বাসে চড়ে নেপাল গেলাম

বাসে চড়ে নেপাল গেলাম
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাস। তখনো আমার বিদেশ যাওয়া হয় নি। নেপাল মেডিকেল এসোসিয়েশন থেকে একটা দাওয়াত পত্র এসেছিল বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের কাছে তাদের বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দেয়ার জন্য। সেই দাওয়াতপত্রটি প্রতি জেলায় ও মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয় আগ্রহীদের নাম সংগ্রহ করার জন্য। দেখলাম বাইরোডে নেপাল যাবার প্রতিনিধি ফি মাত্র ৭,৫০০ টাকা। আমি আগ্রহ প্রকাশ করলাম এই জন্য যে, কম পয়সায় একটু বিদেশ ভ্রমনের অভিজ্ঞতা হোক। সাথী-সংগী সংগ্রহ করতে লাগলাম। বেশ কিছু প্রতিনিধির মধ্যে আমার ব্যাচম্যাট তৎকালীন প্যাথলজির প্রভাষক ডাঃ এ এফ এম সালেহ (বর্তমান প্রফেসর) এবং ডাঃ মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী (বর্তমান সহকারী অধ্যাপক, এনাস্থেসিয়া) আমাদের প্রতিনিধি দলে সফর সংগী হলো। সফরের সময় সালেহ (ইকবাল) আমার সবসময়ের সংগী ছিলো।

ময়মনসিংহ আমাদের টিম লিডার ছিলেন তৎকালীন ময়মনসিংহ বিএমএ-এর প্রেসিডেন্ট প্যাথলজির প্রফেসর ডাঃ মীর্জা হামিদুল হক। আমরা দুপুরের পর ময়মনসিংহ থেকে বাস যোগে রওনা হলাম ঢাকার উদ্যেশ্যে। ঢাকায় বিএমএ অফিসে গিয়ে শুনি আমাদের ভিসা হয়নি। খোজ নিয়ে জানলাম নেপালের ভিসা করা হয়েছে। কিন্তু বাই রোডে গেলে ইন্ডিয়ার উপর দিয়ে যেতে হবে তাই ইন্ডিয়ার ভিসাও লাগবে। পরেরদিন ইন্ডিতার ভিসা করা হলো। ইফতারের পর ঢাকার তোপখানা রোডের বিএমএ অফিসের সামনে থেকে সবাই হিমালয় টুরিজম বাসে উঠলাম। আমি ও ইকবাল পাশাপাশি বসলাম। সেন্ট্রাল বিএমএ-এর সেক্রেটারি জেনারেল ডাঃ মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ভাই (বর্তমানে প্রেসিডেন্ট) আমাদেরকে বিদায় দিয়ে বললেন “আমি যেতে পারলাম না। আমার প্রতিনিধি হিসাবে জয়েন্ট সেক্রেটারি ডাঃ বদিউজ্জামান ডাব্লু থাকবেন। তিনি বাই এয়ারে যাবেন। নেপাল গিয়ে তার সাথে দেখা হবে। আপনাদের সাথে মুরুব্বি হিসাবে থাকবেন আমাদের সবার প্রিয় ডাঃ আংগুর ভাই। সবাই খেয়াল রাখবেন যেনো বিদেশের মাটিতে আমাদের সম্মান অক্ষুণ্ণ থাকে।” আমাদের কাফেলায় প্রায় ৮৩ জন যাত্রী ছিল। যেহেতু বিদেশে এটাই আমার প্রথম ভ্রমন তাই ফ্যামিলির কাউকে নিয়ে যাই নি। মনে করলাম, একটু অভিজ্ঞতা নিয়ে আসি। পরেরবার ফামিলি নিয়ে যাবো। তাছাড়া, বাইরোডে এতো দূর স্ত্রী ও বাচ্চা নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু বাসে উঠে দেখলাম বিভিন্ন বয়সের বেশ কয়েকজন বাচ্চা আছে এবং কয়েকজনের স্ত্রী ও শেলিকাও সাথে আছেন। বাস্তবে দেখলাম, বাচ্চাদের তেমন কষ্ট হচ্ছে না, বরং তারা বাসে ছুটাছুটি করে পিকনিকের আনন্দই পাচ্ছিল। যারা স্বামী বা স্ত্রী সাথে নিয়ে যাচ্ছিলেন তারা গল্প স্বল্প করেই যাচ্ছিলেন। যারা কম বয়েসি ডাক্তার তাদেরমধ্যে দুইএক জনের স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক না থাকলেও বন্ধুর সম্পর্ক ছিল। বড়রা দোস্তে দোস্তে গল্প করে যাচ্ছিলেন। মীর্জা স্যার ও মরহুম সাইদুল ইসলাম স্যারের মধ্যে ছিল বন্ধুর সম্পর্ক। দুইজন বেশ মজা করে যাচ্ছিলেন। আমি আর ইকবাল যাচ্ছিলাম পুরাতন বন্ধু হিসাবে পুরাতন গল্প করতে করতে।

একসময় দেখলাম সবাই বলাবলি করছে “ঐ যে, ঐ যে, বংগবন্ধু ব্রিজ।” সামনে দৃষ্টি গেলো আমার। দেখলাম রাতের বেলা অন্ধকারের মধ্যে দুইসারি তারার মালার মতো করে সাজানো লাইট। কাছে গিয়ে দেখি বংগবন্ধু সেতু। সবাই দেখে খুশী।আমিও প্রথম যমুনা নদী দেখলাম। সদ্যনির্মিত দেশের সর্ব বৃহৎ সেতু দেখা হলো। কিছুক্ষণ সবাই এই সেতুর বৈশিষ্ট্য নিয়ে গল্প করলেন। প্রায় দুই বছর আগে আমি আমার ও আমার শেলিকাদের ফ্যামিলি নিয়ে উত্তর বংগে বেড়াতে যাচ্ছিলাম মাইক্রোবাস নিয়ে। সাথে মেয়ে-জামাইও ছিলো। বংগবন্ধু সেতুর উপর এলে এই সেতু নিয়ে সবাই কথা বলছিল। আমি বললাম “আমি বংগবন্ধু সেতু প্রথম দেখেছি ১৯৯৯ সনে কাঠমান্ডু যাবার সময়।” সবাই মনে করলো আমি চাপা মারছি। এক যোগে সবাই হেসে ফেললো। মেয়ে জামাইও হেসে ফেললো। তাদের মাথায়ই ধরলা না যে কাঠমান্ডু যেতে যমুনার বংগবন্ধু সেতু পরবে । আমি বুঝিয়ে বলার পর তারা বিশ্বাস করলো। তারা আমার কথা বিশ্বাস না করার আরেকটি কারন হলো আমি পিকনিকে গিয়ে আনন্দ পাওয়ানোর জন্য আষাঢ়ে গল্প বলে থাকি। তারা এটাকেও আষাঢ়ে গল্প মনে করেছিল।

বাস চলছিল। এক সময় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম কিনা মনে নেই। বয়েস হয়েছো তো এতো আগের কথা হুবহু মনে করতে পারছি না। এর আগে আমি যমুনার ওপার যাই নি। তাই, বাইরোডে আসায় ভালোই হলো। দেশও দেখা হলো বিদেশও দেখা হলো। বগুড়া কখন পেড়িয়ে গেছি জানি না। খুব সম্ভব তখন ঘুমিয়ে ছিলাম। একসময় গাড়ী থামলে দেখলাম সাইনবোর্ডে লিখা আছে গাইবান্ধা। এক রেস্টুরেন্ট-এর সামনে বাস থেমেছিল। কিছু খেতে নামলাম। কিন্তু নোংরা পরিবেশ দেখে খেলাম না। বাস চললো। থামলো গিয়ে রংপুর। এক রেস্টুরেন্ট-এ সবাই নামলাম। সেহরি হিসাবে ভাত খেলাম খাসির গোস্ত দিয়ে। অনেকেই রুটি খেলেন। খেতে খেতে ফজরের আযান পড়ে গেলো। বাস চললো।

একসময় একটা যায়গায় বাস থামলো। দেখলাম তিস্তা ব্যারেজ। বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারেজ দেখা হলো নেপাল জার্নিতে। বাস চললো। বুড়িমারী সিমান্তে পৌছলো বাস। এইবার দেশ থেকে বের হবার পালা। জীবনে প্রথম দেশ থেকে বের হচ্ছিলাম। যেটাকে বলা হয় ইমিগ্রেশন। ইমিগ্রেশনের ফর্মালিটি চলছিলো। একসাথে ৮৩ জনের ইমিগ্রেশন চেক করতে অনেক ঘন্টা সময় লেগে গেলো। আমাদের ব্যাগেজ চেক করা হচ্ছিল একে একে। এক বড় ভাইয়ের ব্যাগে কয়েক বান্ডিল ফাইফ ফাইফ ফাইফ ব্রান্ডের সিগারেট পাওয়া গেলো। কাস্টম আটকিয়ে দিলো। বড় ভাই তাদের সাথে বাক বিতন্ডায় জড়িয়ে পড়লেন। বুঝালেন যে তিনি একজন চেইন স্মুকার। এক সিগারেট শেষ হতে আরেক সিগারেট ধরান। কাজেই এই জার্নিতে এই কয় প্যাকেট সিগারেট তার জন্য কিছুই না। সিগারেট ছেড়ে দিলেন কাস্টম কর্মকর্তা। নো ম্যান্স ল্যান্ডে ঢুকে পড়লাম আমরা। নো ম্যান্স ল্যান্ডে বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ার পতাকা পতপত করে উড়ছিল। সকাল পেড়িয়ে প্রায় দুপুর হয়ে গেলো। রৌদ্রে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে এই ৮৩ জন যাত্রী আবার ইন্ডিয়ার ইমিগ্রেশন চেকিং-এর পাল্লায় পড়লাম। সেই সিগারেট খেকো বড় ভাই আমার সামনে ছিলেন। ইন্ডিয়ার ইমিগ্রেশন অফিসার বড়ভাইর নাম ভিসা দেখে সঠিক উচ্চারণ করতে পারছিল না। উচ্চারণ শুনে বড়ভাই ক্ষেপে গিয়ে বললেন “এই ব্যাটা, তোকে চাকরী দিয়েছে কে? তুই ইংলিশ পড়তে পারস না? সরে যা এখান থেকে। ” শুনে তো ইমিগ্রেশন অফিসার থ মেরে বসে রইলেন কাজ বাদ দিয়ে। আমি চিন্তা করলাম, বড় ভাই মনে হয় কিছু খেয়েছেন। ভাবমুর্তি তো নষ্ট হওয়া শুরু হলো না! যাহোক, আংগুর ভাইর অনুরোধে মিটমাট হয়ে গেলো। ধীরে ধীরে ইন্ডিয়ায় প্রবেশ করলাম সবাই।

প্রায় আধাকিলোমিটার পা পথে হেটে যেতে হলো বেখাপ্পা রাস্তা দিয়ে। ১২/১৩ বছর বয়সের একদল মেয়ে সামনে দাড়ালো কিছু রুপি চেয়ে সামনে কি একটা পুঁজো উপলক্ষে। শতস্ফুর্তভাবে কিছু রুপি দিয়ে দিলাম। কিছুদূর যেতেই আরেকদল মেয়ে। তারাও পুঁজার চাঁদা চেয়ে বসলো। দিলাম চাঁদা। কিছুদুর গেলে একদল কিশোর আগার দিলো আমাদেরকে। দিলাম চান্দা। কিছুদূর গেলে আরেকদল যুবক চান্দা চেয়ে বসলো পুঁজার। কি আর করা, দিলাম চান্দা। এবার পৌছে গেলাম বাসের কাছে। গুনে গুনে ৮৩ জনকে হিমালয় টুরিজমের ইন্ডিয়ান অংশের বাসে উঠানো হলো। বাস চললো শিলিগুড়ির উপর দিয়ে নেপালের দিকে। দেশ দেখতে বাংলাদেশের মতোই। এক জায়গার নাম লিখা দেখলাম ‘বাছুর আলগা’। বাংলাদেশে রংপুরের কাছে ‘গাইবান্ধা’ লিখা দেখেছিলাম। আর ইন্ডিয়ায় এসে দেখি বাছুর আলগা। বাছুর দুধ খাবে কিভাবে? বিকেলের দিকে পৌঁছে গেলাম কাকরভিটা সীমান্তে। এবার ইন্ডিয়া থেকে নেপালে প্রবেশের পালা। আগের মতোই ৮৩ জনের লাইন। আগের মতোই ইমিগ্রেশনের ঝামেলা। সব ঝামেলা শেষে বেলা ডোবার পর প্রবেশ করলাম নেপালে। সেখানে মাঠে নেপালি কিশোরীরা নুডুল রান্না করছিল। আমরা বসে নুডুলস দিয়ে ইফতার করলাম। আপনারা খেয়াল করুন, সেহেরি খেয়েছিলাম রংপুর, ইফতার করলাম নেপালে। মাঝখানে সারাদিন কেটেছে ইন্ডিয়ার উপর দিয়ে। ইফতার করে কিছুদূর রিক্সায় গেলাম নেপাল অংশের হিমালয় টুরিজমের বাসে উঠতে। সেখানকার রিক্সা আমাদের রিক্সার চেয়ে নিচু ও কমদামী ছিলো। আমি ও ইকবাল এক রিক্সায় বসেছিলাম। রিক্সাগুলিতে বেল ছিল না। বেলের পরিবর্তে হাত দিয়ে প্লাস্টিক ও রাবারের ভেপু বাজিয়ে রিক্সা চালাচ্ছিল সহজ সরল রিক্সাওয়ালারা ফুল প্যান্ট পরে। তখন আমাদের দেশের রিক্সাওয়ালারাগন লুঙ্গী পরে রিক্সা চালাতেন। বাসে উঠানো হলো গুনেগুনে। বাস চলছিল গ্রুত বেগে বীরগঞ্জের দিকে। বীরগঞ্জ ডিস্ট্রিক্ট শহরে ছিল আমাদের সম্মেলন। ওখানে থাকতে হবে দুই রাত। শহীদুল্লাহ ভাইকে দেখলাম কিছুক্ষণ পরপর ডাইরিতে লিখে রাখছেন ভ্রমণ কাহিনী। তিনি বললেন “এটা আমার অভ্যাস। আমি কোথাও ভ্রমণ করলে ডাইরিতে লিখে রাখি। ” মাঝে কোন পয়েন্ট বাদ পড়েছে কিনা আমার কাছ থেকে জেনে নিতেন। তার ভ্রমণ ডাইরি পড়ে এই স্মৃতিচারণ লিখতে পারলে আমার লিখা হয়তো আপনার কাছে ভালো লাগতো। সেই ডাইরি লিখলাম আমি ২০১৯ সনে ফেব্রুয়ারি মাসে, ২০ বছর পর। নেপাল ভ্রমণ ছিল খুব সম্ভব ৩ থেকে ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত। আর আজ ফেব্রুয়ারির ৩ তারিখ। শহীদুল্লাহ ভাইর ডাইরি যদি পত্রিকায় ছাপিয়ে থাকেন তা হলে অনেকেই পড়েছেন। জানিনা আমার এই ২০ বছর পর ভ্রমণ কাহিনী কারো ভালো লাগবে কিনা।

অন্ধকার রাতে নেপালের ভিতর দিয়ে বীরগঞ্জের উদ্যেশ্যে বাস চলছিল। বাচ্চাদের মধ্যে কোন ক্লান্তি দেখলাম না। তারা হেসে খেলে গেয়ে যাচ্চছিল। একসময় এক নদীর উপর দিয়ে ব্রিজ পাড়ি দিচ্ছিলাম রাতে। ঠিক যমুনার বংগবন্ধু ব্রীজের মতোই লাগছিল। খোজ নিয়ে জানলাম যে নেপালের এই ব্রীজ বাংলাদেশের ব্রীজের চেয়েও লম্বা। নিজের গর্ব একটু কমে গেলো। ব্রীজ পাড় হবার পর আমাদের বাস অন্ধকারের মধ্যে একটু থামলো। কয়েকজন পুরুষ যাত্রী নেমে ইটা ক্ষেতে প্রশ্রাব করে এলেন। ডাক্তার মানুষ হয়ে ইটা ক্ষেতে প্রশ্রাব করাটা আমার কাছে বেমানান মনে হলো। শীতের রাত। কি জানি, ডায়াবেটিস রুগীও হতে পারে। মনে পড়লো ছোট বেলা স্কুলে যাওয়া আসার পথে প্রশ্রাব বেশী চাপ হলে এমনি ইটা ক্ষেতে প্রশ্রাব করতাম। ঢিলা কুলুপ করতাম ইটা দিয়ে। টিসু পেপার পাওয়ার পর থেকে এখন আর ঢিলা কুলুপ করতে হয় না। বাস আবার অন্ধকারে থামলো। এবার দেখলাম কয়েকজন মহিলাযাত্রী নামলেন। উদ্যেশ্য আগের মতোই। ভাবলাম, ফ্যামিলি না নিয়ে এসে ভালোই করেছি। যাত্রীরা বাসে উঠার পর আবার বাস চললো বীরগঞ্জের দিকে। ভোর তিনটা কি চারটার সময় আমরস পৌঁছে গেলাম বীরগঞ্জ নির্ধারিত হোটেলে। হোটেলে ডাব্লুভাই আমাদেরকে রিসিভ করে নির্ধারিত রুমে ঢুকালেন। হোটেল দেখে আমাদের পছন্দ হলো না। ডাব্লু ভাই বুঝালেন যে এটা জেলাশহর। এখানে পর্যাপ্ত ভালো হোটেল নেই। এতোগুলি প্রতিনিধি একসাথে আসাতে তারা ভালো হোটেল বন্দোবস্ত করতে পারে নাই। আমাদের প্যাকেজের মধ্যে ছিল ঢাকা টু বীরগঞ্জ ৭,৫০০ টাকা। আমরা বাকী জার্নি ও থাকা অতিরিক্ত টাকায় এরাঞ্জ করবো। আমরা নতুন করে প্যাকেজ করে নেপালে দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করব। একটু ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম করুন। নাস্তা করে সকাল ১০টার আগে আমরা অডিটরিয়ামে যাবো সম্মেলনে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী গিরিজা প্রসাদ কৈরালা আসবেন প্রধান অতিথি হয়ে। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী প্রবেশের আগে আমাদের প্রবেশ করতে হবে। ”

তাই করলাম লিডারের নির্দেশক্রমে। নেপাল মেডিকেল এসোসিয়েশন-এর বার্ষিক সম্মেলনের ইনওগুরাল সেশন হলো প্রধান অতিথি কৈরালা ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে। প্রফেশনাল উপস্থাপক দিয়ে অনুষ্ঠান সঞ্চারিত হচ্ছিল। খুবই মনোজ্ঞ ছিল সেই অনুষ্ঠান। ইনওগুরাল সেশন শেষ করে যখন কৈরালা চলে যাচ্ছিলেন তখন আমি ও ইকবাল ওথ পেতেছিলাম প্রধানমন্ত্রীর সাথে ক্যামেরাবন্দী হতে। তখন ডিজিটাল ক্যামেরা ছিল না। এনালগ ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুললে এক ক্লিকে একটা করে ছবির রিল করচ হয়ে যেতো। তাই হিসাব করে ক্লিক করতে হতো। আমি তোললাম ইকবালকে, ইকবাল তোললো আমাকে। আমি পারলাম ইকবাল সহ কৈরালাকে ক্যামেরাবন্দী করতে, কিন্তু ইকবাল পারলো না। সে শুধু মন্ত্রীকেই বন্দী করলো। আমাকেসহ ধরতে পারলো না। অবশ্য এটা তখন দেখি নি। বাংলাদেশে এসে ছবি প্রিন্ট করার পর দেখলাম। কৈরালার আরেকটা পরিচয় ছিল। তিনি ছিলেন বলিউড নায়িকা মনিষা কৈরালার বাবা। এখনকার ছেলেপেলেরা মনিষাকে চিনবে না।

কিছুক্ষণ অনুষ্ঠান উপভোগ করে লাঞ্চ করে রুমে ফিরে এলাম। কিছুক্ষণ ঘুমালাম। রাতে এক মনোজ্ঞ বিচিত্রানুষ্ঠান হলো। নেপালি ফোক গান, ফোক ডাঞ্চ ও হিন্দি ফিল্মিগানে ভরপুর ছিল সেই অনুষ্ঠান। গভীর রাতে ছিল ককটেল পার্টি। এব্যাপারে আমি একটু বোকা সোকা মানুষ। যাহোক, আমি না বুঝেই ইকবালের সাথে ককটেল পার্টিতে গেলাম। দেখে আসি ককটেল পার্টি কেমন। দেখলাম একটা মাঠের মাঝখানে শুকনা কাঠের ডুম দিয়ে আগুনের কুণ্ডু জ্বালিয়েছে। সেই কুন্ডুর চারিদিকে পার্টির ছেলেমেয়েরা ডাঞ্চ করছে আর মোটা বোতল থেকে পান করছে। আমার বুঝতে অসুবিধে হলো না যে এগুলি এলকোহল বা মদ। সামনের মঞ্চে টেবিলে নানাব্রান্ডের মদের বোতল সাজিয়ে রাখা ছিলো। অনেকেই নিয়ে গ্লাসে কোল্ড ড্রিংসের সাথে মিশিয়ে পাতলা করে খাচ্ছিলো। ইকবাল বললো “চল এক বোতল করে কোল্ড ড্রিংস নিয়ে আসি।” আমি বললাম “কোন ড্রিংসই আমার দরকার নাই।” ইকবাল টেবিল থেকে দুই বোতল পেপসি কোলা নিয়ে এলো। একটা খুলে সে পান করলো। আমাকে একটা সাদলো। আমি বললাম “আমি কিছুই খাবনা এখানে। ” আমি ও ইকবাল একটু দূরে সরে গেলাম। কিছুক্ষণ পর কয়েকজন মিলে হেটে চলে এলাম হোটেলে। কারন, অত রাতে রিক্সা পাওয়া গেলো না। পথে দুইজন সাথী মাতালের মতো করে হাটছিলেন। সন্দেহ হলো খেয়েছেন কিনা। একজন বললেন “দেখোতো আমি মাতালের অভিনয় করতে পারি কিনা। ” শুনে আরেকজনও বললেন “দেখোতো আমি মাতালের মতো করতে পারি কিনা।” গোপনসুত্রে জানতে পাড়লাম তারা আসলেই মাতাল ছিলেন, অভিনয় নয়। মাগনা মাগনা পেয়েছিলেন তো, একটু বেশিই খেয়েছিলেন। পরের একদিন একরাত্রি বীরগঞ্জে থেকে আমাদের সকালে যেতে হবে নেপাল ন্যাশনাল পার্কে নেপাল মেডিকেল এসোসিয়েশন-এর সাথে পিকনিক করতে। কিন্তু মীর্জা স্যার বললেন যে “আমার পার্কে ভালো লাগবে না। বরং নেপালের পাবলিক বাসে করে চলে যাই পোখরা টুরিস্ট স্পটে। কারন ন্যাশনাল পার্ক থেকে শেষে আমাদেরকে পোখরায়ই নিয়ে যাওয়া হবে। সকাল ৬ টার বাসে আমি, ইকবাল, মীর্জা স্যার ও সাইদুল ইসলাম স্যার বাস যোগে রওনা দিলাম নেপালের সাধারণ যাত্রীদের সাথে। স্যার আমাদেরকে সাবধান করে দিলেন বিদেশীদের সাথে বেশী কথা না বলতে। বাসেও বেশী কথা না বলতে। আমি বাসের যাত্রীদেরকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলাম আর আমাদের দেশের মানুষের সাথে তুলনা করছিলাম। যেতে যেতে জানালা দিয়ে নেপালের গ্রাম দেখছিলাম। আর দেখছিলাম গ্রামের সরল মানুষগুলি। দেখছিলাম পাহাড়ের ধারে ধারে ঝুম চাষ। কিছু কিছু পাহাড় আমাদের সখিপুরের পাহাড়ের মতোই মনে হচ্ছিল। পাহাড়ের উপরের গাছগাছড়ার উপর দিয়ে বরফের আচ্ছাদন পড়ে চকচক করছিলো। পাহাড়ের ধার দিয়ে অসংখ্য ঝরনা দেখলাম প্রবাহিত হতে। কি সচ্ছ তার পানি! কিশোর বয়সের ছেলেরা ছোট ছোট বল নিয়ে এক ধরনের খেলা খেলছিলো সারা রাস্তায় দেখা গেলো। শুধু পা দিয়ে নানান কসরতে বলটাকে শুন্যে ছুড়ে মারা খেলা। তাতে তাদের শরীর গরম হচ্ছিল মনে হয়। কিশোরীরা খেলছিলো কুতকুত। আকাশ কুয়াশায় ঢাকা ছিলো। সুর্যের মুখ দেখা গেলো না সারাদিন। অনেক কিশোর ও যুবককে দেখলাম হাতের তালুতে তামাক ডলে ডলে মুখে দিয়ে চিবাচ্ছিলো। । কিন্তু তারা ধুমপান কম করছিলো। আমার পাশে এক অল্প বয়সের ছেলে বসেছিলো। দেখলাম সে বাঙালী। বাড়ী ভারতের শিলিগুড়িতে। ব্যবসার প্রয়োজনে তাকে প্রায়ই নেপালে যাতায়াত করতে হতো। ভারতের সাথে নেপালের ভিসার প্রয়োজন পড়তো না। তার সাথে অনেক কথা হলো। ভালোই লাগলো কথা বলে। খুব বুদ্ধিমান মনে হলো। একসময় তাকে জিজ্ঞেস করলাম “আমাদের বাংলাদেশের কারো নাম তুমি বলতে পারবে?”
– বলতে পারছি না।
– কোন গানের শিল্পীর নাম?
– তাও না।
– তুমি লেখাপড়া করেছো কতদূর?
– ক্লাস নাইন।
– আমাদের দেশের কোন লেখকের নাম জানো?
– ম্মম্ম, একজনের নাম মনে পড়ছে।
– কি নাম তার?
– নাছরিন হবে।
– কি নাম?
– নাছরিন।
– নাছরিন আবার কে? আমি তো নাছরিনকেই চিনছি না। ও, তসলিমা নাছরিন?
– ইয়েস, ইয়েস।
– তছলিমা নাছরিন আপা আমার একবছরের সিনিয়র ডাক্তার। একই মেডিকেল কলেজে পড়েছি। চিনতে পেরেছি। তুমি তার বই পড়েছো?
– একটা পড়েছি।
– আমি একটাও পড়ি নি।

এইভাবে ছেলেটির সাথে অনেক আলাপ হলো।

সেই সকাল ৬টায় বাস ছেড়েছিল বীরগঞ্জ থেকে। বিকাল ৬টা বেজে গেলো পোখরা শহরে পৌছতে। বাস শহরে প্রবেশ করা মাত্র চার/পাচজন স্মার্ট লোক উঠে পরল। বাসে খালি সীট ছিল না। তারা রডে ধরে দাঁড়িয়ে যচ্ছিল। কিছুক্ষণ আমাদের কথাবার্তা শুনার পর তারা বুঝে নিলো আমরা বাংলাদেশী। একজন আমাকে বললো
– দাদারা বুঝি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন?
(ইকবাল আমাকে চোখ টিপ দিয়ে লোকটির সাথে কথা না বলার ইংগিত দিলো। বুঝালো লোকটি হোটেলের দালাল। কারন আমরা দুইজনই ময়মনসিংহ থাকি। চেহারা দেখেই দালাল চিনতে পারি)
আমি বললাম
– জি।
– বাংলাদেশের কোন এলাকায় থাকেন, দাদারা?
– ময়মনসিংহ। ময়মনসিংহের নাম শুনেছেন?
– চিনবো না মানে? আমাদের বাড়ী কুশোরগঞ্জে ছিলো। অনেকদিন হয় নেপালে থাকি।
– নেপালে কি করেন?
– আমাদের হোটেলের ব্যবসা আছে। আপনাদের হোটেল বুক করা আছে? না থাকলে আমাদেরটায় ওঠতে পারেন। দেশের মেহমান।
– আমাদের হোটেল ঠিক করা আছে। ধন্যবাদ।

অবশেষে সন্ধার সময় পৌছলাম পোখরায় পর্যটন এলাকায়। একজন কিশোর গাইড এগিয়ে এলো আমাদের হেল্প করতে। বললো
– আমি গাইডের কাজ করি। আমি আপনাদের সব ধরনের কাজে হেল্প করব। এখানে ভালো ভালো হোটেল আছে। কয়েকটা দেখেন। যেটা আপনার পছন্দ হয় সেটাতেই উঠেন। ”

আমি ও ইকবাল ব্যাগেজ নিয়ে দাঁড়ালাম একটা যায়গায়। মীর্জা স্যার ও সাইদুল ইসলাম স্যার গিয়ে হোটেল সীট ভাড়া করলেন। সকাল ৬টায় তাড়াহুড়ো করে রওনা দেয়ায় সকালের টয়লেটের কাজটি আমার বকেয়া ছিল। হোটেলের ফর্মালিটির ধৈর্য আমার সহ্য হচ্ছিল না। আমি গেলাম টয়লেটের দিকে। টয়লেটে গিয়ে দেখি পাইপে পানি নেই। হোটেল বয়ের কাছে একটা পট চাইলাম। সে বলল “পট দিয়া কিয়া করতা হায়?” আমি রেগে গিয়ে বলে ফেললাম “আমার ইয়ে ধোতা হায়।” ছেলেটি আমার ভাষা বুঝলো কিনা জানি না। তবে হাত দিয়ে যে অংগভংগি করেছিলাম তাতেই সে পট কি তা বুঝে নিলো। আমি নেপালি ভাষা বলতেও পারতাম না বুঝতেও পারতাম। বাংলাভাষাটাকে একটু বিকৃত করে তার সাথে হায় লাগিয়ে হিন্দি ও নেপালি ভাষা বলার চেষ্টা করতাম। শুনে ইকবাল হাসতো।

রাতে ভালো করে ঘুমালাম। সকালে নাস্তা খোথায় করবো জিজ্ঞেস করলে হোটেলের রিসেপসনিষ্ট একটা রেস্টুরেন্ট-এর নাম বলে তার পরিচয় দিয়ে খেতে বললো। আমরা মনে করলাম লোকটি ঐ রেস্টুরেন্ট থেকে দালালি নিবে তাই অন্য রেষ্টুরেন্টে খেলাম। বড় রেষ্টুরেন্টের খাবার ভালো লাগেনা অজুহাত নিয়ে ছোট রেস্টুরেন্ট-এ গেলাম লাঞ্চে। গিয়ে দেখি বড় বড় স্যাররাও গোপনে এসেছেন গরীবানা রেস্টুরেন্ট-এ। দেখা হলে বললেন যে এই ছোট চালের ভাত ও ডিম সব্জিই খেতে বেশী ভালো লাগে। এইসব রেস্টুরেন্ট-এর ভাত একদম অরিজিনাল চাউলের। সেদেশে তখনো হাব্রিড ধান আবাদ শুরু হয়নি। একজন গাইডকে নিয়ে আমি ও ইকবাল সারাদিন বেড়ালাম পোখরায়। দেখলাম ডেভিল ফল, মাহেন্দ্র কেইভ, লেক, টেম্পল ইত্যাদি। ডেভিল ফল-এ দেখলাম অনেক গভীরে কুয়ায় পানি পরছে ছরছরিয়ে। মাহেন্দ্র কেইভ হলো গভীর এক শুকনা কুয়া। নামতে নামতে অনেক নিচে নেমে গেলাম। এর শেষ দেখার জন্য নামতেই থাকলাম। মনে হলো ৩০/৪০ ফুট গর্তে নেমে গেলাম। একসময় ভয় পেয়ে গেলাম। নামছি তো, আবার উঠতে পারব কিনা! অবশেষে পৌছে গেলাম কুয়ার তলায়। দেখলাম এক লোক সেখানে বসে ঠাকুরকে পুঁজো দিচ্ছে। এই গুহাবাসীর প্রতি আমার মায়া হলো। ঘুরে ঘুরে রাতে শহর দেখলাম। ফিরে এলাম হোটেল এরিয়ায়। আমাদের হোটেলের পাশের বড় এক হোটেলের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলাম। মিউজিক আমাকে আকৃষ্ট করলে। একটু ভিতরে গেলাম। দেখলাম আগুনের কুন্ডুর চারিদিকে বিদেশী ছেলে মেয়েরা বোতল হাতে নিয়ে মিউজিকের তালে তালে ডাঞ্চ করছে। এটা আমার জায়গা না মনে করে পিছিয়ে এলাম। হোটেল কাউন্টারে চাবি নিতে গেলে তারা বুঝালেন যে আমরা যদি হিমালয় পর্বত দেখতে চাই তাহলে খুব ভোরে উঠে টেক্সি করে যেতে হবে প্রায় ৬ কিলোমিটার পথ। রাজি থাকলে বুকিং দিয়ে রাখলে তারাই ডেকে দিবেন ভোরে। বুকিং দিলাম।

ভোরে টেক্সি করে চলে গেলাম সেই স্পটে হিমালয় দেখার জন্য। স্পটটার নাম স্মরনকোট। হেটে পাহাড় বেয়ে বেয়ে সেই স্পটের উপর উঠলাম। হিমালয়ের দিকে তাকালাম। গাইড দেখালেন হিমালয় “ঐ যে হিমালয় দেখা যাচ্ছে মাছের পিছার মতো। ওটাকে বলা হচ্ছে মচ্ছিকা পুচ্ছ। ” হিমালয় বরফে ঢাকা ছিলো। মাছের মতোই চকচক করছিলো সুর্যের আলো পড়ে। কিছুক্ষণ পর হিমালয়ের পিছন থেকে সুর্য উকি দিয়ে উঠলো। অপুর্ব সুন্দর লাগছিলো। নানান দেশের নানান ধরনের পর্যটক এসেছিলো সেখানে। তাদের সাথে ছবি তোললাম। মীর্জা স্যার ও সাইদুল ইসলাম স্যার কোরিয়ান পর্যটকদের সাথে খাতির দিলো। সাইদুল স্যারকে কিছুটা কোরিয়ানদের মতো দেখাচ্ছিলো। মীর্জা স্যার তাদের খাবার থেকে কি যেন নিয়ে কচকচিয়ে চিবালেন। কিছুক্ষণ পর আড়ালে গিয়ে বমি করতে চেষ্টা করলেন। কানে কানে বললেন “ওরা আমাকে চান্দা মাছের শুঁটকি খাওয়াছে। এটা যে ভাজি করে নাই, আমি তা জানতাম না। বিস্রি, দুর্ঘন্ধ। বমি আসছে। ওয়া, ওয়া। ” হিমালয় দেখে ফিরে এলাম।

পরেরদিন আমরা সবাই একসাথে চলে গেলাম কাঠমান্ডুতে। কাঠমান্ডু শহরের কাছে পৌছতে বেশী সময় লাগে নি। কিন্তু শহরে প্রবেশ করতে অনেক সময় লেগেছিল। ইয়া বড় বড় পর্বত পেরিয়ে যেতে হয়েছিলো। খাড়া পর্বত বেয়ে বাস উপর দিকে উঠছিল আর নামছিলো। নিচের দিকে তাকালে ভয় লাগতো। একবার চাকা ফসকে পড়ে গেলে বাসের সাথে ছাতু হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো। শক্ত সুঠামদেহী দুইজন করে ড্রাইভার ছিল প্রতিটি বাসে। একজন চালাচ্ছিল আরেকজন সাথে বসা ছিলো। অবশেষে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে পৌছলাম। ফাইফ স্টার হোটেলে উঠলাম। আমার রুমমেট হলেন ডাঃ জুয়েল ভাই। তিনি আমার থেকে ৪ বছরের সিনিয়র ছিলেন। ছাত্রজীবনে দেখেছি তিনি কহিনুর আপার সাথে জুটিবেধে ঘুড়াফিরা করতেন। তারা স্বামী-স্ত্রী। তবে ছাত্রজীবন থেকেই স্বামী -স্ত্রী ছিলেন কিনা জানি না। জুয়েল ভাইকে আমার কাছে গুন্ডা গুন্ডা মনে হতো দেখতে। কেমন সিনা টান পেরে হাটতেন। মনে করতাম জোড় করেই হয়তো কহিনুর আপাকে ভালোবাসেন। আপা ঢাকায় বিএমএ অফিস পর্যন্ত এসেছিলেন জুয়েল ভাইকে বিদায় দিতে। আপা বলছিলেন “এই যে, আমার হাজব্যান্ডকে পাঠালাম। একটু দেখে শুনে রাখবেন।” শুনে আমার মনে হচ্ছিল আপা জুয়েল ভাইকে একা জার্নিতে দিতে সন্দেহ করছিলেন। কিন্তু নেপাল ভ্রমণে গিয়ে সেই ভুল ভাংলো। জুয়েলভাই সারা জার্নিতে বমি করতে করতে গেলেন। তিনি আমার সামনের সীটে বসেছিলেন। বমি করার জন্য তিনি সর্বদা জানালা খোলা রাখতেন। শীতের বাতাস ঢুকতো বাসে। সবার কষ্ট হতো তাতে। কহিনুর আপা হয়তো এটাই বুঝাতে চেয়েছিলেন। তাই, ভাইকে আমাদের দায়িত্ব ছিল দেখে রাখার। জুয়েল ভাইকে লক্ষ করলাম তিনি এত অসুস্থতার মধ্যেও মাত্র একটা কমলা খেয়ে হলেও রোজা রেখেছেন। আমার দৃষ্টিতে জুয়েলভাই খুবই ভালো মানুষ এবং ধার্মিক।

ভ্রমণ করা হলো সারা কাঠমান্ডু শহরে গাইড নিয়ে। টুরিস্ট বাসে করে রাজপথ দিয়ে ভ্রমণ করছিলাম। আমার সামনে এক ভাই-ভাবী বসেছিলেন তাদের ৪/৫ বছরের ছেলেকে নিয়ে। রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল ঘোড়া, ঘোড়ার গাড়ী ও মহিষের গাড়ী। বাচ্চাটি মহিষ দেখে ইন্টারেস্ট পেলো। তার মাকে বললো “আম্মু, দেখো, কত ভোটকা গরু।” মহিষ দেখতে প্রায় গরুর মতো। তবে মহিষের পেটটা গরুর পেটের চেয়ে বেশ প্রশস্ত, মানে ভোটকা। বাচ্চাটি হয়ত গরু চিনে, কিন্তু মহিষ চিনে না। তার মাও হয়ত মহিষ চিনেন না। মা-বাবা ছেলের এই ভুল শুদ্ধ করে না দিয়ে চুইংগাম চিবাচ্ছিলেন। আমি মনে করলাম আমিই ভুল শুধ্রিয়ে দেই। কিন্তু ভাবলাম থাক কি দরকার আছে বাচ্চাটাকে মহিষ গরু বিশেষজ্ঞ বানিয়ে? আমরা অনেক বড় বড় মন্দির দেখলাম। সেসব মন্দিরের আশে পাশে প্রচুর হনুমান দেখতে পেলাম। স্বশানঘাট দেখলাম। দেখলাম হনুমান ঢোকা নামে একটা দর্শনীয় স্থান। হনুমান ঢোকায় একটা বিরাট ঘর আছে যেটার বৈশিষ্ট্য হলো সেটা একটা মাত্র গাছের কাঠ দিয়ে সব কিছু নির্মাণ করা হয়েছিল। দেখতেও সেটা অনেক সুন্দর।

এটার পাশে হলো জীবন্ত দেবীর বাসস্থান। গাইডের কাছ থেকে শুনলাম মানুষের মধ্য থেকে একজন মেয়েকে দেবী বানিয়ে পুঁজা করা হয়। এই দেবীর বৈশিষ্ট্য হলো এঁর জন্ম হতে হবে বৌদ্ধ পরিবারে। নাবালিকা হতে হবে। সাবালিকা হবার সাথে সাথে দেবীত্ব চলে যাবে। একবার দেবী হলে বাকী জীবনে তাকে কেউ বিয়ে করতে পারবে না। কারন, তিনি মানুষের উর্ধে। কঠিন পরীক্ষার মাধ্যমে দেবী নির্বাচন করা হয়। একটা অন্ধকার ঘরে নানা ভয় ভীতি দেখানো হয় শিশুটিকে। যে শিশুটি এই ভয় অতিক্রম করতে পারে সেই বিজয়ী হয় দেবী হবার জন্যে। দেবী সব সময় তার মাকে নিয়ে এই ঘরের দোতলায় অবস্থান করেন। বছরে একবার নিচে নেমে আসেন রাজার জন্মদিনে রাজার প্রণাম গ্রহণ করার জন্য। প্রতিদিন দুপুরে গোসলের পর একবার দেবী দোতলায় বারান্দায় এসে দাঁড়ান দর্শনার্থীদেরকে দেখা দেয়ার জন্য। আমরা তাকে দেখার সময় পেলাম না। শুনে দেবীর জন্য আমার মায়া হলো। চলে আসার সময় ৫ রুপি দিয়ে দেবীর একটা ছবি কিনে এনেছিলাম আমার মেয়েদেরকে দেখানোর জন্যে।

রাতে শপিং করতে গেলাম বিশাল মার্কেটে। কিছু কসমেটিক্স কিনলাম। কেউ কেউ হরিনের শিং, নেপালি স্পেশাল চাকু ইত্যাদি কিনলেন। দোকানে দামাদামি করে জিনিস কিনলে কিছু কমে কেনা যেতো। মেজবা স্যারকে দেখলাম দামাদামি না করেই কিনে ফেলছেন। যুক্তি দেখালেন যে দামাদামি করলে যে সময় নষ্ট হবে সে সময়ে অন্যকাজ করা যাবে। তিনি নাকি ময়মনসিংহ মাইছা বাজারে গিয়েও দামাদামি না করে বড় বড় মাছ কিনে ফেলতেন। মাছ কেনায় দেরী না করে তিনি অপারেশনে চলে যেতেন। নেপাল গিয়ে দেখলাম নেপালি পুরুষরা প্রায় সবাই নেপালি টুপি পরে। আমার প্রিয় গণসংগীত শিল্পী ভুপেন হাজারিও সব সময় নেপালি টুপি পরতেন। শিল্পী মারা যাবার পর তার ভাবীর সাক্ষাতকার পড়ে জেনেছি এই টুপি ভুপেনের নেপালি বন্ধু নেপাল ভ্রমনে গেলে শিল্পীকে উপহার দিয়েছিলেন। সেই থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় ৫৩ বছর নিয়মিত মাতায় সেই নেপালি টুপিটি রেখেছেন। আমিও একটি নেপালি টুপি কিনলাম। সবসময় মাথায় রাখলাম জার্নিতে। পরদিন টুরিস্ট বাসে করে ঘুড়তেছিলাম। এক জায়গায় গেলে ইফতারের সময় হলো। গাড়ী থেকে নেমে কমলা কিনে কমলার রস খেয়ে ইফতার করলাম।

কমলা বিক্রেতা রাস্তায় বসে কমলা বিক্রি করছিলেন। লম্বা দাড়ি ও মাথায় সাদা গোল টুপি ছিল তার। বাংলাদেশি মুন্সীর মতো মনে হচ্ছিল। তিনি আমাকে ইফতার করতে দেখে বললেন “আপনি ইফতার করছেন। তার মানে আপনি মুসলিম। কিন্তু মাতায় হিন্দু টুপি পড়েছেন। মুসলিমরা এই টুপি পরে না। ” কথাগুলি তিনি নেপালি ভাষায় বলছিলেন। কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম। ভাংগা ভাংগা ভাষায় অনেক আলাপ হলো। আসে পাসে তার ছোট ছোট বাচ্চারা খেলছিলো। আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন তাদেরকে। তারা সালাম দিলো শুদ্ধ আরবীতে। আমি তদেরকে কোরআন থেকে সুরা বলতে বললাম। তারা মুখস্থ সুরা তেলাওয়াত করলো। আমি বললাম “গত ১০ দিনে একটা মসজিদও দেখলাম না। আপনারা নামাজ কোথায় পড়েন?” তিনি অনেক দূরে একটা পাহাড়ের চুড়ায় মসজিদ দেখিয়ে বললেন “ঐ যে আমাদের মসজিদ। ওখানেই আছে মাদ্রাসা। ওখানেই আমাদের বাড়ী।” গাড়ীতে ওঠার জন্য ডাক পড়লো। উঠে পড়লাম গাড়িতে।

গত ১০ দিন নেপাল ভ্রমণে আর কোন মসজিদ দেখি নাই। আযানের সুর শুনি নাই। মনটা দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য আনচান করলো। ডাঃ শহিদুল্লাহ ভাইকে দেখেছি, যে স্পটেই নেমেছেন প্রথম কাজই ছিলো ময়মনসিংহ বাসায় মায়ের কাছে টেলিফোন করা। আইএসডি কল প্রতিমিনিটে খুব সম্ভব ৩০ টাকা ছিলো। তিনি প্রতিবার ৪/৫ মিনিট কথা বলতেন মায়ের সাথে। বেশী সময়ই শুধু মাকে ডাকতে থাকতেন “আম্মা, আম্মা বলে।” বলতেন আম্মা সবসময় টেলিফোনের কাছে বসে থাকেন, কখন আমি টেলিফোন করি নেপাল থেকে। আমি কল্পনা করলাম “আমার মা বেচে থাকলে হয়তো তিনিও এমন করতেন। ”

এবার দেশে ফেরার পালা। হোটেল থেকে চেক আউট হয়ে লাউঞ্জে বসলাম। মীর্জা স্যার, সাইদুল ইসলাম স্যার ও আরও দুইএকজন হোটেল রিসেপশনিস্ট-এর মাধ্যমে এয়ারের টিকিট করালেন। বাকী সব আগের মতোই বাসে ফেরা শুরু করলাম আগের রোডেই। এইবার বাসে ক্লান্তি এলো। বেশী সময়ই ঘুমিয়ে জার্নি করছিলাম। ইন্ডিয়ার শিলিগুড়ি এসে হোটেলে উঠলাম। কেউ কেউ দার্জিলিং গেলেন। দার্জিলিং যেতে আর আসতেই টাইম শেষ হয়ে যাবে এবং বেশ ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম, তাই, শিলিগুড়িতেই রয়ে গেলাম। সন্ধায় আমি ও ইকবাল বেরুলাম শহরে। এক দোকানীকে জিগালাম “ভাই, সস্তায় উলের গরম কাপড় কোথায় পাওয়া যায়?” দেখিয়ে দিলেন। বিরাট মার্কেট। সস্তা কিন্তু কোয়ালিটি ভালো না। কিনলাম অনেক। কিন্তু তৃপ্তি পেলাম না। ফেরার সময় এক ফার্মেসিতে বাংলাদেশি ডাক্তার পরিচয় দিয়ে উলের কাপড় ভালো কোথায় পাওয়া যায় জিজ্ঞেস করাতে তিনি যেটা দেখিয়ে দিলেন সেটাই ছিল আসল মার্কেট। আমরা আবার ভালো কোয়ালিটির উলের কাপড় চোপড় কিনলাম। গভীর রাতে দার্জিলিংওয়ালারা ফিরে এসে তাদের কষ্টের কথা জানালেন। শুনে মনে হলো না গিয়ে ভালোই করেছিলাম।

পরদিন সকালে হোটেল থেকে রওনা দিলাম। ৯ টা বেজে গেলো। সবাই বের হয়ে সারে নি। আমার পেট ক্ষুধায় চো চো করছিল। ফুটপাথে দোকানে ঝুলানো একটা রুটিতে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলাম “এটার দাম কত?” দোকানী আমার সাথে খারাপ কথা বললেন খাবারে হাত লাগিয়েছি বলে। ওটা নাকি অশুচ হয়ে গেছে। মন খারাপ করে সরে পড়লাম। একটা শিক্ষিত ছেলে নোংরা জামা পরে সামনে দাঁড়ানো ছিলো। জিগালাম “এখানে নাস্তা করার রেস্টুরেন্ট আছে?” সে বললো “আছে। আসেন।” আমি তার সাথে চলে গেলাম অনেকদূর। ক্ষুধার তারনায় তার সাথে যেতে থাকলাম একটা বাজারের অলিগলি ও দোকানের চিপা দিয়ে নির্জন স্থানে। হঠাৎ মনে হলো আমার পকেটে অনেক ডলার আছে। বিপদের চরম ঠিকানায় পৌছে গেছি। আমাকে ১০ টুকরা করে ফেললেও কেউ জানবে না। আমার গতি কমিয়ে দিয়ে ১৫/১৬ হাত দুরুত্ব সৃষ্টি করে পিছনের দিকে দিলাম দৌড়। হাপাতে হাপাতে চলে এলাম বাসের কাছে। উঠে পড়লাম বাসে। এই বোকামির কথা কাউকে বলি নাই।

ফিরে আসছিলাম বাসে চড়ে। রাতে এমন শীত লাগা শুরু হলো যে পা ঝুলিয়ে রাখতে পারছিলাম। পায়ের ভিতর চিবাতে লাগলো। শরীর কাপতে লাগলো। বাসের সবাই চুপ্টি মেরে বসেছিলো। মনে হচ্ছিল আজ সবাই বাসের ভিতরেই ঠান্ডায় রক্ত জমাট বেধে মারা যাবো। দেশে এসে জেনেছি সেদিন শিলিগুড়ির তাপমাত্রা জিরো ডিগ্রী ছিল। আল্লাহ বাচিয়েছেন। গভীর রাতে হিন্দিতে ওয়াজ শুনতে পেলাম বাসে বসে কোন এক মাহফিল থেকে। মনে হলো দেশের কাছাকাছি এসে গেছি। ওয়াজের দেশের মানুষ তো! সকালের দিকে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করছিলাম। বিজিবি খুব ভালোভাবে চেক করছিলেন। একটি প্রকোষ্ঠে নিয়ে একজন একজন করে চেক করা হচ্ছিল। বের হবার সময় সবার মুখ কালো দেখলাম। দুশ্চিন্তা হলো। সাথে ডলার ছিলো আমার। রেখে দেয় কিনা? ভয়ে ভয়ে প্রবেশ করলাম। বিজিবি বললেন “আপনারা ডাক্তার মানুষ। অনেক টাকা আছে আপনাদের। আমরা ছোট চাকরি করি। বউ বাচ্চা রেখে বর্ডারে পড়ে থাকি। পারলে ৫০ টি টাকা দেন।” আমি খুশী হয়ে তার হাতে ২০০ টাকা দিলাম। তিনি আমাকে ধন্যবাদ দিলেন। চলে এলাম বাংলাদেশে। আমার দেশে। লম্বা নিশ্বাস নিলাম।

এবার শুরু হলো কত তাড়াতাড়ি বাড়ী ফেরা যায়। এই ১০ দিনের জার্নিতে শরীর কাবু হয়ে গেছে। বাসায় গেলেই বাচি। রংপুর পাড়ি দিলে গাড়ী থামিয়ে দিলো এক পরিবহণ বড় ভাই নেতা। নেতা একটা চেয়ার নিয়ে গগলস চোখে পা ছড়িয়ে ভুড়ি ভাসিয়ে বসে আছেন। তার নির্দেশ আজ এই রোডে কোন বাস চলবে না। আমাদের বাস তো পর্যটনের বাস। এটার কি হবে কেউ সিদ্ধান্ত দিতে পারছিলেন না। কয়েকঘন্টা কেটে গেলো ডিসি এসপিদের সাথে যোগাযোগ করতে। অবশেষে বাস ছেড়ে দিলেন বড় ভাই। চলতে চলতে বগুড়া পাড় হলাম। এখন সমস্যা হলো ঢাকার যাত্রী ভাউয়েরা চাচ্ছেন গাড়ী টাংগাইল হয়ে সোজা চলে যাবে ঢাকা। আমাদেরকে ফেলে যাবেন এলেংগায়। ময়মনসিংহের যাত্রীদের দাবী হলো সবাইকে ময়মনসিংহ হয়ে যেতে হবে। এতো রাত্রিতে বাস পাওয়া যাবে না। প্রথমে তর্ক তারপর ঝগড়া বেধে গেলো বাসে। এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে গেলো ঝগড়া পার্টিরা।
– ময়মনসিংহ হয়ে যাবেন
– না সোজা যাবে।
– আমাদের কথা শুনতে হবে।
– আমাদের কথা শুননে হবে।
মারাত্বক ঝগড়া। সেই জুয়েল ভাই ক্ষেপে গেলেন। এতদিন যিনি মৃত প্রায় ছিলেন বমি করতে করতে তিনি যমুনা নদীর উপর এসে পুর্ন শক্তি পেয়ে গেলেন। তাকে আবার গুন্ডা গুন্ডা মনে হচ্ছিল আমার কাছে। সাবাস জুয়েল ভাই। বাস ময়মনসিংহ দিয়ে নিয়েই ছাড়বেন। ঝগড়া করতে করতে টাংগাইল বাস স্ট্যান্ড-এ গেলে কয়েকজন ঢাকা বাসীকে বাস থেকে টেনে নামিয়ে ফেললেন ময়মনসিংহ বাসীরা। নিচে তুমুল ঝগড়া চলছিলো। আমি নিরাপদে বাসেই বসা ছিলাম। ঢাকার কেউ একজন আমাকে বললেন “আপনি ভাই মুরুব্বী মানুষ। একটু নিচে গিয়ে ঝগড়া থামান।”
– আমি মুরুব্বী হলাম কিভাবে?
– আপনি এসিস্টেন্ট প্রফেসর। আপনার কথা শুনবে।

আমি মনে মনে বললাম “আমি এসিস্টেন্ট প্রফেসর হলেই কি আমার কথা গোলন্দাজ ভাই, জুয়েল ভাই, মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকীরা কেউ শুনবে? আমার কথা ছাত্ররা শুনতে পাড়ে। এই নেতারা না।” একসময় ঝগড়া শুনে শ্রমিক ইউনিউয়নের একজন প্রস্তাব দিলেন “আমাদের হাতে একটা বাস আছে আপনারা ইচ্ছা করলে সেই বাসে ময়মনসিংহ যেতে পারেন। আংগুর ভাই রাজি হয়ে গেলেন ভাড়া করে দিতে। সেই গাড়ীতে আমরা ময়মনসিংহ এলাম। আংগুর ভাইরা কোলাকুলি করে ঝগড়া মিটিয়ে সোজা চলে গেলেন ঢাকার দিকে।

রাত প্রায় তিনটার দিকে ময়মনসিংহ পৌছলাম। মেডিকেল কলেজ কোয়ার্টারের ১১ নং বিল্ডিং-এর তিন তলায় থাকতাম। সিরিবেয়ে ব্যাগেজ নিয়ে উপরে উঠে অনেকক্ষণ কলিং বেল বাজালাম। কেউ দরজা খুললো না। বিরক্ত হয়ে দরজার কড়া নাড়লাম। কেউ শুনলো না। আমার ধারনা ছিল স্ত্রী স্বপ্না দরজা খুলে আমাকে রিসিভ করবে যেমনটি দেখেছি নাটক সিনেমায় বিদেশ থেকে এলে নায়ক নায়িকারা রিসিভ করে। কিন্তু দরজা খুলতে দেরী করায় আমার মেজাজ খারাপ হচ্ছিলো। এক সময় দরজায় লাথি দিলাম। স্বপ্না এসে দরজা খুলে দিয়ে চোখ ঘষলো। আমি বললাম “কতক্ষণ ঘরে বেল বাজাচ্ছি, শুনতে পারছো না?” স্বপ্না উত্তর দিলো “কই, একবারই তো শুনলাম। শুয়ে পড়লাম। সেহেরির জন্য উঠতে হবে। ” বলে শুতে গেলো। আমি অবাক হলাম। কোথায় সিনেমা? কোথায় নাটক? আসলে স্বপ্না দরজার শব্দ একবারই শুনেছিলো। বাকী সময় সে ঘুমিয়েছিলো, তাই শুনেনি। আমি বাথরুমের কাজ শেষ করতে ও কিছুটা গোজ গাছ করতে সেহেরির সময় হয়ে গেলো। সেহেরী খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। নামাজ কখন পড়লাম মনে নেই। উপহারগুলি ঘুমাবার আগে, না পড়ে দিয়েছিলাম এখন মনে করতে পারছি না। সেই বিশ বছর আগের কথা তো? এতো আগের সব কথা আমার মনে থাকে না। বারবার মনে পড়ছে বাসে চড়ে নেপাল গেলাম, আবার বাসে চড়ে নেপাল থেকে এলাম। কষ্টও হয়েছে, মজাও পেয়েছি।


তারিখ : ৭/২/২০১৯ ইং
স্থান: ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *