বেইলা নাচারি

বেইলা নাচারি
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আজ বেইলা নাচারির কথা মনে পড়লো। যিনি গানের সাথে নাচেন তাকে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় বলা হতো নাচারি। নাচারিরা ছেলে মানুষ হতো। সেই সময় মেয়েরা পর্দার ভিতর থাকতো। জনসমুক্ষে নাচার তো প্রশ্নই ওঠে না। নাচারিদের বয়স কম হতো। কিশোর বয়স। মেয়েলি চেহারার। এখন আমি বুঝতে পেরেছি এরা ছিল তৃতীয় লিংগের। আঞ্চলিক ভাষায় যাদের আমরা হিজরা বলি। আগের দিনে এই হিজরারাই নাচারির কাজ করতো। এরা এখন দল বেঁধে বাসে উঠে চাঁদা নেয় একরকম জোড় করেই। দোকানে দোকানে ঘুড়ে চাঁদা নেয় প্রায় জোড় করেই। না দিলে উৎপাত করে হাত তালি দিয়ে। এরা দেখতে ছেলের মতো। কিন্তু এদের শরীরের কোষে মেয়েদের কোষের আধিক্য আছে। তাই তারা মেয়েলিপনা করে। আগের দিনে হিজরা ছেলেরা নিজের পরিবারের সাথে থাকতে না পেরে জীবিকার জন্য গানের দলে যোগ দিতো। গ্রামে কয়েকজন মিলে গানের দল বাধত। গ্রামের মানুষের বিনোদনের মাধ্যম ছিল এই গানের দল। যে সব ছেলে মেয়ে সেজে গানের দলে নেচে নেচে গান করতো তাদেরকে গানের ছেরা অথবা নাচারি বলতো। যেহেতু তারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতো সেহেতু তাদের আশ্রয়স্থল ছিল এই গানের দল। দলপতি অনেক সময় বেশী দামে গানের ছেরাকে অন্য দলের কাছে বিক্রি করে দিতো। কোন কোন সময় একদল আরেক দলের ছেরাকে জোড় করে ছিনিয়ে নিয়েও যেতো। আমি যখন নাচারির গান শুনেছি তখন এমন কথা শুনেছি। নাচারিদের এমন করুণ অবস্থার কথা শুনে তাদের প্রতি আমার মায়া হতো।

বেহুলাকে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় বেইলা বা বেওলা বলা হতো। প্রাচীন বাংলার মধ্যযুগীয় মঙ্গলকাব্য মনসামঙ্গলের কাহিনীটিকে আমাদের এলাকায় বেইলা নাচারি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রাম্য দর্শক শ্রোতাদের কাছে উপজীব্য করে তুলে দিতো বেইলা নাচারির দলেরা। আমাদের তালুকদার বাড়িতে গানের আসর দেয়া নিষিদ্ধ ছিল। মেঝো দাদা মেছের উদ্দিন তালুকদার এসব ব্যাপারে খুব কড়াকড়ি ছিলেন। হাছেন কাক্কু আমাদের বাড়ির কাছ দিয়ে কাউকে ঢোল বাজিয়ে যেতে দেখলে লাঠি নিয়ে তেড়ে আসতেন। তার ভয়ে কেউ কোন গানের অনুষ্ঠানে যেতে পারতো না। গেলে খবর ছিলো। পাশের নওপাড়া বা চনপাড়ার বন্ধুরা গানের অনুষ্ঠানে যেতো। তারা গান নিয়ে গল্প করতো। আমার গানের অনুষ্ঠানে যেতে ইচ্ছে করতো। কিন্তু যেতে যে মানা ছিলো!

মনসামঙ্গলের বেহুলা ও লক্ষিন্দরের কাহিনী নিয়ে যেসব গান ছিল সেসব গান মাঠে কাজ করার সময় অনেক কৃষকই গাইতো। ছাটা কামলারা ধুয়া ধরে বেইলার গান গাইতো। বেইলার সে গানটি ছিল এইরকম
“বাসর বান্ধিলাম বান্ধিলাম
লোহার বাসরঘর, বাসর বান্ধিলাম।
সেইঘরেতে বসত করবে বেইলা লখিন্দর
বাসর বান্ধিলাম।”

ছোট্ট বেলা লোহার বাসরঘর কেমন জানতে চাইতাম মার কাছে। মা রাতে ঘুমাবার আগে আমাদের নিয়ে শুয়ে শুয়ে অনেক হাস্তর (গল্প) বলতেন। মা বেহুলাকে বেওলা বলতেন। মা আমাকে বেওলার হাস্তর শুনাতেন। মা বলতেন চাঁদ সদাগরের ছেলে লখিন্দরের সাথে বেওলার বিয়ে হয়। বেওলার বাপের নাম ছিল সাই সদাগর। চাঁদ সদাগর মনসাদেবীর পুঁজা করতো না। সে করতো শিবের পুঁজা। মনসাদেবী ছিল সাপের দেবী। সাপ তার কথা শুনতো। একবার লখিন্দরের ময়ুরে একটি সাপ মেরে ফেলেছিলো। তাতে দেবী লখিন্দরের উপর ক্ষেপে ছিলো। দেবী চাঁদ সদাগরকে শাপ দেয় যে সে চাঁদ সদাগরের সব ছেলেকে সর্প ধংসনে মেরে ফেলবে। একে একে তার পাঁচ ছেলেকে সাপে কেটে মেরে ফেলে। লখিন্দরকে রক্ষা করার জন্য লোহার এক ঘর বানায়। যাতে কোন প্রকার ছিদ্র না থাকে সাপ ঢোকার জন্য। লখিন্দর বেউলাকে বিয়ে করে সেই ঘরে থাকবে। সুতার (মিস্ত্রি) কে দেবী নির্দেশ দেয় ছিদ্র রাখতে। সুতার ছিদ্র না রাখায় তার বাড়ি ঘরে সাপের আক্রমণ করায়। অবশেষে সে রাজি হয়ে সুতানড়ি সাপ ঢোকার মতো করে একটা ছিদ্র রাখে গোপনে। বাসর রাতে সেই ছিদ্র দিয়ে সাপ ঢুকে লখিন্দরকে ধংসন করে। সাপের কামড়ে লখিন্দর মারা যায়। লখিন্দরের লাশ বেউলারে সহ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। এক সময় লাশ শুকিয়ে কংকাল হয়ে যায়। ভাসতে ভাসতে একদিন এক ঘাটে এসে ভিরে। সেখানে এক ধোপা কাপড় কাচতেছিল যে নাকি ছিল মনসাদেবীর পালক মা। ধোপার অনুরোধে বেউলা মনসাদেবীকে পুঁজা দেয়। দেবী অভিসাপ তুলে নেয়। এবং লখিন্দর জীবিত হয়ে উঠে।

আমি সাপের কথা শুনলে খুব ভয় পেতাম। মা যখন সাপের গল্প বলতেন তখন কুচিমুচি ধরে মায়ের বুকে আশ্রয় নিতাম। মাও চাইতেন আমি কুচিমুচি ধরে তার বুকে আশ্রায় নেই। তাই, প্রায়ই তিনি বেউলার গল্প শুনাতেন।

জ্যৈষ্ঠমাসের কাঠাল পাকা গরমে অতিষ্ট হয়ে বাবা রাতে উঠানের মাঝখানে জলচৌকি পেতে শুইতেন। আমিও বাবার সাথে জলচৌকিতে শুইতাম। মাথা রাখতাম বাবার বাহুর উপর। আকাশের তারা গুণতে চেষ্টা করতাম। গুণে শেষ করতে পারতাম না। বাবাকে জিজ্ঞেস করতাম “আশমানে কয়টা তারা আছে গ?” বাবা বলতেন “তারা গুইনা শেষ করা যায় না। কত গুলি তারা আছে কেউ বলতে পারে না।” কিছু কিছু তারা দ্রুত বেগে স্থানচ্যুত হয়ে হারিয়ে যেতো। বাবা বলতেন “তারা ছুইটা যায়।” আসলে সেগুলি ছিল উল্কা পিন্ড। কিছু কিছু তারার লম্বা লেজ দেখা যেতো। আসলে সেগুলি ছিল ধুমকেতু। বাবা বলতেন “আকাশে সাপা উড়ে বেড়ায়।” যে সাপ আকাশে উড়ে বেড়ায় সেগুলিকে বাবা বলতেন সাপা। কিছু তারা মিটমিট করে দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর দিকে চলে যেতো অন্ধকার আকাশে। বাবা বলতেন “ওগুলি তারা না। অনেক উপর দিয়ে উড়োজাহাজ উড়ে যায় ঢাকা থেকে চিন দেশে।” তখন আমাদের বাড়ির উপর দিয়ে বিমানের একটা রুট ছিল হয়তো। স্বাধীনতার পর এই রুটে বিমান যেতে দেখি নাই। আকাশে নানা রংগের মেঘ ভেসে বেড়াতো। আমি মেঘের ভিতর চাঁদ তারার লুকো চুরি খেলা দেখতাম। বাবা নিচু স্বরে গান গাইতেন। কখনো উচ্চারণ করে, কখনো নেনে নেনে করে। রুপভানের গান গাইতেন। গাইতেন বেইলার গান। বাবা গাইতেন
“শোন তাজেল গো
মন না জেনে প্রেমে মইজো না।”
আমি এইসবের অর্থ বুঝতাম না।
বাবা আরও গাইতেন
“দুখখ যে মনের মাঝে আনিল আমার
তারে নি ভালো বাসিবেন খোদায়।”
আমি মনে করতাম কেউ না কেউ বাবার মনে কষ্ট দিয়েছেন। বাবা তাকে অভিশাপ দিচ্ছেন। পরে জেনেছি এটা রুপভানের উক্তি। রুপভানকে কষ্ট দিয়েছিল রহিম ও তাজেল। যে রহিমকে নিয়ে বারটি বছর বনবাসে ছিল সেই রহিম রুপভানকে ছেড়ে তাজেলের প্রেমে পড়েছিল। এটা ছিল সেই দু:খ। রুপভান পালাগানের কাহিনী। বাবা গাইতেন
“কি সাপে ধংসিলো লখাইরে এ এ এ
বিধির কি হইল।”
এইটা ছিল বেইলার গান। এইটা আমি মাঠে ঘাটে অনেককেই গাইতে শুনেছি। গ্রামে বৈদ্যরা আসতো সাপখেলা দেখিয়ে ও সাপের তাবিজ বিক্রি করে চাউল নিতে। তারাও ঝাপি থেকে সাপ বের করতে করতে বিলাপের সুরে গাইতো
“কি সাপে ধংসিল লখাইরে এ এ এ
বিধির কি হই অইলো।”
গ্রামের মেয়েদের কান্নার প্রধান ধরন ছিল সুরে সুরে বিলাপ করা। তাই গানের সুরও আছে এই বিলাপের। কেউ মারা গেলে সুর করে বিলাপ করে কান্না করতো। বিলাপ করে কান্না করা আমাদের তালুকদার পরিবারে নিষিদ্ধ ছিলো। মেয়েদের কাঁদতে হতো নিরবে। বুবুর প্রথম সন্তান সহিদা এক মাস বয়সে মারা যায়। তার লাশ যখন কবর খানার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন সবাই কবরের দিকে গেলেও আমি বাইরবাড়ি বুবুর সাথে দাঁড়িয়ে ছিলাম। বুবু লাশ যাত্রার দিকে ফেল ফেল করে তাকিয়েছিলেন। আমি দেখেছি তার বুক ফিকুরে কান্না আসছিলো। কিন্তু শব্দ করে কান্না মানা ছিলো তাই কান্নায় তার বুক ফেটে যাচ্ছিল। আর বুবুর কষ্টে আমারও বুক ফেটে কান্না আসছিলো।

পাড়া প্রতিবেশী মহিলাদের দেখেছি কেউ মারা গেলে বিলাপ করে কানতে। বিলাপ করে কান্না না করলেও সমালোচনা হতো
“অমুকে মারা গেলো, কেউ কানলো না। ” কেউ কেউ নাকি বিলাপ করে কান্না করার জন্য মহিলা ভাড়া করতো। মহিলারা গালে হাত দিয়ে উঠানে বসে বিলাপ করতো
“আমার বাবা খাইল না, নইল না,
এককু ছেইড়ে মইল গো।
ও বাবা।”
তখন কলেরা হয়ে অনেক লোক মারা যেতো। কলেরায় প্রচুর পাতলা পায়খানা হতো। একবার দুইবার পায়খানা হয়ে পানিশুন্যতা হয়ে মারা যেতো। পাতলা পায়খানাকে আঞ্চলিক ভাষায় ছেইড় বলা হতো। বিলাপের সময় যার বাবা মারা যেতো সে বলতো “অ বাবা”। এইভাবে চাচা, ফুফু, খালা ইত্যাদি বলে বিলাপ করতো। কিন্তু স্বামী মারা গেলে কি বলে বিলাপ করবে তা নিয়ে সমস্যা ছিল। কেউ কেউ ভুলে “অ বাবা” বললে অনেকে শুধ্রিয়ে দিতো “বাবা বলো না, স্বামীরে কেউ বাবা বলে না।”

তবে এইসব বিলাপের সুর আমার মনে হয় রুপভান ও বেইলার গানের সুর থেকেই নেয়া হয়েছিল। বাবা যখন গান গাইতেন তখন আমার কাছে মহিলাদের বিলাপের মতো মনে হতো। আমি যখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গাইনি ওয়ার্ডে ডিউটি করছিলাম দেখলাম “এক যুবক বারান্দায় হাটু গেড়ে বসে উপর দিকে দুই হাত ছোড়াছুড়ি করে চিৎকার করে বলছে
“হে খোদা, হে খোদা,
আমার কেউ রইল না,
আমার কেউ রইল না,
আমার কেউ রইল না।”
শুনে একজন আরেকজনকে জিজ্ঞেস করলো
-ওনার কি হয়েছে?
– ওনার ভাবী মারা গেছে ডেলিভারির সময়।
– ভাবী মারা গেলেই বলছে ‘আমার কেউ রইল না’, বউ মারা গেলে কি বলবে?’

আমি চিন্তায় পড়লাম লোকটি এই স্টাইলে কাঁদছে কেন? ধারনা করলাম “সিনেমায় হয়ত দেখেছে এই ভাবে কাঁদতে। যেমন দেখেছে গ্রামের মানুষ রুপভান ও বেহুলার পালা গানে। ”

আকাশের তারা দেখতে দেখতে ও বাবার গান শুনতে শুনতে এক সময় আমার ঘুম পেতো। আমি বাবার পেটের উপর উপুর হয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করতাম। বাবার পেটটা ছিল অতি আরামের বিছানা। আমার জীবনে শ্রেষ্ঠ বিছানা। পিঠে কাঠইল্লা মশা বসতো। আমি নড়ে উঠতাম। বাবা তাপ্পড় মেরে মশা মেরে আমার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতেন। কখন যে ঘুমিয়ে পড়তাম জানতাম না। সকালে ঘুম ভাংলে দেখতে পেতাম মায়ের সাথে।

মোটামুটি যখন বড় হলাম গানের অনুষ্ঠানে যেতে ইচ্ছে করতো। আমার বয়সী অন্য পাড়ার ছেলেরা বেইলা নাচারি, রুপভান গানের পালা দেখে গল্প করতো। খুব সম্ভব ১৯৭২ সন। ক্লাস সিক্সে পড়তাম। শুনলাম চনপড়া হাছেন ভাইদের বাড়িতে রাতে বেইলার নাচারি গান হবে। চাইরবাইদা থেকে গানের দল আসবে। হাছেন ভাইদের বাড়িতে এমন গানের আসর আরো হতো। মাঝে মাঝে রাতে ফকিরি গানের বৈঠক হতো। নওপাড়ার ময়েজ উদ্দিন দাদা ছিলেন এদের প্রধান ফকির। বড় হয়ে বুঝেছি যে তারা ছিলেন লালন ফকিরের অনুসারী। তারা লালনগীতি গাইতেন। সেদিন বিকেল থেকেই তীব্র ইচ্ছা হলো বেইলার নাচারি গান শুনতে যাব। সুযোগ খুজছিলাম। খাওয়া দাওয়া শেষ করে কাছারি ঘরে শুতে গেলাম। হাছেন ভাইর বাড়ি থেকে ঢোল, মন্দিরা ও হারমোনিয়ামের মিউজিক ভেসে আসছিলো। শীতের দিন ছিলো। চাদর গায় দিয়ে মাথায় মাফলার বেধে আসতে করে বেরিয়ে পড়লাম। হাজির হলাম বেইলা নাচারির জায়গায়। দেখলাম উঠানে সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এক পাশে গানের দলের লোক বসেছে খোল, হারমোনিয়াম, মন্দিরা ইত্যাদি নিয়ে। একজন কবিতাকারে বেহুলা লক্ষিন্দরের কিচ্ছা বলে যাচ্ছেন খোলের তালে তালে। মাঝখানে একটি ছেলে মেয়ে সেজে নাচছে নানা ভংগীতে। ছেলেটির বয়স আমারই বয়সের হবে। তবে চেহারায় মেয়েলি। পাউডার মেখে মুখ সাদা করেছে। মাথায় মেয়েদের পরচুলা। গায়ে ছেলেদের মতো সেন্ডো গেঞ্জি। একটা লাল রংগের জর্জেট শাড়ী কোমরে কুচি দিয়ে নিচের দিকে ফুলিয়ে পরেছে। নিচে আন্ডার পেন্ট পরে কোমর বড় করেছে। ডান হাতে একটা রুমাল নাচাচ্ছে, বাম হাত কোমরে রেখে। পায়ে পরেছে ঘুংগুর। আমি মাফলার দিয়ে মুখ পেঁচিয়ে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিলাম। কেউ জানেনা যে এখানে তালুকদার বাড়ির কেউ আছে। জানলে খবর হয়ে যেতো। আমি কিসসার কিছু বুঝলাম না। বুঝতে চেষ্টা করছিলাম এখানে হচ্ছেটা কি? কিসসার সাথে সাথে শুনলাম আমার সেই পরিচিত বেইলার গান গুলি। লক্ষিন্দরের জন্য যখন লোহার বাসরঘর বানানো হচ্ছিল তখন গাইছিল
“বাসর বান্ধিলাম, বান্ধিলাম,
লোহার বাসর ঘর
বাসর বান্ধিলাম।
সেই ঘরেতে বসত করবে বেইলা লখিনদর
বাসর বান্ধিলাম।”
গানের দলের যারা বাদ্যযন্ত্রের সাথে বসা ছিলো তারা গানের একই পংতি আরেকবার গাইছিলো। তার সাথে নাচছিল নাচারি। কিছু কিছু দর্শকও কাহিনীর আনন্দ বেদনার সাথে একাত্ব হয়ে গাইছিলো। কাহিনী বর্নণাকারী মাঝে মাঝে কাহিনী থামিয়ে বেইলার গান মানসিক করার মাহাত্ম্য বর্নণা করছিলেন। তিনি বলছিলেন “এক পালা বেইলার গান মনসা দেবীর নামে মানসিক দিলে এই উপকার হয়, ঐ উপকার হয়, অনেকেই অগ্রিম মানসিক করে রেখেছেন, ইত্যাদি।” আমি বুঝতে পারলাম এইভাবেই বেইলার গান বেচে আছে গ্রামে গ্রামে। যাহোক, কিছুটা জ্ঞান নিয়ে নিরবে চলে এলাম বাড়ি। কাথা মুড়ি দিয়ে ঘুমালাম। তারপর আর কোন দিন আমি বেইলার নাচারি দেখতে যাই নি।

তার অনেকদিন পর টাংগাইল সিনেমা দেখতে গিয়ে দেখি সিনেমা চলছে রাজ্জাক-সুচন্দা অভিনীত বেহুলা। জানতাম যে এটাই নায়ক রাজের প্রথম সিনেমা। তাই, সিনেমাটি দেখার আগ্রহ হলো। কোন কিছুর শুরু ও শেষ দেখার আমার একটা আগ্রহ থাকে। তাছাড়া মনে হলো সিনেমায় হয়তো আধুনিক কিছু শিখা যাবে। আসল কাহিনীটাও জানা যাবে। টিকিট করে হলে সিনেমা দেখা শুরু করলাম। কি কারনে যেন খুব ঘুম পাচ্ছিল। ঘুমের মধ্যেই যা দেখলাম তাতে বুঝলাম রাজ্জাক চাঁদ সওদাগরের ছেলে লক্ষিন্দর আর সুচন্দা সাই সওদাগরের মেয়ে বেহুলার অভিনয় করছে। সিনেমায় দুইজন গাইছিলো “নাচে মন ধিনা ধিনা, প্রাণেতে বাজে বীণা বাজে রে।” তাদের মধ্যে তখন বিয়ে ঠিক হয়েছে। সুচন্দা গাছের আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে দুই ডালের ফাক দিয়ে বড় বড় করে চোক করে তাকাচ্ছিল সেই গানে। রুপালি পর্দা জুড়ে সেই চোখ দেখাচ্ছিলো ক্যামেরাম্যান। সেই চোখ আমার অনেকদিন মনে ছিল। কোথায় বেইলা নাচারি, কোথায় নায়িকা সুচন্দা। মাগনা বেইলা আর টিকিটের বেহুলা, পার্থক্য ছিলো। সুমিতাদেবী মনসাদেবীর অভিনয় করছিলেন। আমজাদ হোসেন ছিলেন বাসরঘরের মিস্ত্রী। ফতেহ লোহানীও অভিনয় করেছেন সেখানে। সবচেয়ে ভালো লেগিছিলো নদী দেখে। আমি তখনো বংশী নদী ছাড়া অন্য কোন নদী দেখি নি। সাপে কাটা মৃত লক্ষিন্দর তথা রাজ্জাককে যখন ভেলায় করে বেহুলা তথা সুচন্দাকেসহ পদ্মা নদীতে ভাসিয়ে দিলো সেই ভেলা ভাসতে ভাসতে করুণ গানের সাথে ঢেউ খেলে খেলে ভাটির দিকে যাচ্ছিলো। সেই নদীর দৃশ্য আমাকে মুগ্ধ করেছিলো। মৃত রাজ্জাক বহুদিন ভাসতে ভাসতে শুকিয়ে কংকাল হয়ে গিয়েছিল। ঘটনাক্রমে যখন সুচন্দা (বেহুলা) মনসাদেবীকে পুঁজা দিতে রাজি হলো তখন লক্ষিন্দরের উপর থেকে শাপ উঠে যায়। কংকালে মাংস গজিয়ে আবার রাজ্জাকের (লক্ষিন্দরের) চেহারা ফিরে আসে। রাজ্জাক হেসে উঠে। আমি অবাক হয়ে যাই। কি করে এমন অভিনয় করলো?

একবার আমাদের হাছেন কাক্কুকেই সাপে কাটলো ভোরবেলা। পায়ে ডোর বাধা হলো। হাছেন কাক্কু তো বেইলা নাচারির ঘোর বিরোধী ছিলেন। বিন্নাখাইরা থেকে এক ওজা এসে তুলারাশি লোক দিয়ে হাত চালান দিয়ে ঝেড়ে সাপের বিষ নামিয়ে ডোর খুলে দিলেন। যদি সাপের বিষ না নামতো তবে বেইলার গান গেয়ে নামাতে হতো। তাতেও না নামলে ভেলায় ভাসিয়ে দেয়া হতো। বিনিময়ে তিনি কোন টাকা পয়সা নিলেন না। শুধু দাবী করলেন পৌষ মাসে ওজা যখন মনসার নামে শিন্নি করবেন তখন সেখানে কিছু চাউল দিতে হবে। কি আর করা যায়?

আমি যখন এমবিবিএস ফাইনাল ইয়ারে পড়ি তখন বর্ষাকালে আমার চাচা শশুর করিম কাক্কাকে সাপে কেটেছিল। ঐদিন আমি ওখানে ছিলাম। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আমি তাকে হাসপতালে নিয়ে যেতে পরামর্শ দিলাম। কিন্তু গ্রামের মানুষ তাতে রাজি নাহয়ে ওজা এনে ঝাড়া শুরু করলেন। আগেরদিন বিকেল থেকে পরেরদিন বিকেল পর্যন্ত ঝাড়লেন। কাক্কা ঘুমিয়ে পড়লেন। সবাই মনে করলেন তিনি মরে যাচ্ছেন। বেইলা নাচারির দল এসে অনেক রাত পর্যন্ত নাচারি গাইলো। আমার রাগ পাচ্ছিল, কিন্তু করার কিছু ছিলো না। নাচারিরা ঘোষনা দিয়ে দিলো বড় বিষাক্ত সাপে কামড়িয়েছে, ভেলায় ভাসিয়ে দিতে হবে। কলাগাছ কেটে ভেলা বানিয়ে গাংগে ভাসানো হলো। এবার ভেলায় উঠানোর পালা। নাচারি গান ধরলো আর সবাই সাথে গাইলো
“বিদায় দেন গো, দেন আমার আম্মা,
আম্মা বিদায় দেন গো
ও আমার আম্মা আ আ। ”
সবাই ঝড়ঝড়িয়ে চোখের পানি ফেলতে লাগলো। আমি পালস দেখে আন্দাজ করলাম। কিছুই হয় নাই। তাই আমি একটুও কাদি নাই। ইতিমধ্যে আমি সাপে কাটা রুগীর চিকিৎসা ও বিভিন্ন বিষাক্ত সাপের ধরন সম্পর্কে বিদ্যা অর্জন করেছি মেডিকেলের কোর্স করে। আমি জানতাম যত সাপ আছে তার মাত্র শতকরা পাঁচটি বিষাক্ত। এর মধ্যে আবার মাত্র একটি বা দুইটি মারাত্বক বিষাক্ত অর্থাৎ কামড় দিলে রুগী মারা যেতে পারে। সাপের লালায় বিষ থাকে। সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত সাপ পোকামাকড় খায়। খাবার সময় বিষ ঢেলে দেয়। এই বিষ সকালের দিকে প্রায় শেষ হয়ে যায়। তাই সন্ধ্যা রাতে সাপে কামড়ালে বেশী আক্রান্ত হয়। আর সকালের দিকে কামড়ালে কম আক্রান্ত হয়। গভীর রাতে করিম কাকা জীবিত হয়ে ফিরে এলেন বাড়ি। জানতে পারলাম ভেলা ভাসতে ভাসতে ফটিকজানি নদী পর্যন্ত গেলে কাক্কা উঠে বসেন। আমি ধরে নিলাম তখন কাক্কার ঘুম ভেংগেছিল। নাম হলো নাচারির।

উপজেলা হাসপাতালে চাকরি করার সময় আমার এক সিনিয়র ডাক্তার কলিগকে সাপে কাটলো। তিনি সন্ধায় মোটর সাইকেল চালিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। পথে তার পায়ে সাপে কামড় দিয়েছিল। সাপে কামড় দিয়েছে না বাশের কঞ্চি ঢুকেছে আমি নিশ্চিত না। কারন তিনি সাপ দেখেন নি। আমি ও আমার আরেক কলিগ তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে পর্যবেক্ষণে রাখলাম। কিন্তু নিমিষে খবর ছড়িয়ে পড়লো যে মেডিকেল অফিসারকে সাপে কামড়িয়েছে। আমরা যে চিকিৎসা দিয়েছি প্রতিবেশী গ্রামের শুভাকাঙ্ক্ষীদের তা পছন্দ হলো না। তারা বুঝালো যে সাপে কাটা রুগী। এখানে ডাক্তারের কাম বাজে নাই। রুগী মারা গেলে অন্য ডাক্তারদের খবর আছে। শুনে আমরা ঘাবরিয়ে গেলাম। রুগীও আমাদের দিকে করুণ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলো। ইতিমধ্যে একজন মহিলা ওজা এসে হাজির। গ্রামবাসী একজন বললেন যে ইনি ভালো ওজা। ইনি চেরা বাটা পড়া খাইয়ে দিলে বিষ পানি হয়ে যাবে। রুগী একবার আমার দিকে তাকান, আবার আরেক ডাক্তারের দিকে তাকান, আরেকবার তার স্ত্রীরর দিকে তাকান, আরেকবার তার সন্তানের দিকে তাকান, আরেকবার নিজেই নিজের পালস দেখে বলেন “সাদেক সাব, আমি আজ মরে যাবো?” শুনে আমি চমকে উঠি। বলি “না, কিচ্ছু হবে না।” রুগী বলেন “চেরা বাটা খাবো?” আমরা দুই ডাক্তার আড়ালে গিয়ে পরামর্শ করে এসে বলি “খান, ক্ষতি নাই।” বাসায় কোন মাটির হাড়ি পাতিল ছিল না। পাশের বাড়ির কলাগাছের গোড়া থেকে পাতিল ভাংগা চেরা কুড়ুয়ে এনে টিউবওয়েলের পানিতে ধুয়ে ঐ নোংড়া মহিলা ওজা পাটায় কাচা মরিচ, লবন ও সরিষা তেলের সাথে বেটে রুগীকে খাইয়ে দিলেন। রুগী ঝালে হাহু হাহু করতে লাগলেন। সমস্ত এমবিবিএস বিদ্যা শেষ হয়ে গেল তার। সবাই দাঁড়িয়ে ডাক্তার রুগীর চেরা বাটা খাওয়ার তামাশা দেখছে। আমাদের লজ্জাও লাগছিলো আবার হাসিও পাচ্ছিলো। আমরা দুই ডাক্তার একে অপরকে ইশারা দিয়ে বাইরে এসে এক যোগে কিছুক্ষণ হেসে হাল্কা হয়ে নিলাম। আবার ঘরে গেলাম। কিছুক্ষণ পর হাহু হাহু কিছু কমলো। মহিলা আবারও কিছু চেরা বাটা খাইয়ে দিলেন। আবার হাহু হাহু। বুঝলাম মরার সম্ভাবনা নাই। হাহু হাহু করতেই তার রাত কাটবে। ওজা চলে গেলেন। বলে গেলেন “অজ্ঞান হয়ে পরলে বেহুলার গান গাইতে হবে।” কি লজ্জা এমবিবিএস রুগীর জন্য বেইলা নাচারি। রাত ১২ টার দিকে কোন রকম ভরসা না পেয়ে তিনি মটর সাইকেলের পিছনে বসে জেলা সদর হাসপাতালে চলে গেলেন। সকালে শুনলাম সেখান থেকে তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে এই বলে যে হয়তো কঞ্চির খোচা লেগেছে। সাপে কাটেনি। রুগীর চেরা বাটা খাওয়ার কথা মনে হলে এখনো আমার হাসি পায়।

বহু বছর হয় গ্রামে থাকা হয় না। গ্রামের মানুষ অনেকেই শিক্ষিত হয়ে গেছে। বাড়ি বাড়ি ফাইবার অপ্টিক চেনেলে টিভি দেখছে। বেইলা নাচারিদের দিন শেষ। সাপে কাটলে সাথে সাথে উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স, জেলা সদর আধুনিক হাসপাতাল বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে আধুনিক বিজ্ঞান সম্মত চিকিৎসা করিয়ে থাকেন। তবে, বেইলা নাচারির দল এখনো আছে কিনা আমি সঠিক জানি না।


তারিখ : ২১/২/২০১৯ ইং
স্থান: ময়মনসিংহ- কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ জার্নি

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *