আমার প্রথম অভিনয়

স্মৃতির পাতা থেকে

১৯৬৯ সন। আমি ঘোনারচালা সরকারি ফ্রি প্রাইমারী স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ি। বাংলা পড়াতেন সাখাওয়াত স্যার (সাকে মাস্টার)। সম্রাট আকবরকে নিয়ে একটি গল্প ছিল। গল্পটি ছিল এইরকম। এক বিকেলে সম্রাট আকবর তার নবরত্নের এক রত্ন মোল্লা দোপে আজাকে নিয়ে বাগানে পায়চারী করছিলেন। সম্রাট বললেন
Continue reading “আমার প্রথম অভিনয়”

ছোট বেলার গাধু কাক্কু

(স্মৃতির পাতা থেকে)
আমরা চাচাদেরকে কাকুর সাথে আরেকটা অতিরিক্ত ক লাগিয়ে কাক্কু ডাকতাম। বাবার চাচাত ভাই চোট কাক্কু তার বড় চার ভাইদেরকে যথাক্রমে বড় ভাই, মাঝ ভাই, সাঝ ভাই, ও মিয়া ভাই ডাকতেন। সেটা অনুকরন করে আমরা ডাকতাম বড় কাক্কু, ডাক্কার কাক্কু, সাঝ কাক্কু ও মিয়া কাক্কু। পাড়া প্রতিবেশী চাচাদেরকে শুধু কাক্কু ডাকতাম।

Continue reading “ছোট বেলার গাধু কাক্কু”

আমার ছেলেবেলার খেলাধুলা

(স্মৃতির পাতা থেকে)
আমাদের গ্রামের বাড়ীর এখন যেখানে টিউব ওয়েল আছে তখন ওখানে একটা ডোবা ছিল। ঐ ডোবাতে অনেক বড় বড় সোনাব্যাঙ থাকতো। সোনা ব্যাঙকে আমরা বাইয়া ব্যাঙ বলতাম। জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় মাসে ডোবা পানিতে ভরে যেত। বাইয়া ব্যাঙগুলি পানিতে লাফালাফি করত। উচ্চস্বরে ডাকত। মাঝারী সাইজের কোনো ব্যাঙ নিম্নস্বরে ডাকত। ব্যাঙের ডাকের সাথে কথা মিলাতাম। এক বাইয়া ব্যাঙ তার ডোবা থেকে বলত “এগাও আমার।” আরেক বাইয়া Continue reading “আমার ছেলেবেলার খেলাধুলা”

আমার নাটকের প্রতি আগ্রহ

(স্মৃতির পাতা থেকে)
১৯৬৩ সন হতে পারে। আমার বয়স তখন ৫/৬ বছর হবে। রৌহা নানাবাড়ি ছিলাম। বিকেলে হালট পাড়ে তেতুল গাছের পাশের খেতে গোদুল্লা খেলছিলাম। এক সময় আমার চেয়েও সামান্য ছোট আমার এক মামাতো বোন বলল “মাষ্টর দাদার এডুতে আইজকা আইতে টাটক অব।” অর্থাৎ রাতে আমার ছোট নানা কাজীম উদ্দিন মাষ্টারের রেডিওতে নাটক হবে। নাটককে সে টাটক বলেছে। আমিতো তাও জানি না। যাহোক রাত দশটায় বাড়ীর সবাই Continue reading “আমার নাটকের প্রতি আগ্রহ”

আমার সংগীতের সাথে পরিচয়

(স্মৃতির পাতা থেকে)
ছোটবেলা থেকেই আমার গান বাজনার প্রতি আগ্রহ একটু বেশী ছিল। আমাদের তালুকদার বাড়ীতে গান বাজনা করা ও যাত্রা দেখা নিষিদ্ধ ছিল। শুনেছি নাহার আপার বিয়ের এক বছর পর নাহার আপা কথা প্রসংগে বলেছিলেন তার স্বামী হাশেম দুলা ভাই যাত্রা দেখতে গিয়েছিলেন। কথাটা মেছের উদ্দিন তালুকদার, আমার দাদার মেঝো ভাই, যাকে আমরা দাদু ডাকতাম তার কানে গিয়েছিল। শুনে আপাকে শশুরবাড়ী যাওয়া বন্ধ করে দিলেন। শত অনুনয় Continue reading “আমার সংগীতের সাথে পরিচয়”

আমার প্রথম পাঠ

মায়ের সাথে নানাবাড়ি গিয়েছিলাম। মা প্রতি বছর শীতকালে ২০/৩০ দিন এবং বর্ষা কালে ২০/৩০ দিন নানাবাড়ি নাইয়োর থাকতেন। নানাবাড়ি কালিহাতির রৌহা গ্রামে। নিচু ভুমি। মাটি দিয়ে অনেক উচু ভিটা নির্মাণ করে অনেকগুলি পরিবার ঘন ঘন ঘর নির্মাণ করে থাকতেন। খুব ছোট ছিলাম। একদিন সকাল বেলা ঘরের চিপা দিয়ে Continue reading “আমার প্রথম পাঠ”

আমার প্রথম হাট দর্শন

(স্মৃতির পাতা থেকে)
আমাদের বাড়ীর কাছে হাট ছিল না। আমাদের এলাকায় হাট ও বাজারের মধ্যে পার্থক্য ছিল। হাটে সপ্তাহে নির্দিষ্ট একটি বা দুইটি বারে কেনা বেচার উদ্দেশ্যে অনেক মানুষ একটি নির্দিষ্ট স্থানে জমা হত। সাধারণত দুপুরের পর হাট বেশী জমত। হাট বসার স্থানে অথবা অন্য কোন নির্দিষ্ট স্থানে সকাল নয়টা দশটার দিকে প্রতিদিন কিংবা নির্দিষ্ট দিন অল্প কয়েকটি জিনিষ বিশেষ করে গাভীর দুধ বিক্রি হত। সেটাকে বলা হত বাজার। আর ঐ সময়টাকে বলা হত Continue reading “আমার প্রথম হাট দর্শন”

ওয়াবক ও অজগরের ভয়

(স্মৃতির পাতা থেকে)
ছোট বেলায় যখন আমাদের ঘুম আসত না তখন ভয় ভিতিকর গল্প বলে মা আমাদেরকে চুপ করিয়ে ফেলতেন। শীতের রাতে লেপের নিচেও যেতে চাইতাম না। হঠাৎ বাতি নিভিয়ে দিয়ে মা বলতেন “এই ওয়া বক আইল।” ওয়া বক একটি কাল্পনিক আজব বক ছিল। বাড়ির পাশে ছেছড়া গাছে এক ঝাক শারষ পাখি থাকত। আমার কল্পনায় এর চেয়েও বড় বিভৎস এক ধরনের লম্বা ঠোট ওয়ালা পাখী হতে পারে ওয়াবক। মনে হত সিলিং এর উপর বসে Continue reading “ওয়াবক ও অজগরের ভয়”

আমার ছোটবেলার নানাবাড়ি

(স্মৃতির পাতা থেকে)
আমার নানাবাড়ি টাংগাইল জেলার, কালিহাতি উপজেলার রৌহা গ্রামে। কালিহাতি থেকে ৪/৫ কিলোমিটার পুর্বে বংশী নদীর কাছাকাছি। নানার নাম আমীরউদ্দিন। নানা বর্গা স্কুলের হেডমাস্টার কাজীম উদ্দিন নানার বড় ভাই। কাজীম উদ্দিন নানার ছেলে আবুল কাশেম মামা ছিলেন আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজের প্রিন্সিপাল।

নানা দুই তিন মাস পর পর তার আদরের বড় মেয়ে আমার মা ফাতেমা বেগমকে দেখতে আসতেন। মাকে নানা ডাকতেন ফতে বলে। নানাদের ক্ষেতে প্রচুর মশলা উৎপাদন হত। আসার সময় অনেক মশলা নিয়ে আসতেন। তাই সারাবছর আমাদের মশলা কিনতে হত না। নানার সাথে আমার বেশ বন্ধুত্ব ছিল। নানা আসলে শুয়ে শুয়ে নানার কাছে অনেক গল্প শুনতাম। মাকে আমি অনেক বিরক্ত করতাম। মাঝে মাঝে বিরক্ত থেকে রক্ষা পেতে বলতেন “যাও তোমার নানার কাছে গিয়ে হাস্তর শুনগে।” গল্পকে হাস্তর বলা হত। নানা আমার মাথা তার ডান বাহুর উপর রেখে অনেক ধর্মীয় শিক্ষণীয় গল্প বলতেন। হযরত মুহম্মদ (স:) কে তিনি পয়গম্বর না বলে পেগাম্বর সাব বলতেন। তার গল্পে পেগাম্বর সাব ও মা ফাতেমা থাকতেন। গল্প শুনতে শুনতে কল্পনায় আমি নানাকেই পেগাম্বর সাবের মত মনে করতাম। ফাতেমা (রা:)কে আমার মা ফাতেমার মত মনে করতাম। নান খুব পুথি পড়তেন। জংগে কারবালা, লাল বানু শাহ জামাল ইত্যাদি। খালার নাম তিনি রেখেছিলেন লাল বানু। আমার বয়স যখন ৭/৮ বছর তখন নানা মারা যান। ছোট বেলা নানার সাথে দুষ্টুমিও করেছি। একবার নানা এসে বড় ঘরে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। মা রান্নাঘরে নানার জন্য সুস্বাদু খাবার রান্না করছিলেন। মা আমাকে বললেন “ছাদেগালী, বাজান, বড় ঘর থেকে লবনের বাটিটা আনছে।” এই ধরনের ছোট খাট কাজ সাধারণ পিচ্চি পোলাপানরাই করত। আমি বড় ঘরে গিয়ে নানাকে বললাম “নানা, মা আপনাকে আর আমাকে লবন নিয়ে যেতে বলেছেন। ”
-কি? কি বললি?
-আপনাকে আর আমাকে লবন নিয়ে যেতে বলেছেন।
-এই, এই ফতে, তোর পোলায় কি কয়?
-কি কয়?
-কেন, আপনি বলছেন ছাদেগালী ও বাজান। তাইলে তো দুই জনই বুঝায়।
দুইজনই হাসলেন। মা নানাকে বাজান ডাকতেন। আমাকেও আদর করে বাজান ডাকতেন। পরে মা এই ঘটনা চাচীদের কাছে বর্ণনা করেন। এখনো চাচীরা সেই কথা বলে হাসেন। কাজীম উদ্দিন নানা খুব ধার্মিক ছিলেন। সবাইকে নিয়ে নিজ বাড়ির মসজিদে জামাতে নামাজ পড়তেন। সাত বছর বয়স পার হলে নামাজ না পড়লে পিটুনি দিতেন। ফজরের নামাজের পর খাটের উপর পুর্ব দিক মুখ করে বসে সুর করে মুখস্ত কোরআন শরীফ পড়তেন। খুব সুন্দর কণ্ঠস্বর ছিল। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। হাসান চাচা বলেছেন “তোমার কাজীম উদ্দিন নানা যখন করটিয়া সাদৎ কলেজে বি এ পড়তেন তখন দেশের প্রধান পরিদর্শনে এসেছিলেন। তার সৌজন্যে একটি বিরাট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে লুঙ্গী পরে, লাঙ্গল কাধে নিয়ে, মাথাল মাথায় দিয়ে মঞ্চে নাচতে নাচতে গেয়েছিলেন -বাজান, চল যাই চল মাঠে লাঙ্গল বাইতে। অসংখ্য হাত তালি পরেছিল। ” আমি প্রায় সারা জীবনই ফজর নামাজের পর কিছুক্ষণ সুর করে কোরআন পড়ার চেষ্টা করি। সাথে বাংলা অর্থ পড়ি। নানাকে ফলো করি। কোরআন তেলাওয়াত শেষে চা খেতেন। নানা বেলা ডোবার সাথে সাথে উচুস্বরে বলতে থাকতেন “খেলাধুলা বাদ দিয়ে অজু করে নামাজ পড়ে সবাই পড়তে বস। ” তার ছেলে আবুল কাশেম মামা আমার থেকে তিন বছরের বড়। আরেক নানার ছেলে মতি মামা আমার দুই বছরের বড়। আমি তখনো স্কুলে যাওয়া শুরু করি নি। মামাদের পড়া শুনে শুনে সব পড়া মুখস্ত করে ফেলেছিলাম। তার কিছু কিছু এখনো মনে আছে। যেমন
আষাঢ় মাস। চারিদিকে পানি থৈ থৈ করে। নৌকায় সবাই হাটে যায়। আর সবাই বৈঠা বায়। আর বলে মারো ঠেলা হেইও।
ফৈজুর নৌকা ঘাটে নাই। এই নৌকা কার? মৌলভী সাহেবের। এই লিসনে ঐ কার ও ঔ কার শিখানো উদ্যেশ্য ছিল।

আরো ছিল। খোকা দোকানী ভাই। দামী দামী শাড়ী চাই। অমলা, কণা ও বীণা। ইত্যাদি।
মা প্রতিবছর দুইবার আমার নানাবাড়ি নাইয়র যেতেন। প্রতিবার ২০/৩০ দিন অবস্থান করতেন। বর্ষাকালে একবার ও শীতকালে একবার। বর্ষাকালকে বাইস্যামাস এবং শীতকালকে বলতাম উনামাস। বাইস্যামাসে নৌকা নিয়ে মেঝমামা ও ছোটমামা আসতেন মাকে নেয়ার জন্য। বড়মামা দূরে থেকে মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। তাই আমরা তাকে বেশী কাছে পাই নি। মামাদের নাম ছিল হোসেন আলী, সিবা উদ্দিন ও রিয়াজ উদ্দিন। মামাদের সাথে নৌকা করে মামাতো ভাই বোনেরা আসতো। কিজে খুশী লাগতো। পেয়ারা গাছে বসে বসে পেয়ারা খেতাম আর জমানো গল্পগুলা বলতাম।

আসর নামাজের পর বাড়ী থেকে বের হতাম নানাবাড়ির উদ্যেশ্যে। ছোটচওনা ঘাট থেকে নৌকা ছাড়তো। মামাদের নিজের নৌকা। ঝোড়া দিয়ে যেতে যেতে সন্ধ্যা নেমে আসতো। ঝোড়া খালের মত। দুইধারে সবুজ ঝোপঝাড়। অন্ধকারে যখন নৌকা চলত মনে হত যেন ঝোপঝাড়গুলি পিছনের দিকে চলে যাচ্ছে। দেখে খুব মজা পেতাম। অনেক রাতে পৌছে যেতাম নানীগ বাড়ী। নানী কোলে নিয়ে আদর করতেন। মামীরাও কোলে নিয়ে আদর করতেন। মামীর হাতে খেয়ে ঘুমিয়ে পরতাম। নানীবাড়ীতে ছাদক নামে পরিচিত ছিলাম। খুব ভোরে ডিঙি নৌকা নিয়ে চলে যেতাম মাইজবাড়ি থেকে খালাকে আনতে। খালা আমাকে পেয়ে মহা খুশী হতেন। নানা জাতের খাবার ও ফল খাওয়ানোর জন্য পিড়াপিড়ি করতেন। এইডা খাবি? ঐডা খাবি? আমার বিরক্ত লাগতো। খালা আসার পর নানীর ঘর ভরে যেত। তিন মামা, খালা ও মার সন্তানরা সবাই নানীর ঘরে গেঞ্জাম করতাম। মামা হাট থেকে অনেক বাজার নিয়ে আসতেন। সেইগুলি সকালে গোছানো হত। নানী এক শের কাঁচামরিচ মেঝেতে ঢেলে দিয়ে বোটাতে বলতেন। ভুলু ভাই বলতেন “দেখি কে বেশী বোটাতে পারে।” আমরা দ্রুত বোটাতে থাকতাম। তারপর গণনা করা হত। আমি কুড়ির উপর গণনা করতে পারতাম না। বলতাম আমি বোটায়েছি চার কুড়ি উনিশটা। ভুলু ভাই একশত পর্যন্ত গণনা করতে পারতেন। তিনি যখন বলতেন বিরানব্বই, তিরানব্বই, নিরানব্বই তখন আমি আফসোস করতাম, আমি যদি নিরানব্বই পর্যন্ত গোনতে পারতাম! ভুলু ভাই সবার বড় মামাত ভাই, মেঝ মামার ছেলে। বুলবুল হায়দার ওরফে ভুলু। আমাকে এখনো খুব স্নেহ করেন।
দুপুরের পর কাদের ভাই, ফজলু ভাই, ইসমাইল ভাই, নজরুল, শাহজাহান, ইয়াসিন ও আমি ডিঙি নৌকা নিয়ে চলে যেতাম বিভিন্ন বিলে। বাড়ীর দক্ষিনে ছিল শুক্নি বিল এবং পুর্বে ছিল নেংগাইল বিল। রৌহা নানাবাড়ি ও ভিয়াইলের দাদাবাড়ির মাঝখানে ছিল নোকাইল খাল। বর্ষায় সব পানিতে ভরে যেত। চারিদিকে পানি থৈ থৈ করত। বাড়ীগুলিকে মনে হত পানির উপর ভাসছে। দক্ষিণ দিকে তাকালে মনে হত সমুদ্র। অনেক দূরে ওপারে দেখা যেত নাগবাড়ি চৌধুরী বাড়ী, ভেংগুলা ও আওলাতৈল। নৌকা নিয়ে নানা রকম খেলা করতাম। নৌকা বাইচ খেলতাম। গান গাইতাম
আগের নৌকা পাছে গেল হেইও
নাইয়া ভাগ্যবান সোনার চান কলসি পাইলাম দান
আসতে দেরী হউয়াছে, চলো যাই মেম্বরের কাছে, ইত্যাদি।
শাপলা, শালুক ও ঢেপ তোলতাম। প্রাকৃতিক ডাক আসলে নৌকায় বসে বিলের পানিতেই ছাড়া হত। পিপাসা পেলে বিলের পানিই খাওয়া হত অঞ্জলি ভরে। কারন, পানি ছিল স্বচ্ছ। বেলা ডোবার সাথে সাথে বাড়ীতে ফিরতাম। দলে দলে হাসগুলি বিলের পানিতে সাতার কাটত। হাসকে বলা হত ততি। মেয়েরা সুর করে হাসকে বাড়ী ফেরার জন্য ডাকত “ততি, ততি, আয়, আয়, তই, তই।” হাসগুলি পেকপেক করতে করতে বাড়ী ফিরে খোয়ারে ঢুকত। ” পারখীর খাল দিয়ে পাল তোলা নৌকা ভন্ডেশ্বরের দিকে যেত। নানা রঙের পাল ছিল। মেয়েরা তাদের ছোট ছোট ভাই বোনদের কাখে নিয়ে কান্না থামাত পাল তোলা নৌকা দেখিয়ে। গাইত “বাদাম আলা নাওরে, পান খাইয়া যাও। আমাগো অমুকরে ঘুম দিয়া যাও। ” দূর থেকে মাইকে আব্দুল আলীমের কলের গান ভেসে আসত “বন্ধুর নায়ে ওরে নীল বাদাম।আমি গাংগের ঘাটে যাইতে নারি, ঘরে আছে নানান কাম। ”
কখনো কখনো বিকেলে আমি ও ভুলু ভাই ডিঙি নৌকা নিয়ে হল্কা মাছ মারতে যেতাম। বিলের মাঝারি সাইজের রুই মাছকে বলা হত হল্কা মাছ। চামারা ধান ক্ষেতে নৌকা থামিয়ে আমি লগি দিয়ে ঠেকিয়ে রাখতাম। ভুলু ভাই বিড়ালের মত মাছের দিকে তাক করে থেকে খচ করে কোচ দিয়ে ঘা মেরে হল্কামাছ আটকিয়ে ফেলত। আনন্দ করে নানাবাড়ি নিয়ে আসতাম।

শীতকালে নানাবাড়ি যেতাম পা পথে নওপাড়া, জিতেশ্বরি, ঢ্নডনিয়া, তেল ধারা, নাইন্দাভাংগা, দিঘী চালা, হামিদপুর, চকপাড়া, বহরমপুর ও পারখী হয়ে। সিবা মামা মাকে নিতে আসতেন। সাথে মাঝে মাঝে সোনাবুঝি আসতেন। সোনাবুঝি অনেক গীত জানতেন। আমি গীত শুনতে চাইলে গীত শুনাতেন। কিছু কিছু আমার মনে আছে। যেমন
ঘরে গেছিলাম পান খাবার জায়ে ছক্কল ধরল লো, জায়ে ছক্কল ধরলো!
জায়ের জ্বালায় পাট ক্ষেতে গেলাম শিয়ালে ছপ্পন ধরল লো, শিয়ালে ছপ্পন ধরল!
শিয়ালের জ্বালায় গাছে উঠলাম কাউয়ায় গল গল করল লো, কাউয়ায় গল গল করল!
খুব ভোরে উঠে নানাবাড়ির উদ্যেশ্যে হাটা শুরু করতাম। খুব আনন্দের সাথেই হাটতাম। দিঘীচালার দিঘীতে যেখানে রাজকুমারী মইলন করতে গিয়ে ডুবে মারা গিয়েছিল সেই পয়েন্টটা দেখতাম। সেখানে কচুরিপানা জমত না। এই দিঘীর নাম বড় হয়ে জেনেছি বখতার খার দিঘী। চকপাড়া পর্যন্ত গেলে পা চালাতে খুব কষ্ট হত। সোমেলা মার কোলে করে যেতো, তাই হিংসা হত। তার পায়ের তলায় চুলকানি দিতাম তাতে সে খিলখিলি হাসত। মার সমস্যা হত। আমাকেও কোলে নিতে বলতাম। মা বলতেন “এইতো এসে গেছি। এই পারখীর গাং পার হলেই তোমার নানীগ বাড়ী। ” গাং পার হলেই নানাবাড়ি দেখা যেত। তখন পায়ে বল ফিরে আসত। দুপুরের আগ দিয়ে পৌছে যেতাম নানীগ বাড়ী।

পরেরদিন ভোরে আমি ও ফজুভাই চলে যেতাম মাইজবাড়ী খালাকে আনতে। শিশিরের পানি ও রাস্তার ধুলা কাদা পাকিয়ে পায়ের সেন্ডেল জড়িয়ে ধরত। পথের দুই পাশে খেশারী কলাইর ছেই তুলে তুলে মুখে দিতাম। বিকেলে ছেই তুলে রাতে সিদ্ধ করে সকালে সবাই মিলে খেতাম। রাতে সব মামাত খালাত ভাইয়েরা নানীর ঘরের মেঝেতে শুয়ে নানা রকম হাসির গল্প বলতাম। মেঝেতে খর বিছিয়ে তার উপর পাটি বিছানো হত। তাতে তোষকের কাজ হত। মাঝে মাঝে তর্ক লেগে গিয়ে বকা ঝকা শুরু হয়ে যেত। বলা হত
-এই পাহাইরা
-এই ভৌরা
আমাদের বাড়ী পাহার অঞ্চলে তাই পাহাইরা বলত। নানা বাড়ী ও খালাবাড়ী ভর অঞ্চলে তাই ভৌরা বলতাম।

মা, খালা, মামী রান্নাঘরে গভীর রাত পর্যন্ত দুধের পিঠা, পুলি পিঠা, সাওই পিঠা, মুঠা পিঠা ইত্যাদি বানাতে বানাতে কেউ বাপের বাড়ির কেউ শশুর বাড়ীর গল্প করতেন। আমরা মেঝেতে এলোমেলো ভাবে শুয়ে থাকতাম। নানী আসলে ঘুমের ভান করতাম। নানী আমাদেরকে গুছিয়ে শোয়ানো শুরু করতেন। এক হাত ও এক পা ধরে উচু করে নিয়ে বালিশে সারিবদ্ধভাবে শোণ য়াতেন। আমরা গভীর ঘুমের ভান করে নেং করতাম না। খুব মজা পেতাম। নানী চলে গেলে কিলিকিলি হাসতাম। আবার গল্প ও গেঞ্জাম শুরু করতাম। সকালে সেই সব পিঠা পেটভরে খেতাম।
শীতের দিনে দক্ষিন পাশের পাগারের পানি কমে যেত। কচুরিপানায় ভরে যেত। আমি খুইয়া জাল পানার নিচ দিয়ে ঢুকিয়ে দিতাম। ফজুভাই জালের উপর থেকে পানা সরিয়ে দিত। জাল উচু করে ফেলতাম। তাতে চাটামাছ, খলসে মাছ, শিং মাছ, মাগুর মাছ ও কই মাছ উঠত। মাঝে মাঝে শিং মাছের কাতা খেয়ে বিষে কাতরারাম। মা ও মামী ঝার ফুক দিলে ব্যাথা কমে যেত।
শীতের দিনে পুর্বপাশের পুকুরের পানি কমে যেত। কচুরিপানায় ভরে যেত। মামারা ডল্লাজাল টানতেন। বড় বড় বোয়াল মাছ মামাদের কাদের উপর দিয়ে লাফিয়ে যেত । তাতে বোয়ালমাছ, চিতল মাছ, শৈলমাছ ও ফইল্লামাছ উঠত। খলইভরে বাড়ি নিয়ে আসতাম। মাঝে মাঝে পুকুরে ডুবিয়ে রাখা নৌকা টান মেরে ডাংগায় তুলে পানি সেচে ছোট মাছ ধরা হত। আমরা পুকুরের পানিতে নল খেলেছি। আঙুল তুলে বলেছি “এইটা কি?”
-নল।
-আমি গেলাম গংগার তল।
ডুব দিয়ে হারিয়ে যেতাম। অন্যজন ডুব দিয়ে ছুয়ে দিলে সেই হত নল।
সকাল বেলা রোদ উঠলে ডুবানো নৌকার গলুইয়ে বসে সুন্দর সুন্দর কাছিম রোদ পোহাত। চেরা দিয়ে ডিল দিতাম। টুব করে ডুব দিত। পানির উপর এমনভাবে চেরা ছুরতাম যেন পানির উপর দিয়ে ব্যাঙ লাফিয়ে যাচ্ছে।
বিকেল বেলা সব ছোটরা উত্তরপাশের হালটে গোল্লাছুট, টুংকিবারি, হাডুডু ও গোদুল্লা খেলতাম। খেলতে খেলতে অন্ধকার হয়ে গেলে কেউ হঠাৎ বলতো “ছালা ধরা আইল। ” এক দৌড়ে ঘরে ঢুকে পরতাম।
সন্ধার সময় হালট দিয়ে গ্ররুর পাল খুরা দিয়ে ধুলা উড়াতে উড়াতে বাড়িতে ফিরত। এটাই হয়ত ছিল গোধুলি। এই সময়টাই হয়ত ছিল গোধুলি লগন।
শীতের সকালে মা, মামী ও খালা আলই ধানের খই ভাজতেন। খালা মাইটা পাতিলে বালু জাল দিয়ে নারতে নারতে গরম করতেন। মামী মাইটা পাতিলে চাউল গরম করতেন। গরম বালু মাইটা বুরকায় ঢেলে দিতেন। তার সাথে ঢেলে দেয়া হত গরম চাউল। মা দুই হাতে বুরকা ধরে দাঁড়িয়ে ঘুরাতে থাকতেন। হুম হুম করে বুরকার ভিতর খই ফুটত। ছাপ্নির উপর ঝাইঞ্জর বসিয়ে তার উপর বালিসহ খই ঢেলে দিতেন। মামী কলাপাতার ডাইগ্যা দিয়ে খই নারতেন। বালি পরে যেত ছাপ্নিতে। নানী কুলায় ঝেরে খই টিনে তুলে রাখতেন। মার মুখে বালি উড়ে লেগে যেত। মার ফর্সামুখ কালো হয়ে যেত। খেজুরের গুরের সাথে খই মিশিয়ে মামী মোয়া বানাতেন। আমি কামুড় দিয়ে খেতাম। মোয়া ভেংগে খই উঠানে পরত। মুরগীর বাচ্চারা চিয় চিয় করে খই ঠুকরিয়ে খেত। মামী ডেপের খই ও বিন্দি ধানের খই দিয়েও মোয়া বানাতেন। চিনা দিয়ে পায়েস রান্না করতেন। মামী চামারা ধানের মুইঠা পিঠা দিতেন। উঠান দিয়ে বেড়ায়ে বেড়ায়ে খেতাম। পিছে কুত্তার বাচ্চা কুত কুতি চেয়ে থাকত। মুইঠা পিঠা দিয়ে কুত্তাকে ডিল দিতাম। কুত্তা তুলে খেয়ে ফেলত। এইজন্য কেউ কেউ এই পিঠাকে কুত্তা ঢেলানো পিঠা বলত। বরন ধানের গরম ভাতে লাউয়ের পাতা ভর্তা দিয়ে নাস্তা করতাম।
বড় হয়েও নানাবাড়ির সেইসব স্মৃতি মনে পরে। তাই মাঝে মাঝে নানাবাড়ি যাই। কয়েক বছর আগে খুব পানি হয়েছিল। চাদনী রাত হিসাব করে ভরা বর্ষায় নানাবাড়ি গেলাম। বিকেলে কিছুক্ষণ রুগী দেখলাম। রাতের খাবার খেয়ে আমি ফজুভাই ও কাদের ভাই ডিংগি নৌকা নিয়ে বিলের মাঝখানে লগি গারলাম। আমার ইচ্ছা ছিল মামাত ভাইদের সাথে ছোটবেলার গল্প করব। নৌকায় চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশের পুর্নিমার চাঁদ ও সাদা মেঘের আনাগুনা দেখছি আর আলাপ করছি। আমি গান ছাড়লাম। বাউল গান। ছোট বেলায় যেগুলি শুনেছি। মাঝে মাঝে বলদ মারার ক্ষেত, আটা ক্ষেত, খুনিবাড়ি, নোকাইল ইত্যাদি নিয়ে কথা বলি। লক্ষ করলাম তারা আমার গান ও আমার কথার প্রতি মনযোগী না। আমি বলি এক কথা কাদের ভাই বলেন আরেক কথা। তিনি বলেন “সাদেক, ছেলেকে প্রাইভেটে দিব না সরকারিতে দিব?” আমি বলি এক কথা ফজু ভাই বলেন আরেক কথা। তিনি বলেন “সাদেক, আমি যেখানে চাকরি করেছি সেখানের মানুষ পাতে আস্ত মুরগীর রোষ্ট নিয়ে এক কামড় খেয়ে বাকীটা ফেলে দেয়। ” নৌকা ভ্রমনে ছোট বেলার মত মজা পেলাম না। রাত ১২ টার পর শুতে গেলাম। ভাবলাম শুয়ে শুয়ে জেগে জেগে পানির পাখীর ডাক শুনব। কোড়া ও ডাহুক পাখীর ডাক শুনব। পানিতে ঠোট ডুবিয়ে পাখী টুব টুব করে ডাকবে।
এমন সময় দজায় করা নাড়ার শব্দ পেলাম। কয়েকজন মহিলা রুগী এসেছেন। তাদের কথা শুনতে হবে। আমি বললাম “বিকেলে অনেক রুগী দেখলাম। তখন বললেন না কেন?” তারা বললেন “আমরা আমাদের রোগের কথা সবার সামনে বলতে পারব না। আমরা লজ্জা পাই। ” রুগীর প্রেস্কৃপশন করা শেষ করে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পরলাম। কোড়া পাখীর ডাক শোনা হল না। শোনা হল না দূর দেখে ভেসে আসা গ্রাম্য বাউলের “ফাকি দিয়া থাকবা কত দিন। মনে কি পরে না তোমার মহাজনের আছে ঋণ। ফাকি দিয়া থাকবা কত দিন। ”

মাঝে মাঝেই ছোট বেলার নানাবাড়ির সেই মধুর স্মৃতির কথা মনে পরে। নানারা নেই। নানীরা নেই। মামারা নেই। মামীরা নেই। খেলার সাথীরা বড় হয়ে গেছে। আর তারা খেলবে না। কিন্তু সেই বিল, সেই আটা ক্ষেত, সেই পানি, সেই পুকুর ঠিকই আছে। তাই তো বার বার মন ছুটে যায় নানাবাড়ি, নানীগ বাড়ী।

===
ডাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
ফেইসবুক পোস্ট
১০/১১/২০১৭

 

Continue reading “আমার ছোটবেলার নানাবাড়ি”

আমার দাদাবাড়ী

আমার দাদাবাড়ী টাংগাইল জেলার কালিহাতি উপজেলার ভিয়াইল গ্রামের দক্ষিন পাড়ায়। কালিহাতি শহর থেকে ৪/৫ কিলোমিটার পুর্বে। বংশী নদীর ১ কিলোমিটার পশ্চিমে। এলাকাটি খুব নিচু।অল্পতেই বন্যা হয়। স্থানীয় ভাষায় ভর অঞ্চল বলা হয়। দাদার নাম মোকসেদ আলী তালুকদার ওরফে মোকসে তালুকদার। দাদারা ছিলেন ৫ ভাই। কায়েম উদ্দিন তালুকদার, মেছের উদ্দিন তালুকদার, মোকসেদ আলী তালুকদার, জয়নাল আবেদীন তালুকদার (আজ তালুকদার) ও মাজম আলী তালুকদার (মাজ তালুকদার)। মাজ তালুকদারকে আমি দেখি নাই। তিনি বিয়ে করার Continue reading “আমার দাদাবাড়ী”