প্রধান অতিথির ছাতা

(মনে পড়ে)
অনেক দিন আগের কথা। গ্রাম এলাকায় একটা প্রীতি ফুটবল খেলা হচ্ছিল। আমাকে প্রধান অতিথি হিসাবে দাওয়াত করেছিল। খুব রৌদ্র ছিল সেদিন। গরমও পড়েছিল প্রচুর। বিকেলে মাঠে খেলা হচ্ছিল। গ্রামের বিবাহিত যুবক বনাম স্কুল কলেজের অবিবাহিত ছাত্রদের মধ্যে খেলা হচ্ছিল। আশে পাশের গ্রাম থেকে অনেক দর্শক এসেছিল খেলা দেখতে। তারা খুব আনন্দ উপভোগ করছিল। মাইকে রম্য রস করে খেলার ধারা বর্ণনা দিচ্ছিল ফকরা ছেলেপেলেরা। তাতে দর্শকরা আরো মজা পাচ্ছিল। আমিও বেশ উৎফুল্ল ছিলাম।

মাঠে সবুজ ঘাস ছিল। মাঠের চুতুরদিকে সবুজ বনানী। মাঠ ও বনানীতে বিকেলের রোদ মিষ্টি লাগছিল। আয়োজকরা আমাকে খুশী করার জন্য ব্যস্ত ছিল। মাইকে আমার উপস্থিতিতে তারা মুগ্ধ তা বার বার ঘোষণা করছিল। আমি পুর্ব দিকে মুখ করে একটা সামিয়ানার নিচে বসেছিলাম। আমার আশে পাশে অনেক লোক ছিল।

বাড়ি থেকে বের হবার সময় কেউ একজন বলেছিলেন
– প্রচন্ড রোদ। একটা ছাতা নিয়ে যাও।
– আমি ছাতা নিয়ে আসি নি।
– আমাদেরটাই নিয়ে যাও।
– আমি ছাতা হারিয়ে ফেলতে পারি। থাক, ছাতা লাগবে না।
– হারালে সমস্যা নাই। নিয়ে যাও।

আমি ছাতা নিয়ে গেলাম। লম্বা ছাতা। ফোল্ড করা যায় না। গ্রাম্য ছাতা। আমি মাস্টার সাহেবের মত ছাতা মাথায় দিয়ে ক্ষেতের বাতর দিয়ে ধীরে ধীরে হাটতে হাটতে সামিয়ানার নিকট পৌছলাম। মাইকে ছেলেপেলেরা স্লোগান দিল “প্রধান অতিথির আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম। ” আমি ছাতা বন্ধ করে হাত নেড়ে প্রধান অতিথির চেয়ারে আসন গ্রহণ করলাম। ছাতাটা আমার পিছন দিকে চেয়ারের সাথে আটকিয়ে রাখলাম। পিছনে বেশ কয়েকজন লোক দাঁড়িয়েছিল। আমার সন্দেহ হল হয়ত কেউ একজন ছাতাটা নিয়ে নিতে পারে। নিজের ছাতা না। নিয়ে নিলে ছাতার মালিক মন খারাপ করবে।
ছাতা ঘেঁষে দাড়িয়েছিল পরিচিত একজন। নাম বলা ঠিক হবে না। সে কোন সময় চেয়ার ছাড়ছিল না। তাকে আমি সন্দেহের দৃষ্টিতে রাখলাম। খেলা দেখার ফাকে ফাকে জনগনের সাথে স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়েও কথা বললাম। খেলা শেষ হল। বক্তৃতা ও পুরস্কার দেয়ার পালা শুরু হল। আমাকে খুশী করার জন্য একজন মাইকে রম্য বক্তৃতা দিল। তার বক্তৃতাটি ছিল এই রকম:

“ভাই সব। নির্বাচনের আগে আমি ওয়াদা করেছিলাম আমি এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করব। প্রাথমিক কাজ হিসাবে আমি প্রত্যেকের বাড়ি বাড়ি কম পক্ষে একটা করে বদনার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আপনাদের সবার বাড়িতে একটা করে বদনা আছে না? থাকলে হাত তুলুন। ” সবাই দুই হাত তুলে সমস্বরে বলল “হ্যা, আছে। ”

আমরা হেসে ফেললাম। সবশেষে সভাপতির বক্তব্যের পালা। আমার নাম ঘোষণা করা হল। ভাব গাম্ভীর্য নিয়ে আমি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালাম। গণ্যমান্য ব্যাক্তিদের সম্বোধন করে আমি বক্তৃতা শুরু করলাম।
আরচোখে একটু বা দিকে তাকালাম। দেখলাম সেই পেছনে দাঁড়ানো লোকটি ছাতা নিয়ে ভাগছে। আমি আমার বাম পাশে বসা একজন আয়োজকের কানে কানে বললাম “আমার ছাতা নিয়ে চলে যাচ্ছে। ধরার ব্যবস্থা করুন। ” সবাই ভাবল আমি মনে হয় বক্তৃতার কোন পয়েন্ট নিয়ে পরামর্শ করছি। তিনিও কাউকে বুঝতে না দিয়ে কৌশলে অন্য লোক পাঠালেন ধরার জন্য। আমি যথারীতি বক্তব্য শেষ করলাম। দেখলাম লোকটিকে বসিয়ে রাখা হয়েছে আমার কাছে জবাবদিহি করার জন্য। চির চেনা সেই লোকটি আমার চোখের দিকে তাকাতে সাহস পেল না। আমি বললাম
– ছাতা নিয়ে যাচ্ছিলেন কেন?
– আমি অনেক্ষন আপনার চেয়ার ধরে দাড়িয়েছিলাম। চলে যাবার সময় অভ্যাস বশত আমার নিজের ছাতা ভেবে হাতে নিয়ে চলে যাই। ভুল হয়ে গেছে। ”

বেলাডোবার সময় বিদায় নিলাম। এবার ছাতা মেলতে হল না। প্রায় অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছিল। বাইদের বাতর পাড়ি দিতে দিতে ভাবলাম “এমনো গ্রামবাসী আছে যে আমার জিনিস নিয়ে নিতে পারে! আমি কিভাবেই বা তার দিকে তাকাব? আর সেই বা কেমন করে আমার সাথে দেখা হলে কথা বলবে? যাহোক, বাড়ি পৌছলে অন্ধকার নেমে আসলো। আমি ড্রেস পাল্টানোর চেষ্টা করছিলাম। পাড়ার একজন দৌড়ে এসে বললেন
-অমুকে(সেই ছাতা নেয়া লোকটি) অজ্ঞান হয়ে পড়েছে।
– পড়বেই তো। ও দেখবে আরো কত কিছুর ভান ধরবে। লজ্জায় ভান ধরেছে।
– ডাক্তার সাব। জরুরী ভাবে আপনাকে একটু যেতে হবে।
– ঠিক আছে।

আমি অমনি বেগটা নিয়ে ঐ রুগীটাকে চিকিৎসা দিতে গেলাম। দেখি রুগী তিনি নন। রুগী তার ছেলে। আমি হয়ত ভুল শুনেছিলাম। অতিরিক্ত গরমে ঘেমে রুগীর লবন ও পানিশুন্যতা হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। সেই লোকটি লজ্জায় আমার কাছে আসলোই না। আমি চিকিৎসা দিয়ে চলে এলাম। ছাতার মালিককে ছাতা ফেরৎ দিয়ে দিলাম।

সেই লোকটির সাথে আমার খুব দেখা হয়। আমাদের মধ্যে ভাল সম্পর্ক। আসলেই মনে হয় লোকটি ভুল করে নিজের মনে করে ছাতাটি নিয়েছিল। ভুল মানুষের হতেই পারে।
==
ডাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
১৪/৭/২০১৮

পানি খেয়ে মারা গেলেন

মতিউর রহমান তালুকদার ছিলেন দুই সন্তানের বাবা। বাটাজোর তালুকদার বাড়ির। চান মিয়া তালুকদার সাহেবের ভাই। তিনি আমার পরিচিত ছিলেন। আমি যখন ১৯৮৬ সনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে ইনসার্ভিস ট্রেইনিং করি সেই সময় তিনি আমাদের ইউনিটে ৭ নং ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন। আমি ঐ ওয়ার্ড ২২ নং বেডের রুগী পরীক্ষা করছিলাম। মতি ভাই ছিলেন ৩নং বেডে। ওয়ার্ডের গেইটের কাছেই। তিনি একুট এবডোমেন নিয়ে কনজার্ভেটিভ চিকিৎসাধীন ছিলেন। নাথিং বাই মাউথ অর্ডার ছিল। অর্থাৎ মুখ দিয়ে কিছু খাওয়া নিষেধ ছিল। আই ভি ফ্লুইড দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ রগে সেলাইন দেয়া ছিল। এভাবে তাকে মুখে কিছু না দিয়ে আনুমানিক ১০/১২ দিন রাখা হয়েছিল। আমি দৈনিক তাকে কিছু সময় দিতাম। Continue reading “পানি খেয়ে মারা গেলেন”

মৃত্যুর আভাস

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডাঃ মঞ্জুরুল হক সাহেবের চেম্বার ছিল আমার চেম্বারের কাছেই। তিনি অনেক রুগী দেখতেন। তার চেম্বারে এটাচড টইলেট রুম ছিল না। মাঝে মাঝে আমার টয়লেট রুম শেয়ার করতেন। একদিন রাত ১১ টার দিকে তিনি দ্রুত বেগে আমার রুমে ঢুকলেন। তার পেছনে পেছনে দ্রুত এক বয়স্ক রুগীও ঢুকলেন। ডাক্তার সাহেব দ্রুত টয়লেটে ঢুকে পরলেন। আমি লোকটাকে বললাম
-আপনি টলেটের দিকে যাচ্ছেন কেন? Continue reading “মৃত্যুর আভাস”

মাটি ডলেছে কে?

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতেলের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগে আমার ইনসার্ভিস ট্রেইনিং চলছিল ১৯৮৬ সনে। আমরা ৫ নং ওয়ার্ডের ডক্টরস রুমে বসতাম। রুমের কাছেই এক রুগীর সীট ছিল। সিজারিয়ান সেকশন অপারেশন হয়ে এক শিশু জন্মেছিল প্রফেসর ডাঃ জোবায়েদ স্যারের অধীন। ক্লিনিকাল এসিস্টেন্ট (সি এ) ছিলেন খুব সম্ভব ডাঃ আনন্দ দা। এখন সি এ কে এসিস্টেন্ট রেজিস্ট্রার বলা হয়। আমি সি এ-র সাথে রাউন্ড দিতাম। নবজাতকের বড় বোনটির বয়স প্রায় ৫ ববৎসর ছিল। সারাক্ষণ কটকট করে কথা বলত। একবার মেয়েটি তার কাছে আসা তারই বয়সের আরেক মেয়ের কাছে বলছিল “একটা বাচ্চা মানুষ করা চাট্টিখানি কথা না। ” তার পাকা কথা শুনে আমরা আশ্চর্য হলাম। হয়ত সে বড়দের আলাপ শুনেছিল। বড়রা হয়ত এমন কথা বলেছিল। সেটাই নকল ক Continue reading “মাটি ডলেছে কে?”

জগের ভিতর আস্ত ডাব

রিগেডিয়ার জহির স্যার ছিলেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক। তিনি তখন কর্নেল ছিলেন। সবাই সংক্ষেপে কর্নেল সাব বলতো। তিনি অত্যন্ত দক্ষ এবং সাহসী পরিচালক ছিলেন। তার সময় চিকিৎসকগণ নির্বিঘ্নে নির্ভয়ে কাজ করতেন। হাসপাতাল ছিল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। হাসপাতালে অহেতুক কোন লোক ঠুকতে পারত না। তিনি সারাক্ষণ একটা ছড়ি হাতে নিয়ে তিড়িংতিড়িং করে হাসপাতাল চষে বেড়াতেন। কর্মচারীরা তার ভয়ে তটস্থ থাকতো। হাসপাতাল নোংরা হয় এমন কোন জিনিষ গেইট দিয়ে ঢুকতে পারতো না। বিশেষ করে পান ও আস্ত ডাব কেউ নিয়ে ঢুকতে পারতো না। Continue reading “জগের ভিতর আস্ত ডাব”

গাছগুলি কেটে ফেলতে হবে

আমার ছোট মেয়ে ডাঃ মার্জিয়া ইসলাম দীনা তখন ক্লাস টু বা থ্রিতে পড়তো। আমরা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের বাসভবনে থাকতাম। মাঝে মাঝেমাঝে আমি তাকে স্কুলে নিয়ে যেতাম। বাসা থেকে কোয়ার্টারের গেইট পর্যন্ত হেটে গিয়ে রিক্সায় উঠতাম। কয়েকদিন একটানা হাল্কা বৃষ্টি হল। ছাতা মাথায় দিয়ে গেইট পর্যন্ত যেতাম। তাতে দীনার জামা কিছুটা ভিজে যেতো। কোয়ার্টার এরিয়ায় অনেক গাছ ছিল সুন্দর সুন্দর। দীনা বিরক্ত হয়ে বলল Continue reading “গাছগুলি কেটে ফেলতে হবে”

ফেল করেও কদম্বুছি

১৯৯৪ সনের দিকের কথা। তখন এফসিপিএস কোর্সে প্রবেশ করতে হত ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে। পরীক্ষা খুবই কঠিন ছিল। অনেকেই দশ বার বছর পর্যন্ত চেষ্টা ও ফেল করে করে এক সময় ভর্তি হতে পারতো। কাজেই ভর্তি পরীক্ষায় পাস করা মানে এক মহা আনন্দের বেপার ছিল। Continue reading “ফেল করেও কদম্বুছি”

দুষ্টামির শাস্তি দুই রাকাত নামাজ

চেম্বারে রুগীর সাথে আসা লোকটির মাথায় বাবরি চুলের উপর সাদা টুপি, লম্বা দাড়ি, গায়ে সাদা পাজামা -পাঞ্জাবী । আমি জানতে চাইলাম
– আপনি কি করেন?
– জি, খেদমতে আছি।
– বুঝতে পারলাম না।
– মানে, আমি একটা মাদ্রায় শিক্ষকতা করি। Continue reading “দুষ্টামির শাস্তি দুই রাকাত নামাজ”

দিনে চিড়া রাতে পানি

১৯৯০ সনের দিকে শেরপুর জেলার নকলা উপজেলা স্বাস্থ্য প্রকল্পে চাকরি করতাম। একটা রুগী আসল।
– রুগী কি করে?
– ক্লাস নাইনে পড়ে।
– কি সমস্যা? Continue reading “দিনে চিড়া রাতে পানি”