আমাদের গড়

আমাদের গড়
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমাদের ঢ্নডনিয়ার গ্রামের বাড়ীটা পড়েছে গড় অঞ্চলে। তবে মধুপুরের গড়েও না ভাওয়ালের গড়েও না। এটা সখিপুরের গড়ে। সখিপুরের পাহাড়ি অঞ্চলে দুই রকম ভুমি আছে। উচু ভুমিকে বলা হয় চালা আর দুই চালার মাঝের নিচু সমতল ভুমিকে বলা হয় বাইদ। ছোট বাইদকে বলা হয় ঘোনা। চালার পানি গড়িয়ে ঘোনায় বা বাইদে পড়ে। বাইদের পানি ঝোড়া(খালের মত) দিয়ে চলে যায় বিলে। বিলের পানি খাল দিয়ে চলে যায় গাংগে(নদীতে)। চালার উপর বাড়ী-ঘর করা হয়। উচ্চতা অনুসারে চালাও আবার বিভিন্ন নামে হয়ে থাকে। যেমন, টিকর, টিলা, খিল ইত্যাদি। স্থানীয়রা যেসব চালায় বিশেষ করে গজাড়ী বন হতো সেইসব চালাকে গড় বলতো। গড় দিয়ে আমাদের এলাকায় গড়বাড়ী নামে একটা গ্রামও আছে। আমাদের বাড়ীর দক্ষিণ পাশ দিয়ে চটান বাইদ চলে গিয়েছে পুবে পশ্চিমে। এই বাইদের দক্ষিণ পাশের সাড়াসিয়া পাড়ায় বিস্তির্ন এলাকাজুড়ে ছিল একটা গড়। গড়ের কথাই আজকে লিখতে চাই।

প্রায় ১৬ বছর আগে আমার স্ত্রী স্বপ্নার পরামর্শে আমাদের চালায় আমি বাড়ির পশ্চিম বেল্টে প্রায় ১০০টি মেহেগনি ও সেগুন গাছ লাগিয়েছিলাম। সেই গাছগুলি এখন বড় হয়েছে। বেশ সুন্দর দেখায়। ২০১২ সনে ওখান থেকে কিছু গাছ কেটে ময়মনসিংহের বাড়ীর দরজা বানিয়েছিলাম। চিড়ানো কাঠ পিক আপ দিয়ে আনার সময় বনবিভাগের লোকেরা রাস্তায় আটকিয়ে দেন। মোবাইল করে জানতে পারি নিজের গাছ হলেও বনবিভাগের কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে গাছ কাটতে হবে। যাহোক, কিছু টাকা জরিমানা দিয়ে পিক আপ চলে আসে কাঠ নিয়ে। আরও কিছু কনস্ট্রাকশনের কাজ হয়েছে। তাই কিছু গাছ কাটার জন্য ভাতিজাকে নির্দেশ দিলাম। সেদিন ভাতিজা মান্নান বললো “কাক্কু, গৌড়া এসেছে গাছ কাটতে। কি কি মাপে গাছ কাটতে হবে?” আমি গৌড়া শব্দটি ভুলেই গিয়েছিলাম। মান্নানের কাছ থেকে গৌড়া শব্দটি শুনে আমার মনে হলো ছোটকালে দেখা গৌড়াদের কথা। গৌড়ারা গড়ের গাছ কেটে দিতো করাত ও কুড়াল দিয়ে। করাতিরা গাছ করাত দিয়ে চিরাতো। কিছু কিছু লোক ছিল তারা গড় থেকে কাঠ কেটে সাইজ করে কুড়াল দিয়ে চেগিয়ে লাকড়ি বানাতেন। সেই লাকড়ি রৌদ্রে শুকিয়ে আটি বেধে বাঁশের তৈরি বাইকে ঝুলিয়ে বাইক কাধে নিয়ে প্রায় ২০/২৫ কিলোমিটার দূরে বল্লা হাটে নিয়ে বিক্রি করতেন। লাকড়ির বোঝা প্রায় চল্লিশ কেজির মতো হতো। এদের বলা হতো কাঠুরিয়া। আমরা বলতাম কাটুইরা। কেউ কেউ বড় বড় গজারি গাছ কেটে গরুর গাড়ী করে নিয়ে যেতেন বল্লা হাটে। এদের বলতাম গাইড়াল (গাড়িয়াল)। বনবিভাগে যারা বনরক্ষির চাকরী করতেন তাদের বলা হতো ফরেস্টার। চুরি করে যাতে কাঠ নিয়ে বল্লার দিকে না যেতে পারে সেজন্য বনরক্ষিরা বংশী নদীর পশ্চিম পারে গুদারাঘাটের টানে টোল ঘরে বসতেন। তারা গায়ে খাকি কালারের শার্ট ও হাফ পেন্ট পরতেন। হাতে থাকতো কাঠের রোলার। আমাদের এলাকায় বড় বড় গড় গুলি সরকারি খাস জমিতে ছিল। এগুলি ছিল সংরক্ষিত বন বা রিজার্ভড ফরেস্ট। আমরা সংক্ষেপে এই গড়কে রিজার্ভ বলতাম। এগুলি রক্ষা করার দায়িত্ব ছিল ফরেস্টারদের। গুদারা ঘাটে যেসব ফরেস্টার থাকতেন তাদের বলা হতো ঘাট ফরেস্টার। ফরেস্টার ও ঘাট ফরেস্টারগন কাটুইরা ও গাইরালদের শত্রু ছিলেন। তারা বন থেকে গাছ কাটতে দিতেন না। ঘাট পাড় হয়ে বল্লার দিকে লাকড়ি ও কাঠ নিয়ে যেতে দিতেন না। দিলেও দুই চার টাকা নিয়ে ছেড়ে দিতেন। একবার ছাকে ভাই এক ফরেস্টারকে ধরে গজারি গাছের সাথে বেধে মাথায় কুত্তা ডেউয়ার (লাল পিপড়া জাতীয়) বাসা ভেংগে দিয়েছিলেন রাগ করে। আরেকবার ছাকে ভাই মরিচকুরির ঘাটের এক ঘাট ফরেস্টারের দুই গালে দুই থাপ্পড় মেরে গাং সাতরিয়ে চলে এসেছিলেন। কারন, বেশী টাকা দাবী করেছিলেন। তবে এই টাকা বৈধ টোল ছিল কিনা আমি জানি না। বর্ষাকালে নদী ভরে যেতো। তখন কাঠুরিয়া ও গাড়িয়ালরা ইন্দাজানী (ইন্দ্রজানী) ও পলাশতলীর হাটে লাকড়ি ও কাঠের গুড়ি বিক্রি করতে আসতেন। ভৌরারা (সমতল ভুমিরা) জ্বালানী ও ঘরের খুটির জন্য সেইগুলি কিনে নৌকা দিয়ে নিয়ে যেতেন। ঘাট ফরেস্টাররা রাস্তায় নৌকার লগি গেড়ে ওৎ পেতে বসে থাকতেন। লাকড়ি ও কাটের নৌকা দেখলেই ডাক দিতেন “এই, নৌকা ভিড়াও। ” লাকড়িওয়ালারা কিছু টোল দিয়ে লাকড়ি নিয়ে চলে যেতেন। একবার পলাশতলী হাট থেকে নৌকা যোগে আমি রৌহা যাচ্ছিলাম। পাশের নৌকায় চকপাড়ার ইয়াসিন হাজী সাহেব কয়েক আটি লাকড়ি নিয়ে যাচ্ছিলেন। ঘাট ফরেস্টার ডাক দিয়ে বসলেন “এই, নৌকা ভিড়াও। ” হাজী সাব তার নৌকায় চরা অন্য যাত্রীকে বলতে বললেন “বলে দাও, হাজী সাব রান্না করার জন্য কিছু লাকড়ি কিনেছেন। ” শুনে ফরেস্টার বললেন “ঠিক আছে, যান।”
আমি আজ যেসময়টার কথা লিখছি সেটা ৫০ বছরের আগের কথা। তখন এই অঞ্চল জীববৈচিত্র ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভরা ছিল। বাড়ীর পিছনে যে বন থাকতো তাকে বলা হতো আড়া। আড়াতে সাধারণত বাঁশঝাড় থাকতো। এসব আড়াকে বলা হতো বাঁশ আড়া। বাস আড়ায় সাধারণত প্রাকৃতিক কর্ম সাড়া হতো। এই কর্ম শুধু এক জায়গায় করা হতো না। একেকদিন একেক যায়গায় করা হতো পরিষ্কার জায়গা দেখে দেখে। শুনা যায় ভাজন ফকির সাব মুক্তি যুদ্ধের সময় আড়ায় বসে প্রাকৃতিক কর্ম সারতেছিলেন। এমন সময় দেখেন কয়েকজন মুক্তি যোদ্ধা অস্ত্র হাতে নিয়ে পজিশন নিয়ে আছে চটান বাইদ দিয়ে অগ্রসরমান পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দিকে। দেখে ভাজন ফকির বলেছিলেন “তোমরা না, মুক্তিযোদ্ধারা কি যে শুরু করছো, আমি একটু শান্তিতে ইয়েও করতে পারছিনা। ” বাড়ী থেকে একটু দূরে ছোট ছোট বনকে বলা হতো ঝোপ। এই সব ঝোপঝাড় ছোট ছোট ঘন লতাপাতা গাছে ভরা ছিল। সাপ, বেজি, সজারু,ওয়াপ (বন বিড়াল), খাটাস (খেক শিয়াল), ফেউর, হাইল্লা (গন্ধ গোকুল), ফইটা (খোরগোস), শিয়াল, কানাকুক্কা ইত্যাদি বসবাস করতো এইসব ঝোপে। বড় বড় অজগর থাকতো। বড় বড় বনকে বলা হত জংগল। জংগলে নানা জাতের গাছ ছিল। করই, ছেচড়া, সিদা, তিতিজাম, পিড়িলা, আজুগি, বানরনরী, গাদুইলা, পলাশ, বয়রা, আমলকী, হরতকী, জয়না ইত্যাদি বড় বড় গাছ ছিল। আজুগী গাছের পাতা বিরাট বিরাট ছিল। আজুগি ফল দেখে মনে হয় যেন ছোট চালতা। এইসব বন্য গাছের ফলও খাওয়া যেতো, যেমন, হরতকী, বয়রা, আমলকী, তিতিজাম, বেহুল গোটা, পিড়িলা, আনাই গোটা, জয়না গোটা ইত্যাদি।

এইসব গাছে বড় বড় পাখীর বাসা ছিল। চিল, হাদাল (ঈগল), শকুন, হাড়ং (সাড়স/মদন টাক), বক ইত্যাদি পাখী বাসা করতো এই সব গাছে। আগে ময়ুর ও বন মুর্গীও ছিল এই সব বনে। আমি মাত্র একবার ময়ুর ও দুইবার বন মোরগ দেখেছি আমাদের বাড়ীর দক্ষিণ পাশের জংগলে। বাবার কাছে শুনেছি দাদা এখানে বাঘও দেখেছেন। বাবা বাঘ দেখেন নি তবে বাগের ডাক শুনেছেন। বাবার কাছে জিজ্ঞেস করেছিলাম “বাঘের ডাক শুনতে কেমন গো?” বাবা বললেন “একটা মাটির রাইংগের (বড় পাতিল) ভিতর মুখ রেখে হালুম হালুম ডাকলে যেমন শুনা যায় তেমন।” আমি কয়েকটি হরিণ দেখেছি। বাবা অনেক হরিণ দেখেছেন এ গ্রামে। একদিন নাকি আমাদের বড় বাইদের আমন ধান ক্ষেতে ধান খাওয়ার সময় গলায় ধান ঠেকে হরিণ পড়ে গিয়েছিল। এই সুযোগে হরিণটা ধরে ফেলেন পাড়ার কয়েকজনে। জবাই করে খেয়েছিলেন কিনা আমার মনে নেই।
জিন্না ভাইদের বাড়ীর সামনে গর্ত গর্ত ছিল। এখানে নাকি বন্য মহিষরা অল্প পানিতে গড়াগড়ি খেলতো। বাঘ থাকতো মাত্র কয়েকটি। একবার নাকি একটা বাঘ বাগেরবাড়ীর জংগল থেকে বেড় হয়ে হাইল হিন্দুর(সাইল সিন্দুর) খাল ও গাং (বংশী নদী) সাতরিয়ে পাড় হয়ে পশ্চিম দিকে ধাবিত হয়ে রৌহার দিকে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে আমার তাঐ মওলানা জহির উদ্দিন একটা তরবারি নিয়ে ওৎ পেতে ছিলেন। সামনে আসা মাত্রই এক কোপে মাথা চেগিয়ে ফেলেন। এমন শক্তিশালী ছিলেন আমার তাঐ। সেই তরবারিটা আমি দেখেছি। হাতে নিয়েছিলাম। খুব ভারী ছিল সেটা।
গড়ের মাঝে মাঝে কিছু খোলা যায়গা ছিল। সেখানে খুব ছন হতো। এগুলিকে বলা হতো ছন পাওড়। এই ছন পাওড় আমি সুন্দর বনে গিয়েও দেখেছি। গাইড আমাদেরকে বাঘের পায়ের ছাপ দেখালেন সেই ছন পাওড়ে। আমাদের ছন পাওড়েও নাকি অনেক আগে বাঘ বসে থাকতো হরিণ শিকারের জন্য। আমি বাঘ দেখি নাই, কিন্তু শিয়াল দেখেছি ছাগল শিকার করতে আমাদের ছন পাওড়ে। ছন কেটে শুকিয়ে ঘরের চাল (চালা) ছাওয়া হতো। বেশী ভাগ ঘরের চালাই ছিল ছনের ছাউনি।

গড়ের ভিতর সঠি নামে এক প্রকার গাছ ছিল। এগুলি হলুদ গাছের মত। সুন্দর ফুল হয় সঠি গাছে। মাটির নিচে হলুদের মতোই কন্দ হতো। সঠির কন্দ হলুদ না, সাদা। গরীব মেয়েরা এই সঠি কোদাল দিয়ে কুপিয়ে তুলে ধুয়ে পরিষ্কার করে ঝাঝড়া টিন সীটে ঘষে পানির সাথে মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে শুকিয়ে কাটলেট করে তারা বিক্রি করতেন ক্রেতারা এইগুলি নিয়ে ফ্যাক্টরিতে দিতেন। ফ্যাক্টরিতে থেকে তৈরি হতো সঠি বার্লি। বার্লি ছিল তখনকার প্রধান শিশুখাদ্য। ধনি শিশুরা খেতো এবারুট বার্লি। এবারুট বার্লি দিয়ে আমরা শার্টে মার দিতাম। বেশী ভাগ শিশুদের প্রধান খাদ্য ছিল সঠি বার্লি।

আমাদের গড় এলাকায় বংশী ও মান্দাই নামে দুই উপজাতির লোক বাস করতেন। তারা সাধারণত জংগলের ভিতর বাড়ী করতে পছন্দ করতেন। এদের মধ্যে মান্দাইগন বেশী আদি ছিলেন। তারা খুব শান্ত প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তোন কিছু তাদের কিনতে হতো না। বন্য পশুপাখি ও বন্য আলু খেয়ে তারা প্রধানত ক্ষুধা মিটাতেন। পুরুষরা খালি গায় থাকতেন শুধু একটা লেংটি পড়ে। মেয়েরা একটুকরা কাপড় দিয়ে কোমর পেচাতেন, আরেক টুকরা কাপড় দিয়ে বুক বাঁধতেন। ছেলে মেয়ে সবাই বিড়ি খেতেন। তাদের নিজস্ব বিশেষ ভাষা ছিল। আমাদের সাথে কথা বলার সময় ভাংগা বাংলায় বলতেন। তারা আপনি বলতেন না। বলতেন তুই।

মান্দাইদের নিজস্ব ধর্ম ছিল। সন্ধায় কাশার থালা বাজিয়ে পুজা করতেন। তাদের ভাষায় গান গেয়ে ইশ্বরের বন্ধনা করতেন। এরা অনেকেই খৃস্টান মিশনারিদের মাধ্যমে ধর্মান্তরিত হয়ে লেখাপড়া করে ভালো চাকরি করে শহরে বসবাস করছেন। কেউ কেউ মধুপুরের গড়ের দিকে চলে গেছেন। অল্প কয়েকজন এখনো ঢ্নডনিয়া পাড়াতে বসবাস করছেন।

আমাদের গড়ে অনেক বন্য শুকর থাকতো। দিনের বেলা ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থাকতো। রাতের বেলা দল বেধে বেড় হতো কচু গেচু খেতে। বিরাট বিরাট শুকুর পাওয়া যেতো আমাদের গড়ে। মান্দাইগন দল বেধে জংগলের এক দিক থেকে ঝোপঝাড় পিটাতে পিটাতে আরেকদিকে যেতেন। উলটা দিকে পালোয়ান বন্দুক হাতে তাক করে থাকতেন। মান্দাইদের তাড়া খেয়ে শুকুর অন্য বনের দিকে ধাবিত হতো। এই সুযোগে পালোয়ান গুলি করে শুকুর মেরে ফেলতো। যাদের কাছে বন্দুক ছিল তাদেরকে পালোয়ান বলা হতো। পালোয়ান সাধারণত বাংগালী থাকতো। গাছের ডালের সাথে অথবা বাশের সাথে উলটা করে ঝুলিয়ে লেংটি পরা মান্দাইগন শিকার করা শুকুর নিয়ে কোমর দুলিয়ে চলে যেতেন। যে সব শুকুরের সামনে লম্বা দাত ছিল সেগুলিকে বলা হতো দাতাল। অনেকেই বলত এই বনে দাতাল আছে। আমি একদিন হয়দর (হায়দার) ভাইদের বনে দাতাল দেখেছিলাম আমার সামনে দিয়ে দোড়িয়ে যেতে। খুব ভয় পেয়ে এক দৌড়ে বাড়ী চলে আসি। বড় হয়ে জেনেছি ওগুলি ছিল গন্ডার।

মান্দাইগন দল বেধে বন্য আলু তোলতেন গড় থেকে। আলু গাছের লতা গজাড়ি গাছে উঠে যেতো। গাছের গোড়ায় লম্বা লম্বা সাদা আলু থাকতো। মান্দাইগন খোন্তা (গাইতি) দিয়ে মাটি খুড়ে আলু তুলে নিতেন। মেয়েরা ছোট ছোট বাচ্চা গামছায় বেধে গলায় ঝুলিয়ে আলু তোলতেন।
মান্দাইগন কুচ্ছে খেতেন। কুচ্ছে দেখতে বাইপ মাছের মতো। কিন্তু এগুলি মাছ প্রজাতির না। একবার ছোট চওনার বাজারে মাছের হাটের সাথে একজন মান্দাই কুচ্ছে নিয়ে বসেছিলেন বিক্রির জন্য। আমি তাকে বললাম “কিছু মনে নিবেন না। এগুলি মাছ না। কোন কোন মুসলিম ভুল করে বাইম মনে করে কুচ্ছে কিনে ফেলতে পারে। মুসলিমদের কাছে কুচ্ছে হারাম (নিষিদ্ধ) খাবার। আপনি দয়া করে আলাদা হয়ে বসেন। সবাই ভালো বলবে। ” লোকটি তাই করলো। আমি এখনো সেই কথা মনে করি। তখন মাত্র ক্লাস ফোরে পড়তাম।

গড়ের ভিতর গজাড়ি পাতা পড়ে পচে স্তূপ হয়ে থাকতো। পচা পাতার নিচে দুরা নামে বড় বড় কাছিম (কচ্ছপ) থাকতো। মান্দাইগন চোখা একটা রড ঢুকিয়ে দিতেন পচা পাতার ভিতর। কাছিমের গায়ে লাগলে তারা টের পেতেন। তারপর ধরে আনতেন কচ্ছপ। একেকটি কচ্ছপ পাচ/ছয় কেজির মত বড় হতো।

গড়ের ঝোপের ভিতর বড় বড় খোরগোস বসে থাকতো। খরগোসকে বলা হতো ফইটা। ফইটা দিনে ঘুমাতো। রাতে মাঠে ঘাস খেতো ছাগলের মতো। খাবার সময় তারা নাদায়তো (পায়খানা) ছাগলের মতো গোটা গোটা। বিকেল বেলা মান্দাইগন মাঠে ফইটার নাদা (গোবর) খুঝতেন। কাচা গোবর দেখলে মনে করতেন পাশের জংগলে জীবিত ফইটা আছে। জংগলের এক পাশে পাতা দিয়ে ছট্ট ঘর বানিয়ে চুপ করে বসে বিড়ি টানতেন। মাঠের এক দিকে থাকতো জংগল, একদিকে ভলিবল খেলার নেটের মতো নেট, দুই দিকে সুতা টানানো থাকতো। সুতায় ৮/১০ ইঞ্চি লম্বা লম্বা সোলা ঝুলানো থাকতো। সন্ধার অন্ধকার নামার পর একে একে খরগোসগুলি বন থেকে বেড়িয়ে এসে মাঠে ঘাস খাওয়া শুরু করতো। মোটামুটি সবগুলি বেরিয়ে আসলে শিকারি মুখে হইট হইট করে উঠতেন এবং সুতা টেনে সোলা দোলাতে থাকতেন। খরগোশরা এদিক সেদিক তাকিয়ে নেটের দিকে নিরাপদ মনে করে দৌড় দিয়ে নেটে জড়িয়ে পড়তো। এই সুযোগে সবগুলিকে ধরে ফেলতো। পায়ে বেধে উলটা করে ঝুলিয়ে নিয়ে যেতেন কাধে করে। ফইটাদের করুণ চাহুনি দেখে আমাদের মায়া হতো। আমি একটা লাঠি হাতে নিয়ে ঝোপের ভিতর ফইটা খুঝে বেড়াতাম। বড়ালের মতো করে ঘুমিয়ে থাকতো ঝোপের ভিতর। আমি আলতো করে পিঠে খোঁচা দিতাম। ফইটা দুই কান খারা করে হরিনের মতো লাফিয়ে অন্য বনে চলে যেতো। দেখে খুব মজা পেতাম।

আমাদের গড়ে নানা জাতের লতা ছিল। এগুলিকে বলা হতো নও। নও চিড়িয়ে সুতার মতো করে ঘরের চাল ছাওয়া ও বেড়া বাধার কাঝে ব্যবহার করা হতো। ফুলঘড়ি গাছ কেটে শুকিয়ে বেড়া বাধা হতো। কচি কচি গজারি গাছ কেটে লাকড়ি ও বেড়া দেয়ার কাজে ব্যবহার করা হতো। ফুল ঘড়ির ফুল দিয়ে ফুল কপি খেলতাম। হিয়ালমুতির ফুল দিয়েও আমরা খেলতাম। দুপুর বেলা এক প্রকার ফুল ফুটতো। এটাকে বলতাম দুপুইরা ফুল। বনে হাটা হাটি করার সময় পায়ে মোন কাটা ফোটতো। আরেক মোন কাটা দিয়ে খুচিয়ে পায়ের মোন কাটা বের করতাম। যাকে বলা হয় কাটা দিয়ে কাটা তোলা। গড়ে টেওড়া কাটা নামে এক প্রকার কাটা ছিল। ক্ষেতের বেড়া দিতে এই কাটা ব্যবহার করা হতো। বিশ কাটালি নামে এক প্রকার ফল ছিল। এটা বিষাক্ত ফল ছিল। ছেইচ্চা পুকুরে ছিটাইয়া দিলে মাছ অজ্ঞান হয়ে ভেসে উঠত। এই ফল নিয়ে গবেষনা করে হয়ত অজ্ঞান করার ঔষধ বানানো যাবে।

গড়ের ভিতর মাঝে মাঝে গভীর কুয়া (কুপ) দেখা যেতো। এই কুয়াগুলিতে পানি ছিল না। নিচের দিকে তাকালে অন্ধকার দেখা যেতো। এগুলিকে বলা হতো আন্ধা কুয়া। আন্ধা কুয়াগুলি কোন যুগে কে কেটেছিল আমরা জানি না। মাঝে মাঝে কাকরের খনি আছে। আমরা বলি কাউচি। এই কাউচি কর্দমাক্ত রাস্তায় বিছিয়ে রাস্তা শক্ত করা হতো। এখনো হয়। সিমেন্ট বালির সাথে কাউচি মিশিয়ে কনক্রিট তৈরি করা হতো। আমাদের যে ইদারা কুয়া ছিল সেটার পাট (রিং) এই কাউচির কংক্রিট দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল।

মাঘ ফাল্গুন মাসে গজারি গাছের সমস্ত পাতা পড়ে নেড়া হয়ে যেত। এই পাতা ঝাড়ু দিয়ে স্তুপ করে টেপারি (ঝাকা) ভরে কৃষকগন বাইদের ক্ষেতে বিছিয়ে দিতেন। তারপর আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে ছাই করতেন। এই ছাই ভালো জৈব সার ছিল। মেয়েরা টেপারি ভরে রান্নাঘরে এনে স্তুপ করতেন। এই শুক্নো পাতা রান্নার চুলার জ্বালানী হিসাবে ব্যবহার করতেন। চৈত্রমাসে খরতাপে গড় এলাকার আবহাওয়ায় নিম্নচাপ তৈরি হয়ে বাকুল্লা বাতাস (ঘুর্নিবায়ু) তৈরি হতো। সেই ঘুর্নি বায়ু গজারির পাতা আকাশের চুরা পর্যন্ত উড়িয়ে তুলতো। গুর্নি বায়ু ঘুরতে ঘুরতে গ্রামময় প্রদক্ষিণ করতো। কেউ এই বায়ুর মাঝে পড়ে গেলে তার কাপড় চোপড়ও উড়ে যেতো বাতাসের সাথে। ঘুর্নিবায়ু শেষ হলে সারা আকাশে গজারির পাতা শকুনের মতো উড়তে থাকতো। তখন আকাশে দল বেধে শকুনরা ঘুরে ঘুরে উড়তো। স্বাধীনতা যুদ্ধের গোলাগুলির শব্দে শকুনরা দেশ ছেড়ে চলে গেছে। মরাগাছের ডালে ডালে ঘষা লেগে কোন কোন সময় গড়ের বিছানো গজারি পাতায় আগুন ধরে যেতো। এই আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে সারাগড় পুড়ে যেতো। একেবেবারে বাসার চালা থেকে শুরু করে সাড়াসিয়ার পুর্ব মাথা পর্যন্ত পুড়ে গড় পরিষ্কার হয়ে যেতো।

ফাল্গুন মাসে গড় ভরে যেতো গজারি ফুলে। পলাশ ও শিমুলগাছ ফুল ফুটে লাল হয়ে যেতো। ডালে ডালে পাখী গান গাইতো। নানাজাতের পাখী ছিল এই গড়ে। বসন্ত কালে পাখীরা বাসা করে ডিম দিয়ে বাচ্চা দিতো। আমি পাখি খুব পছন্দ করতাম। বাসা বানানো থেকে বাচ্চা বড় হওয়া পর্যন্ত আমি পর্যবেক্ষণ করতাম গাছে উঠে উঠে। এক সময় আমার পর্যবেক্ষণে প্রায় ৫০ টা পাখীর বাসা ছিল। শীকারীরা পাখী দিয়ে পাখী শিকার করতেন। একটি ছোট খাচায় পোষা পুরুষ ঘুঘু পাতা দিয়ে ঢেকে গাছের ডালে বসিয়ে রাখতেন। বন্দী পাখীটি ঘুঘু ডাকে মাতিয়ে তুলতেন। মুধুর ডাকে সাড়া দিয়ে বন্যপাখী পোষা পাখিটির সামনে ফাদের উপর বসে আটকা পড়তো। শীকারিরা এইভাবে অনেক ঘুঘু শীকার করে খেতেন। মনো ভাই সারাজীবনই ঘুঘু শীকার করেছেন। তারছেলে মকবুল এখন মৌচাক ভাংগায় ওস্তাদ। এই গড়ে প্রচুর মৌচাক ছিল। যারা মৌচাক ভাংতেন তাদের বলা হতো মৌয়াল।

গ্রীষ্ম কালে গড়ের গজারি গাছ গজারি ফলে ভরে যেতো। গজারি ফল দেখতে ফুলের মতো। একটা ছোট বলের সাথে গ্রামীন ফোনের লগোর মতো তিনটি পাখা আছে গজারির ফলে। পরিপক্ব হলে এই ফল ঝাকে ঝাকে পাখা দিয়ে উড়তে উড়তে ঘুরতে ঘুরতে নিচে পড়তো। দেখতে খুবই সৌন্দর্য। গ্রামীন ফোনের লগো উড়ার মতো।

আম ও কাঁঠাল গাছ ছাড়া আর সব গাছই ছিল বন্য গাছ। এগুলি আপনা আপনি গজাইত। আমরা যখন ঘোনার চালা প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম তখন কালিয়া পাড়া মোসলেম চাচাদের বাড়ীর দক্ষিণ পাশের বাচ্ছ্রা ক্ষেতের বাতর (আইল) দিয়ে যেতাম। এই আইলে দুইটি অচেনা গাছ ছিল। খুব লম্বা। আকাশ পর্যন্ত লম্বা ছিল। কেউ এই গাছের নাম জানতো না। ঐ ক্ষেতে দশ বারটি অচেনা মুর্গী দেখতাম। আমরা বলতাম চিনা মুর্গী। বড় হয়ে জেনেছি ওগুলি তিতির। কালো একজাতের হাস দেখতাম। মাথায় রংগিন কারুকাজ করা। আমরা বলতাম চিনা হাস। বড় হয়ে যেনেছি ওগুলি পেলিকান। বিরাট বিরাট হাস দেখতাম ওখানে ঘাস খেতো। কাছে গেলে ঠোকরাতে আসতো গলা লম্বা করে। ওগুলো ছিল রাজহাঁস। আমি তখন ক্লাস ওয়ানে পড়তাম। বানু আপা (হাছনা বানু, হাছেন কাক্কুর মেয়ে) তখন ক্লাস ফোরে পড়তেন। বললেন “চল এই বাড়িতে ময়নাপাখি দেখি আসি। ময়নাপাখি কথা বলতে পারে।” বাড়িতে প্রবেশ করে বারান্দার কাছে যাওয়ার সাথে সাথে খাচায় বসা একটি ময়নাপাখি দেখতে পেলাম। শালিকের চেয়ে একটু বড়। ঘর থেকে মোসলেম চাচার মেয়ে ময়না আপা বেড় হয়ে বললেন “ময়না কথা কও। ” ময়নাপাখি অনর্গল বলতে লাগলো “ময়না, কথা কও। ইষ্টি আইছে বসতে দেও।”
মানুষ ছাড়াও অন্য প্রানী কথা বলতে পারে জেনে খুব বিস্মিত হলাম। আমাদের গড়ের একটি গাছ কথা শোনে। গাছটার নাম ভুলে গেছি। দুই তিন ফুট লম্বা হয় সেই গাছটি। এখনো আছে। ঠোটে শীশ দিয়ে হাতে তুড়ি বাজালে ঐ গাছের পাতা ধীরে ধীরে উঠা নামা করে। লজ্জাবতী নামে একটা ছোট কাটা গাছ আছে। ওটাতে ছোয়া লাগালে লজ্জা পেয়ে চুপসে যায়।

বানু আপা আমার চাচাতো বোন। আমার থেকে তিন চার বছরের বড়। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। স্কুলে যাতায়াতে আমাকে কাছে রাখতেন। কারন, আমি একজন শান্তশিষ্ট ছেলে ছিলাম। এখনো তিনি আমাকে খুব স্নেহ করেন। যতবারই গ্রামের বাড়ী যাই ততবারই বানু আপা ছোট খাটো রোগের উপসর্গ নিয়ে আমার কাছে আসেন। আমি মনে করি তিনি মুলত আমাকে দেখতে আসেন। গত দুই বছর তিনি আসেন নি। আমি কিছুটা উদ্বিগ্ন হই। তিনি শারীরিক ভাবে দুর্বল হলেন কিনা? তাই আমি হাটতে হাটতে বেড়াতে বেড়াতে সাড়াসিয়ায় বানু আপাদের বাড়িতে চলে যাই। গত বছর দুলাভাই ক্যান্সারে মারা গিয়েছেন। বানু আপা এখন একা হয়ে পড়েছেন।

ময়না আপা বানু আপাদের ক্লাসমেট ছিলেন। ময়না আপাদের ময়নার মুখে প্রথম পাখীর কথা বলা শুনেছিলাম। তাই ময়না আপার নামটি এখনো মনে আছে। ময়না আপা মোসলেম চাচার দ্বিতীয় মেয়ে। মোসলেম চাচা বনবিভাগে চাকরি করতেন। গ্রামের বাড়ী বেশী থাকতেন না। তিনি মোসলেম ফরেস্টার নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি খুব সৌখিন মানুষ ছিলেন। তাই বিদেশী জাতের গাছ ও পাখী পালন করতেন। বড় হয়ে জেনেছি তার বাড়ির সামনের সুউচ্চ গাছ দুইটি ছিল ইউকিলেপ্টাস। মোসলেম চাচার ছেলেরা সবাই উচ্চ শিক্ষিত চাকুরীজীবি। নাতী নাত্নীরাও ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকার, খামারী, চিত্র নায়ক ইত্যাদি। কয়েকমাস আগে আমার চেম্বারে বিপ্লব নামে এক ছেলে এসে মামা মামা ডাকছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম
– তুমি কে যেন?
– মামা, আমি কালিয়ার মোসলেম সাহেবের মেয়ের ঘরের নাতী।
– তোমার মায়ের নাম কি?
– আমার মায়ের নাম মনোয়ারা।
– ময়না আপা তোমার মায়ের বড় না ছোট?
– আমার মায়েরই ডাকনাম ময়না। আমার মায়ের নাম আপনার মনে আছে?
– মনে আছে। আমি তোমার মামার বাড়ী গিয়ে প্রথম ময়না পাখী দেখেছিলাম। ময়না আপা দেখায়েছিলেন। তাই, নাম টি মনে আছে। তুমি কি করছো?
– মামা, আমি ডিগ্রী পাশ করে ইউরোপে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে বেশ কিছু ডলার কামিয়ে দেশে ফিরে এসেছি। চিন্তা করলাম বিদেশে কিছু করার চেয়ে দেশে গিয়ে কিছু করি। কাদের নগর মুজিব কলেজের সাথে দশ লাখ টাকা দিয়ে কিছু জমি ও পুকুর লিজ নিয়ে তার্কি, হাস ও মাছ চাষ করছি। তার্কি পালন করে খুব নাম করেছি। ঢাকা থেকে অনেক দর্শক আসে আমার ফার্ম দেখতে। আমার ফার্ম টিভিতেও প্রচার হয়েছে। আমার আরেক ভাই রিপন মডেল ও অভিনেতা। চিত্র নায়ক আরিফ আমার বড় খালার ছেলে।

ভাবলাম উপযুক্ত নানার উপযুক্ত নাতী। নানায় পালন করতেন তিতির, রাজহাস, পেলিকান, ময়না। নাতী পালন করছে তার্কি মুরগী আধুনিক খামারে।

মোসলেম চাচার দ্বিতীয় ছেলে আমিনুল ইসলাম ভাই গ্রামীন ব্যাংকের বড় কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ময়মনসিংহ জোনাল অফিসের ম্যানেজার থাকাকালীন ফামিলি নিয়ে আমাদের বাসায় বেড়াতে আসতেন। আমার মনে হতো ময়নাপাখির কথা। “ইষ্টি আইছে, বসতে দেও। ” আমরাও তার বাসায় বেড়াতে যেতাম। এখন তিনি ঢাকার মীরপুরে বাড়ী করে অবসর কাটাচ্ছেন। আমার সাথে মোবাইলে কথা হয়। ফেইসবুকে রেগুলার ইন্টারেকশন হয়।

স্বাধীনতার পর বনবিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ক্ষমতা কমে যায়। বনরক্ষিরা বনরক্ষা করতে ব্যর্থ হন। গড় এলাকার জনগন বনরক্ষিদের মানতে চান না। তারা দেদার্সে বৃক্ষনিধনে মেতে উঠেন। স্বাধীনতার পরবর্তী বছরগুলিতে, বিশেষ করে ১৯৭৩/৭৪ সনে দেশে খাদ্যাভাব ও অভাব অনটন দেখা দেয়। অনেকেই গজারি গাছগুলি কেটে বল্লা হাটে নিয়ে বিক্রি করতে থাকে। প্রভাবশালীগন কামলা নিয়ে গজারি গাছের মোথা উপরে ফেলে গড় এলাকা ধানী জমি বানিয়ে ফেলেন। ধনিরা আরো ধনি হয়ে যায়। গরীবরা গরীবই থেকে যায়। আমি তখন ক্লাস সিক্স সেভেনে পড়ি। বন্ধুরা চারজন মিলে পরামর্শ করলাম “সবাই যখন সরকারি গড়ের গাছ কেটে বিক্রি করছে চলো আমরাও একটা গাছ কেটে বিক্রি করে জিলাপি খাই।” সরকারী গাছ। তাই হাল্কা চুরি মনে হলো। যাহোক, চুরি তো! তাই, আমরা রাতে গেলাম কুড়াল নিয়ে গাছ কাটতে। চটান পর্যন্ত গেলে দেখি দুই চোর একটা গাছ কাধে নিয়ে গড়ের দিক থেকে আসছে। আমাদের দেখামাত্র গাছ কাধ থেকে ফেলে দিয়ে বনের দিকে দৌড়িয়ে পালালো। আমরা বললাম “ধর ধর ধর।” আমরা চোরদেরকে চিনতে পারি নাই। তবে আন্দাজ করতে পেরেছিলাম। চিনবেন। নাম বলব না। আমরা চোরের উপর বাটপারি করে চারজনে কাঠটি কাধে নিয়ে চলে আসলাম। আমাদের কুড়াল দিয়ে গাছ কাটতেও হলো না জংগলেও যেতে হলো না। কাঠাল কাছের সাথে কাঠটি খারা করে রাখলাম। গাড়িয়ালদের কাছে বিক্রি করতে চাইলাম। তারা ভালো দাম বললেন না। ওভাবেই খারা অবস্থায় ছিল কাঠটি। একদিন দেখি কাঠটি কে যেন চুরি করে নিয়ে গেছে। ছলেরটা জলেই গেলো।

সাড়াসিয়ার গড় সাবার হয়ে গেলো। একটা গাছও রইল না। গাছের মোথা পর্যন্ত উঠিয়ে ধানীদের জমি হয়ে গেল। জীব বৈচিত্র্য ধংস হয়ে গেলো। গড় আর গড় রইল না।

পরবর্তী সময়ের সরকার এসে সেই গড়ের সরকারি খাস জমি উদ্ধার করলো। কিন্তু গজারির বন আর বানাতে পারলো না। কারন, গজারি গাছ সাধারণত গজারি গাছের মোথা থেকে গজাতো। বিকল্প হিসাবে বন বিভাগ বিদেশী জাতের দ্রুত বর্ধনশীল গাছ ইউকিলেপ্টাস ও আকাশির চারা সারিবদ্ধভাবে লাগিয়ে বনায়ন করলো। বন পার্কের মতো সুন্দর হলো। কিন্তু সেই জীব বৈচিত্র্য আর ফিরে এলো না। আধুনিক করাত কল বসেছে। এইসব কাঠ চিরিয়ে আধুনিক ফার্নিচার তৈরি হচ্ছে। গজারির পাতার প্রয়োজন নেই। আছে রাসায়নিক সার। লাকরি কাটার প্রয়োজন নেই আছে বাড়ি বাড়ি গ্যাসের চুলা গ্যাসের সিলিন্ডার। পানির নেই অভাব। সাবমার্সিবল পাম্প দিয়ে পানি তুলে পাকা বাড়ির ছাদের টেংকি ভরে সাপ্লাই হচ্ছে পানি পাকা টাইলস করা বাথ রুমে। সাইবার অপ্টিক কেবল দিয়ে বিদেশী টেলিভিশন চেনেল দেখা হচ্ছে। পাখীর ডাক শোনার আগ্রহ কারো নেই। পাওয়ার ট্রিলার দিয়ে চাষবাস করাতে গরু কমে গেছে। এখন আর মাঠে মরা গুরু পড়ে থাকে না। তাই শকুনেরাও আসে না।

জানি আমার এই গল্প কারো এখন আর ভালো লাগবে না। আমার বয়সের অথবা আমার চেয়েও বড় যারা আমাদের এলাকার আছেন তারা যদি আমার এই গল্প পড়তে পারতেন তবে হয়তো তাদের ভালো লাগতো। কিন্তু তারা অনেকেই ডিজিটাল হতে পারেন নি। ডিজিটাল মিডিয়া চালাতে পারেন না। তাদের কোন নাতী নাত্নী বা সন্তান যদি আমার এই লেখা পড়ে থাকেন তবে যেন তারা সেই পুড়ানো দিনের লোকদিগকে পড়ে শুনান।

তারিখ: ১৩/১২/২০১৮ ইং
স্থান: ময়মনসিংহ -ঢাকা-ময়মনসিংহ জার্নি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *