লেপ তোষকের কারিগর

লেপ তোষকের কারিগর
(সামাজিক ছোট গল্প)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

শীত এসে গেলো। নতুন করে লেপ বানাতে দিলাম। লাল সালু কাপড় ও খাটি কার্পাস তুলা পছন্দ করে দিলাম। যেদিন লেপ সরবরাহ করার কথা ছিল সেদিন লেপের দোকানে গেলাম। দেখলাম লেপ বানানো হয় নাই। তুলা ধুনানো হচ্ছে। তুলা ধুনা উড়ে উড়ে নাক দিয়ে ঢুকছিল। আমি একটু সরে দাঁড়ালাম। ধুনানো শেষ হলে লাল সালুর খোলে ভরা শুরু করলেন লেপের কারিগর । দোকান মালিক কাউন্টারেই ছিলেন। কর্মচারীকে বললেন আমাকে একটা চেয়ার দিতে। আমি তুলা ভরা দেখছিলাম চেয়ারে বসে। বললাম

Continue reading “লেপ তোষকের কারিগর”

সুস্থ্য শরীরে ক্যান্সারের পরীক্ষা

সুস্থ্য শরীরে ক্যান্সারের পরীক্ষা
(স্বাস্থ্য কথা)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

কয়েকদিন আগে প্রবাস থেকে একজন আমাকে মোবাইল করে জানতে চাইলেন যে তিনি দেশে ফিরে রক্ত পরীক্ষা করাবেন। কি জন্য রক্ত পরীক্ষা করাবেন জানতে চাইলে বললেন
– শরীরে ক্যান্সার আছে কি না জানতে চাই।
– তা শারীরিক সমস্যা কি কি?
– না, শরীরে কোন সমস্যা নাই।
– সমস্যা নাই, তাও পরীক্ষা করাবেন কেন?
– অনেকেই তো ক্যান্সার হয়ে মারা গেলো। আমার শরীরের ভিতরে ক্যান্সার আছে কি না জানতে চাই।
– দেশে ফিরে আমার সাথে যোগাযোগ করবেন।

এভাবে যারা অতি-স্বাস্থ্য সচেতন তারা আগাম কিছু পরীক্ষা করাতে চান। এই সুযোগে অনেক দালালের সুবিধা হয়। তারা দেশী বিদেশী বড় বড় ডায়াগনোসিস্টিক সেন্টারে মোটা কমিশনের বিনিময়ে প্যাকেজ করে শরীর চেক আপ করার নামে টাকা হাতিয়ে নেয়। সহজ উপায়ে বেশী টাকা কামাই করলে সাধারণত এমন সখ হয়। বিদেশ ভ্রমণও হলো, চেক আপ করাও হলো। চেক আপ করার পর বন্ধুদের সাথে মোবাইলে তার বিদেশে গিয়ে চেক আপের কথা বলে বেড়ায় গশর্ব করে। আর দেশী ডায়াগনোসিস্টিক সেন্টারের বদনাম করে যেভাবে দালালদের মুখ থেকে শুনেছে। অনেক সময় বিদেশ যেতে ভিসা পেতে দালালরা ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করে ভিসা সংগ্রহ করে। আজব আজব রোগের নাম লিখা থাকে সেই সব রিপোর্টে। সেই রিপোর্ট যখন বিদেশী ডাক্তারের হাতে পড়ে তখন তারা প্রচার করে বাংলাদেশী ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের রিপোর্ট ভুল হয়। এমন রিপোর্ট স্ক্যান করে কেউ কেউ ফেউস বুকেও ভাইরাল করেছে।

কয়েক বছর আগে একটা রিপোর্ট পেলাম মহিলা রোগীর। তিনি বড় একটা ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে রক্ত পরীক্ষা করিয়েছেন একজন পল্লী চিকিৎসকের এডভাইস অনুযায়ী। তিনি চিকিৎসককে বলেছিলেন যে তার শরীরে ক্যান্সার আছে কি না তা জানার জন্য কোন রক্ত পরীক্ষা লাগলে লিখে দেয়ার জন্য। সেই অনুযায়ী তিনি সাত আটটা পরীক্ষা করিয়েছেন। মজার কথা হলো তিনি প্রোস্টেট স্পেসিফিক এন্টিজেন (PSA) টেস্টটাও করিয়েছেন। সব পরীক্ষার রিপোর্ট ভালো। কিন্তু যেখান থেকে পরীক্ষা করিয়েছেন সেখানকার প্যাথলজিস্ট-এর দেখা তিনি পান নি। রিপোর্টে স্বাক্ষর করেছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিষয়ে বিএসসি পাশ করা একজন পার্সন। তিনি মেডিকেল পার্সন নন। তাই, তার রিপোর্ট বুঝার জন্য আমার কাছে এসেছিলেন। মনে রাখবেন, অধিক মুনাফা করার জন্য কেউ কেউ মেডিকেল পার্সনের পরিবর্তে অন্য প্রফেসনের লোক দিয়ে প্যাথলজি করাতে পারেন। প্রোস্টেট স্পেসিফিক এন্টিজেন পজিটিভ হয় প্রোস্টেট ক্যান্সারে সাধারণত। ছেলেদের পুরুষাংগের গোড়ায় ও মুত্রথলির নিচে মুত্রনালীর বেষ্টন করে প্রোস্টেট থাকে। মেয়েদের প্রোস্টেট নাই। প্রোস্টেটে ক্যান্সার হলে মুত্রনালী বন্ধ হয়ে প্রশ্রাব আটকে যায়। আগাম কেউ রক্ত পরীক্ষা করালে রক্তের পিএসএ বেশী দেখে প্রোস্টেট ক্যান্সার সন্দেহ করতে পারে।

কিন্তু আমার প্রশ্ন ছিল এই মহিলা রোগীর পিএসএ পরীক্ষা করানো হলো কেন? নিজে নিজেই চিন্তা করে বের করার চেষ্টা করলাম। মহিলা যখন পল্লী চিকিৎসককে উপদেশ লিখে দিতে বলেছেন তখন তিনি গুগলে সার্চ দিয়েছেন ক্যান্সার রোগের রক্ত পরীক্ষা কি কি আছে। মহিলা/পুরুষ বিবেচনা না করে সবগুলি লিখে দিয়েছেন। এও হতে পারে বেশী কমিশন পাওয়ার আশায় সবগুলি পরীক্ষা লিখে দিয়েছেন।

সিবিসি (CBC) নামে রক্তের একটা পরীক্ষা খুব করা হয়। সাভাবিক অবস্থায় যদি অনেকগুলি রোগীর রক্তের সিবিসি পরীক্ষা করা হয় তবে ইনসিডেন্টাল ফাইন্ডিং হিসাবে দুই এক জনের ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়বে। কারন, প্রথম দিন থেকেই রোগীর শারীরিক সমস্যা নাও হতে পারে। রক্তকণিকার অনেক পরিবর্তন হবার পর ব্লাড ক্যান্সারের উপসর্গ শুরু হয়। উপসর্গ শুরুর আগেই রক্তে ক্যান্সার সেলের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।
সাভাবিক সংখ্যার চেয়ে যদি অপরিক্ক রক্ত কণিকার পরিমাণ বেড়ে যায় তবে ব্লাড ক্যান্সার সন্দেহ করা হয়। যে ব্লাড ক্যান্সারে অপরিপক্ব কোষ থাকে তাকে একুট লিউকেমিয়া বলে। যে ব্লাড ক্যান্সারে পরিপক্ব কনিকা থাকে তাকে ক্রনিক লিউকেমিয়া বলে। পরিপক্ব কোষের সংখ্যা অসম্ভব বেশী হয়ে গেলেই ক্রনিক লিউকেমিয়া বলা হয়।

অনেক মেয়েদের জরায়ুমুখের ক্যান্সার হয়। সার্ভাইকাল ক্যান্সার বলে যাকে। এই ক্যান্সার কিন্তু এক দুই দিনে হয় না। পুরাপুরি ক্যান্সার হয়ার আগে, কোন কোন ক্ষেত্রে ৪/৫ বছর আগে থেকে সার্ভিক্স-এর কোষে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। প্রাথমিক ভাবে ভিআইএ (ভায়া) টেস্ট করে সন্দেহ করা হয়। ভায়া টেস্ট পজিটিভ হলে অথবা গাইনিকোলজিস্ট মনে করলে পেপ টেস্ট করে সার্ভিক্স-এর অস্বাভাবিক সেল ডিটেক্ট করে জরায়ুমুখের ক্যান্সার সন্দেহ করেন। গাইনিকোলিস্ট পেপ স্মিয়ার কালেকশন করেন। প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ পেপ টেস্ট পরীক্ষা করেন। ভায়া সেন্টারে ভায়া পরীক্ষা হয়।

ক্যান্সার মার্কার নামে রক্তের কিছু পরীক্ষা আছে। এগুলি কনফার্ম পরীক্ষা না। উপসর্গ দেখে ক্যান্সার সন্দেহ হলে অথবা চিকিৎসা দেয়ার সময় ঔষধে কেমন কাজ করছে তা দেখার জন্য এইসব মার্কার দেখা হয়। অনেক মার্কার আছে। তার মধ্যে PSA, AFP, beta-HCG, CA-125, Carcinoemryonic antigen সচারাচর করা হয়।

পিএসএ(PSA)-এর কথা আগেই বলা হয়েছে যে প্রোস্টেট ক্যান্সার হলে সাধারণত এটা পজিটিভ হয়।

এএফপি (AFP) সাধারণত পজিটিভ হয় ওভারি(ডিম্বাধার) ও টেস্টিসের (অন্ডকোষ)-এর ক্যান্সার এবং লিভারের ক্যান্সারে (হেপাটোসেলুলার ক্যান্সার)।

CA-125 পজিটিভ হয় সাধারণত ওভারিয়ান ক্যান্সার, এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যান্সার, ফ্যালোপিয়ান টিউব ক্যান্সার, লাংস (ফুসফুস) ক্যান্সার, ব্রেস্ট (স্তন) ক্যান্সার ও পরিপাক তন্ত্রের ক্যান্সারে।

বিটা-এইচসিজি (HCG) পজিটিভ হয় প্লাসেন্টাল ক্যান্সার (কোরিওকার্সিনোমা) ও জার্মসেল ক্যান্সার (ওভারি ও টেস্টিস) ক্যান্সারে।

কার্সিনোএম্ব্রায়োনি এন্টিজেন পজিটিভ হয় পরিপাক তন্ত্রের, সারভিক্স, লাংস, ওভারি ও ব্রেট ক্যান্সারে।

যাহোক, খামখা কেউ যদি ক্যান্সারের আগাম কোন পরীক্ষা করাতেই চান তবে উপরে উল্লেখিত পরীক্ষাগুলি করাতে উপদেশ দেয়া যেতে পারে। তবে মনে রখতে হবে কোনটি মেয়েদের আর কোনটি ছেলেদের পরীক্ষা।
৫/১০/২০১৯ খ্রী.

মলন দেয়া

মলন দেয়া
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ধান মাড়াই করাকে বলা হত মলন দেয়া। গ্রামে এখন আর মলন দিতে দেখি না। মলন দিতে ৫/৭টি গরুর প্রয়োজন হতো। এখন কেউ লাংগল দিয়ে হাল চাষ করে না। কেউ গরুর গাড়ি বায় না। তাই গরুর সংখ্যা কমে গেছে। দুইএকজন দুধ খাওয়ার জন্য গরু পালে। কেউ কেউ গরু পালে মোটাতাজা করার জন্য। কোরবানির আগ দিয়ে ভালো দামে বিক্রি করে। লাখ টাকা দাম পায় সেই গরুর। শহরের ছেলে মেয়েরা ষাঁড় ও বলদের পার্থক্য বুঝতে পারে না। গ্রামে বলদ কোরবানি দেয়া হয়েছে শুনে একজন কলেজ পড়ুয়া আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল কয়েকজন মেয়ের উপস্থিতিতে “ষাঁড় ও বলদের মধ্যে পার্থক্য কি?” আমি উত্তর এড়িয়ে অন্য প্রসংগে চলে যাই। তাতে তাদের মনে রহস্যের সৃষ্টি হয়। কিভাবে বুঝাব তা বলতে পারছিলাম না। আপনারাও যদি পার্থক্যটা না বুঝে থাকেন তা হলে বলছি “যে সব ষাঁড়ের অন্ডকোষ গোটকা ডেকে কেটে ফেলা হয় সেগুলি বড়সড় ও উচু হয়। তাদের প্রজনন ক্ষমতা থাকে না। তাদের বলা হয় বলদ।” বলদ দিয়ে বেশী কাজ করানো যায়।

যাহোক, মলনের কাজে সকল প্রকার গরু ব্যবহার করা হতো। পারতপক্ষে ষাঁড় ব্যবহার করা হতো না। ষাঁড় অন্য গরুর জন্য বিরক্তির কারন ছিল। মলনের জন্য ৫, ৬ বা ৭ টি গরু সারিবদ্ধভাবে গলায় রশি দিয়ে বাঁধা হতো। এই রশিকে বলা হতো দাউন। নির্দিষ্ট দুরত্বে দুরত্বে একটা করে পাগা থাকতো সেই দাউনে। পাগায় গরুর গলা আটকানো হতো। পাগার এক মাথায় বলের মত গুটি থাকতো আরেক মাথায় আংটার মত ছিদ্র থাকতো। গরুর গলার দুই পাশ দিয়ে উপরে তুলে গুটি আইংটার মধ্যে লাগিয়ে দেয়া হতো। গলার সাইজ ছোট হলে গরু মাথা বের করে ছুটে পালাতো। এটাকে বলা হতো মুরগলা দেয়া। অর্থাৎ মুরগলা দিয়ে গরু ছুটে যেতো। গরুর পায়ের নিচে যেহেতু ধানের হিঞ্জা (শিষ) থাকত সেহেতু গরু ধানের হিঞ্জা খেয়ে ফেলতো। তাই গরুর মুখে ঠোনা লাগিয়ে দেয়া হতো। ঠোনা বেত, বাঁশ, নও (বনলতা) অথবা দড়ি (রশি) দিয়ে বুনিয়ে বানানো হত। ঠোনা মুখে লাগালে গরু হা করে কিছু মুখে দিত পারতো না। কেউ কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলে আমরা বলতাম “মুখে ঠোনা লাগিয়ে বসে আছো কেন? কিছু বল।” মলন দেয়ার আগে পাকা ধান কেটে আটি বেঁধে বাঁশের বাইকে কাঁধে করে বাড়ি এনে উঠানের এক পাশে পালা (স্তুপ) দেয়া হতো। আমরা পালা বেয়ে উপরে উঠতাম। উপর থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়তাম। মলন দেয়ার সময় পালার উপর থেকে ধানের আটি মাটিতে ফেলা হতো। আটির বাঁন (বাঁধ) খুলে ঝাকি দিয়ে উঠানে ছড়িয়ে দেয়া হতো এলোমেলো করে। তারপর সব গরুগুলিকে দাউনে বাঁধা হতো। মলন উঠানে গোলাকৃতি চাকতির মতো দেখা যেতো। মলনের মাঝখানে রাখা হতো সবচেয়ে বৃদ্ধ গাইটিকে। গাভীকে বলা হতো গাই। যে গাইয়ের শক্তি সবচেয়ে কম হতো তাকে রাখা হতো কেন্দ্র বিন্দুতে। এটাকে বলা হত মেউয়া। মেউয়া এক পা স্থির রেখে অন্যান্য গরুর সাথে ঘুরতো। তাই তার বাম পায়ে খের পেঁচিয়ে পড়তো। এটাকে বলা হতো মেউয়া্র পেচ। মাঝে মাঝে মেউয়ার পেচ ছাড়িয়ে দিতে হতো। মেউয়ার ডানে থাকতো গাল মেউয়া। গাল মেউয়া দুর্বল বলদ অথবা অল্প বয়সের গরু থাকতো। এরপর যতই ডানদিকে যাওয়া হত ততই শক্তিশালী ও চঞ্চল স্বভাবের গরু জোড়া হতো। গরুকে মলনের সাথে সামিল করাকে বলা হতো জোড়া। গরু জোড়া শেষ হলে পাজুন হাতে নিয়ে গরুর লেজে ঝাকুনি দিয়ে হইট হইট করলে হরু হাটা শুরু করতো। পাজুন হলো বাঁশের তৈরি গরু পিটানোর চিকন লাঠি। এই পাজুন হাল বাওয়ার সময়ও ব্যবহার করা হতো। তাই এটাকে আইল্লা পাজুনও বলা হতো। কাপুরুষ চাষী এই আইল্লা পাজুন দিয়ে বউ পিটাত। অনেকে ভয় দেখানোর জন্য বলতো “তরে আইল্লা পাজুন দিয়া বাইরামু।” অর্থাৎ গরু পিটানোর লাঠি দিয়ে আঘাত করবে। গরুরা মলনের উপর দিয়ে ঘড়ির কাটা ঘুরার  বিপরিত  দিকে ঘুরতো। মানে, বামদিকে ঘুরতো। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই বাম দিকে ঘুরি।

মলনে একজনে গরু পরিচালনা করে। এটাকে বলা হতো গরু ডাহানো। ডান হাতে পাজুন আর বাম কাহে (কাঁকে) বাচ্চা নিয়ে অনেকে গরু ডাহাইতো। মলনে হাটার সময় গরু চোনাইয়া দিত। গরুর প্রশ্রাবকে বলা হতো চোনা। প্রশ্রাব করাকে বলা হতো চোনানো। চোনা খেরের সাথে মিশে যেতো পাড়ায় পাড়ায়। চোনানোর পর গরু দাঁড়িয়ে একটু বাঁকা হতো পায়খানা করার জন্য। সাথে সাথে কিছু খের হাতে নিয়ে গরুর নেদা (লেদা/গোবর) ধরে ফেলা হতো। গোবর মেইল্লা মেরে (ছুড়ে মেরে) ফেলা হতো উচির মধ্যে। উচি বুনানো হতো বাঁশের বেতী দিয়ে। উচি ভরে গেলে মেয়েরা কাঁহে করে নিয়ে গিয়ে পালানের গোবরের ঠেংগিতে (স্তুপ) ফেলে দিতো। ফসল বুনার আগে খেত প্রস্তুত করার সময় জৈব সার হিসাবে কৃষক শুকনা গোবর খেতে ছড়িয়ে দিতো। পানাইন্না গরুর বাছুর বেঁধে রাখা হতো গোয়াইল ঘরে। ক্ষুধায় বাছুর মাকে ডাকতো “অম ব্যা” করে। মা গাই উত্তর দিতো “হাম্বা” করে। দেশী জাতের গাই ছিলো সেগুলি। সাইজে ছোট ছিল। ওলান ছিল ছোট। দুধ হতো মাত্র দুই পোয়া বা তিন পোয়া। খুব বেশী হলে এক সের। এক সের ছিল প্রায় এক লিটারের সমান। এক সেরের চার ভাগের এক ভাগ হলো এক পোয়া। এক সের দুধের দাম ছিল মাত্র এক টাকা।

গরুর ক্ষুরের পাড়ায় পাড়ার হিঞ্জা থেকে ধান আলাদা হয়ে নিচের দিকে চলে যেতো। আরেকজন আবার ধানের আটি খুলে মলনের উপর ছড়িয়ে দিতো। এইভাবে কয়েকঘন্টা মাড়ানোর পর মলন ভেংগে গরু বাঁধা হতো চাড়ির পাড়ে। চাড়িতে লবন, কুড়া ও পানি মিশিয়ে পেস্ট করা হতো। ক্ষুধার্ত ও পরিশ্রান্ত গরুগুলি তখন হামচিয়ে খেতো সেই কুড়া। খাওয়া শেষ হলে শুয়ে শুয়ে জাবর কাটতো ।

বাঁশের আগার কঞ্চিগুলি কেটে চেছে মশ্রিন করে আগায় একটি কঞ্চি রেখে দিয়ে সেই কঞ্চিকে গরম করে বেকিয়ে আংটা বানিয়ে তৈরি করা হতো কারাইল। কারাইল দিয়ে খের খুঁচিয়ে আলাদা করা হত। ধান গাছ থেকে ধান পড়ে গেলে যা থাকে তাকে বলা হয় খের (খর)। কারাইল দিয়ে রৌদ্রে নেড়ে খের শুকিয়ে বাইর বাড়িতে পালা দিয়ে রাখা হতো। যারাবেশী ধান আবাদ করতো তাদের খেরও বেশী হতো। তাই খেরের পালাও বড় হতো। মেয়ে বিয়ে দিবার সময় ছেলের বাপের খেরের পালার সাইজ দেখে ধনী কেমন তা আন্দাজ করা হতো। টিনের ঘরের সংখ্যা দিয়েও ধনী কেমন তা বুঝা যেতো।

শুকনা খেরের পালা থেকে পরিমাণ মত খের বের করে কাঁচি (কাস্তে) দিয়ে কেটে গরুর চাড়িতে দেয়া হতো। খের ছিল গরুর প্রধান খাবার। খের দিয়ে ঘরের চালও ছাওয়া হতো। তবে ছন দিয়ে ঘরের চাল ছাওয়া হলে বেশী মজবুত হতো। কিন্তু সবার খেতে ছন হতো না। ছন হতো ছন পাওরে।

খেরের পালার গোড়ায় খের দিয়ে ঢেকে লুকিয়ে আমরা পলান পলান (লুকুচুরি) খেলতাম। ঘরের পিছনে, বাওবেড়ার পিছনে, উগারতলে, চকিরতলে, দরজার চিপায়, ডোলের ভিতর, ফুলঘরি গাছের ঝোপে, গাছে উঠে অথবা খেরের পালায় লুকিয়ে আমরা “টুকু” শব্দ করতাম। বন্ধুরা খুঝে পেতো না। আর ডাকতো “টুকু টু”। মজা পেতাম সেই খেলায়। খুজে পাওয়ার পর কি আনন্দই না পেতাম আমরা!

এখনো ধান আবাদ হয়। কিন্তু সেই ধান আবাদ করতে পাওয়ার ট্রিলার ব্যবহার করা হয়। এখন আর কেউ হালের লাংগল দিয়ে হাল বায় না। হাল বাইতে বাইতে আর কারো দুপুর গড়িয়ে যায় না। কোন গ্রাম্য বউ তার স্বামীর জন্য এক বাটি পান্তাভাত ও এক বদনা পানি নিয়ে খেতের বাতরে (আইলে) নিয়ে যায় না। কোন বউ আর এখন পান্তা ভাত খাওয়ার সময় তার স্বামীর কপালের ঘাম আচল দিয়ে মুছে দেয় না। এখন খাটো খাটো হাইব্রিড ধান গাছ হয়। তাতে ধরে উচ্চ ফলনশীল বড় বড় সাইজের ধান। সেইগুলি আর কেউ কাঁধে করে নিয়ে আসে না। নিয়ে আসে ভ্যানে করে। মলন আর দেয়া হয় না। বাবার কোলে কোন শিশু মলনের পিছনে ঘুরে না। সবাই ধান মাড়ায় মাড়াই মেশিন দিয়ে। মলনের দিন শেষ।
২৮/৯/২০১৯ খ্রি.
ময়মনসিংহ

 

 

প্রকাশনা স্মৃতির পাতা থেকে

প্রকাশনা স্মৃতির পাতা থেকে

১০/৯/২০১৯, মিলন অডিটরিয়াম, বি এস এম এম ইউ, শাহবাগ, ঢাকা।

“স্মৃতির পাতা থেকে” বইখানার মোড়ক উন্মোচন করলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় সাবেক ভিসি প্রফেসর ডাঃ কামরুল হাসান খান, আমার পোস্ট গ্রাজুয়েট শিক্ষক ও কিংবদন্তী প্যাথলজিস্টবৃন্দ।

প্রফেসর ডা. মীর্জা হামিদুল হক, সাবেক অধ্যক্ষ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহের কিংবদন্তী হিস্টোপ্যাথলজিস্ট। স্যারের সাথে আমি এই মেডিকেল কলেজে প্রায় ১৪ বৎসর কাজ করেছি। ‘স্মৃতির পাতা থেকে’র কয়েকটি গল্পে স্যারের কথা আছে। স্যার বইটি পেয়েই পড়া শুরু করে দেন।
১১/৯/২০১৯

১১/৯/২০১৯, অধ্যক্ষ ডাঃ সজল কুমার সাহা, শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ, আমার লেখা “স্মৃতির পাতা থেকে” বইখানা গ্রহণ করলেন।

১৫/৯/২০১৯ খ্রি. প্রফেসর ডা. মতিউর রহমান ভুঁইয়া, সাবেক উপাধ্যক্ষ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ, প্রেসিডেন্ট বিএমএ ময়মনসিংহ, প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা “স্মৃতির পাতা থেকে” বইখানা গ্রহণ করলেন।

সাহিত্যিক বন্ধু, আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজের আমার সহপাঠী, সখিপুরের কৃতিসন্তান, আতিকুল হক ছমির আমার লেখা “স্মৃতির পাতা থেকে” বইখানা প্রকাশের ব্যপারে পরামর্শ দিয়েছে।
ধন্যবাদ ছমির বন্ধুকে।
১৪/৯/১৯ খ্রি.

ডা. তোফায়েল আহমদ, কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করলেন।
১৪/৯/১৯ খ্রি.

ডা. কামরুল হাসান, হেমাটোলজি বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করলেন।
১৪/৯/১৯ খ্রি.

ডা. আবুল বাশার, কমিউনিটি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করলেন।
১৪/৯/১৯ খ্রি.

মি. হিমাদ্রী বিশ্বাস, প্রতিনিধি ট্রেডওয়ার্থ লি. আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানার এক কপি নিজের জন্য, এক কপি মি. মিজানুর রহমান এমডি এবং কয়েক কপি বন্ধুদের জন্য গ্রহন করলেন।
১৪/৯/১৯ খ্রি.

ডা. সুবীর নন্দী, প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করেছেন।
১৪/৯/১৯ খ্রি.

ডা. মজাহারুল ইসলাম , ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করেছেন।
১১/৯/১৯ খ্রি.

ডা. ফখরুদ্দিন আহমেদ , এনাস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করেছেন।
১১/৯/১৯ খ্রি.

ডা. জহিরুল হক , মেডিসিন রোগ বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করেছেন।
১১/৯/১৯ খ্রি.

ডা. মোল্লা নজরুল ইসলাম , সার্জারি বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করেছেন।
১১/৯/১৯ খ্রি.

ডা. নাজমুল আলম, কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করেছেন।
১১/৯/১৯ খ্রি.

ডা. ইয়ামলি খান, চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করেছেন।
১১/৯/১৯ খ্রি.

ডা. আনোয়ার হোসেন, ডায়াবেটিস ও হরমোন রোগ বিশেষজ্ঞ, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করছেন।
১১/৯/১৯ খ্রি.

প্রফেসর ডা. পংকজ পাল, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করছেন।
১১/৯/১৯ খ্রি.

ডা. সাজেদুর রহমান (ফারুক), কার্ডিওলজিস্ট, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করছেন।
১১/৯/১৯ খ্রি.

ডা. নাজমুল আলম খান, রেডিওলোজী ও ইমেজিং স্পেশালিষ্ট, আমার লেখা ‘স্মৃতির পাতা থেকে’ বইখানা গ্রহন করছেন।
১১/৯/১৯ খ্রি.

ডাঃ ফারুক ও ডাঃ নাজমুল

এস কে আলম ভাই “স্মৃতির পাতা থেকে” বইটি নিয়েছেন।
১৬/৯/২০১৯ খ্রি.

এক ফোটা ঔষধের পাওয়ার

এক ফোটা ঔষধের পাওয়ার
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৮৩ সনে যখন আমি এমবিবিএস তৃতীয় বর্ষে পড়তাম তখন আমার এক আত্বীয় গ্রামের এক চিকিৎসকের খোজ নিতে বলেন যে সেই চিকিৎসক নাকি বন্ধা রুগীদের ভালো চিকিৎসা করতে পারেন এবং অনেকেই তার চিকিৎসায় সন্তান লাভ করেছে। তিনি মূলত হাই স্কুলের বিএসসি টিচার। বিকেলে ও ছুটির দিনে বাড়িতে প্র‍্যাক্টিস করেন। তার ভিজিট কত, কি কি নিয়ম জেনে যেতে হবে। আমি সেই বাড়িতে গেলাম। দেখি তিনি তার বাড়ির বাংলা ঘরে বসে রুগীর ব্যবস্থাপত্র ও ঔষধ দিচ্ছেন। কয়েকজন রুগী তার চেম্বারের ভিতরেই বসে আছে। আমিও সবার মতো করে বসলাম। Continue reading “এক ফোটা ঔষধের পাওয়ার”

ফেইসবুক পোস্টের প্রাইভেসি ও শেয়ার করা

ফেইসবুক পোস্টের প্রাইভেসি ও শেয়ার করা
(সাধারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ফেইসবুকে যেকোনো একটা পোস্ট দেয়ার আগে প্রাইভেসি সেট করে নিতে হয়। এটা নির্ভর করে যিনি পোস্টটি দিচ্ছেন এটি কে কে দেখতে পারবেন তার উপর । একটা অপশন আছে ‘me only’। এটা সেট করা হলে নিজে ছাড়া আর কেউ দেখতে পারবে না। কিছু কিছু নিজের দরকারি তথ্য আছে যেগুলি অন্যের প্রয়োজন নাই। তাহলে অন্যকে দেখায়ে তার সময় ও পয়সা কেনো নষ্ট করা হবে? মনে করতে হবে, যে কোন পোস্ট পড়ে একজন কিছু সময় ব্যয় করে। পোস্ট পড়তে কিছু ডাটা খরচ হয়। ডাটা খরচ হওয়া মানে টাকা খরচ হওয়া। একটা অতি গোপনীয় তথ্যও এই অপশনে রেখে দেয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে ছেড়ে দেয়া যেতে পারে বন্ধুদের জন্য। আরেকটা অপশন আছে “Friends”। এই অপশন সেট করা হলে শুধু ফ্রেন্ড লিস্টে যারা আছে তারাই দেখতে পারবে। এই ধরনের পোষ্ট দেয়ার আগে ভেবে দেখতে হবে এটা আমার সব ফেইসবুক বন্ধু দেখার মতো কি না। আমি আমার শিক্ষক, ক্লাসমেট, বন্ধু, আত্বীয় ও অপরিচিত অনেককেই ফেইসবুক ফ্রেন্ড হিসাবে লিস্টে রেখেছি। তাই বলে কি আমি আমার ক্লোজ বন্ধুদেরকে যা দেখাতে পারবো তা সব বন্ধুকে দেখাতে পারব? আমার ছাত্ররা তাদের নিজেদের মধ্যে হাল্কা তামাশা করে নানা রকম পোস্ট দেয়। যেগুলি হয়তো বাস্তবে আমার সামনে করবে না। তাহলে ফেইসবুকে কেন সেটা দেখাবে। অথবা তার বন্ধুকে নিয়ে শর্ট ড্রেস পরে কিছু ছবি পোস্ট করলো। বাস্তবে কি আমার সামনে এই ভাবে দাড়াতে পারবে? তবে ইচ্ছা হলে ক্লোজ বন্ধুদের কাছে মেসেঞ্জারে শেয়ার করতে পারা যায়। “Friends except” নামে একটা অপশন আছে। এই অপশনে দেখে দেখে কয়েকজন ফ্রেন্ডকে পোস্ট দেখা থেকে বাদ দেয়া যেতে পারে। আরেকটা অপশন হলো “Public”। মানে সবাই দেখতে পারেন। এই পোস্টগুলি নিজের লিস্টের সব ফ্রেন্ড ও ফলোয়ারদের নিউজ ফিডে চলে যায় এক যোগে। এই ধরনের পোস্ট অধিকাংশ ফেইসবুক ইউজারদের উপকারে আসতে পারে মনে করে ছাড়া হয়। নিজের চিন্তাধারা বা মতামত অনেক মানুষের সাথে শেয়ার করাই পাবলিক পোস্টের উদ্দেশ্য।

নিজের কথা অন্যকে জানানোকে শেয়ার করা বলা হয় সামাজিক মাধ্যমে। প্রাইভেসি সেট করে আমরা নিজের মনের কথা, ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে থাকি। অন্যের পোস্টও ভালো লাগলে শেয়ার করা যায়। পোস্টে শেয়ার অপশন থাকে। এর মানে হলো আমরা নিজেদের টাইম লাইনে এটা শেয়ার করতে পারি, কপি পেস্ট করে নয়, শেয়ারে ক্লিক করে। তাতে পোস্ট দাতার নাম ছবি সহ হুবহু পোস্ট ইউজাররা দেখতে পারে। ফেইসবুক পোস্ট একটা ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি। শেয়ার বাটনে ক্লিক করে শেয়ার করে এই প্রোপার্টির আইন লংঘন হয় না। যদি শেয়ার অপশন না থাকে তবে মনে করতে হবে পোস্ট দাতা চান না এটা কেউ শেয়ার করুক। কিন্তু আমরা দেখতে পাই কেউ কেউ অন্যের পোস্ট কপি পেস্ট করে শেয়ার করছেন। এতে কপিরাইট আইন লংঘন হচ্ছে। কি দরকার, একজন যেটা চান না সেটা করতে। কেউ কেউ মনে করেন পেস্ট করে পোস্ট দাতার নাম লিখে দিলেই হবে। তাও ঠিক না। তবে অন্য কোনভাবে অনুমতি নেয়া হলে অসুবিধা নাই।

যিনি পোস্টে প্রাইভেসি দিয়ে রেখেছেন ফ্রেন্ড অনলি হিসাবে। সেই পোস্টটির স্ক্রিনশট নিয়ে পাবলিকের কাছে শেয়ার করাও ফেইসবুক প্রাইভেসি আইনের পরিপন্থী।

তাই নিজের বা অন্যের কোন পোস্ট শেয়ার করার সময় প্রাইভেসির কোন ক্ষতি করা হচ্ছে কিনা ভেবে নিতে হবে।
২৭/৮/২০১৯ খ্রী.

রুগীর প্রক্সি

রুগীর প্রক্সি
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ঘটনাটা অনেকদিন আগের। ১৩/১৪ বছর তো হবেই। আমাদের গ্রাম এলাকা থেকে ময়মনসিংহে একজন লোক এলেন আমার কাছে। আমি তাকে চিনতাম না। তিনি আমাকে চিনতেন। তার বয়স ২৫ কি ২৬ বছর হবে। তিনি বললেন “আমি সৌদিআরব যেতে চাই চাকরি করতে। মেডিকেল চেক আপ-এ যেন ধরা না খাই সেজন্য চেক আপ করতে যে সব পরীক্ষা করাতে হয় সেইগুলি পরীক্ষা করায়ে দেখতে চাই। পরীক্ষায় সমস্যা না থাকলে দালালকে টাকা দেব। ” আমি তার কয়েকটি রক্তের পরীক্ষা ও বুকের এক্সরে করাতে দিলাম। দুইঘন্টা পর সবগুলি রিপোর্ট নিয়ে আমার কাছে এলেন। রক্তের রিপোর্ট ভালো। বুকের এক্সরে রিপোর্টে লিখা “নন-স্পেসিফিক ইনফেকশন।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন Continue reading “রুগীর প্রক্সি”

নাড়ী ঢিলা রোগ আইবিএস

নাড়ী ঢিলা রোগ আইবিএস
(স্বাস্থ্য কথা)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

অনেকে পেটের পাকস্থলীকে ভুড়ি আর অন্ত্রকে নাড়ী বলে। একসাথে বলে নাড়ী- ভুড়ি। আবার হাতের কব্জিতে রক্তনালীর উপর আঙুল রেখে রক্ত চলাচলের ঢেউ গণনা করে হার্ট রেট বা পাল্স গণনাকেও অনেকে নাড়ী দেখা বলে। মানুষ জানে যে অন্ত্রের ভিতর পায়খানা থাকে। ছাগল গরু জবাই করে অনেকেই দেখেছে যে নাড়ীর ভিতর পায়খানা থাকে। কাজেই অনেকেই মনে করে নাড়ী ঢিলা থাকলে পায়খানা ধরে রাখা যায় না। খাবার হজম না হয়েই পড়ে যায়। দেখবেন, অনেকেই এমন আছেন, সকালে নাস্তা খাওয়ার কিছুক্ষণ পর পেটে একটা মোচর দিয়ে পায়খানার বেগ হয়। দৌড়ে যেতে হয় লেট্রিনে। কমোডে বসলে কলকলি সব পায়খানা পড়ে যায় কমোডে। নরম পায়খানা। আগের দিনে গ্রামের অনেকেই লোটা অথবা বদনা নিয়ে দৌড়ে যেতেন আড়া জংগলে। এসে বলতেন পেটের সব পড়ে গেছে গেলগেলি। অথচ এই সব লোক সুস্থ মানুষের মতোই। অন্য কোন সমস্যা নেই। নেই কোন জ্বরজারি। শুধু বলে মুখটা একটু তামা তামা লাগে। বন্ধুরা ঠাট্টা করে বলে নাড়ী ঢিলা মানুষ।

আসলে এই নাড়ী ঢিলা রোগটিকে ডাক্তারি ভাষায় বলা হয় ‘আইবিএস’। এর ফুল মিনিং ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম। যে সব রোগের কারন জানা গেছে সেসব রোগের চিকিৎসাও সহজ হয়েছে। যেসব রোগের প্রকৃত কারন এখনো জানা যায় নি সেসব রোগের ভালো চিকিৎসাও নেই। আইবিএস হলো এমন রোগ যার প্রকৃত কারন এখনো জানা যায় নি। ধারনা করা হচ্ছে এই রুগীরা একটু বেশী শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা করে। বাওয়েল বা অন্ত্রের মুভমেন্ট বা ঢেউ অসামঞ্জস্যপুর্ণ। কোন সময় বেশী চলে কোন সময় কম চলে। তাই কয়েকদিন কোষ্ঠকাঠিন্য থাকে আবার কয়েকদিন ডাইরিয়া থাকে। তিন চার দিন পায়খানা না হয়ে যখন রুগী কমোডে বসে তখন কমোড ভরে যায় পায়খানায়। একটু উল্টাপাল্টা খেলে আরো বেশী পায়খানা হয়। এজন্য রুগী ভয়ে এটা সেটা খেতে চায় না।

অল্প কিছু কার্যকরী ঔষধ আছে এই রোগের। কিন্তু তাতে রুগীরা তেমন সন্তুষ্ট না চিকিৎসা নিয়ে। তাই তারা কিছুদিন পরপর ডাক্তার বদলায়। প্রতিটি ডাক্তার তার সিম্পটম শুনেই রোগ ধরতে পারেন। তারপরও বেশ কিছু দামী দামী পরীক্ষা নিরিক্ষা করান অন্য কোন খারাপ রোগ আছে কিনা জানার জন্য। পরীক্ষার রিপোর্ট সবসময় ভালো আসে। রুগী এইসব রিপোর্ট প্রেসক্রিপশন ফাইলে সুন্দর করে ক্লিপ দিয়ে সাজিয়ে রাখে। একটা রিপোর্টও হারাতে চান না। তাতে তার কাছে এক গাদা কাগজ জমা হয়। এই কাগজ আবার নতুন ডাক্তারকে দেখার জন্য অনুরোধ করে। না দেখলে অসন্তুষ্ট হয়। এটাও একটা লক্ষন আইবিএস রুগীর। রুগী সামর্থ্য থাকলে ডাক্তার বদলাতে বদলাতে সুদুর ব্যাংকক পর্যন্ত চলে যায়। তারাও রুগীকে কয়েক বার ঘুরায় ফলো আপ দেয়ার জন্য। শেষে এই রুগের রহস্যটা বলে দেয়। লাখ লাখ টাকা ভাংগার পর রুগী চিকিৎসা ক্ষান্ত দিয়ে হতাসার আলাপ শেয়ার করে বন্ধুদের সাথে। বন্ধুরা হতাস না হয়ে হার্বাল মেডিসিনের আশ্রয় নিতে বলে। সেখান থেকে হতাস হয়ে হোমিওপাথি মেডিসিন সেবন করে বহু বছর কাটায় কেউ কেউ। কিন্তু নাস্তা করার পর পেটে কামর দিয়ে লেট্রিনে যাওয়ার অভ্যাসটা তার থেকেই যায়। কারন, আইবিএস এর এখনো কোন কারন জানা যায় নি এবং এর কার্যকরী চিকিৎসাও আবিষ্কার হয় নি। কিন্তু যিনি চিকিৎসা করেন তিনি রুগীকে কিছুটা আশ্বাস দেন যে তার ঔষধ খেয়ে ভালো হবার সম্ভাবনা আছে। রুগী তখন তার পূর্বের চিকিৎসকে দোষারোপ করে এবং নতুন বিশ্বাসে কিছুদিন ঔষধ খেয়ে মানষিক প্রশান্তি লাভ করে।

চিকিৎসকগণ সিম্পটম কমানোর জন্য ফাইবারযুক্ত খাবার খেতে বলেন। তৈলাক্ত খাবার খেতে নিষেধ করেন। পেট ভরে না খেয়ে অল্প অল্প খাবার ঘনঘন খেতে বলেন। কপি ও ব্রুকলি খেতে নিষেধ করেন। রোগের সম্পর্কে ধারনা নিয়ে মনের জোড় বাড়ালে আইবিএস এমনি এমনি কমে যায়।
২৫/৮/২০১৯ খ্রী.

 

গ্যাস্ট্রিক নামে কি কোন রোগ আছে?

গ্যাস্ট্রিক নামে কি কোন রোগ আছে?
(স্বাস্থ্য কথা)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

দেশে কিন্তু অনেক রুগী আছে গাস্ট্রিকের। কিন্তু গ্যাস্ট্রিক নামে এমবিবিএস পাঠ্য বইয়ে কোন রোগ নেই। তাহলে মানুষ গ্যাস্ট্রিক গ্যাস্ট্রিক বলে যে ঔষধ কিনে খাচ্ছেন ওটা কোন রোগ? আজ আমি সেই বিষয়টা একটু পরিষ্কার করতে চাচ্ছি। পাকস্থলীর ইংরেজি হলো স্টোমাক। এই স্টোমাক থেকে হাইড্রোক্লোরিক এসিড নামে একটা তরল এসিড এসিড উৎপন্ন হয় যা খাবার হজম করতে সহায়তা করে। এসিডের কিছু অংশ গ্যাস আকারে স্টোমাকের উপরের দিকে থাকে। কোন কোন সময় অতিরিক্ত গ্যাস খাদ্যনালীতে প্রবেশ করে মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়। আমরা তখন বলি ঢেকুর তোলা। এই গ্যাস যেহেতু এসিড জাতীয় সেহেতু এটা খাধ্যনালী জ্বালিয়ে দেয়। তাই আমরা বলি বুক জ্বলে। এসিডে কিন্তু স্টোমাক জ্বলে না, কারন, স্টোমাকের ভিতরে এসিড নিউট্রাল করার মিউকাসের একটা আবরণ থাকে। কোন কারনে এই আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্টোমাক জ্বলে। তাতে পেটে ব্যথা হয়। অতিরিক্ত গ্যাস যখন স্টোমাক পার হয়ে ডিউডেনামে প্রবেশ করে তখন ডিউডেনাম জ্বলে। ডিউডেনাম ব্যাথা করে নাভির কাছে। রুগী মনে করে গ্যাসের কারনেই এসব হচ্ছে। তাই বলে ‘গ্যাস্ট্রিক’। দোকানে গিয়ে বলে “আমাকে গ্যাসের ঔষধ দেন।” যাদের মাথার বিষ বা শরীরের বিষ আছে তারা বলে “আমাকে বিষের বড়ি দেন।” কাজেই গ্যাস্ট্রিক হলো রুগীগের মুখে বলা রোগের নাম যেটা আসলে গাস্ট্রিক এসিড সংক্রান্ত জটিলতার কারনে হয়। স্টোমাকের আরেক নাম গ্যাস্ট্রোন। কাজেই গ্যাস্ট্রিক মানে হলো স্টোমাকের। যেমন, গ্যাস্ট্রিক আলসার, গাস্ট্রিক ক্যান্সার, গ্যাস্ট্রিক এসিড। অতিরিক্ত গ্যাস্ট্রিক থেকে গ্যাস্ট্রাইটিস, গাস্ট্রিক আলসার, ডিউডেনাইটিস, ডিউডেনাল আলসার, ইওসোফেজাইটিস, ইওসোফেজিয়াল আলসার ইত্যাদি সমস্যা হয়। এইসব ক্ষেত্রে রুগীর পেটে গ্যাস অনুভুত হয়, পেট ব্যাথা ও বুক ব্যথা বা জ্বালাপোড়া করে। এক কথায় তারা বলে গাস্ট্রিক হইছে। স্টোমাক ও ডিউডেনামে হেলিকোব্যাক্টার পাইলো ইনফেকশন হলে প্রদাহ হয়ে আলসার বা ঘা হয় তাতেও ব্যাথা জয়। কোন কোন খাবার খেলে কারো কারো গাস্ট্রিক এসিড বেশী বেশী তৈরি হয়। তাই সেইসব খাবার পরিহার করলে গ্যাস্ট্রিক রোগ কম হয়। গাস্ট্রিক এসিড কমানোর জন্য ডাক্তারগণ এন্টাসিড দেন। গাস্ট্রিক এসিড তৈরি কম করানোর জন্য বেশ কিছু ঔষধ আছে। হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি ইনফেকশন থাকলে ডাক্তারগণ এন্টিবায়োটিক দেন। রক্ত পরীক্ষা করে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি ইনফেকশন আছে কিনা জানা যায়। পেটে ক্যান্সার হলেও গ্যাস্ট্রিকের অনুরূপ সিম্পটম হয়। এন্ডোস্কোপি পরীক্ষা করে স্টোমাকে, ডিওডেনামে ও ইওসোফেগাসে প্রদাহ ও আলসার (খত) অথবা ক্যান্সার আছে কি না তা দেখা যায়।
কাজেই কারো গ্যাস্ট্রিক সিম্পটম দেখা দিলে ফার্মেসী থেকে নিজের ইচ্ছা মতো গাস্ট্রিকের ঔষধ না খেয়ে আসলে কি রোগ হয়েছে তা ডাক্তার দেখায়ে নির্নয় করে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ।
২৪/৮/২০১৯ খ্রী.

 

একটা দুইটা এন্টিবায়োটিক খেলে কি হয়?

একটা দুইটা এন্টিবায়োটিক খেলে কি হয়?
(স্বাস্থ্য কথা)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমাদের শরীরের কিছু কিছু অসুখ আছে যেগুলি জীবাণুর কারনে হয়। বলা হয় ইনফেকশন। সাধারণত ব্যাক্টেরিয়া ও ফাংগাস ইনফেকশনে এন্টিবায়োটিক ও এন্টিফাংগাস ঔষধ প্রয়োগ করে ব্যাকটেরিয়া ও ফাংগাস (ছত্রাক) ধ্বংস করা হয় । এই ঔষধ প্রয়োগ করার নির্দিষ্ট মাত্রা ও সময় আছে যা একজন এমবিবিএস ডাক্তার জানেন। এই ওষুধ যদি সঠিক নিয়মে সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করা না হয় তাহলে এক পর্যায়ে জীবাণু এন্টিবায়োটিকের বা এন্টিফাংগাসের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করে। ফলে এই ওষুধে আর কোনো কাজ হয় না। এই অবস্থাকে বলা হয় ‘এন্টিবায়োটিক /এন্টিফাংগাস রেজিস্টেন্স’। অর্থাৎ যখন ব্যাকটেরিয়ার /ফাংগাস ধ্বংস করার ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিকের/এন্টিফাংগাসের কার্যকারিতা থাকে না।

কেউ কেউ আছেন জ্বর, সর্দি, কাশি ও ডায়রিয়া হলে চট করে ফার্মেসী থেকে একটি বা দুইটি এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট বা ক্যাপ্সুল এনে খেয়ে ফেলেন। প্রকৃতপক্ষে এই চারটি রোগ সারাতে এন্টিবায়োটিকের কোনো প্রয়োজন নেই। এই চারটি কন্ডিশনে এন্টিবায়োটিক খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। এমনো দেখেছি, দাওয়াতে গিয়ে বেশী পরিমানে খেয়ে একটা এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট খেয়ে নিচ্ছেন। কেনো খেলেন জিজ্ঞেস করলে বলেন “যদি পেট খারাপ হয়, তাই ট্যাবলেট খেয়ে নিলাম।” পেট খারাপ হতে পারে মনে করে একটা এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট খেলেন। আবার পেট খারাপ হয়ে গেছে সেই ক্ষেত্রেও দেখেছি ফার্মেসি থেকে একটি বা দুইটি ট্যাবলেট এনে খেলেন। পেট খারাপ ভালো হলে আর খেলেন না। একদিন পর আবার পেট খারাপ হলো, আবার একটা ট্যাবলেট খেলেন। এই সব ক্ষেত্রে জীবাণুরা এই এন্টিবায়োটিকের বিরোদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলে। ভবিষ্যতে এই এই এন্টিবায়োটিক দিয়ে এই জীবাণুকে মারা আর সম্ভব হবে না।

যারা সবসময় ঘরের ভিতর থেকে অভ্যস্ত তাদের যদি অনেকক্ষণ রৌদ্রে দাড়া করে রাখা হয় তারা রৌদ্রে কাবু হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়বে। এমনটি মারাও যেতে পারে। কিন্তু একজন কৃষক সারাদিন রৌদ্রে কাজ করেও অসুস্থ হন না বা মারাও যান না। কারন, তিনি রৌদ্রে কাজ করে করে রৌদ্রের প্রতি প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলেছেন। জীবাণুও তেমনি একটু একটু করে এন্টিবায়োটিক পেয়ে এর বিরোদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলে। তাই, অসুখ বিসুখ হলে একটা দুইটা এন্টিবায়োটিক খাওয়া ঠিক না। খেলে এন্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স হয়। তখন এই ঔষধে আর কাজ করে না। খেতে হলে, বিএমডিসি রেজিস্টার্ড ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ফুল কোর্স এন্টিবায়োটিক খাবেন।
২৪/৮/২০১৯ খ্রী.