আমার দাদাবাড়ি

আমার দাদাবাড়ি
আমার দাদাবাড়ি টাংগাইল জেলার কালিহাতি উপজেলার ভিয়াইল গ্রামের দক্ষিণ পাড়ায়। কালিহাতি শহর থেকে ৪-৫ কিলোমিটার পুর্বে। বংশী নদীর ১ কিলোমিটার পশ্চিমে। এলাকাটি খুব নিচু। অল্পতেই বন্যা হয়। স্থানীয় ভাষায় ভর অঞ্চল বলা হয়। দাদার নাম মোকসেদ আলী তালুকদার ওরফে মোকসে তালুকদার। দাদারা ছিলেন ৫ ভাই। কায়েম উদ্দিন তালুকদার, মেছের উদ্দিন তালুকদার, মোকসেদ আলী তালুকদার, জয়নাল আবেদীন তালুকদার (আজ তালুকদার) ও মাজম আলী তালুকদার (মাজ তালুকদার)। মাজ তালুকদারকে আমি দেখি নি। তিনি বিয়ে করার আগেই মারা গিয়েছেন। কি একটা জ্বর হয়েছিল যেনো। সেই জ্বরে যৌবন বয়সে তিনি, আমার এক ফুফু ও এক চাচা মারা গিয়েছেন। দাদার বাবার নাম ছিল মালু শেখ। পরবর্তীতে তিনি মালু মন্ডল হন। হজ্জ করার পর হন মালু হাজী। অনেক সম্পত্তির মালিক হওয়ার পর তিনি বৃটিশ সরকার কর্তৃক তালুকদার খেতাব পান। শুনেছি, আমাদের এলাকায় ৫৬ শতক জমিকে ১ পাখি, ১৬ পাখিতে ১ খাদা, ১৬ খাদায় ১ আনা তালুক ছিল। ১৬ আনা তালুক অতিক্রম করলে তাকে জমিদার বলত। মালু তালুকদার ২ আনার তালুকদার ছিলেন। আমার বড় ফুফুর শশুর বাড়িও ভিয়াইল গ্রামের মধ্যপাড়ায়। ফুফার নাম ছিল মফিজ উদ্দিন তালুকদার। ফুফার দাদা ছিলেন ৪ আনা তালুকদার। ফুফুর বিয়েতে ১৭ রকমের গহনা তার শশুর দিয়েছিলেন পন হিসাবে। ফুফা ছিলেন ডা. সাখাওয়াত তালুকদার এমবি-এর ছোট ভাই। সফি তালুকদারের বাবা ছিলেন ডা. সাখাওয়াত তালুকদার।

বড় দাদা কায়েম উদ্দিন তালুকদার তহসিলদার ছিলেন। তিনি জমিদারের খাজনা আদায় করতেন। মেঝ দাদা মেছের উদ্দিন তালুকদার মাতাব্বর ছিলেন। আমার দাদা মোকছেদ আলী তালুকদার একটু সৌখিন, উদাসীন ও ভোজনপ্রিয় মানুষ ছিলেন। তিনি স্বাস্থ্য বিভাগে খন্ডকালীন চাকরী করতেন। গ্রামে কলেরা ও বসন্তের টিকা দিতেন। তাই তাকে টিকাদার বলা হত। টিকাদারের নাতী ডাক্তার হয়েছি । দাদা যৌবনকালে ধুতি ও সাদা পাঞ্জাবী পরতেন। সম্ভ্রান্ত হিন্দুদের মত গলায় নগুন পরতেন। আমি দাদাকে খুব ধার্মিক দেখেছি। তিনি রেগুলার নামাজ পড়তেন। সকালে কোরআন পড়তেন। আমি দাদার কাছে কোরআন শিখেছি। তিনি বাড়িতে ব্যাবহারে জন্য বাঁশ/কাঠ দিয়ে চালা, ডালা, কুলা, উচি, শলা, খরম, পয়টা, গাছা ইত্যাদি বানাতেন। তিনি যা বানাতেন আমিও সাথে সাথে তা বানিয়ে ফেলতাম।

দাদার শশুরবাড়ি তালতলা গ্রামে। আসান তালুকদার ও পাসান তালুকদার দাদীর ভাই। দেওপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজহার তালুকদার বাবার মামাত ভাই। গোয়ারিয়ার জসিম উদ্দিন তালুকদার দাদার ফুফাত ভাইয়ের ছেলে। শিশু সার্জন প্রফেসর ডাঃ শাহ আলম তালুকদার আমজানি গ্রামের দাদার মামাত ভাই সফদর তালুকদারের ছেলে।

দাদাদের জমিজমা প্রায় ১৩ টি গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। তখন জমি তেমন উর্বর ছিল না। ফসল বন্যা ও খরায় নষ্ট হয়ে যেত।  সময়মত খাজনা না দেয়ায় নিনামে উঠে অনেক জমি হাতছাড়া হয়ে যায়। আমার দাদার জমি অনেক কমে যায়। বেচে থাকাদের মধ্যে দাদার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে ছিলেন। ছেলের মধ্যে আমার বাবাই বড়। পাহাড় অঞ্চলের জমি মধ্যে ঢনডনিয়া গ্রামের জমির পরিমাণ ও কদর বেশী ছিল। মেছের দাদা তার পরিবার নিয়ে সেখানে বসতি স্থাপন করলেন। দেখা গেল সেখানকার জমির ফলন বেশী। বন্যায় নষ্ট হওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই। বড় দাদা তার শক্ত সামর্থ ছেলে রিয়াজ উদ্দিন তালুকদারকে পাঠালেন পাহারের জমিতে বাড়ি করে থাকার জন্য। কিছুদিন পর আমার দাদাও সিদ্ধান্ত নিলেন আমার বাবাকে পাঠানোর। তখন লাইলি বুবু ও আকবর ভাইর জন্ম হয়েছে। আমি আমার মায়ের পেটে শুখে শান্তিতেই ছিলাম। আজো দাদা ছিলেন দাদার সৎভাই। আ্জো দাদা ও বাবা এক সাথে বাড়ি করেছিলেন। এখন যে আমাদের বাড়ি আছে এই বাড়ির এক খেত দক্ষিণে এই বাড়িতে ওঠার পর আমার জন্ম হয়। এটা ছিল ১৯৫৮ সন। সাত দিনের সময় আমার নাভীর নাড় শুক্না হয়ে ঝরে পরে। থাকার ঘরের পিছনে ওটা পুতে রাখা হয়। পরে মাটির সাথে মিশে যায়। জামাল ভাইর বাড়ির পশ্চিমের খেতে আমার নাড়ী মিশে আছে। তাই আমি আমার ঘরের বারান্দায় বসে দক্ষিণ দিকে মাঝে মাঝে সেই খেতের দিকে চেয়ে থাকি।

তবে আমাদের ঐ বাড়িতে আমাদের বেশী থাকা হয় নি। কিছুদিন পর ছোট দাদার পরিবার ও মার মধ্যে উঠান শেয়ার করা নিয়ে ঝামেলা বাঁধে। মেছের দাদা বিচার করে দুই বাড়ি দুই দিকে সরিয়ে দেন। ঐ ভিটা খালি হয়ে যায়। ঢনডনিয়া এসেই মা একটি কাঁঠালগাছ লাগিয়েছিলেন। সেই গাছকে সামনে রেখে আমাদের নতুন বাড়ি নির্মান করা হয়। যেহেতু সেই বছরে আমার জন্ম হয়, সেহেতু গাছটির বয়স আমার বয়সের সমান। দেখবেন সেই গাছটি আমাদের বাহির বাড়িতে আছে।

আমি বুঝমান হয়ে মাঝে মাঝে বাবার সাথে দাদাবাড়িতে যেতাম। দাদার স্টিলের তৈরি পেচানো রডের একটা চেয়ার ছিল। পিতলের তৈরি নক্সা করা পাইপওয়ালা একটি হুক্কা ছিল। আমরা বলতাম বান্ধা হুক্কা। দাদা চেয়ারে বসে দূরে হুক্কা রেখে পাইপ দিয়ে হুক্কার ধুম পান করতেন। বিরাট একটা সিন্দুক ছিল। থালা বাসন, বদনা, গাছা ইত্যাদি পিতল ও কাশার তৈরি ছিল। আমি দাদার চেয়ারে বসে হুক্কার পাইপ হাতে নিয়ে তালুকদারি ভাব নিয়ে বসতাম। দাদাবাড়িতে সুন্দর সুন্দর দুইটি পুকুর ছিল। একটির এখন অস্তিত্ব নাই। আরেকটি কচুরিপানায় ভরা। যত্ন নেয়ার লোকের অভাব। সেই সিন্দুক, চেয়ার, পিতলের জিনিস পত্র কিছুই নেই। চাচাত ভাইয়েরা এগুলি বেমানান ও অপ্রয়োজনীয় মনে করে ভাঙ্গারিদের কাছে বেচে দিয়েছেন।

মাঝে মাঝে কাজের ফাঁকে এখনো দাদাবাড়ি বেড়াতে যাই। মনে পড়ে দাদার স্মৃতিবিজড়িত সেসব জিনিসের কথা, বাবার শৈশবকাল ও যৌবনকাল কাটানোর স্থান গুলোর প্রতি মায়া, মার শশুরবাড়ির প্রতি আমার আবেগ, বুবু ও ভাইর জন্মস্থানের প্রতি আলাদা টান। তাই আমি আমার দাদাবাড়ি ভালবাসি। ভালবাসি ভিয়াইল গ্রাম।

৩/১১/২০১৭ খ্রি.

 

One Reply to “আমার দাদাবাড়ি”

Leave a Reply

Your email address will not be published.