রবির বনভোজন

লাইব্রেরিয়ানের বড় মেয়েটা খুব মেধাবী। গতবার এমবিবিএস পাস করে ডাক্তার হয়েছে। লাইব্রেরিয়ানের স্বপ্ন ছিল তার মেয়াটা ডাক্তার হবে। মেয়েটা মায়ের সব কথা শুনে। গত মাসে ইন্টার্নির প্রথম ভাতা পেয়েছে। বিশ হাজার টাকা ভাতা পেয়েছে। তা থেকে পনর হাজার টাকা দিয়ে একটি এন্ড্রয়েড মোবাইল কিনে তার মাকে গিফট দিয়েছে। বাবা অফিস সহকারী। আগামী মাসে ভাতা পেয়ে তার বাবাকেও অনুরূপ একটা মোবাইল গিফট দেয়ার ইচ্ছা তার আছে।

রবিউল প্রিন্সিপাল সাহেবের অফিস সহায়ক। সবাই তাকে রবি বলেই ডাকে। রবি অত্যন্ত ভদ্র অনুগত একজন কর্মচারী। প্রিন্সিপাল সাহেবের রুমে সে অফিস টাইম শুরু হওয়ার আগেই উপস্থিত হয়। সবাই চলে যাবার পর সে দরজা জানালা বন্ধ করে ওয়াসরুম চেক করে মেইন গেইটে তালা লাগিয়ে বাসায় চলে যায়। অনেকেই অফিসের কাজ ফাঁকি দিয়ে অন্য কাজে জড়িত থাকলেও এনিয়ে তার কোন আফসোস নেই। এখনো বিয়ে করেনি রবি। ছোট বোনকে বিয়ে দেয়ার পর সে বিয়ে করবে। প্রিন্সিপালের টেবিলে কয়েকটি জাতীয় দৈনিক খবরের কাগজ থাকে। কাজের ফাকে ফাকে সে টুলে বসে পেপার পড়ে । কতরকম খবর বের হয় খবরের কাগজে! সিলেটে শিশু রাজনকে এক প্রভাবশালী পিটিয়ে হত্যা করেছে। সেই মাইরের দৃশ্য মোবাইলে রেকর্ড করে ইউটিউব ও ফেইসবুকে একজনে ছেড়ে দিয়েছে। দেখে লাখ লাখ মানুষ মানব বন্ধন করেছে। পেপারে তার ছবি দিয়েছে। সেই খুনির ফাসীর আদেশ হয়েছে তা সে পেপারে পড়েছে। সিলেটে প্রেমে প্রত্যাখ্যান করায় খাদিজা নামে এক মেয়েকে নির্মম ভাবে কুপিয়েছে এক ছাত্র। সেই কুপানোর ভিডিও মোবাইলে রেকর্ড করে সারাবিশ্বে ইউটিউব ও ফেইসবুকে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সারাদেশ প্রতিবাদে মুখর হয়েছে। রবি সেই ভিডিও বন্ধুদের মোবাইলে দেখেছে। রবি বুঝতে পেরেছে যে খুনের প্রতিবাদ করতে না পারলে ভিডিও ধারন করে ছড়িয়ে দিতে পারলে ভিকটিমের বিচার পাওয়া সহজ।

কলেজ থেকে শিক্ষক সমিতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বার্ষিক বনভোজন করার। সকল শিক্ষক পরিবার নিয়ে বনভোজনে যাবে। সাথে কলেজের একাডেমিক ভবনের সকল কর্মচারীও যাবে। তাদের চাঁদা দিতে হবে না। শুধু শিক্ষগণ চাঁদা দিবেন। যথারীতি বিনা চাঁদায় রবিও বনভোজনে যাওয়ার সুযোদ পেল।

২ ফেব্রুয়ারি বনভোজনের দিন ঠিক হল। সকাল ৭টায় কলেজ ক্যাম্পাস থেকে যাত্রা শুরু। সকাল ৯ টায় ময়মনসিংহ পৌছে ময়মনসিংহের পার্টিসিপেন্টদের নিয়ে একটি নামকরা রেস্টুরেন্টে নাস্তা করা, সেখান থেকে বনভোজনের মুল স্পট পিকনিক স্পটে বনভোজন করে সাফারি পার্কে বেড়ানো ছিল সেদিনের প্রোগ্রাম।

লাইব্রেরিয়ান দুইটি মোবাইল সাথে নিলেন। একটা কম দামী মোয়াইল, যেটা তিনি সব সময় ব্যবহার করেন। এটা অনেক বছর আগে তার স্বামী জন্মদিনে গিফট দিয়েছিলেন। এটা সাধারণ মোবাইল হলেও তখন এটাই দামী মোবাই ছিল। তার মেয়ের কাছে এই মোবাইলটা এখন পছন্দ হয় না। কয়েকবার মেয়ে অনুরোধ করেছে এই মোবাইলটা ব্যবহার না করতে। সে বলেছে

-আম্মু, তোমার এই ব্যাকডেটেড মোবাইলটা আর ইউজ করনা তো। একটা এন্ড্রয়েড টাচ স্ক্রিন মোবাইল ব্যবহার করবে। তোমার সাথে আমি ফেইসবুক মেসেঞ্জারে ভিডিও কল করে কথা বলব।

-এই মোবাইলটা তোর আব্বা আমাকে গিফট করেছিল আমার জন্মদিনে। অনেক বছর ধরে ব্যবহার করছি। এটাতেই অভ্যস্ত হয়ে পরেছি। এটার প্রতি মায়া ধরে গেছে। এটা ফেলতে পারব না। তাছাড়া আমি টাচ মোবাইল চালাতে পারব না।

-তাহলে আমি যে একটা দামী এন্ড্রয়েড টাচ মোবাইল দিলাম ওটা কি করবে?

-ওটাও থাক। পরে ব্যবহার করব।

-তুমি এটাও নিয়ে যাও। ছবি তুলবে। ভিডিও করবে সুন্দর সুন্দর দৃশ্যের। এই যে এখানে টিপ দিয়ে ক্যামেরা অন করবে। এখানে টিপ দিলে ছবি ওঠবে। এখানে টিপ দিলে ভিডিও রেকর্ড হবে। এখানে টিপ দিলে ভিডিও সেইভ হবে।
-তাহলে নিয়ে যাই। আমি যদি না পারি রবিকে দিয়ে ছবি ওঠাব। ও পারবে। ও খুব ভাল ছেলে। ও আমাকে মায়ের মত ভক্তি করে।
কলেজে পৌছে রবির হাতে এন্ড্রয়েড মোবাইলটি দিয়ে লাইব্রেরিয়ান বললেন “রবি, এই নেও মোবাইল। নতুন মোবাইল। মেয়ে প্রথম ভাতা পেয়ে আমাকে গিফট করেছে। এখনো ইউজ করা হয় নি। মেমোরি একদম খালি। এটা আমি ইউজ করতে পারি না। তুমি আমাদের ছবি তুলে দেবে। এটা তোমার কাছেই থাকবে। সাবধানে রাখবে। হারায় না যেন।
-ঠিক আছে, আন্টি।

সকাল ৭টায় কলেজ ক্যাম্পাস থেকে যাত্রা শুরু হল। সবাই পিকনিকের সাজে সেজেছে। আনন্দ আনন্দ ভাব শুরু হয়ে গেছে। গ্রুপে গ্রুপে ছবি তোলা হচ্ছে সেল্ফি স্টিক দিয়ে। কলেজের কার, মাইক্রোবাস, বড় বাস ও কয়েকটি প্রাইভেট কার পিকনিক বহরে যোগ দিল। প্রিন্সিপ্যাল, ভাইস প্রিন্সিপ্যাল কলেজের কারে রওনা দিলেন তাঁদের পরিবার নিয়ে। কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষক উঠলেন কলেজের মাইক্রোবাসে। জুনিয়র শিক্ষক ও কর্মচারীরা উঠলেন বড় বাসে। গাড়ি চলছে ময়মনসিংহের পথে। কারের শিশুরা মনে মনে বলছে “সবাই এক গাড়িতে গেলেই বেশী মজা হত। ” মাইক্রোবাসের কিশোররা মনে মনে বলছে “বড় বাসে গেলেই ভাল হত। ডান্স করতে করতে যেতে পারতাম। ” বড় বাসের যাত্রীরা মনে মনে বলছে ” যারা প্রাইভেট কারে যাচ্ছে তারা কত আরাম করে যাচ্ছে। ”

সকাল নয়টায় ময়মনসিংহের সেই রেস্টুরেন্টে এসে পৌছল। রেস্টুরেন্টের তিনটি বড় রুম নাস্তার জন্য রিজার্ভ করা ছিল। ফ্রেশ হয়ে সবাই নাস্তায় বসে পরল। ভুনাখিচুড়ি ও ডিম দিয়ে নাস্তা খাওয়া হল। শেষে এক মগ কফি। নাস্তা খেয়ে সবাই গাড়িতে উঠলেন। দেখা গেল নুরুল্লাহ সাহেব উঠেন নি। কেউ বলতেও পারছেন না তিনি কোথায় গেলেন। অনেক খোঁজাখুঁজি করা হল। মোবাইলও রিসিভ করছেন না। সবাই বিরক্ত হচ্ছেন “এখানেই যদি দিন শেষ করে ফেলি রিসোর্টে গিয়ে কি দেখব?” ঐতো নুরুল্লাহ সাহেব আসছেন।

-আরে, নুরুল্লাহ ভাই, আপনে কই গেছলেন?

-সরি, নাস্তা খাওয়ার পর আমার বাথরুম চাপে। এটা আমার একটা সমস্যা।

-তয়, বলে যাবেন না? আর এতক্ষণ লাগে বাথরুম সারতে?

-সারার পরও কিছুক্ষণ বসে থাকতে হয়। পেট ব্যথা হয়। মিউকাস পরে। তাছাড়া ভাল করে একটু অজু সেরে নিলাম। আজ জুম্মাবার তো।

-পেট ব্যাথা করে, মিউকাস পরে, বয়েস হয়েছে। বলা যায় না কি হচ্ছে। কলনোস্কোপি পরীক্ষা করে নিবেন।
গাড়ি চলছে হাই ওয়ে দিয়ে তিব্র ঘতিতে। সন্দীপ বাবু র‍্যাফেল ড্রর টিকিট বিক্রি শুরু করলেন ভং করে করে। মুল্য যে যা দেন বা যার কাছ থেকে যত আদায় করা যায়। লাইব্রেরিয়ান দুইটি টিকিট নিলেন। একটি দিলেন রবিকে। জিম্মা সাহেব নাক ডেকে বাসের সীটেই ঘুমাতে লাগলেন। তিনি খুব পরিশ্রম করেন। তাই অল্পতেই তার ঘুম ধরে যায়। অন্যরা নানা রকম চুটকি বলে বলে অট্ট হাসি হাসছে। তাতেও জিম্মা সাহেবের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে না। এক সময় রাস্তায় গাড়ির জ্যাম লেগে গেল। কেন লাগল তা বুঝা যাচ্ছে না। রবি নেমে এগিয়ে গেল। ফিরে এসে বলল সামনে একটা প্রাইভেট কারকে ট্রাকে মেরে দিয়েছে। তাই গ্যাঞ্জাম লেগেছে। সবাই বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে। রাস্তায়ই তো সময় খেয়ে নিল। পিকনিক হবে কখন? রফিক সাহেব বলেন “রাস্তাও পিকনিকের একটা অংশ। আপনারা আনন্দ করুন। জোকস বলুন। বাচ্চারা গান গাও। ” জিম্মা সাহেবের ঘুম ভেংগে গেল। সবাইকে একটা করে লজেন্স দেয়া হল। সবাই লজেন্স মুখে দিয়ে চোটকাতে লাগল। জিম্মা সাহেবের নাম্মারে মোবাইল আসলো। কল করেছে তার কলেজ পড়ুয়া মেয়ে। মেয়ে বলছে

-আব্বু, তুমি কোথায়?

-আমি বাসে, পিকনিকে যাচ্ছি।

-পিননিক কোথায়?

-গ্রীন ভিউ রিসোর্টে।

-এতো সুন্দর যাওগায় যাচ্ছো, আমাকে নাও নি কেন? গত সপ্তাহে আমার বান্ধবী তার আব্বু-আম্মুর সাথে ওখানে গিয়েছিল। সে কত গল্প করল। খুব সুন্দর নাকি দেখতে। আমাকে না জানিয়ে গেলে কেন? আম্মুকে বলেছিলে?
জিম্মা সাহেবের গলা শুকিয়ে গেল। মেয়ের কাছে ধরা খেয়েছে। বুঝাতে চেষ্টা করলেন।

-আমি নিজেও যেতে চাই নি। প্রিন্সিপাল স্যার গতকাল জোড় করে বললেন যে সবাইকে যেতে হবে। তাছাড়া তোমার আম্মুকে কয়েকদিন আগে বলেছিলাম যে যাবে নাকি। তোমার আম্মু আগ্রহ দেখায় নি। আরেকদিন আমরা তিনজন যাব নে। মন খারাপ করো না।

গাড়ির জ্যাম ছেড়ে দিয়েছে। সবাই জানালা দিয়ে দেখল দুর্ঘটনা কবলিত কার ও ট্রাকটি ছাগলের ঢিপ ধরার মত মুখোমুখি মাথা লাগিয়ে মাথা চেপ্টা করে ফেলেছে। কিছুদূর যাওয়ার পর গাড়ি হাই ওয়ে ত্যাগ করে বনের ভিতর দিয়ে চিপা রাস্তায় ঢুকল। কিছুক্ষণ পর পর ছোট ছোট গ্রাম্য বাজার। রাস্তার দুইপাশে নানারকম শব্জি ও ফল মুল বিক্রি করছে ঝাকা রেখে। তাই গাড়ি এগুতে পারে না। মাঝে মাঝে উলটা দিক থেকে গাড়ি এসে আটকা পড়ে। কোন মতে কষ্ট করে পাশ কেটে যেতে হচ্ছে। তার উপর আবার ভাংগাচুড়া রাস্তা। থেকনাতে থেকনাতে নিয়ে যাচ্ছে। নুরুল্লাহ সাহেব চিৎকার দিয়ে উঠেন “বাবারে, কোমরের হাড্ডি ছুটে গেলো! ” জানালা খুললে ধুলা প্রবেশ করে।

কিছু কিছু গরম লাগাও শুরু হল।

দুপুর ১২ টায় পৌছল পিকনিক স্পটে। ঢুকেই সবাই আনন্দিত। বিভিন্ন রকম চমৎকার গাছ গাছড়া, লেইক, কৃত্তিম পশুপাখি দিয়ে সাজানো হয়েছে পিকনিক স্পট। সবাই দেখা শুরু করল ঘুরে ঘুরে। রবিও কিছু ছবি তুলল তার নিজের পছন্দ মত। কিছু ছবি তুলল লাইব্রেরিয়ান ও তার সংগীদের। রবির ছবি কেউ তুলল না। তবে কয়েকটি সেল্ফি সে তুলেছে। জুম্মার নামাজের সময় নুরুল্লাহ সাহেবের সাথে একটা গ্রুপ স্পটের বাইরে গ্রামের এক হাফ পাকা মসজিদে গেল। রাস্তা খুজে পাওয়া যাচ্ছিল না। মাইকে ইমাম সাহেবের বয়ান শুনে শুনে নুরুল্লাহ সাহেবেরা এগুচ্ছিল। এক জায়গায় এসে তারা আর পথ খুজে পাচ্ছিলেন না। চার পাচটি বাড়ি খুজে কোন লোক পাওয়া গেল না জিজ্ঞেস করার মত। অবশেষে কোন মতে কষ্টে মসজিদ পাওয়া গেল। সবাই জুতা খুলে হাতে নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করল। স্থানীয় ছেলেপেলেরা বলছিল যে জুতা বাইরে রেখে যান কেউ নিবে না। কিন্তু কেউ তাদের কথা মানলেন না। ভাবলেন, বাইরে রাখলে যদি জুতা হারিয়ে যায় তখন এই লোকগুলিকে কি পাওয়া যাবে? খালি পায়ে এই পথ পাড়ি দেব কেমনে। আর স্পটে ঘুরবই বা কেমনে? নামাজে সালাম ফিরিয়ে সবাই চলে আসল পিকনিক স্পটে। এসে দেখা গেল বেনামাজিগণ খাওয়া শুরু করে দিয়েছে। সবাই খাওয়া শুরু করে দিল। করিম সাহেব খচ্ছিলেন না। তিনি বললেন যে ঢাকা থেকে তার স্ত্রী প্রাইভেট কারযোগে আসছেন। আসলে একসাথে খাবেন। একজন বললেন “আপনি আমাদের সাথে কিছু খান। আমরা আপনার বিবির কাছে বলবনা।” সবাই হাসলেন “হা, হা, হা।” করিম সাহেব বললেন ” স্ত্রীর সাথে বেইমানী করা যাবে না।” সবাই আবার হাসলেন “হা, হা, হা।” খাওয়া শেষে ব্যানার সামনে নিয়ে কয়েকটি গ্রুপ ছবি তুলে দিল রবি। তারপর অল্পকথা, হাসাহাসি ও র‍্যাফেল ড্র হল। র‍্যাফেল ড্রতে রবি একটা ছোট পুরস্কারও পেল। প্রতিটি বাচ্চার মাথায় একটি করে ক্যাপ পরানো হল। বাচ্চারা সবাই খুশী। এদিকে বেলা শেষ হয়ে যাচ্ছে। সাফারি পার্কে যেতে হবে বিকেল পাচটার মধ্যেই। সবাই গাড়িতে উঠে বসলেন। গাড়ি চলল সাফারি পার্কের দিকে। এই পথ আরো খারাপ। কাটায় কাটায় ঠিক বিকেল পাচটায় পৌছল সাফারি পার্কে। তাড়াতাড়ি টিকেট করে সবাই ঢুকে পরল। কিছুক্ষণ ফুলের বাগানে ঘুরাঘুরি করে বনে মুক্ত অবস্থায় বিচরণরত সিংহ, বাগ, জিরাফ ইত্যাদি দেখার জন্য মাইক্রোবাসের টিকিট করে লাইনে দাড়াল। রবি দেখতে পেল অদুরে কয়েকজন ছেলে একটা ছেলেকে বেদম মাইর দিচ্ছে। মেরেই ফেলবে হয়ত। রবি এগিয়ে গেল। মোবাইল ক্যামেরা অন করে ভিডিও রেকর্ড করা শুরু করল। পিছন থেকে খপ করে ধরে ফেলল রবিকে এক নিরাপত্তাকর্মী । আরেক নিরাপত্তাকর্মী তার হাত থেকে মোবাইল কেরে নিয়ে নিরাপত্তা কক্ষে চলে গেল। রবির কলারে ধরে দুই চাপায় ঘুষাইতে ঘুষাইতে তাকে আরেক কর্মী নিয়ে গেল নিরাপত্তাকক্ষে। লাইব্রেরিয়ান ও পার্টির কয়েকজন দৌড়িয়ে গিয়ে রবিকে উদ্ধারের চেষ্টা করলেন। কি হয়েছে কেউ বুঝতে পারছিলেন না। এদিকে মাইক্রোবাস এসে গেছে যাত্রিদের নেয়ার জন্য। নিরাপত্তাকর্মীদের কবল থেকে রবিকে উদ্ধার করে সবাই সাফারি বাসে উঠলেন কিন্তু রবি উঠল না। বন্য জন্তু দেখায়ে সাফারি বাস ২০ মিনিটের মধ্যে ফিরে আসল। রবি সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। এবার রবিকে নিয়ে লাইব্রেরিয়ান নিরাপত্তাকক্ষে গেলেন মোবাইল ফেরৎ আনতে। লাইব্রেরিয়ান নিরাপত্তাকর্মীদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন

-আমাদের ছেলে কি অপরাধ করেছে যে তোমরা এভাবে তাকে মারলে?

-সে খুব বড় অন্যায় করেছে। মারামারির দৃশ্য ভিডিও করেছে মোবাইলে ভাইরাল করার জন্য।

-সেটা কি জিনিস?

-আন্টি, বুঝলেন না? মানে, এই ভিডিও ফেইসবুক ও ইউটিউবে ছড়িয়ে দিলে সারা বিশ্বের মানুষ জেনে যেতো যে এত সুন্দর জায়গায় মারামারি হয়। আমাদের বদনাম হত। এই মোবাইল দেয়া যাবে না। তদন্ত করা হবে।

-বাবা, ও একটু বোকামি করেছে। ও আমার ছেলের মত। তোমরাও আমার ছেলের মত। মোবাইলটা আমি বাসা থেকে নিয়ে এসেছি। ওটা ওর না। আমি মেয়ে মানুষ। মোবাইল রেখে গেলে বাসায় কি জবাব দিব। বাবা, ওর পক্ষ থেকে আমি মাফ চাচ্ছি, মোবাইলটা বাবা দিয়ে দাও।

-মোবাইলে ভিডিও আছে। ওটা দেয়া যাবে না।

-তোমরা যদি ভিডিও মুছে ফেলতে পার মুছে ফেল। দরকার হলে সব মুছে ফেল। তবু আমার মোবাইলটা দিয়ে দাও।

-দাড়ান। মেমোরি কার্ডটা ফর্মাট করে দেই। এই দিলাম ফর্মাট। সব ডিলিট হয়ে গেল। এখন মোবাইলে কিছুই রইল না। নিন।

-অনেক ধন্যবাদ তোমাদের। বাবারা ভাল থাক। আস বাবা রবি।

রবি গাড়িতে উঠল। সবাই গাড়িতে উঠেছে। গাড়ি ফিরে চলছে বন্য রাস্তা দিয়ে। অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। সবাই ক্লান্ত। রবিও ক্লান্ত। মাইরের জায়গাগুলিতে ব্যাথা বেড়েই যাচ্ছে। একে একে সব যাত্রী ঘুমিয়ে পড়ছে। রবির ঘুম আসছে না। রবির মনে পরল মোবাইল ভর্তি করে কত ছবি ও ভিডিও রেকর্ড করেছিল। সেই মোবাইলের মেমোরি এখন খালি। কিন্তু তার মনের মেমোরি ভরা আছে কত আনন্দ আর বেদনায়!

[বিদ্র: সকল ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক]

==

ডাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৭/৩/২০১৮

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *