মক্কায় কুরবানি দিয়েছিলাম যেভাবে

মক্কায় কুরবানি দিয়েছিলাম যেভাবে
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

হজ্জ করেছিলাম ২০০৫ সনের জানুয়ারিতে। সাথে আমার স্ত্রী ফিরোজা আক্তার স্বপ্নাও ছিলো। আমরা ময়মনসিংহ থেকে ৪৫ জনের একটা কাফেলা হজ্জে গিয়েছিলাম। কাফেলার মোয়াল্লেম প্রতি বছরই ৪৫ জনের একটি করে কাফেলা নিয়ে হজ্জে যেতেন। রমজান মাসে বেশ কিছু সাথী নিয়ে তিনি ওমরা করে আসতেন। মোয়াল্লেম হিসাবে তিনি খুব দক্ষ, সৎ ও যোগ্য ছিলেন। হজ্জে যাওয়ার আগে ময়মনসিংহের একটি বাসায় তিনি হজ্জ সম্পাদনের প্রশিক্ষণ করিয়েছিলেন। একটা জিনিস তিনি একটু বেশী শিক্ষা দিয়েছিলেন সেটা হলো হজ্জে গিয়ে খুব ধৈর্যশীল হতে হবে।

সুষ্ঠুভাবে কাফেলা পরিচালনার জন্য তিনি আমাদের মধ্য থেকে একটা কমিটি তৈরি করলেন। কমিটির আমি হলাম সেক্রেটারি। আমরা হজ্জের আগে সফর করেছিলাম পবিত্র মদিনা। হজ্জ করার প্রাক্কালে পবিত্র মক্কায় ফিরলাম। হযরত ইব্রাহীম রোডের একটা হোটেলে আমরা ২টি বড় বড় রুম নিয়েছিলাম। একটিতে পুরুষ আরেকটিতে মহিলা হাজী অবস্থান করলাম। মেঝেতে ঢালাই বিছানা করে থাকতাম। সকালে মোয়াল্লেমের সাথে বের হতাম বিভিন্ন সফর ও পর্ব সারার জন্য। রাতে ঈশার নামাজের পর পুরুষ কক্ষে মোয়াল্লেম আগামীদিনের কর্ম পরিকল্পনার বয়ান দিতেন। আমাদের মধ্যে কারো কোন পর্ব বাদ পড়েছে কিনা তা তিনি জেনে নিতেন। বয়ানের সময় পুরুষ -মহিলা পৃথক বসার জন্য রুমের মাঝখানে একটা পর্দা টানিয়ে দিতেন। বয়ানের সময় হঠাৎ এক হাজী বলে উঠলেন “হুজুর, আপনার বিয়ে করা উচিৎ।” আমি চমকে গেলাম। কিসের মধ্যে কি কয়! আমি জানতাম না যে মোয়াল্লেম বিয়ে করেন নি। তার হাবভাব দেখে মনে হতো বয়স ৪৫ এর কম না। আসলে তার বয়স ছিলো ৩৫ এর মতো। মোয়াল্লেম বয়ান চালিয়ে গেলেন। যিনি মন্তব্য করেছিলেন তিনি একজন তাবলীগওয়ালা লোক। তিনি বিয়ের বয়স হবার সাথে সাথেই বিয়ে করে ফেলেন। সামর্থ্য থাকলে তাই করতে হয় ইসলামী বিধানে। আমার জানা ছিল না কেন মোয়াল্লেম বিয়ে করেন নি। এই হাজীই বা জানলো কেমনে যে মোয়াল্লেম বিয়ে করেন নি। বয়ান শেষে মোয়াল্লেম মোনাজাত ধরলেন। আল্লাহ্‌র কাছে আমরা অনেক কান্নাকাটি করলাম। এক পর্যায়ে মোয়াল্লেম বললেন “হে আল্লাহ্‌, আমি এই কাফেলার জিম্মায় ছিলাম। সারাদিন আমার কাফেলার হাজীরা তোমার বিধান মতে ইবাদত করার চেষ্টা করেছে। যে টুকু তারা ভুল করেছে সেটুকু ভুলের গুণাহ তুমি আমাকে দাও।” আমাকে ছাড়া প্রায় সবাই উচ্চ স্বরে বলে উঠলো “আমিন, আমিন।” মনে হলো যেন মোয়াল্লেমকে গুণা বুঝিয়ে দিতে পেড়ে সবাই আমিন বলে বেঁচে গেলো। মোনাজাত শেষে আমি মোয়াল্লেমকে বললাম
– আপনি এটা কি বললেন? আমাদের গুণাহ আপনি নিয়ে নিবেন।
– মানে, আমি হলাম সবার মোয়াল্লেম। সব পর্ব সম্পাদন করানো আমার দায়িত্ব ছিলো। কিন্তু কেউ যদি সেই অনুযায়ী কাজ করতে না পেড়ে থাকে তার গুণাহ তো আমাকেই নিতে হবে।
– গুনাহর জন্য শাস্তি পেতে হয়। তারা তো শাস্তি থেকে রেহাই পেয়ে গেলো। কিন্তু সেই গুনাহর জন্য আপনাকে শাস্তি পেতে হবে। গুনাহর শাস্তি পরকালে ভোগ করতে হবে। একটা গুনাহর শাস্তি যদি এমন হয় যে ফেরেস্তারা আপনার কপালে হাতুরি ঠুকিয়ে একটা লোহার পেরেক ঢুকালো। সেই শাস্তি কি আপনি সহ্য করতে পারবেন? বরং বলুন যে ‘হে আল্লাহ্‌, আমরা যদি কোন ভুল করে থাকি তো সবাইকে আপনি ক্ষমা করে দিন।’ আল্লাহ সবাইকে ক্ষমা করে দিতে পারেন।
– সাদেক ভাই যে কিসব কথা বলেন। মোয়াল্লেমের উপর কথা বলতে নাই।

মোয়াল্লেমের মুখের এক্সপ্রেশন দেখে আমি বুঝতে পারলাম তিনি আমার কথার মর্ম উপলব্ধি করেতে পেরেছিলেন। এরপর আর তাকে মোনাজাতে গুণাহর ভাগ নেয়ার কথা বলতে শুনি নি।

মোনাজাত শেষ করে সবাই যার যার স্থানে যাবার পর মোয়াল্লেম সেই তাবলীগওয়ালাকে প্রশ্ন করলেন
– আপনি বয়ানের সময় বেয়াদবি করলেন কেন?
– কি বেয়াদবি করলাম?
– আমার বিয়ে করা উচিৎ, এটা কেমন কথা হলো?
– আপনার বিয়ের বয়েস হয়েছে। তাই বিয়ে করতে বলেছি।
– তাই, সবার সামনে বয়ানের সময় বলতে হবে?
– ঐসময় মনে পড়লো, তাই বলে ফেললাম।
– আপনার আক্কেল নাই।

আমি তাকে সরিয়ে দিয়ে মিটমাট করে দিলাম। কিন্তু তার কথায় কাজ হয়েছিলো। ঘটনার কয়েক মাস পরেই মোয়াল্লেম আমাকে ফোন করে জানান যে তিনি একজন কোরআনে হাফেজ মেয়ে বিয়ে করেছেন।

হজ্জের একটা পর্ব হলো পশু কুরবানি করা। সামর্থ্য অনুযায়ী যে যা জবাই করতে পারে। খাসী, দুম্বা, গরু বা উট। দুইভাবে কুরবানি দেয়া যেতো। নির্দিষ্ট পরিমান রিয়াল ব্যাংকের বুথে জমা দিলে পশুর ধরন ও সংখ্যা লিখে একটা টোকেন দেয়া হতো। তখন সৌদি মুদ্রা ১ রিয়াল সমান ১৬ টাকা ছিল। সরকারি হজ্জ ব্যাবস্থাপনায় ইলেক্ট্রিক মেশিনের মাধ্যামে হাজার হাজার পশু জবাই হয়ে যেতো। কুরবানি হওয়া পশুর সিরিয়াল নাম্বার ডিসপ্লে হতো স্ক্রোল করে। অনেকে নিজ দায়িত্বে পশুর হাটে গিয়ে নিজে দেখে পছন্দ করে পশু কিনে কুরবানি দিতো। আমাদের কাফেলার সিদ্ধান্ত ছিলো মোয়াল্লেমের মাধ্যমে প্রতি জনের জন্য ৩৬০ রিয়াল করে একটি করে খাসী কিনে কুরবানি দেয়া হবে। বাংলাদেশে থাকতেই হজ্জ প্যাকেজের সাথে এই টাকা পরিশোধ করা হয়েছিলো। কুরবানির সময় ঘনিয়ে আসার আগে কাফেলার কেউ কেউ আমার কানে দিলেন যে কুরবানি করব আমরা আল্লাহ্‌র ওয়াস্তে। সেই কুরবানির পশু পছন্দসই হওয়া চাই। আমরা টাকা দিয়েই দায়িত্ব সারতে পারি না। নিজেরা গিয়ে দেখে কিনে কুরবানি দিতে চাই। আমি কথাটা মোয়াল্লেমকে জানালাম। তিনি বললেন
– আমি একজনকে কন্ট্রাক্ট দিয়েছি আমাদের জন্য একটি করে খাসী সরবরাহ করতে। তিনি আমার বিশ্বস্ত লোক। প্রতি বছরই তিনি আমাদেরকে কুরবানির খাসী সরবরাহ করে দেন।
– অসুবিধা নাই। আমরা সেই খাসীগুলি দেখে নিতে চাই।
– দেখার দরকার নাই। কুরবানির ব্যাপারে কেউ জালিয়াতি করে না।
– জালিয়াতির প্রশ্ন না। নিজের কুরবানির পশু নিজে দেখে দেওয়া ভালো। আমরা গিয়ে খাসীগুলি দেখে আসতে চাই।
– ওখানে যেতে পারবেন না। অনেক দূর। পুশুর দুর্ঘন্ধে যেতে পারবেন না।

মোয়াল্লেম যতোই মানা করছিলেন আমাদের খাসী দেখার আগ্রহ ততই বাড়ছিলো। শেষে আমার সাথে ৫ জন প্রতিনিধিদল নিয়ে খাসী দেখতে রওনা দিলাম। সাথে মোয়াল্লেম ছিলেন। কিছুদূর বাসে গিয়ে নামলাম এক জায়গায়। সেখানে এক মুন্সী টাইপের লোক এলেন। পরিচয় করিয়ে দিলেন তিনিই আমাদের খাসীগুলি সরবরাহ করছেন। তিনি খাগড়াছড়ির ভাষায় কথা বললেন। অর্ধেক বুঝলাম অর্ধেক বুঝলাম না। মোয়াল্লেম লোকটার খুব প্রশংসা করলেন। তিনি খুব ধার্মিক মানুষ। গরীব ছিলেন। অনেকদিন আগে পরিবার নিয়ে বাংলাদেশ থেকে চলে এসেছেন সৌদিআরব। এখানে তিনি ব্যবসা করেন। তিনি মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন আফ্রিকার কোন এক দেশের প্রিন্সের কাছে। আমরা না বুঝলেও লোকটি বকবক করে যাচ্ছিলেন। একসময় আমি লোকটিকে জানালাম যে আমরা আমাদের খাসীগুলি দেখতে চাই। সাথে সাথে তিনি জানালেন যে সেখানে আমরা যেতে পারবো না। শুনে আমাদের আগ্রহ আরো বেড়ে গেলো। দেখবই আমরা। এবার মোয়াল্লেম ওকালতি কমালেন। যাত্রা শুরু করলাম খাসীর খোয়ারের দিকে। আগে যাচ্ছিলেন লোকটি, তারপর মোয়াল্লেম, তারপর আমি, আমার সাথে আমার প্রতিনিধি দল। তখন ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমি মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষক। আমাকে মনে হচ্ছিল একজন ছাগলের পাইকার। পরনে ছিলো টুপি, পাঞ্জাবী, পাজামা ও প্লাস্টিকের সেন্ডেল। যেতে যেতে অনেকদূর চলে গেলাম। রাস্তাঘাটহীন মাঠের উপর দিয়ে ডেউ দিয়ে দিয়ে হাটছিলাম এক হাতে পাজামা টেনে ধরে আরেক হাতে নাক বন্ধ করে করে। হায়রে দুর্ঘন্ধ! মাঠে ছাগল মরে পড়ে আছে। কিছু কিছু ছাগল মরার অপেক্ষায় আছে। কতদিন যে খায় নাই তা জানা নেই। এসেছে অস্ট্রেলিয়ার মতো দূর দেশ থেকে জাহাজে করে। না খেয়ে খেয়ে শুকিয়ে গেছে। মাঠে মানুষের পায়খানার মতো পায়খানা পড়ে আছে। এত পায়খানা কেন জানতে চাইলে লোকটি জানালো যে এগুলি ছাগলের পায়খানা।
– ছাগলের পায়খানা তো বটি বটি গোটা গোটা থাকে। এগুলি তো মানুষের পায়খানার মতো।
– ঘাস খেলে ছাগলের পায়খানা বটি বটি হয়। এই ছাগলগুলি ঘাস পায় নাই। তাই এমন পায়খানা করেছে। কোন কোনটি না খেয়ে মরে পড়ে রয়েছে। এযেন এক যুদ্ধ শেষে যুদ্ধক্ষেত্র পরিদর্শনে এসেছি। কষ্ট হলেও আমরা এগিয়ে চললাম আমাদের প্রিয় ছাগলগুলিকে দেখতে। কেউ কোন কথা বলছিলাম না। মনে হলো মোয়াল্লেমও কোন দিন ছাগল দেখতে আসেন নাই। লোকটির বকবক থেমে গেছে। পায়খানা বেছে বেছে ডেউ পেড়ে এক সময় পৌছে গেলাম আমাদের ছাগলের কাছে। লোকটি দেখালো “এই গুলি আপনাদের ছাগল।” দেখলাম কিছু ছাগল শুয়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যগুলির শুধু হাড্ডি দেখা যাচ্ছে। কুরবানির দিন পর্যন্ত কয়টা টিকে থাকবে তা নিয়ে সন্দেহ হল। লোকটির মুখের দিকে তাকালাম। মাথা নিচু করে নিরব রইলেন। মোয়াল্লেমও কোন কথা না বলে নিরব রইলেন। প্রতিনিধিদের দিকে চেয়ে দেখলাম তাদের বুঝতে বাকী নেই। আমি যা বুঝেছি তারাও তাই বুঝেছেন। শুধু মোয়াল্লেমকে বললাম “আমাদের টাকা ফেরৎ দিন। আমরা এমন মরা ছাগল কুরবানি দিব না।” মোয়াল্লেম বললেন “ঠিক আছে।” আমরা ফিরে আসছিলাম। আমাদের সাথে দুইজন জল্লাদ যোগ দিলেন। তাদের মাথায় লাল পট্টি বাঁধা। কোমরে তরবারি ঝুলানো। তাগড়া জোয়ান। তাদের একজন বললেন
– আপনাদের কুরবানির উট লাগবে? ভালো ভালো উট আছে মার্কেটে। পছন্দ করে কিনতে পারেন।
– কোথায় উট?
– আছে। আপনারা চাইলে নিয়ে যাব আমরা।

– আপনারা কি করেন?
– আমরা উট জবাই করে দেই।
– আপনাদের দেখে বাংলাদেশি মনে হচ্ছে।
– আমরা বাংলাদেশি না। আমরা রোহিঙ্গা ছিলাম। অনেক বছর হয় আমরা বাংলাদেশি সেজে সৌদিআরব এসেছিলাম। এখানে এসে এই কাজ করে খাচ্ছি।
– উট কোথায়?
– উটের হাট ঐদিকে। চলেন উটের হাটে যাই। ভালো দেখে উট কিনে কুরবানি দেন। সেটাই ভালো হবে। উটের দাম বেশী না। সাতজনে মিলে একটি করে উট কিনে কুরবানি দেন। সাতটি খাসীর দামেই একটি উট পাবেন।
– উট জবাই করে কত রিয়াল নেন?
– জবাই করে টাকা নেই না।
– তাহলে আপনাদের লাভ?
– উট কুরবানি করে আপনারা সাধারণত একটা পা বা সিনার কিছু গোস্ত নেন। বাকীটুকু তো আর নেন না। আমরা অনেকগুলি উট জবাই করে অনেক গোস্ত পাই। সবগুলি হোটেলে বিক্রি করে দেই। হোটেলের সাথে কন্ট্রাক্ট থাকে। গোস্ত বেচা টাকায় আমাদের বছরের প্রায় ৯ মাস সংসার খরচ চলে যায়। হোটেলেও গোস্তগুলি প্রায় ৯ মাস পর্যন্ত রান্না করতে পারে।
– কুরবানির গোস্ত হোটেলে বিক্রি করা ঠিক?
– কুরবানির গোস্ত বিক্রি করা ঠিক না। আপনি কুরবানি করে আমাদের কাছে বিক্রি করতে পারবেন না। আবার সব গোস্ত খেতেও পারবেন না। নিজে খাওয়ার মতো গোস্ত রেখে যখন অন্যসবগুলি আমাদেরকে দিয়ে দেবেন তখন সেগুলি আমাদের মালিকানায় চলে যাবে। আমরা সেগুলি খেতেও পারি, বিক্রি করতেও পারি আবার ফেলে দিতেও পারি।
– উপজেলায় চাকরি করার সময় আমরা সৌদি সরকারের পাঠানো কুরবানির দুম্বার গোস্ত খেয়েছি। ইউএনও সাহেব অফিসারদেরকে দুম্বার গোস্ত ভাগ করে দিতেন।
– লাখ লাখ হাজী হজ্জের সময় লাখ লাখ পুশু কুরাবানি দেন। আগে সৌদি সরকার এগুলি সমুদ্রের পাড়ে নিয়ে জ্বালিয়ে দিতেন। কয়েকবছর হয় এগুলি ফেলে না দিয়ে হিমাগারে সংরক্ষণ করে জাহাজে করে গরীব মুসলিম দেশে খাওয়ার জন্য পাঠিয়ে দেন। এই তালিকায় বাংলাদেশও আছে।
– এই গোস্ত ধনী লোক হিসাবে আমাদের খাওয়া কি ঠিক হয়েছে?
– কুরবানির গোস্ত ধনী গরীব সবাই খেতে পারেন।
– আপনারা এত বড় উট জবাই করার জন্য শোয়ান কিভাবে?
– উট খাড়া অবস্থায় জবাই করা হয়। উটের গলার কাছে গিয়ে এই তরবারি দিয়ে এক খোঁচায় কেটে ফেলি। উট মরে গিয়ে পড়ে যায়। আমাদের কাছে এটা সহজ কাজ।

এমন কথাবার্তা বলতে বলতে আমরা উটের হাটের দিকে যেতে লাগলাম। পথে একটা গরীব গ্রাম দেখলাম। ছোট বেলার আমাদের পাহাড়ের এলাকার গ্রামের মতো দেখতে মনে হলো। পাহাড়ের উপর ছোট ছোট মাটির ও পাথরের ঘর। পুষ্টিহীন বাচ্চাকাচ্চারা গোল্লাছুট খেলছিল। বাংলায় কথা বলছিল। দেখতেও ছিলো বাংগালীর মতো। কোথাও কোন পানির ব্যাবস্থা নেই। সেই আমলে আমাদের এলাকায়ও অনেকে হাফ কিলো বা পোয়া কিলোমিটার দূর থেকে পানি এনে বাড়িতে খরচ করতো। এখন তো বাড়ি বাড়ি সাবমার্সিবল টিউবওয়েল দিয়ে পানি তুলছে সবাই। রোগা রোগা ছাগল ঘাস খাচ্ছিলো পাহাড়ের ধারে ধারে। কোথাও কোন গাছ ছিল না। এক বাড়ির পিছনে দেখলাম একটা অপুষ্ট লাউগাছ। তাতে একটা লাউয়ের জালি ধরেছিল। তাও আবার মেরা মেরা মাঝখানে চিকণ। দেখলাম, বাড়ির ভিতরের প্রস্রাবখানা থেকে চুইয়ে প্রস্রাব এসে পড়েছে লাউ গাছের গোড়ায়। ঐ প্রস্রাবই ঐ লাউগাছের জন্য খাদ্য।

আমি জিজ্ঞেস করলাম
– এদের তো বাংগালী মনে হচ্ছে। এই গরীব মানুষগুলি কি বাংলাদেশ থেকে এসেছে?
– না। এরা রোহীংগা উদ্বাস্তু ছিলো। দালালদের মাধ্যমে বাংলাদেশী সেজে এখানে এসে বসবাস করছে। শহরে গিয়ে কুলির কাজ করে খায়।

কয়েকজন ছেলে একপাল দুম্বা নিয়ে যাচ্ছিলো। দুম্বার লেজ দেখে আশ্চর্য হলাম। লেজ তো না যেনো একটা মাংসপিন্ড পিছনে দোলছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম
– দুম্বার লেজ দেখে মনে হচ্ছে মাংস পিন্ড ঝুলছে।
– এই লেজে তৈলাক্ত মাংস পিন্ড আছে। মাঝে মাঝে কোন কোন জ্যান্ত দুম্বার লেজের কিছু অংশ দুম্বার রাখালরা কেটে রান্না করে খায়। কিছু দিনের মধ্যেই আবার লেজ পুরা হয়ে যায়।

উটের হাটে গিয়ে পৌঁছলাম। শত শত উট বাধা ছিলো। অতো কাছে থেকে আমি এর আগে উট দেখি নাই। এত বড় বড় প্রাণী হলেও ছাগলের মতো আচরণ করছিলো উটগুলি। তবে ছাগলের চেয়েও এরা নিরিহ। ছাগল তো মাঝে মাঝে খুট্টি ধরে। কিন্তু উট খুট্টি ধরে না। পছন্দ করে প্রতিটি ২,১০০ টাকায় কয়েকটি উট কিনলাম। উটের গায়ে চিহ্ন দিয়ে উট বিক্রেতার নিকট রেখে এলাম। ফিরে এলাম হোটেলে। উটের হাটে পশুর দুর্ঘন্ধে অস্বস্তি লাগছিলো। নিশ্বাসের সাথে উটের পশম নাক দিয়ে প্রবেশ করছিলো। রুমে এসে অসুস্থ হয়ে পড়লাম। শরীর মেজ মেজ করছিল। বেশ হাঁচি হচ্ছিলো। গায়ের জামা থেকে উটের দুর্ঘন্ধ বের হচ্ছিল। জামা ধুইয়ে দিলাম।

কুরবানির দিন আমাদের মধ্য থেকে দুইজন প্রতিনিধি পাঠানো হলো আমাদের পছন্দকরা কুরবানি জবাই হলো কিনা এবং জবাইর সংবাদটা কুরবানি দাতাকে মোবাইল করে জানানোর জন্য।পশু জবাইর সংবাদ পেয়ে হাজীগণ মাথা মুন্ডান। আমি তাওয়াফ করার পর কুরবানির সংবাদের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। মোবাইলে মোয়াল্লেমের কাছে খবর আসলো আমাদের কুরবানি হয়ে গেছে। আমি মাথা মুন্ডানো বা ন্যাড়া করার জন্য মারওয়া পাহাড়ের কাছে এক সেলুনে প্রবেশ করলাম। ৩ টাকা ধার্য হলো ন্যাড়া করে দেয়ার জন্য। মাথা নত করে দিলাম সেলুনে। খুর দিয়ে মাথা চাছার সময় কয়েক জায়গায় কেটে গেলো। আমি মনে করলাম এই লোক পেশায় হেয়ার ড্রেসার না। হজের মৌসুমে বাড়তি কামাইয়ের জন্য মনে হয় এই কাজ করতে সেলুনে এসেছে। আমি রাগারাগি করছিলাম। উর্দু ভাষায় লোকটি কথা বলছিলো। ধরে নিলাম লোকটি পাকিস্তানি। এবার ভয় ঢুকে গেলো। যদি লোকটি আজ আমার উপর প্রতিশোধ নেয় ৭১ সনের? তর্ক না করে আমার মাথা পেতে দিলাম। চাছ, আরও চাছ। আরো কাট। কিছু বলবো না। ন্যাড়া হয়ে হোটেলে ফিরলাম। মোছ কাটার ক্যাচি দিয়ে আমার স্ত্রী স্বপ্নার চুলের আগা অল্প কিছু কেটে দিলাম। হজের এহরাম ভংগ করা হলো আমার মাথা ন্যাড়া করে এবং আমার স্ত্রীর চুল একটু কেটে। রাতে আমাদের কুরবানির উটের গোস্ত দিয়ে ভাত খেলাম। শুনলাম উটের একটি পা আনা হয়েছিলো। এটাই আমার জীবনে উটের গোস্ত খাওয়ার অভিজ্ঞতা। পরের দিন রেস্টুরেন্ট-এ নাস্তা করতে গিয়ে রুটির সাথে দুম্বার গোস্ত খেলাম। ওয়েটার বাংগালী ছিলো। তার কাছ থেকে জানতে পারলাম এই দুম্বার গোস্তও ছিল কুরবানির। রেস্টুরেন্ট মালিক কুরবানি জবাইকারীদের কাছ থেকে দুম্বার গোস্ত কিনে নিয়ে ফ্রিজে রেখে দিয়েছিলেন। সেই কুরবানির গোস্ত দিয়ে আমরা রুটি খেয়েছিলাম।


তারিখ : ৩/৩/২০১৯ ইং
স্থান: ময়মনসিংহ- কিশোরগঞ্জ – ময়মনসিংহ জার্নি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *