আবুলের বউ

(সামাজিক স্বাস্থ্য সমস্যা)
আবুল চা বিক্রি করে সংসার চালায়। জমি জমা নেই। গ্রামে থাকে। সকাল থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত বাজারেই কাটায়। নরম সভাবের। অনেকেই তাকে ঠকিয়েছে। তা নিয়ে তার দুঃখ নেই। আবুলের বউ মাঝে মাঝে মানুষের কাথা সেলাই করে কিছু কিছু পান। একটা কাথা সেলাই করলে দুই তিন শ টাকা পাওয়া যায়। অসুস্থ। শুইলেই কাশি উঠে। খুস খুসে শুকনা কাশি। আবুল বাজার থেকে কত রকম কাশির ঔষধ এনে দেয়। কোনটাতেই কাজ হয় না। কাথা সেলাই করে পাওয়া টাকা থেকে কিছু কিছু টাকা বাক্সে রেখে দেয়। গত তিন বছরে মাত্র পাচ হাজার টাকা সে জমাতে পেরেছে। তার বড় বোনের বাড়িতে টিভি আছে। গ্রাম হলে কি হবে বাড়ী বাড়ী ফাইবার অপটিক তারের ডিস লাইন আছে। বাংলা ও হিন্দি চেনেল ছাড়াও ডিস সাপ্লাই কারীদের নিজস্ব চেনেলও আছে। ঐসব চেনেলে রেকর্ডকরা পাইরেটেড সিনেমা নাটক দেখানো হয়। স্থানীয় ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনও দেখানো হয় এই সব চেনেলে। বড় বোন বলেছে “সখিপুর এক দরবেশ কবিরাজ আছে। তারে দৈনিক টিভিতে দেখায়। কত মানুষ তার কাছে যায়! কত জটিল জটিল রোগের চিকিৎসা তিনি যে করেন। সবাইরে টিভিতে দেখায়। তার কাছে চিকিৎসা নিয়া সবাই খুশী। চুক্তি কইরা গেরান্টি সহ চিকিৎসা দেয়। চল তারে একবার দেখাই। ”
বড় বোনের কথা তার বিশ্বাস হয়। কবিরাজ সিরিয়াল দিয়ে রুগী দেখেন। তার অনেক এসিস্টেন্ট। সব কথা শুনে তাকে এক কোর্স ঔষধ খাওয়ার বিধান দেন। তিন রকমের সিরাপ। তিন মাসের কোর্স। মুল্য ছয় হাজার টাকা। নিচুইটা ভালা অইয়া যাব। আবুলের বউ জানায় সে নিতান্ত গরীব মানুষ। কয়েক বছরের টাকা জমিয়ে মাত্র পাচ হাজার টাকা হয়েছে। তাই হাতে আছে। কবিরাজ এক হাজার টাকা মাফ করে দেন। নিয়মমতো ঔষধ খায় আবুলের বউ। কিছুই কমে না। বসে বসে শুধু কাশে।

আমি গ্রামে গিয়ে একদিন আবুলের বাড়ীতে বেড়াতে গেলাম।
-আবুলের বউ কই?
-ঐ যে ঘরের ভিতর বইসা বইসা কাশতাছে।
-তোমার কি সমস্যা?
আবুলের বউ উল্লেখিত ঘটনাগুলি বিস্তারিত জানাল।
-তুমি এই কবিরাজের কথা বিশ্বাস করলা?
-হাজার হাজার রুগী তারে সিরিয়াল দিয়া দেহায়। হাজার টাকা ভিজিট নেয়। সবাই খুশী অইয়া দেয়। চেহারাও দরবেশের মতো। এই যে দেহুন তার ছবি।
-এইগুলি ভুয়া। কিছুই হবে না এইগুলি খেয়ে। পানি বা মদ ছাড়া এগুলি কিছুই না। তুমি ময়মনসিংহ আস। আমি তোমাকে বড় ডাক্তার দেখায়ে দিব।
-আমি টেহা পামু কুনু। সব ত দিয়া দিলাম।

দুইমাস পর আবুলের বউ ময়মনসিংহ আসল। আমি আমার কার্ডের পিছনে রুগীটি গরীব লিখে একজন বিশেষজ্ঞ ডারক্তাভ রের কাছে পাঠালাম। ডাক্তার অল্প কয়েকটি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করায়ে রোগ নির্ণয় করলেন। সবাই শুধু খরচটা নিয়েছেন। তার পড়েও হিসাব করে দেখলাম তার দুই হাজার টাকার মত খরচ হয়েছে। রোগ ধরা পরেছে মাইট্রাল স্টেনোসিস। অর্থাৎ হার্ট বা হৃদপিন্ডের ভালব শক্ত হয়ে সরু হয়ে গেছে। ভালবের আগের অংশ ফুলে উঠে ফুস ফুসে চাপ পরেছে। ফুসফুসে চাপ পরলে রুগীর খুস খুসি কাশি হয়। আবুল বলল
-কি রোগ ধরা পরল?
আবুলকে বুঝিয়ে বললাম।
-রোগটা হইল কেমনে?
-ছোটবেলায় হয়ত গলায় ইনফেকশন হয়েছিল। সেখান থেকে রিউমাটিক ফিভার হয়ে রিউমাটিক কার্ডাইটিস হয়েছিল। গরীব মেয়ে। চিকিৎসা করাতে পারেনি। এখন সেখান থেকে মাইট্রাল স্টেনোসিস হয়েছে।
-এইগুলির কিছু আমি বুঝি না। তা ভাল হবে তো?
-ঔষধ খেলে কিছুটা ভাল থাকবে। তবে আরো ভাল চিকিৎসার জন্য ঢাকার হৃদরোগ হাসপাতালে যেতে হবে। অনেক টাকা খরচ হতে পারে।
-যা ছিল তার সব শেষ। আমি কি ঢাকায় যাইতে পারমু?

আমি তাকে কিভাবে বুঝাব বুঝতে না পেরে মাইক্রোস্কোপে চোখ রাখলাম। কি দেখলাম আমিও জানি না। আবুলের প্রশ্ন থেকে নিজেকে লুকানো ছাড়া আমি কিই বা করতে পারি। আমি এখনো যেন কল্পনায় দেখতে পাই আবুলের ছোট্ট অসহায় বউটি মেঝেতে পাটি বিছিয়ে খুস খুসিয়ে কাশছে আর কাথা সেলাই করছে আবার আরেক দরবেশ কবিরাজের জন্য টাকা জোগারের জন্য।
===
ডাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
১১/১/২০১৮

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *