ব্লাড ক্যান্সার ধরা পরার পরীক্ষা

ব্লাড ক্যান্সার ধরা পরার পরীক্ষা
(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
এম ফিল (প্যাথলজি)

অনেকেই এমন একটা প্রশ্ন করেন “রক্তে ক্যান্সার হয়েছে কিনা কি পরীক্ষা করলে ধরা পরবে?” রক্তের ক্যান্সার বা লিউকেমিয়া হলে শরীর দেখে বুঝা মুস্কিল। তাই অনেকে এমন প্রশ্ন করেন। ব্লাড ক্যান্সার হলে শরীরে যেসব উপসর্গ দেখা দেয় তা অনেক রোগের উপসর্গের সাথে মিল আছে। তাই ব্লাড ক্যান্সারের নির্দিষ্ট কোন উপসর্গ নেই। যেমন, শরীর খুব দুর্বল হয়ে পড়া, জ্বর হওয়া, দাঁতের মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, হাড়ের ভিতর ব্যথা করা, চামড়ায় রক্তকক্ষরণ হয়ে জখমের মতো দাগ হওয়া, ইত্যাদি। এইসব লক্ষণ অন্য অনেক রোগেও আছে। এইসব লক্ষণ থাকলে অবশ্যই রক্ত পরীক্ষা করতে হবে। অনেক পরীক্ষা করা যায়। তবে কিছু করতে না পারলেও শুধু রক্তের ডিসি বা ডিফারেন্সিয়াল কাউন্ট (অব ডাব্লিওবিসি) পরীক্ষাটি করতে পারলে ব্লাড ক্যান্সার ধরা যাবে। একটি কাঁচের স্লাইডে এক ফোটা রক্ত নিয়ে আরেক স্লাইড দিয়ে ঘষা দিয়ে ব্লাড ফিল্ম তৈরি করা হয়। মাত্র এক ফোটা রক্তের প্রয়োজন হয় তাতে। আংগুলের মাথা থেকেই নেয়া রক্ত যায়। এই ফিল্ম শুকানোর পর লেইশম্যান স্টেইন নামে একটি রিএজেন্ট দিয়ে ফিল্ম কালার করা হয়। তাতে রক্তকোষের শেতকনিকা (WBC) ও অণুচক্রিকা (Platelets) রংগিন হয়। লোহিত কনিকাকে (RBC) রঙ করার প্রয়োজন পড়ে না, কারন, এগুলি নিজে থেকেই লাল রংগের। মাইক্রোস্কোপ দিয়ে এই কোষগুলি দেখা হয়। এদের আকার আকৃতি দেখে বিশ্লেষণ করা হয়। আকার আকৃতি ও কালার নেয়া অনুসারে শেতকনিকাকে নিউট্রোফিল, লিম্ফোসাইট, ইউসিনোফিল, মনোসাইট ও ব্যাজোফিল নাম দেয়া হয়েছে। ডিসি পরীক্ষায় এগুলির শতকরা হার নির্ণয় করা হয়। এইগুলির পারসেন্টেজের একটা নির্দিষ্ট রেঞ্জ আছে। বিভিন্ন রোগে এদের পারসেন্টেজের হেরফের হয়। তাই দেখে বিভিন্ন রোগের সাথে মিলিয়ে রোগ নির্ণয় করা যায়। তাই দেখা অধিকাংশ রুগীর রক্তের ডিসি পরীক্ষা করতে দেয়া হয়। কিছু কিছু সন্দেহপ্রবন লোক আছেন তারা মনে করেন ডাক্তাররা অযথা পরীক্ষা করান। এই পরীক্ষাটি করাতে বেশী টাকা লাগে না। ১০০/১৫০ টাকায়ই করানো যায়। এভাবে একজন প্যাথলজিস্ট যদি মাইক্রোস্কোপ দিয়ে ডিসি পরীক্ষা করেন তবে এটাকে মেনুয়াল মেথডে পরীক্ষা করা বুঝায়। কম্পিউটারাইজড ইলেকট্রনিক সেল কাউন্টার মেশিন দিয়েও দ্রুত বিনাপরিশ্রমে প্যাথলজিস্ট ছাড়াই ডিসি পরীক্ষাটি করা যায়। বড় বড় ল্যাবরেটরিতে শত শত ডিসি পরীক্ষা করা হয়, সাধারণত, কম্পিউটার মেথডে। নিয়ম হলো, কম্পিউটারে পরীক্ষা করালেও প্যাথলজিস্ট স্লাইড দেখে চেক করবেন। কিন্তু অধিক চাপের কারনে অনেক সময় প্যাথলজিস্ট চেক করতে পারেন না। তখন কম্পিউটারের রিপোর্ট ভুল আসতে পারে। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার রক্তকণিকার আকার আকৃতি ও কালার কোড করে কম্পিউটার প্রোগ্রাম তৈরি করে দেন। সেই প্রোগ্রামের একটা সীমাবদ্ধতা আছে। তার বাইরের কোষ কম্পিউটার মেমোরিতে থাকে না। তাই সেগুলি কাউন্টের বাইরে থেকে যায়। ব্লাড ক্যান্সারের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটে। ব্লাড ক্যান্সার হলে সাধারণত রক্তকণিকা পরিপক্ব হয় না। অপরিপক্ব রক্তকোষকে ব্লাস্ট সেল বলা হয়। এই ব্লাস্ট সেল মাত্রাতিরিক্ত হয়ে গেলে বলা হয় লিউকেমিয়া বা ব্লাড ক্যান্সার। এই ব্লাস্ট সেলগুলির আকার আকৃতি ও কালার খুবই জটিল। এই গুলি কম্পিউটার তো দুরের কথা কম অভিজ্ঞ প্যাথলজিস্ট বা টেকনোলোজিস্টও কোন কোন সময় চিনতে পারেন না। তাই, সেই ক্ষেত্রে ব্লাড ক্যান্সার থাকলেও তা রিপোর্ট-এ লিখা হয় না। রুগী মরণাপন্ন হয়ে পরলে মেনুয়াল মেথডে ডিসি পরীক্ষা করে ব্লাড ক্যান্সার নির্নয় করা হয়। কোন কোন সময় ব্লাস্ট সেলের আধিক্য কম থাকলে বোন মেরো বা অস্থিমজ্জা পরীক্ষা করে ব্লাড ক্যান্সার নির্নয় করা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে ইমিনোসাইটোকেমিক্যাল পরীক্ষা করে ব্লাড ক্যান্সারের শ্রেণীবিন্যাস করে চিকিৎসা দেয়া হয়। মেনুয়াল মেথডে ডিসি পরীক্ষার সময় যদি প্যাথলজিস্ট ব্লাস্ট সেল পান তবে তিনি শুধু ডিসির রেজাল্টই লিখেন না, রুগীর যে ব্লাড ক্যান্সার আছে তাও লিখে দেন। মেনুয়াল মেথড হলো অল্প খরচে কম সময়ে অতি সহজে ব্লাড ক্যান্সার ধরার একটি মেথড।

৯/৭/২০১৯ ইং
ময়মনসিংহ