এনাটমির পড়া

এনাটমির পড়া
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

এম বি বি এস ক্লাস শুরু হয় আমাদের এনাটমি দিয়েই। ১৯৭৯ সনের ডিসেম্বরের ১৮ বা ১৯ তারিখে ভর্তি হলেও ক্লাস শুরু হয় আমাদের ১৯৮০ সনের জানুয়ারি মাস থেকে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ আমাদের টাংগাইল থেকে কাছে হওয়াতে এবং কম খরচে পড়তে পারব এই চিন্তা করেই আমি ভর্তির দরখাস্ত ফর্মে প্রথম পছন্দ ময়মনসিংহ দিয়েছিলাম। তাই আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে চাঞ্চ পাই। এসে দেখি হোস্টেলে সীট নাই। কি আর করা যায়। যারা অবস্থাবান ফ্যামিলি থেকে এসেছিল তারা বেশ কয়েকজন বাইরে শেয়ার করে বাড়ি ভাড়া করে থাকা শুরু করলো। আমি আপাতত জে সি গুহ রোডে পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত বাড়িতে মেডিকেল কলেজের অস্থায়ী হোস্টেলে ওঠলাম চাচা শাহ আলম তালুকদারের রুমে ডবলিং করে থাকার জন্য। এদিকে এনাটমি কার্ড আইটেম পরীক্ষা শুরু হয়ে গিয়েছিল। আমি গ্রাম থেকে শহরে এসে থাকা শুরু করেছি মাত্র। শহরে এসে থাকা এডজাস্ট করতে পারছিলাম না। চাচার সাথে ডব্লিং করে থাকা আমার ভালো লাগছিল না। আমি সব সময় চিন্তাগ্রস্ত থাকতাম এবং মনমরা রোগে আক্রান্ত ছিলাম। কোন বই কিনতে হবে, কোন বই পড়তে হবে, কিভাবে পড়তে হবে তার কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। ঢাকাইয়া ক্লাসমেট যারা ছিল তারা খুব চালু ছিলো। তারা খুব পড়া পাড়তো। তারা খুব আনন্দে থাকতো। আমি গুনে গুনে সিরি বেয়ে উপরে উঠতাম। তারা লাফিয়ে লাফিয়ে উপরে উঠতো। চারজন ছাত্র ভুয়া মার্ক দেখায়ে আমাদের মেডিকেল কলেজে চাঞ্চ পেয়েছিল। তারা আরো চালু ছিল। তারা খেলাধুলায় খুব পাকা ছিল। কিছুদিন যেতেই খবরের কাগজে পড়লাম “ভুয়া মার্কশীট জমা দিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ৪ জন ছাত্র ভর্তি হয়েছে।” কে কে ভর্তি হয়েছে তার নাম লিখা ছিল না। তাই এই ১৫০ ছাত্রের মধ্যে ঐ ৪ জন ছাত্রের নাম জানা যায় নি। তবে ঐ খবর বের হবার পর থেকে কয়েক বন্ধুকে আর দেখি নাই আমাদের ক্লাসে। আমি সন্দেহ করেছিলাম তারাই হবে।

এক সিনিয়র ভাই থেকে গ্রে’স এনাটমি বই কিনেছিলাম। বিদেশী বড় দামী টেক্সট বই। লেকচার ক্লাসে এনাটমির প্রফেসর আব্দুল হাই ফকির স্যার কিনতে বলেছিলেন। তিনি বিদেশী ডিসেকশন বই কানিংহামস মেনুয়ালও কিনতে বলেছিলেন। আমি সরল বিশ্বাসে সেই বইগুলি কিনে ফেলি অনেক টাকা দিয়ে। কিন্তু পড়ে কোন কুল কিনারা পাচ্ছিলাম না।

এনাটমির লেকচারার ডাঃ নাছির স্যার আমাদের “এ” ব্যাচের আইটেম কার্ড পরীক্ষা নিতেন। চেপ্টারগুলিকে ছোট ছোট করে ভাগ করে আইটেম তৈরি করা হতো ১০ নম্বরের। ৬ পেলে পাস। কম পেলে ফেইল। ফেই ল হলে আবার পরীক্ষা। নাছির স্যার কয়েকটা আইটেম নিলেন। কিন্তু কোনটাতেই ৬ পাই না। মন আরো খারাপ হতে লাগলো। অন্যরা, বিশেষ করে ঢাকাইয়া ক্লাসমেটরা ঠিকই ভালো নাম্বার পাচ্ছিল। পেয়ে পেয়ে প্রেসক্লাব কেন্টিনে বিরিয়ানি খেয়ে আসতো। কৃষ্ণা কেবিন থেকে ছানার পোলাও খেয়ে আসতো। ছুটির দিনে দল বেধে ট্রেনে চড়ে আনন্দে ঢাকায় চলে যেতো। এগুলি দেখে আমার মন আরো ভেংগে গেলো। এক সময় দুনিয়াকে ভালো লাগছিল না। এভাবে চলতে থাকলে হয়ত দুনিয়া থেকে চলে যেতে হতো। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর অবস্থাও আমার মতো। সে তার মনমরা রোগের কথা আমাকে খুলে বলল। আমি বিজ্ঞের মতো তাকে বুঝালাম। আমারও যে মনমরা রোগে ধরেছে তা তাকে বললাম না। একদিন সে আইটেমে ফেল করাতে তার জেদ চেপে গেলো। দুইদিন সময় পেয়েছিল। সে বলল “আজকে আমাকে স্যারে আটকাতে পারবেন না। আমি কানিংহামের এত পৃষ্ঠা মুখস্থ করে এসেছি।” বাস্তবে দেখা গেলো সেদিন সে মাত্র ৩ পেয়েছে। সে তো মুখস্ত বলতে পারে এত পৃষ্ঠা। স্যার যখন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রশ্ন করেন তখন সে বলতে পারে না। এই ঘটনার পর সে আমাকে বলল
– সাদেক, আমি মেডিকেলে পড়ব না। আমার দ্বারা মেডিকেলের পড়া সম্ভব না।
– দেখ, আমরা গ্রাম থেকে এসেছি। আমাদের থাকার জায়গা নেই। বই পুস্তকের ঠিক নেই। কিভাবে পড়তে হবে এখনো বুঝতে পারছি না। আমরা গ্রামের প্রতিষ্ঠান থেকে পড়ে এত ভাল রেজাল্ট করেছি। মেডিকেলে পড়তে পারব না! আমরাই পারবো। ধৈর্য ধর।

আমি ঢাকাইয়া ক্লাসমেটদের সাথে মেঝ শা শুরু করলাম। তাদের সাথে ভাব দেয়ার চেষ্টা করলাম। তাদের সাথে বেড়াতে বেড়াতে তাদের রুমে গেলাম। গিয়ে দেখি তাদের রুমে পাতলা পাতলা বই। আমি বইগুলি পড়ে দেখলাম। একদম সহজ করে লেখা। প্রশ্ন আছে, উত্তর আছে। বললাম
– এইগুলি কি বই?
– এইগুলি চটি বই।
– এইগুলি কোথায় কিনতে পাওয়া যায়?
– ঢাকার নীলক্ষেতে।

আমি দোস্তকে চটি বই আবিস্কারের কথা জানালাম। এইগুলি পড়লে আমাদেরকে নাছির স্যার আর আটকাতে পারবেন না। ঢাকায় গিয়ে এনাটমির চটি বই নিয়ে এলাম।
এরপর নাছির স্যার আমাদেরকে আর আটকাতে পারেননি। আমরা ১০ -এ ৭, ৮, ৯ পাওয়া শুরু করলাম। ইতিমধ্যে চালু ক্লাসমেটদের সাথে হোস্টেলের একটা বড় রুমে ১৮ জন থাকার একটা রুম পেলাম। সবার সাথে থেকে এনাটমি পড়ার ভাও বুঝে ফেললাম। আগে বিদেশী টেক্সট বই পড়ে নিতাম, পরে দেশী চটি বই পড়তাম। এনাটমিতে ক্লিয়ার কন্সেপ্টশন হতো। শেষে এনাটমিতে এতই ভালো করেছিলাম যে প্রফ পরীক্ষা এনাটমিতে আমার ভাইবার পারফর্মেন্স দেখে চন্দন স্যার ফিজিওলজির ভাইবা বোর্ডের স্যারদের কাছে ইনফোর্মেশন দেন যে এ ছেলে ভালো, এনাটমিতে ভালো করেছে। আমার বন্ধুটিও তাই করে।
২১/৭/২০১৯ ইং