বন্ধু মামুন ও ঢাকা দর্শন

বন্ধু মামুন ও ঢাকা দর্শন
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আব্দুল করিম আল মামুন এইচ এস সি পড়ার সময় ১৯৭৭-৭৮ সেসনে আমার সহপাঠী হলেও প্রকৃতপক্ষে আমার এক বছরের সিনিয়র ছিলেন। তিনি গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম কলেজে একবছর পড়ে কালিহাতির আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজে মাইগ্রেশন নিয়ে এসেছিলেন। ছাত্রাবাসে আমার রুমমেট ছিলেন। সিনিয়র-জুনিয়র হওয়াতে আমি তাকে মামুন ভাই ডাকতাম, তিনি আমাকে সাদেক ভাই ডাকতেন। মামুন ভাই কথা বলার সময় প্রায়ই আটকে যেতেন। ছোট বেলায় কি যেন একটা জ্বর হয়েছিল। সেই থেকে তার কথা আটকে যেতো। যতক্ষণ কথা মুখ দিয়ে বের হতো না ততক্ষণ ডান হারের তর্জনি আংগুল দিয়ে মাথার ডান পাশে ছুঁইয়ে রাখতেন। যে কোন বিষয়ে তিনি পাণ্ডিত্য দেখাতে চেতেন। যে কেউ কোন বিষয় নিয়ে কথা বললে তিনি এগিয়ে গিয়ে কিছু একটা মন্তব্য করতেন। তার প্রথম বাক্য ছিলো “না না, আমার মনে হয়, এটা ঠিক না।” তারপর বিষয়টি নিয়ে তিনি অনেকক্ষণ কথা বলতেন। কেউ যদি পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে বারান্দায় বের হয়ে আরেকজন ক্লান্ত ছাত্রের সাথে কোন বিষয় নিয়ে দুই চার কথা বলতেন, মামুন ভাই পড়া বাদ দিয়ে বারান্দায় চলে যেতেন আলোচনায় অংশ গ্রহণ করতে। বারান্দায় জমসে আলাপ করলে আমার সমস্যা হতো। আমি ছিলাম বইয়ের পোকা। তাই, মাঝে মাঝে আমি মামুন ভাইকে টেনে রুমে নিয়ে আসতাম। আমি ছোট হলেও মামুন ভাই আমাকে মান্য করতেন। জোড় করে রুমে ঢুকালেও মামুন ভাই পড়তেন না। শুয়ে তাকিয়ে থাকতেন সিলিং-এর দিকে। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে দুইজন দুই বেডে শুয়ে শুয়ে হাল্কা গল্প করতাম। গল্প করতে করতে আমাদের মধ্যে সমবয়সীর মতো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। বলতাম
-মামুন ভাই, আপনাদের দেশের বাড়ি কোথায় পড়েছে?
– কালিয়াকৈরের একটা গ্রামে।
– ভাওয়ালের কলেজ ছেড়ে এমন গ্রামের কলেজে চলে এলেন কেনো?
– ওখানে এখানকার মতো শিক্ষকগণ কেয়ার নিতে পারেন না। আমার বড় ভাই আব্দুর রহিম এম বি বি এস ডাক্তার। ঢাকা মেডিকেল কলেজে চাকরি করেন। তিনিই আমার পড়ার খরচ দেন। তিনি এখানকার রাজাফৈর গ্রামে বিয়ে করেছেন। তিনি জানেন যে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজের সব শিক্ষক ছাত্রদের খুব যত্নসহকারে পড়ান। আছে আবাসিক হোস্টেলের ব্যবস্থা। তাই, তিনি আমাকে এখানে এনেছেন।
– আপনার এই সুন্দর সুন্দর শার্ট, প্যান্ট, জুতা, বেডশিট, পিলো, পিলো কভার এগুলি কি রহিম ভাই কিনে দিয়েছেন?
– জি, তিনি আমার সব খরচ দেন। হোস্টেলের খাবারের টাকাও তিনি দেন। তিনি খুব ভালো ছাত্র ছিলেন। পড়া ছাড়া আর কিছু বুঝেন না, আপনার মতো। আমি এখান থেকে যাই যখন তখন ঢাকায় যাই তার কাছে।
– আমি এখন পর্যন্ত ঢাকায়ই যাই নি। টাংগাইল যাওয়া হয়েছে অনেকবার। ঢাকা যাওয়ার ইচ্ছা ছিলো অনেক দিনের। শুনেছি ঢাকায় নাকি অনেকগুলি গলি। আর সব গলি নাকি একই রকম। একবার হারিয়ে গেলে নাকি গলি খুজে পাওয়া মুস্কিল। তাই, একা যেতে ভয় লাগে। আপনি কি যাদুঘর ও চিড়িয়াখানা দেখেছেন?
– দেখেছি। আপনাকে একবার ঢাকা নিয়ে যাবো।
– নিয়ে গেলে ভালোই হয়। থাকবো কোথায়, হোটেলে?
– না, ভাইর ডর্মেটরিতেই থাকা যাবে।
– ভাই মনে কিছু নিবে না?
– না। ভাই খুব ভালো মানুষ।

কিছুদিন পর আমরা দুইজন দুই দিনের ঢাকা সফরের পরিকল্পনা করে রওনা দিলাম। আউলিয়াবাদ থেকে কালিহাতি, টাংগাইল হয়ে ঢাকায় পৌছলাম সন্ধায়। তখন সব বাস গিয়ে থামতো গুলিস্তানে। গুলিস্তান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডরমেটরিতে গেলাম। ডাঃ রহিম ভাই তখন খুব সম্ভব এফ সি পি এস ট্রেইনিং কোর্সে ছিলেন। আমাদের সাথে দুই একটি কথা বলে আমাদের জন্য রুম ছেড়ে দিয়ে অন্য এক খালি রুমে দুই রাত থাকবেন বলে চলে যাচ্ছিলেন। আমি বললাম
– ভাই, আমার দাঁতের মাড়ি দিয়ে পুঁজ পড়ে আর চোখ মাঝে মাঝে লাল হয় ও জ্বলে।
-মামুন, ওকে নিয়ে আগামীকাল সকাল ৯ টায় ডেন্টাল আউটডোর-এ গিয়ে বসবে। আমি ডাক্তারকে বলে দিয়ে আসবো।

রাতে শুয়ে শুয়ে মামুন ভাইর সাথে কি কি দেখতে হবে তানিয়ে আলাপ করলাম। আমি জানালাম
– দাঁত দেখাবো, চোখ দেখাবো, হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে দেখবো, যাদুঘর, চিড়িয়াখানা ও পার্ক দেখব ।
– ঢাকার সব কিছুই চিনি। ঘূরে ঘুরে সবকিছুই দেখাবো।
– যদি আমি হঠাৎ হারিয়ে যাই?
– কোন চিন্তা নাই। সব বাস ঘুরে ঘুরে গুলিস্তানে এসে থামে। যে কোন বাসে উঠে গুলিস্তানে নেমে রিক্সায় এসে যাবেন ঢাকা মেডিকেলে।

পরদিন সকালের নাস্তা সেরে আমরা ডেন্টাল আউট ডোরের বেঞ্চিতে গিয়ে বসলাম। ডাঃ রহিম ভাই হন্তদন্ত হয়ে এসে একটা আউটডোর টিকিট করিয়ে মেডিকেল অফিসারকে বলে দিয়ে চলে গেলেন। আমি দাঁতের ডাক্তারের সামনে বসলাম। ডাক্তার জিগালেন
– কি সমস্যা?
– সমস্যা হলো, দাঁতের মাঁড়ি দিয়ে পুঁজ পড়ে।
– কোন দাঁতের?
– সামনের ডান দাঁতের।
– দেখি?
– ঈ ঈ।
ডাক্তার চোক্কা একটা যন্ত্র দিয়ে চাপ দিলেন। আমি খুব ব্যাথা পেলাম। বললাম
– ঈ, আ আ।
– কতদিন হয় ঘা হয়েছে?
– এই, বেশী দিন না।
– বেশী দিন না মানে কি? কত দিন, কত মাস, কত বছর?
(আমি লজ্জায় পড়ে গেলাম। আমার ঘা হয়েছে ২ বছরের কম না। এত দিন ডাক্তার দেখাই নি। এটা লজ্জার কথা। কাজেই কমিয়ে বললাম)
– এই ২ মাস হবে।
ডাক্তার ঔষধ লিখে দিলেন টিকিটে। আরেকটা স্লিপ দিলেন হাসপাতালের ডিস্পেসারি থেকে ফ্রি ঔষধ নেয়ার। লেখা ছিলো কমবায়োটিক্স ইঞ্জেকশন মাংসে নিবেন প্রতিদিন একটা করে। কয়টা লিখেছিলেন মনে নেই। সেই ৪২ বছর আগের কথা। সব কি আর মনে রাখা যায়? ঔষধের গায়ে লাল রঙ লাগানো ছিলো যাতে বাইরে কোথাও বিক্রি না করতে পাড়ি। লিখা ছিলো “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বিনামূল্যে বিতরনের জন্য, কিক্রি করা নিষেধ।” সেই ইঞ্জেকশন পুশ করে দিতেন আমার চাচা পল্লী চিকিৎসক শামসুদ্দিন তালুকদার (শমে ডাক্তর)। সেই যে মাড়ির ঘা ভালো হলো, আর জীবনে সেই রকম ঘা আর হয় নি।

