হুজুরের টিউশন ফি

রফিক সাহেব জুম্মার নামাজের খুতবার বাংলা তরজমা শুনার পর থেকেই মন খারাপ করেছেন। দুপুরের খাবারও কম খেয়েছেন। সাধারণত জুম্মার নামাজের পর খাবার খেয়ে আছর নামাজ পর্যন্ত একটা লম্বা ঘুম দেন। সদিলাপুর উপজেলার একাউন্ট অফিসার তিনি। এক ছেলে ও স্ত্রী নিয়ে তার সংসার। ঢাকার তাজমহল রোডে তিনি একটি ফ্লাট ভাড়া করে থাকেন। শুক্র ও শনিবার অফিস ছুটি। বৃহস্পতিবার বিকেলে তিনি ঢাকায় আসেন রবিবার ফিরে যান অফিস করতে। সপ্তাহের বাজার তিনি শুক্রবার সকালেই করে নেন। রফিক সাহেবের স্ত্রী রেবেকা হোম ইকোনমিক কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্সসহ মাস্টারস পাস করেছিলেন। তিনি চাকরী না করে গৃহিণীর দায়ীত্ব পালন করছেন। ছেলে আরিয়ানের পিছনে তার সময় কাটে। বাকী যেটুকু সময় পান সেটুকু তিনি আরিয়ানের জন্য সুস্বাদু খাবার তৈরি ও টেলিভিশনের পারিবারিক কলহের সিরিজ নাটক দেখে ব্যয় করেন। আরিয়ান ক্লাস ফোরে পড়ে। মা ও ছেলে মুলত শারীরিক পরিশ্রম করেন না বরং বেশী বেশী খান। তাই দুই জনই মুটিয়ে গেছেন।

রেবেকা লক্ষ্য করলেন রফিক সাহেব শুয়ে আছেন, কিন্তু ঘুমান নি। সিলিং ফ্যানটা ধীরে ধীরে ঘুরছে। রেবেকা কাছে গিয়ে বসলেন। রবিক সাহেবের গায়ে হাত রেখে বললেন
– ঘুমাও নি?
– ঘুম আসছে না।
– কোন কিছু নিয়ে চিন্তা করছো?
– হ্যা, একটু চিন্তা করছি।
– কি নিয়ে চিন্তা করছ?
– আজ জুম্মার নামাজের খুতবার তরজমায় ইমাম সাব বলছিলেন “আপনার জানাজা আপনার ছেলে পড়ানো উত্তম। আপনি কি ছেলেকে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলি শিক্ষা দিয়েছেন? ” বয়স তো কম হল না। মরতে তো একদিন হবেই। আমার জানাজা আমার ছেলে পড়ালেই ভাল হতো। আমি চাচ্ছি আমাদের আরিয়ান স্কুলে বাংলা- ইংরেজি পড়ার পাশাপাশি কোরআন ও আরবি ভাষাও শিক্ষা করবে। ওর জন্য একজন আরবি টিউটর রাখতে চাই।
– ক্লাসে আরিয়ান আরবিতে একটু দুর্বল। ওর জন্য আরবি টিউটর রাখতে হবে। ধর্ম বিষয়ে এ প্লাস পেতে হলে আরিয়ানের জন্য ধর্ম টিউটর রাখতে হবে। অনেকেই রেখেছে। ওর বন্ধুর জন্য ইউনিভার্সিটির সেকেন্ড ইয়ারের এক ছেলে রেখে দিয়েছে। টিউশন ফি মাসে দুই হাজার টাকা।
– মাত্র দুই হাজার টাকায় একজন ইউনিভার্সিটির ছাত্র টিউশনি করবে? আরিয়ানের টিচার তো সাত হাজার টাকা নেয়? সেও তো ইউনিভার্সিটি সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র।
– আরবি টিচারের বেতন কমই হয়।
– আমি একটু বেশীইই দেব।
– কি বোকার মতো কথা বলছ? যেখানে দুই হাজার টাকায় টিউটর পাচ্ছ সেখানে সেধে সেধে কেন বেশী দিতে যাবে? আমি ওকে দুই হাজারেই ঠিক করে নেব।

বরাবরই রেবেকা একটু হিসাবী। রফিক সাহেব তেমন হিসাব করে চলেন না। বাজার থেকে মাছ এনে রফিক সাহেব সঠিক দামটি বলেন না। বললে রেবেকা তিরস্কার করে বলেন “এতটুকু মাছের দাম এত টাকা? তোমাকে সব সময় ঠকায়। ” তাই রফিক সাহেব মাছের দাম একটু কম করেই বলেন।

রফিক সাহেব রেবেকাকে বললেন “ঠিক আছে। তুমি আরবি টিচারকে বলে দাও যেন আগামীকাল থেকেই ছেলেকে পড়াতে আসে। ”

পরেরদিন টিউটর আসলো। রফিক সাহেব দেখলেন টিউটরের লেবাস পুরাপুরি কওমি মাদ্রাসার ছাত্রের মতো। রফিক সাহেব বললেন “তোমার টিউশন ফি টা প্রতিমাসের প্রথম সপ্তাহে আমি দেব। ”

রফিক সাহেব ভাবলেন “একই কোয়ালিটির দুইজন টিউটর। একজনের ফি সাত হাজার টাকা আরেকজনের ফি দুই হাজার। এই রকম বৈষম্য করা ঠিক না। কাজেই আমি ছেলেটিকে সাত হাজার টাকাই দেব। তবে রেবেকাকে জানানো ঠিক হবে না। সে আমাকে বোকা ভাববে। ”

প্রথম মাসের ফি সাত হাজার টাকা খামে ভরে রফিক সাহেব হুজুর টিউটরের হাতে দিয়ে বললেন “তোমাকে আমি মাসে সাত হাজার টাকাই দেব। অন্য টিউটরকেও তাই দেই। আমি তোমাকে ঠকাব না। ” এভাবে রফিক সাহেব পরপর কয়েকমাস হুজুরকে সাত হাজার টাকার খাম দিলেন।

একবার রফিক সাহেব কয়েকদিনের জন্য খুলনা গেলেন। রেবেকা ভাবলেন এবারের খামটা তিনিই দিয়ে দেবেন। তিনি দুই হাজার টাকা খামে ভরে হুজুরের হাতে দিলেন। হলে ফিরে খাম খুলে দেখেন খামে মাত্র দুই হাজার টাকা। পরদিন পড়াতে এসে হুজুর রেবেকাকে বলল
– ম্যাডাম মনে হয় একটু ভুল করেছেন।
– কেন? কিভাবে?
– ম্যাডাম, খামের ভিতর মাত্র দুই হাজার টাকা ছিল।
– আমি তো এক মাসের ফি দিয়েছি। বকেয়া আছে নাকি?
– না, মানে, স্যার তো সব সময় আমাকে মাসে সাত হাজার টাকা দেন।
– ও, তাই নাকি? আমি তো তা জানি না। ঠিক আছে। সাহেব বাসায় আসুক। পরে দেখা যাবে। কিছু মনে করো না।

==
ডাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
৮/৭/২০১৮

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *