চরামদ্দির কলেরায়

চরামদ্দির কলেরায়
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

মেডিকেল অফিসার হিসাবে প্রথম এক বছর সরকারি চাকুরী করি বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়ন উপ উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে জুলাই ১৯৮৮ থেকে আগষ্ট ১৯৮৯ পর্যন্ত। আমিই ছিলাম এখানকার এম বি বি এস পাস করা প্রথম মেডিকেল অফিসার। তাই এলাকার জনগণের আমাকে নিয়ে বেশ আগ্রহ ছিল। চিকিৎসা সেবার এক মহান উদ্যেশ্য নিয়ে আমি চিকিৎসক হয়েছিলাম। এই পেশায় এত সন্মান থাকাতেও বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে এটা আমি আগে জানতাম না। নতুন অফিসার ছিলাম। অভিজ্ঞতা তেমন ছিল না। তাই রুগী, কর্মচারী, মাস্তান ও জনগণ ম্যানেজ করতে হিমসিম খাচ্ছিলাম। তারপর আবার টাংগাইলের সখিপুরের শুক্নার দেশের মানুষ। পোস্টিং হয়েছে পানির দেশে। অনেকেই কর্মস্থলে যোগদান করে নানা কৌশলে অনুপস্থিত থাকতেন। আমি কোন রকম কৌশলের আশ্রয় না নিয়ে কর্মস্থলে থেকে মনোযোগ দিয়ে কর্তব্য পালন করতে থাকলাম। প্রথম মাসেই আমার মেডিকেল এসিস্টেন্ট অফিসে আসার পথে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়। আমি এক মহা সংকটে পড়ে যাই। আমার বস বাকেরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসারকে নিয়ে বরিশালের সিভিল সার্জন অফিসে যাই এই সংকট নিয়ে পরামর্শ নিতে। ডেপুটি সিভিল সার্জন ছিলেন চরামদ্দি ইউনিয়নবাসী। আমরা চারজন সিভিল সার্জন স্যারের রুমে বসলাম। আমি ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়ার পর বললাম “আমার চরামদ্দিতে থাকা সম্ভব না। ” ডেপুটি স্যার বললেন “আমি চরামদ্দির মানুষ। আমাদের এলাকার মানুষ খুব ভালো। আপনাকে পেয়ে তারা খুব খুশী। আপনাকে তারা সন্মান করে। আপনার কোন সমস্যা হবে না। আপনি যখন ঔষধের জন্য পাঠাবেন আমার সাথে দেখা করতে বলবেন। আমি এক কার্টুন ঔষধ বেশী দেব। এলাকার নেতা ও মাস্তানদের সাথে খাতির দিয়ে চলবেন। জনগন আপনার ক্ষতি করবে না। ক্ষতি করলে ওরাই করবে। ”
সিভিল সার্জন বললেন “ইনি যা বলেছেন ঠিক বলেছেন। তুমি কি প্রাইভেট প্রাক্টিস কর?”
– স্যার, অফিস টাইমের পর কিছু রুগী দেখি।
– তোমার সেন্টার থেকে পাচ/ছয় কিলোমিটারের মধ্যে আর কোন এম বি বি এস ডাক্তার নাই। তোমার কাছে অনেকেই দূর দুরান্ত থেকে নৌকা যোগে রুগী নিয়ে আসবে। বিকেল পর্যন্ত বসে থাকা তাদের জন্য কষ্টকর হবে। তাই, তুমি ফ্রি রুগী দেখার ফাকে ফাকে প্রাইভেট রুগী দেখে দিবে।
– অফিস টাইমে প্রাইভেট রুগী দেখা অন্যায় না, স্যার?
– অন্যায়। কিছু কিছু অন্যায় কাজ তুমি পাব্লিককে জানিয়ে করতে পারো। যারা প্রাইভেট দেখাতে আসবে তারা এলাকারই অবস্থাশালী মানুষ। তারা প্রভাবশালী। তোমার উচিৎ হবে তাদেরকে খুশী রেখে জনসেবা করা। তুমি প্রাইভেট রুগীকে যে সব ঔষধ লিখবে তা যদি সরকারি ডিস্পেন্সারীতে সরবরাহ থাকে তবে তুমি ফ্রি রুগীর মতোই তাদেরকে দিতে পারো। তবে রুগীর নামে খাতায় হিসাব লিখে রাখবে।
– ধনী রুগীদেরকেও সরকারি ঔষধ দেব, স্যার।
– সরকারি ঔষধ গরীব ধনী সবার জন্য।

এভাবে স্যারের নির্দেশনা নিয়ে আমি চরামদ্দিতে ধুমছে সরকারি রুগী ও প্রাইভেট রুগী দেখতে থাকি সকাল ৭ টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত। রুগী আর রুগী। ডোয়া পাকা টিনের ঘরে থাকতাম হেল থসেন্টারের পিছনেই। পাশের টিন সেডে থাকতেন ফার্মাসিস্ট।

যতই দিন যেতে লাগলো রুগীর সংখ্যা বাড়তে লাগলো, সরকারি ও প্রাইভেট দুই রকমেরই। দিনে রাতের ১৮ ঘন্টাই ব্যস্ত থাকতাম রুগী নিয়ে। সবাই জেনে গেলো নতুন সরকারি অফিসার হাসপাতালে গেলেই ঔষধ দেন। হাসি মুখে কথা বলেন। একদম সোজা মানুষ। সকাল নয়টা থেকেই লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে যেতো হাসপাতালের রুগীরা। রেজিস্টার খাতা নিয়ে বসে যেতাম। রুগীরা নাম, বয়স ও কষ্টের কথা বলার সাথে খাতায় লিখে ফেলতাম। স্লিপে ঔষধ লিখে ধরিয়ে দিতাম। পাশের রুমের সরকারি ডিস্পেন্সারি থেকে ঔষধ নিয়ে চলে যেতেন খুশীতে। প্রাইভেট রুগীরা পাশের রুমে অপেক্ষা করতেন। ১০/১২ জন সরকারি রুগী বিদায় করার পর আমি লাইনে দাঁড়ানো রুগীদের উদ্যেশ্যে বলতাম “পাশের রুমে অনেক দূর থেকে একজন রুগী এসেছেন আমাকে প্রাইভেট ভাবে দেখানোর জন্য। আমি কি ৫ মিনিটে তাকে দেখে আসতে পারি?” সমস্বরে তারা বলতেন “দেইখা আহেন, ডাক্তার সায়েব।” দেখে এসে সামনের দাতের আগা বের করে একটা হাসি দিয়ে আবার লাইনের রুগী দেখা শুরু করতাম। কেউ বিরক্ত হতো না। অফিস টাইমের পর একটানা রুগী দেখতাম। অল্প টাকা ভিজিট ছিল। টাকা চেয়ে নিতাম না। যা দিতো হাতে নিয়ে পকেটে রেখে দিতাম।

