এমআরআই পরীক্ষা

এমআরআই পরীক্ষা

(স্বাস্থ্য কথা)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

এমআরআই কথাটার পূর্ণ শব্দগুলো হলো ম্যাগনেটিক রিজোনেঞ্চ ইমেজিং। এই পরীক্ষায় শক্তিশালী ম্যাগনেট (চুম্বক), রেডিও ওয়েভ (বেতার তরঙ্গ) ও কম্পিউটার ব্যবহার করা হয়। তাতে শরীরের ভেতরে জিনিসের বিস্তারিত এবং পরিস্কার ছবি পাওয়া যায়। শুধু ডাক্তারই না, রোগীও চায় রোগ হলে তার শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের একটা পরিস্কার ছবি। এক্স-রে ও সিটি স্ক্যান পরীক্ষায় ক্ষতিকর আয়োনাইজিং রেডিয়েশন ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এমআরআই পরীক্ষায় তা ব্যবহার করা হয় না বলে এতে রিস্ক নেই।

এটোমিক নিউক্লিয়াসের ম্যাগনেটিক প্রোপার্টি কাজে লাগানো হয় এমআরআই পরীক্ষায়। শরীরের প্রত্যেক কোষেই পানি থাকে। পানিতে থাকে হাইড্রোজেন এটোম। যার ভেতর থাকে সিঙ্গেল প্রোটন। যেহেতু শরীরের সব টিস্যুতে হাইড্রোজেন এটোম আছে সেহেতু সব টিস্যুরই এমআরআই করা যায়। হাইড্রোজেন এটোম কম্পাস কাটার মতো আচরণ করে। ম্যাগনেটিক স্ক্যানার যেদিকে ঘুরে সেদিকেই হাইড্রোজেন কম্পাস কাটা ঘুরে। স্ক্যানারের রেডিও ওয়েভ ব্যবহার করে হাইড্রোজেন কম্পাসকে ঘুরানো হয় এবং তারা ম্যাগনেটিক ফিল্ডে অসিলেট করে ইকুইলিব্রিয়ামে চলে আসে। এই সময় রেডিও সিগনাল তৈরি হয় যেগুলো ক্যাপচার করা হয় এন্টিনা দিয়ে। পাঠিয়ে দেয়া হয় ও কম্পিউটার প্রসেসরে। প্রসেসর প্রসেস করে সেই টিস্যুর স্পষ্ট ছবি তৈরি করে মনিটরে শো করে । প্রিন্ট করে রিপোর্টের সাথে দেয়া হয়। সিগনালের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি সাধারণত ৪০-১৩০ মেগাহার্টজ হয় যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর না।

এমআরআই করে ডাক্তারগণ রোগ বা ইঞ্জুরিটার ছবি স্পষ্ট দেখতে পান। রোগ চিকিৎসার সময় কেমন ভালো হচ্ছে তাও দেখতে পান। শরীরের বিভিন্ন অংশের এমআরআই পরীক্ষা করা যায়। বাস্তবে বিশেষ করে নার্ভাস সিস্টেম বা স্নায়ু তন্ত্রের এমআরআই বেশি বেশি করা হয়। এর মধ্যে আছে ব্রেইন ও স্পাইনাল কর্ড। ব্রেইন থাকে মাথার খুলির ভেতর। আর স্পাইনাল কর্ড থাকে মেরুদণ্ডের হাড়গুলোর ভেতর দিয়ে যে পাইপ আছে তার ভেতর। ব্রেইন ও স্পাইনাল কর্ডকে একসাথে সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম বলা হয়। এগুলো খুবই নরম। আপনারা মুর্গি, গরু ও খাসির মগজ দেখেছেন। মুরগির মেরুদণ্ডের ভেতরের সাদা নরম জিনিসগুলো অনেকে কাঠি দিয়ে খোচা দিয়ে বের করে ফেলে দিয়ে রান্না করে। এটাই হলো স্পাইনাল কর্ড। মানুষের এমন ব্রেইন ও স্পাইনাল কর্ড আছে। ব্রেইন ও স্পাইনাল কর্ডের অনেক ধরনের সমস্যা হতে পারে। সেইগুলা ধরার জন্য এমআরআই বেশি বেশি করা হয়। যেমন, রক্তনালি ডেমেজ, ব্রেইন ডেমেজ, ক্যান্সার, মাল্টিপল সক্লেরোসিস, স্পাইনাল কর্ড ইঞ্জুরি, স্ট্রোক, চোখের সমস্যা, ভেতরের কানের সমস্যা ইত্যাদি।

হার্ট ও রক্তনালির রোগেও এমআরআই করা হয়। যেমন, রক্তনালির ব্লক, হার্ট এটাক হয়ে হার্ট ডেমেজ, হার্ট ডিজিজ, হার্টের গঠনগত ত্রুটি ইত্যাদি।

হাড় ও জয়েন্টের রোগ নির্ণয়েও এমআরআই ব্যবহার করা হয়। যেমন, বোন ইনফেকশন, ক্যান্সার, জয়েন্ট ডেমেজ, স্পাইনাল ডিস্ক প্রব্লেম, ঘার ও কোমরের ব্যাথার কারন নির্ণয় ইত্যাদি। মেরুদণ্ড বা কশেরুকা হাড়গুলো একটার সাথে আরেকটা সাজানো থাকে মাঝখানে কার্টিলেজ বা মুড়মুড়ে হাড্ডির ডিস্ক বা চাকতি বসিয়ে। এই চাকতিকে বলা হয় ইন্ট্রাভার্টিভ্রাল ডিস্ক। সামনের দিকে ঝুকে (হুতি দিয়ে) ভারী জিনিস তোলার সময় কোমরের ভার্টিভ্রার উপর চাপ পড়ে। ফলে ডিস্ক পিছলে পেছনের দিকে সরে গিয়ে স্পাইনাল কর্ডে চাপ দেয়। তখন রোগী এক ধরনের টাস করে শব্দ অনুভব করে কোমরে। ডিস্ক বা চাকতি আটকে থাকে ঐ অবস্থায় যাকে ডাক্তারি ভাষায় বলা হয় প্রলাপ্স ইন্ট্রাভার্টিভ্রাল ডিস্ক, সংক্ষেপে পিএলআইডি। আগের দিনে গ্রামের মানুষ এই অবস্থাকে হুত উঠছে বলত। হুতি দিয়ে বোঝা উঠানোর সময় হতো বলে হুত উঠছে বলত। এটাকে টাস লেগেছে বলে টাসের ঝাড়া ফুকও দিত। কারন প্রলাপ্স জবার সময় টাস করে উঠতো বলে। এখন গ্রামের মানুষও পিএলআইডি বলতে পারে। পল্লী চিকিৎসকরাও জানে এটা পিএলআইডি। তারা রোগীকে বলে দেয় পিএলআইডি হইছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন চিকিৎসক সেজে শহরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালি করে। নিজে চিকিৎসা করতে না পেড়ে শহরে নিয়ে আসে এমআরআই পরীক্ষা করাতে। করাতে পেড়ে তারা খুশি হয়। খুশিতে পান চিবায়। পিএলআইডি ধরা পড়ার পর এমআরআই এর ছবিটা রোগীকে দেখিয়ে ব্যাখ্যা করে বুঝান। ছবি দেখে রোগী জিনিসটা বুঝতে পারে। আপনিও বুঝতে পারবেন। একদম পরিস্কার ছবি। এমআরআই পরীক্ষা কিন্তু ব্যয়বহুল। সাথে লোক আসে বলে হয়তো আরও ব্যয়বহুল হয়। রোগীর হয়তো ডাক্তার দেখানোর টাকা নেই। হয়তো ঔষধ কেনার টাকা নেই। এমআরআই পরীক্ষা করে যা ছিলো সব শেষ করে ফেললো। আর অবস্থাশালী রোগী হলে প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয় কাউকে কাউকে। স্পাইনাল সার্জনকে দেখানো হয় হয়তো কোন কোন ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। অপারেশন করে ডিস্ক ঠিক মতো বসিয়ে দেন সার্জন সাহেব। বিরাট অংকের বিল আসে রোগীর জন্য। সাথে আসা লোকটার তখন আনন্দ ধরে না এমন কথা শুনা যায়। খুশিতে সে আরও বেশি করে পান চিবায়। কেউ কেউ অধিক টাকা খরচ করে বিদেশ গিয়ে অপারেশন করায়। বিমানে ফিরে আসার সময় আরেকবার চোট লেগে হয়তো আবার আগের মতো হয়। তাই, আমার পরামর্শ হলো পিএলআইডি হয় এমন কোন কাজ না করা। হয়ে গেছে মনে হলে অর্থোপেডিক্স সার্জন অথবা স্পাইনাল সার্জন অথবা নিউরোসার্জনকে সরাসরি দেখান। কোন মাধ্যম রাখার দরকার নেই। এমআরআই পরীক্ষা করার টাকা না থাকলে করাবেন না। অপারেশন করার টাকা না থাকলে করাবেন না। ঔষধের ও নিয়ম কানুনের চিকিৎসাও আছে পিএলআইডির। তবে একটু ধৈর্য্য ধরতে হবে।

নিন্মলিখিত অর্গানের চেক আপ করাতেও এমআরআই পরীক্ষা করা হয়। যেমন, ব্রেস্ট (স্তন), লিভার, কিডনি, ওভারি (ডিম্বাধার), পেনক্রিয়াস, প্রোস্টেট, ইত্যাদি।

এমআরআই পরীক্ষায় রিস্ক নাই বললেই চলে। তবে খুব বেশি প্রোয়জন না হলে প্রেগন্যান্সির প্রথম তিন মাসে এমআরআই না করাই ভালো।

১৬/৯/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

 

 


আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষা

আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষা

(স্বাস্থ্য কথা)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমি মেডিকেল কলেজে পড়তাম ১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ সন পর্যন্ত। তখন আমি আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষার মেশিন দেখিনি। বইয়ে দেখেছি আলট্রাসনোগ্রাফি ইমেজ। ভালো করে বুঝতাম না সে ছবি। শুনতাম জাপানে এই পরীক্ষা খুব বেশি হয়। সেই পরীক্ষা দেশে এসে দ্রুত প্রসার লাভ করেছে। এখন এই পরীক্ষার প্রসার এমন হয়েছে যে আল্ট্রাসনোগ্রাফি না করলে সাধারণ রোগী তৃপ্তিই পায় না। এখন গ্রাম এলাকাতেও আলট্রাসনোগ্রাফি হচ্ছে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাবার কারনে। আল্ট্রাসনোগ্রাফি কথাটা এসেছে আল্ট্রাসাউন্ড থেকে। আর আল্ট্রাসাউন্ড এসেছে সাউন্ড বা শব্দ থেকে।

শব্দ ধরা-ছোয়া যায় এমন কোন বস্তু না। এটা এক প্রকার শক্তি। তাই একে দেখাও যায় না ছোয়াও যায় না। কোন বস্তুতে কম্পন হলে আমরা শব্দ শুনতে পাই। সব শব্দ সব প্রানী শুনতে পায় না। যখন কোন বস্তুতে কম্পন সৃষ্টি করা হয় তখন তার সাথের কঠিন, তরল ও বায়বীয় মাধ্যমে তরঙ্গ বা ঢেউ তৈরি হয়। এই ঢেউ শব্দ তরঙ্গ আকারে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সেই তরঙ্গ এসে আমাদের কানের টিম্ফেনিক পর্দায় বারি খেয়ে পর্দায়ও কম্পন সৃষ্টি হয়। সেটা ওখান থেকে ব্রেইন বা মস্তিষ্কে পৌছে আমাদেরকে শুনিয়ে দেয়। আমরা পানিতে ঢিল ছুড়ে তরঙ্গ সৃষ্টি করে দেখেছি। ঢেউ একবার উচু হয়, একবার নিচু হয়। উচু-নিচু হতে হতে আগাতে থাকে। একবার নিচু থেকে উচু হয়ে নিচুতে নেমে আসাটাকে বলা হয় তরঙ্গের ফ্রিকুয়েন্সি। সেকেন্ডে যতটা ফ্রিকোয়েন্সি দেয় সেটাকে বলা হয় হার্জ। শব্দ তরঙ্গ ঢেউ খেলে মিডিয়াতে সঞ্চারিত হতে থাকে। ঢেউয়ের এক উচু মাথা থেকে আরেক উচু মাথার দূরত্বকে ওয়েভলেংথ বা তরঙ্গধৈর্ঘ্য বলে। আমরা যখন গাছে ঝুলনা বেঁধে ঝুলন খেলি, একজন পেছন থেকে ঝুলনে ধাক্কা দেয়। ঝুলন কিছুদূর গিয়ে আবার আগের যায়গায় ফিরে আসে। এটার ফ্রিকুয়েন্সি আছে। এর কোন তরঙ্গ নাই। কারন এ আগের যায়গায়ই ফিরে এসেছে। ঝুলন যদি আসা আসা যাওয়ার সময় সামনের দিকের পয়েন্টে আগাতো তা হলে তরঙ্গ সৃষ্টি হতো এবং এর একটা তরঙ্গদৈর্ঘ্য থাকতো। গিটারের কর্ড বা তারে টোকা দিলে কম্পন করে শব্দ তৈরি হয়। কর্ড যত চিকন হবে শব্দ তত কনকনে হবে। চিকন তারের শব্দের ফ্রিকুয়েন্সি বেশি। তাই চিকন শব্দ হয়। আমাদের স্বাস নালীতে ভোকাল কর্ড নামে দু’টি তার আছে। কথা বলার সময় বা গান গাওয়ার সময় আমরা ফুসফুস থেকে বাতাস ছেড়ে গলার মাংস সংকুচিত প্রাসারিত করে ভোকাল কর্ড শক্ত ও নরম করি। ভোকাল কর্ড কম্পন করে শব্দ হয় এবং শব্দের ফ্রিকুয়েন্সি কম বেশি হয়। মেয়েদের ভোকাল কর্ড ছেলেদের থেকে চিকন। তাই তাদের শব্দের ফ্রিকুয়েন্সিও বেশি। ফলে, তাদের আওয়াজ চিকন। মিডিয়াতে শব্দতরঙ্গ থাকলে আমরা শব্দ শুনতে পাই। সব তরঙ্গের শব্দ মানুষ শুনতে পায় না। মানুষ শুনতে পায় ২০ থেকে ২০ হাজার হার্জের শব্দ। এর নিচের শব্দকে বলা হয় ইনফ্রাসাউন্ড। ২০ হাজার হার্জের উপরের সাউণ্ডকে বলা হয় আল্ট্রাসাউন্ড। অর্থাৎ ইনফ্রাসাউন্ড ও আল্ট্রাসাউন্ড আমরা শুনতে পাই না। কোন কোন প্রাণী, যেমন, কুকুর এমন সাউন্ড শুনতে পায়। এই আল্ট্রাসাউন্ডকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা আবিস্কার করেছে আল্ট্রাসনোগ্রাফি নামের এই পরীক্ষা পদ্ধতি । যাকে সাধারণ রোগীরা অতি সংক্ষেপে আল্ট্রা পরীক্ষাও বলে থাকে।

আপনারা লক্ষ্য করে থাকবেন, কোলাহলমুক্ত ভোরবেলা মাইকে আজান দিলে সেই আজানের ধ্বনি দূরের বড় বড় বিল্ডিংয়ে বাধা পেয়ে আবার আপনার কানে ফিরে আসে। এটাকে বলা হয় ইকো। তার মানে সাউন্ডওয়েভ নরম মিডিয়া থেকে শক্ত মিডিয়াতে প্রবেশ করতে বাধা পেয়ে প্রতিসরিত হয়। শব্দের এই প্রতিসরণ টেকনোলজি কাজে লাগানো হয়েছে আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষায়। মনে করুন, রোগীর পেটের লিভারটা দেখতে হবে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে। রোগীকে বেডে শোয়ানো হলো। পেটের জামা শরীয়ে চামড়ার উপর আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিনের প্রোব বসানো হল। প্রোবটা গোলাকার, মাইকের মাউথপিসের মতো। এর উপর জেল লাগিয়ে দেয়া হয়। মেশিন অন করলে প্রোবের ভেতর আল্ট্রাসাউন্ড তৈরি হয়। প্রোবটা পেটের চামড়ার উপর লিভার বরাবর ঘুরানো হয়। জেল, চামড়া ও মাংসের ভেতর দিয়ে আল্ট্রাসাউন্ড লিভার পর্যন্ত গিয়ে বাধা পেয়ে ইকো হয়ে ফিরে আসে প্রোবে। এটাকে ইলেট্রোমেগ্নেটিক সিগনালে রূপান্তরিত করে পাঠিয়ে দেয়া হয় মেশিনের প্রসেসর সেকশনে। সেখান থেকে সিগনালের গ্রাফ তৈরি হয়ে মনিটরে প্রদর্শিত হয় ছবি আকারে। এইজন্য বলা হয় আল্ট্রাসনোগ্রাফি। ডাক্তার সাহেব প্রোব ঘুরাতে থাকেন, গ্রাফ বা ছবি দেখে বিশ্লেষণ করে লিভারের সাইজ, সেইপ, ও এর ভেতর কোন টিউমার / ক্যান্সার আছে কিনা তা রিপোর্ট আকারে লেখেন। মনিটর থেকে দু’একটা ছবি প্রিন্ট করে রিপোর্টের সাথে গেঁথে দেন।

মনিটরে আপনি গ্রাফ থেকে বুঝার কথা না। এটা বুঝবেন তিনি, যাকে এই ব্যাপারে শেখানো হয়ে। যিনি বেশি শিখেছেন তিনি বেশি বুঝবেন। যিনি কিছুই শিখেন নাই তিনি কিছুই বুঝবেন না। কাজেই, বিদ্যুৎ এসে গেছে, হাতে টাকা আছে, কিনে ফেললাম একটা আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন। খুলে ফেললাম একটা আল্ট্রাসনোগ্রাফি সেন্টার আলানে-পালানে, তা নয়। এটা চালাতে গেলে একজন এমবিবিএস পাস, তারপর আল্ট্রাসনোগ্রাফির ভালো প্রশিক্ষণ অথবা ডিপলোমা অথবা ডিগ্রি থাকতে হবে। ডিগ্রি যত বড় হবে অথবা অভিজ্ঞতা যত বেশি হবে রিপোর্ট তত ভালো হবে। কমজানা রিপোর্টকারী কিছুই পাবেন না। লিখে দেবেন সব সাভাবিক। অথবা পাথরকে লেখবেন টিউমার বা টিউমারকে লেখবেন পাথর। কাজেই, শুধু মেশিন দেখলেই হবে না মানুষটাকে দেখতে হবে পরীক্ষা করানোর আগে।

সবধরনের রোগ ডায়াগনোসিস করার জন্য আল্ট্রাসনোগ্রাফি প্রজোজ্য নয়। বড়দের মাথায় কোন আল্ট্রাসনোগ্রাফি করা হয় না। তবে শিশুদের দেড় বছর বয়স পর্যন্ত মাথার আল্ট্রাসনোগ্রাফি করা হয়। বুকের ফুসফুসে বাতাস থাকে। বুকের আল্ট্রাসনোগ্রাফি সুবিধাজনক না। তবে বুকে থাকে হার্ট বা হৃদপিণ্ড। হার্টের এই রকম একটা পরীক্ষা আছে যাকে বলা হয় ইকোকার্ডিওগ্রাফি। আল্ট্রাসনোগ্রাফি অব হোল এবডোমেন বা সারাপেটের আল্ট্রাসনোগ্রাফি হলো খুবই কার্যকরী একটা পরীক্ষা। পেটের প্রায় সব অংগের যেমন, লিভার, গল ব্লাডার, পেনক্রিয়াস, সপ্লিন, কিডনি, ইউরিনারি ব্লাডার, প্রোস্টেট, ইউটেরাস, ওভারি ইত্যাদির সাইজ সেপ ও এর ভেতর থাকা পাথর, টিউমার/ক্যান্সার ইত্যাদি দেখা যায়। সব কিছু সাভাবিক থাকলে রোগীকে বুঝাতেও সুবিধা হয়। কোন কোন সহকারী কোন কোন অশিক্ষিত রোগীকে এভাবে বুঝিয়ে দেন “আপনার কলিজা, পিতের থলি, তিল্লি, পিলা, গুর্দা, জরায়ু, মুত্রথলির ছাকনি সব ভালো আছে।” রোগী শুনে সন্তুষ্ট হয়। ব্রেস্ট ও অন্ডকোষেরও আল্ট্রাসনোগ্রাফি হয় । মাংস পেশির রোগেও আজকাল অনেক আল্ট্রাসনোগ্রাফি হচ্ছে। রক্তনালী দেখার জন্য ডপলার আল্ট্রাসনোগ্রাফি নামে একরকম পরীক্ষা করা হয়। শুনেছি, মাথা খারাপ এক রোগী মাথার আল্ট্রাসনোগ্রাফি করার জন্য খুব অনুরোধ করায় রোগীর সন্তুষ্টির জন্য কপালে প্রোব ঘুরিয়ে সান্তনামূলক আল্ট্রাসনোগ্রাফি করেছিলেন এক ডাক্তার । এমন অনেক রোগী আছে প্রয়োজন না থাকলেও তারা আল্ট্রাসনোগ্রাফি করার জন্য পীড়াপিড়ি করে। অনেকে এটাকে কম্পিউটার পরীক্ষাও বলে কম্পিউটারের মনিটরের মতো দেখা যায় বলে। গ্রামের কোন কোন অশিক্ষিত রোগী আল্ট্রাসনোগ্রাফির মনিটর দেখে মজা পায়। বাড়ি গিয়ে ভাবী, ননদ ও জায়ের সাথে গল্প করে বলে “কম্পিউটারে পেটের ভেতরের সব দেখা যায়।” শুনে তারাও নিজের শরীরের আল্ট্রা বা কম্পিউটার পরীক্ষা করাতে আসে আল্ট্রাসনোগ্রাফি সেন্টারে।

আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষার সুবিধা হলো এটা একটা নন-ইনভেসিভ পরীক্ষা। মানে, এখানে শরীরের ভেতরে কোন কিছু ঢুকাতে হয় না। তাই কোন ব্যাথা পাওয়ার প্রশ্ন আসে না। এখানে এক্স-রের মতো রেডিয়েশন হ্যাজার্ড নাই। কারন, এখানে ব্যাবহার করা হয় সাউন্ড। ভালো মেশিন ও ভালো ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা করালে অনেক রোগ নির্ণয় করতে সহায়তা করে আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষায়।

১২/৯/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/


সিটি স্ক্যান পরীক্ষা

সিটি স্ক্যান পরীক্ষা

(স্বাস্থ্য কথা)

ডা.সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

সিটি স্ক্যান রেডিওলজি এন্ড ইমেজিং বিভাগের একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সিটি কথাটার পূর্ণ শব্দ হলো কম্পিউটেড টমোগ্রাফি। এই কাজে কম্পিউটার প্রসেসর দিয়ে এনালাইসিস করা হয় বলে কম্পিউটেড কথাটা এসেছে। টোম কথার অর্থ হলো কেটে খন্ড করা। মনে করুন একটা লাউ টেবিলের উপর রেখে ছুড়ি দিয়ে চাক চাক করে একশ স্লাইস বা টুকরা বা চাক্কা করা হলো। ইংরেজিতে বলা হবে একশ সেকশন করা হলো। এই একশ সেকশন পৃথকভাবে একটা একটা করে দেখলে একেকটা একেক রকম দেখা যাবে। কোন সেকশনে একদম ভরা সলিড থাকবে। কোনটা মাঝখানে একটু ফাঁফা থাকবে। কোনটাতে একটা বীজের এক অংশ থাকবে। কোনটাতে বীজের অন্য অংশ থাকবে। কোন অংশে পোকাও থাকতে পারে। লাউয়ের সবগুলো সেকশন আগের মতো গুছিয়ে একাত্র করলে আগের লাউয়ে যেমনটি ছিলো তেমনটি হবে। সিটি স্ক্যান পরীক্ষায় মানুষটা লাউয়ের মতো করে শত শত সেকশন করা হয় এক্স-রে করে বিভিন্ন দিক থেকে। রোগীকে টেবিলে শোয়ায়ে সিটি এক্স-রে মেশিনের গোল ছিদ্র দিয়ে ধীরে ধীরে প্রবেশ করানো হয়। এক্স-রে মেশিনটা ভুতের মতো অদ্ভুত শব্দ করে রোগীর শরীরের চারিদিকে ঘুরে ঘুরে এক্স-রে বিভিন্ন এংগেলের ছবি তুলে কম্পিউটার প্রসেসরে পাঠায়। এই ছবিগুলো মানুষটাকে কাল্পনিক ভাবে সেকশন করার ছবি। সবগুলো ছবি স্ট্যাক করে বা একাত্র করে কম্পিউটার মানুষের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আকৃতি তৈরি করে। অঙ্গে কোন জায়গা দখলকারী রোগ বা টিউমার /ক্যান্সার থাকলে তারও অবয়ব তৈরি করে। একটা এক্স-রে ফিল্ম দেখে আমরা অঙ্গের বা রোগের মাত্র একদিকের একটা ছবি পাই। সিটি স্ক্যান করে আমরা ছবিও পাই আকৃতিও পাই। শরীরের যে কোন অংশের অথবা সারা শরীরের সিটি স্ক্যান করা যায়। কিছু কিছু মানসিক রোগী আছে তারা এভাবে বলে থাকে “ডাক্তার সাব, আমি আমার হোল বডি স্ক্যান করে দেখতে চাই।” সিটি স্ক্যান পরীক্ষা করাতে তেমন সময় লাগে না। পরীক্ষায় কোন কষ্টও নেই। তবে খরচ একটু বেশি। একটা এক্স-রে করাতে যেখানে ৩০০/৪০০ টাকা খরচ হয় সেখানে সিটি স্ক্যান করাতে হয়তো খরচ হয় ৩০০০/৪০০০ টাকা।

সিটি স্ক্যান একটা স্পেশাল পরীক্ষা। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এই পরীক্ষা করা ঠিক না। অনেক কারনে ডাক্তার সিটি স্ক্যান করার এডভাইস দিয়ে থাকেন।

হাড় ও জয়েন্টে কোন ডিফেক্ট হলে বা এলো মেলো ভাবে হাড় ভেঙ্গে গেলে অথবা হাড়ে ক্যান্সার হলে সিটি স্ক্যানে ভালো ভাবে ধরা পড়ে। ফুসফুসের ক্যান্সার, লিভারের ক্যান্সার, ফুসফুসে বাতাস আটকে থাকা, ফোড়া হওয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে সিটি স্ক্যান সুন্দর করে সেই স্পট ডিটেক্ট করে দেয়।

রোড এক্সিডেন্টে শরীরের ভেতর কোন রক্ত জমাট আছে কি না দেখার জন্যও সিটি স্ক্যান করা হয়।

সিটি স্ক্যান টিইমার, জমাট রক্ত, অতিরিক্ত পানি, ও ইনফেকশন লোকেট করতেও সহায়তা করে।

চিকিৎসকগণ ট্রিটমেন্ট প্লান করতে, অপারেশন প্লান করতে এবং রেডিও থেরাপি দিতেও সিটি স্ক্যানের সহায়তা নেন।

প্যাথলজিস্ট শরীরের ভেতরের রোগ থেকে সেম্পল কালেকশন করতে সিটি স্ক্যান ব্যাবহার করেন। সিটি স্ক্যান দেখে যখন ফাইন নিডল এসপাইরেশন সাইটোলজি সেম্পল কালেকশন করা হয় তখন বলা হয় সিটি গাইডেড এফএনএসি। সিটি গাইডেড এফএনএসি অব স্পেস অকোপাইং লেশন (এসওএল) অব লাংস, লিভার ও এবডোমেন খুবই কার্যকরী একটা পরীক্ষা।

ক্যান্সার চিকিৎসায় রোগ কেমন ভালো হচ্ছে তা টাইম টু টাইম ফলো আপ করতেও সিটি স্ক্যান পরীক্ষা করা হয়।

আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সিটি স্ক্যান পরীক্ষা হয় ব্রেইনের। একটা কারন হলো স্ট্রোক করে ব্রেইনে রক্তক্ষরণ হলে তা ডিটেক্ট করা। ব্রেইনে রক্তক্ষরণ হলে সেখানকার ব্রেইনের কিছু অংশ ডেমেজ হয় অথবা চাপ খেয়ে থাকে। এটাকে বলা হয় স্ট্রোক। অনেকে ভুল করে হার্ট এটাককে হার্ট স্ট্রোক বলে। স্ট্রোক হার্টের রোগ না, ব্রেইনের রোগ। ব্রেইন শরীরের অংগ প্রত্যংগ কন্ট্রোল করে। ব্রেইনের যে অংশ শরীরের যে অংশকে কন্ট্রোল করে সেই অংশে রক্তক্ষরণ হয়ে বা ক্যান্সার হয়ে নষ্ট হয়ে গেলে শরীরের সেই অঙ্গ প্যারালাইজড বা অবস হয়ে যায়। এক সাইডের ব্রেইন আক্রান্ত হলে এক সাইডের শরীর অবস হয়। তখন গ্রামের মানুষ বলে অর্ধঙ্গের বাতাস লাগছে। অর্ধঙ্গের বাতাস লাগার কারন জানার জন্য ডাক্তারগণ ব্রেইনের সিটি স্ক্যান পরীক্ষা করান।

কিছু কিছু লোক আছে না বুঝেই ব্রেইনের সিটি স্ক্যান পরীক্ষা করান। তাদের মাথায় নানান সমস্যা। বেশিরভাগই মানসিক। হালকা মানসিক সমস্যা নিয়ে তারা মনোরোগের ডাক্তারের কাছে যেতে চান না লোকে পাগল বলবে বলে। তারা যান নিউরোমেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে। মানসিক সমস্যা দ্রুত ভালো হয় না। তাই দুএকবার ডাক্তার দেখায়ে রিকোয়েস্ট করেন তার ব্রেইনের একটা সিটি স্ক্যান পরীক্ষা করানোর। রোগীর সন্তুষ্টির জন্য অনেক সময় সিটি স্ক্যান করাতে হয়। এমনকি মনোরোগের ডাক্তারও বাধ্য হয়ে ব্রেইনের সিটি স্ক্যান পরীক্ষা করান। আমি লক্ষ্য করেছি গ্রামের অনেক মেয়ের স্বামী চাকরির কারনে দূরে বা প্রবাসে থাকেন । তারা অনেকেই সংসারে একটা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে থাকেন। অনেকেরই মাথায় চাপ ধরে থাকে। কোন কোন পল্লী চিকিৎসক এই চাপের সুরাহা করতে না পেরে মাথার সিটি স্ক্যান পরীক্ষা করাতে উদ্ভুদ্ধ করেন। প্রবাস থেকেও বলে দেন যত টাকাই লাগুক সিটি স্ক্যান করানো হোক। তাই, আমাদের দেশে ব্রেইনের সিটি স্ক্যান পরীক্ষা করার সংখ্যাটা আমার জানা মতে বেশি।

একটা কেইস হিস্ট্রি উল্লেখ করতে চাই। একবার একজন মেয়ে রোগী গ্রাম থেকে এলেন আমার কাছে পরামর্শ নিতে। তার উপসর্গগুলো হলো মাথা ঘুরায়, বমি বমি ভাব হয় এবং সকালে খুব দুর্বল লাগে। এগুলো হলো প্রেগন্যান্সির উপসর্গ। অবস্টেট্রিক্স হিস্ট্রি নিয়ে জানা গেলো প্রেগনেন্ট হয়েছেন কি না তা জিজ্ঞেস করাও ঠিক না। তার ফাইলে ব্রেইনের সিটি স্ক্যান পরীক্ষার রিপোর্ট পেলাম। তাতে ব্রেইনে কোন সমস্যা নেই। ব্রেইনের সিটি স্ক্যান পরীক্ষা কেনো করেছেন জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিলেন যে মাথায় কিছু হলো কি না তা দেখার জন্য পল্লী চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে সিটি স্ক্যান করা হয়েছে। আমি তাকে রক্ত ও প্রস্রাবের রুটিন টেস্ট করার জন্য সেম্পল নিলাম এবং পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাফি করালাম। আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে একটা টিউবোওভারিয়ান মাস পাওয়া গেলো। রোগীর সাথে এসেছিলো কলেজ পড়ুয়া তার ছোট ভাই। তাদেরকে না জানিয়ে আমি তার প্রস্রাব সেম্পল দিয়ে প্রেগন্যান্সি টেস্ট করলাম। প্রেগন্যান্সি টেস্ট পজিটিভ পেলাম। তার মানে হলো রোগী প্রেগন্যান্টই হয়েছে। তবে ভ্রুণ জরায়ুতে প্রবেশ না করে ওভারির কাছেই ফেলোপিয়ান টিউবে বড় হচ্ছে। যেটাকে আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে বলা হচ্ছে টিউবোওভারিয়ান মাস। এখানে বাচ্চা ধরলে বাচ্চা টিকে না। টিউব ফেটে রক্তক্ষরণ হয়ে রোগী অনেক সময় মারাও যায়। রোগীর প্রাইভেট তথ্য গোপন রাখা মেডিকেল ইথিক্সের অংশ। তাই, তার ভাইকে প্রেগন্যান্সির কথা জানতে দিলাম না। গাইনিকোলজিস্টকে ফোন করে জানিয়ে দিলাম ম্যানেজ করার জন্য। ভাইয়ে জানলো টিউমার অপারেশন হয়েছে। জরায়ুর বাইরে প্রেগন্যান্সি হলে বলা হয় একটোপিক প্রেগন্যান্সি। রোগীর একটোপিক প্রেগন্যান্সি। সিম্পটম হলো প্রেগন্যান্সির, করালো তারা মাথার সিটি স্ক্যান পরীক্ষা।

সিটি স্ক্যান পরীক্ষায় এক্স-রে ব্যবহার করা হয়। এক্স-রের কারনে কোষের ডিএনএ ডেমেজ হয়ে ক্যান্সার হতে পারে অল্প কিছু মানুষের শরীরে। তবে এটা হবার রিস্ক খুবই কম। তাই, নিজ ইচ্ছায় কেউ সিটি স্ক্যান পরীক্ষা করাবেন না। পরীক্ষা প্রয়োজন হলে ডাক্তারই এডভাইস করবেন।

১৩/৯/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/


 

ডাক্তার দেখাতে রোগীর করনীয়

ডাক্তার দেখাতে রোগীর করনীয়

(স্বাস্থ্য কথা)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

চিকিৎসা একটা সেবা। চিকিৎসা পেতে হলে রোগীর খরচ হয়। চিকিৎসা সেবা কিনে নিতে হয়। কেনাবেচাতে ঠকাজেতা আছে। যারা সরকারি হাসপাতালে ফ্রি চিকিৎসা করান বা বিভিন্ন কারনে ফ্রি চিকিৎসা পান সেখানেও কিন্তু সরকার বা কর্তৃপক্ষ রোগীর জন্য সেবা ক্রয় করে। চিকিৎসক যখন রোগীকে বিনা ফিতে দেখে দেন সেক্ষেত্রে হয়তো চিকিৎসা সেবা ক্রয় কর হয় না। কাজেই, টাকা দিয়ে যদি চিকিৎসা সেবা ক্রয় করতে হয় তবে সে ক্ষেত্রে ঠকলেন কি না সেটা দেখার বিষয় আছে। চিকিৎসা সেবা ক্রয় করতে গিয়ে যাতে আপনি না ঠকেন তার জন্য আমার সচেতনতা মূলক কিছু কথা আছে এই লেখায়।

অসুস্থ হলে প্রথম ধাপ হলো সঠিক ডাক্তার নির্বাচন করা। আমি আপনাকে পরামর্শ দেব প্রথমে একজন বিএমডিসি রেজিস্ট্রার্ড কমপক্ষে এমবিবিএস ডিগ্রিধারী ডাক্তার দেখাতে। ডাকারের ডিগ্রি ডাক্তারের চেম্বারের সামনে সাইনবোর্ডে লেখা থাকে। দশ বারো লাইনে লেখা অনেক কথা যুক্ত দুর্বোধ্য ডিগ্রিধারী ডাক্তারদের না দেখানোর জন্য পরামর্শ দিচ্ছি। আপনার এলাকার ডাক্তারগণ ভুয়া কিনা তাও মাথায় রাখতে হবে। সংশ্লিষ্ট জেলার প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সিভিল সার্জন সাহেব এটা যাচাই বাচাই করে থাকেন। কিন্তু তিনি বিভিন্ন বিষয়ে খুব ব্যস্ত থাকায় মাঝে মাঝে দু’একটা ভুয়া ডাক্তার তার অজান্তে প্রেক্টিস করতে পারে। তবে, আপনার দ্বারা ভুয়া ডাক্তার সনাক্ত সম্ভব না। তাই, কিছু কিছু ব্যাপারে আপনাকে একটু সতর্ক হতে হবে। কোন কোন অচেনা অজানা বড় বড় বিদেশি ডিগ্রিধারী ডাক্তার মাসে একবার বা দুইবার আপনার এলাকায় প্রভাবশালীদের মালিকানায় ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে মাইক মেরে উচ্চমূল্য ফিতে প্রেক্টিস করতে আসেন। এমন ডাক্তার দেখালে ঠকার সম্ভাবনা আছে। ডাক্তার আপনাকে দেখে কিছু পরীক্ষা করার জন্য এডভাইস স্লিপ দিতে পারেন। কিছু কিছু প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা আছে দিনের যেকোনো সময় সেম্পল দেয়া যায়। কোন কোন ক্ষেত্রে সকালে খালি পেটে সেম্পল দিতে হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম পালন করে সেম্পল দিতে হয়। কাজেই, এডভাইস স্লিপ হাতে পেয়ে ডাক্তারের এসিস্ট্যান্ট-এর কাছ থেকে ভালো করে বুঝে নেবেন।

ল্যাবে গিয়ে পরীক্ষার মূল্য তালিকা দেখে নেবেন। পরীক্ষার রিপোর্টকারী ডাক্তারের নাম ও ডিগ্রি দেখে নেবেন। দেখবেন, তিনি কমপক্ষে একজন এমবিবিএস পাস করা বিএমডিসি রেজিস্ট্রার্ড ডাক্তার, এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, প্যাথলজি, প্রতিটি ক্ষেত্রেই। এমন ডাক্তার ছাড়া কোন ল্যাবকে সরকার অনুমোদন দেননি। রিপোর্টকারী ডাক্তারের ডিগ্রি ও অভিজ্ঞতার উপর তার রিপোর্ট করার দক্ষতা নির্ভর করে। নিশ্চই আপনি আপনার রিপোর্টের জন্য একজন দক্ষ প্যাথলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট বা সনোলজিস্ট পছন্দ করবেন। রিপোর্ট যেমন হবে আপনার চিকিৎসাও তেমন হবে। প্যাথলজি রিপোর্ট পেয়ে পড়ে নিজে নিজে বুঝতে চেষ্টা না করে যিনি রিপোর্ট সই করেছেন তার নাম ও ডিগ্রি ঠিক আছে কিনা দেখে নিন। সই আছে নাম নেই। মানে, “নাম নাই যার দাম নাই তার।” এমন রিপোর্ট ফেরত দেন। প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা করেন প্যাথলজিস্ট, টেকনোলজিস্ট ও ল্যাব সহকারীর একটা টিম। এখানে সর্বোচ্চ পার্সন হলেন একজন ডাক্তার, প্যাথলজিতে প্রশিক্ষণ বা উচ্চতর ডিগ্রিপ্রাপ্ত। তার সই ও নাম না থাকলে আপনি ঠকেছেন। সই করে তিনি রিপোর্ট থেকে একটা ফি নিয়ে থাকেন। সই দেয়া না থাকলে ল্যাব মালিক রিপোর্টকারী ডাক্তারকেও ঠকিয়েছেন। ইদানীং আরেক সমস্যা হয়েছে, রিপোর্টে সই-এর ইমেজ বসিয়ে দিয়ে লেখা থাকে ডিজিটাল সিগনেচার। এমন রিপোর্টে উভয়েরই ঠকার সম্ভাবনা আছে। প্রশ্ন করতে পারেন এগুলো কি ভুয়া? না, ভুয়া না। পরীক্ষা করেছেন ডাক্তারের পরিবর্তে টেকনোলজিস্ট অথবা অটেকনোলজিস্ট। জিতেছেন মালিক। ঠকেছেন রোগী ও ডাক্তার। আলট্রাসনোগ্রাফির বেলায়ও প্যাথলজির অনুরূপ। এক্স-রের বেলায় অনূরূপ। তবে কিছু ল্যাব এক্স-রে রিপোর্টই দেন না। বলেন “এই ফিল্ম হলেই চলবে। এখানেই সব দেখা যায়। আপনার ডাক্তারের রিপোর্ট লাগে না। তিনি নিজেই এক্স-রে বুঝেন।” জিতলেন ল্যাবের মালিক। ঠকলেন আপনি ও রেডিওলজিস্ট। কোন কোন ক্ষেত্রে আপনার প্রেস্ক্রিপশনকারী ডাক্তারেরও লাভ থাকে এখানে। এই জন্য তিনি রিপোর্ট চান না। অনেক সময় তারাহুরো করলে রিপোর্ট ছাড়াই ফিল্ম দিয়ে দেয়া হয়। রিপোর্টকারী রেডিওলিজিস্ট পড়াশোনা করে ডিগ্রি নিয়েছেন এক্স-রের ফিল্ম দেখে বিশ্লেষণ করে রিপোর্ট লেখার উপর। তাকে ছাড়া এক্স-রে ল্যাবের লাইসেন্স দেয়া হয় না। তাহলে, রিপোর্ট ছাড়া আপনার এক্স-রে ফিল্ম ছাড়বে কেমনে?

পরীক্ষা নিরিক্ষার রিপোর্ট নিয়ে আসুন আপনার প্রেস্ক্রিপশনকারী ডাক্তারের কাছে। তিনি আপনার রোগের সংক্ষিপ্ত সাইন সিম্পটম ও রোগের নাম প্রেস্ক্রিপশনের বাম পাস দিয়ে লিখে ডান পাসে ঔষধের নাম ও ডোজ লেখবেন। যদি হাতে লিখে থাকেন তবে স্পষ্ট লেখেছেন কিনা দেখে নিন। না বুঝা গেলে বুঝে নিন। প্যাডে ডাক্তারে বিএমডিসি রেজিষ্ট্রেশন প্রিন্ট করা আছে কিনা চেক করুন। না থাকলে ঠিক নাই আইন অনুযায়ী।

ফার্মেসি থেকে ঔষধ কেনার সময় ঔষধের দাম যাচাই করে নেবেন। এক্সপাইরি ডেট দেখে নিন। ডাক্তারে লেখা ঔষধ বদলিয়ে অন্য কোম্পানির ঔষধ দিল কি না দেখে নিন। অন্য কোম্পানি নাম করা বা দামে সস্তা হলেও ঔষধের ব্রান্ড বদলাবেন না।

এবার বাড়ি এসে ঔষধ সেবন করুন। যদি ডাক্তার নিয়ে কোন সন্দেহ থাকে তবে যাচাই করে নিন। বিএমডিসির ওয়েবাসাইটে প্রবেশ করে রেজিস্ট্রার্ড ডাক্তারের লিস্টে নাম আছে কিনা, ডাক্তারের মুখের সাথে ওয়েবসাইটের ডাক্তারের মুখের ছবির মিল আছে কিনা মিলিয়ে দেখুন। বর্তমানে সার্চ করার ওয়েবসাইট লিংক https://www.bmdc.org.bd/search-doctor । অনেক সময় আসল ডাক্তারের নাম ও রেজিষ্ট্রেশন বসিয়ে ভুয়া ডাক্তার সেজে প্রেক্টিস করে। গত বছর পাবনায় এমন এক ভুয়া ডাক্তার পাওয়া গেছিল।আমার এক বন্ধু মাস্ক পরে রোগী দেখছিলেন। রোগী ছিলেন সচেতন মহিলা। তিনি রোগী দেখা শেষে রোগী বললেন “ডাক্তার সাব, মুখ খুলুন। কেনো জিজ্ঞেস করাতে রোগী উত্তর দিলেন ” ডাক্তার চিনে ডাক্তার দেখাতে হয়।” মনে রাখবেন, মূল্যবান জিনিসই নকল হয়। চিকিৎসা সেবা একটা মুল্যবান সেবা। এটাও নকল হয়। আসল নকল চিনে চিকিৎসা সেবা নিন।

১১/৯/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ
কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/


জানালা দিয়ে দেখলাম

জানালা দিয়ে দেখলাম
(নিজের চোখে দেখা)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
আমি ১৯৯৩ জুলাই থেকে ১৯৯৫ জুলাই, এই দুই বছর পিজির “এ” ব্লকের হোস্টেলের চতুর্থ তলার উত্তর পাশের এক রুমে থাকতাম। উত্তর পাশের জানালা দিয়ে বটতলা চত্ত্বর, এ ও বি ব্লকের মাঝের খালি মাঠ ও বি ব্লকের বারান্দা দেখা যেতো। আমরা যেটাকে পিজি বলতাম সেটার পূর্ণ নাম ছিল ইন্সটিটিউট অব পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিসিন এন্ড রিসার্চ, সংক্ষেপে আইপিজিএমআর। তখন অন্যান্য ইন্সটিটিউটের মতো এটাও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ছিলো। তাই, এর কিছুটা দৈন্যদশা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়ে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এর দৈন্যদশা দুর হয়। এখন এর নাম হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সংক্ষেপে বিএসএমএমইউ।
অফিস টাইমে বটতলা চত্ত্বর জমজমাট থাকতো। পোস্ট গ্রাজুয়েট ছাত্ররা বসে বসে ঝালমুড়ি, ছোলা বুট ও বাদাম খেতো। জানালা দিয়ে দেখা যেতো। আমার হোস্টেল বিল্ডিং এর সেপ্টি টেংকি একটা ঢাকনা ছিলো না। আগের দিনে এটা একটা কমন দৃশ্য ছিল। এই ঢাকনাগুলো নেশা খোররা তুলে বিক্রি করে নেশা করতো। হাসপাতালের আউটডোর টয়লেটের মেটালিক টেপ একটাও থাকতো না। নেশাখোররা নিয়ে বিক্রি করে নেশা করতো। ঐ ম্যানহোলের ঢাকনা দিয়ে পায়খানার দুর্ঘন্ধ বের হতো। সেইখানে এসে বসতো স্কুল ড্রেস পড়ুয়া দুইজন ছেলে মেয়ে। সকাল দশটা থেকে বিকেল চারটা /পাচটা পর্যন্ত কি আলাপই যে তারা করতো! তাদের নাক দিয়ে পায়খানার দুর্ঘন্ধ প্রবেশ করলেও তারা কাবু হতো না। এমন নেশায় কাটতো তাদের সময়। নিজ চোখে তাদের এমন ধৈর্য দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। দুজন যুবক আসতো বিকেল তিনটার পর। তাদের দেখে সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান বলে মনে হতো। তাদের পরনে কাবুলি কুর্তা থাকতো। বি ব্লকের কার্যক্রম বিকেল তিনটার পর শেষ হয়ে যেতো। এসময় বারান্দায় কেউ থাকতো না। এখন যেখানে কেন্টিন হয়েছে। সেই বারান্দায় আসন বিড়ায়ে বসতো যুবক দু’জন। পকেট থেকে কি যেনো বের করে বাম হাতের তালুতে নিয়ে বুইড়া আঙ্গুল দিয়ে তামাক ডলার মতো করে ডলতো। কাগজের মধ্যে আগুন ধরিয়ে নাক দিয়ে ধুয়া নিতো। কোন কোন সময় কাগজ মুড়িয়ে বিড়ি বানিয়ে টানতো। তারা প্রতিদিন এই বিকেল বেলায় এই কাজ করতো। এটাকে আমার কাছে রহস্যময় মনে হতো। আমার কাছে মনে হলো এরা নেশা করছে। রহস্যটা বুঝার জন্য আমাদের পিজিতে পড়ুয়া এক ডাইলখোর ডাক্তারের কাছে জিজ্ঞেস করলাম ওরা কি করে? ডাইলখোর বললেন যে ওরা হিরোইন সেবন করে। যারা ফেসসিডিলে আসক্ত ছিলো তাদেরকে ডাইলখোর বলা হতো। ফেন্সিডিলে নাকি হালকা নেশা হয়। তাই, ফেন্সিফিডিলের নেশাখোররাও পড়াশোনা করতে পারতেন। এভাবে আমি ঐ দুই যুবককে অনেকদিন হিরোইন খেতে দেখেছি। কাউকে কিছু বলিনি। শুধু আমার পোস্ট গ্রাজুয়েট এম ফিল (প্যাথলজি) পড়া পড়েছি।
বি ব্লকের পশ্চিম গেটের রাস্তার পাশে ছোট একটা পাটি বিছিয়ে এক ফকির বসে ফকিরান্তি করতেন। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা হতাশাগ্রস্ত রোগীরা এই ফকিরের কাছে এসে বসতো। ফকির পানি পড়া নিতেন। তাবিজ দিতেন। রাতে তিনি বি ব্লকের বারান্দায় পাটি বিছিয়ে ঘুমাতেন। হাসপাতালের টয়লেট ব্যবহার করতেন। সকালে টয়লেটে গোসল করে বারান্দায় পাটিতে বসে সারা শরীরে তেল মাখতেন। লুঙ্গি পরে খালি গায়ে থাকতেন। সাথে একটা সাপের পতো লাঠি থাকতো। কাপড়ের একটা ঝোলাও ছিলো কাবুলিওয়ালার মতো। মাথায় বাবরি চুল ছিলো। তার শরীর পরিস্কার ছিল। তেল মেখে তেলে তেলে থাকতেন। মাড়িতে দাঁত ছিলো না, কিন্তু তিনি তত বৃদ্ধও ছিলেন না। হাসপাতালের একটা আয়াকে প্রায় প্রতিদিন তার কাছে বসে অনেকক্ষণ গল্প করতে দেখেছি নিজ চোখে জানালা দিয়ে। মেয়েটার দুই আড়াই বছরের এক বাচ্চাও ছিলো। বাচ্চাটাকে ফকিরের পিঠ ঘেঁষে খেলা করতেও দেখেছি।
একদিন আমার কৌতুহল জাগলো ফকিরের সাথে কথা বলতে। ক্লাস থেকে ফেরার সময় লোকটার কাছে গিয়ে জিগালাম
– আপনার বাড়ি কোথায়?
– জি, আমি এই হানেই থাহি।
– তা বুঝলাম। আপনার জন্ম স্থান কোথায়?
– জি, আমার বাড়ি যশোর জেলায়।
যশোর না অন্য জেলায় আমি এখন মনে করতে পারছি না।
– আপনি এখানে থাকেন কেনো?
– আমিতো ফকির, বাবা!
– আপনার ছেলে মেয়ে নাই?
– আছে। ছেলেও আছে মেয়েও আছে আল্লাহর মাল।
– বাড়ি ঘর নাই?
– বাড়ি আছে।
– তয় এখানে পড়ে থাকেন কেনো?
– আমিতো ফকির !
– আপনার ছেলেরা কিছু করেন না?
– আমার দুই ছেলেই মাশাল্লাহ চাকরি করে। একছেলে আর্মিতে চাকরি করে। আরেক ছেলে মীলে চাকরি করে। ভালাই বেতন পায়।
– তারপরও আপনি এভাবে বারান্দায় ঘুমান। আর সারাদিন মাঠে পাটি বিছিয়ে বসে থাকেন।
– বাবা, আমিতো ফকির !
তিনি দাঁতের মুথুল্লা বের করে চোখটাকে এমন ভাব করে ‘আমিতো ফকির ‘ কথাটা বলেন যে ওটা আপনাকে বলে আমি বুঝাতে পারবো না।
– আপনার এখানে একটা মেয়ে একটা বাচ্চাসহ আসে। ওটা কে হয় আপনার?
– ও এখানকার হাসপাতালের আয়া। ঐ মেয়েটার দুনিয়ায় কেউ নাই। আয়ার কাম কইরা খায়। আমার কাছে আহে। বাবা ডাকে আমারে। বাচ্চাডায় আমারে নানা ডাহে। মেয়েডা খুব ভালা।
– আপনি যে বাড়ি ছেড়ে এখানে পড়ে থাকেন আপনার চাকরি করা ছেলেরা লজ্জা পান না?
– লজ্জা পাবো কেন? আমি তো ফকির ! এই কইরাই আমি তাগরে পড়াইছি।
ফকিরের সাথে কথায় না পেরে আমি হোস্টেলে চলে গেলাম। জানালা দিয়ে ফকিরের দিকে চেয়ে থাকতাম আর বিচিত্র মানুষের কথা ভাবতাম। আয়া বেটির কথাও ভাবতাম। দুনিয়ায় তার কেউ নাই। আল্লাহ তাকে ফকির বাবা জোগার করে দিয়েছে। বাচ্চাটাকে নানা বানিয়ে দিয়েছে আল্লাহ।
আমি ভোরে উঠে ফজরের নামাজ পড়েই পড়তে বসতাম। পড়তাম বিছানায় বসে। একদিন এভাবে জানালার পাশে বসে পড়ছিলাম। অনেকে তখনও ঘুমাচ্ছিলো। বাইরে কেউ ছিলো না। বি ব্লকের বারান্দায় পাটিতে ল্যাটা দিয়ে বসে ফকির বাবা বিড়ি টানছিলেন। দুই তিন ফুট দূরে বারান্দার কিনারে পা ঝুলিয়ে বসা ছিলো এক টোকাই। টোকাই বসে বসে ঝিমাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল তার ঘুম ভাঙ্গেনি এখনো। হয়ত ফকির বাবার অদূরেই সে খালি বারান্দার মেঝেতে ঘুমিয়েছিল গত রাতে। ছিন্নমূল শিশুদের তখন টোকাই বলা হতো। তারা সারাদিন হাবিজাবি জিনিসপত্র টুকিয়ে ভাঙ্গারির দোকানে বিক্রি করে ভাত রুটি কিনে খেয়ে জীবন বাচাত বলে তাদেরকে টোকাই বলা হতো। টোকাইদের নিয়ে প্রতিদিন চিত্রশিল্পী রফিকুন্নবী (রনবী) কার্টুন আঁকতেন। কার্টুনের টোকাইদের উক্তির মাধ্যমে শিল্পী সমাজের অনেক অসংগতি তুলে ধরতেন। তারপর সরকার এদের নাম দেয় পথশিশু। পথশিশুদের অনেককেই পূনর্বাসনের ব্যাবস্থা করে সরকার, কিছু করে বিদেশি সংস্থা, কিছু পাচার হয়ে যায়। এখনো কিছু কিছু পথ শিশু আছে। যাহোক, সেই টোকাইর বয়সটা হয়তো আট কি দশ বছর হবে। তাকে দেখে আমার খুব মায়া হলো। খালি গায়। পরনে কুড়িয়ে পাওয়া নোংরা পুরাতন প্যান্ট। তাকে নিয়ে অনেক্ক্ষণ ভাবলাম। কে তাকে জন্ম দিয়েছিল, কে তাকে পেটে ধারণ করেছিলো, মায়ের স্নেহ সে পায় নি, বাবার আদর ও শাসন কি সে তা পায় নি। পশু পাখির মতো তার দিনের খাবার দিনে যোগার করতে হয়। এমন ভাবনা তাকে নিয়ে ভাবছিলাম আর তাকে দেখছিলাম জানালা দিয়ে। ছেলেটা এদিক সেদিক নড়াচড়াও করছিলো না ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে। ফকির বাবা দীর্ঘ সময় বিড়ি টানলেন। অনেকে পায়খানার বেগ আনতেও বিড়ি টানে। এমনও হতে পারে পায়খানার বেগ আনতে বিড়ি টানছিলেন। বিড়িটানা শেষ করে সবকিছু ভাজ করে ঝুলিতে ঢুকালেন। ঝুলি থেকে কাশার লোটা বের করে লোটা নিয়ে তিনি টয়লেটে প্রবেশ করলেন। এবার টোকাই ছেলেটা হটাৎ নড়াচড়া দিয়ে উঠে খোরঘোষের মতো এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখে ফকিরের ঝুলির ভেতর হাত ঢুকিয়ে মানিব্যাগটা বের করে আনলো। সব টাকা বের করে প্যান্টের পকেটে নিয়ে মানিব্যাগটা আগের যায়গায় রেখে পূর্ব পাশের গলি দিয়ে চলে গেলো। আমি জানালা দিয়ে চেয়ে চেয়ে দেখলাম। সে চলে গেলো। নিয়ে গেলো সব টাকা মানি ব্যাগের। যা কিছু কামিয়েছিলেন ফকির বাবা। সব নিয়ে গেলো। চেয়ে চেয়ে দেখলাম। আমার করার কিছু ছিলো না।
১৬/৯/২০২০ খ্রি.
ময়মনসিংহ

কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/