যখন কার গাড়ী কিনলাম

যখন কার গাড়ী কিনলাম
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

গাড়ী কেনার স্বপ্ন দেখি মেডিকেলে ভর্তি হবার পর। বাসে ওঠার জন্য রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতাম। বাসভর্তি গাদাগাদা পেসেঞ্জার নিয়ে বাস যেতো। বাসে ওঠতে না পেড়ে দাড়িয়েই থাকতাম। কোন কোন সময় ওঠতে পারলেও দাঁড়িয়ে যেতে হতো। অনেকসময় সিটে বসে গেলেও পাশে ঘারের উপর যাত্রী দাঁড়িয়ে যেতো। গাড়ীর দোলায় দাঁড়ানো যাত্রীরা ঘারের উপর হুমরি খেয়ে পড়তো। কিছু বললে রেগে গিয়ে বলে ফেলতো “কি অইছে? গাড়ীতে গেলে একটু আধটু ঘেষা লাগবেই। সমস্যা হলে প্রাইভেট কার কিনে নিয়েন। ” ভাবতাম বড় হয়ে প্রাইভেট কারই কিনতে হবে। এখনতো বাবা প্রাইভেট কার কিনে দিতে পারবেন না। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকার সময় পাশ দিয়ে সাঁই করে প্রাইভেট কার চলে যেতো। গ্রামের বন্ধুরা বলতো “অপেক্ষা করো, ডাক্তার হয়ে তো অনেক টাকা কামাবা। তোমাদের জন্য প্রাইভেট কার কেনা কোন ব্যাপার না। ” তখন ৪/৫ লাখ টাকায় ভালো প্রাইভেট কার পাওয়া যেতো। রুগীর ভিজিট ছিল মাত্র ২০ টাকা। এই টাকা থেকে সংসার চালিয়ে বাকী টাকা জমিয়ে প্রাইভেট কার কেনা কি সম্ভব? আমি হিসাব মেলাতে পারতাম না। তাই, প্রাইভেট কার কেনার স্বপ্ন দেখেও সম্ভাবনা দেখতাম না। আমার তিন ক্লাসমেট একবার আমাকে রাস্তার ধারে দাঁড়ানো দেখে কার থামিয়ে নেমে এসে আমাকে কারে নিয়ে যেতে চাইলো। আমি জিগালাম “তোমরা কোথা থেকে কোথা যাচ্ছো?” একজন বললো “এটা ওর বাবার কার। ওকে নিয়ে মজা করার জন্য ড্রাইভিং -এ বেরিয়েছি। ” আমি ধন্যবাদ দিয়ে কারে যেতে অস্বীকৃতি জানালাম। ভাবলাম “আল্লাহ যদি কোনদিন সামর্থ্য দেন সেদিন কার কেনবো।” আবার চিন্তা করতাম ২০ টাকা করে ভিজিট নিয়ে কেমনে সামর্থ্য হবে আমার?
ডাক্তার হলাম। চাকরী করলাম। প্রেক্টিস করলাম। সংসারী হলাম। ফার্নিচার বানালাম। পোস্ট গ্রাজুয়েশন করলাম। আবার চাকরি ও প্রেক্টিস করতে লাগলাম। কিছু টাকা জমলো। বিদেশ ভ্রমণ করলাম। আবার কিছু জমলো। ময়মনসিংহ শহরে মাসকান্দায় এক টুকরা জমি কেনলাম। আবার কিছু জমলো। এবার মাথায় আসলো প্রাইভেট কার কেনার। এবার বুঝতে পারলাম কেমনে আল্লাহয় সামর্থ্য দেন। কল্পনা করলাম “প্রাইভেট কার নিয়ে আমি অফিসে যাব, আমার স্ত্রী স্বপ্না সন্তান মুনা ও দীনাকে নিয়ে কোচিং – এ যাবে। বাবা শহরে এসে বেশীদিন থাকতে পারেন না। বাবাকে ইচ্ছা করলেই কার দিয়ে বাড়ী থেকে নিয়ে আসবো। ইচ্ছে করলেই রেখে আসবো। মন চাইলেই বাড়ী চলে যাবো। স্বপ্নাও ঘন ঘন আমার শশুর বাড়ী যেতে পারবে, ইত্যাদি। ”

আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে ১৯৯৮ বা ৯৯ সনের দিকে একটা টয়োটা করলা কার কিনলাম। ব্যাংকে টাকা কালেকশন হতে বিলম্ব হওয়ায় ৫০ হাজার টাকা কম পড়ে গেলো। ডাঃ আ ন ম ফজলুল হক পাঠান ভাই তখন ময়মনসিংহ বিএমএ-এর সাধারণ সম্পাদক। তাকে জানানোর সাথে সাথে তিনি আমাকে ৫০ হাজার টাকা দিলেন। আমি গাড়ী নিয়ে কোয়ার্টারে এলাম। সন্ধ্যা হয়ে গেলো। গাড়ী রাখবো কোথায়? দাড়োয়ান দেখিয়ে দিলেন সরকারি একটি গ্যারেজ খালী আছে। হাসপাতালের ডাইরেক্টর সাহেব অনুমতি দিলে রাখতে পারেন। আমি ডাইরেক্টরের বাসায় অনুমতি নিতে গেলাম। দাড়োয়ান ভিতরে গেলেন অনুমতি আনতে। অনেক্ষণ পর ডাইরেক্টর স্যার দোতালার বারান্দায় বেরিয়ে রেগে গিয়ে বললেন “সারাদিন কি করেছেন? সন্ধায় আমি বিশ্রাম নিচ্ছি এখন এসেছেন! এই নিন চাবি। ” আমি বললাম “আমি একটা কার কিনেছি। এখনই নিয়ে এলাম মাত্র। তাই, আপনাকে বিরক্ত করেছি। ” চাবি নিয়ে গ্যারেজ খুলে গাড়ী রাখলাম।

তখন মোবাইলের যুগ ছিল না। গাড়ী কিনার সংবাদটি তেমন কেউ জানলো না। পরদিন সকালে ড্রাইভার এলো। নাস্তা করে আমি ও স্বপ্না ড্রাইভারকে নিয়ে বেরুলাম কিছুক্ষণ ঘুরে দেখতে যে গাড়ীটা চলতে কেমন বা ড্রাইভারটা চালাতে কেমন। চলতে চলতে ত্রিশাল পর্যন্ত গেলাম। ভালোই লাগছিলো। আরো যেতে বললাম। ভালুকার ভরাডোবা পর্যন্ত চলে গেলাম কয়েক মিনিটেই। মজাই লাগছিল। সাথে স্বপ্না ছিল। তাই হয়ত একটু বেশীই ভালো লাগছিলো। ভরাডোবা পর্যন্ত গেলে ডান দিকের রাস্তায় যেতে বললাম। সাগরদিঘী পর্যন্ত গিয়ে নেমে দিঘীর পারে কিছুক্ষণ নায়ক নায়ীকার মতো বেড়ালাম। আবার গাড়ীতে বসলাম। স্বপ্নাকে বললাম “বাড়ীর কাছেই তো এসে গেছি। চলো বাড়ী যাই।”
– বাসায় তো বলে আসি নি।
– দেরী করবো না। বাবাকে গাড়ী দেখিয়েই ফিরে যাবো।
– চলো।

গাড়ী নিয়ে গুড় গুড়ি চলে গিয়ে বাড়ীর বাইর বাড়ী গিয়ে থামলাম। দেখে -শুনে ভাই, ভাবী, ভাতিজা, ভাতিজী সবাই খুশী। বাবা এগিয়ে এসে খুশীতে গাড়ীর গায়ে হাত রাখলেন। দেখেছিলাম ছোটবেলায় একটি সুন্দর ঘোড়া কিনে এনে বাবা যেমন করে ঘোড়ার গতরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। বাবার ঠোট ও গালের টোল পরা দেখে মনে হলো খুব খুশী হয়েছেন। তারপর বাবা উঠানে গিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন। একে একে আশে পাশের অনেকেই আসলেন গাড়ী দেখতে। সিদ্দিক ভাই মন্তব্য করলেন “গাড়ীটা ভালো আছে। একদম শব্দ কম। বাইর বাড়ী দিয়ে চলে এলো শব্দই পেলাম না। ” নানা রকম প্রশ্ন করলেন। যেমন ছোট বেলায় আমি দেখেছিলাম পাশের বাড়ীর আ: হামিদ খসরু তালুকদার কাক্কুর রেডিও কিনে আনার পর। খসরু কাক্কুর দুই স্ত্রী এখন। এদের মধ্যে বড়জন আমাকে খুব আদর করেন। তিনি আমাকে সাদেগালী বলে ডাকেন। আমার ছোটবেলার নাম ছিল সাদেক আলী। চাচীর মুখের সাদেগালীই আমার ভালো লাগে। বাড়ী গেলে এই চাচীই আমাকে প্রথম দেখতে আসেন। কোন দিন তিনি আসতে দেরী হলে আমি চলে যাই চাচীর বাড়ী। চাচী বলেন “এল্লা, সাদেগালী কূনসুম আইলা। মুনার মা আইছে? বও। ”

চাচী এলেন। গাড়ী দেখলেন। খুশী হলেন। বাড়ীর ভিতরে গেলেন। বাবার মুখ হাসি হাসি ছিল। আমি দেখলাম চাচী বাবার চোখের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন। তিনি বাবাকে উদ্যেশ্য করে বললেন “এল্লা আপনে কান্দুন কে? কান্দুইন না যে। আহ হা রে আইজকা যদি সাদেগালীর মাও বাইচা থাকতেন কত খুশী যে হতেন! ” আমি দেখলাম বাবা আসলে কাদছিলেন না। এই চাচীই উস্কানি দিয়ে বাবাকে কাদালেন। বাবার দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। আমারও দুচোখে অশ্রু আসলো। কাউকে দেখতে দিলাম না। বাড়ীর পশ্চিম পাশে গিয়ে দাড়ালাম। মন খারাপ হলে আমি তাই করতাম। পশ্চিম দিকে নওপাড়ার উপর দিয়ে আকাশের দিকে তাকালে আমারা মন ভালো হয়ে যায়। তাই আমি মন খারাপ হলে বাড়ীর পশ্চিম পাশে গিয়ে নওপাড়ার গাছ গাছড়ার উপর দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার কান্না বা চোখের পানি পৃথীবির মানুষ খুব কমই দেখতে পায়।

আমরা গ্রামের বাড়ী এসেছি এটা ময়মনসিংহের বাসায় কেউ জানে না। দেরী হলে বাসায় চিন্তা করবে তাই তাড়াতাড়ি কিছু খেয়ে ফিরে এলাম। ফিরার সময় বড় চওনা বাজারের কাছে আসলে দেখলাম উলটা দিক থেকে একটা লাকড়ির ভ্যান আসছে। ড্রাইভারকে সাবধান করলাম যাতে লাকড়ির সাথে না লাগায়। ড্রাইভার গাড়ী স্লো করে সাইড দিলো। কিন্তু ভ্যানওয়ালা কারকে তোয়াক্কা না করে কারের গায়ে একটা পোছ দিয়ে ছাল উঠিয়ে ফেললো। বোকা চোকা এক ভ্যানওয়ালা। রাগে দু:খে কিছুই বললাম না। চুপ করে চলে এলাম ময়মনসিংহে।

পরেরদিন ব্যাংকে টাকা কালেকশন হলে ৫০ হাজার টাকা ফেরৎ দিতে গেলাম ডাঃ পাঠান ভাইর বাসায়। ড্রইং রমে সোফায় পাশাপাশি বসে গুণে টাকাগুলি পাঠান ভাইর হাতে দিলাম। চোখ তুলে দেখি ভাবী দরজায় দাঁড়ানো। আমি সালাম দিলাম। সালামের জবাব দিয়ে ভাবী জিজ্ঞেস করলেন “কি জন্য টাকা দিচ্ছেন?” আমি বললাম “ভাবী, আমি ভাই থেকে ৫০ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলাম। সেইটা ফেরৎ দিলাম। ” ভাবী আমার কথা বিশ্বাস করলেন কিনা আমি জানি না। তবে কেনো যেন মনে হয় আমি ভাবীর মনে ঘুষের সন্দেহ ঢুকিয়ে দিলাম না তো?

নিজে গাড়ী ড্রাইভ না করতে পারলে ইচ্ছামতো ঘুরাফিরা করা যায় না। তাই, ছয় হাজার টাকা দিয়ে ড্রাইভিং-এ ভর্তি হয়ে ড্রাইভিং শিখলাম। মোটামুটি একাই চালাতে পারবো বলে আত্ববিশ্বাস এলো। ড্রাইভারকে বাম পাশে বসিয়ে নিজে ড্রাইভ করে চুরখাই কমিউনিটি বেইজড মেডিকেল কলেজ পারি দিয়ে ফিরে আসছিলাম। সেদিন ছিল শীতের সকাল। মিষ্টি মিষ্টি রোদ ছিল। চুরখাই বাজারে রাস্তার বাম পাশে পড়ে থাকা একটা টেম্পুতে ৫/৬ জন লোক বিড়ি খাচ্ছিল ও রোদ পোহাচ্ছিল। আমি ডান পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিলাম ড্রাইভ করে। হাল্কা একটু ছোঁয়া লাগলো টেম্পূর পিছনের এক কর্নারে। ঝাকি খেয়ে সবাই ছিটকে পড়লো মাটিতে। বাজার থেকে এক ঝাক লোক এসে আমার কার ঘেরাও করে ফেললো। আমি ভরকে গেলাম। আমি ড্রাইভারের সীটে বসা। ড্রাইভার ভেবে এবার একটা কিলও মাটিত পড়বে। আমি কি করব বুঝতে পারছিলাম না। একটা যুবক ছেলে আমার জানালার কাছে এসে বললো “স্যার এখানে?” আমি বললাম “আমি ড্রাইভ করছিলাম। কেমনে গাড়ীটা একটু কানিতে লেগে গেলো বুঝতে পারছি না। ” “স্যার, চলে যান। আমি দেখছি ” ছেলেটি বলার সাথে সাথে আমি একটানে চলে এলাম নিরাপদ দুরুত্বে। গাড়ী ছেড়ে দিলাম আসল ড্রাইভারের হাতে। বাসায় যেতে যেতে ভাবলাম ড্রাইভিং-এর সময় এক্সিডেন্ট করলে নিজেও মরতে পারি, দুই চারজন মারতেও পারি। আমার মেয়েরা এতিম হয়ে যাবে। স্ত্রী বিধবা হয়ে পড়বে। এত কষ্ট করে ডাক্তারি পড়লাম তার কি হবে। আমার হিস্টোপ্যাথলজি প্রেক্টিসের কি হবে। দরকার নাই আমার গাড়ী চালানোর। সেই থেকে আমি আর গাড়ী চালাই না। তবে আমার কাছে একটা ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে খুব সম্ভব।


তারিখ : ১০/১/২০১৯ ইং
স্থান: ময়মনসিংহ -কিশোরগঞ্জ -ময়মনসিংহ জার্নি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *