এফএনএসি রিপোর্টের অর্থ

এফএনএসি রিপোর্টের অর্থ
(সাধারণ স্বাস্থ্য কথা)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

শরীরের টিউমার বা সন্দেহ জনক ক্যান্সার অথবা ক্ষতস্থান থেকে এক সুই পরিমান নমুনা নিয়ে প্রসেস করে মাইক্রোস্কোপিক পরীক্ষা করে রিপোর্ট দেয়াকে এফএনএসি পরীক্ষা বলা হয়। এর পুর্ননাম হলো ফাইন নিডল এসপাইরেশন সাইটোলজি। এই পরীক্ষাটি করেন প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। নমুনা কালেকশন ক্লিনিশিয়ানও করতে পারেন। তবে একই প্যাথলজিস্ট কালেকশন ও পরীক্ষা করতে পারলে রোগ ডায়াগনোসিস বেশী সঠিক হয়। এই রিপোর্টে মাইক্রোস্কোপিক ফাইন্ডিং বিস্তারিত লিখা থাকে। তবে যিনি রিপোর্ট দেখেন তিনি সাধারণত কমেন্ট বা ডায়াগনোসিস সেকশনটাই দেখে থাকেন। কমেন্ট সেকশনে যদি “প্লিজ, সি দা ডেস্ক্রিপশন” লিখা থাকে তখন তিনি সব সেকশন পড়ে দেখেন। তবে সাধারণ মানুষও তার নিজের এফএনএসি রিপোর্ট-এর অর্থ বুঝতে চান। তাই আমি আজ সাধারনের জন্য এফএনএসি রিপোর্ট-এর কয়েকটি নমুনা কমেন্ট লিখে তার অর্থ লিখার চেষ্টা করছি। কোন কোন এলাকার সাধারণ লোকের মধ্যে ইংরেজি টার্ম-এর অর্থ নিয়ে সমস্যা আছে আমি তা লক্ষ করেছি। আমরা জানি নর্মাল মানে স্বাভাবিক। কিন্তু এমনও লোক আছে তারা নর্মালকে “ভালো না” মনে করে। যেমন বলে “তার বাবার অবস্থা খুবই নর্মাল।” বুঝাতে চায় তার বাবার অবস্থা খুব খারাপ। কাজেই কমেন্টে নর্মাল লিখলে তিনি মনে করবেন এবনর্মাল। নেগেটিভ মানে নাই। নিল মানে নাই। পজিটিভ মানে আছে। পজিটিভ ভালোও হতে পারে আবার খারাপও হতে পারে। তেমনি, নেগেটিভ ভালোও হতে পারে আবার খারাপ হতে পারে। দেখতে হবে কি পজিটিভ বা কি নেগেটিভ। আমি একবার একটা এফএনএসি রিপোর্ট-এ নেগেটিভ ফর ম্যালিগন্যান্ট সেল লিখেছিলাম। রোগীর স্বামী রিপোর্ট পড়ে মন খারাপ করে বললেন
– নেগেটিভ হয়েই গেলো!
– হ্যা, নেগেটিভ।
– আমার ভাগ্যটাই খারাপ। প্রথম বউটা সন্তান ডেলিভারি হবার সময় মারা গেলো। এই বউটাও নেগেটিভ।
– তাতে, মন খারাপের কি আছে?
– নেগেটিভ মানে তো মাইনাস। তার মানে আমার স্ত্রী নেগেটিভ। তাই না?
– না, তা না। মানে আপনার স্ত্রীর ক্যান্সার নেগেটিভ, মানে, ক্যান্সার নাই।

এমনি অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী মানুষ আমাদের সমাজে আছে।
ক্লিনিসিয়ান যখন রোগী পাঠান এফএনএসি করাতে তখন এডভাইসে ক্লিনিক্যাল ডায়াগনোসিস লিখে দেন সাধারণত। যাতে প্যাথলজিস্ট সেই বিষয়ের উপর বিশেষভাবে খেয়াল করেন মাইক্রোস্কোপি করার সময়। ক্লিনিসিয়ানের ক্লিনিক্যাল ডায়াগনোসিস এবং প্যাথলজিস্ট-এর প্যাথলজিকাল ডায়াগনোসিসের সমন্বয়ে ফাইনাল ডায়াগনোসিস হয়। কাজেই প্যাথলজিস্ট-এর কাছে ক্লিনিক্যাল ইনফর্মেশন থাকা ভালো। তাতে পরীক্ষার পর প্যাথলজিস্ট রোগীকেও তার রোগের পরিণতি কি হতে পারে তার একটা ধারনাও দিতে পারেন।

এফএনএসি পরীক্ষা হিস্টোপ্যাথলজি (বায়োপ্সি) পরীক্ষার সমান সঠিক না। হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষা করার হয় টিস্যুর নিয়ে। আর এফএনএসি পরীক্ষা করা হয় টিস্যু থেকে মাত্র কিছু সেল (কোষ) নিয়ে। হিস্টোপ্যাথলজিক্যাল ডায়াগনোসিস এর একুরিসি প্রায় ১০০% এর কাছাকাছি হয়। কিন্তু এফএনএসির একুরেসি তা হয় না, একটু কম হয়। তাই চিকিৎসা দেয়ার আগে হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষা, বিশেষ করে ক্যান্সারের ক্ষেত্রে, করে নেয়া হয়।

কমেন্টে “পজিটিভ ফর ম্যালিগন্যান্ট সেল” লিখার মানে হল “এফএনএসি পরীক্ষা অনুযায়ী এটা ক্যান্সার।” সেইরূপ
নেগাটিভ ফর ম্যালিগন্যান্ট সেল = ক্যান্সার সেল পাওয়া যায় নি। ক্যান্সার থাকতেও পারে, তবে পাওয়া যায় নি। আকাশে চাঁদ দেখা যায় নি বলে কি আকাশে চাঁদ নেই? থাকতে পারে, দেখা যায় নি হয়ত।
সাসপিসিয়াস ফর ম্যালিগন্যান্ট সেল = যে সেলগুলি পেলাম সেগুলিকে ক্যান্সার সেল বলে সন্দেহ হলো। তবে আমি নিশ্চিত না। তয় কি করা যায়? ক্লিনিক্যাল ডাটার সাথে মিলিয়ে দেখেন। মিলে গেলে ক্যান্সার। না মিললে ক্যান্সার না। হিস্টোপ্যাথলজি করে সন্দেহ দূর করা যেতে পারে।
সাজেস্টিভ অব ম্যালিগন্যান্ট সেল = সেলগুলি দেখে মনে হলো ক্যান্সার। তবে সিউর না। ক্লিনিক্যাল ডাটার সাথে মিলে গেলেই নিশ্চিত ক্যান্সার।
পসিবিলিটি অব ম্যালিগন্যান্ট সেল = ক্যান্সার সেল হওয়ার সম্ভাবনা। তবে মনের জোড় কম। ক্লিনিসিয়ান সিধ্যান্ত নিবেন কি করবেন। আরেকবার এফএনএসি করাতে পারেন। অথবা হিস্টোপ্যাথলজি করাতে পারেন।

ইনফ্লামেশন বা প্রদাহজনিত রোগাক্রান্ত স্থান থেকে এফএনএসি করলে ইনফ্লামেটরি সেল পাওয়া যায়। বেশী ভাগ সেল নিউট্রোফিল থাকলে কমেন্টে লিখা হয় “একুট ইনফ্লামেটরি লেশন। ” বেশীভাগ সেল লিম্ফোসাইট হলে কমেন্টে লিখা হয় “ক্রনিক নন-স্পেসিফিক ইনফ্লামেশন।” তবে স্মল লিম্ফোসাইটিক লিম্ফোমা এবং নন-হজকিন নামক ক্যান্সার এফএনএসি পরীক্ষায় ধরা নাও পড়তে পারে। ক্লিনিক্যালি ক্যান্সার সন্দেহ হলে বায়োপ্সি করাই ভালো। অনেক ইপিথেলিওয়েড সেল পাওয়া গেলে কমেন্টে লেখা হয় “গ্রনুলোমাটাস ইনফ্লামেশন।” এই ধরনের ইনফ্লামেশনের অনেক কারন আছে। আমাদের দেশের কমন কারন হলো টিউবারকুলোসিস। ইপিথেলিওয়েড সেলস, ল্যাংহ্যান্স টাইপ জায়ান্ট সেল ও ক্যাজিয়েশন নেক্রোসিস পেলে কমেন্টে লিখা হয় “কনসিস্টেন্ট উইথ টিউবারকুলোসিস।” তবে কনফার্ম না। কনফার্ম লিখতে গেলে টিউবারকিউলোসিস-এর জীবাণু পেতে হবে। ক্লিনিক্যাল হিস্ট্রির সাথে মিলে গেলে অথবা এম টি পরীক্ষাও পজিটিভ হলে কনফার্ম টিউবারকিউলোসিস। ইপিথেলিওয়েড সেলস এবং ল্যাংহ্যান্স টাইপ জায়ান্ট সেল পেলেও “কনসস্টেন্ট উইথ টিউবারকিউলোসিস।” এমনকি ইপিথেলিওয়েড সেলস এবং ক্যাজিয়েশন নেক্রোসিস পেলেও “কনসিস্টেন্ট উইথ টিউবারকিউলোসিস।” শুধু মাইক্রোস্কোপিক ফাইন্ডিং দিয়ে সাইটলজিক্যাল ডায়াগনোসিস করা না গেলে ক্লিনিসিয়ানের ডাগনোসিসের পক্ষে মাইক্রোস্কোপি ফাইন্ডিং-এর মিল থাকলে তখন লিখা হয় “কম্পাটিবল উইথ…..। ” যেমন “কম্পাটিবল উইথ টিউবারকুলোসিস।” এমন অনেক টার্ম আছে এফএনএসি রিপোর্ট-এ। এই টার্মগুলির সঠিক অর্থ বুঝতে না পাড়ার কারনে অনেক রোগী প্যাথলজি রিপোর্ট নিয়ে ভুল বুঝে থাকে। আমার এই লেখা পড়লে আশা করি সেই ভুল বুঝাবুঝি কমে যাবে।
১২/১০/২০১৯ খ্রি.

হোটেলের অপরিত দুই মেহমান

হোটেলের অপরিত দুই মেহমান
(সামাজিক ছোট গল্প)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

জুম্মার নামাজ শেষ করে মসজিদের পাশের হোটেলে গিয়ে বসলাম। গরম লেগেছিল বেশ। ফ্যান ছাড়তে বললাম। ফ্যানের বাতাসে লাকরির চুলার ধুয়া এসে লাগছিল। বিরক্ত হয়ে ফ্যান বন্ধ করে দিতে বললাম। আট বছর আমি দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে চাকরি করেছি। এই সময় আমি শুক্রবারেও প্রাক্টিস করতাম। ঢাকার বাইরের ডায়াগনোস্টিক সেন্টারগুলিতে শুক্রবারে বেশী রোগী আসে। কারন, শুক্রবারে ছুটির দিন থাকাতে ডাক্তারগণ বেশী সময় প্রাক্টিস করতে পারে। যতদিন ফ্যামিলি নিয়ে থেকেছি ততদিন আমি শুক্রবারে প্রাক্টিস করি নাই। দিনাজপুর ফ্যামিলি না যাওয়াতে শুক্রবারেও প্রাক্টিস করতাম। দুপুরের খাবার হোটেলেই খেয়ে নিতাম। রোস্তমের হোটেলের গরুর গোস্ত সবার কাছেই ভালো লাগতো। তাই, যে একবার এই হোটেলের গরুর গোস্ত খেতো সে বারবার যেতো গোস্তো খেতে। ইন্টারনিক চিকিৎসক ও ঔষধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভরা ছিল এই হোটেলের প্রধান কাস্টমার। মাঝে মাঝে আমি অনেকের কাছে এই হোটেলের গরুর গোস্তের স্বাদের প্রশংসা করেছি। তাতে আমার উছিলায় এই হোটেল বেশী বেশী কাস্টমার পেতো।

আমি একাগ্রচিত্তে খাচ্ছিলাম। একজন যুবক এসে দাঁড়ালো হোটেল মালিকের সামনে কাউন্টারে। শিক্ষিত যুবক মনে হলো দেখে। শার্ট প্যান্ট দেখে মনে হলো বহু বছর যাবৎ এই কাপড় সে পরছে। শরীরের গঠন বেশ সুঠাম কিন্তু পুষ্টি কম আছে তাতে। পর্যাপ্ত খাবার হয়ত খেতে পাননা অভাবে। তিনি দাঁড়িয়ে এদিক সেদিক তাকিয়ে একটু দেখে নিলেন। তারপর অতি সতর্কতার সাথে হোটেল মালিকে বললেন
– আমাদের বস আমার খাবার ব্যাপারে কিছু বলেছেন?
– আপনার বস কে?
– হাসান সাব।
– হাসান সাব কে?
– পলাশ ফার্মার এরিয়া ম্যানেজার। ঐজে গত রাতে খেয়ে গেলেন। আমিও তার সাথে খেলাম। ওনি আমার এখানে খাওয়ার ব্যাপারে কিছু বলেছেন?
– না, কিছু বলেন নাই তো?
– আমার গতকাল এই কোম্পানিতে চাকরি হয়েছে। তিনি বলেছেন আমাকে এই হোটেলে খেতে। টাকা তিনি দিয়ে দেবেন।
– এমন আলাপ তিনি আমাদের সাথে করেন নাই।
– আমাকে তো তাই বলে গেছেন যে আমি খেয়ে বাকী খাতায় সই করবো, তিনি পরে টাকা পরিশোধ করে দিবেন।
– এখানে খেলে নগদ টাকায় খেতে হবে। এই যে দেখেন বড় বড় করে লিখা আছে বাকী চাহিয়া লজ্জা দিবেন না।
লোকটি ইতস্তত এদিক সেদিক কিছুক্ষণ তাকালেন। কিছুক্ষণ অন্যের খাবারের দিকেও তাকিয়ে রইলেন। তারপর চলে যেতে উদ্ধত হলো। আমি ডাকলাম
– হ্যালো, এই যে, হ্যালো।
– কিছু বলবেন?
– এখানে বসেন।
– কেন, কি হয়েছে?
– না, বসেন।
– বলেন।
– বসেন।
লোকটি আমার খাবার টেবিলের সামনে বসলেন।
– আপনি আমার মেহমান। খাবেন।
– আপনি কে?
– আমি কে পরে বলবো। আগে খান। এই এখানে ভাত দাও।
– না। আমি খাব না।
– আপনি তো খেতেই এসেছিলেন। খাবেন না কেনো?
– আমি পরে খাবো।
– না, এখনই খাবেন। আমি খাওয়াচ্ছি।
– আপনি খাওয়াবেন কেনো।
– এমনি খাওয়াব। আপনি আমার মেহমান।

হোটেল বয় টেবিলে ভাত দিয়ে দাঁড়ালো।

– মাছ না মাংস?
– মাছ মাংস খাব না।
– কেনো, মাছ মাংস খান না?
– খাই, এখন খাব না।
– কোন সমস্যা নাই, আমি খাওয়াব।
– না, শুধু ভাজি দেন।
– শুধু ভাজি দেবে কেমনে? মাছ বা মাংস কিছু একটা নেন।

লোকটি এক প্লেট ভাত ও ভাজি ছাড়া আর কিছু নিলেন না। বিল আমি দিয়ে দিলাম। লোকটি আমার ঠিকানা চেয়ে বললেন যে তিনি এই টাকা পরিশোধ করবেন। আমি বললাম আপনি আমার মেহমান। খেলেন মাত্র ২০ টাকার ভাত আর ১০ টাকার ভাজি। তা আবার ফেরৎ দিতে চাচ্ছেন? আপনি যদি না খেয়ে চলে যেতেন তাতে আমি অনেকদিন কষ্ট পেতাম। আমি আমার কষ্ট থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যই আমি আপনাকে খাওয়াছি। আমার সার্থেই আমি আপনাকে খাইয়েছি। লোকটি চোখ টলমলো চোখে আমার দিকে চাকিয়ে রইল। চলে গেলাম চেম্বারে।

কয়েকদিন আগে চরপড়ার ব্যাংক বুথ থেকে টাকা উঠাতে গিয়েছিলাম। বুথে প্রবেশের আগে পেটে ক্ষুধার উদ্রেক হলো। একটা হোটেলে প্রবেশ করলাম। কি খাব ভেবে ওয়ালে টাংগানো খাবারের মেনুটা দেখছিলাম। অনেক খাবারের মাঝে চায়ের মুল্যের তালিকার প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো। লিখা ছিল
রঙ চা ৫ টাকা
দুধ চা ১০ টাকা
রোজ চা ১৫ টাকা

রঙ চা ও দুধ চা বুঝলাম। কিন্তু রোজ চা বুঝলাম না। হোটেল বয়কে জিজ্ঞেস করলাম
– এই রোজ চা আবার কি?
– রোজ চা চিনেন না? মেশিনে বানায়।
– মেশিনে বানায় রোজ চা?
– জি।
– আমাকে একটা সিংগারা দাও। তারপর একটা রঙ চা দিও।

সিংগারার সাথে একটা কাচা মরিচ ও কিছু পিয়াজ কুচি দেয়া হলো। সিংগারা গরম তেলে সেকা খেয়ে হয়ত জীবাণুমমুক্ত হয়েছে। কিন্তু পিয়াজকুচি তো কাচা। জীবাণু থাকার সম্ভাবনা আছে যেনেও খেলাম। কি আছে জীবনে, একটু মজা করেই যদি খেতে না পারি। খেতে খেতে ভাবলাম, বেচে থাকলে কত কিছুই খাওয়া যায়। রোজ চার নামই শুনি নি কখনো। আজ শুনেও খেলাম না। খাওয়া উচিৎ ছিল। অভিজ্ঞতা হত। গত বছর বেল চা খেয়েছিলাম। বেল গুড়া করে যে চায়ের মত দানা করে চা বানিয়ে খায় এটা তো জান্তামই না। বেল চাও খাওয়া হয়েছে। কিন্তু রোজ চা খাওয়া হয় নাই। নিশ্চই রোজ চা বানায় গোলাপের পাপড়ি দিয়ে। অনেকে তুলসি পাতা দিয়েও নাকি চা বানিয়ে খায়। তবে আমি চায়ের সাথে পুদিনাপাতা মিশিয়ে জাল দিয়ে খাই। তাতে শরীর বেশীক্ষণ চাংগা থাকে। টিপা ফলের নামই আমি জানতাম না। কিছুদিন আগে টিপাফল খাওয়া হয়েছে। বেঁচে থাকলে আরও নতুন নতুন খাবার খাওয়া যাবে। এমন ভাবনা ভাবছিলাম। এমন সময় এক অতি বৃদ্ধলোক এসে আমার সামনে বসলেন। টুপি মাথায় লম্বা দবদবে সাদা দাড়ি। মাড়িতে একটা দাঁতও নেই। টেবিলটা একটু ছোট সাইজের। একটু অসস্তি বোধ করছিলাম। আমার কাছে ভিক্ষুক মনে হচ্ছিল। আবার মনে হলো ভিক্ষুক নাও হতে পারে। গ্রাম থেকে হয়ত শহরে কোন আত্বীয় বাড়ি এসেছে। পাঞ্জাবী বেশ পরীস্কার। লোকটি হোটেল বয়কে ইশারায় ডেকে কাছে এনে দাঁতের মুথুল্লা বের করে একটু লাজুক হাসি দিয়ে ফিসফিস করে যেন কি বললেন। বয় হাফ বাটি সবজি এনে দিলো। পাঞ্জাবীর সাইড পকেট থেকে দুইটি রুটি বের করে রোল করে ছিড়ে ছিড়ে মুখে দিলেন ভাজি লাগিয়ে লাগিয়ে। দাঁতের মুথুল্লা দিয়ে সেই রুটি সজোরে চিবাচ্ছিলেন আর পানি দিয়ে গিলছিলেন। যেন কত দিনের ক্ষুধার্ত ছিল লোকটি। আমি লোকটি নিয়ে ভাবা শুরু করলাম না না কিছু। ভাবতে ভাবতে লোকটি সব খেয়ে বাটি চেটে খাওয়া শুরু করল। আমি বললাম
– বাড়ি থেকে রুটি এনেছিলেন?
– লোকটে লজ্জার হাসি হেসে বললেন “না, ঐ হোটেল থেকে দুইটা রুটি দিছে, কিন্তু হুদা রুটি খাবার পাই না। তাই একটু ভাজি নিলাম।
– এখানে কয় টাকার ভাজি দিয়েছিলো?

মুস্কি হাসি দিয়ে বুঝেলেন যে “ফ্রি”।

– আমি আপনাকে খাওয়াই?
– খাইছিই তো।
– এখন দুপুর। ভাত খান।

মুস্কি হেসে রাজি হলেন।

আমি হোটেল বয়কে বললাম
– এখানে ভাত দাও।
– বিল কি আপনে দিবেন?
– হ্যা, আমি দেব।

ভাত দেয়ার পর লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম
– ভাতের সাথে কি নিবেন।
-( মৃদু স্বরে বললেন) গোস্ত।
– এই, এখানে গোস্ত দাও।

লোকটি গোস্ত আঙুল দিয়ে ছিড়ে ছিড়ে ভাতের সাথে মুখে দিচ্ছিলেন আর থুরা থুরা করে কিছুক্ষণ চিবিয়ে গোস্তের রস চুষে গিলে ফেলছিলেন। মনে হলো কতদিন যেন তিনি গোস্তের স্বাদ গ্রহন করেন নাই। এক প্লেট ভাত শেষ করলে আরেক প্লেট দিতে বললাম। দুই প্লেটে শেষ হলে আরও দিতে চাইলে তিনি হাত ইশারায় মানা করলেন। খাওয়ার সময় তাকে অন্য কিছুর দিকে তাকাতে দেখি নাই। খাওয়া শেষ করে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে একটা তৃপ্তির হাসি হাসলেন। সেই হাসি যে দেখে নাই তাকে আমি বলে বুঝাতে পারব না।
আমি কাউন্টারে বিল দিতে গেলাম। হাত মুছতে মুছতে কেশ কাউন্টারের বাম পাশে রাখা মেশিনের দিকে চোখ পড়লো। মেশিনের গায়ে লেখা দেখলাম “রোজ ক্যাফে” যেমনটি লেখা থাকে “নেস ক্যাফে।” আমি নেস ক্যাফে চিনতাম আগে থেকে। রোজ ক্যাফে দেখলাম আজই। আমি কাউন্টারে জিজ্ঞেস করলাম
– রোজ ক্যাফের দাম কত?
– রোজ কফি ২০ টাকা আর রোজ চা ১৫ টাকা।
– আমার বিল কত হয়েছে?
– আপনি খেয়েছেন ১০ টাকা আর উনি খেয়েছেন ২০০ টাকা। মোট ২১০ টাকা।

কম পড়ে কিনা এই ভেবে সঙ্কিত হয়ে আমি পকেটে হাত দিলাম ।

৯/১০/২০১৯ খ্রি.

লেপ তোষকের কারিগর

লেপ তোষকের কারিগর
(সামাজিক ছোট গল্প)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

শীত এসে গেলো। নতুন করে লেপ বানাতে দিলাম। লাল সালু কাপড় ও খাটি কার্পাস তুলা পছন্দ করে দিলাম। যেদিন লেপ সরবরাহ করার কথা ছিল সেদিন লেপের দোকানে গেলাম। দেখলাম লেপ বানানো হয় নাই। তুলা ধুনানো হচ্ছে। তুলা ধুনা উড়ে উড়ে নাক দিয়ে ঢুকছিল। আমি একটু সরে দাঁড়ালাম। ধুনানো শেষ হলে লাল সালুর খোলে ভরা শুরু করলেন লেপের কারিগর । দোকান মালিক কাউন্টারেই ছিলেন। কর্মচারীকে বললেন আমাকে একটা চেয়ার দিতে। আমি তুলা ভরা দেখছিলাম চেয়ারে বসে। বললাম
– তুলা নিয়ে কাজ করেন। একটু সাবধানে থাকবেন।
লোকটি তুলাভরা শেষ হলে আমার দিকে তাকিয়ে রাগান্বিত হয়ে বললেন
– তুলা নিয়া কাম করি তাই কি মনে করেন? নিজেরা চোর আর সবারে চোর মনে করেন। সেই কখন থেকে ধরার জন্য চেষ্টা করতাছেন যে আমি খারাপ তুলা মিশাতাছি কি না। আপনে দেখলেও যা দিতাম, না দেখলেও তা দিতাম। তুলাওয়ালাদেরকে আপনারা চোর মনে করেন। আপনেগো মতো শিক্ষিত মানুষই বেশী চোর। আমরা টেলিভিশনে দেখতাছিনা, কেরা কত টেহা চুরি করতাছে কলমের পেচ মাইরা। একটা বালিশ কিন্না কত টেহা খরচ দেহায় দেহি নাই। একটা লেপের দাম কত দেহাইছে দেহি নাই? বালিশ তোষক কেনাকাটা কইরা কোটি কোটি টেহা মাইরা দেয় নাই? আপনে আইছেন তুলা চোর ধরতে। এহানে চোর ধরনের দরকার নাই। যান সাব বড় বড় চোর ধরেনগা। সবগুলায় চুরি করে আর সন্দেহ করে খালি তুলাওয়ালারে।
– আপনি এসব কি বলছেন?
– কি কইছি মানে? আপনি আমারে সন্দেহ করবেন আর আমি চুপ কইরা থাকমু। গরীব অইতে পারি। চোর না।
– আরে, আমি কি বললাম, আর আপনি কি মনে করলেন।
– আর আমারে বুঝাতে অইব না।
– আমার কথাটা শুনুন।
– কইন, আপনে কি কইবার চাইন।
– আমি একজন ডাক্তার। আমি লক্ষ করছি আপনি তুলা ধুনাচ্ছেন নাক মুখ খোলা রেখে। তুলার কণা আপনার নাকমুখ দিয়ে চলে যাচ্ছে ফুসফুসে। ফুসফুসে গিয়ে আটকে যাচ্ছে।
– আমি ১২ বছর ধইরা এই কাম করতাছি। আমার ফুসফুসে তো তুলা আটকে নাই।
– ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তুলাকণা দীর্ঘদিন পর্যন্ত জমা হতে হতে লাংগস-এ নিউমোকনিওসিস নামে একটা গ্রেনুলোমাটাস ইনফ্লামেটরি ডিজিজ হয়। তাতে লাংগসের কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়। অল্পতেই হয়রান লাগে। খুসখুসি কাশি হয়। শরীর শুকিয়ে যায়। অনেকে যক্ষা মনে করে। তখন আর লেপ বানানোর শক্তি পাবেন না।
– কি রোগের কথা কইলেন?
– নিউমোকনিওসিস।
– ইংরাজিতে না কইয়া বাংলায় কন।
– নিউমোকনিওসিস-এর বাংলা নাম কি হবে তা আমার জানা নেই। তবে বুঝলেই হলো।
– বুঝলাম না তো।
– ঔ যে বললাম, গ্রেনুলোমাটাস ইনফ্লামেশন।
– আবারও তো ইংরাজি কইলেন।
– ও, মানে, ফুসফুসে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোটা গোটা দানা বেঁধে অক্সিজেন ধরার ক্ষমতা কমে যায়।
– বুঝলাম। তয় কি করতে অইব?
– নাকেমুখে মাস্ক বেঁধে কাজ করতে হবে। ঔষধের ফার্মেসীতে ও ফুটপাতের দোকানেও আজকাল মাস্ক পাওয়া যায়। দাম মাত্র পাঁচ দশ টাকা।
– ও, আজকালকার পোলাপানরা দেখি মুখের মধ্যে কাপড়ের ঠোনা পরে। কতক পোলাপান কি যে পরে, কালা কাপড়ের মাঝখানে লাল জিহবার মত কাপড় লাগায়। কেমন বিশ্রি দেয়া যায়।
– ওরা আসলে ধুলাবালি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মাস্ক পরে। অল্প বয়সের পোলাপান তো। সব কিছুতেই ফ্যাসান খুঁজে। মাস্কেও একটু ফ্যাসান করে। আপনি সাদা কাপরের মাস্ক কিনে নিয়েন। টিস্যু কাপরেরও সুন্দর সুন্দর মাস্ক পাওয়া যায়। বেশী দিন বেঁচে থাকতে কার মন না চায়? মাস্ক পরে কাজ করুন। বেশী দিন বেঁচে থাকবেন। আর কতক্ষণ লাগবে সেলাই শেষ করতে?
– ডাক্তার সাব, কিছু মনে করুন না যে। না বুইঝা কইছি। আপনেরে কই নাই। টেলিভিশনের অফিসারগুলারে কইছি। আপনের জন্য একটা চা আনাই। দুধ চা, না রঙ চা?
– চা খাব না। আর কয় মিনিট লাগবে?
– আর পাঁচ দশ মিনিট লাগবে। আপনি চা খাইতে খাইতেই অইয়া যাবে।
– রঙ চা দিতে বলেন। আর, মনে রাখবেন, শিক্ষিত লোকের মধ্যে মাত্র গুটি কয়েক চোর আছে। সবাই না।
– এই, স্যারেরে একটা রঙ চা দেও।
২/১০/২০১৯ খ্রি.

সুস্থ্য শরীরে ক্যান্সারের পরীক্ষা

সুস্থ্য শরীরে ক্যান্সারের পরীক্ষা
(স্বাস্থ্য কথা)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

কয়েকদিন আগে প্রবাস থেকে একজন আমাকে মোবাইল করে জানতে চাইলেন যে তিনি দেশে ফিরে রক্ত পরীক্ষা করাবেন। কি জন্য রক্ত পরীক্ষা করাবেন জানতে চাইলে বললেন
– শরীরে ক্যান্সার আছে কি না জানতে চাই।
– তা শারীরিক সমস্যা কি কি?
– না, শরীরে কোন সমস্যা নাই।
– সমস্যা নাই, তাও পরীক্ষা করাবেন কেন?
– অনেকেই তো ক্যান্সার হয়ে মারা গেলো। আমার শরীরের ভিতরে ক্যান্সার আছে কি না জানতে চাই।
– দেশে ফিরে আমার সাথে যোগাযোগ করবেন।

এভাবে যারা অতি-স্বাস্থ্য সচেতন তারা আগাম কিছু পরীক্ষা করাতে চান। এই সুযোগে অনেক দালালের সুবিধা হয়। তারা দেশী বিদেশী বড় বড় ডায়াগনোসিস্টিক সেন্টারে মোটা কমিশনের বিনিময়ে প্যাকেজ করে শরীর চেক আপ করার নামে টাকা হাতিয়ে নেয়। সহজ উপায়ে বেশী টাকা কামাই করলে সাধারণত এমন সখ হয়। বিদেশ ভ্রমণও হলো, চেক আপ করাও হলো। চেক আপ করার পর বন্ধুদের সাথে মোবাইলে তার বিদেশে গিয়ে চেক আপের কথা বলে বেড়ায় গশর্ব করে। আর দেশী ডায়াগনোসিস্টিক সেন্টারের বদনাম করে যেভাবে দালালদের মুখ থেকে শুনেছে। অনেক সময় বিদেশ যেতে ভিসা পেতে দালালরা ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করে ভিসা সংগ্রহ করে। আজব আজব রোগের নাম লিখা থাকে সেই সব রিপোর্টে। সেই রিপোর্ট যখন বিদেশী ডাক্তারের হাতে পড়ে তখন তারা প্রচার করে বাংলাদেশী ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের রিপোর্ট ভুল হয়। এমন রিপোর্ট স্ক্যান করে কেউ কেউ ফেউস বুকেও ভাইরাল করেছে।

কয়েক বছর আগে একটা রিপোর্ট পেলাম মহিলা রোগীর। তিনি বড় একটা ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে রক্ত পরীক্ষা করিয়েছেন একজন পল্লী চিকিৎসকের এডভাইস অনুযায়ী। তিনি চিকিৎসককে বলেছিলেন যে তার শরীরে ক্যান্সার আছে কি না তা জানার জন্য কোন রক্ত পরীক্ষা লাগলে লিখে দেয়ার জন্য। সেই অনুযায়ী তিনি সাত আটটা পরীক্ষা করিয়েছেন। মজার কথা হলো তিনি প্রোস্টেট স্পেসিফিক এন্টিজেন (PSA) টেস্টটাও করিয়েছেন। সব পরীক্ষার রিপোর্ট ভালো। কিন্তু যেখান থেকে পরীক্ষা করিয়েছেন সেখানকার প্যাথলজিস্ট-এর দেখা তিনি পান নি। রিপোর্টে স্বাক্ষর করেছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিষয়ে বিএসসি পাশ করা একজন পার্সন। তিনি মেডিকেল পার্সন নন। তাই, তার রিপোর্ট বুঝার জন্য আমার কাছে এসেছিলেন। মনে রাখবেন, অধিক মুনাফা করার জন্য কেউ কেউ মেডিকেল পার্সনের পরিবর্তে অন্য প্রফেসনের লোক দিয়ে প্যাথলজি করাতে পারেন। প্রোস্টেট স্পেসিফিক এন্টিজেন পজিটিভ হয় প্রোস্টেট ক্যান্সারে সাধারণত। ছেলেদের পুরুষাংগের গোড়ায় ও মুত্রথলির নিচে মুত্রনালীর বেষ্টন করে প্রোস্টেট থাকে। মেয়েদের প্রোস্টেট নাই। প্রোস্টেটে ক্যান্সার হলে মুত্রনালী বন্ধ হয়ে প্রশ্রাব আটকে যায়। আগাম কেউ রক্ত পরীক্ষা করালে রক্তের পিএসএ বেশী দেখে প্রোস্টেট ক্যান্সার সন্দেহ করতে পারে।

কিন্তু আমার প্রশ্ন ছিল এই মহিলা রোগীর পিএসএ পরীক্ষা করানো হলো কেন? নিজে নিজেই চিন্তা করে বের করার চেষ্টা করলাম। মহিলা যখন পল্লী চিকিৎসককে উপদেশ লিখে দিতে বলেছেন তখন তিনি গুগলে সার্চ দিয়েছেন ক্যান্সার রোগের রক্ত পরীক্ষা কি কি আছে। মহিলা/পুরুষ বিবেচনা না করে সবগুলি লিখে দিয়েছেন। এও হতে পারে বেশী কমিশন পাওয়ার আশায় সবগুলি পরীক্ষা লিখে দিয়েছেন।

সিবিসি (CBC) নামে রক্তের একটা পরীক্ষা খুব করা হয়। সাভাবিক অবস্থায় যদি অনেকগুলি রোগীর রক্তের সিবিসি পরীক্ষা করা হয় তবে ইনসিডেন্টাল ফাইন্ডিং হিসাবে দুই এক জনের ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়বে। কারন, প্রথম দিন থেকেই রোগীর শারীরিক সমস্যা নাও হতে পারে। রক্তকণিকার অনেক পরিবর্তন হবার পর ব্লাড ক্যান্সারের উপসর্গ শুরু হয়। উপসর্গ শুরুর আগেই রক্তে ক্যান্সার সেলের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।
সাভাবিক সংখ্যার চেয়ে যদি অপরিক্ক রক্ত কণিকার পরিমাণ বেড়ে যায় তবে ব্লাড ক্যান্সার সন্দেহ করা হয়। যে ব্লাড ক্যান্সারে অপরিপক্ব কোষ থাকে তাকে একুট লিউকেমিয়া বলে। যে ব্লাড ক্যান্সারে পরিপক্ব কনিকা থাকে তাকে ক্রনিক লিউকেমিয়া বলে। পরিপক্ব কোষের সংখ্যা অসম্ভব বেশী হয়ে গেলেই ক্রনিক লিউকেমিয়া বলা হয়।

অনেক মেয়েদের জরায়ুমুখের ক্যান্সার হয়। সার্ভাইকাল ক্যান্সার বলে যাকে। এই ক্যান্সার কিন্তু এক দুই দিনে হয় না। পুরাপুরি ক্যান্সার হয়ার আগে, কোন কোন ক্ষেত্রে ৪/৫ বছর আগে থেকে সার্ভিক্স-এর কোষে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। প্রাথমিক ভাবে ভিআইএ (ভায়া) টেস্ট করে সন্দেহ করা হয়। ভায়া টেস্ট পজিটিভ হলে অথবা গাইনিকোলজিস্ট মনে করলে পেপ টেস্ট করে সার্ভিক্স-এর অস্বাভাবিক সেল ডিটেক্ট করে জরায়ুমুখের ক্যান্সার সন্দেহ করেন। গাইনিকোলিস্ট পেপ স্মিয়ার কালেকশন করেন। প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ পেপ টেস্ট পরীক্ষা করেন। ভায়া সেন্টারে ভায়া পরীক্ষা হয়।

ক্যান্সার মার্কার নামে রক্তের কিছু পরীক্ষা আছে। এগুলি কনফার্ম পরীক্ষা না। উপসর্গ দেখে ক্যান্সার সন্দেহ হলে অথবা চিকিৎসা দেয়ার সময় ঔষধে কেমন কাজ করছে তা দেখার জন্য এইসব মার্কার দেখা হয়। অনেক মার্কার আছে। তার মধ্যে PSA, AFP, beta-HCG, CA-125, Carcinoemryonic antigen সচারাচর করা হয়।

পিএসএ(PSA)-এর কথা আগেই বলা হয়েছে যে প্রোস্টেট ক্যান্সার হলে সাধারণত এটা পজিটিভ হয়।

এএফপি (AFP) সাধারণত পজিটিভ হয় ওভারি(ডিম্বাধার) ও টেস্টিসের (অন্ডকোষ)-এর ক্যান্সার এবং লিভারের ক্যান্সারে (হেপাটোসেলুলার ক্যান্সার)।

CA-125 পজিটিভ হয় সাধারণত ওভারিয়ান ক্যান্সার, এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যান্সার, ফ্যালোপিয়ান টিউব ক্যান্সার, লাংস (ফুসফুস) ক্যান্সার, ব্রেস্ট (স্তন) ক্যান্সার ও পরিপাক তন্ত্রের ক্যান্সারে।

বিটা-এইচসিজি (HCG) পজিটিভ হয় প্লাসেন্টাল ক্যান্সার (কোরিওকার্সিনোমা) ও জার্মসেল ক্যান্সার (ওভারি ও টেস্টিস) ক্যান্সারে।

কার্সিনোএম্ব্রায়োনি এন্টিজেন পজিটিভ হয় পরিপাক তন্ত্রের, সারভিক্স, লাংস, ওভারি ও ব্রেট ক্যান্সারে।

যাহোক, খামখা কেউ যদি ক্যান্সারের আগাম কোন পরীক্ষা করাতেই চান তবে উপরে উল্লেখিত পরীক্ষাগুলি করাতে উপদেশ দেয়া যেতে পারে। তবে মনে রখতে হবে কোনটি মেয়েদের আর কোনটি ছেলেদের পরীক্ষা।
৫/১০/২০১৯ খ্রী.

মলন

মলন
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ধান মাড়াই করাকে বলা হত মলন দেয়া। গ্রামে এখন আর মলন দিতে দেখি না। মলন দিতে ৫/৭টি গরুর প্রোয়োজন হতো। এখন কেউ লাংগল দিয়ে হাল চাষ করে না। কেউ গরুর গাড়ি বায় না। তাই গরুর সংখ্যা কমে গেছে। দুইএকজন দুধ খাওয়ার জন্য গরু পালে। কেউ কেউ গরু পালে মোটাতাজা করার জন্য। কোরবানির আগ দিয়ে ভালো দামে বিক্রি করে। লাখ টাকা দাম পায় সেই গরুর। শহরের ছেলে মেয়েরা ষাঁড় ও বলদের পার্থক্য বুঝতে পারে না। গ্রামে বলদ কোরবানি দেয়া হয়েছে শুনে একজন কলেজ পড়ুয়া আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল কয়েকজন মেয়ের উপস্থিতিতে “ষাঁড় ও বলদের মধ্যে পার্থক্য কি?” আমি উত্তর এড়িয়ে অন্য প্রসংগে চলে যাই। তাতে তাদের মনে রহস্যের সৃষ্টি হয়। কিভাবে বুঝাব তা বলতে পারছিলাম না। আপনারাও যদি পার্থক্যটা না বুঝে থাকেন তা হলে বলছি “যে সব ষাঁড়ের অন্ডকোষ গোটকা ডেকে কেটে ফেলা হয় সেগুলি বড় ও উচু হয়। তাদের প্রজনন ক্ষমতা থাকে না। তাদের বলা হয় বলদ।” বলদ দিয়ে বেশী কাজ করানো যায়।

যাহোক, মলনের কাজে সকল প্রকার গরু ব্যবহার করা হতো। পারতপক্ষে ষাঁড় ব্যবহার করা হতো না। ষাঁড় অন্য গরুর জন্য বিরক্তির ছিল। মলনের জন্য ৫, ৬ বা ৭ টি গরু সারিবদ্ধভাবে গলায় রশি দিয়ে বাঁধা হতো। এই রশিকে বলা হতো দাউন। নির্দিষ্ট দুরত্বে দুরত্বে একটা করে পাগা থাকতো সেই দাউনে। দাউনে পাগা লাগানো থাকতো। পাগায় গরুর গলা আটকানো হতো। পাগার এক মাথায় বলের মত গুটি থাকতো আরেক মাথায় আংটার মত ছিদ্র থাকতো। গরুর গলার দুই পাশ দিয়ে উপরে তুলে গুটি আইংটার মধ্যে লাগিয়ে দেয়া হতো। গলার সাইজ ছোট হলে গরু মাথা বের করে ছুটে পালাতো। এটাকে বলা হতো মুরগলা দেয়া। অর্থাৎ মুরগলা দিয়ে গরু ছুটে যেতো। গরুর পায়ের নিচে যেহেতু ধানের হিঞ্জা ( শিষ) থাকত সেহেতু গরু ধানের হিঞ্জা খেয়ে ফেলতো। তাই গরুর মুখে ঠোনা লাগিয়ে দেয়া হতো। ঠোনা বেত, বাঁশ, নও (বনলতা) অথবা দড়ি (রশি) দিয়ে বুনিয়ে বানানো হত। ঠোনা মুখে লাগালে গরু হা করে কিছু মুখে দিত পারতো না। কেউ কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলে আমরা বলতাম “মুখে ঠোনা লাগিয়ে বসে আছো কেন? কিছু বল।” মলন দেয়ার আগে পাকা ধান কেটে আটি বেঁধে বাঁশের বাইকে কাঁধে করে বাড়ি এনে উঠানের এক পাশে পালা (স্তুপ) দেয়া হতো। আমরা পালা বেয়ে উপরে উঠতাম। উপর থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়তাম। মলন দেয়ার সময় পালার উপর থেকে ধানের আটি মাটিতে ফেলা হতো। আটির বাঁন (বাঁধ) খুলে ঝাকি দিয়ে উঠানে ছড়িয়ে দেয়া হতো এলোমেলো করে। তারপর সব গরুগুলিকে দাউনে বাঁধা হতো। মলন উঠানে গোলাকৃতি চাকতির মতো দেখা যেতো। মলনের মাঝখানে রাখা হতো সবচেয়ে বৃদ্ধ গাইটিকে। গাভীকে বলা হতো গাই। যে গাইয়ের শক্তি সবচেয়ে কম হতো তাকে রাখা হতো কেন্দ্র বিন্দুতে। এটাকে বলা হত মেউয়া। মেউয়া এক পা স্থীর রেকে অন্যান্য গরুর সাথে ঘুরতো। তাই তার বাম পায়ে খের পেঁচিয়ে পড়তো। এটাকে বলা হতো মেউয়া পেচ। মাঝে মাঝে মেউয়ার পেচ ছাড়িয়ে দিতে হতো। মেউয়ার ডানে থাকতো গাল মেউয়া। গাল মেউয়া দুর্বল বলদ অথবা অল্প বয়সের গরু থাকতো। এরপর যতই ডানদিকে যাওয়া হত ততই শক্তিশালী ও চঞ্চল স্বভাবের গরু জোড়া হতো। গরুকে মলনের সাথে সামিল করাকে বলা হতো জোড়া। গরু জোড়া শেষ হলে পাজুন হাতে নিয়ে গরুর লেজে ঝাকুনি দিয়ে হইট হইট করলে হরু হাটা শুরু করতো। পাজুন হলো বাঁশের তৈরি গরু পিটানোর চিকন লাঠি। এই পাজুন হাল বাওয়ার সময়ও ব্যবহার করা হতো। তাই এটাকে আইল্লা পাজুনও বলা হতো। কাপুরুষ চাষী এই আইল্লা পাজুন দিয়ে বউ পিটাত। অনেকে ভয় দেখানোর জন্য বলতো “তরে আইল্লা পাজুন দিয়ায়া বাইরামু।” অর্থাৎ গরু পিটানোর লাঠি দিয়ে আঘাত করবে। গরুরা মলনের উপর দিয়ে এন্টি-ক্লকওয়াইজ ডিরেকশনে ঘুরতো। মানে, বামদিকে ঘুরতো। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই বাম দিকে ঘুরি। হজ্জ ও ওমরা করার সময় ক্কাবাঘরের চতুর্দিকে এন্টি-ক্লকওয়াইজ ডিরেকশনে সাতবার ঘুরতে হয় এটাকে বলা হয় তাওয়াফ করা। ক্যাম্পাসে প্রাতঃভ্রমণ করার সময় বেশী ভাগই বাম দিকে ঘুরে। তবে বিয়ের অনুষ্ঠানে সাত পাকে ঘুরার সময় ডান দিকে ঘুরতে হয়।
মলনে একজনে গরু পরিচালনা করে। এটাকে বলা হতো গরু ডাহানো। ডান হাতে পাজুন আর বাম কাহে (কাঁকে) বাচ্চা নিয়ে অনেকে গরু ডাহাইতো। মলনে হাটার সময় গরু চোনাইয়া দিত। গরুর প্রশ্রাবকে বলা হতো চোনা। প্রশ্রাব করাকে বলা হতো চোনানো। চোনা খেরের সাথে মিশে যেতো পাড়ায় পাড়ায়। চোনানোর পর গরু দাঁড়িয়ে একটু বাঁকা হতো পায়খানা করার জন্য। সাথে সাথে কিছু খের হাতে নিয়ে গরুর নেদা (লেদা/গোবর) ধরে ফেলা হতো। গোবর মেইল্লা মেরে (ছুড়ে মেরে) ফেলা হতো উচির মধ্যে। উচি বুনানো হতো বাঁশের বেতী দিয়ে। উচি ভরে গেলে মেয়েরা কাঁহে করে নিয়ে পালানের গোবরের ঠেংগিতে (স্তুপ) ফেলে দিতো। ফসল বুনার আগে খেত প্রস্তুত করার সময় জৈব সার হিসাবে কৃষক শুকনা গোবর খেতে ছড়িয়ে দিতো। পানাইন্না গরুর বাছুর বেঁধে রাখা হতো গোয়াইল ঘরে। ক্ষুধায় বাছুর মাকে ডাকতো “অম ব্যা” করে। মা গাই উত্তর দিতো “হাম্বা” করে। দেশী জাতের গাই ছিলো সেগুলি। সাইজে ছোট ছিল। ওলান ছিল ছোট। দুধ হতো মাত্র দুই পোয়া বা তিন পোয়া। খুব বেশী হলে এক সের। এক সের ছিল প্রায় এল লিটারের সমান। এক সেরের চার ভাগের এক ভাগ হলো এক পোয়া। এক সের দুধের দাম ছিল মাত্র এক টাকা।

গরুর ক্ষুরের পাড়ায় পাড়ার হিঞ্জা থেকে ধান আলাদা হয়ে নিচের দিকে চলে যেতো। আরেকজন আবার ধানের আটি খুলে মলনের উপর ছড়িয়ে দিতো। এইভাবে কয়েকঘন্টা মাড়ানোর পর মলন ভেংগে গরু বাঁধা হতো চাড়ির পাড়ে। চাড়িতে লবন, কুড়া ও পানি মিশিয়ে পেস্ট করা হতো। ক্ষুধার্ত ও পরিশ্রান্ত গরুগুলি তখন হামচিয়ে খেতো সেই কুড়া। খাওয়া শেষ হলে শুয়ে শুয়ে জাবর কাটতো ।

বাঁশের আগার কঞ্চিগুলি কেটে চেছে মস্রিন করে আগায় একটি কঞ্চি রেখে দিয়ে সেই কঞ্চিকে গরম করে বেকিয়ে আংটা বানিয়ে তৈরি করা হতো কারাইল। কারাইল দিয়ে খের খুঁচিয়ে আলাদা করা হত। ধান গাছ থেকে ধান পড়ে গেলে যা থাকে তাকে বলা হয় খের (খর)। কারাইল দিয়ে রৌদ্রে নেড়ে খের শুকিয়ে বাইর বাড়িতে পালা (স্তুপ) দিয়ে রাখা হতো। যারা বেশী ধান আবাদ করতো তাদের খেরও বেশী হতো। তাই খেরের পালাও বড় হতো। মেয়ে বিয়ে দিবার সময় ছেলের বাপের খেরের পালার সাইজ দেখে ধনী কেমন তা আন্দাজ করা হতো। টিনের ঘরের সংখ্যা দিয়েও ধনী কেমন তা বুঝা যেতো।

শুকনা খেরের পালায় থেকে পরিমাণ মত বের করে কাঁচি (কাস্তে) দিয়ে কেটে গরুর চাড়িতে দেয়া হতো। খের ছিল গরুর প্রধান খাবার। খের দিয়ে ঘরের চালও ছাওয়া হতো। তবে ছন দিয়ে ঘরের চাল ছাওয়া হলে বেশী মজবুত হতো। কিন্তু সবার খেতে ছন হতো না। ছন হতো ছন পাওরে।

খেরের পালার গোড়ায় খের দিয়ে ঢেকে লুকিয়ে আমরা পলান পলান (লুকুচুরি) খেলতাম। ঘরের পিছনে, বাওবেড়ার পিছনে, উগারতলে, চকিরতলে, দরজার চিপায়, ডোলের ভিতর, ফুলঘরি গাছের ঝোপে, গাছে উঠে অথবা খেরের পালায় লুকিয়ে আমরা “টুকু” শব্দ করতাম। বন্ধুরা খুঝে পেতো না। আর ডাকতো “টুকু টু”। মঝা পেতাম সেই খেলায়। খুজে পাওয়ার পর কি আনন্দই না পেতাম আমরা!

এখনো ধান আবাদ হয়। কিন্তু সেই ধান আবাদ করতে পাওয়ার ট্রিলার ব্যবহার করা হয়। এখন আর কেউ হালের লাংগল দিয়ে হাল বায় না। হাল বাইতে বাইতে আর কারো দুপুর গড়িয়ে যায় না। কোন গ্রাম্য বউ তার স্বামীর জন্য এক বাটি পান্তাভাত ও এক বদনা পানি নিয়ে খেতের বাতরে (আইলে) নিয়ে যায় না। কোন বউ আর এখন পান্তা ভাত খাওয়ার সময় তার স্বামীর কপালের ঘাম আচল দিয়ে মুছে দেয় না। এখন খাটো খাটো হাইব্রিড ধান গাছ হয়। তাতে ধরে উচ্চ ফলনশীল বড় বড় সাইজের ধান। সেইগুলি আর কেউ কাঁধে করে নিয়ে আসে না। নিয়ে আসে ভ্যানে করে। মলন আর দেয়া হয় না। বাবার কোলে কোন শিশু মলনের পিছনে ঘুরে না। সবাই ধান মাড়ায় মাড়াই মেশিন দিয়ে। মলনের দিন শেষ।
২৮/৯/২০১৯ খ্রি.

প্রকাশনা স্মৃতির পাতা থেকে

প্রকাশনা স্মৃতির পাতা থেকে

১০/৯/২০১৯, মিলন অডিটরিয়াম, বি এস এম এম ইউ, শাহবাগ, ঢাকা।

“স্মৃতির পাতা থেকে” বইখানার মোড়ক উন্মোচন করলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় সাবেক ভিসি প্রফেসর ডাঃ কামরুল হাসান খান, আমার পোস্ট গ্রাজুয়েট শিক্ষক ও কিংবদন্তী প্যাথলজিস্টবৃন্দ।

প্রফেসর ডা. মীর্জা হামিদুল হক, সাবেক অধ্যক্ষ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহের কিংবদন্তী হিস্টোপ্যাথলজিস্ট। স্যারের সাথে আমি এই মেডিকেল কলেজে প্রায় ১৪ বৎসর কাজ করেছি। ‘স্মৃতির পাতা থেকে’র কয়েকটি গল্পে স্যারের কথা আছে। স্যার বইটি পেয়েই পড়া শুরু করে দেন।
১১/৯/২০১৯

১১/৯/২০১৯, অধ্যক্ষ ডাঃ সজল কুমার সাহা, শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ, আমার লেখা “স্মৃতির পাতা থেকে” বইখানা গ্রহণ করলেন।

১৫/৯/২০১৯ খ্রি. প্রফেসর ডা. মতিউর রহমান ভুঁইয়া, সাবেক উপাধ্যক্ষ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ, প্রেসিডেন্ট বিএমএ ময়মনসিংহ, প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা “স্মৃতির পাতা থেকে” বইখানা গ্রহণ করলেন।

সাহিত্যিক বন্ধু, আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজের আমার সহপাঠী, সখিপুরের কৃতিসন্তান, আতিকুল হক ছমির আমার লেখা “স্মৃতির পাতা থেকে” বইখানা প্রকাশের ব্যপারে পরামর্শ দিয়েছে।
ধন্যবাদ ছমির বন্ধুকে।
১৪/৯/১৯ খ্রি.

ডা. তোফায়েল আহমদ, কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করলেন।
১৪/৯/১৯ খ্রি.

ডা. কামরুল হাসান, হেমাটোলজি বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করলেন।
১৪/৯/১৯ খ্রি.

ডা. আবুল বাশার, কমিউনিটি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করলেন।
১৪/৯/১৯ খ্রি.

মি. হিমাদ্রী বিশ্বাস, প্রতিনিধি ট্রেডওয়ার্থ লি. আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানার এক কপি নিজের জন্য, এক কপি মি. মিজানুর রহমান এমডি এবং কয়েক কপি বন্ধুদের জন্য গ্রহন করলেন।
১৪/৯/১৯ খ্রি.

ডা. সুবীর নন্দী, প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করেছেন।
১৪/৯/১৯ খ্রি.

ডা. মজাহারুল ইসলাম , ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করেছেন।
১১/৯/১৯ খ্রি.

ডা. ফখরুদ্দিন আহমেদ , এনাস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করেছেন।
১১/৯/১৯ খ্রি.

ডা. জহিরুল হক , মেডিসিন রোগ বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করেছেন।
১১/৯/১৯ খ্রি.

ডা. মোল্লা নজরুল ইসলাম , সার্জারি বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করেছেন।
১১/৯/১৯ খ্রি.

ডা. নাজমুল আলম, কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করেছেন।
১১/৯/১৯ খ্রি.

ডা. ইয়ামলি খান, চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করেছেন।
১১/৯/১৯ খ্রি.

ডা. আনোয়ার হোসেন, ডায়াবেটিস ও হরমোন রোগ বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করছেন।
১১/৯/১৯ খ্রি.

প্রফেসর ডা. পংকজ পাল, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করছেন।
১১/৯/১৯ খ্রি.

ডা. সাজেদুর রহমান (ফারুক), কার্ডিওলজিস্ট, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করছেন।
১১/৯/১৯ খ্রি.

ডা. নাজমুল আলম খান, রেডিওলোজী ও ইমেজিং স্পেশালিষ্ট, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করছেন।
১১/৯/১৯ খ্রি.

ডাঃ ফারুক ও ডাঃ নাজমুল

এস কে আলম ভাই “স্মৃতির পাতা থেকে” বইটি নিয়েছেন।
১৬/৯/২০১৯ খ্রি.

 

এক ফোটা ঔষধের পাওয়ার

এক ফোটা ঔষধের পাওয়ার
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৮৩ সনে যখন আমি এমবিবিএস তৃতীয় বর্ষে পড়তাম তখন আমার এক আত্বীয় গ্রামের এক চিকিৎসকের খোজ নিতে বলেন যে সেই চিকিৎসক নাকি বন্ধা রুগীদের ভালো চিকিৎসা করতে পারেন এবং অনেকেই তার চিকিৎসায় সন্তান লাভ করেছে। তিনি মূলত হাই স্কুলের বিএসসি টিচার। বিকেলে ও ছুটির দিনে বাড়িতে প্র‍্যাক্টিস করেন। তার ভিজিট কত, কি কি নিয়ম জেনে যেতে হবে। আমি সেই বাড়িতে গেলাম। দেখি তিনি তার বাড়ির বাংলা ঘরে বসে রুগীর ব্যবস্থাপত্র ও ঔষধ দিচ্ছেন। কয়েকজন রুগী তার চেম্বারের ভিতরেই বসে আছে। আমিও সবার মতো করে বসলাম। Continue reading “এক ফোটা ঔষধের পাওয়ার”

ফেইসবুক পোস্টের প্রাইভেসি ও শেয়ার করা

ফেইসবুক পোস্টের প্রাইভেসি ও শেয়ার করা
(সাধারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ফেইসবুকে যেকোনো একটা পোস্ট দেয়ার আগে প্রাইভেসি সেট করে নিতে হয়। এটা নির্ভর করে যিনি পোস্টটি দিচ্ছেন এটি কে কে দেখতে পারবেন তার উপর । একটা অপশন আছে ‘me only’। এটা সেট করা হলে নিজে ছাড়া আর কেউ দেখতে পারবে না। কিছু কিছু নিজের দরকারি তথ্য আছে যেগুলি অন্যের প্রয়োজন নাই। তাহলে অন্যকে দেখায়ে তার সময় ও পয়সা কেনো নষ্ট করা হবে? মনে করতে হবে, যে কোন পোস্ট পড়ে একজন কিছু সময় ব্যয় করে। পোস্ট পড়তে কিছু ডাটা খরচ হয়। ডাটা খরচ হওয়া মানে টাকা খরচ হওয়া। একটা অতি গোপনীয় তথ্যও এই অপশনে রেখে দেয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে ছেড়ে দেয়া যেতে পারে বন্ধুদের জন্য। আরেকটা অপশন আছে “Friends”। এই অপশন সেট করা হলে শুধু ফ্রেন্ড লিস্টে যারা আছে তারাই দেখতে পারবে। এই ধরনের পোষ্ট দেয়ার আগে ভেবে দেখতে হবে এটা আমার সব ফেইসবুক বন্ধু দেখার মতো কি না। আমি আমার শিক্ষক, ক্লাসমেট, বন্ধু, আত্বীয় ও অপরিচিত অনেককেই ফেইসবুক ফ্রেন্ড হিসাবে লিস্টে রেখেছি। তাই বলে কি আমি আমার ক্লোজ বন্ধুদেরকে যা দেখাতে পারবো তা সব বন্ধুকে দেখাতে পারব? আমার ছাত্ররা তাদের নিজেদের মধ্যে হাল্কা তামাশা করে নানা রকম পোস্ট দেয়। যেগুলি হয়তো বাস্তবে আমার সামনে করবে না। তাহলে ফেইসবুকে কেন সেটা দেখাবে। অথবা তার বন্ধুকে নিয়ে শর্ট ড্রেস পরে কিছু ছবি পোস্ট করলো। বাস্তবে কি আমার সামনে এই ভাবে দাড়াতে পারবে? তবে ইচ্ছা হলে ক্লোজ বন্ধুদের কাছে মেসেঞ্জারে শেয়ার করতে পারা যায়। “Friends except” নামে একটা অপশন আছে। এই অপশনে দেখে দেখে কয়েকজন ফ্রেন্ডকে পোস্ট দেখা থেকে বাদ দেয়া যেতে পারে। আরেকটা অপশন হলো “Public”। মানে সবাই দেখতে পারেন। এই পোস্টগুলি নিজের লিস্টের সব ফ্রেন্ড ও ফলোয়ারদের নিউজ ফিডে চলে যায় এক যোগে। এই ধরনের পোস্ট অধিকাংশ ফেইসবুক ইউজারদের উপকারে আসতে পারে মনে করে ছাড়া হয়। নিজের চিন্তাধারা বা মতামত অনেক মানুষের সাথে শেয়ার করাই পাবলিক পোস্টের উদ্দেশ্য।

নিজের কথা অন্যকে জানানোকে শেয়ার করা বলা হয় সামাজিক মাধ্যমে। প্রাইভেসি সেট করে আমরা নিজের মনের কথা, ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে থাকি। অন্যের পোস্টও ভালো লাগলে শেয়ার করা যায়। পোস্টে শেয়ার অপশন থাকে। এর মানে হলো আমরা নিজেদের টাইম লাইনে এটা শেয়ার করতে পারি, কপি পেস্ট করে নয়, শেয়ারে ক্লিক করে। তাতে পোস্ট দাতার নাম ছবি সহ হুবহু পোস্ট ইউজাররা দেখতে পারে। ফেইসবুক পোস্ট একটা ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি। শেয়ার বাটনে ক্লিক করে শেয়ার করে এই প্রোপার্টির আইন লংঘন হয় না। যদি শেয়ার অপশন না থাকে তবে মনে করতে হবে পোস্ট দাতা চান না এটা কেউ শেয়ার করুক। কিন্তু আমরা দেখতে পাই কেউ কেউ অন্যের পোস্ট কপি পেস্ট করে শেয়ার করছেন। এতে কপিরাইট আইন লংঘন হচ্ছে। কি দরকার, একজন যেটা চান না সেটা করতে। কেউ কেউ মনে করেন পেস্ট করে পোস্ট দাতার নাম লিখে দিলেই হবে। তাও ঠিক না। তবে অন্য কোনভাবে অনুমতি নেয়া হলে অসুবিধা নাই।

যিনি পোস্টে প্রাইভেসি দিয়ে রেখেছেন ফ্রেন্ড অনলি হিসাবে। সেই পোস্টটির স্ক্রিনশট নিয়ে পাবলিকের কাছে শেয়ার করাও ফেইসবুক প্রাইভেসি আইনের পরিপন্থী।

তাই নিজের বা অন্যের কোন পোস্ট শেয়ার করার সময় প্রাইভেসির কোন ক্ষতি করা হচ্ছে কিনা ভেবে নিতে হবে।
২৭/৮/২০১৯ খ্রী.

রুগীর প্রক্সি

রুগীর প্রক্সি
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ঘটনাটা অনেকদিন আগের। ১৩/১৪ বছর তো হবেই। আমাদের গ্রাম এলাকা থেকে ময়মনসিংহে একজন লোক এলেন আমার কাছে। আমি তাকে চিনতাম না। তিনি আমাকে চিনতেন। তার বয়স ২৫ কি ২৬ বছর হবে। তিনি বললেন “আমি সৌদিআরব যেতে চাই চাকরি করতে। মেডিকেল চেক আপ-এ যেন ধরা না খাই সেজন্য চেক আপ করতে যে সব পরীক্ষা করাতে হয় সেইগুলি পরীক্ষা করায়ে দেখতে চাই। পরীক্ষায় সমস্যা না থাকলে দালালকে টাকা দেব। ” আমি তার কয়েকটি রক্তের পরীক্ষা ও বুকের এক্সরে করাতে দিলাম। দুইঘন্টা পর সবগুলি রিপোর্ট নিয়ে আমার কাছে এলেন। রক্তের রিপোর্ট ভালো। বুকের এক্সরে রিপোর্টে লিখা “নন-স্পেসিফিক ইনফেকশন।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন Continue reading “রুগীর প্রক্সি”

নাড়ী ঢিলা রোগ আইবিএস

নাড়ী ঢিলা রোগ আইবিএস
(স্বাস্থ্য কথা)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

অনেকে পেটের পাকস্থলীকে ভুড়ি আর অন্ত্রকে নাড়ী বলে। একসাথে বলে নাড়ী- ভুড়ি। আবার হাতের কব্জিতে রক্তনালীর উপর আঙুল রেখে রক্ত চলাচলের ঢেউ গণনা করে হার্ট রেট বা পাল্স গণনাকেও অনেকে নাড়ী দেখা বলে। মানুষ জানে যে অন্ত্রের ভিতর পায়খানা থাকে। ছাগল গরু জবাই করে অনেকেই দেখেছে যে নাড়ীর ভিতর পায়খানা থাকে। কাজেই অনেকেই মনে করে নাড়ী ঢিলা থাকলে পায়খানা ধরে রাখা যায় না। খাবার হজম না হয়েই পড়ে যায়। দেখবেন, অনেকেই এমন আছেন, সকালে নাস্তা খাওয়ার কিছুক্ষণ পর পেটে একটা মোচর দিয়ে পায়খানার বেগ হয়। দৌড়ে যেতে হয় লেট্রিনে। কমোডে বসলে কলকলি সব পায়খানা পড়ে যায় কমোডে। নরম পায়খানা। আগের দিনে গ্রামের অনেকেই লোটা অথবা বদনা নিয়ে দৌড়ে যেতেন আড়া জংগলে। এসে বলতেন পেটের সব পড়ে গেছে গেলগেলি। অথচ এই সব লোক সুস্থ মানুষের মতোই। অন্য কোন সমস্যা নেই। নেই কোন জ্বরজারি। শুধু বলে মুখটা একটু তামা তামা লাগে। বন্ধুরা ঠাট্টা করে বলে নাড়ী ঢিলা মানুষ।

আসলে এই নাড়ী ঢিলা রোগটিকে ডাক্তারি ভাষায় বলা হয় ‘আইবিএস’। এর ফুল মিনিং ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম। যে সব রোগের কারন জানা গেছে সেসব রোগের চিকিৎসাও সহজ হয়েছে। যেসব রোগের প্রকৃত কারন এখনো জানা যায় নি সেসব রোগের ভালো চিকিৎসাও নেই। আইবিএস হলো এমন রোগ যার প্রকৃত কারন এখনো জানা যায় নি। ধারনা করা হচ্ছে এই রুগীরা একটু বেশী শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা করে। বাওয়েল বা অন্ত্রের মুভমেন্ট বা ঢেউ অসামঞ্জস্যপুর্ণ। কোন সময় বেশী চলে কোন সময় কম চলে। তাই কয়েকদিন কোষ্ঠকাঠিন্য থাকে আবার কয়েকদিন ডাইরিয়া থাকে। তিন চার দিন পায়খানা না হয়ে যখন রুগী কমোডে বসে তখন কমোড ভরে যায় পায়খানায়। একটু উল্টাপাল্টা খেলে আরো বেশী পায়খানা হয়। এজন্য রুগী ভয়ে এটা সেটা খেতে চায় না।

অল্প কিছু কার্যকরী ঔষধ আছে এই রোগের। কিন্তু তাতে রুগীরা তেমন সন্তুষ্ট না চিকিৎসা নিয়ে। তাই তারা কিছুদিন পরপর ডাক্তার বদলায়। প্রতিটি ডাক্তার তার সিম্পটম শুনেই রোগ ধরতে পারেন। তারপরও বেশ কিছু দামী দামী পরীক্ষা নিরিক্ষা করান অন্য কোন খারাপ রোগ আছে কিনা জানার জন্য। পরীক্ষার রিপোর্ট সবসময় ভালো আসে। রুগী এইসব রিপোর্ট প্রেসক্রিপশন ফাইলে সুন্দর করে ক্লিপ দিয়ে সাজিয়ে রাখে। একটা রিপোর্টও হারাতে চান না। তাতে তার কাছে এক গাদা কাগজ জমা হয়। এই কাগজ আবার নতুন ডাক্তারকে দেখার জন্য অনুরোধ করে। না দেখলে অসন্তুষ্ট হয়। এটাও একটা লক্ষন আইবিএস রুগীর। রুগী সামর্থ্য থাকলে ডাক্তার বদলাতে বদলাতে সুদুর ব্যাংকক পর্যন্ত চলে যায়। তারাও রুগীকে কয়েক বার ঘুরায় ফলো আপ দেয়ার জন্য। শেষে এই রুগের রহস্যটা বলে দেয়। লাখ লাখ টাকা ভাংগার পর রুগী চিকিৎসা ক্ষান্ত দিয়ে হতাসার আলাপ শেয়ার করে বন্ধুদের সাথে। বন্ধুরা হতাস না হয়ে হার্বাল মেডিসিনের আশ্রয় নিতে বলে। সেখান থেকে হতাস হয়ে হোমিওপাথি মেডিসিন সেবন করে বহু বছর কাটায় কেউ কেউ। কিন্তু নাস্তা করার পর পেটে কামর দিয়ে লেট্রিনে যাওয়ার অভ্যাসটা তার থেকেই যায়। কারন, আইবিএস এর এখনো কোন কারন জানা যায় নি এবং এর কার্যকরী চিকিৎসাও আবিষ্কার হয় নি। কিন্তু যিনি চিকিৎসা করেন তিনি রুগীকে কিছুটা আশ্বাস দেন যে তার ঔষধ খেয়ে ভালো হবার সম্ভাবনা আছে। রুগী তখন তার পূর্বের চিকিৎসকে দোষারোপ করে এবং নতুন বিশ্বাসে কিছুদিন ঔষধ খেয়ে মানষিক প্রশান্তি লাভ করে।

চিকিৎসকগণ সিম্পটম কমানোর জন্য ফাইবারযুক্ত খাবার খেতে বলেন। তৈলাক্ত খাবার খেতে নিষেধ করেন। পেট ভরে না খেয়ে অল্প অল্প খাবার ঘনঘন খেতে বলেন। কপি ও ব্রুকলি খেতে নিষেধ করেন। রোগের সম্পর্কে ধারনা নিয়ে মনের জোড় বাড়ালে আইবিএস এমনি এমনি কমে যায়।
২৫/৮/২০১৯ খ্রী.