ধৈর্য

ধৈর্য
(গল্প)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডাঃ রুহুল আমীন খান স্যার গল্প করতে পছন্দ করেন। একাডেমিক কাউন্সিলের মিটিং শুরুর আগে আমরা স্যারের রুমে জড়ো হলে স্যার আমাদের মধ্যমণি হিসাবে নানা রকম উপদেশমুলক কথা বলেন। আমি কথার মাঝে মাঝে এমন মন্তব্য করি যাতে স্যারের মন ডাইভার্ট হয়ে মজার গল্পে রুপান্তরিত হয়। সেই সুবাদে স্যার থেকে আমরা মজার মজার হল্প শুনতে পাই। প্রায়ই স্যারের মা, বাবা, ভাই ও চাচীদের আদর্শ নিয়ে কথা বলেন। কিছুদিন পরপরই স্যারের পরিবাবারের কেউ না ইন্তেকাল করছেন। বুঝতে পারছি তাতে ক্রমেই স্যারের মন ভেংগে পড়ছে।

স্যারের বাবার খুব ধৈর্যগুণ ছিল। এ প্রসংগে একদিন স্যার একটা গল্প বললেন। গল্পটা আমার হুবহু মনে নেই। তবে যে টুকু মনে আছে তার সাথে জোড়াতালি দিয়ে আজকের আমার এই গল্প। স্যার বললেন:

আমার আব্বার খুব ধৈর্য ছিল। একদিন আমি আব্বার সাথে এক জায়গায় গিয়েছিলাম। সেখানে আব্বার মামার বাড়ীর গ্রামের এক লোকের সাথে দেখা হলো। তিনি আব্বাকে সালাম দিয়ে বললেন
– চাচা, অনেকদিন হয় আপনাদের বাড়ী যাওয়া হয় না। একদিন আপনাদের বাড়ী যেতে হবে।
– চলো আজকেই চলো।
– না, আজকে না। আমি অন্যদিন যাবো। আমাকে কিন্তু ভালো ভাবে চারটে খাবার দিতে হবে। অনেকদিন হয় ভালো খাওয়া হয় না।
– তা, কবে যেতে চাও?
– এই, ধরেন, অমুক তারিখ শুক্রবার দুপুরের দাওয়াত খেতে চাই।
– সেটা তো প্রায় একমাস পর। এতদিন পর আমিও বেচে নাও থাকতে পাড়ি, তুমিও বেচে নাও থাকতে পারো।
– কি যে কন চাচা। বেচে থাকলে আমি আপনের বাড়ী খাইব। চাচা মনে থাকে যেন তারিখটা। আমি কিন্তু আপনার বাড়ীতে চারটা ডালভাত খাবই। খুবই ইচ্ছে হয়েছে আপনার বাড়ীতে চারটা খেতে।
– আচ্ছা, ঠিক আছে, মনে থাকবে।
– চাচা, আমি কিন্তু চিকন চাউলের ভাত খাব। আমার জন্য চাচীকে চিকন চাউল বানিয়ে রাখতে বলবেন কিন্তু। কতদিন চাচীর হাতের রান্না খাই না। চাচীর হাতের রান্না যে কত স্বাদের!
– আচ্ছা, চিকন চাউলের ভাতই দেয়া হবে তোমায়।
– চাচা, আমি কিন্তু শক্ত ভাত খেতে পারি না। আবার বেশী নরমভাতও ভালো লাগে না। আমার জন্য চাচীকে মধ্যম নরম ভাত দিতে বলবেন।
– ঠিক আছে। বলব।
– চাচা, খাওয়ার প্রথমে কিন্তু আমি একটু ভাজী খাই।
– ভাজীও দেয়া হবে।
– ভাজীটা কিন্তু গোপালের খাটি গাওয়া ঘি দিয়ে ভাজতে হবে। কিজে ঘ্রাণ গোপালের ঘি টা!
– ঘি দিয়েই ভাজা হবে শব্জি।
– আমি কিন্তু বড় মাছ পছন্দ করি। আপনার পুকুরের রুই কাতলা খুবই স্বাদের। কতদিন আপনার পুকুরের রুই কাতলা খাওয়া হয় না। চাচা, সবচেয়ে বড় মাছটা কিন্তু ধরতে হবে। মাছ যত বড় হয় স্বাদও ততো বেশী। আহ, রুই মাছের পেটি, কি যে স্বাদের! চাচা, চাচীকে বলবেন “আমার জন্য যেনো মাছের পেটিটা রাখেন। ”
– কবুতরের বাচ্চা দোপেয়াজি আমার খুব ভালো লাগে। আপনারা এখনো কি কবুতর পালেন?
– হ্যা, আমাদের অনেক কবুতর আছে।
– তাইলে, আমার জন্য কবুতরের বাচ্চাও দোপেয়াজি করতে বলবেন চাচীকে। আহ কি যে স্বাদের কবুতরের বাচ্চা।

– ঠিক আছে কবুতরের বাচ্চাও রান্না হবে।
– চাচা, আজকাল কি যে হয়েছে, দেশী মুরগী পাওয়াই যায় না। সবাই ব্রয়লারের মুরগী খায়। দেশী জাতের কচি মুর্গীর ছানা ছোট গোল আলু দিয়ে রান্না করলে কিযে স্বাদ! চাচা, আমাকে কিন্তু মুরগির বাচ্চা দিতে হবে। ঝালটা যেনো একটু বেশী দেয়া হয়। আহ, কি যে স্বাদ চাচীর হাতের মুরগির বাচ্চা!
– ঠিক আছে মুরগির বাচ্চাও জবাই করা হবে।
– চাচা, রাগ কইরেন না। ভাতের সাথে কিন্তু আমি গাভীর খাটি দুধ মাখিয়ে খাই।
– গাভীর দুধ দেয়া হবে। আমরা গাই পানাই।
– আমি কিন্তু কাচিলা গাইয়ের দুধ খাই না।
– আমাদের বাছুর কাচিলা না।
– চাচা, কম জ্বাল দেয়া দুধ আমার কাছে পানসে লাগে। দুধ জ্বাল দিতে দিতে যখন হলুদ রঙ ধারন করে তখন খুব স্বাদ লাগে। চাচীকে বলবেন আমার জন্য যেন দুধ ঘন করে জ্বাল দেয়া হয়।
– ঘন করেই জ্বাল দেয়া হবে।
– চাচা, আমি কিন্তু সবরি কলা ছাড়া দুধ খাই না। সবরি কলা ভাতের সাথে চেইটকা, ঘন দুধ দিয়ে মাখিয়ে খেতে কি যে মজা!
– সবরি কলাও আনা হবে।
– চাচা, রাগ করুন না যে, ভাত খাওয়ার পর ফিরনি খাওয়া আমার পছন্দের।
– ফিরনিও দেয়া হবে।
– ফিরনিটা যেনো কালিজিরা চাউলের ও খেজুর গুড়ের হয়।
– তাই দেয়া হবে।
– চাচা, খাওয়া শেষে কিন্তু আমার পান খাবার অভ্যাস আছে। চাচীকে বলবেন যেন শেষে আমাকে রতন জর্দা দিয়ে একটা পান দেন।
– পানও থাকবে জর্দা দিয়ে।
– আমি কিন্তু কাঁচা শুপারী খেতে পারিনা। আমার পানে শুকনা শুপারী দিতে বলবেন।
-সব দেয়া হবে। তুমি আসবে আমাদের বাড়ীতে।
– চাচা, আমি তাহলে যাই। তারিখটা যেনো মনে থাকে, চাচা। চাচীকে বইলেন।

সালাম দিয়ে লোকটি বিদায় নিলেন। কিছুদূর গিয়ে ফিরে এসে বললেন
– চাচা, একটা কথা ভুলে গেছি। ভাতের সাথে একটু কঁচি শসা, কাচা দেশী পিয়াজ ও খাটি সরিষা তেলের সালাদ দিয়েন।
– আচ্ছা দিব নি।

আমি লোকটির খাওয়ার পছন্দ শুনে স্তম্ভিত হলাম। লোকটার প্রতি আমার প্রচণ্ড বিরক্তি এলো। আব্বার ধৈর্য দেখে আশ্চর্য হলাম। সেই কবে আসবে লোকটা, সেই তারিখ কি কারো মনে রাখা সম্ভব! আর এত কিছুর কথা কি মনে রাখা সম্ভব! বাচাল ও পেটুক লোক কোথাকার!

আব্বাকে বললাম
– এমন পেটুক, বাচাল ও ছোচা লোক আমি দেখি নাই। এই লোকটা অতদিন পর কি তারিখটা মনে রাখতে পারবে? আমাদেরই কি মনে থাকবে? এইভাবে চেয়ে চেয়ে যেচে যেচে কি কেউ কারো বাড়িতে খেতে আসে? এই লোকটাকে এত কিছু জোগার করেই বা কেনো খাওয়াতে হবে?
– তুমি বুঝবে না। অনেকেই খেয়ে আনন্দ পায়। অনেকে খাওয়ায়ে আনন্দ পায়। এই লোকটি খেয়ে আনন্দ পায়। আসুক না একদিন। দেখি খাওয়াতে পারি কি না।

অনেকদিন হয়ে গেলো। ঘটনাটা ভুলেই গিয়েছিলাম আমি। জুম্মার নামাজের পর পুকুরপাড় দিয়ে হেটে আসছিলাম আব্বার সাথে। দেখি সেই লোকটি আব্বাকে সালাম দিয়ে বললেন “চাচা, মনে আছে নি? আজকে কিন্তু সেই তারিখ। এসে গেছি চাচীর হাতের রান্না খেতে।” আমি ভাবলাম “এতো দেখছি মহা বিপদ! এতদিন পর কি আব্বার সেই কথা মনে আছে? মনে তো থাকার কথা না। পেটুক লোকটা ঠিকই মনে রেখেছে। আজ কেমন হবে? কি দিয়ে তাকে খাওয়াব? আব্বা বললেন “মনে আছে। চলো বাড়ী।” বাবা লোকটাকে বাড়ী নিয়ে বসিয়ে তার আগের চাহিদা অনুযায়ী সব খাওয়ালেন। লোকটি খায় আর আম্মার রান্নার প্রশংসা করেন। খেয়ে গলা পর্যন্ত ভরে ফেললেন। শেষে খেলেন রতন জর্দা দিয়ে পান। তারপর বাংলা ঘরে বিছানায় কিছুক্ষণ গড়া গড়ি করলেন।

আমি আব্বাকে বললাম
-আপনি লোকটার জন্য এত কিছু করলেন আমরা তো জানলাম না।
– তোমাদেরকে ইচ্ছে কিরেই জানাই নি। তোমাদেরকে দায়িত্ব দিলে এটার গুরুত্ব বুঝতে না। চাহিদা মাফিক সব আয়োজন হতো না। তাই, তোমার আম্মা আর আমিই এই কাজ করেছি।
– কি লাভ ইনাদেরকে এতো কিছু খাইয়ে?
– লাভ আছে। ইনি আমাদের কাছে আর কিছু চায় নি। শুধু চেয়েছে তৃপ্তিসহ কিছু খেতে। এতো কিছু তার পছন্দ। কিন্তু সে তা যোগার করতে পারেনা। পারলেও কেউ সেইভাবে রান্না করতে পারে না। সে আমার প্রতি আস্থা পেয়েছে যে আমি তাকে খাওয়াতে পারব। সে আজ আমার বাড়ীর মেহমান হয়ে এসেছে। সব খাবারের হিসাব একদিন দিতে হবে পরকালে। মেহমানকে যে খাবারগুলি খাওয়ালাম সেই খাবারের হিসাব দিতে হবে না। খেয়ে খুশী হয়ে মেহমান যে দোয়া করবে হতে পারে সেটা আমাদের নাজাতের ফয়সালা।
-আব্বার ধৈর্যও আছে।


তারিখ : ১৯/১/২০১৯ ইং
স্থান: ময়মনসিংহ -কিশোরগঞ্জ -ময়মনসিংহ জার্নি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *