বসা নিয়ে মারামারি

বসা নিয়ে মারামারি

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
স্মৃতিচারণ

১৯৬৮ সনে ক্লাস টুতে পড়তাম ঘোনারচালা ফ্রি প্রাইমারী স্কুলে। আমার বয়স তখন ৭-৮ বছর হবে। আমাদের স্যার ছিলেন চার জন। হেড স্যার ছিলেন মোঃ খোরশেদ আলম। সেকেন্ড স্যার ছিলেন আমার চাচা মোঃ সোলায়মান তালুকদার। থার্ড স্যার ছিলেন মোঃ সাখাওয়াৎ হোসেন। ফোর্থ স্যার ছিলেন মোঃ আঃ লতিফ। লতিফ স্যার একই সাথে কচুয়া পোস্ট অফিসের পোস্ট মাস্তার ছিলেন । তাই আমরা বলতাম পোস্টো স্যার । আমাদের ক্লাসে সাতটি বেঞ্চ ছিল। স্যার বসার সামনা-সামনি সারিবদ্ধ তিন সারিতে ছয়টি। স্যারের ডান পাশে আড়া-আড়ি ভাবে একটি। সামনের দুই বেঞ্চে মেয়েরা বসত। ছেলেরা মেয়েদের পিছে বসতো । জামাল আমাদের মধ্যে একটু ডানপিটে ছেলে ছিল। সে আমাদের ফার্স্টবয় ক্লাস ক্যাপ্টেন বারীর ভাগ্নে ছিল। একদিন জামাল আমাদেরকে ডেকে বলল “আমরা সবাই একই ক্লাসে পড়ি। সবার সমান অধিকার। কেন মেয়েরা সামনে বসবে আর আমরা সবসময় পিছনে বসব? আগামীকাল থেকে আমরা মেয়েদের আসার আগেই এসে সামনের সীটে বসে পড়ব।” আমরা সবাই রাজি হলাম। পরেরদিন সবাই আগে এসে সামনের বেঞ্চে বসে পড়লাম। সবার ডানে জামাল বসেছে যেখানে মেয়েদের মধ্যে যে একটু বড় এবং শক্তিশালী সে বসত। একে একে মেয়েরা আসে। বলে “তোমরা তোমাদের বেঞ্চে যাও।” ছেলেরা কেউ কথা বলে না। তাকায়ও না সেদিকে। একসময় মেয়ে লীডার জামালের বইগুলো বেঞ্চ থেকে ছুরে মারল। জামালও মেয়ের বইগুলি নিয়ে ছুরে মারল। মেয়েটি জামালকে কিল মারল। জামালও কিল মারল। কিলাকিলি লেগে গেল দুই পক্ষের মধ্যে। দুর্বল চিত্তের মেয়েরা ভয়ে চিল্লাচিল্লি শুরু করল। অফিস থেকে সাখাওয়াৎ স্যার এসে গণহারে বেত্রাঘাত করতে লাগলেন। বেতাইতে বেতাইতে এক সময় ক্লান্ত হয়ে বললেন “কি হয়েছে?” কেউ উত্তর দিচ্ছে না। নিরুপায় হয়ে আমাকে প্রশ্ন করলেন। সবাই আমাকে নির্ভর যোগ্য এবং একটু বিশ্বাসী মনে করতেন। আমি বিস্তারিত বললাম। স্যার আমাদের চিরাচরিত াগের নিয়মেই বসতে বললেন। স্যারের সামনেই আবার হট্টগোল শুরু হল। এইবার সোলেমান স্যার এলেন বেত হাতে। সবাই বুঝল এবার চামড়া ছিড়ে ফেলবে। স্যার সব শুনে সাখাওয়াৎ স্যারকে বললেন “আপনি নিজে ওদেরকে একজন ছেলে একজন মেয়ে এইভাবে বসিয়ে দিন। এতে কেউ রাজি না হলে আমার কাছে পাঠিয়ে দিন। আমি বেতিয়ে চামড়া ছিড়ে দিব।” আমরা শান্ত থাকলাম। সাখাওয়াৎ স্যার ফার্স্ট বয় বারীকে আড়া-আড়ি বেঞ্চের ডান সাইডে বসালেন। সেকেন্ড বয় আমাকে বেঞ্চের মাঝখানে বসালেন। থার্ডবয় লুৎফরকে বেঞ্চের বাম সাইডে বসালেন। বারী ও আমার মাঝখানে স্যারের ভাতিজিকে বসালেন। আমার ও লুৎফরের মাঝে স্যারের মেয়েকে বসালেন। এখানে হাসির কিছু নাই। আমরা মাত্র ক্লাস টু-এ পড়তাম। শিশু ছিলাম। অন্যান্য বেঞ্চেও একজন ছাত্র একজন ছাত্রী এই ভাবে বসিয়ে দিয়ে বললেন “ক্লাসে আগে আসুক, আর পরে আসু্‌ এই ভাবেই বসতে হবে।”

আমি একটু লাজুক প্রকৃতির ছেলে ছিলাম। মেয়েদের সাথে সহজে কথা বলতাম না। ডানে বামে ঘুরতে পারতাম না। আমার খেলার নেশা ছিল না। খেলার আওয়ারে আমি বেঞ্চেই বসে থাকতাম। মেয়েরা সাধারণত খেলতে যেত না। ক্লাসে বসেই গল্প করত। মাঝখানে আমি থাকাকে তারা দুই কাজিন গল্প করতে পারত না। আমাকে খেলতে যেতে বলত। আমি বলতাম “আমি খেলতে পারি না।” ঠাট্টা করে বলত “কুঁইচা মুরগীর মত ক্লাসে বসে থাকে।” তবে এই ব্যবস্থাটা কয়েকদিন মাত্র স্থায়ী ছিল। আপনা আপনি আগের ব্যবস্থায় চলে যায়। অসাভাবিক নিয়ম বেশীদিন স্থায়ী থাকে না।

৮/১০/২০১৭ খ্রি.