পায়খানা পরীক্ষা

পায়খানা পরীক্ষা

(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

পায়খানার সাথে কৃমির ডিম, ডাইরিয়ার ও আমাশয়ের জীবাণু যায় কিনা এবং পরিপাক তন্ত্রে ইনফেকশন হয়ে পাস সেল যায় কি না এগুলো জানাই পায়খানা পরীক্ষার মুল উদ্দেশ্য । খাবার হজম হবার পর খাদ্যের অপ্রয়োজনীয় বস্তুগুলো পরিপাকতন্ত্রের শেষ অংশ রেক্টামে জমা থাকে বেশ কয়েকঘন্টা । এই জমা থাকা খাদ্যের অপ্রয়োজনীয় বস্তুগুলোকে বলা হয় মল। ডাক্তারি ভাষায় বলা হয় স্টুল । রেক্টাম মলে ভরে গেলে পায়খানার বেগ হয় । রেক্টামের পরের অংশকে বলা হয় এনাল ক্যানাল । এর মুখকে বলা হয় এনাস । সুবিধামত সময় ও জায়গা না পাওয়া পর্যন্ত আমরা পায়খানার বেগ হলেও ধরে রাখি । এটা সম্ভব হয় এনাল স্ফিংটার থাকার জন্য । এটা মাংসপেশি দিয়ে তৈরি । এটা যত শক্তিশালী হবে পায়খানা ধরে রাখার ক্ষমতাও তত বেশী হবে । যাদের কোন কারনে এই মাংসপেশী দুর্বল হয়ে যায় তারা পায়খানা ধরে রাখতে পারে না । প্যারালাইসিস তার অন্যতম কারন । পায়খানা নরম বা পিছলা হলেও এনাল স্ফিংটার তা ধরে রাখতে পারে না । ডায়রিয়া ও ডিসেন্ট্রি (আমাশয়) হয়ে এমন হয় । পায়ুপথ (এনাল ওরিফিস বা এনাস), যৌনাংগ ও স্তনকে মানুষ লজ্জা স্থান হিসাবে গণ্য করে । তাই, বিশেষ করে কমপক্ষে এতটুকু জায়গা মানুষ ঢেকে রাখে । এসব লজ্জাস্থানের নাম মানুষ মুখে আনতেও লজ্জাবোধ করে । ডাক্তারের কাছে গিয়ে কোলাশা করে না বললে ডাক্তারও ঠিক মতো বুঝতে পারে না । ডাক্তার ঠিক মতো না বুঝলে চিকিৎসাও ঠিক মতো হয় না । বলতে লজ্জা বোধ করার কারনে এসব অংগের বিভিন্ন নাম দিয়েছে মানুষ । আমাদের গ্রামের কিছু কিছু মুরুব্বিরা পায়ু পথের নাম দিয়েছে মারগ । বলে “রাতে আমার মারগ দিয়ে গুড়া কৃমি বাইরয় ।“ এটাকে পায়খানার রাস্তাও বলে অনেকে । যেমন বলে “আমার পায়খানার রাস্তায় জ্বালাপোড়া করে।” যেঘরে মল ত্যাগ করা হয় তাকে বলা হয় পায়খানা ঘর (লেট্রিন)। কিন্তু মানুষ এটাকে সংক্ষিপ্ত করে বলে পায়খানা । যেমন বলে “আমাদের পায়খানাটা বাড়ির উত্তর পাশে।” আবার মলকেও পায়খানা বলে। যেমন বলে “আমার পায়খানা একদম কষা।” অথবা “আমার পায়খানা পরীক্ষা করাতে হবে।” ডাক্তাররা বুঝে নিতে পারেন রোগী কী বলতে চাচ্ছে । কিন্তু রোগী অনেক সময় বুঝতে পারে না ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মী কি বলতে চাচ্ছে । আমি আমার দুটি বাস্তব ঘটনা দিয়ে ব্যাপারটা বুঝাতে চাচ্ছি ।

 

আমি এমফিল ভর্তি হবার পুর্বে জানুয়ারি ১৯৯২ থেকে জুন ১৯৯৩ পর্যন্ত এই দেড় বছর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের প্রভাষক ছিলাম। তখন নিজের ল্যাবরেটরি ছিল না। একজন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার মালিকানায় চরপাড়ায় একটা প্রাইভেট প্যাথলজি ল্যাবরেটরিতে আমি রিপোর্ট করতাম। পাশের চেম্বারে মেডিসিন বিভাগীয় প্রধান প্রাক্টিস করতেন। তার রেফার্ড করা অধিকাংশ পরীক্ষাই আমি করতাম। তিনি অনেক রোগীর স্টুল (মল) পরীক্ষা করাতেন। আমি বলতাম
– আপনি এত স্টুল পরীক্ষা করান কেন, স্যার?
– তাতে আপনার কি সমস্যা? আপনার ইনকাম তো তাতে বেশী হয়।
– না, মানে, অনেক রোগীর দেখা যাচ্ছে পায়খানা অত্যন্ত কষা। অথচ আপনি তাকে এডভাইস করেছেন পরীক্ষা করার জন্য। তাতে অনেকে এখানে পায়খানা করতে না পেরে মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে চলে যায়। মনে করে যে পায়খানাই পরীক্ষা করাতে পারলাম না, চিকিৎসা দিবেন কিভাবে।
– আপনাকে দিয়ে পায়খানা পরীক্ষা করা আমার উদ্দেশ্য না। রোগী কমপ্লেইন করে তার পায়খানা হয় না । আমার উদ্দেশ্য হলো রোগীর পায়খানা হয় কি না তা পরীক্ষা করা। সন্ধ্যার সময় আপনার ল্যাবে এসে পায়খানা হলে তো রোগী ভালো। তার পায়খানা হয়।

 

ল্যাবের মালিক খুব সচেতন ছিলেন। একটা  রোগীও যাতে পরীক্ষা না করে চলে না যায় সেজন্য সহকারীদেরকে সতর্ক করে দিতেন । সহকারীরা জানতো যে রোগী পায়খানা পরীক্ষা না করে চলে গেলে খবর আছে। সহকারীরাও চালাক কম ছিল না। পায়খানা কষা রোগীদের ব্যাবস্থা দেন পায়ুপথে গ্লিসারিন সাপোজিটরী। পায়খানা করতেই হবে। তাতে আমার কি? আমি কাজ পেলেই হল।

একদিন সন্ধায় এক রুগী বললেন
– লেট্রিনের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
– কেন?
– লেট্রিনের সামনে লাইন পরে গেছে।

 

আমি গিয়ে দেখি লেট্রিনের দরজায় সামনে লেট্রিনের দিকে ঘুরে এক গ্রাম্য মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। আমি বললাম
-দড়জায় দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ভিতরে ঢুকুন।
– পায়খানা তো ধরতাছে না।
– আপনার পায়খানা কেমন?
– আমরা গ্রামে থাকি, গরীব মানুষ। কেমন আর অইব, তিন মুরা হোলার বেড়া, সামনে চটের দরজা।
– তার মানে তিন দিকে শোলার বেড়া, সামনে চট। আমি সেই পায়খানার কথা বলিনি আপনার পেটের পায়খানা কি কষা না নরম?
– এবা, আমার পায়খানা কষা, লোয়ার মত শক্ত।
– আপনি পরে আসুন।
– তাইলে ঐডা কি করাম?

দেখলাম লেট্রিনের দরজার মাঝখানে একটা গ্লিসারিন সাপোজিটরি রাখা আছে।
– এটা কে রাখল?
– আমি রাখছি।
– কেন?
-আপনেগ লোকে কইল “এইডা পায়খানার দরজায় দিয়া কিছুক্ষণ দাড়াইয়া থাকলে পায়খানা ধরব। সেই কখন থাইকা খাড়াই আছি, পায়খানা ধরতাছে না। আমি কি করাম।
– এইটা পায়খানার রাস্তা দিয়া দিতে হবে।
– হেই রাস্তা কোন দিকে?

 

তারপরের ঘটনা ভাল মনে নেই। তাই আর বলতে পারলাম না।

 

যে কোন সেম্পলে অসাভাবিক কিছু থাকলে সহকারীদেরকে আমার নির্দেশ দেয়া ছিল যেন আমাকে দেখানো হয়। সহকারী একদিন একটা স্টুল সেম্পল দেখাল। দেখলাম ওতে কোন স্টুল নেই। আছে শুধু টাটকা রক্ত। আমি রোগীকে ডেকে জিগালাম
-আপনার পায়খানার সাথে সব সময় রক্ত আসে?
– না, কখনো আসে না।
– এতো দেখছি টাটকা রক্ত।
– রক্ত আসবে না মানে, আপনাদের দেয়া কাঠি মশৃন না। ওটা পায়খানার রাস্তায় ঢুকাতে আমার অনেক কস্ট হয়েছে।
– আপনি কি করেন?
– কলেজে পড়ি।
-কাঠি পায়খনার রাস্তায় ঢুকায়েছেন কেন?
-আপনার লোক বলল “এই কাঠি দিয়ে একটু পায়খানা নিয়ে এই পটে নিয়ে আসুন”। অনেক গুঁতাগুঁতি করেও পায়খানা আনতে পারি নি, এসেছে শুধুই রক্ত।

-আপনাকে বলা হয়েছিল প্যানে পায়খানা করার পর সেখান থেকে এই কাঠির আগা দিয়ে এক দানা পরিমাণ সেম্পল নিতে । আপনি পায়ু পথে খোচাখুছি করলে কি পায়খানা আসবে?

-অ বুঝছি ।
১৮/৬/২০১৭ খ্রি.

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (14 votes, average: 4.50 out of 5)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ থেকে বই কেনার জন্য ক্লিক করুন

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

রোগাক্রান্ত হলে করনীয়

রোগাক্রান্ত হলে করনীয়

(স্বাস্থ্য কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমরা রোগে আক্রান্ত হলে আমাদের শরীরে নানা রকম সমস্যা ও কস্ট দেখা দেয়। এইগুলোকে বলা হয় উপসর্গ। একেক রোগের একেক রকম উপসর্গ। রোগ হলে শরীরের ভিতর ক্ষতি হতে থাকে। এসব ক্ষতির কারনে আমাদের শরীরে জ্বর, ব্যাথা, কাশি ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়। কষ্ট হয় বলে আমরা রোগের চিকিৎসা করি। কষ্ট না হলে আমরা চিকিৎসা করতাম না। তার দরূন রোগে আমাদের শরীরের সমুহ ক্ষতি করে ফেলত। তাই উপসর্গগুলো  আমাদের জন্য উপকারী। যেমন শরীরে আগুন লাগলে গরম লাগে। তাই আমরা আগুন থেকে সরে যাই। গরম না লাগলে আমরা পুড়ে যেতাম কিন্তু জানতে পারতাম না। রোগের চিকিৎসা করার দায়িত্ব ডাক্তারের। তাই রোগ হলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে।

রোগ হয়ার সাথে সাথে সব লক্ষণ এক সাথে দেখা দেয় না। তাই সাথে সাথেই ডাক্তারের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিলম্ব করা যাবে না। যেমন, বুকের বাম পাশে ব্যাথা, তলাপেটের ডান পাশে ব্যাথা, তীব্র মাথা ব্যাথা ইত্যাদি।

প্রথমেই আপনাকে যেতে হবে আপনার নিকটস্থ রেজিস্টার্ড ডাক্তারের নিকট। তিনি আপনার সমস্যার কথাগুলো শুনে শারীরিক পরীক্ষা করে প্রাথমিক ভাবে একটা রোগ নির্ধারণ করে প্রাথমিক চিকিৎসা দিবেন। প্যাথলজিক্যাল ও রেডিওলজিক্যাল কিছু পরীক্ষা করাবেন সুক্ষ্মভাবে রোগ নির্ণয় করার জন্য। প্রয়োজনে তিনি ঐ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে পাঠাবেন। তবে, আপনি যদি কোন কারনে সরাসরি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে চান তবে আপনাকে সঠিক বিশেষজ্ঞ নির্বাচন করতে হবে। না হলে টাকা ও সময় দুইটিরই অপচয় হবে।

সেক্ষেত্রে আমার পরামর্শ হল রোগী যদি ১৫ বছর বয়সের কম হয় তবে শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ দেখাবেন। তাদের ডিগ্রি থাকবে ডিসিএইচ, এফসিপিএস(শিশু) বা এমডি(শিশু)। অপারেশন এর ক্ষেত্রে এফসিপিএস(শিশু সার্জারি) বা এমএস (শিশু সার্জারি)।

বড়দের ক্ষেত্রে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগনের ডিগ্রি দেখবেন এমসিপিএস (মেডিসিন), এফসিপিএস(মেডিসিন) অথবা এমডি(মেডিসিন)।

স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞগনের ডিগ্রি হবে ডিজিও, এফসিপিএস (গাইনি অবস), এমএস(গাইনি অবস)। এখন মেডিসিন ও সার্জারির ব্রাঞ্চ গুলোতেও অনুরূপ ডিগ্রী আছে। বুঝে শুনে এসব বিভাগের ডাক্তারও দেখাতে পারেন।

সঠিক সময়ে, সঠিক ডিগ্রিধারী ডাক্তার দেখাতে পারলে এবং সঠিক প্যাথলজি ও রেডিওলোজী বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করাতে পারলে আপনার সময় ও খরচ কম লাগবে। কষ্টও কম লাগবে।

৫/৬/২০১৭ খ্রি.

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 3.00 out of 5)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ থেকে বই কেনার জন্য ক্লিক করুন

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

 

পছন্দের প্যাথলজি ল্যাবরেটরি

পছন্দের প্যাথলজি ল্যাবরেটরি

(স্বাস্থ্য কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

মনে করুন,  আপনি একজন আপনার পছন্দের ডাক্তার দেখালেন । ডাক্তার আপনার রোগের লক্ষণ শুনে শরীর পরীক্ষা করলেন । তারপর একটা প্যাথলজিকেল পরীক্ষার রিকুইজিশন ফরম ধরিয়ে দিলেন যেখানে রেফার্ড করা আছে একটা নির্দিষ্ট ল্যাবরেটরির নাম। আপনি আমাকে প্রশ্ন করতে পারেন

– কেন আমার ডাক্তার একটা  নির্দিষ্ট প্যাথলজি ল্যাবে আমার পরীক্ষাগুলো করাতে দিলেন?
উত্তর দেয়ার আগে আমি আপনাকে প্রশ্ন করি

– কেন আপনি এত ডাক্তার থাকতে একজন নির্দিষ্ট ডাক্তার পছন্দ করলেন?
ডাক্তারের জ্ঞানের পরিমাণ, ডিগ্রীর মান ও সংখ্যা, অভিজ্ঞতা, ভিজিটের পরিমান ইত্যাদি বিবেচনা করে আপনি ডাক্তার নির্বাচন করেছেন।
তদ্রুপ, আপনার ডাক্তারও প্যাথলজি ল্যাবের প্যাথলজি বিশেষজ্ঞের জ্ঞানের পরিমান, ডিগ্রীর মান ও সংখ্যা, অভিজ্ঞতা, চার্জের পরিমান ইত্যাদি বিবেচনা করে ল্যাব নির্বাচন করে পরীক্ষার জন্য রেফার্ড করেছেন । কেউ কেউ এর মধ্যে কমিশনের গন্ধ খোঁজেন।

আপনার অধিকার আছে আপনার পছন্দের ল্যাব থেকে পরীক্ষাগুলো করিয়ে আনতে। মনে রাখবেন, ডাক্তার দেখিয়েছেন বিশেষজ্ঞ দেখে অথচ প্যাথলজি পরীক্ষাগুলো করিয়েছেন সাধারন ল্যাবে। সেক্ষেত্রে আপনার চিকিৎসার কম্বিনেশন ভাল হলো না। চিকিৎসাও বিশেষজ্ঞ মানের হবে না। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখালে বিশেষজ্ঞ প্যাথলজিস্ট দিয়েই পরীক্ষা করাতে হয় ।

যেমন, পান্তাভাত মরিচ পিয়াজ দিয়ে খেতে হয় । পোলাও খেলে মুর্গির রোষ্ট নিতে হয় ।

৩০/৫/২০১৭ খ্রি.

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ থেকে বই কেনার জন্য ক্লিক করুন

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

হার্ট এটাক কার হবে?

হার্ট এটাক কার হবে?

(স্বাস্থ্য কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

হটাৎ বুকের হ্রিদপিন্ডের রক্তনালীতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে সাধারণত হার্ট এটাক বলা হয়। ডাক্তারগণ এটাকে বলেন মায়োকার্ডিয়াল ইনফারকশন। অনেক রোগীই হার্ট এটাকের অল্প সময়ে মারা যান। অনুরূপভাবে মস্তিস্কে (ব্রেইনে) রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে বলা হয় স্ট্রোক। কেউ কেউ ভুল করে হার্ট এটাককে বলেন হার্ট স্ট্রোক।

 

হার্ট এটাক ও স্ট্রোক কার হবে তা সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউ জানে না। তবে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে এই রোগগুলোর ঝুকিপুর্ণ বৈশিষ্ট্য আবিস্কার করেছেন।

 

কিছু কিছু ঝুকি অপরিবর্তনযোগ্য। কিছু কিছু ঝুকি পরিবর্তনযোগ্য।

অপরিবর্তনযোগ্য ঝুকির মধ্যে আছে বেশী বয়স, পুরুষমানুষ ও বংশগত রোগ।

পরিবর্তনযোগ্য ঝুকির মধ্যে আছে ডায়াবেটিস মেলাইটাস, উচ্চ রক্তচাপ, ধুম পান ও হাপারলিপিডিমিয়া (রক্তে তৈলাক্ত পদার্থ বেড়ে যাওয়া)।

উপরের বৈশিষ্ট্যগুলো বেশী ঝুকিপুর্ন।

কম ঝুকিপুর্ন বৈশিষ্ট্যগুলি হলঃ শারীরিক পরিশ্রম কম করা, বেশী বেশী হাহুতাস করা, মুটিয়ে যাওয়া, খাদ্যে শর্করা বেশী খাওয়া, রক্তে ইউরিক এসিড লেভেল বেশী থাকা এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খাওয়া।

 

অভ্যাস পরিবর্তন করে ও চিকিৎসার মাধ্যমে আমরা অনেক ঝুকিই কমাতে পারি এবং হার্ট এটাক ও স্ট্রোক থেকে বাচতে পারি।

 

৪/৬/২০১৭ খ্রি.

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (3 votes, average: 4.33 out of 5)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ থেকে বই কেনার জন্য ক্লিক করুন

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

বুলবুল হায়দারের সমাজ উন্নয়ন

বুলবুল হায়দারের সমাজ উন্নয়ন

(কল্প কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

বুলবুল ভাইকে যখন আমি প্রথম দেখি তখন আমি ক্লাস থ্রিতে পড়তাম। গাছের শিকরে বসে গাছের সাথে হেলান দিয়ে পড়ার অভ্যাস ছিলো আমার। বাংলা পাঠ্যবই থেকে সত্যেন্দ্র নাথ দত্তের কবিতা পরছিলাম ছন্দে ছন্দে শরীর দুলিয়ে। পড়ছিলাম

“ছিপ খান তিন দার

তিন জন মাল্লা

চৌপর দিন ভর

দেয় দৌড় পাল্লা।।”

মাথা উচু করে চেয়ে দেখি একজন শুকনো চেহারার লম্বা লোক দাঁড়িয়ে আমার পড়া শুনছেন। আমি লজ্জা পেয়ে চুপ করে গেলাম। তিনি বললেন “খুব ভালোই তো আবৃতি করছিলে। আবার পড়।” আমি লজ্জায় কথা বলতে পারছিলাম না। তিনি আবার বললেন “তোমার কবিতা আবৃত্তি আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে। তুমি আবার শুনাও।” কিছুতেই শুনাচ্ছিলাম না। বারবার অনুরোধ করাতে আমি আবার কবিতা আবৃত্তি করলাম। কিন্তু আগের মতো হলো না। তিনি বললেন “আগের মতো শরীর দুলিয়ে পড়। কিন্তু আমি আর আগের মতো শরীর দুলিয়ে পড়তে পারলাম না। তিনি বললেন “আমার নাম বুলবুল হায়দার। তুমি আমাকে চেনো?” আমি মাথা নাড়িয়ে বুঝালাম যে চিনি না। তিনি বললেন

– আমার বাড়ি জিতাশ্বরি। মসজিদের দক্ষিণের বাড়িটাই আমাদের। আমার বাবার আজান হয়তো তুমি শুনেছ। খুব জোড়ে শব্দ করে সুর করে আজান দেন মসজিদে। তুমি শুননি?

– একটা আজান পশ্চিম দিক থেকে শুনা যায়। তবে ভোরে ফজরের আজান এবং রাতের ঈশার আজান শুনা যায়। অন্যসময় শুনি না। খুব সুন্দর সেই আজানের আওয়াজ।

– আমার বাবা নামাজের ৫ ওয়াক্তই আজান দেন। দিনের বেলায় অন্যান্য শব্দের জন্য হয়তো তুমি দিনের আজান শুনতে পাওনা।

– তা হতে পারে।

– তুমি কোন ক্লাসে পড়?

– আমি ক্লাস থ্রিতে পড়ি।

– কোন স্কুলে যাও?

– কাইলা স্কুলে।

– ওভাবে বলে না। বলতে হয় ‘ঘোনারচালা ফ্রি প্রাইমারি স্কুল।’

– তোমাদের হেড স্যারের নাম কি?

– খোরশেদ স্যার।

– অভাবে বলতে নেই। বলতে হয় “জনাব খোরশেদ আলম।”

– আপনে কোন ক্লাসে পড়ুন?

– আমি এবার এসএসসি পরীক্ষা দেব।

– মানে মেট্রিক পরীক্ষা?

– হ্যা, মেট্রিক পরীক্ষাও বলে।

– আমাগ ভুলু ভাই গতবার সেকেন্ড ডিভিশনে মেট্রিক পাশ করছে । আপনের নাম কি ভাই?

– আমার নাম বুলবুল হায়দার। বুলবুল বলেই ডাকে।

এভাবে কথা বলে পরিচয় হয় বুলবুল ভাইর সাথে। আরেকদিন আমি পড়ছিলাম গাছের ডালে বসে। গাছের বড় ডালটার দু’শে দু’পা ঝুলিয়ে ঘোড়ায় চড়ে বসার মতো করে বসে গাছের কান্ডে হেলান দিয়ে পড়ছিলাম নিঃশব্দে। আমি বেশী সময়ই নিঃশব্দে পড়তাম। গাছে বসে পাখির ডাক শুনতাম। পাখি কিন্তু সুরে সুরে ডাকে। একেক পাখির সুর একেক রকম। কোন কোন পাখি এমন ভাবে ডাকে যেনো মনে হয় কথা বলছে। বুলবুল ভাই পশ্চিম দিক থেকে এলেন। গাছের নিচে এসে দাড়ালেন। আগেরবার আমি শিকরে বসে পড়ছিলাম সেখানে কিছুক্ষণ চোখ রাখলেন। আমি উপর থেকে বলে উঠলাম “ভাই কি আমাকে খুজছেন?” বুলবুল ভাই উপর দিকে তাকিয়ে আমাকে দেখতে পেয়ে বললেন “তুমি গাছে বসে পড়ছ?”

– আমার গাছে বসে পড়তে ভালো লাগে। পড়তে পড়তে পাখির গান শুনি।

– আজ স্কুলে গিয়েছিলে?

– গিয়েছিলাম।

– ঠিক আছে, পড়।

বুলবুল ভাই পুর্ব দিকে চলে গেলেন। এরপরও বুলবুল ভাইর সাথে আমার অনেকবার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। আমার পড়াশোনার খোজখবর নিতেন সবসময়। বুলবুল ভাই সবসময় সাদা পাঞ্জাবী ও সাদা পাজামা পরতেন। সাথে স্পঞ্জের সেন্ডেল পা দিতেন। হাটার সময় সেন্ডেলের ধুলা লেগে পাজামার নিচের অংশ ময়লা হয়ে থাকতো। পাহাড়িয়া লালমাটির ধুলায় ঘাম লেগে লালচে দাগ হতো।

১৯৭১ সনের স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় বুলবুল ভাইকে দেখেছি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী করতে। প্রত্যেক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর হাতে একটা করে বেত থাকতো। তার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধার খাবার যোগান দিতো। এলাকার সকল অন্যায়ের বিচার করতো। কেউ যাতে না খেয়ে না থাকেন তার দেখাশোনা এই বাহিনী করতো। ধনীদের থেকে শস্য নিয়ে গরীবদের মাঝে বন্টন করে দিতেন বুলবুল ভাই।

১৯৭৪ সনের এক বিকেলে বুলবুল ভাই আমাদের এলাকার সব ছাত্রদের ডেকে জিতাশ্বরির এক বাচ্রাক্ষেতে বসে মিটিং করলেন। সে বছর দেশে খুব আকাল পড়েছিল। সবাই অভাবে পড়ে যায়। অনেকে কষ্ট করে ভাত হয়তো যোগার করতে পারতো কিন্তু তরকারি যোগার করতে পারতো না। রান্না করে গরম ভাতে পানি দিয়ে পান্তাভাত বানিয়ে লবন মরিচ দিয়ে খেতো। সেই লবনও বাজারে পাওয়া যেতো না। পাওয়া গেলেও দাম ছিল খুব চড়া। দাম বাড়তে বাড়তে একবার ৬০ টাকা শের (প্রায় এক কেজি) হয়েছিল লবনের দাম। তখনকার এক টাকা এখনকার ১৫-২০ টাকার সমান। এমন অভাবের সময় কেউ পরনের নতুন কাপড় কিনতে পারতো না। আমরা ছিলাম গ্রামের ছাত্র। প্রায় সবাই লুঙ্গি পড়তাম। জহিরুল ভাইকে দেখেছি ফুল প্যান্ট পরতে। বুলবুল ভাইর ডাকা সেই মিটিংয়ে ছত্তর ভাই এসেছিলেন এমন একটা ছেড়া লুঙ্গি পরে যে সামনে পেছনে ডানে বামে সব দিকেই ফুটা ছিল। ফুটা দিয়ে তার থোরার ফর্সা চামড়া দেখা যাচ্ছিলো। সবচেয়ে বেকায়দায় ফেলেছিলো তার পেছনের ছিদ্রটা। বুলবুল ভাই ছত্তর ভাইকে বললেন লুঙ্গিটা ঠিক করে পরতে। ছত্তর ভাই লুঙ্গি যেদিকেই ঘুরান তার পিছনে একটা ছিদ্র পড়ে। বুলবুল ভাই বললেন লুঙ্গিটাকে উল্টিয়ে দুই ভাঁজ করে পড়তে। ছত্তর ভাই লুঙ্গি ভাঁজ পরলেন। এবার লুঙ্গির দুই পারই উপর দিকে পরা হলো। ছেড়া ছিদ্র ঢাকা পড়লো। কিন্তু লুঙ্গি শর্ট হয়ে হাটু পর্যন্ত উঠে এলো। ছত্তর ভাই মাঠে লেটা দিয়ে বসে পরলেন। মিটিং শুরু হলো। মিটিংয়ের বিষয়বস্তু ছিল পাড়ায় ছাত্রদের নিয়ে সমিতি করা। ছাত্রদের কল্যাণ করা ও সমিতির দ্বারা এলাকার উন্নয়ন করাই সেই সমিতির উদ্দেশ্য ছিল। সবাই সমিতি করার পক্ষে কথা বললো। কিন্তু ছত্তর ভাই রাজি হলেন না। কেনো হবেন না তার কোন ব্যখ্যা দিলেন না। বুলবুল ভাই সমিতির নাম প্রস্তাব করলেন “জোনাকি ছাত্র সংঘ।” মুকুল ভাই জিজ্ঞেস করলেন “ভাই, জোনাকি ছাত্র সংঘ নাম দেয়ার ব্যখ্যা কি?” বুলবুল ভাই ব্যাখ্যা দিলেন “জোনাকি পোকা অন্ধকারে ঝোপঝাড়ে থাকে। রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে জোনাকি পোকা নিজের শরীর থেকে আলো জ্বালায়। অনেকগুলো জোনাকি যখন একসাথে আলো জ্বালায় তখন ঝোপঝাড়ের অন্ধকার দুর হয়ে আলোকিত হয়। আমাদের এই পাহাড়ি এলাকা অনুন্নত। অন্ধকারে পড়ে আছে। আমরা ছাত্ররা এই অন্ধকারের একেকটা জোনাকি পোকা। আমরা একসাথে শিক্ষার আলো জ্বালবো। আমাদের এলাকায় শিক্ষায় আলোকিত হবে। ছাত্রসংঘ করে আমরা সেই আলোর পথে এগিয়ে যাবো।” সবাই রাজি বুলবুল ভাইর প্রস্তাবে। একমাত্র ছত্তর ভাই রাজি হলেন না। সমিতির কর্মকাণ্ড দেখে পরের বছর ছত্তর ভাই সমিতিতে ভর্তি হন। সবাই সমিতিতে কিছু কিছু চাঁদা দিতো। সমিতির কর্মকান্ড দেখে খুশী হয়ে এলাকার মুরুব্বিরা বেশী পরিমানে চাঁদা দেন। তাতে বুলবুল ভাইর হাত শক্তিশালী হয়। বুলবুল ভাই সমিতির মাধ্যমে গ্রামে একটা পাঠাগার গড়ে তুলেন। প্রচুর বইয়ের কালেকশন আছে সে পাঠাগারে। এলাকার ছাত্র যুবা মুরুব্বি সবাই সে পাঠাগারে বসে বই পড়ে। বইয়ের মাধ্যমে এলাকা জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে পড়ে। সমিতির মাধ্যমে বুলবুল ভাই প্রতি বছর দু’বার আনন্দ উৎসবের আয়োজন করেন। সেই উৎসবে এলাকার ছোট বড় সবাই আনন্দে মেতে উঠে। সারাদিন দেশীয় খেলাধুলা চলে। সন্ধায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। চলে গান বাজনা ও সাহিত্যের আসর। পুরুস্কার বিতরনি হয়। মেধাবী ও গুণিজনদেরকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা হয় সবার সামনে। সব শিশু স্কুলে গেলো কি না সেটা বুলবুল ভাই দেখভাল করেন।

 

১৯৭৫ সনে বুলবুল ভাই বিয়ে করেন। তার শশুর বাড়ি গোবর চাকা গ্রামে। রোকন বিএসসি স্যার তার চাচাশ্বশুর। বুলবুল ভাই নতুন নতুন শশুরবাড়ি গিয়েছিলেন। রাতে শশুরবাড়ি নতুন বউকে নিয়ে ঘুমিয়েছিলেন। রাত দুইটার পর পুলিশ তার ঘুম ভাঙ্গিয়ে এরেস্ট করে নিয়ে যায়। ধরতে এসেছিলো রোকন বিএসসি স্যারকে। তিনি ছিলেন গণ বাহিনীর সদস্য। বিএসসি স্যার ছিলেন খুব চালাক লোক। তিনি রাতে নিজ বাড়িতে থাকতেন না। পুলিশ রোকন স্যারকে না পেয়ে বুলবুল ভাইকে ধরে নিয়ে যান। বুলবুল ভাই পুলিশকে বুঝাতে চান যে তিনি গণবাহিনীর সদস্য না, তিনি শশুরবাড়ি এসেছেন। কিন্তু পুলিশ সন্দেহ করেন যে বুলবুল ভাই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এই বাড়িতে অবস্থান করছেন। এভাবে আরও ৩০/৪০ জন লোককে রাতের বেলায় ধরে এনে বর্গা বাজারে এনে জড়ো করে। কাইলার মহশিন ভাই যাচ্ছিলেন টাঙ্গাইলের উদ্দেশ্যে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে। বর্গার গুদারা (খেয়া) পার হবার সময় পুলিশ তাকেও গণবাহিনীর সদস্য বলে এরেস্ট করলো। দুইজন ভালো মানুষ ধরা পরলো গণবাহিনীর সদস্য সন্দেহ করে। শোনা যায় কিছু লোক পুলিশকে গোপনে টাকা দিয়ে ছাড় পেয়ে যায়। বুলবুল ভাইর মামাশ্বশুর ছিলেন একজন আর্মির লোক। সেসয় আর্মি শাসিত সরকার ছিলো। তিনি ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছিলেন। আর্মিতে চাকরি করা অনেকেই বাড়ি এসে একটা বেত হাতে নিয়ে ঘুরাফেরা করতেন। বেত হাতে থাকা লোককে গ্রামের মানুষ ভয় পেতো। বুলবুল ভাইকে ছাড়িয়ে রাখার জন্য মামাশ্বশুরকে অনুরোধ করলে তিনি বর্গার পুলিশ ক্যাম্পে গিয়ে পরিচয় দিয়ে বেত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলেন “বুলবুল অত্যন্ত ভালো ছেলে। তাকে কেনো ধরে এনেছেন।” উত্তরে পুলিশ বলেন “আপনি আর্মির লোক। আমি পুলিশের লোক। এলাকার ক্রিমিনাল কেইস আপনার চেয়ে আমি বেশী বুঝি।” পুলিশ ক্ষেপে গিয়ে বুলবুল ভাইকে অন্যান্য গণবাহিনীর সদস্যের সাথে টাঙ্গাইল জেল হাজতে চালান দিয়ে দেন। সাথে অগণবাহিনী মহসিন ভাইও জেলে ঢোকেন। এভাবে জেলে ২৯ দিন কাটে গণবাহিনীর সদস্যদের সাথে বুলবুল ভাই ও মহসিন ভাইর। আমি ঘটনা শুনে খুবই ভেঙ্গে পড়েছিলাম। শুনেছি একই জেলে এলাকার বাহিনীর মুক্তি বাহিনীর একজন কমান্ডারও ছিলেন। তাকে জেল কর্তৃপক্ষ সমিহ করে চলতো। তার নির্দেশে বুলবুল ভাই ও মহসিন ভাই বিশেষ সুবিধা পান খাওয়া দাওয়া ও কম্বল পাওয়ার ব্যাপারে।

 

আমি তখন ছোট ছিলাম। ১৯৭৪ সনে ক্লাস এইটে পড়তাম। একদিকে দেশে অভাব অনটন লেগে আছে অন্যদিকে আইন শৃঙ্খলার ব্যপক অবনতি ঘটছে। খুনাখুনির ঘটনা ঘন ঘন ঘটছে। বিচার আচার তেমন হচ্ছে না। গণবাহিনী নামে একটা আন্ডারগ্রাউন্ড বাহিনী গঠিত হয়েছিল। তাদের সদস্যরা বেশী ভাগ নাইন টেন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্র ছিল। কেউ কেউ বলতো সর্ব হারা পার্টি। তারা মানুষ মারতো দিনে দুপুরে গুলি করে। কি ভয়াবহ অবস্থা দিয়ে দিন যাচ্ছিল। এলাকার প্রভাবশালী কয়েকজন লোক তাদের দ্বারা খুন হয়। ১৯৭৫ সনে সরকার এদেরকে কঠোর হস্তে দমন করে। তারই ধারাবাহিকতায় বুলবুল ভাই ভুল ক্রমে জেল খেটেছিলেন। আমি বড় হয়ে একজন গণবাহিনীর প্রক্তন সদস্যকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তারা এমন করছিলেন কেন। উত্তরে তিনি বললেন “আমাদের উদ্দেশ্য ভালো ছিল। আমরা দেশে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েম করতে চেয়েছিলাম। সেটা করতে গেলে শ্রেণীশত্রু খতম করতে হবে। সমাজে গুটিকয়েক সুবিধাবাদি শাসনকারী ও শোসনকারী লোক আছে তাদের খতম করতে হবে। সেজন্য আমরা সমাজতান্ত্রিক দেশ থেকে অস্ত্রও সংগ্রহ করেছিলাম। কিন্তু আমাদের বাহিনীর তরুন ও যুবকরা এই অস্ত্রের অপব্যবহার করতে থাকে। তাতে আমাদের বাহিনী সফল হতে পারেনি।

 

জেল থেকে বেরিয়ে এসে বুলবুল ভাই আবার সামাজিক কাজে জড়িয়ে পরেন। ইউনিয়ন কাউন্সিলের মেম্বার পদে দাড়া করিয়ে দেয় গ্রামের সবাই। বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে বুলবুল ভাই মেম্বার হন। আনতে থাকেন সরকারি অনুদান গ্রামের উন্নয়নের জন্য। এর আগেও মেম্বাররা সরকারি অনুদান আনতেন। সেই অনুদান দিয়ে সড়ক ভাঙ্গায় মাটি ফেলতেন। তাতে ছয়মাস সড়ক দিয়ে গরুর গাড়ি ও সাইকেল চালিয়ে যাতায়াত করা যেতো। জ্যৈষ্ঠ -আষাড় মাসে পাহাড়ি ঢলের পানি বাইদ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সড়কে বাধা পেয়ে মেরামত করা স্থান ভেঙ্গে কল কলি পানি যেতো। স্রোতের পানিতে জালি, খুইয়া ও ছিপজাল ফেলে পড়ার মানুষ মাছ ধরতো। সড়কে যাতায়াত বন্ধ হয়ে যেতো। মেম্বার সাব আবার অনুদান আনতেন বাঁশের সাঁকো তৈরি করার। তাতে সাঁকো দিয়ে মানুষ পারাপার করতে পারতো। গাড়ি পার করতে পারতো না। বছরে দুইবার সরকারি অনুদানের অপচয় হতো। বুলবুল ভাই মেম্বার হয়ে এই অপচয় বন্ধ করেন। তিনি মাটি দিয়ে বাইদের সড়ক ভাঙ্গা বন্ধ না করে একবারে কালভার্ট ও সিমেন্টের ব্রিজ করে ফেললেন। তিনি আমাদের ওয়ার্ডের সব সড়ক ভাঙ্গায় ব্রিজ ও কালভার্ট পূর্ণ করে দিলেন। পরের বার তিনি চেয়ারম্যান পদে ইলেকশন করে বিপুল ভোটে জয়ী হলেন। একবার না পরপর তিন বার ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হলেন। রাস্তা ঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ব্যপক উন্নয়ন করলেন।

 

এলাকার পাশকরা ডাক্তারদের দিয়ে ঘন ঘন ফ্রি চিকিৎসা ক্যাম্প করে স্বাস্থ্য সেক্টরে ব্যপক উন্নয়ন করলেন। সরকারি অনুদান এনে ইউনিয়নের প্রতিটা রাস্তা পাকা করেছেন। এই ইউনিয়নের কোন রাস্তা এখন কাঁচা নেই। সব পাকা। শুধু পাকা না, একদম তেলতেলে মসৃণ রাস্তা। সব রাস্তার দু’পাশে গাছ লাগিয়েছেন সারিবদ্ধভাবে। একেক রাস্তায় একেক রকম গাছ। কোন রাস্তার দুপাশে শুধু দেবদারু গাছ, কোন রাস্তার দু’পাশে কৃ্শ্মচুরা গাছ, কোন রাস্তার দু’পাশে শুধু ছেচড়া গাছ, কোন রাস্তার দু’পাশে শুধু তাল গাছ, কোনটিতে শুধু খেজুর গাছ, এমন রাস্তা। কিন্তু কোন একটা রাস্তার গাছের সাথে অন্য কোন রাস্তার গাছের মিল নেই। পূরা ইউনিয়নটাকে বুলবুল ভাই তার মনের মতো করে সাজিয়েছেন। ইউনিয়নের পশ্চিম অংশে নিচু বা ভর অঞ্চল। বর্ষাকালে পলাশতলীর পাদদেশে প্রচুর পানি থাকে। দেখে মনে হয় যেন সমুদ্র সৈকত। তিনি পলাশতলীকে এমন ভাবে সাজিয়েছেন যে প্রতিদিন শত শত পর্যটক বেড়াতে যায় পলাশতলীতে। দিঘীচালার বক্তার খা’র দিঘীর কাছে একটা সুন্দর মনোমুগ্ধকর রেসোর্ট বানিয়েছেন ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য। পুরা ইউনিয়নটাকে বুলবুল ভাইর স্বপ্নের রাজ্য বানিয়ে ফেলেছেন। মইলানি পুকুরটাতে শুধু পদ্মফুল লাগিয়েছেন। যেনো বুলবুল ভাইর স্বপ্নপুড়ী। আমি চাচ্ছিলাম যে অবসরে গিয়ে আমি বুলবুল ভাইকে সময় দেব। তাই, প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছিলাম। গত শীতে বুলবুল ভাইকে নিয়ে গ্রামের বাজারে বসেছিলাম জ্যোস্না রাতে। প্রায় তিন শত লোক জমায়েত হয়েছিল সেই মজলিসে। বুলবুল ভাইয়ের উত্থানের সেই সব গল্প আমি শুনালাম। বুলবুল ভাই মন্তব্য করলেন “তোমার দেখি অনেক কিছুই মনে আছে।” এপ্রিলে আবার যেতে চেয়েছিলাম গ্রামে, স্বপ্নের গ্রামে। কিন্তু করোনা ভাইরাস এসে সব পরিকল্পনা লন্ড ভন্ড করে দিয়েছে।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে সারাদেশ লকডাউন করে দেয়া হলে এলাকার কিছু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে। ফেইসবুকে দেখলাম বুলবুল ভাই ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে অনুদান বিতরন করছেন। সেই ফান্ডে আমিও বিকাশ করে কিছু টাকা পাঠালাম। বুলবুল ভাইর ফেইসবুক ঘেটে আমার মনে হলো তিনি বেশী কিছু লিখতে পারেন না। শুধু কিছু ছবি পোস্ট করেন। কারো পোস্ট পড়ে ইংরেজিতে শুধু কমেন্ট করেন “nice” অথবা “thanks”। আমি মোবাইল করে বললাম

– ভাই, আপনি ফেইসবুকে তেমন কিছু লেখেন না কেন?

– আসলে আমি তেমন কিছু লেখতে পারি না মোবাইল দিয়ে। তুমি তো দেখি বিরাট বিরাট একেকটা গল্প লেখ। কিভাবে লেখো?

– ভাই, আপনে মনে হয় মোবাইলে বাংলা টাইপ করতে পারেন না। বাংলা টাইপ করতে পারলে অনেক কিছু লেখতে পারবেন। বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা। মায়ের ভাষায় লেখা শিখুন।

– ইংরেজির চেয়ে বাংলাই কঠিন।

– কঠিন না। আমি আপনাকে শিখিয়ে দিচ্ছি। দেখবেন এখই লিখতে পারবেন।

আমি বাংলা লেখার সব কিছুই মোবাইল কলের মাধ্যমেই শিখিয়ে দিলাম। ঈদের পর থেকে প্রতিদিন দুই তিন জন করে ডাক্তার মারা যাচ্ছে করোনায় আক্রান্ত হয়ে । ফেইসবুকে নিউজ ফিডে মৃত্যু সংবাদ আসছে। আমি সব নিউজ আমার টাইম লাইনে শেয়ার করছি করোনায় শহীদ ডাক্তারদের ছবি সহ। এখন এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে ফেইসবুকে কারো ছবি দেখলেই “ইন্না-লিল্লাহ ” লিখা শুরু করে দেয় কেউ কেউ। গতকাল পর্যন্ত প্রায় ৪৩ জন ডাক্তারের করোনা হয়ে শহীদ জবার খবর জানা গেছে। এরমধ্যে হঠাৎ খবর এলো আমার স্বপ্নের বুলবুল ভাই আর নেই। মনে পড়লো সেই গাছটার কথা। সেই কাছটা এখনো সেখানেই আছে। আমিও আছি। নেই সেই বুলবুল ভাই। একজন ভালো মানুষ চলে গেলেন এই অসময়ে।

১৯/৬/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

[গল্পটা কাল্পনিক]

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ থেকে বই কেনার জন্য ক্লিক করুন

এখানে

#সাদেকুল #গল্প

একই সাথে দুই হাতের রক্ত পরীক্ষা

একই সাথে দুই হাতের রক্ত পরীক্ষা

(স্বাস্থ্য কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 একদিন সন্ধায় আমার কাছে একটা মোবাইল এলো। আমি তখন প্রাইভেট ল্যাবে কাজ করছিলাম। পরিচয় দিলেন। একজন হাইলি এডুকেটেড উচ্চপদস্থ কর্ম কর্তা।
– আপনি আজ আমার রক্তের লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করে রিপোর্ট দিয়েছেন। একই রক্ত দিয়ে অন্য একটা ল্যাবে এই পরীক্ষা করিয়েছি। দু’টার রেজাল্ট দ’রকম । আপনাদের রিপোর্ট এমন হচ্ছে কেন?
– একই রক্ত দুই ল্যাবে কেমনে দিলেন?
– আমি সকালে গাড়ী পাঠিয়েছিলাম, আপনার ল্যাব ও অন্য ল্যাব থেকে টেকনোলজিস্ট এনে একই সময় দুই হাত থেকে দুইজনকে রক্ত নমুনা নিতে বলি।
– কেন এমন করলেন?
– ইদানীং পত্র পত্রিকায় দেখছি, বাংলাদেশের ল্যাবের পরীক্ষার মান ভাল না। তাই একটু তুলনা করে দেখলাম নিজেরটা দিয়ে।
– কোন কোন পত্রিকা নেগেটিভ কথাবার্তা লিখে মজা পায়। কেউ কেউ এগুলু পড়েও মজা পায়। তা কেমন গড়মিল দেখছেন?
– একটাতে আপনি দিয়েছেন ১৯৮ অন্য ল্যাব দিয়েছে ২০০। অন্যগুলোও এইরকম দুই এক মিলিগ্রাম কম বেশী।
– স্টেটিস্টিকের নিয়মে ১-৫% কম বেশী গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। টেকনোলজিস্ট  টু টেকনোলজিস্ট, রিএজেন্ট টু রিএজেন্ট, মেশিন টু মেশিন তথা ল্যাব টু ল্যাব রেজাল্ট ১-৫% কম বেশী হতে পারে। আপনার বেলায়ও তাই হয়েছে। আশা করি আমি আপনাকে বুঝাতে পেরেছি?
– বুঝতে পেরেছি। ধন্যবাদ, ডাক্তার সা’ব।
২৯/৫/২০১৭ খ্রি.

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (3 votes, average: 2.67 out of 5)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ থেকে বই কেনার জন্য ক্লিক করুন

এখানে

 

জিনের সমস্যা

জিনের সমস্যা
(স্বাস্থ্য কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

জিনের সমস্যার কারনেও অনেক রোগ হয়। এদেরকে বলা হয় জেনেটিক ডিজঅর্ডার বা ডিজিজ। বিশেষ করে কয়েকটা জন্মগত রোগ জেনেটিক ডিজ অর্ডারের কারনে হয় ।। মানুষের শরীর অশংখ্য কোষ দিয়ে তৈরি। কোষের ভিতর থাকে নিউক্লিয়াস। নিউক্লিয়াসের ভিতর থাকে সুতার মত ক্রোমোজোম। ক্রমোজমের যে অংশ কোন একটা প্রোটিন তৈরি করার জন্য কোড করে সে অংশকে জিন (gene) বলা হয়। জিনের ডিফেক্ট হলে জিনের প্রোডাক প্রোটিন তৈরি হয়না। তাতে শরীরের গঠনের ও কাজের সমস্যা হয়। তখন বলা হয় জেনেটিক ডিফেক্ট। অধিকাংশ ডিফেক্টই মানুষের জন্মগত।

 

অস্টিওজেনেসিস ইম্পার্ফেক্টা জিনের কারনে জন্মগত ডিফেক্ট। এর কারনে মানুষের কোন হাড়ই বড় হয় না। মানুষ লম্বা হয় হাড়ের লম্বা হবার কারনে। হাড়ই যখন লম্বা হয় না মানুষও তখন লম্বা হয় না, খাটো থেকে যায়। ভাই-বোনদের মধ্যে অর্ধেকেরই এই সমস্যা হতে পারে কমবেশি।

 

একন্ড্রপ্লাসিয়া জন্মগতভাবে খাটো হওয়ার আরেকটি সমস্যা। জিনের ডিফেক্টের কারনে শরীরের কার্টিলেজ বা নরম হাড়গুলো  বৃদ্ধি পায় না। ফলে শুধু শক্ত হার বড় হয়। যেমন মাথার খুলি, মুখ, চোয়াল, ধড় বড় হয়। কিন্তু হাত ও মা বড় হয় না। ছোট ছোট হাত ও পা বাকা থাকে। ছেলে বা মেয়ে উভয়ে আক্রান্ত হতে পারে। ভাই বোনদের মধ্যে অর্ধেকে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে।

 

মার্ফেন সিন্ড্রোম একটি জেনেটিক ডিজঅর্ডার। এই সিন্ড্রোমে আক্রান্ত মানুষ জন্মগতভাবে শরীর আকাবাকা বা লেকবেকা হয়। হাত পা লম্বা লম্বা হয়। ছেলে ও মেয়ে আক্রান্ত হতে পারে। ভাই বোনদের মধ্যে অর্ধেক কমবেশী আক্রান্ত হতে পারে।

 

আরেকটা জেনেটিক সমস্যা হল এলবিনিজম। এই রোগে আক্রান্ত ছেলে বা মেয়ে জন্মগত ভাবে সাদা। ভাই বোনদের মধ্যে চার জনে একজন আক্রান্ত হতে পারে। মেলানিন পিগমেন্ট নামে এক কালো দানার জন্য মানুষের রং কালো হয়। মেলানিন দানা যার কম আছে সে ফর্সা। এলবিনিজম রোগীর শরীরে মেলানিন দানা তৈরি হয় না। তাই সাদা ।

 

একটা জন্মগত রক্ত শুন্যতা রোগ আছে যে রোগে রক্তের লাল কনিকা ভেংগে যায়। তার নাম থ্যালাসেমিয়া। এটাও জিনের দোষে হয়। ছেলে মেয়ে উভয়েই আক্রান্ত হতে পারে। ভাই বোনদের মধ্যে চার জনে একজন আক্রান্ত হতে পারে।

 

হিমোফিলিয়া একটা জন্মগত জেনেটিক ডিজিজ। এই রোগ ছেলেদের হয়। মেয়েদের সাধারণত হয় না। এই রোগে কোথাও কেটে গেলে অনেকক্ষন রক্তক্ষরণ হয়। বিশেষকরে খৎনা করালে রক্ত পরা বন্ধ হয় না। হাজাম ভয়ে পালিয়ে যায়।

আমি এখানে মাত্র কয়েকটা জিনের কারনে সমস্যার উল্লেখ করলাম। আরো অনেক রোগ আছে যেগুলো জিনের ডিফেক্ট-এর কারনে হয়। মাতৃগর্ভে থাকতেই সন্তান জেনেটিক ডিজিজে আক্রান্ত কিনা তা গর্ভের পানি পরীক্ষা করলেই জানা যায়। চিকিৎসকগণ জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং করে আজকাল জিন রিপিয়ার করে দেন।
২৮/১১/২০১৭ খ্রি.

ময়মনসিংহ – কিশোরগঞ্জ জার্নি

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 3.00 out of 5)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই অনলাইন থেকে কেনার জন্য ক্লিক করুন

এখানে

রুহিনী দা

রুহিনী দা

(স্মৃতি কথা)

ড. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

রুহিনী দাকে আমি প্রথম দেখি ১৯৯৩ সনে। নাম জানতাম না। পিজিতে এমফিল এডমিশন টেস্টের ভাইবা দিচ্ছিলাম একই দিনে। এখনকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন আইপিজিএমআর নামে একটা পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিকেল ইনস্টিটিউট ছিল। সংক্ষেপে বলা হতো পিজি। পিজিতে পড়া ও শিক্ষকতা করা খুবই সম্মানের ব্যাপার ছিলো। বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর বি আর খান স্যারের অফিস কক্ষে মৌখিক পরীক্ষা হচ্ছিল। একজন একজন করে ক্যান্ডিডেট প্রবেশ করছিলেন। আমরা সবাই ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করছিলাম। ১০/১৫ মিনিট পর ফিরে এসে একেকজন একেক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছিলেন। কী কী প্রশ্ন করলেন এটাই ছিলো অপেক্ষমান ক্যান্ডিডেটদের কমন প্রশ্ন। বর্ণনাকারীরা ভয়ংকরভাবে তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন। সবাই কোলাহল করে সেই সব প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করছিলেন। আমি সাধারণত নতুন কারো সাথে খোলামেলা আলাপ করতে পারি না। তাই, আমাকে অনেকেই বোকা ছেলেই মনে করে থাকেন। সেদিন আমি বোকার মতো এক দিকে বসে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলাম। ছোট বেলা হুজুর ছমির মাওলানা আমাকে দোয়া শিখিয়েছিলেন পরীক্ষার আগে পড়ার জন্য। সেই দোয়াটা বার বার পড়ছিলাম আর দেখছিলাম অন্যরা কিভাবে কি ভঙ্গিতে কথা বলেন। কিভাবে শরীর নাড়াচাড়া করেন। কত স্মার্ট তারা। আমি মানুষের কথা বলার ভঙ্গি খুব নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করে থাকি। দোয়াটা আমার ছাত্রদেরকেও শেখাই পরীক্ষার আগে পড়ার জন্য। দোয়াটা এমন “রাব্বি, জেদনি, এলমা।” অর্থাৎ “হে আমার রব, আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দিন।” একজন ক্যান্ডিডেট ভাইভা দিয়ে ফিরে এসে তার অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন। তার চেহাড়া দেখে বেশী স্মার্ট মনে হলো না। তিনি দু’হাতের দুই তর্জনী আঙ্গুল খারা করে কপালের দুপাশে ঠেকিয়ে বলছিলেন “সবই পারলাম। কিন্তু স্যার বলছিলেন ‘এরপর কি?’ আমি আর বলতে পারছিলাম না।” অন্য এক ক্যান্ডিডেট বলে দিলেন “এরপর হলো ফ্রি র‍্যাডিকেল সেল ইঞ্জুরি।” তিনি “ইয়েস, ইয়েস” বলে জিহব্বায় কামড় দিলেন। বললেন “আমার এবার হবে না।” অন্য এক ক্যান্ডিডেট বললেন “আপনার হবেই। আপনি গত দেড় বছর যাবত চিটাগং মেডিকেল কলেজে প্যাথলজির লেকচারার হিসাবে আছেন। আপনি অভিজ্ঞ।” দেখলাম সবাই সবাইকে চেনেন। আমি কাউকে চিনছি না। আমাকেও কেউ চিনছেন না। আমিও যে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের লেকচার তা কেউ জানেন না। এতক্ষণ যার কথা বললাম তিনিই রুহিনী দা। এই দাদা ১৯৯৯ সনে বিএসএমএমইউ-তে প্রথম এমডি কোর্স চালু হলে চাঞ্চ পেয়ে প্যাথলজিতে এমডি কোর্সে ভর্তি হন। আমি সে ১৯৯৩ সনের জুলাই সেসনেই এম ফিল চাঞ্চ পাই। ১৯৯৫ সনের জুলাই ফাইনাল পরীক্ষায় পাস করে ১৯৯৬ সনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ফিরে আসি। ১৯৯৮ সনে সহকারী অধ্যাপক হই। আমাদের ডিপার্টমেন্টে আমার ব্যাচমেট ডাঃ এএফএম সালেহ (ইকবাল) তখন প্রভাষক ছিল। সে আমার সাথে পরামর্শ করে ১৯৯৯ সনে এমডি কোর্সে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে চাঞ্চ পেয়ে গেলো। সালেহ পিজি থেকে মাঝে মাঝে আমার সাথে দেখা করে আমাকে দোষারোপ করতো। বলত “সাদেক, দোস্ত, তুমি আমারে কি এক সমুদ্রে ফেলে দিলা, আমি এর কূলকিনারা পাচ্ছি না।” আমি সাহস দিতাম এই বলে “দেখতে দেখতে ৫ বছর শেষ হয়ে যাবে। চিন্তা করবা না।” সালেহ রুহিনী দার খুব প্রশংসা করতো। বলত “সাদেক, আমি আমার এক রিডিং পার্টনার পেয়েছি, রুহিনী দা। দাদার মতো এত ভালো মানুষ হয় না।” সালেহ ২০০৩ সনে এমডি পাস করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে আবার প্রভাষক হিসাবে ফিরে আসে। প্যাথলজি বিষয়ে প্রথম এমডি পাস করা হিসাবে সবার কাছে একটু বেশী প্রশংসা পেতে থাকে। আমি যেমন এমফিল পাস করে ময়মনসিংহ এসে ১৯৯৭ সনেই তালুকদার প্যাথলজি নামে নিজের মতো করে স্বাধীনভাবে প্রাক্টিস করতে থাকি সালেহও তেমনি নোভা প্যাথলজি নাম দিয়ে ময়মনসিংহে একটা প্যাথলজি ল্যাব দিয়ে প্র‍্যাক্টিস শুরু করে। সালেহ সারাক্ষণ রুহিনী দার প্রশংসা করতো। রুহিনী দা এমডি পাস করে চিটাগং মেডিকেল কলেজে ফিরে গিয়ে প্র‍্যাক্টিস শুরু করেন। এদিকে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে সালেহর বদলীর প্রস্তাব হয়। সালেহ এই বদলী ঠেকাতে না পেরে রুহিনী দাকেও রাজি করান দিনাজপুর নিয়ে যেতে। কর্তৃপক্ষকে রিকুয়েষ্ট করে সালেহ রুহিনীদাকে সহ একই অর্ডারে বদলীর অর্ডার করায়। অর্থাৎ দুজনই সহকারী অধ্যাপক হিসাবে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে যোগদান করেন। সালেহ প্যাথলজি বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব নেন। মাইক্রবায়োলজির পোস্ট গ্রাজুয়েট করা টিচার না থাকাতে রুহিনী দা মাইক্রোবায়োলজির প্রধানে দায়িত্ব নেন। এভাবে চলে ৩ বছর। দাদা ও সালেহ একসাথে পার্টনারশিপে নোভা প্যাথলজি নামে দিনাজপুর শহরে একটা ল্যাবরেটরি দেন। দিনাজপুরে এর আগে কেউ হিস্টোপ্যাথলজি (বায়োপসি) পরীক্ষা করতো না। এই দু’জন মিলে প্রথম দিনাজপুরে হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষা শুরু করেন। দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, সৈয়দপুর অঞ্চলের সব বায়োপসি ও সাইটোপ্যাথলজি পরীক্ষা এই দু’জন বিশেজ্ঞের দ্বারা করা হতো।

Continue reading “রুহিনী দা”

ক্যান্সার দেখে চেনা যায়

ক্যান্সার দেখে চেনা যায়

(স্বাস্থ্য কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

প্যাথলজি বিশেষজ্ঞগণ খালি চোখে ও মাইক্রোস্কোপ -এর ম্যাধ্যমে দেখে ক্যান্সার রোগ নির্ণয় করেন।
সার্জন ক্যান্সার কেটে হিস্টোপ্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার জন্য প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ-এর নিকট পাঠান। আমাদের দেশে প্যাথলজি বিষয়ে এমফিল, এমডি অথবা এফসিপিএস পাস করা ডাক্তারগণ প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ । সাধারণ জনগণ পরীক্ষাটাকে মাংস পরীক্ষা বলে। মাংস ১০% ফরমালিনে ডুবিয়ে পাঠাতে হয় যাতে পঁচে না যায়।

মাংস কিছু কিছু অংশ পচা থাকলে বা রক্তক্ষরণ যুক্ত থাকলে বা এব্রোথেব্রো থাকলে ক্যান্সার সন্দেহ করা হয়।

ক্যান্সার হলে কোষ বিন্যাসে পরিবর্তন হয়। হাজারো রকম ক্যান্সারে হাজারো রকম কোষ বিন্যাস আছে। মাংস অতি পাতলা করে কেটে কাঁচের স্লাইডে নিয়ে মাইক্রোস্কোপ দিয়ে কোষ বিন্যাস দেখে প্যাথলজিস্টগণ ক্যান্সার রোগ চিনে থাকেন।

আমরা গাছের ডালপালা ও পাতার বিন্যাস দেখে যেমন বিভিন্ন রকম গাছ চিনতে পারি তেমনি কোষ বিন্যাস দেখে প্যাথলজিস্টগণ বিভিন্ন রকম ক্যান্সার চিনতে পারেন। কোন কোন গাছ যেমন সহজেই চেনা যায় তেমনি কোন কোন ক্যান্সারও সহজে চেনা যায়। কোন কোন গাছ আছে দেখতে প্রায় একরকম হলেও ভিন্ন জাতের । তেমনি কোন কোন ক্যান্সার আছে দেখতে প্রায় এক রকম। এইগুলো নির্নিয় নিয়ে প্যাথলজিস্টগনের সমস্যা হয়। তখন কয়েকজন মিলে মতামত দিয়ে একটা রোগ নির্ধারণ করেন। অথবা আরও উন্নত প্রযুক্তিগত পরীক্ষা করে সঠিক রোগ নির্ণয় করেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চোখ দিয়ে দেখে  চেনা যায়।

১/৬/২০১৭খ্রি.

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (5 votes, average: 4.20 out of 5)
Loading...