মার্চ মাসের দিকে হটাৎ ডাইরিয়া বা পাতলা পায়খানা রুগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে লাগলো। কাটাদিয়া, বাদল পাড়া, গুয়াখোলা, ডাকুয়া, চরাদি, দুদল, পশ্চিম চরামদ্দি এবং অন্যান্য গ্রাম থেকে প্রচুর লোক আসা শুরু করলো তাদের বাড়ীতে ডাইরিয়া রুগীর ঔষধ নেয়ার জন্য। ডাইরিয়া রুগী হাসপাতালে আসতে পারতো না। তাই বিশ্বাস করে রুগীর নাম লিখে ঔষধ দিয়ে দেয়া ছাড়া উপায় ছিল না। টেট্রাসাইক্লিন ক্যাপ্সুল ও খাবার সেলাইনের প্যাকেট রুগী না দেখেও দিয়ে দিতে হতো। না দিলে ঝামেলা বাধার সম্ভাবনা ছিল। যেসব রুগী বেশী ডিহাইড্রেশন হয়ে খেতে পারতো না সেই সব রুগীকে দেখার পর শিরায় (রগে) সেলাইন দেয়া হতো। ডাইরিয়া রুগীকে যে সেলাইন পুশ করা হয় তার নাম কলেরা সেলাইন। কলেরা সেলাইনের ব্যাগ দামী ছিল। এই গুলি মিথ্যা কথা বলে প্রাইভেট ফার্মেসীতে বিক্রি করে দিতে পারে ভেবে এইগুলি রুগী না দেখে দিতাম না।
একদিন বিরাট লাইন পড়ে গেলো রুগীর। নাম জিগাই, লিখি আর খাবার সেলাইন দিচ্ছিলাম। নিশ্বাস নেয়ার সময় পাচ্ছিলাম না। ডান পাশের জানালা খোলা ছিল। এক স্কুল পড়ুয়া ছেলে জানালা দিয়ে বার বার বলছিল “স্যার, আমাদের বাড়ীতে ছয়জন ডাইরিয়া রুগী আছে। ঔষধ দেন। ” আমিও তাকে বারবার বলছিলাম লাইনে এসে দাড়ানোর জন্য। কিন্তু ছেলেটি আমার কথায় পাত্তা না দিয়ে বারবার জানালা দিয়েই ঔষধ চাইছিল। লাইনের রুগীরা বিরক্ত হয়ে বললো “ডাক্তার সাব, দিয়ে দিন ছেলেটাকে। ” আমি ছয়জন রুগী হিসাবে টেট্রাসাইক্লিন ক্যাপ্সুল ও খাবার সেলাইন দিয়ে দিলাম। সেলেটি আবার শুরু করলো রগে দেয়ার সেলাইন দিয়ে দিতে। বারবার চাইতেছিল রগে দেয়ার সেলাইন। আমিও বারবার বলতেছিলাম যে রুগী না দেখে রগে দেয়ার সেলাইন দেয়া যাবে না। এক পর্যায়ে ছেলেটি বলে বসলো “স্যার, আপনে এত ঘাউড়া কেন?” আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। কয় কি? একজন ফার্স্টক্লাস গেজেটেড অফিসারকে স্কুল পড়ুয়া এক পিচ্ছি পোলায় কয় ঘাউড়া। কিছুক্ষণ চুপ থাকলাম। ভেবে দেখলাম আসলেই আমি ঘাউড়ামি করতেছি ছেলেটির সাথে। আমি রাগ না করে হেসে দিলাম। আমি ছেলেটিকে ভিতরে ডেকে আনলাম। পিঠে হাত বুলালাম। জিজ্ঞেস করলাম
– তুমি কোন ক্লাসে পড়?
– ক্লাস এইটে।
– তোমার বাড়ী এখান থেকে কত দূর?
– স্যার, এক কিলোমিটার হবে।
– আমি তোমার সাথে তোমাদের বাড়ী যাবো এই রুগীগুলি বিদায় করে। একটু বসো।
লাইনের লোকগুলি আমার সামনেই আমার নানারকম প্রশংসা করতে লাগলো। খুব ভালো লাগছিল তখন। রুগী শেষ করে কয়েকটি সেলাইন সাথে নিয়ে সহকারী সহ ছেলেটির সাথে এক কিলোমিটার পথ হেটে গেলাম। ছেলের বাবা চাচারা আমাকে দেখে অবাক হলেন। তারা জানতে পারলেন আমি দুপুরের খাবার না খেয়েই রুগী দেখতে এসেছি। তারা আমাকে আগেই রুগী দেখালেন না। জোড় করে লাঞ্চ করালেন। পানি হিসাবে আমি শুধু ডাবের পানি খেলাম। সারা চরামদ্দি ইউনিয়নে শুধুমাত্র একটা ডিপ টিউব অয়েল ছিল চরামদ্দি বাজারে। সেলো টিউবওয়েলের পানি নোনা ছিল। তাই প্রায় সবাই পুকুর ও খালের পানি পান করতো। পুকুর ও খালের পানিতেই ডাইরিয়ার পায়খানা লাগা কাপড় ধোয়া হতো। তাই ডাইরিয়াও গ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছিল। শেষে হিসাব নিয়ে দেখেছিলাম আমরা কয়েকজন ছাড়া প্রায় সবাই ডাইরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। মল পরীক্ষা করে পরে জানা গেছে এটা ছিল কলেরা। লাঞ্চের পর রুগী দেখে সবার রগে সেলাইন পুশ করে স্থানীয় স্বাস্থ্য সহকারীকে বুঝিয়ে দিয়ে চলে আসলাম। ভাজ্ঞিস, ক্লাস এইটে পড়া ছেলের কাছে অপমানিত হই নাই!

এইভাবে কয়দিন চললো ডাইরিয়া নিয়ে ব্যস্ততা। বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে গিয়ে কলেরা রুগী চিকিৎসা দিয়ে আসতাম। নিজের জান নিয়ে ফিরে যেতে পারব কিনা এ নিয়েও ভাবতাম।

এমনি এক রাতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম টিনের ঘরে। আনুমানিক রাত তিনটার দিয়ে এক মটর সাইকেলের বিকট ভো ভো শব্দে ঘুম ভেংগে গেলো। ঘরের সামনে থেকে একজন উচ্চস্বরে ডাক দিলেন “এই ডাক্তার, আমার সব রুগী মরে যাচ্ছে আর আপনি আরামে ঘুমাচ্ছেন?” ভয়ে আমার গুর্দা কেপে উঠলো। দরজায় আঘাতের শব্দ পেলাম। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। আত্ত্বাটা হাতে নিয়ে হারিকেনের আলোটা বাড়িয়ে দিয়ে জানালা খুলে দেখি একজন প্রভাবশালী ব্যাক্তি। সাথে তার বাইকের চালক। আমি জানালা দিয়ে বললাম “কোথায় রুগী খারাপ?
– আমার গ্রামে।
– আপনার গ্রামের হেলথ এসিস্টেনকে বললেই তো হতো। প্রয়োজনে এসিস্টেন্ট আমাকে নিয়ে যেতেন। আমি গতকালও কয়েক গ্রামে গিয়েছিলাম। আপনাদের কথা আমাকে বলেনি।
– আপনার হেলথ এসিস্টেন্ট সবগুলার খবর আছে যদি একটা রুগী মারা যায় আমার গ্রামের।
– আপনি উত্তেজিত হয়েন না। আমরা রুগী নিয়ে হিমসিম খাচ্ছি। যদি প্রয়োজন মনে করেন আপনার গ্রামের জন্য একটা স্পেশাল হেলথ ক্যাম্প করা যেতে পারে। তিনি একটু নরম হলেন। বললেন “তবে তাই করুন।”
আমি দরজা খুলে ভিতরে বারান্দায় বসিয়ে শিখিয়ে দিলাম কিভাবে দরখাস্ত করে উপজেলা থেকে স্পেশাল হেলথ ক্যাম্প করানো যেতে পারে। তিনি চলে গেলেন।
পাশের বাসার আমার ফার্মাসিস্ট এলেন। জিজ্ঞেস করলাম
– এতক্ষণ কোথায় ছিলেন?
– ঘরের পিছনেই অন্ধকারে একটা লাঠি নিয়ে লুকিয়েছিলাম। আপনার দরজায় আঘাতের শব্দ পেয়েই আমি এই প্রস্তুতি নিয়েছিলাম।

পরেরদিন ফার্মাসিস্ট ঘটনাটা সব হেলথ এসিস্টন্টকে বলে দিলেন।

একদিন খবর এলো সেন্টার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ঢাকা ডিজি হেলথ থেকে একটি টিম এসেছে ডাইরিয়া রুগীর মলের সেম্পল নিয়ে যেতে। আমি সেখানে উপস্থিত হলাম। আমি ডাইরিয়া রুগীদের চিকিৎসা দিলাম। তারা মলের সেম্পল সংগ্রহ করলেন। স্থানীয় এক প্রভাবশালী রুগীর তদারকি করলেন। তিনি আগেরবার ইলেকশনে চেয়ারম্যান পদে ফেল করেছিলেন। আগামীতেও ইলেকশন করবেন। ডিজি অফিসের প্রতিনিধিগণ সেম্পল নিয়ে চলে গেলেন। যাওয়ার সময় অনেকগুলি টেট্রাসাইক্লিন ক্যাপ্সুল দিয়ে গেলেন। বললেন “আমরা রুগীদের জন্য এই ক্যাপ্সুলগুলি এনেছিলাম। এগুলি আপনি দিয়ে দিয়েন। আমি বিনা দ্বিধায় ক্যাপ্সুল গুলি নিয়ে নিলাম। আরো কিছু সময় ব্যয় করলাম রুগী চিকিৎসায়। ক্ষুধায় পেটে চো চো করছিল। প্রভাবশালী বললেন “ডাক্তার সাবের মনে হয় ক্ষুধা লেগেছে। কিছু মনে না করলে আমার বাসায় চারটে ডাল ভাত খেতে পারেন। ” আমাদের দেশে ডাল ভাত বলতে মোরগ মুরগীর গোস্তের পর ডাল দিয়ে ভাত খাওয়া বুঝায়। ” প্রস্তাবটা শুনে আমার ক্ষুধা আরো বেরে গেলো। একজন ভোলান্টিয়ার আমাকে প্রভাবশালীর বাড়ী নিয়ে গেলেন। গিয়ে দেখি আরো ১০/১২ জন ভোলান্টিয়ার খাওয়া দাওয়া শেষ করলো। আমি হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসলাম। বাড়ীর একজন নকিদার বললেন “ডাক্তার সাব দেরীতে এসেছেন। ভাত আছে, তরকারী নাই। শুধু ডাল দিয়ে খেতে হবে। ” আমি বললাম অসুবিধা নাই। ” নকিদার এক বাটী ভাত ও এক বাটী মাসের ডাল আনলেন। মাসের ডালে টেলটেলা পানি। ডালে কয়েকটা সজনের টুকরা ডুবানো। খেয়ে দেখি ডাল পানির মতো পানসে। হয়তো ডাল শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমাকে দেয়ার জন্য ডালের মধ্যে পানি দিয়েছে। কিন্তু লবন দিতে ভুলে গেছে। আমি চোখ বন্ধ করে খেয়ে নিলাম। খাওয়া শেষে আমার অফিসের এম এল এস এস এলো সাইকেল নিয়ে খবর দিতে যে এক এক্সিডেন্টের রুগী দেখতে এখনি ফিরতে হবে। আমি তাকে ঔষধ নিয়ে আসতে বলে তার সাইকেল চালিয়ে রওনা দিলাম। খুব দ্রুত সাইকেল চালিয়ে ফিরছিলাম। রাস্তায় কোন লোক ছিল না। উচু করে নতুন সড়ক তৈরি করা হয়েছিল। রাস্তার ধারে অনেক কলাগাছ লাগানো ছিল। হঠাৎ সড়কের কিনারার নরম মাটি ফস্কে আমার সাইকেল খারা নেমে পড়লো নিচের দিকে। আমি বায়োনিক ওম্যানের মতো উড়ে গিয়ে এক কলাগাছের মাঝখানে ধরে ফেললাম। সাইকেল উড়ে গিয়ে কাত হয়ে পড়ে রইল ধান ক্ষেতে। আমি কলাগাছ পিছলে মাটিতে পড়ে গিয়ে সোজা হয়ে দাড়ালাম। কেউ দেখে ফেললো কিনা এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখে নিলাম। কেউ দেখে নাই। তাই লজ্জা পেলাম না। শুধু দেখলাম দূরে এক মহিলা বাওবেড়ার কাছে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখে লজ্জা পেয়ে বাড়ীর ভিতরে চলে গেলেন। তিনি হয়তো মনে করেছিলেন এক প্যান্ট শার্ট পরা ভদ্রলোক দুই নম্বর জরুরত সাড়ার জন্য কলাগাছের গোড়ায় নেমেছিলেন। ছোটবেলায় তাবলীগের জামাতে গিয়ে এক নম্বর ও দুই নম্বর জরুরতের কথা শিখেছিলাম। তাবলীগে গিয়ে মসজিদে অবস্থান করতে হতো। পায়খানায় যাওয়াকে বলা হতো এক নম্বর জরুরত এবং প্রশ্রাব করাকে বলা হতো দুই নম্বর জরুরত। আমীর সাহেবকে বলা হতো
-হুজুর, বাইরে যাব।
– কেনো?
– এক নম্বর জরুরত।

কলেজে পড়ার সময় ইংলিশ টিচার বলতেন “আমার ক্লাসে শুধু ইংলিশে কথা বলতে চেষ্টা করবে। ” তিনি শিখিয়ে দিতেন ক্লাস থেকে বাইরে যেতে চাইলে ইংলিশে পারমিশন চাবে এই ভাবে “মে আই গো আউট, স্যার?”
– হোয়াই?
– ন্যাচার কল।

এখানে ন্যাচার কল হলো প্রশ্রাব-পায়খানায় যাওয়া। যাহোক, আমি কাপড়ের ধুলা ময়লা ঝেড়ে সাইকেলটা ধীরে ধীরে চালিয়ে চরামদ্দি ফিরে এলাম।

চরামদ্দিতে সারাক্ষণ লোকেরা আসতো আমার কাছে ডাইরিয়া রুগীর ঔষধ নিতে। ঢাকা থেকে মলের নমুনার রিপোর্ট এলো। সেবারের ডাইরিয়া কলেরার জীবানুর কারনে হয়েছিল। কলেরা রুগীর ঔষধ বিতরনের জন্য আমি ঠিকমতো ঘুমাতেও পারছিলাম না। হয়তো ক্লান্ত হয়ে একটু ভেলঘুম আসছি এক লোক এসে হাক দিলো “এই, ডাক্তার আছে? আমার এগগুয়া মাইয়ার একছের পায়খানা অইতাছে। দুগগা সেলাইন দেন না।” আমি উঠে জানালা দিয়ে সেলাইন ও ক্যাপ্সুল দিয়ে দিতাম। ঢাকা থেকে রেখে যাওয়া টেট্রাসাইক্লিন ক্যাপ্সুলের কৌটাগুলি ফার্মাসিস্টকে বললাম ডিস্পেসারির রেজিস্টারে এন্ট্রি করার জন্য। তিনি সেগুলি গ্রহন করতে অপারগতা প্রকাশ করলেন। তিনি যুক্তি দেখালেন “ঔষধ গ্রহন করতে হলে কোথা থেকে গ্রহন করা হল তার ডকুমেন্ট লাগবে। তারা কোন ডকুমেন্ট দিয়ে যান নি। ডকুমেন্ট ছাড়া ঔষধ ডিস্পেসারিতে রাখলে উর্ধতন কর্তৃপক্ষ দেখলে চুরির মাল হিসাবে সন্দেহ করতে পারে। ” তাই ঔষধ গুলি আমার হাওলায় রাখলাম। এবং খাতায় এন্ট্রি ছাড়াই রিলিফের মালের মতো জানালা দিয়ে বিতরণ করে শেষ করলাম।

একদিন হাসপাতালে মহা ভির হলো রুগীর। এমন সময় এক দল লোক এসে হাজির হলো। তারা এসেছিল একজনের নেতৃত্তে। যিনি নেতৃত্ত দিচ্ছিলেন তিনি এই এলাকারই। থাকেন ঢাকায়। কয়েদিন যাবৎ দেখি বাজারে চায়ের স্টলে বসে প্রধান মাস্তানের সাথে বসে আড্ডা দিতে। লম্বা, সুন্দর চেহারা। পরিপাটি ফুলহাতা শার্ট গায় দেন। মাটি ছেছরিয়ে লুঙ্গী পরেন। নেতার সাথে অনেকেই ভিতরে প্রবেশ করলেন। একপাশে লাইনের রুগী, আরেকপাশে আগুন্তক লোকজন। নেতার সাথে দাড়ালো প্রধান মাস্তান। আমি বললাম “আপনারা কিছু বলবেন? ” নেতা বললেন “হ্যা, কিছু বলার জন্যই এসেছি। ” আমি হাত গুটিয়ে বললাম “বলেন।”
লাইনের রুগীরা ও নেতার সাথে আসা লোকজন সবাই মনোযোগ দিলো নেতার দিকে। নেতা বক্তৃতার ভঙ্গিতে বললেন
” আমি চরামদ্দিরই সন্তান। বড় হয়েছি ঢাকায়। ঢাকা ইউনিভারসিটি থেকে মাস্টার্স কমপ্লিট করে বিসিএস দিয়েছি। এডমিন ক্যাডারে সারাদেশের ক্যান্ডিডেটদের মধ্যে তৃতীয় হয়েছি।”
আমি ভাবলাম “কিসের বিসিএস? পুলিশের তারা খেয়ে হয়তো আত্বগোপনে এসেছেন গ্রামে।”
তিনি বললেন “আপনি এখানে আশাতে এলাকার জনগণ খুব খুশী হয়েছে। কিন্তু আপনি যা করছেন তা তারা বুঝতে পারছে না। ”
– আমি কি করলাম?
– আপনি পাব্লিককে বোকা পেয়ে অনেক কিছু করেছেন।
– যেমন?
– আপনার হাসপাতালের সরবরাহকৃত সরকারি সেলাইন ঔষধের দোকানে পাওয়া যাচ্ছে।
– আমাদের এখানের সেলাইন শুধু রুগীকে দেয়া হয়। বিক্রি করার প্রশ্নই আসে না।
– হয়ত আপনার ফার্মাসিস্ট বিক্রি করেন।

আমি ফার্মাসিস্টকে পিওনকে না পেয়ে নিজেই ডিস্পেন্সারিতে গেলাম তাকে ডেকে আনতে। গিয়ে দেখি ফার্মাসিস্ট টেবিলের উপর বসে ঔষধ দিচ্ছেন রুগীদেরকে। দুই আংগুলের চিপায় একটা জ্বলন্ত বিড়ি। আরেকটা বিড়ি কানের চিপায় লাগানো। আমি জিগাইলাম “একি? আপনি টেবিলের উপর উঠে বসেছেন কেন? ” তিনি বললেন “স্যার, আপনি যান, স্যার।”
-এদিকে আসেন। আপনি এমন করছেন কেনো?
– (ফিসফিসিয়ে) স্যার, ঐ যে একটা হাত ব্যান্ডেজ করা রুগী দেখছেন না? উনি বরিশালের আলেকান্দার মাস্তান। পুলিশের মার খেয়ে পালিয়ে এসেছে। আমি তারে আমার কারবার দেখাচ্ছি যে আমি কেমন মাস্তান।
– মাস্তানি বাদ দিয়ে আমার রুমে আসেন।
ফার্মাসিস্টকে নেতার কাছে নিয়ে এসে জিগাইলাম
– আমাদের সরকারি সেলাইন দোকানে বিক্রি হয় কেমনে?
– স্যার, আমাদের এখান থেকে কোন ঔষধ দোকানে যাবার সম্ভাবনা নাই। সেলাইন তো শুধু আমরাই দেই না। পাশের গ্রামে একটা স্পেশাল হেলথ ক্যাম্প আছে। ওখান থেকে রুগী না দেখেই রুগীর লোকের কাছে রগে দেয়ার সেলাইন সরবরাহ করা হয়। তারা তো এলাকার লোকের নেতা। তাদের আপনার চেয়েও দরদ বেশী। এই সুযোগে কেউ যদি সেলাইন নিয়ে দোকানে দিয়ে থাকে আমাদের কিছু করার নাই। তাছাড়া অন্য উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে এনেও তো বিক্রি করতে পারে।

আমি আগন্তুক নেতাকে বললাম
– বুঝলেন তো?
– আপনি অফিস টাইমে প্রাইভেট রুগী দেখেন কেনো?
– আমি দেখতে চাই না। প্রাইভেট রুগীরা আপনাদেরই মা, বাবা, চাচা, দাদা, দাদী। তাদের দাবী, বসিয়ে না রেখে বিদায় করে দেয়া। তাতে লাইনের রুগীরা অসন্তুষ্ট হয় না। আমি এটা অন্যায় জেনেও আপনাদের সুবিধার জন্য করছি। আপনারা না চাইলে আমি এটা বন্ধ করে দিব।
– আপনি সরকারী ঔষধ প্রাইভেট রুগীকে দেন কেন?
– সরকারি ঔষধ ধনী গরীব সবার জন্যই। যদি কোন প্রাইভেট রুগী সরকারি ঔষধ নিতে চান আমি তাকে দেব না কেন?
– এগুলি সবই অন্যায়। অচিরেই এর ফল আপনি দেখতে পাবেন।
– ঠিক আছে। আপনারা যা ভালো চান তাই করব। আপনারা সবাই এসেছেন। ভালই হলো। আসুন আমরা এক যোগে চেষ্টা করি কিভাবে এলাকা থেকে কলেরা রোগ নির্মুল করা যায়।

নেতার পিছন থেকে একজন লোক বলে উঠলেন “ডাক্তার সাব, আপনি মনে কিছু নিয়েন না যেন। উনি বাজার থেকে আমাদেরকে জড়ো করে নিয়ে এলেন বলে যে কিভাবে দেশ থেকে কলেরা রোগ দূর করা যায় সেই বিষয়ে আপনার সাথে পরামর্শ করতে। উনি এখানে এসে সুর পালটিয়ে অন্য কথা বলছেন। উনি দেশে থাকেন না। আইছেন ধান্ধা করতে। এই চলেন সবাই। আমরা ওনার সাথে নাই। ” সবাই এক সুরে বলে উঠলো “হ্যা, আমরা ওনার সাথে নাই। চলো। ” বলে সবাই এক যোগে চলে গেলেন। রইলেন শুধু নেতা ও মাস্তানটি। আমি বললাম “দেখলেন তো, পাবলিক কি চায়।” নেতা “ডাক্তার সাব আমাকে আন্ডার এস্টিমেট করলেন, ভালো হলো না” বলে মাস্তানকে নিয়ে চলে গেলেন। কিছুদূর গিয়ে মাস্তান আবার ফিরে এসে বললেন “ডাক্তার সাব, আমার সেলাইনের বেগটা দিন। খাওয়ার সময় হয়েছে। ” মাস্তান তিন মাস পর পর একটি করে গ্লুকোজ সেলাইন নিতেন। তিনি অর্ধেক মদ আর অর্ধেক গ্লুকোজ সেলাইন মিক্সার করে পান করতেন। এতে নাকি তিন মাস চাংগা থাকতেন। এটা তার মনের রোগ। ডাক্তারি বিদ্যায় এর কোন ভিত্তি নাই। আমি বললাম “এখন কলেরার সময়। শুধু কলেরা সেলাইন আছে। কলেরা সেলাইন আপনার লাগবে না। আপনার লাগবে গ্লুকোজ সেলাইন। এরপর যখন গ্লুকোজ সেলাইন আসে তখন নিয়েন। ” মাস্তান চলে গেলেন। আমি ভাবলাম “আমার চরামদ্দির দিন শেষ হয়ে আসছে। ”


তারিখ : ৩১/১২/২০১৮ ইং
স্থান: ময়মনসিংহ -ঢাকা -ময়মনসিংহ জার্নি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *