গেন্দু বাসর রাতে বিড়াল মারলো

গেন্দু বাসর রাতে বিড়াল মারলো

(হাসির হাস্তর)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

[আমাদের সখিপুরের গ্রাম এলাকায় ছোটবেলা লোক মুখে কিছু গল্প শুনতাম। সেগুলোকে বলা হতো হাস্তর। আমি সেসব হাস্তর বন্ধুদের সহযোগিতায় সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছি আমার মতো করে। হাস্তরের ভেতর দিয়ে আগের দিনের গ্রামবাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রকাশ পাবে বলে আমি মনে করি। এই লেখাটি তারই একটি অংশ]

 

গেন্দুর বিয়ের দু’দিন আগে সে করিম বকসের কাছে যায় বিয়ে সংক্রান্ত কিছু জ্ঞান নিতে। করিম বকস গেন্দুকে মোটামুটি যা যা শিখিয়ে দেয়ার কথা ভালো করে শিখিয়ে দিলেন। বলে দিলেন

– বউ বাড়িতে আসার পর বরণ করবে বাড়ির মেয়েরা। তারপর তোমাকে ও তোমার বউকে পাশাপাশি বসিয়ে সাগরানা খাওয়াবে।

– সাগরানা কী কিবা খাওন?

– সাগরানা আলাদা কোন খাবার না। এটা হলো গুড়ের পায়েস। প্রথম তোমার মা তোমাকে ও তোমার বউকে চামচ দিয়ে পায়েস খাইয়ে দিবেন। তোমার মা সরে যাবেন। তারপর তোমার ভাবীরা একটা পয়সা দিয়ে একটু করে পায়েস উঠায় তোমার হাতে দিবেন। তুমি তা তোমার বউয়ের মুখে তুলে দিবে। তারপর তোমার বউ ঠিক একইভাবে তোমাকে খাইয়ে দিবে।

– মিয়া ভাই, ইডা ত খুবই শরমের কথা। এত মানুষের সামনে বউয়ের আতে খাবার পামু?

– দূর, বোদাই। শরম পাবো তোমার বউ। তুমি পাবা কেন? তারপর শাহী নজর করা হবে।

– ওডা আবার কিবা নজর?

– তুমি বিয়ের রাতে তোমার মুখের দিকে তোমার বউ তাকাবে আর তুমি তাকাবে তোমার বউয়ের মুখের দিকে। এটার হলো শাহী নজর।

– আমি এত মাইনষের সামনে বউয়ের মুখের দিকে চাবার পামু না।

– এইজন্য তোমাদেরকে আয়নার মাধ্যমে মুখ দেখানো হবে। তোমার ভাবীরা তোমাদের সামনে একটা গোল আয়না ধরবে। তুমি দেখবা আয়নায় তোমার বউয়ের মুখ। তোমার বউও তোমার মুখ দেখবে আয়নায়। আয়নায় কিন্তু তোমার বউয়ের চুলের শিথি উলটা দিকে দেখা যাবে।

– হ বুঝছি। আমি আয়নায় দেখছি আমার মাথার বায়ের হিতি ডাইন দিকে দেহা যায়।

– এরপর তোমাদেরকে নিয়ে যাবে বাসর ঘরে। আগে থেকেই তোমার ছোট ভাই-বোনেরা বাসর ঘর রঙিন কাগজ কেটে কেটে সাজিয়ে রাখবে। তারা বাসর ঘরের ভিতরেই দরজায় আড় লাগিয়ে খারাইয়া থাকবে । তাদেরকে মাইন দিয়ে ভিতরে ঢোকতে হবে। তারপর দরজায় আড় লাগিয়ে চৌকিতে বসে বউয়ের সাথে কথা বলবে।

– কী কথা কমু? বউরে আপনে কইরা কমু, না তুমি কইরা কমু?

– তুমি করে বলবা।

– কী কথা কমু?

– কী কথা বলবে তাও আমার বলে দিতে হবে? বলবি যে তোমারে অনেক সুন্দর লাগতাছে। তারপর দেখবি আরও কথা বাইরবো মুখ দিয়ে সেটা আমার বলে দিতে হবে না। দেন মোহরের টাকা বাকী আছে কিছু?

– বাকী আছে।

– সেটা কবে দিবে?

– ধান কাটার পর দিওন নাগব।

– সিনেমায় দেখছ না জামাই বউ বাসর ঘরে কী কথা কয় আর কেমন কেমন করে, তোমরাও তেমন করবা। আর একটা কথা মনে রাখবা, দেন মোহরের টাকা পরিশোধ না করে বউয়ের গায়ে হাত দেয়া যাবে না।

– কিবা কতা কইন? ছোওন যাবো না?

– ছোওন যাবো, এর চেয়ে বেশী কিছু না। তবে তুমি দেন মোহরের টাকা ধান কাটার পর দিয়ে দিবা কিরা করে বলে যদি সেই পযর্ন্ত মাফ চাও আর বউ মাফ করে দেয় তাইলে সব কিছুই করতে পারবা।

– বউয়ের কাছে নাফ চাওন ঠিক অইবো?

– আরে, এটা অন্য রকম মাফ। টাকার মাফ নাই। টাকা তোমার দিতে হবে, কিছুদিন পরে। এই সময়ে জন্য মাফ চাওয়া। বাসর রাতে একটু সাহস দেখাবে। বউ যেন টের না পা যে তুমি বোদাই।

বউকে বরণ করার পর বিয়ে পড়ানো হলো মসজিদের ইমাম দিয়ে। দু’জনকে পাটিতে পাশাপাশি বসানো হলো। সাগরানা খাওয়ানো হলো। গেন্দুর মুখের কাছে যখন জয়গন পায়েসসহ কয়েন ধরলো গেন্দুর পিঠের উপর তার চাচাতো ভাই হাটু দিয়ে একটু ধাক্কা মারলো। সম্পুর্ণ কয়েন গেন্দুর মুখের ভিতর চলে গেলো। সবাই হেসে দিলো। গেন্দুর দুলাভাই বললেন “শালায় পয়সাসহই খাইয়া ফালাইছে।” গেন্দু মুখ থেকে পয়সা বের করে দিলো। সাগরানা খাওয়া শেষে শাহী নজর করা হলো।

এবার বাসর ঘরে প্রবেশের পালা। গেন্দুর দুলাভাই ও ভাবীরা ওদেরকে নিয়ে বাসর ঘরের দরজার সামনে গিয়ে টোকা দিলেন। যারা ঘর সাজিয়েছিল তারা দরজা খুলে সামনে দাঁড়িয়ে বললো

– আমরা খরচা করে কষ্ট করে ঘর সাজাইছি। মাইন দেওন নাগব।

– কত টাকা দিতে হবে?

– ১০ টেহা দিওন নাগব।

– ৫ টাকা দিমু।

– ১০ টার নিচে একটা ছেন্দা পয়সাও কম নিমু না।

গেন্দুর চাচা ডাক দিয়ে বলনেন

– এই গেইট ছাইড়া দেও গ।

– কাক্কুর অনেক কথা হুনছি। আইজকা হুনমু না। আইজকা ১০ টেহা না নিয়া গেইট ছাড়মু না।

– দামান্দে, ওগরে ১০ টেহাই দিয়া দেও।

১০ টাকা নিয়ে গেইট ছেড়ে দিলো। দুলা ভাই ও ভাবীরা নতুন বর-কণে বাসর ঘরে বুঝিয়ে রেখে চলে গেলেন। চৌকির কিনারে গেন্দু ও গেন্দুর বউ পা ঝুলিয়ে বসে রইলো অনেকক্ষণ। কেউ কোন কথা বললো না। দু’জনই অস্বস্তি অনুভব করছিলো। একসময় গেন্দু অল্প অল্প কাশতে শুরু করলো কিছুক্ষণ পরপর। জয়গন প্রথম কথা বললো

– আপনে কতক্ষণ পরপর গলা খাউর পারতাছুন ক্যা? সর্দি নাগছে?

– না মানে, সর্দি নাগে নাই। মেওপোলা মানুষ দেখলে আমার গলা খাউর দিবার অভ্যাস আছে।

– হেডাত ভিন মেয়ামানুষ দেখলে। আমি ত ভিন মেয়া মানুষ না। আমি ত আপনের বউ।

– অ হ হ। আর কাশমু না। একটা কতা কী, দেন মোহরের যে কয় টেহা বাকী আছে এই কয় টেহা আমি ধান কাটার পর দিয়া দিমুনি। হেই পর্যন্ত আমারে মাফ কইরা দেওন নাগবো। মাফ না করলে নিহি আপনের শরীলে ছানন যাবো না।

 

জয়গন চুপ করে বসে রইলো। গেন্দু বারবার একই কথা বলছিলো। জয়গনও এই সুযোগে চুপ করে থেকে মজা পাচ্ছিল। গেন্দুর মেজাজ খারাপ হচ্ছিল। বোকা মানুষের মেজাজ খারাপ হলে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। একসময় গেন্দুর মনে পড়লো করিম বকসের পরামর্শের কথা। তিনি বলেছিলেন বাসর রাতে সাহস দেখাতে। গেন্দু ভাবছিলো কী করে সাহস দেখানো যায়। এমন সময় চৌকির নিচ থেকে সেই হুলো বিড়ালটি মিয়াও মিয়াও করা শুরু করলো। গেন্দু ভয় দেখালো “এই বিলাই ধইরা কিন্তু আছাড় মারমু, চুপ করবি?” জয়গন একটু ভয় পেলো। এরপরও যখন বিড়ালটি মিয়াও মিয়াও করতেই থাকলো গেন্দু রাগান্বিত হয়ে “হালার বিলাই” বলে খপ করে বিড়ালের ঘারে ধরে উঁচু করে মেজেতে জোড়ে একটা আছাড় মারলো। বিড়াল গোংরানি দিয়ে চৌকির নিচে গিয়ে নিরব হয়ে গেলো। জয়গন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে মৃদুস্বরে বললো “মাফ কইরা দিলাম।”

৬/১/২০২১

ময়মনসিংহ
Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)

Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/