দাঁতের আউটডোরে বসেছিলাম। ডাঃ রহিম ভাই এসে চোখের আউটডোর মেডিকেল অফিসারের নিকট গিয়ে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন
– কি সমস্যা?
– ডান চোখটায় কয়েকদিন পরপর লাল হয়। একটু একটু জ্বালা করে। ফাল্গুন-চৈত্র মাসেই বেশী হয়।
– কতদিন ধরে এমন হয়?
– কয়েক বছর ধরে এমন হয়। তবে সারা বছর হয় না।
ভালোকরে চোখ পরীক্ষা করে একটা চোখের ড্রপ লিখে দিলেন। সেইটার নাম আমার মনে আছে। কিন্তু সবাইকে ঔষধের নাম বলা ঠিক হবে না। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া সেই ড্রপ চোখে দেয়া ঠিক না। সেই ড্রপেই আমার চোখ ভালো হয়। এরপরও পরপর কয়েক বছর চোখের সেই সমস্যা হয়েছিলো। আমি সেই ড্রপ ব্যবহার করে চোখ ভালো করেছি। বহুদিন হয় সেই সমস্যা আর হয় না। রহিম ভাই পরে এফ সি পি এস পাস করে চক্ষু বিশেষজ্ঞ হিসাবে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কিছুদিন চাকরি করেন। আমি খুব সম্ভব তখন ইন সার্ভিস ট্রেইনিং করি। দেখা হয়েছিলো, কথা হয়েছিলো। এখন কোথায় কি অবস্থায় আছেন জানি না।

এখান থেকে চলে গেলাম হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে দেখতে। কিন্তু বিরাট এক সমস্যায় পড়ে গেলাম। চোখ পরীক্ষার জন্য পিউপিল ফাক করতে একটা ড্রপ দিয়ে বসিয়ে রেখেছিলেন অনেক্ষণ। সেই পিউপিল তখনও ডায়লেটেড (ফাক) অবস্থায়ই ছিলো। সবকিছু বড় বড় দেখতে লাগলাম। পায়ের কাছের মাটি অনেক নিচুতে মনে হচ্ছিলো। হাসপাতাল ভালোভাবে দেখতে পেলাম না। ভালোভাবে হাটতেও পারলাম না। বাসে উঠে চলে গেলাম সদরঘাট লঞ্চ দেখতে। গাড়ীতে বসে মামুন ভাই জানালা দিয়ে নানান কিছু দেখাচ্ছিলেন। কিন্তু আমি তাকাতে পারছিলাম না। তাকালেই সূর্যের আলো চোখে বেশী লাগছিলো। গাড়ী থেকে নামতে গেলে মাটি অনেক নিচুতে মনে হচ্ছিলো। মামুন ভাই আমাকে ধরে নামালেন। সদর ঘাটে নিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চ দেখাচ্ছিলেন। কিন্তু বিকেলের রোদ এসে প্রবেশ করছিলো আমার চোখের মণি দিয়ে। আমি লঞ্চ দেখতেই পেলাম না। হায়রে যন্ত্রণা! আসলাম ঢাকা দেখতে, কিন্তু চোখ পরীক্ষা করাতে গিয়ে একি করলেন আমাকে, অন্ধ বানিয়ে দিলেন! ফিরে এলাম থাকার রুমে। রাতে আল্লাহ্‌ আল্লাহ করলাম যেন পরেরদিন চোখ ভালো হয়ে যায়। চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলাম।

পরদিন সকালে নাস্তা করে ঢাকা শহর সফরে বের হলাম। প্রথমে গেলাম সেগুনবাগিচার জাতীয় যাদুঘরে। আগে এখানেই যাদুঘর ছিলো। পরে শাহবাগে নতুন ভবন করে স্থানান্তর করা হয়েছে। জাদুঘর দেখে ভালো লাগলো। অনেক ইতিহাস জানতে পারলাম যাদুঘর প্রত্যক্ষ করে। অনেকদিনের স্বপ্ন আমার পূরণ হলো। এখান থেকে বাসে চলে গেলাম তেজগাঁও ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। কাছে থেকে বিমান দেখলাম দোতলায় দাঁড়িয়ে টিকেট করে। অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিমান দেখলাম। দেখলাম বিমান থেকে মই দিয়ে যাত্রিরা উঠানামা করছে। ২০০৩ সনে যখন আমি প্রথম বিমানে উঠলাম তখন অবাক হয়েছিলাম এই জন্য যে বিমান বন্দরের লাউঞ্জ থেকে হেটে হেটে চলে গিয়েছিলাম একেবারে বিমানের ভিতরে। সেই মই প্রয়োজন পড়েনি। বিমান দেখার স্বপ্ন পূরণ হলো তেঁজগা গিয়ে। ১৯৮০ সনে তেঁজগা থেকে বিমান বন্দর শিফট করা হয় কুর্মিটোলায়। তখনো নাম ছিল ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। ১৯৮৩ সনে এর নামকরন করা হয় জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। ২০১০ সনে এর নামকরন করা হয় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। তেঁজগায়ের বিমান বন্দর ভবনটি দীর্ঘদিন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের অফিস হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

বিমানবন্দর দেখে চলে গেলাম মীরপুর চিড়িয়াখানায়। এখানে গিয়ে অবাক হলাম। আমার অনেক দিনের ধারণা ছিল চিড়িয়াখানায় অনেকগুলি খাঁচা সারিবদ্ধভাবে রাখা থাকবে তারমধ্যে বাঘ ভালুক রাখা থাকবে। কিন্তু বাস্তবে গিয়ে দেখি আমাদের বড়বাইদ পাড়ার পাহারের চালার মতো লাল মাটির পাহারে অনেক জায়গা নিয়ে চিড়িয়াখানা। একেক প্রাণী একেক চালায় অনেক জায়গা নিয়ে বিচরণ করছে। শিম্পাঞ্জী দেখে খুব মজা পেয়েছিলাম। চিড়িয়াখানা দেখে শুধু আমার স্বপ্নই পূরণ হয় নি, আমার কল্পনাকেও হার মানিয়েছিলো এই চিড়িয়াখানা। আমি মুগ্ধ হলাম ছবির প্রানীগুলিকে বাস্তবে দেখতে পেয়ে। সন্ধার আগে ফিরে এলাম কাওরানবাজার এফ ডি সি-র গেইটে। দেখলাম ছেলে ছোকরার দল গেইটে সারিবদ্ধভাবে দাড়িয়ে আছে নায়ক নায়িকাদের দেখার জন্য। তারপর ফিরে এলাম ঢাকা মেডিকেলের রুমে। মামুন ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম “আপনি কোন গাড়ীতে উঠেতে হবে এটা বুঝেন কিভাবে?” তিনি বললেন “বাসের সামনে রুট নাম্বার লিখা আছে। ৩ নাম্বার গাড়ী কোন রাস্তা দিয়ে যায় আমার জানা আছে। ৯ নাম্বার গাড়ী কোন রাস্তা দিয়ে যায় তা আমার জানা আছে। পরদিন সকালে ঢাকা থেকে ফিরে এলাম। মোটামুটি সবই দেখা হলো। শুধু সদর ঘাটের লঞ্চটা দেখা হলো না। সেই লঞ্চ দেখলাম ১৯৮৮ সনের জুলাই মাসে প্রথম কর্মস্থল বরিশালে গমনের সময়। তার আগে আমি লঞ্চ দেখি নাই। আপনি শুনে অবাক হতে পারেন।

একসময় প্রিন্সিপাল সংকটের কারনে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজের একাডেমিক কার্যক্রমে সংকট দেখা দিলো। কয়েকজন শিক্ষক অন্য কলেজে চলে গেলেন। কিছু ছাত্রও চলে গেলো অন্য কলেজে। মামুন ভাইও আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন ভাওয়াল বদরে আলম কলেজে।

আমি পলিসি ফর্ম নামে একটি কোম্পানির ভার্চুয়াল ফর্ম কিনেছিলাম ১০ টাকা দিয়ে। কোম্পানি আমার নামে ৪টি ফর্ম পাঠিয়েচিলো। আমি ৪ জনের কাছে ৪টি ফর্ম ৪০ টাকা বিক্রি করে কিছু টাকা কোম্পানির নামে পাঠিয়েছিলাম এবং কিছু অংশ আমার পূর্বের গ্রাহকদের জন্য পাঠিয়েছিলাম। আমার কাছ থেকে যারা ফর্ম নিয়েছিলো তারা প্রত্যেকেই ৪টি করে ফর্ম বিক্রি করে কোম্পানি ও আমার নামে পাঠিয়েছিলেন মানি অর্ডার করে। আমার পরবর্তী গ্রাহক জেনারেশন যতোই বাড়ছিলো ততই আমি টাকা পাচ্ছিলাম। টাকা প্রেরণকারীকে চেনার প্রয়োজন পড়তো না। আমার নামে টাকা আসলে মনে করতাম আমার গ্রাহক জেনারেশনের মাধ্যমে পলিসি ফর্ম বিক্রি চালু আছে। প্রতি মানি অর্ডারে টাকার পরিমাণ ছিল মাত্র ৩, ৪ বা ৬ টাকা। এভাবে মোট ৩৬ টাকা পর্যন্ত এসে বন্ধ হয়ে গেলো। মনে করে নিয়েছিলাম আমার জেনারেশনের পলিসি ফর্ম বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে। আমার ৪টি ফর্ম থেকে একটি ফর্ম মামুন ভাইও নিয়েছিলেন। কাজেই মানি অর্ডারগুলির বেশীরভাগই কালিয়াকৈর অঞ্চল থেকে আসতো।

এদিকে আমার নামে ছোট ছোট অংকের মানি অর্ডার আসাতে পোস্ট অফিসের লোকজন আমার কাছে জানতে আগ্রহী হলো যে এত অল্প অল্প টাকা কারা পাঠায়। আমি তাদেরকে পলিসিটা বুঝিয়ে বললাম। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। আমার নামে মানি অর্ডার আসে না। পোস্ট অফিসের এক কর্মচারী আমার রুমের সামনে এসে মাঝে আমার কুশল জানতে চাইতেন। সুন্দর করে জিজ্ঞেস করতেন
– সাদেক, ভালো তো?
– আলহামদুলিল্লাহ, ভালো। আপনি ভালো?
– ভালো। তোমার পড়াশুনা কেমন চলছে?
– ভালো।
– আচ্ছা, তোমার নামে মাঝে মাঝে যে টাকা আসতো, এখন আসে না কেনো?
– হয়তো পলিসি বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে।
– বিক্রি চালু থাকলে ভালোই হতো।

লোকটি প্রায় প্রতি মাসেই এইভাবে কথা বলে আমার খোজ নিতেন। তাই, আমার কাছে অত্র অঞ্চলের মধ্যে তিনিই ছিলেন বেশী শুভাকাঙ্ক্ষী।

এদিকে এ এফ এম গোলাম কিবরিয়া স্যার অধ্যক্ষ হিসাবে এসে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজের একাডেমীক অবস্থা অনেক উন্নত করে ফেলেছিলেন। যারা ইতিমধ্যে অন্যত্র চলে দিয়েছিলো সবাই ফিরে এলো। এইচ এস সি পরীক্ষার ফর্ম পূরণের আগ দিয়ে মামুন ভাইও চলে এলেন। আবার আমার রুমমেট হলেন। বন্ধুকে ফিরে পেয়ে উভয়েই আনন্দিত হলাম। আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব এমন পর্যায়ে গেলো যে গোপন কথাগুলিও শেয়ার করা শুরু করলাম।

এমনি এক রাতে পাশাপাশি বেডে শুইয়ে দুই বন্ধু অন্তরঙ্গ আলাপ করছিলাম। একসময় মামুন ভাই জিজ্ঞেস করলেন
– আচ্ছা, সাদেক ভাই, আপনি পলিসি ফর্ম থেকে মোট কেমন টাকা পেয়েছিলেন?
– মাত্র ৩৬ টাকা। তারপরই টাকা আসা বন্ধ হয়ে গেছে।
– কি কন? আমার মাধ্যমেই তো অনেক পলিসি বিক্রি হয়েছে। পলিসির নাম্বারে যে সিরিয়াল লেখা থাকতো তাতে আপনি ৭০০ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা।
(৪২ বছর আগের ৭০০ টাকা এখনকার প্রায় ৭০০০ টাকার সমান। শুনে আমার শরীর নড়াচড়া দিয়ে উঠলো)
– তাই, নাকি। আমি তো মাত্র ৩৬ টাকা পেলাম ৪/৫ টি মানি অর্ডার থেকে।
– আপনি যখন আনুমানিক ৭০০ টাকা ক্রস করলেন তখন আপনার মানি অর্ডারে কিছু লিখার স্থানে আপনাকে অভিনন্দন জানিয়ে আমাদের কলেজের এক পলিসি গ্রাহক চিঠি লিখে। সেই চিঠি লিখা মানি অর্ডার আপনি পান নি?
(আমি শুনে অন্ধকারের মধ্যেই উঠে বিছানায় বসে পড়লাম)
– কি বললেন! আমাকে একজন চিঠি লিখেছিলো মানি অর্ডারে! সেই চিঠি আমি পাই নি! বিশ্বাস করুন আমি পাই নি।
– হে, আমার সামনে লিখে পোস্ট করেছে।
– তার মানে, টাকা তো পাই নাই, চিঠিও পাই নাই।
– চিঠিতে আপনাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। ঠিক আছে আগামীকাল আমরা পোস্ট অফিসে গিয়ে খোজ নিয়ে দেখবো সেই মানি অর্ডারগুলি পেলেন না কেন।

আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না যে সেই পোস্ট অফিসের শুভাকাঙ্ক্ষীই আমার সিগনেচার জাল করে টাকাগুলি তুলে নিয়েছেন। কারন, তিনি জানতেন যে এই পলিসিতে প্রাপক প্রেরণকারীকে চিনতেন না। আমিই তাকে ব্যাখ্যা করে বলে দিয়েছিলাম। সারারাত ভালো ঘুম হলো না।

পরদিন পোস্ট অফিসে গিয়ে তদন্ত করে আমার আন্দাজ ঠিক হলো। সেদিন বাবা এসেছিলেন হোস্টেলে। সব শুনে বাবা বললেন “ওনারা সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষ। কাউকে বলা ঠিক হবে না।” আমার নামে মোট ৭৬০ টাকার মানি অর্ডার এসেছিলো। সেখান থেকে মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে ৩৫০ টাকা পেয়ে একটি সেভেন্টিন জুয়েলের হাত ঘড়ি কিনেছিলাম। সেই ঘড়ি অনেকদিন হাতে পরেছি।

১৯৭৯ সনে এইচ এস সি পরীক্ষার পর থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। মামুন ভাইর গ্রামের বাড়ির ঠিকানায় কয়েকবার চিঠি লিখে কোন উত্তর পাই নি। এম বি বি এস পড়ার চাপে ও কাজের অন্তরালে মামুন ভাইকে ভুলে যেতে থাকি। ৯ বছর পর ১৯৮৮ সনে টাংগাইলের নাহার নার্সিং হোমে চাকরি করছিলাম। হঠাৎ মামুন ভাই এলেন আমার চেম্বারে। দেখলাম মামুন ভাইর শরীর ভেংগে গেছে। সেদিন অপারেশন নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। অল্পক্ষণ কথা বলে জানতে পারলাম মামুন ভাই একটি কোম্পানিতে সাপ্লাইয়ের কাজ করেন। জার্নি করতে হয়। তাই শরীর ভেংগে গেছে। টাংগাইলের আকুরটাকুর পাড়ায়ই বিয়ে করেছেন। শশুরের বাসায় এসেছেন। আমার সাইনবোর্ড দেখে দেখা করতে এসেছেন। কি হতভাগা আমি, মামুন ভাইর ঠিকানা রাখি নাই!

তারপর বহু বছর কেটে গেছে। হাজারো কাজের মাঝে ডুবে আছি। কত কত মামুন ভাইর মতো প্রকৃত বন্ধুদেরকে ভুলে গিয়ে ভার্চুয়াল জগতের বুন্ধুদের সাথে বন্ধুত্ব করে ভাবের আদান প্রদান করছি। কি অকৃতজ্ঞ আমি! ভুলে গেছি আমার এক প্রকৃত বন্ধুকে। যিনি আমাকে গ্রাম্য জীবনের জ্ঞান থেকে শহুরে জীবনের জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছিলেন। যিনি আমাকে প্রথম ঢাকায় নিয়ে গিয়ে ঢাকা শহর দেখিয়েছিলেন। সেই কালিয়াকৈরের আব্দুল করিম আল মামুন। বন্ধু মামুন ভাই।


তারিখ : ১/৩/২০১৯ ইং
স্থান: ময়মনসিংহ- ঢাক-ময়মনসিংহ জার্নি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *