ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ডিজিটাল করার স্মৃতি

 

২০০০ সনের দিকে কলেজ কাউন্সিল আমাকে মেডিকেল এডুকেশন ইউনিট -এর দায়িত্ব দেন। ইতিমধ্যে কম্পিউটারে সামান্য বেসিক ট্রেইনিং নিয়ে বই পড়ে ও ইন্টেরনেট ঘাটাঘাটি করে ডিজিটাল জগতে মোটামুটি স্বশিক্ষিত হয়েছি। বৃটিশ কাউন্সিলের লোকজন এসে প্রস্তাব দিলেন তারা মেডিকেল এডুকেশন সেক্টরে কিছু উন্নয়ন করতে চান। অধ্যক্ষ আব্দুল্লাহ আক্তার আহমেদ আমার সাথে যোগাযোগ করতে বললেন। স্যার আমাকে খুব পছন্দ করতেন। এখনো প্রায় দুইএক মাস পর পর মোবাইলে আমার খোজ নেন। প্রতিদিন অফিস শুরুর আগে ত্রিশ চল্লিশ মিনিট সময় স্যারকে দিত হত। স্যারকে ডিজিটাল লাইফের খুটিনাটি শিখাতে হত।

বৃটিশ কাউন্সিল আমাদের মেডিকেল এডুকেশন রুম পরিদর্শন করলেন। আমাদের রুমে শুধু লম্বা একটা টেবিল ছিল। এই টেবিলের চার দিকে বসে আমরা মিটিং করতাম। তারা আমাকে প্রস্তাব দিলেন
-আমরা এই হল রুমে ১০/১২ টি অটবি টেবিল দিয়ে কনফারেন্স সিস্টেম করে দিতে চাই।
– দিলে ভালই হয়।
সাত দিন পড় তাই হল। আমি সই করে দিলাম। অধ্যক্ষ ওকে করে দিলেন।
-ফ্লোর তো মশ্রিন না।
-আমরা বাজেট এলে ফ্লোরম্যাট কিনে নেব।
-আপনাদের কিনতে হবে না। আমরাই কিনে দিচ্ছি। আপনি শুধু সই করুন।
-ঠিক আছে।
-আপনাদের এত বড় হল রুমের জন্য মাত্র একটি এসি, এতে হবে না। কমপক্ষে তিনটি এসি লাগবে।
-যেটি আছে সেটিও অকেজো। বাজেট এলে কিনে নেব।
-আমরাই দিয়ে দিচ্ছি তিনটি এসি।
এক সপ্তাহ পর হল রুম এসিযুক্ত হল।
বৃটিশ কাউন্সিল বললেন – আপনাদের কম্পিউটার ল্যাব আছে?
আমি -এই তো হল রুমের পাশেই তো আছে।
– কয়টি কম্পিউটার আছে?
– মাত্র একটি। তেমন ভাল না।
– একটি দিয়ে কাজ হবে না। আমরা তিনটি দিতে চাই।
– দেন।
এক সপ্তাহ পর তিনটি লেটেস্ট ব্রান্ড কম্পিউটার দিলেন।
– এই রুমের জন্যও তো এসি লাগবে।
– আমরা এসি কিনে স্টার্ট করব।
– আমরাই এসি দিয়ে দেই। সাথে ফ্লোর ম্যাট।
তিন দিন পর কম্পিউটার ল্যাবের এসি ও ফ্লোর ম্যাট হল। কম্পিউটার অপারেটর খুব খুশী।
দশ দিন পর ব্রিটিশ কাউন্সিলের উর্ধতন কর্মকর্তা এসে খোজ নিলেন কেমন কাজ হচ্ছে কম্পিউটার ল্যাবে।
– কোন কাজ হচ্ছে না। কম্পিউটার কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখেছি।
– কেন?
– আমাদের শিক্ষকরা কম্পিউটার ব্যবহার জানেন না।
– কম্পিউটার -এর উপর ট্রেনিং নিতে পারেন।
– আস্তে আস্তে নিয়ে নিবেন।
– আমরা বাহিরের কম্পিউটার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কি প্রশিক্ষণ দিয়ে আনতে পারি? এই শহরে কি এমন প্রতিষ্ঠান আছে?
– আছে। এপ্টেক নামে একটি আছে।
তারা এপ্টেক থেকে ফিরে এসে বললেন
– ওখানে দুই মাসের কোর্স আছে। সপ্তাহ ২ টি ক্লাস ২ ঘন্টা করে। ২০ জনের ব্যাচ। আমরা একটা ব্যাচকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দেই। আপনি সিলেক্ট করে দিন।
অধ্যক্ষ স্যার আমাকে কোঅর্ডিনেটর নিযুক্ত করে নোটিশ দিলেন আগ্রহী প্রার্থী যোগার করতে। প্রার্থী হয়ে গেল ৫০ জন। কাকে রেখে কাকে নিব। দুই এক জনকে বাদ দিতে চাইলাম। কিন্তু তারা নেতার সুপারিশ নিয়ে আসলেন। ব্যাপারটা জটিল হয়ে গেল। এমন সময় নতুন ডাইরেক্টর ব্রিগেডিয়ার সহিদ উদ্দিন স্যার এসে বললেন “সাদেক ভাই, আমাকে নিতে হবে। ” দেখাদেখি প্রিন্সিপাল, ভাইস প্রিন্সিপ্যালও নাম লিখালেন। হয়ে গেল ৫৩ জন। এখন কি করব?
ব্রিটিশ কাউন্সিল আসলেন
-২০ জনের লিস্ট করেছেন?
-না। ৫৩ জন হয়ে গেছে। কাউকে বাদ দিতে পারলাম না। এভাবে হবে না। আমি পারব না।
-ঠিক আছে, আরও ৭ জন যোগ করে ৬০ জন হলে তিনটি ব্যাচ করে দেন।
৭ জন অফিস সহকারী যোগ করে তিনটি ব্যাচের প্রশিক্ষণ হয়ে গেল। সবাই এপ্টেক থেকে সার্টিফিকেট পেলাম। সবাই খুশী। আমার প্রশংসা।
টিম আসল অগ্রগতি দেখার জন্য।
– সবাই কি মাল্টিমিডিয়ায় ক্লাস নেন?
– না।
– কেন? তাহলে প্রশিক্ষণ নিলেন যে?
– অডিও ভিসুয়াল এসিস্টটেন্টরা তো কম্পিউটার চালাতে পারে না। তাদের ছাড়া কিভাবে ক্লাস নিবেন?
– তাহলে তাদেরকেও প্রশিক্ষণ দিয়ে নেই?
– ভাল হয়।
এর পরে সকল তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী ও আরও সকল শিক্ষক মিলে মোট ৬০ জনের প্রশিক্ষণ হল। সর্বমোট ১২০ জনের প্রশিক্ষণ হল। শিক্ষক ও কর্মচারীদের বিরাট একটা অংশ কম্পিউটার শিক্ষিত হয়ে গেল । এবার প্রয়োগের পালা ।

সবাই আমার নিকট আসেন, কি ব্রান্ডের কোন কম্পিউটার কিনব? কারন, বাসায় কম্পিউটার না থাকলে কাজ করা যায় না । আমার মনে আছে প্রথম মাসেই আমি প্রায় ৬০টি কম্পিউটার সাথে গিয়ে কিনে দিয়েছি। মার্কেটে আমার চাহিদা বেড়ে গেল । বলে দিলাম যে কেউ যে কোন সময় কম্পিউটার সংক্রান্ত সমস্যা আমাকে বলবেন মোবাইলে । আমি সমাধান দেয়ার চেস্টা করব। সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আমার কাছে মোবাইল আসত কম্পিউটার সংক্রান্ত সমস্যার সমাধনের জন্য । আমি খুশি হয়ে মোবাইলেই সমা্ধান করে দিতাম ।

প্রায় সব শিক্ষক মাল্টিমিডিয়ায় ক্লাস তৈরি শুরু করলেন । মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রফেসর আকরাম স্যারও কম্পিউটারে বেশ পারদর্শী ছিলেন। আমি, আকরাম স্যার ও কম্পিউটার অপারেটর সবাইকে এ ব্যাপারে সাহায্য করতে লাগলাম । ক্লাসগুলি ডিজিটাল হল ।

এদিকে আকরাম স্যারের মাথায় ওয়েবসাইট তৈরির চিন্তা এসে গেল। তিনি শুভেচ্ছা মাল্টিমিডিয়ার কচিকে নিয়ে প্রাথমিক কিছু তথ্য সমৃদ্ধ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ওয়েবসাইট তৈরি করে অধ্যক্ষের অনুমতি নিয়ে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদ্ভোদন করে আপলোড করে দিলেন। বিল নিয়ে কচি চলে গেলেন। এদিকে আমি ওয়েবসাইট তৈরির খুটিনাটি শিখে ফেললাম। কচিকে নিয়ে সমস্যা হল। তিনি আমাদের কলেজের টেকনিক্যাল তথ্যগুলি নিয়মিত আপডেট করতে পারেন না। তাছাড়া মেডিকেল কলেজের তথ্যের থিম তার জানা থাকার কথা না। অধ্যক্ষ স্যারকে আমি এটা বুঝালাম। তিনি ওয়েবসাইটের দায়িত্ব আমাকে দিলেন । কচির নিকট থেকে পাসওয়ার্ড নিয়ে নিলাম । আমি অক্লান্ত পরিশ্রম করে ওয়েবসাইট সমৃদ্ধ করে আপডেট করা শুরু করলাম । সবচেয়ে বেশী কার্যকরী হল এলাম্নাই পেইজটি অর্থাৎ প্রাক্তন ছাত্রদের প্রফাইল । সারাবিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রাক্তন ছাত্রদের মিলন মেলায় পরিনত হল আমাদের এই পেইজ । একে অপরের অবস্থান ও পজিশন জানতে পারল । তখন তো ফেইসবুক ছিল না । এজন্য আমি সারা বিশ্ব থেকে ধন্যবাদ পাওয়া শুরু করলাম । আমার কাজের স্পৃহাও বেড়ে গেল । এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ডলার সংগ্রহ করে বেশ কিছু ডলার আমাদের হাসপাতাল ক্যাম্পাসে মসজিদ করার কাজেও ব্যয় করা হলো ।

ব্রিটিশ কাইউন্সিল আসলেন অগ্রহতি দেখতে । তারা খুব খুশী । আমাকে বললেন
-আপনারা ইন্টারনেট ব্যাবহার শিখেছেন?
-শিখেছি ।প্রত্যেকেই শিখেছি ।
-ব্যাবহার করেন ?
-আমি বাসায় টিএনটি টেলিফোনে ইন্টারনেট কানেকশন দিয়ে কাজ করি । বর্তমানে আমাদের একটি অফিসিয়াল ওয়েবসাইট আমি মেইন্টেইন করি বাসার ইন্টারনেট ব্যাবহার করে । কিন্তু খরচ অনেক বেশী ।
-বলেন কি? আপনাদের ওয়েবসাইট আছে ? তাহলে এটাই বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজগুলির মধ্যে প্রথম ওয়েবসাইট । আমরা আপনাদের কলেজে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কানেকশন দিয়ে দিতে চাই । কেমন খরচ ?
-আমি খোজ নিয়ে বলব।

শহরের কম্পিউটারের দোকান মিলেনিউয়াম কম্পিউটারের এমডি রতনের সাথে কথা বললাম । তারা ব্রিটিশ কাউন্সিলের সাথে কথা বলে তিন লাখ ষাট হাজার টাকায় তিন বছরের সার্ভিসের চুক্তি করল। সারা কলেজের সকল ডিপার্টমেন্টের পয়েন্টগুলি ও লাইব্রেরীতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেরনেট কানেকশন পেয়ে গেলাম । সমস্ত কর্মকর্তা কর্মচারী ও ছাত্রদের নিয়ে সেমিনার করে রতনকে দিয়ে ইন্টারনেট ব্রাউজিং ও ইমেইল এর উপর একটা প্রশিক্ষন হয়ে গেল ।এর পর থেকে ইমেইল ও চেটের মাধ্যমে আমরা ইন্টারডিপারমেন্টাল যোগাযোগ করা শুরু করলাম । আমরা পুরাপুরি ডিজিটাল লাইফে চলে গেলাম ।

ব্রিটিশ কাউন্সিল আসলেন অগ্রগতি দেখতে । খুশী হলেন । বললেন
-আপনাদের জার্নাল আছে নিজশ্ব?
-আছে, মানে পাবমেড ইনডেক্স ইন্টারনাশনাল জার্নাল আছে । এটাই এক মাত্র বাংলাদেশের পাবমেড ইনডেক্স মেডিক্যাল কলেজ জার্নাল।
-স্ট্রাঞ্জ! এটা ছাপাতে টাকা দেয় কে?
-কলেজ কর্তৃপক্ষ।
-প্রতি বছর কত টাকা লাগে?
-৬০/৭০ হাজার টাকা ।
-এটা ছাপানোর টাকা আমরা পে করতে চাই ।
-ভালই হয়।
-চলেন আপনাদের ছাত্রদের ক্লাস করার গেলারি দেখে আসি ।
-এখানে ক্লাস করতে ছাত্রদের তো বেশ কস্ট করতে হয়।
-হয় । আমরাও করেছি ।
-আমরা এক নাম্বার গেলারি এসি ও সাউন্ড সিস্টেম আপডেট করে দিতে চাই ।
-ভালই হয় ।
তাদের কথার উত্তরগুলি যদিও আমি দিচ্ছি এগুলি অধ্যক্ষের অনুমতি নিয়েই করা হচ্ছিল ।

এরপর ২৬টি বিষয়ে পোস্টগ্রাজুয়েট ডিগ্রি খোলা হল । তখন ২০০২ সন । প্যাথলজি বিভাগে শিক্ষক স্বল্পতা দেখা দিল । আমি তখন হেড । আন্ডার গ্র্যাজুয়েট পোস্ট গ্র্যাজুয়েট সব ক্লাস আমাকে নিতে হচ্ছে । মাল্টিমিডিয়ায় ক্লাস তৈরি না থাকলে এত ক্লাস নেয়া আমার সম্ভব হত না । প্রথম ৬ মাস ক্লাস নেয়ার সংখ্যা সার্ভে করে দেখা গেছে সকল ডিপার্টমেন্টের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট লেকচার ক্লাস নেয়ার মধ্যে প্যাথলজি সেকেন্ড । ই এন টি ফার্স্ট । এই প্রথম ব্যাচের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ছাত্ররা পাস করে কেউ সহকারী অধ্যাপক, কেউ সহযোগী অধ্যাপক ও কেউ কন্সাল্টেন্ট । আমাকেও ছাড়িয়ে গেছেন । দেখা হলে খুশী হয়ে কৃতজ্ঞতার সাথে সালাম দেন । মুখ দেখে মনে হয় একটু লজ্জাও পান । আমার জন্য একটু দঃখ প্রকাশ করেন । বলি “সবই আল্লাহর ইচ্ছায় হয় ।” আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি যে আমি ১৯৯৮ সন থেকে এখনও সহকারী অধ্যাপক । এজন্য কারও কোন দোষ নেই । আমারই ব্যর্থতা ।

২০০৮ সনে এই কলেজ থেকে আমাকে সরকার বদলী করে দেয় । সেই থেকে আমি এখানে নেই । ওয়েবসাইটের নাম পরিবর্তন করে অন্য নামে চলছে । হয়ত পরের জেনারেশন এখন এটা মেইন্টেইন করছে । হয়ত পরের জেনারেশন মেডিকেল কলেজকে আরও ডিজিটাল করে ফেলেছে । আমি কলেজের পশ্চিম পাশে বাড়ী করেছি । পাশ দিয়ে যাই । মাঝে মাঝে সন্ধায় খুব আলোকসজ্জা দেখতে পাই । তাকিয়ে থাকি । আমার বুকের মাঝে হু হু করে । এইত আমার ডিজিটাল মেডিকেল কলেজ । এইখানে আমি পড়েছি । এইটাকে আমি ডিজিটাল করেছি ।

==========
ডাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
ফেইসবুক পোস্ট
স্মৃতির পাতা থেকে
২২/৬/২০১৭

2 Replies to “ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ডিজিটাল করার স্মৃতি”

  1. Sir….apnar sriti kotha pore akdike jemon gorbobodh korchilam….abar shesher angshota pore khub koshto pelam….haire amar desh….haire tar shorkar….apnar Moto brilliant guni manusher kodor holona …. Allah to bujhben….valo thakben sir

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *