আমার হেয়ার ড্রেসার

আমার হেয়ার ড্রেসার
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

যারা বিভিন্ন স্টাইলে চুল কেটে দেন তাদের বলা হচ্ছে হেয়ার ড্রেসার। বিভিন্ন বয়সে আমি বিভিন্ন স্টাইলে চুল কাটাতাম। তাহলে আমারও হেয়ার ড্রেসার ছিল বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন রকম। আজ তাদের নিয়ে কিছু স্মৃতিচারণ করতে চাই। আমি যখন বুঝমান হয়েছি তখন থেকে দেখেছি যারা চুল কাটেন তাদেরকে নাপিত বলা হয়। সামনাসামনি কেউ তাদেরকে নাপিত বলেন না। অনেকে রাগ করে নাপিত বলে গালী দিয়েও থাকেন। সামনাসামনি তাই নাপিতকে কেউ নাপিত বলেন না। দাদা, কাকা, ভাই ইত্যাদি বলে সম্বোধন করেন। আমাদের এলাকার নাপিতগণ সাধারণতত সনাতন ধর্মাবলম্বী শীল গোত্রের হতেন। এলাকার কিছু মুসলিমরাও এই কাজ করতেন। শহরের আধুনিক সেলুনে যারা চুল কেটে দেন তাদেরকে সেলুন কারগর বলা হয়। পার্লারে যারা চুলের স্টাইল করে দেন তারা শিক্ষিত হেয়ার ড্রেসার। এই পেশার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে, আমার এই গল্পের প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য, সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য, নাপিতই লিখলাম। কেউ কিছু মনে নিয়েন না। অনেকে পরিবর্তন করে এদেরকে নরসুন্দরও বলতেন। এই নাপিত বা নরসুন্দরগনই আজকের যুগের হেয়ার ড্রেসার। শহরের সেলুন কারিগররা অনেকেই বিহারী মুসলিম। আমাদের এলাকায় নাপিতের অভাব ছিল। তাই দুই একটি গরীব পরিবার নাপিতের পেশা বেছে নেন। তাদেরকে কেউ কেউ সাফাই মাতবর বলেন। পরবর্তীতে তারা এই পেশা ছেড়ে দেন। শুনা যায় এই ফ্যামিলির দুইজন লোক মল্লিকবাড়ী হাটে যাওয়ার সময় রাস্তায় রাখা ধানের আটি পাড়ায়ে যাচ্ছিলেন। ধানের আটির মালিক রাগ করে ধান ক্ষেত থেকে ডেকে বলেন “এই নাপিতেরা, ধান পাড়াইতাছস কেন।” শুনে নাপিতরা বলাবলি করছিলেন “সেই বারো বছর আগে আমরা নাপিতের পেশা বাদ দিয়েছি। এরা এত দুরের মানুষ। আমাদেরকে চিনলো কেমনে? মনে রাখলোই বা কেমনে।” আসোলে তারা একসময় নাপিত ছিলেন, তাই তাদের নাপিত বলাতে মনে কিছু নিয়েছেন। ধানের মালিক জেনে বলেন নি, তিনি গালী দিয়েছিলেন।

আমাদের পাড়ায় কোন নাপিত ছিলেন না। কালিহাতি অঞ্চল থেকে দুইজন হিন্দু নাপিত আসতেন ধুতি পরে। থাকতেন মোহাম্মাদ ভাইদের বাড়ী। আমরা বলতাম নাপিত বাড়ী। নাপিতবাড়ীতে তাদের থাকার জন্য একটি ঘর ছিল। তাদের সাথে মহিলা কেউ থাকতো না। দুইজনের মধ্যে একজন ছিলেন বৃদ্ধ, আরেকজন জোয়ান, আমার বাবার বয়সের। বড়জন ছোট জনের চাচা ছিলেন। ছোট জনকে ডাকতাম কাকা আর বড়জনকে ডাকতাম দাদু। কাকা ডাইলভাত রান্না করতেন। দাদুকে নিয়ে খেতেন। শরীর শুকনা ছিল। চাপা ভাংগা ছিল। দুইমাস অন্তর তারা এক সপ্তাহের জন্য আসতেন চুল কাটতে। নাপিতবাড়ির দক্ষিণ আংগিনায় বসে বেলা ওঠার পর থেকে নাস্তা অবদি চুল কাটতেন। নাস্তা খাবার পর বেড়িয়ে পরতেন পাড়ায় ঘুরে ঘুরে চুল কাটতে। বড়রা চুল কাটাতেন নাপিত বাড়ী গিয়ে। ছোটরা কাটাতো নিজ বাড়ীর আংগিনায়। তারা শুধু চুলই কাটতেন না, নোখও কেটে দিতেন খুর দিয়ে। এইজন্য একটা প্রবাদবাক্য আছে “নাপিত দেখলে কাই আংগুল বাড়ে। ” অর্থাৎ নাপিত দেখলেই ছোট আংগুলের নোখ বড় হয়েছে বলে মনে হয়।
গ্রামের সবাই প্রতি বছর পৌষ মাসে নাপিতগনকে ধান দিতেন সারাবছর চুল কেটে দেয়ার জন্য। এই ধান নাপিতবাড়ির ডোলের মধ্যে রাখা হতো। বর্ষাকালে নৌকা দিয়ে ধান নিয়ে যেতেন। এই ধানেই নাপিত পরিবারের সারাবছরের খাবার যোগান হতো।
তারা এই গ্রামে একটি জমিও কিনেছেন। এই জায়গাকে নাপিতের চালা (উচুভুমি) বলা হয়।

সকাল ৯/১০ টার দিকে নাপিতরা আমাদের বাড়ীতে চুল কাটতে আসতেন। চুল কাটানোটা আমার কাছে অস্বস্তিকর লাগতো। নাপিতের সামনে স্থির করে মাথা নোয়ায়ে থাকতে হতো অনেক্ষণ। শরীরে কাটা চুল পড়ে কুট কুট করতো। চুলকানি হতো। কিন্তু চুলকানো যেতো না। চুল কালেই নাপিত বলতেন “এই নড়বে না।” তাই নাপিত এলেই আমি পালাতে চাইতাম। কিন্তু বাবা ধরে আনতেন। পালালেও পরদিন নাপিতবাড়ি নিয়ে চুল কাটিয়ে আনতেন।

নাপিতগন একটা থলের মধ্যে চুল কাটার সরঞ্জাম নিয়ে আসতেন। সুপারি গাছের ডাইগ্যার খোল সুন্দর করে কেটে তিন ভাজ করে মানিব্যাগের মতো বানাতেন। এর ভাজে ভাজে ক্যাচি ও খুর রাখতেন। একটা ছোট স্টেইনলেস স্টিলের বাটী ছিল সেই ব্যাগে। এটাকে বলা হতো নাপিতের বাটী। নাপিত এলে আমরা জগে করে পানি নিয়ে দিতাম বাটী ভরার জন্য। চুল কাটার আগে এই পানি দিয়ে চুল ভিজানো হতো নাপিতের দুই আংগুল ঘষে। নাপিত বসতেন এক পিড়িতে আমরা বসতাম সামনের পিড়িতে। বাকীরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখতো। নাপিত ধুতি পরে হাটু বের করে বসতেন। আমরা সামনে বসে তার দুই হাটুর মাঝখানে মাথা নোয়ায়ে দিতাম। নাপিত ক্যাচি হাতে নিয়ে তার আংগুলের গতি জড়তা বাড়ার জন্য ক্যাচির রিং-এ আঙুল ঢুকিয়ে নাড়তে থাকতেন আর শব্দ হতে থাকতো “ক্যাচি, ক্যাচি, ক্যাচর, ক্যাচি, ক্যাচি, ক্যাচি, ক্যাচর।” শুনতে বেশ ভালোই লাগতো।

চুলকাটার দুইটি স্টাইল ছিল গ্রামের নাপিতগনের কাছে। একটি একদম সহজ। চেছে ন্যাড়া করে দেয়া। আরেকটির নাম ছিল আলফেট। ছোট ছোট শিশুদের সাধারণত ন্যাড়া করা হতো। বড় শিশুরাও গরমকালে ব্যাড়া হতো। এইরকম ন্যাড়াদেরকে বলতাম নাইড়া। মাথার উপর হাতের তালু রেখে বলতাম “নাইড়া খুলি থাপ থুপ।” শুনে নাইড়ারা ক্ষেপতো। ন্যাড়া মাথায় চুল বড় হবার সময় ছোট ছোট চুল দেখতে খুব সুন্দর লাগে। হাত রাখতে মন চায়। ন্যাড়া বাচ্চারা আমার কাছ দিয়ে হেটে গেলে আমি আলতো করে আমার ডান হাতের তালু দিয়ে মাথায় ঘষে দেই। বলি “বাবু ন্যাড়া করেছো কেন?”

বড়রা ন্যাড়া করলে আমি পছন্দ করিনা। ন্যাড়া করে কিশোররা মাথায় ক্যাপ পড়লেও আমি পছন্দ করিনা। বড়রা টাক মাথায় পরতে পারেন। অনেক টাক মাথা আছে তাদের ক্যাপ ছাড়াই ভালো লাগে। আমার এক মেধাবী ছাত্র ক্লাসে এসেছিল ক্যাপ পড়ে। মেডিকেলের ছাত্র। আমি জিগালাম
– আমার ক্লাসে ক্যাপ পরে এসেছো কেন। ক্লাসে ক্যাপ পরা আমি পছন্দ করি না।
– স্যার, ন্যাড়া করেছি।
– ন্যাড়া করেছ কেন? কিশোরদের ন্যাড়া হওয়া আমি পছন্দ করি না।
– স্যার, মাথার চুল পড়ে যাচ্ছে, তাই।
– মাথার চুল পড়লে ন্যাড়া করতে হবে কেন? ডাক্তার বলেছে?
– না স্যার। অনেকেই বলে।
– তুমি মেডিকেলে পড়। অনেকের কথা শুনবে কেন? অনেকের চিন্তায় মাথার চুল পড়ে। তোমার চিন্তা কিসে?
– এই যে, স্যার, চুল পড়ে। চুল পড়ার চিন্তা।
– তার মানে, চিন্তায় চুল পড়ে, আর চুল পড়ায় চিন্তা হয়। তোমার চুল পড়বেই। তুমি ন্যাড়া করবেই। ক্যাপ মাথায় পরবেই।

এখন সে বিয়ে করেছে। বাচ্চা হয়েছে। মাথায় চুল গজিয়েছে। আমারই আরেক ছাত্র চর্ম নিশেষজ্ঞ হয়ে তার চুল পড়ার চিকিৎসা দিয়েছে। এখন সে চুল নিয়ে হ্যাপি।

গ্রামে আরেকটা স্টাইল ছিল আলফেট। কানের উপর বরাবর লেভেল করে ক্যাচি দিয়ে চুল কেটে নিচের অংশ খুর দিয়ে চেছে দেয়া হতো। বাকী চুল গুলো ক্যাচি দিয়ে ছেটে দেয়া হতো। ছেটে দেয়ার স্টাইলকে বলা হতো ছাটনি। আলুফেট ছাটনি দেয়ার সময় যে সব বাচ্চারা কান্নাকাটি, নড়াচড়া করতো তাদেরকে নাপিতের দুই হাটুর চিপায় ফেলে টাইট করে ধরা হতো। এখন আধুনিক সেলুনে বাচ্চাদের হাতে মোবাইলে বা ট্যাবে কার্টুন ভিডিও ছেড়ে দিয়ে চুল কাটা হয়। বাচ্চাদের চুল কাটার জন্য বিশেষজ্ঞ হেয়ার ড্রেসার আছেন। আমি দেখেছি তারা বাচ্চাদের সাথে বাচ্চাদের মতো করে গল্প করতে করতে চুল কাটতে থাকেন। আমি একটা ভিডিওতে দেখেছি চুল কাটার সময় বাচ্চা খেলতে খেলতে চেয়ার থেকে নেমে ফ্লোরে শুইয়ে পড়েছে। বাচ্চার সাথে হেয়ার ড্রেসারও মাটিতে শুয়ে শুয়ে চুল কাটছে।

আমি যখন স্কুলে যেতে শুরু করি তখন আলফেট ছাড়াও অন্য স্টাইলের চুলের স্টাইল দেখতে পাই। বিশেষ করে বড় ক্লাসের ছাত্রদের মাথায়। সেই সব স্টাইল আমার খুব পছন্দ হতো। বাবাকে বললাম যে আমি অন্য রকম করে চুল কাটাব। স্কুলের ছাত্ররা সুন্দর করে চুল কাটায়। বাবা আমাকে বড় চওনা হাটে নিয়ে গেলেন চুল কাটাতে। হাটের উত্তর পাশের ছাগল হাটির পশ্চিম পাশে দুই সারি নাপিত বসা ছিলেন। এক পিড়িতে নাপিত আর এক পিড়িতে কাস্টমার বসা। সবাই ক্যাচ ক্যাচ করে চুল কাটছেন। সর্বডানে আলাদাভাবে একজন নাপিত বসেছিলেন গাব গাছের নিচে টুলের উপর । আর সব নাপিত বসেছিলেন পিড়ির উপর। সুন্দর চেহারা। পরিপাটি শরীর। পরিষ্কার শার্ট গায়। লুঙ্গী পরা। দক্ষিণ দিকে মুখ করে বসা ছিলেন। ক্লিন সেভ অল্প মোছ। দেখেই পছন্দ হয়ে গেল আমার নাপিত হিসাবে। হাতের ডান পাশে গাছের শিকরের উপর একটা রেডিও বাজছিল। তিনি এই হাটের স্পেশাল নাপিত। তখন নাপিত ইংরেজি যে বারবার তা শিখেছি। তার মানে স্পেশাল বারবার। তার নাম ছিল বলাই। বাবাকে বললাম আমি এই নাপিত দিয়ে চুল কাটাব। বাবা নিয়ে বসালেন বলাই দার সামনে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন “কি ছাটনি দিব।” আমি বললাম “এই যে পিছনের নিচের দিকে দুইটা চোক্কা থাকে এইটা। ” তিনি বললেন “মানে স্কোয়ার ছাটনি। ” তিনি স্কোয়ার স্টাইলে চুল কেটে দিয়ে একটি আয়না ঘারের পিছনে আরেকটি আয়না চোখের সামনে ধরলেন। আমি ঘারের স্কোয়ার ছাটনি দেখে মুগ্ধ হলাম। ফিরে আসার সময় বাবা বললেন “অন্য নাপিতের চেয়ে এই নাপিত দ্বিগুণ টাকা নেন। বাড়ীর নাপিত দিয়ে চুল কাটালে এই টাকা লাগবে না। আমাদেরকে বছর শেষে সমান পরিমাণ ধান দিতে হবে কাটালেও, না কাটালেও। ” আমি বললাম “হউক বেশী খরচ, আমি এই নাপিত দিয়েই চুল কাটাব। ” এরপর থেকে ক্লাস এইট পর্যন্ত আমি এই নাপিত দিয়েই খেউরি হয়েছি। চুল ছাটাকে বলতাম খেউরি হওয়া। আমি প্রতি দুই মাস অন্তর খেউরি হতাম।
স্কোয়ার ছাটনির পর প্রচলন এলো দীলিপ ছাটনির। এরপর বলাই দা আমাকে দীলিপ ছাটনি দিয়ে দিতেন। দীলিপ ছাটনি হলো ভারতীয় হিন্দি সিনেমার কিংবদন্তী নায়ক দীলিপ কুমারের চুল কাটার স্টাইল। দীলিপ কুমারের নাম শুনে মনে হতো হিন্দু। না, তিনি ছিলেন মুসলিম। নাম ইউসুফ খান। ইংরেজ আমলে ফিলিপ নাম ধারন করে সিনেমায় নায়কের অভিনয় করতেন। ১৯৪৭ সালের ভারতের স্বাধীনতার পরে নাম পালটিয়ে দীলিপ নাম ধারন করেন। দীলিপ কুমার নামে সারাবিশ্বে পরিচিতি লাভ করেন। ভারতের চিত্র জগতে তিনি ফার্স্ট খান নামে পরিচিত। শাহ রুখ খানকে বলা হয় কিং খান।

দীলিপ ছাটনির পর প্রচলন হয় উত্তম ছাটনি। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা সিনেমার কিংবদন্তী নায়ক উত্তম কুমারের চুলের স্টাইল। বলাই দা আমার চুল উত্তম কুমারের স্টাইলে কেটে দিতেন। একজন হেয়ারড্রেসারের চেহারাও উত্তম কুমারের মতো ছিল। উত্তম কুমার অভিনীত শেষ অসমাপ্ত সিনেমাটি সেই হেয়ার ড্রেসারকে দিয়ে অভিনয় করায়ে সমাপ্ত করেন সিনেমা পরিচালক।

এক সময় বাংলা চলৎচিত্রে নায়ক রাজ রাজ্জাকের জয় জয়কার ছিল। সবাই চাইত নায়ক রাজের মতো হেয়ার স্টাইল করতে। নায়ক রাজের চুল ছিল কোকরা। কোকরা চুল যাদের ছিল তারা রাজ্জাক স্টাইলে চুল কাটাতে পারতেন। কিন্তু আমার চুল ছিল সোজা। আমি পারলাম না রাজ্জাক স্টাইল হতে। না পেরে মাথায় তেল দেয়া বন্ধ করে হাতের তালু দিয়ে ঘষে চুল গুয়াথুবড়ি করে রাখতাম। কেউ কেউ বুঝতে পারতেন, কেউ কেউ বুঝতে পারতেন না কেন এমন করছি। মুরব্বিরা সমালোচন করতেন আমার চুল নিয়ে। বলতেন “একজন ভালো ছাত্র হয়ে উস্কু খুস্কু করে চুল রাখে?” পরে এই প্রজেক্ট ক্ষান্ত দেই।

ক্লাস নাইনে ওঠে বাটাজোর বি এম হাই স্কুলে চলে যাই। খুব পড়ার চাপে থাকি দুই বছর। হেয়ার স্টাইল ভুলে যাই। বাটাজোর বাজারের কোন এক নাপিত দিয়ে চুল কাটাতাম। কি স্টাইলে কাটাতাম তা মনে করতে পারছি না। ১৯৭৭ সনে আউলিয়াদে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেযে ভর্তি হয়ে আবার বলাই দাকে পেলাম। দেখি বলাই দা আরও আধুনিক। হোস্টেলের পিছনে চেয়ার, টেবিল, গ্লাস ফিট করা আধুনিক সেলুন দিয়ে বসেছেন বলাই দা। খুব খুশী হলাম বলাই দাকে পেয়ে। ঐ সময় খুব সিনেমা দেখতাম। রাজ্জাকের চান্দির চুল উঠে গিয়েছিল তখন। তাই পরচুলা পরে অভিনয় করতেন। পরচুলা স্ট্রেইট (সোজা) ছিল। ঘারের পিছনে চুল লম্বা ছিল। জুলফি বড় ছিল। গোফের দুই দিকে লম্বা হয়ে চোকা ছিল। আমারও তখন গোফ হয়েছে। বলাই দা দুই বছর এই স্টাইলেই আমার চুল কেটেছেন।

১৯৮০ থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের অবস্থানকালীন কোন স্টাইলে চুল কেটেছি, কোন সেলুনে চুল কাটিয়েছি তেমন মনে করতে পারছি না। ডাক্তার হয়ে সরকারি চাকরি নিয়ে বাকেরগঞ্জের চরামদ্দি ইউনিয়ন সাবসেন্টারে থাকতে হয় এক বছরকাল ১৯৮৮/৮৯ সনে। চরামদ্দি বাজারে একটা সেলুন ছিল। আমি ওখানে গিয়ে চুল কাটাতে চাইলাম। আমার ফার্মাসিস্ট মালেক বললেন “স্যার, আপনি এলাকার বড় অফিসার। আপনি বাসায়ই চুল কাটাবেন। ওকে খবর দিলে বাসায় এসে চুল কেটে দিয়ে যাবে। একটু বেশী করে দিলেই হবে। ” তার কথামতো বাসায় বসেই চুল কাটাইয়েছি। “চুলের স্টাইল কেমন হবে” বলাতে “আমি বললাম “সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার সাব যে স্টাইলে কাটিয়েছেন সেই স্টাইলে কাটেন।”

এরপর নকলায় ছিলাম আড়াই বছর । কে কেটেছেন মনে নেই। তারপর এলাম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে শিক্ষক হয়ে। চড় পাড়া মোড়ের ফেমাস এসি সেলুনে চুল কাটাতাম। এটার কোন নির্দিষ্ট স্টাইল ছিল না। তারা বুঝতেন এক জন মেডিকেল কলেজের শিক্ষকের কিভাবে চুলের ছাট দিতে হবে। তারা খুব যত্নসহকারে আমার চুল কাটতেন। সেলুনে পুরানো দিনের হিন্দি গান বাজতো। আমার খুব ভালো লাগতো। বিশেষ করে শামসাদ বেগমের ‘হাওয়া মে উড়তা যায়ে, লাল দোপাট্টা মাল মাল….’ গানগুলি। আমি সেলুনের এক কারিগরকে বললাম “আপনাকে একটা ক্যাসেটের টাকা দেই, আমাকে এই গানের একটা ক্যাসেট কিনে দিবেন। ” তিনি বললেন “এই ক্যাসেটটাই নিয়ে যান। আমরা আরেকটা কিনে নেব নি। ” আমি নিতে চাইলাম না। তারা জোড় করেই দিয়ে দিলেন।

কাছে কেউ না থাকলে এই গানটি বাজাতাম ক্যাসেটে। ১৯৯৮ সনে কম্পিউটার কেনার পড়ে ঐ ক্যাসেট থেকে গান বাজিয়ে কম্পিউটারে রেকর্ড করে সিডি করে নেই। এখন আর সিডিতে শুনতে হয় না। মনে চাইলেই ইউটিউবে সার্চ দিয়ে শুনে নেই।
২০০৫ সনে হজ্জ করার সময় মিনাতে বসে দাড়ি রাখার নিয়ত করলাম। তারপর থেকে সেভ করা হয় নি। মক্কায় কুরবানি শেষে সেলুনে গিয়ে মাথা ন্যাড়া করতে হলো। সেলুনের কারিগর ছিল পাকিস্তানি নাপিত। মনে হলো সে পেশায় নাপিত না। হজ্জের মৌসুমে নাপিত সেজে ন্যাড়া করে দেয়। প্রতি ন্যাড়ায় তিন রিয়াল করে পায়। ক্ষুর দিয়ে চাছার সময় সে আমার মাথার চামড়া কয়েক জায়গায় কেটে ফেললো। রক্ত ঝরছিল। জ্বালা করছিল। আমি রাগ দেখালাম। সে উর্দুতে যেন কি বললো। ড্যাম কেয়ার ভাব। আমি মনে মনে ভয় পেয়ে গেলাম। ভাবলাম “পাকিস্তানি হানাদারদের বংশধর। সুযোগ পেয়েছে। বেশী রাগ করলে ঘার কেটে ফেলতে পারে। একাত্তুরে আমাদের কাছে শোচনীয় পরাজয়ের কথা তাদের ভোলার নয়। কাট, যতো পারস কাট।” আমার চুলের স্টাইল হয়ে গেল ন্যাড়া। আয়নায় দেখলাম কেমন দেখা যায়। বেলের মতো গোল মাথা। মোটা গোফ। পরনে সেলাইবিহীন দুই টুকরা সাদা কাপড়। হজ্জ থেকে ফিরে এসে কি স্টাইলে চুল কাটব এনিয়ে চিন্তা করছিলাম। তখন ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আহম্মদ নেজাদ। তার ছবি পত্রিকায় দেখলাম। তার দাড়ি ও চুলের স্টাইল দেখে আমার পছন্দ হলো। ভাবলাম তিনি একটি পাকা মুসলিম রাস্ট্রের প্রধান। নিশ্চয়ই তার চুল দাড়ির স্টাইল ইসলাম সম্মত বা সুন্নতি। ছবিটি ক্যাচি দিয়ে কেটে পকেটে নিয়ে চড়পাড়ার ফেমাস সেলুনে গিয়ে ছবি দেখিয়ে বললাম “এই স্টাইলে চুল দাড়ি কেটে দিন।” তারপর থেকে এখন পর্যন্ত সেই স্টাইলেই কাটা হচ্ছে।

২০০৮ সনের পহেলা জানুয়ারি দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে বদলী হলাম। ওখানে গিয়ে দেখলাম আমার প্রাইভেট চেম্বারের প্রতিষ্ঠানের এডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসারের চুল দাড়ির স্টাইল আমার স্টাইলের মতো। জিজ্ঞেস করলাম “আপনি কোন সেলুনে চুল কাটান।” তিনি বললেন “সেলুনটা নন-এসি। কিন্তু ভালো। নাম আশেকি সেলুন। ফুলবাড়ি বাস স্ট্যান্ডে। মাত্র একজন কারিগর। একবার কাটায়ে দেখতে পারেন। ” শুরু হলো আমার নিয়মিত আশেকি সেলুনে চুল দাড়ি কাটা। কেউ অপছন্দ করেনি কোনদিন। মাত্র পঞ্চাশ টাকায় চুল ও দাড়ি ছাটা হতো। কারিগরের নাম মোহাম্মদ আলী। অত্যন্ত নম্র ও ভদ্র এবং নিরিহ একজন মানুষ। আমি এক টানা আট বছর শুধু আশেকি সেলুনে মোহাম্মদ আলীকে দিয়েই চুল কাটিয়েছি। তার আদি নিবাস ছিল বিহার। তাকে দেখে হৃদরোগ আছে বলে আমার মনে হতো। আমি তাকে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ দেখাতে বলেছিলাম। ডাক্তার তাকে এঞ্জিওগ্রাম করাতে বলেছিলেন। টাকার অভাবে তিনি এঞ্জিওগ্রাম করাতে পারেন নি। ডাক্তার বলেছেন ঔষধের উপর বাকী জীবন কাটাতে হবে। একদিন দেখলাম এক লোক তাকে কিছু টাকা দিয়ে গেলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম
– কিসের টাকা দিলেন তিনি?
– তিনি আমার সব ঔষধের টাকা দেন।
– তিনি কে?
– চিনি না। আমার এখানে চুল কাটান। আমার অসুস্থতার কথা শুনে বলেছেন ‘তোমার যত ঔষধ লাগে আমি কিনে দেব। ‘ তাই মাঝে মাঝে এসে টাকা দিয়ে যান ঔষধ কিনতে।

শুনে আমার নিজেকে লোকটার তুলনায় বেশ ছোট মনে হলো। তিন বছর হয় দিনাজপুর থেকে চলে এসেছি। মাঝে একবার গিয়ে দেখা করে এসেছি। সামান্য কিছু বখশিশ দিয়েছি। তার নিজের মোবাইল নেই। ছেলের কাছে একটা মোবাইল আছে। সেই মোবাইলে খোজ নেই। ছেলেমেয়েরা সবাই পড়াশুনা করে। দুই বছর আগে দিনাজপুরে এঞ্জিওগ্রাম করিয়েছেন। ছয় মাস আগে ইন্ডিয়ার বেংগালোরে গিয়ে প্রেস্ক্রিপশন করিয়ে এসেছেন। সেই চিকিৎসার উপর আছেন। ইলেকশনের পর তিনি আবার ইন্ডিয়ায় যাবেন ফলোআপ দিতে। আল্লাহ মোহাম্মদ আলীকে ভালো রাখুন।
২০১৬ সন থেকে ময়মনসিংহ শহরে ফিরে এসে আবার চড়পড়া মোড়ের সেই ফেমাস এসি সেলুনে চুল কাটাচ্ছি। আগের কারিগর দের থেকে দুইজন কারিগর আছেন। আমাকে আট বছর পর পেয়ে তারা খুশী হয়েছেন। গত তিন বছর নিয়মিত এখানেই চুল কাটাচ্ছি। তারা এখন ক্যাসেট বাজান না। সামনের কাউন্টারে বিদেশী চেনেলের টিভিতে ধুমধাড়াক্কা সিনেমা দেখেন। একদিন আমি বললাম
– আগে আপনাদের সেলুনে চুল কাটাতে এসে ক্যাসেটে ভালো ভালো গান শুনতে পেতাম। এখন আপনারা গান বাজান না।
– স্যার, কোন গান আপনার ভালো লাগতো?
– তাহলে শুনে দেখবেন?
– কিসে শুনাবেন?
– মোবাইলে ইউটিউবে। আমার চুল কাটা শুরু করুন আমি বাজাই।
আমি ইউটিউবে “হাওয়া মে উড়তা যায়ে, লাল দো পাট্টা মাল মাল” বাজাতে লাগলাম। অন্য কারিগররা জিজ্ঞেস করলেন “গান বাজায় কে?” আমার হেয়ার ড্রেসার বলেন “স্যারে, বাজান। স্যারের পছন্দের গান।” গানটি শেষ হলে তারা আরও বাজাতে অনুরোধ করলেন। আমি আর বাজালাম না। আমি তো মেডিকেল কলেজের শিক্ষক, আমি তো ডাক্তার, আমি তো গেজেটেট সরকারি অফিসার। নির্জনে শোনা যায়, অন্যের সামনে না।

প্রায় ১৪/১৫ বছর আগে বলাই দা এসেছিলেন বউদিকে নিয়ে আমার কাছে গলায় একটি পরীক্ষা করানোর জন্য। সেই সুবাদে বলাই দার সাথে আমার শেষ দেখা হয়। তারও আগে একদিন সেই ছোট বেলার দুই জনের ছোট জন যাকে কাকা ডাকতাম তিনি এসেছিলেন তার স্ত্রীকে নিয়ে আমার কাছে পরীক্ষা করানোর জন্য। সেইটাই তার সাথে আমার শেষ দেখা। তিনি ১৯৮০ সন থেকে আমাদের গ্রামে যাওয়া ক্ষান্ত দিয়েছেন। পরিবর্তে তার ছেলে প্রমথ স্থায়ীভাবে বউ নিয়ে আমাদের গ্রামে বসবাস করতে থাকে। তার স্ত্রীর সন্তান হচ্ছিল না। একদিন পরামর্শের জন্য বউ নিয়ে আমার কাছে আসে। দেখলাম তারা উভয়েই আধুনিক। আমি প্রমথের বাবার নাম ভুলে গিয়েছিলাম। বলাই দার নামও ভুলে গিয়েছিলাম। গতকাল গ্রামের বাড়িতে থাকা আমার চাচাতো ভাই হবি তালুকদারকে ফোন করে জানতে চাইলাম যারা আমাদের চুল কাটতেন তাদের নাম কি ছিল যেন। সে বলল যে প্রমথের বাবার নাম ছিল সত্যেন্দ্রনাথ শীল। ভন্ডেশ্বরের নাপিতের নাম ছিল বলাই। কয়েক বছর হয় দুই জনই মারা গেছেন। বলাই দার ছেলেরা বড় চওনা বাজারে সেলুন দিয়েছেন। বলাই দার ভাতিজারা জিতেশ্বরি বাজারে সেলুন দিয়েছেন। প্রমথের সন্তান হয় নি। বউ ক্যান্সারে মারা গেছে। প্রমথ সখিপুর থাকেন। কালিয়া বাজারে সেলুন দিয়েছেন। কেউ বাড়ী বাড়ী গিয়ে চুল কাটেন না। গ্রামের সবাই সেলুনে গিয়ে চুল কাটান।

গত দুইদিন আমার হেয়ার ড্রেসারদের নিয়ে লিখব ভাবছিলাম। তাই আজকের যুগের তরুনদের মাথার চুলের স্টাইল লক্ষ করছিলাম রাস্তা ঘাটে। একটা স্টাইল কমন মনে হলো। সেটা হলো চারিদিকে চুল নেই। চান্দির উপর কিছু চুল স্তুপ করে রাখা আছে। এক ছেলেকে সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম “আংকেল, আমি হেয়ার স্টাইল নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখছি। তুমি যে স্টাইলে চুল কাটিয়েছ এই স্টাইলের নাম কি?” ছেলেটি মৃদু হেসে উত্তর দিলো “আংকেল, আমি নেইমারের মতো করে কাটতে বলেছিলাম। কিন্তু সেভাবে কাটতে পারে নি।” তারমানে চিত্র জগতের নায়ক ছেড়ে এখন খেলোয়াড়দের হেয়ার স্টাইল ফলো করছে আজকালের ছেলেরা। আমরাও হয়তো করতাম। কিন্তু আমাদের সময় আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন খেলোয়ার দেখার সুযোগ ছিল না। পরিশেষে সেলুনে চুল কাটা নিয়ে একটি গল্প লিখে শেষ করছি।

এক দুষ্ট ছেলে গেলো সেলুনে চুল কাটাতে। দেয়ালে টানানো একটি স্টাইল দেখে বলল
– এইটা কি স্টাইল? এটা কত টাকা?
– এইটা স্কোয়ার স্টাইল। এটা চার টাকা।
– স্কোয়ার ছাটনি দিয়ে দিন।
ছাটনি দেয়ার পর আয়না দেখে বলল
– এটা ভালো লাগছে না। ঐটা দিয়ে দিন।
– ঐটা দীলিপ ছাটনি। চার টাকা।
– এইটা করে দিন।
দীলিপ ছাটনি করার পর তার পছন্দ হলো না। এরপর এইভাবে উত্তম ছাটনি ও তারপর ব্রুসলি ছাটনি দিল। শেষে বলল
– এটাও আমার ভালো লাগছে না। সব বাদ দিয়ে ন্যাড়া করেদিন। ন্যাড়া কত টাকা?
– ন্যাড়া করতে এক টাকা রেট।
– ন্যাড়া করেই দিন।
ন্যাড়া হওয়ার পড় বিল দিলেন মাত্র ১ টাকা। সেলুনের মালিক বললেন
– তোমার বিল হয়েছে তিন চারে বার আর এক, তের টাকা।
– আমি তো ন্যাড়া হয়েছি। ন্যাড়ার বিল ১ টাকা।
ঝগড়া বেধে গেলো। আগুন্তকগণ জিজ্ঞেস করলে দেখা গেলো যে ন্যাড়া করা হয়েছে। ন্যাড়ার বিল তো এক টাকাই। আগে কি হয়েছিল তার প্রমান সেলুনের কারিগর দিতে পারলো না। এক টাকা পরিশোধ করে ন্যাড়া মাথা হাতাতে হাতাতে চলে গেল।

তারিখ: ১৫/১২/২০১৮ ইং
স্থান: ময়মনসিংহ -কিশোরগঞ্জ -ময়মনসিংহ জার্নি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *