কয়েক দিনেই সব শেষ

রফিক সাহেবের জ্বর সারছেই না। প্রথম তিন তিন প্যারাসিটামল খেয়েছিলেন। তিব্র জ্বর। প্যারাসিটামলে কিছুই হল না। ডান পায়ের বৃদ্ধাংগুলে পচন ধরেছিল। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস রুগীর বেলায় এমনই হয়। দশ বার বছর হয় রফিক সাহেবের ডায়াবেটিস হয়েছে। ডাক্তার দেখায়েছেন অনেকবার। কোন ঔষধ ও কোন ডাক্তারেই তার সন্তুষ্টি নেই। তাই যখন যে তাকে যে ডাক্তার দেখাতে বলেন তখন সেই ডাক্তারই দেখান। বেশীর ভাগ ডাক্তারই তাকে ইন্সুলিন ইঞ্জেকশন নিতে বলেন। কিন্তু তিনি ইঞ্জেকশন নেন না। ট্যাবলেট ও বনাজি ঔষধ খেতেই তিনি সাচ্ছন্দ বোধ করেন। তার পায়ে তিব্র ইনফেকশন হয়েছিল। জীবাণু ধ্রুত তার রক্তে মিশে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল।

রফিক সাহেবের শেলিকার ছেলে ডাঃ সেলিম একজন নবীন চিকিৎসক। তাকে কল করা হল। সে দেখেই বলে দিল “খালুজানের সেপ্টিসেমিক শক হয়েছে। শীঘ্র স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। ” রফিক সাহেবের স্ত্রী খাদিজা বললেন “বাবা, তাহলে তাড়াতাড়ি এম্বুলেন্স কল কর।”

এম্বুলেন্স এসে গেল। রফিক সাহেব অজ্ঞান। কোন মন্তব্য করার সামর্থ্য তখন তার নেই। হাসপাতাল ও ডাক্তার বাছাবাছি করার ক্ষমতাও তার নেই। তার শরীরের কন্ট্রোল তখন অন্যদের হাতে। রাজধানীর নাম করা একটা পেয়াইভেট স্পেশালাইজড হাসপাতালে তাকে নেয়া হল। ডাক্তার দেখেই বলে দিলেন “রুগী বাঁচাতে হলে আই সি ইউ তে রাখতে হবে। ” তাই করা হল।

রফিক সাহেবের অসুস্থতার খবর আত্বীয় সজনদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। সবাই হাসপাতালে গিয়ে উপস্থিত হল। অনেকেই খবরের কাগজে আই সি ইউ এর ভয়াবহতার কথা খবরের কাগজে পড়েছে। তাতে দেখা গেছে এর ভিতরে ঢুকলে খুব কম সংখ্যকই জীবিত বের হয়ে আসে। টাকা যে কি পরিমাণ ব্যায় হয় তা শুনে অনেকের চোখ চরক গাছে ওঠে। অনেকে টাকার কথা শুনে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে হাসপাতাল ভাংচুর ও নিরিহ ডাক্তার পিটিয়ে আহত করে।

রফিক সাহেবের অসুস্থতার খবর নিউইয়র্ক প্রবাশী তার আরেক শেলিকার ছেলে ডাক্তার হারুনের কাছেও চলে গেল। শুনেই হারুন সাহেব চলে আসলেন বাংলাদেশে তার খালুজানকে দেখতে। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কাউকে আইসিইউতে প্রবেশের অনুমতি দেন না। বিশেষ অনুরোধে ডাক্তার হারুনকে অনুমতি দেয়া হল। হারুন সাহেব বের হয়ে এসে বললেন “এখানে একই রুমে চারজন রুগী রাখা হয়েছে। আমি যতদূর জানি আই সি ইউ তে এক রুমে একজনের বেশী রুগী রাখা ঠিক না। ” অনেক খোজ করেও এমন আই সি ইউ এর সন্ধান তারা পেলেন না। উপায়ান্তর না পেয়ে হারুন সাহেব সিংগাপুরের সম্ভ্রান্ত এক হাসপাতালের তার এক বন্ধুকে ফোন দিলেন সব জানিয়ে। বন্ধু সিংগাপুর হাসপাতালের এজেন্ট গুলশানের একটা ঠিকানা দিয়ে দিলেন। মুহুর্তের মধ্যে সব ঠিক ঠাক হয়ে গেল। রাজধানীর স্পেশালাইজড হাসপাতাল ১৬ দিনের জন্য ১৬ লাখ বিল দাবী করল। রবিক সাহেবের স্ত্রীর একাউন্টে গচ্ছিত ১৬ লাখ টাকার সম্পুর্ন এক চেকেই পরিশোধ হয়ে গেল। তার একাউন্টে আর কোন টাকা রইল না। রফিক সাহেবের বয়স এখন নব্বইর কাছা কাছি। তিনি একজন সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন। একাউন্ট অফিসার ছিলেন। কোন সময়ই কোন অবৈধ টাকা গ্রহন করেন নি। খুব মিতব্যয়ী ছিলেন।

রুগী রিলিজ করে বিমানে করে রফিক সাহেবকে সিংগাপুর নিয়ে সেই প্রাইভেট হাসপাতালে আইসিইউ-তে ঢুকানো হল। তিনদিন পর তাকে মৃত ঘোষণা করা হল। আবার তার লাশ বিমানে করে ঢাকায় আনা হল। যাওয়ার সময় বিমানভাড়া লেগেছিল ৩৫ লাখ টাকা। ফেরার সময় লেগেছিল ৩৭ লাখ। সিংগাপুর হাসপাতালের বিল এর সাথে মিলিয়ে দেখা গেল মোট খরচ এক কুটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই টাকা রফিক সাহেবের একাউন্টে ছিল না। তার একাউন্টে দেখা গেল মাত্র এক লাখ টাকা। অবশিষ্ট টাকা পরিশোধ করেছিলে রফিক সাহেবের ভায়েরাগণ। হিসেব মিলিয়ে দেখা গেল ভায়েরাদের একাউন্টের টাকাও শেষ।
==
ডাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
২/৭/২০১৮

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *