লঞ্চডুবি

লঞ্চডুবি
(কল্প কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

হুরমুজ আলী এসএসসি ফেল করে আর পড়তে পারেনি। বাবা ছিল না। অভাবের সংসার। মা ও ছোট তিন বোনের খরচ যোগার করতে হিমসিম খেতে হয়েছে হুরমুজ আলীর। কাজের চাপে থাকতে হয় সবসময়। তাই, বন্ধু বান্ধব নিয়ে আড্ডা দিতে পারে না। আড্ডা না দিতে পারলে বন্ধু বান্ধবও জোটে না। নিজে কামাই করে বোনগুলারে বিয়ে দিয়েছে। বোন বিয়ে দেয়ার পর তার বিয়ে করতে হয়েছে। তার ঘরে এসেছে তিন সন্তান। কিছুদিন আগে তার মাটাও মরে গেছে। এতদিন ধর্মকর্ম কিছু করে নাই। এখন বয়স বাড়ছে ধর্মকর্ম করতে হবে। এবয়সে কায়দা সিপারা পড়া তারপক্ষে সম্ভব না। মাদ্রাসা মক্তবে গিয়ে পোলাপানদের সাথে বসে পড়ার বয়স এখন নাই। আল্লাহকে পেতে হলে আল্লাহর কাজকর্ম কিছু করতে হবে। এই বয়সে তাবলীগে গেলে হয়তো কিছু শেখা যাবে। দুইএকদিনের জন্য অল্প কিছু সময় দিল জামাতে। কিন্তু এভাবে সময় দেয়াটা তার কাছে কঠিন মনে হলো। ওর ভালো একটা গুন হলো ও বিড়ি সিগারেট টানে না। পান খাবার অভ্যাসও ওর নেই। আগে খুব ভালো হাডুডু খেলতে পারতো। দম দেয়ার সময় অনেকক্ষণ দম ধরে রাখতে পারতো। দম দেয়ার সময় পায়ের গোছায় পাঁচ জনে ধরে ফেললেও এক ঝেংটা টানে সে ছুটে আসতে পারে। হুরমুজ আলী ভালো ডুব খেলতে পারে। অনেকক্ষণ সে পানিতে ডুব দিয়ে থাকতে পারে। পানিতে নল খেলার সময় পাড়ার কেউ তার সাথে পারতো না ছোট বেলা।
ময়েজ ফকিরের সাথে একদিন দেখা হলে হুরমুজ জিজ্ঞেস করল
-চাচা, আপনাকে তো নামাজ পড়তে দেখিনা?
– আমি তরিকার লোক। আমার নামাজ অন্য রকম। তোমরা দেখতে পাবা না।
– আপনে কোন তরিকার ধরা।
– আমার মুর্শিদ হলো ছোনপুরের জইনা পীর সাব। খুবই কামেল পীর।
– মাওলারে পাইতে হলে কি করতে হয়?
– মুর্শিদের মুরিদ হতে হবে। চলো এবার আমার মুরশিদের কাছে নিয়ে যাই। আমার মুর্শিদকে ধরলে মাওলাকে পাওয়া সহজ।
– ঠিক আছে আমারে জইনা পীর সাবের কাছে নিয়ে যাবেন। পীর সাবকে কি কিছু দিতে হবে?
– মুর্শিদের সাথে দেখা করার আদব আছে। মুর্শিদের খাস কামড়ায় প্রবেশ করে মুর্শিদের সাক্ষাৎ পেতে হয়। মুর্শিদকে দর্শন করে হাতে কিছু নজরানা দিতে হয়।
– কিবায় কি দিতে হয়?
– বাবার হাতে টাকা দিতে হয়। যত বেশী টাকা বাবার হাতে দিবা তত তুমি কামিলিয়ত পাবা।
– তার দরবারে গেলে কি বিশেষ কোন জামা কাপড় পরে যেতে হবে?
– না। বাবা কারো কাপড় চোপড় দেখেন না, দেখেন শুধু দেলটা। বাবাকে ধরতে পারলে মাওলাকে পাওয়া খুবই সহজ।
একদিন মইজুদ্দি ফকিরের সাথে হুরমুজ আলী ছোনপুরের বাবার দরবারে গেল। ১,০০০ টাকার নজরানা দিয়ে বাবার সাক্ষাৎ পেল। বাবা তিনটা শব্দ শিখিয়ে দিলেন একমাস কলবে জপবার জন্য । দিনে দুইবার জপলেই হবে। হুরমুজ আলী ভাবল এই তরিকাই তো সহজ তরিকা। তারপর ঘুরে ঘুরে পীর সাবের দরবার দেখল। বিশাল এলাকা জুড়ে পীর সাবের দরবার। সুন্দর মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। যেন এক চিরিয়াখানা। একেক ঘরে একেক রকম পশু পাখি পালন করা হচ্ছে। আছে বড় বড় উট, মহিষ, ষাড় গরু, দুম্বা, রাম ছাগল, ভেড়া, তার্কী মুরগি, ময়ুর ইত্যাদি। আছে নানা জাতের ফুল ও ফলের বাগান। দেখে হুরমুজ আলীর মন ভরে গেলো। ময়েজ ফকিরকে জিজ্ঞেস করল
– চাচা, পীর সাব এত কিছু যোগার করল কেমনে। এতো টাকা পয়সা কামাই করলো কেমনে। ওনার কী কোন বড় ব্যবসা আছে?
– পীর সাবের টাকার অভাব আছে? বাবার মুরীদ আছে হাজার হাজার। সবাই নজরানা নিয়ে দেখা করতে আসে। তাছাড়া কেউ বিপদে আপদে পড়লে বাবার কাছে দোয়া নিতে আসে। বাবার দোয়ায় যে কোন মুশকিল আছান হয়। ওড়সের সময় বড় বড় ধনী মুরিদানরা বড় বড় উট, ষাড়, মহিষ, খাসি ইত্যাদি নিয়ে আসে দরবারে। যাদের সামান্য কিছু আনার সামর্থ্য আছে তারাও মোরগ মুরগি নিয়ে আসে। চাউল ডাউল তো আনেই। যার কিছু নাই সে এখানে এসে খাটাখাটি করে।
– এখানে খাবার কী ব্যবস্থা আছে?
– আসো যাই খেয়ে আসি। খাবার জন্য টিকিট নিতে হবে। টিকিট দেখালেই থালায় খাবার দিবে। বেঞ্চে বসে খেয়ে নিবো। প্রতিদিন শত শত মুরিদান দর্শনার্থীদের জন্য রান্না হয় বাবার দরবারে। বাবার মধ্যে অনেক কেরামতি আছে। একবার ওড়শের দিন বাবায় ধ্যান করছিলেন। তিনি ধ্যানের মধ্যে দেখতে পান তার একদল মুরিদ নৌককা যোগে দরবারে আসার সময় ৫ মাইল দুরে নদীতে ঝরের কবলে পরছে। বাবা মাইকে সবাইকে জানিয়ে দিলেন এই কথা। এবং সবাইকে মাওলার দরবারে মুরিদানদের দোয়া করতে বললেন। বাবার সাথে আমরা সবাই হাত উঠায়ে দোয়া করলাম। দেখো কোথায় পাঁচ মাইল দুরে নৌকা ঝরের কবলে পড়ছে আর বাবায় এখানে ধ্যানে বসে দেখতে পাচ্ছে। ঐ নোকায় বাবার মুরিদরা ছিল বলেই বাবায় দেখতে পাইছে। মুরিদদেরকে বাবায় চোখে চোখে রাখেন।
– চাচা, পীর মুর্শিদ হতে গেলে কী লাগে?
– পীর হতে গেলে আল্লাহ পাকের প্রিয় বান্দা হতে হয় এবং পীর মুর্শিদের কাছে থাকতে হয়। আমাগো হুজুর অনেক দিন আগে ভারত থেকে এক বড় পীরের দরবারে থেকে পীর হয়ে এসেছেন। ইনি নাকি আগে জাহাজের কুলি ছিলেন।
– জাহাজের কুলি থেকে পীর হয়েছে?
– আল্লাহ পাক চাইলে কী না হয়?
– চাচা, আমি চেষ্টা করলে পীর হতে পারবো?
– সেটাও আল্লাহ পাক ভালো জানেন। ফানাফিল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছাইতে পারলে তো কথাই নাই।
বাড়িতে এসে হুরমুজ আলী ঝিম মেরে গেলো। সারাক্ষণ ভাবে কি করে ছোনপুরের পীর সাবের মতো পীর হওয়া যায়। দুনিয়াতেও শান্তি। আখেরাতেও শান্তি।

একটা ছোট লঞ্চে চড়ে হুরমুজ আলী নবগঙ্গা নদী পথে হাতীমারা ছাচ্ছিল ব্যাবসার কাজে । লঞ্চে ৫০ জনের মতো যাত্রী ছিলো । হেলান দিয়ে বসে চিন্তা করছিলো কি করে পীর হওয়া যায় । ভাবতে ভাবতে তন্দ্রা এসে গেলো হুরমুজ আলীর । পেছন দিক থেকে একটা বড় লঞ্চ এসে ছোট লঞ্চটার প্রায় কাছাখাছি এলো । বড় লঞ্চটার হাত থেকে বাচার জন্য ছোট লঞ্চটা যেই ডান দিকে মোচর দিয়েছে অমনি ওটা সোজা উলটে বড় লঞ্চের নিচে পড়ে ডুবে নদীর তলায় চলে গেলো । একজন যাত্রীও বের হতে পারলো না । হাতীমারা ঘাটের সিসি ক্যামেরায় এই দৃশ্য ধরা পড়লো । মুহুর্তে এই ক্যামেরায় ধারণকৃত ভিডিওটা টেলিভিশন ও ফেইসবুক সোসাল মিডিয়ায় প্রচার হতে লাগলো । টিভি নিউজে দেখে হুরমুজ আলীর বউ আতকে উঠলো । হুরমুজকে ফোন দিলো । ফোন বাজলো না । বউ বুজে ফেললো হুরমুজের ভাগ্যে কি হয়েছে । ফোন যেহেতু বাজছে না সে ধরেই নিলো হুরমুজ আলীর সলিল সমাদি হয়েছে ।

তন্দ্রার মধ্যে হুরমুজ একটা ঝাকুনি খেয়ে সীট থেকে পড়ে গিয়েছিল । তাকে পানি ঘিরে ফেলেছে । সে বুজতে পারলো লঞ্চ ডুবে গেছে। এখন বাচার চেষ্টা করতে হবে । সে আগে থেকেই ডুবে থাকায় পাকা ছিল । সে দম বন্ধ করে আশে পাশের দরজা জানালা খুঁজতে লাগলো । সে হঠাত বাতাসের সন্ধান পেলো । নাক মুখ-ভরে বাতাস নিয়ে নিল । অন্ধকারে কিছু দেখা গেলো না । হাতে একটা খুটির মতো লাগলো । ওটাতে ধরলো সক্ত করে । খুঁটির নিশানা সে ঠিক রেখে এদিক সেদিক ঘুরাগুরি করলো । সব দিকেই পানি । পানির বেড়া । হাতে লাগছে । উপর দিকে বাতাস । খুঁটি বেয়ে উপর দিকে উঠার চেষ্টা করলো । কিন্তু উপর দিকে ছাদের মতো । হুরমুজ সাহস পেলো । মনে করলো হয়তো কাছাকাছিই আছি । কেউ এসে উদ্ধার করবে । অঞ্জলি ভরে কিছু পানি খেলো । কিছুক্ষণ পর অনেক প্রশ্রাব হলো । পাশের পানি নিয়ে অজু করলো । ইশারায় দু’রাকাত নামাজ পরলো । সুরা হাশর, আয়াত আল কুরশি ও ইয়াসিন সুরার কিছু অংশ পড়ে আল্লাহর কাছে মোনাজাত করে কান্নাকাটি করলো যেন এখান থেকে কেউ এসে তাকে উদ্ধার করে । তার মনের ভিতর ভিসন বল ছিল । আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে কিছু চাইলে আল্লাহ নিরাশ করেন না । তাবলীগে গিয়ে এটা শিখেছিলো । এভাবে আশায় আশায় তার সময় যাচ্ছিল। এই যে পানির ভিতর বাতাসের ঘরে হুরমুজ আলী বেচে আছে এটাও সে মনে করলো আল্লাহ তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করে দিয়েছে । কাজেই, সে আল্লাহ ভরসা করে অপেক্ষায় থাকলো ।

লোকে লোকারণ্য ঘটনা স্থল। টিভি চ্যানেললোতে লাইভ দেখাচ্ছে। স্বজনরা আহাজারি করছে। লঞ্চ এত পানির গভীরে চলে গেছে যে লঞ্চেরই হদিস পাচ্ছে না উদ্ধারকারী দল। প্রায় ৯ ঘন্টা পর পানির নিচে লঞ্চের হদিস পাওয়া গেলো। পঞ্চাশ জন যাত্রীর একটা লাশও ভেসে উঠেনি। তার মানে সব যাত্রী লাশ হয়ে লঞ্চের ভিতরেই আটকা পড়েছে। লঞ্চ পানির নিচ থেকে টেনে তোলার জন্য উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তমকে আনা হলো। প্রথমে ডুবুরিরা বেলুন নিয়ে গিয়ে লঞ্চের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে এলো। মেশিন দিয়ে পাম্প করে মস্তবড় বেলুনটা ফুলালে বাতাসের চাপে লঞ্চটার ছাদ পানির উপর জেগে উঠলো। ততক্ষণে রাত হয়ে গেছে। উৎসুক জনতার সংখ্যাও কমে গেছে। শুধু লাশের স্বজনরা রয়ে গেছে লাশ সনাক্ত করে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। ইতিমধ্যে ডুবুরিরা একটা দু’টা করে লাশ তুলে আনা শুরু করলো লঞ্চের ভেতর থেকে। সবার দৃষ্টি লাশের দিকে।

ডুবুরিরা পানির নিচে লঞ্চের ভেতর থেকে খুঁজে খুঁজে লাশ ধরে ধরে বের করছে। এক ডুবুরি পেয়ে গেলো হুরমুজ আলীকে। সে হুরমুজ আলীর পা ধরে টেনে তুলে আনলো পানির উপরে। একজনে মুখের উপর টর্স লাইট ফেললো লাশ সনাক্ত করার জন্য। হুরমুজ আলী চোখ খুলে একটু তাকিয়ে আবার বন্ধ করে দিলো। শরীর খুব দুর্বল । ঠিক ঠাক স্বাস নিলো। তাতে পেট উচু নিচু হলো। একজন বলে উঠলো “এ্যা, এতো বেঁচে আছে মনে হয়!” হুরমুজ আলী সামান্য হা করে স্বাস নিলো। সবাই নিশ্চিত হলো বেঁচে আছে। একজন চিতকার করে বলে উঠলো “একজন বেঁচে আছে এখনো। সবাই দোয়া কালাম পড়ুন।” টিভি সাংবাদিকরা সবাই লাইভ দেখানো শুরু করলো হুরমুজ আলীকে। হুরমুজ আলী মিটিমিটি তাকায় আর মৃদু মৃদু নিশ্বাস নেয়। উদ্ধারটীমের হেলথ ওয়ার্কাররা হুরমুজ আলীর শরীরের তাপমাত্রা বাড়ানোর জন্য যতরকম চেষ্টা করা দরকার সব করতে লাগলো। একজনে ফোমের কম্বল দিয়ে তার শরীর ঢেকে দিলো। দু’জনে দু’পায়ের তলা মাসাজ করতে লাগলো। দু’জনে দু’হাতের তালু মাসাজ করতে লাগলো। এমন আরাম হুরমুজ আলী জীবনেও পায়নি। সরকারি কর্মচারী কর্মকর্তারা তার শরীর মাসাজ করে দিচ্ছে। এতো সৌভাগ্য ক’জনার হয়? হুরমুজ আলী চোখ বন্ধ করে উপভোগ করছে। টিভিতে লাইভ ব্রটকাস্টিং চলছে অবিরাম। সারা বিশ্বের কোটি বাংগালী যে যে দেশেই থাকুক না কেনো দেখছে হুরমুজ আলীকে। টিভি সাংবাদিকের সব কথা হুরমুজ আলী চোখ বুঝে শুনতে পাচ্ছে। সে শুনতে পাচ্ছে সাংবাদিক বলে চলেছেন “দর্শক আপনারা দেখতে পাচ্ছেন লঞ্চডুবির ১৩ ঘন্টা পরও গভীর পানির নিচে একজন যাত্রী বেঁচে আছেন। আমাদের দক্ষ ডুবুরিরা তাকে বের করে এনেছে। তাকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। শিগগির তাকে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করা হবে। তাকে অক্সিজেন দিতে হবে। তার আগে তার শরীরের তাপমাত্রা কমানোর চেষ্টা চলছে। রাখে আল্লাহ, মারে কে? মারে আল্লাহ রাখে কে? ১৩ ঘন্টা পানির নিচে থেকেও আল্লাহ পাক মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। এ এক অলৌকিক ঘটনা আজ আমরা প্রত্যক্ষ করছি।” এই কথাগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সাংবাদিক অনবরত বলে যাচ্ছিলেন। হুরমুজ আলী চোখ বন্ধ করে শুনে যাচ্ছিল। তার বলতে ইচ্ছে করছিল “তাপমাত্রা কমানোর চেষ্টা করছে না। বাড়ানোর চেষ্টা করছে।” কিন্তু সে তা না করে আরাম পেতে থাকলো।
সারা বিশ্বের অগনিত বাংগালী এই দৃশ্য দেকে হতবাক হলো আর আল্লাহ পাকের কুদরতের তারিফ করতে লাগলো। অনলাইন টিভি নিউজের নিচে লাখ লাখ কমেন্ট পড়লো। পড়ে শেষ করা যাচ্ছিল না। কয়েকটার নমুনা দেয়া হল
“রাখে আল্লাহ, মারে কে”
“আল্লাহ পারে না এমন কিছু নাই।”
“আল্লাহ চাইলে মাছের পেটেও মানুষ জিন্দা রাখতে পারে।”
“লোকটা নিশ্চয়ই কোন কামিলকর লোক হবে। আল্লাহর প্রিয় বান্দা।”
“এখনও আল্লাহর দুনিয়ায় আল্লাহর প্রিয় বান্দা বেঁচে আছে।”
“এ এক অলৌকিক ঘটনা। ”

রীমান আহমেদ পড়ার ফাঁকে ফাঁকে সব কিছু পর্যবেক্ষণ করছিল আর ব্যাপারটা বুঝার চেষ্টা করছিল। সে কোন কিছুই সহজে মেনে নেয় না। তার একবার ইচ্ছে হলো কমেন্ট বক্সে লিখতে “এটা হতে পারে না। কোন কিন্তু আছে এর মধ্যে।” কিন্তু সারা বিশ্বের মানুষ এক দিকে আছে সরল বিশ্বাস নিয়ে। সেখানে এমন কমেন্ট করলে তাকে খারাপ ভাববে। তাই, আপাতত কোন কমেন্ট লিখল না। রীমান কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষ এমবিবিএস পড়ে। মানবদেহের ফিজিওলজি ও প্যাথলজি পড়া তার শেষ। কাজেই যতই আল্লাহর কুদরতের দোহাই দিয়ে এই ঘটনার বর্ণনা দেয়া হোক না কেনো এটাতে কোন কিন্তু আছে। ইসলাম ধর্মের বই পুস্তক পড়ে তার আল্লাহ সম্পর্কে ভালো ধারণা হয়েছে। আল্লাহ এমন করেন না। করলেও সেটা নবী রাসুল গণের বেলায় প্রযোজ্য। সেই পর্ব আল্লাহ নিজেই ঘোষণা দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছেন। ১৩ ঘন্টা পানিতে জীবিত থাকার ঘটনা রীমানের বিশ্বাস হলো না। রীমান নতুন করে পড়তে লাগলো এই তত্ব জানার জন্য যে পানিতে ডুবে থাকলে মানুষ কতক্ষণ জীবিত থাকতে পারে? স্বাস না নিয়ে মানুষ কতক্ষণ জীবিত থাকতে পারে? ব্রেইনে কতক্ষণ অক্সিজেন না পেলে মানুষ জীবিত থাকতে পারে? সহজে জানার জন্য সে গুগুল সার্স দিলো। একটা জায়গায় সে এমন একটা ৩ এর হিসাব পেলো “মানুষ সাধারণত ৩ মিনিট অক্সিজেন ছাড়া বাঁচতে পারে, ৩ দিন পানি ছাড়া বাঁচতে পারে, ৩ সপ্তাহ খাবার ছাড়া বাঁচতে পারে।” তবে এর থেকে কিছুটা এদিক সেদিক হতে পারে। কাজেই ঐ লোকটার কোন দুই নম্বরি থাকতে পারে।

এদিকে রাতে হুরমুজ আলী বাড়ি না ফেরাতে হুরমুজ আলীর স্ত্রী চিন্তিত হলো। ফোন দিলে ফোন রিং হলো না। চিন্তায় বউ ছটফট করছিল। স্বামীর চিন্তায় ঘুম আসছিলো না। মেয়ে হ্যাপি আক্তার দেখেছে তার মা বিছায় একবার শোয় আবার উঠে। মেয়ে মাকে জিজ্ঞেস করে
– মা, তুমি ঘুমাও না?
– কি ঘুমামু, মশায় ধরে।
– ক মশা, আমারে ত ধরে না?

কিছুক্ষণ ছটফট করে একময় ঘুমিয়ে পড়ে। এদিকে হাসপাতালে নেয়ার পর ডাক্তাররা হুরমুজ আলীকে সুস্থই পান। তাই, তেমন কিছু করতে হয়নি। শুধু বিছায় বিশ্রাম। কাউকে রোগীর সাথে কথা বলা নিশেধ। রাতে আরামে ফোমের নরম বিছানায় শুয়ে শুয়ে হুরমুজ আলী ভাবে পীর বনে যাবার এটাই মোক্ষম সময়। সময় মানুষের একবারই আসে। এবার তার সময় এসে গেছে। খুব কৌশলে কাজে লাগাতে হবে। একবার মনে হলো বউকে একটা ফোন দেয়। কিন্তু ফোনটা পানিতে হারিয়ে গেছে। তার পরনে লুঙ্গি ছিল। লুঙ্গি কোসা দিয়ে পানিতে নেমেছিল। মোবাইলটা রেখেছিল লুঙ্গির কোছায়। ডুবুরি হুরমুজের লুঙ্গি ধরে টান দিলে মোবাইল পানিতে পড়ে যায়। মোবাইলের ভেতরে পানি ঢুকে হয়তো ওটা বন্ধ হয়ে গেছে। বউয়ে ফোন করলেও পাবে না। ফোনের চিন্তা করি না। একবার পীর হতে পারলে অমন মোবাইল কেনা কোন ব্যাপারই না। আগামীকাল টিভি সাংবাদিক আসতে পারে। সুন্দর করে গুছিয়ে বলতে হবে। কি কি বলতে হবে হুরমুজ আলী ভালো করে গুছিয়ে রাখলো। সকাল ১০ টায় সাংবাদিক এসে লাইভ সাক্ষাৎকার নেয়া শুরু করলেন। আবার সারা বিশ্বের বাংগালীদের চোখ গেলো টিভি পর্দায়। ফেইসবুকেও লাইভ ভিডিও ব্রটকাস্ট হলো। রীমানও সেই সাক্ষাৎকার শুনলো। লাইক কমেন্টে ভরে গেলো নিউজ পোর্টাল।

বাড়িতে হুরমুজের মেয়ে হ্যাপি আক্তার টিভিতে দেখতে পেলো তার বাবাকে হাসপাতালের বেডে বসে সাক্ষাৎকার দিতে। মা রান্না ঘরে রান্না করছিল। ডাক দিয়ে বলল “মা, দেখে যাও, বাবারে টিভিতে দেখাইতাছে।” দৌড়ে এসে টিভির সামনে দাড়ালো হুরমুজের বউ। সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেন
– ভাই, আপনার নাম কি?
– আমার নাম হুরমুজ আলী বেপারি।
– ভাই, লঞ্চটা কিভাবে ডুবে গেলো সেটা কি একটু বলবেন?
– আমি ছিলাম লঞ্চের ভিতর বসা। একটু ঘুম ঘুম লাগছিল। একটা আঁতকা মাইরা জাকি খাইলো। তার পরই লঞ্চটা পানির নিচে চলে গেলো।
– আপনি লঞ্চের কোন পাশে বসেছিলেন?
– আমি বসা ছিলাম লঞ্চটার ডান দিকে।
– তারপর কি হলো তা দর্শকদের উদ্দেশ্যে খুলে বলুন।
– আমি বারী খেয়ে ছিটকে পড়লাম ইঞ্জিনের কাছে। হাতে একটা কি যেনো বাজলো। শক্ত করে ধরে ফেললাম এই ভেবে যে এক সময় যখন লঞ্চটা উঠানো হবে আমি সহ যেন উঠে আসি।
– ডুবে গিয়ে পানি খেয়েছিলেন না?
– পানি প্রথমই অল্প কিছু খেয়েছিলাম। তা পেছাব করার পর পেট খালি হয়ে যায়।
– আপনি পানি খেয়ে পেছাব করেছেন?
– হে, পেছাব করার পরই পেট খালি হয়ে যায়। তারপর আমি অজু করি। কলেমা পড়ি। আল্লাহ পাককে ডাকি। আপনি পানিতে ডুবে ছিলেন। আবার বলছেন অজু করলেন। কিভাবে?
– আমি যেখানে ছিলাম সেখানে পানি ছিলো না। একটা লাশ পরে ছিলো। আমি ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছি।
– লঞ্চ পানির নিচে গভীরে ডুবে ছিল। আপনার জায়গায় পানি ছিলো না। এটা কি করে হয়?
– আল্লাহ পাকের ইচ্ছা। আল্লাহ পাক আমাকে রক্ষা করেছে। আমি অজু করে আল্লাকে ডেকেছি। সুরা হাশর পড়েছি, সুরা ইয়াসিন পড়েছি। আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করেছি। মাওলাই আমারে বাঁচাইছে।
– তো দর্শক। আপনারা দেখছেন গতকাল রাতে যে লঞ্চটা উদ্ধার করা হয়েছে ডুবে যাওয়ার ১৩ ঘন্টা পর সেই লঞ্চেরই একজন যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। আল্লাহ চাইলে সবই পারে। রাখে আল্লাহ মারে কে?

এদিকে হুরমুজের বউ টিভিতে সাক্ষাৎকার দেখে কপাল থাপরাচ্ছে আর বলছে “যে নাকি নামাজও ঠিক মতো পড়ে না। সে এগুলো কী বলছে। হাসপাতাল বেড থেকে দেয়া অনলাইন সাক্ষাৎকার দেখে লাখো লাখো কমেন্ট পরতে লাগলো আল্লাহর কুদরতের তারিফ করে। এখনো আল্লাহর প্রিয় বান্দা আছেন। প্রিয় বান্দাদেরকে এভাবেই আল্লাহ রক্ষা করেন মৃত্যুর হাত থেকে।
কিন্তু রীমান এবার উল্টো কথা লিখে ফেললো কমেন্টে। লেখলো “আমার কাছে লোকটার কথা শুনে গাঁজাখুরি কথা মনে হলো। সন্দেহ করতে হবে। আপনারা একটু খতিয়ে দেখুনতো উদ্ধারের আগ মুহুর্তে তাকে আশে পাশে দেখা গেছে কিনা কোন ভিডিও ফুটেজে অথবা কোন ছবিতে।”

পাঁচ মিনিট পরেই ফেইসবুকে একজন একটা ছবির লাগিয়ে স্ট্যাটাস দিয়ে ফেললো যেখানে দেখা গেলো উদ্ধারের আগ মুহুর্তে হুরমুজ আলী উদ্ধারকারিদের কাজ তদারকি করছে। সাথে সাথে আরো বেস কিছু স্ট্যাটাসে এমন অনেক ছবি ও ভিডিওতে হুরমুজ আলীকে সবাই দেখতে পেলো। তাইলে কিবায় কি হলো? এটাই সবার প্রশ্ন।

ফেইসবুক দেখে হুরমুজের চাচাতো ভাই হুরমুজের বাড়িতে এলো। বিস্তারিত জানতে চাইলো। হুরমুজের বউ বিস্তারিত জানালে সে বলল “এবার দেখা যাবে মজার খেলা। হুরমুজ কেরামতি দেখায়ে খুব সম্ভব পীর হতে চেয়েছিল। ভালো করেই ধরা খাইছে। এবার সত্য কথা বাইর করার জন্য রিমান্ডে নিবে। ডিম থেরাপি দিবে।”
– কী থেরাপি?
– ডিম থেরাপি।
– সেটা কেমন?
– ডিম সিদ্ধ করে গরম ডিম শরীর দিয়ে ঢুকিয়ে দিবে? তখন সত্য কথা প্যারপ্যারি বের হয়ে যাবে।
– হ্যায়, আল্লাহ! কী কয়?
– কমে ছাড়বে? সরকারি উদ্ধারকারীরা তার হাত পায়ের তলা টিপা দিছে। জনগণ ছাড়লেও তারা ছাড়বে না।

ওদিকে উদ্ধারকারীরা মোট ৪৯টা লাশ বের করেছিল লঞ্চ থেকে। সেই লাশের খবর কেউ জানতে পারলো না গত দুই দিন। বড় লঞ্চটার চালকের কি হলো কেউ জানলো না।

ফেইসবুক স্ট্রলে ছবিতে হুরমুজ আলীর মতো যাকে দেখা গেছে সে আসলেই হুরমুজ আলী না । হুরমুজ আলীর চেহারার সাথে হুবুহু মিল আছে । সেও একজন ডুবুরি সদস্য। ছবি দেখে ছুটে গেলো হাসপাতালে হুরমুজ আলির বেডের কাছে । আবার সাংবাদিকরা নতুন করে প্রচার করা শুরু করলো “দেখেন ছবিতে যাকে দেখা গেছে সে আসলেই হুরমুজ আলী না । ইনিই হলেন সে ডুবুরি যাকে হুরমুজ আলীর মতো দেখা গেছে । আল্লাহর কি কুদরত, আসলেই আল্লাহ পাক পানির ভিতর বাতাস রেখে হুরমুজ আলী ভাইকে বাচিয়ে রেখেছেছেন ।

টিভি নিউজ দেখে রীমান টাস্কি খেয়ে গেলো । কিবায় কী?
সে আবার ইন্টার্নেটে সার্চ দেয়া শুরু করলো “পানির ভিতর বাতাস বন্দী” লিখে । অবশেষে পেয়ে গেলো একটা আর্টিকেল সাধারন জ্ঞানের । লিখেছেন ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার । আর্টিকেলটা ছিল এমন ।

পানির ভিতর বাতাস বন্দী
(সাধারন জ্ঞানের )
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আপনারা অনেকেই যাত্রীসহ লঞ্চ ডোবার ভিডিও দেখেছেন। ডুবুরিদেরকে ডুবন্ত লঞ্চ থেকে লাশ বের করে আনতে দেখেছেন। আবার ডুবন্ত লঞ্চ থেকে ১৩/১৪ ঘন্টা পর জীবিত যাত্রী তুলে আনতেও দেখেছেন। ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য হলেও বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সত্যি।
আমরা জানি মানুষ সাধারণত অক্সিজেন ছাড়া ৩ মিনিট, পানি ছাড়া ৩ দিন এবং খাদ্য ছাড়া ৩ সপ্তাহ বেচে থাকতে পারে। আমরা নিশ্বাসের সাথে বাতাস থেকে অক্সিজেন নেই। ফুসফুসে গিয়ে অক্সিজেন রক্তের লোহিত কণিকার সাথে প্রবাহিত হয়ে শরীরের বিভিন্ন কোষে প্রবেশ করে। এই অক্সিজেন না পেলে কোষ মরে যায়। ভাইটাল অংগের কোষ মরে গেলে মানুষটাই মরে যায়। পানিতে সামান্য পরিমানে অক্সিজেন মিশ্রিত থাকে। মানুষ পানি থেকে অক্সিজেন নিতে পারে না। মাছ ও জলজ প্রাণী অক্সিজেন নেয় ফুলকার সাহায্যে পানি থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে। কাজেই, মানুষ পানিতে ডুবে গেলে অক্সিজেন না পেয়ে মরে যায়। ব্রেইনে অক্সিজেন কম পরলে সয়ংক্রিয়ভাবে শ্বাস প্রশ্বাস চালু হয়। তাই, ডুবে যাওয়া মানুষ স্বাস নেয়ার জন্য হা করলে ফুসফুসে বাতাসের পরিবর্তে পানি প্রবেশ করে। পানি গলা দিয়ে পেটেও প্রবেশ করে। নৌকার গলুইয়ে বসে থাকা মানুষ হঠাৎ হার্ট এটাকে মারা গেলে কাত হয়ে পানিতে পড়ে ডুবে যাবে। এই মৃত লোকটাকে পানি থেকে উদ্ধার করে তুলে আনলে দেখা যাবে যে তার ভিতরে পানি প্রবেশ করেনি । কারন, মৃত মানুষ পানি খেতে পারে না, নিশ্বাস নিতে পারে না।

যাত্রী বাহী কোন একটা লঞ্চকে যদি বড় একটা জাহাজ এক দিক থেকে ঠেলা দিয়ে কাত করে ডুবিয়ে উপর দিয়ে চলে যায় তা হলে লঞ্চটা হঠাৎ উপুড় হয়ে পানি প্রবেশ করে ডুবে যাবে নদীর তলায়। লঞ্চের তলা থাকবে উপরের দিকে। সব দিক থেকে লঞ্চে পানি প্রবেশ করবে, শুধু উপরের দিক বাদে। অর্থাৎ তলার দিক বাদে। তলার দিকই হবে তখন ছাদ সরূপ। লঞ্চ ডুবার সমায় ভিতরে যে বাতাস ছিল তা উপরের দিকে চলে গিয়ে নতুন ছাদের নিচে অবস্থান করবে। এই আটকা বাতাসকে তিন দিক থেকে নদীর পানি চাপ দিয়ে এক জায়গায় নিয়ে জড়ো করে রাখবে নতুন সৃষ্ট ছাদের নিচে। পানির ভিতর বাতাসের প্রবাহের দিক হলো উপরের দিক। ডুবন্ত উপুর হওয়া লঞ্চের উপরে দিক লঞ্চের তলা দিয়ে বন্ধ। তিন দিকে পানির চাপ দিয়ে গোলাকৃতি বাতাসের একটা বল তৈরি করবে। বাতাস যত বেশী হবে বাতাসের বল তত বড় হবে। কোন একজন শক্তিশালী যাত্রী যদি লঞ্চের ভিতর সাঁতার কেটে হটাৎ এই বাতাসের বল পেয়ে যায় তবে সে অক্সিজেন পেয়ে গেলো। সে চোখে কিছু না দেখলেও হাত দিয়ে বাতাসের বলের সীমানায় পানি স্পর্শ করতে পারবে। প্রয়োজনে পানি খেতে পারবে। প্রশ্রাব-পায়খানা করতে পারবে। দোয়া কালাম পড়তে পারবে। মানুষ ফাঁফর হয় অক্সিজেন না পেয়ে। এই মানুষটা অক্সিজেন পাচ্ছে। তাই, ফাঁফর হবে না। সে অক্সিজেন ও পানি দুটিই পাচ্ছে। শুধু খাদ্য পাচ্ছে না। খাদ্য ছাড়া মানুষ সাধারণত ৩ সপ্তাহ বেঁচে থাকতে পারে। তাই, যদি তিন সপ্তাহের মধ্যে ডুবুরিরা তাকে উদ্ধার করে তবে সে বেঁচে গেলো।
আর্টিকেল পড়ে রীমান সব কিছু বুঝে ফেললো । এবার মনোযোগ দিলো মেডিকেলের পড়ায় ।
১০/৭/২০২০ খ্রি.
ময়মনসিংহ
পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ দেখার জন্য ক্লিক করুন
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

বুলবুল হায়দারের সমাজ উন্নয়ন

বুলবুল হায়দারের সমাজ উন্নয়ন

(কল্প কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

বুলবুল ভাইকে যখন আমি প্রথম দেখি তখন আমি ক্লাস থ্রিতে পড়তাম। গাছের শিকরে বসে গাছের সাথে হেলান দিয়ে পড়ার অভ্যাস ছিলো আমার। বাংলা পাঠ্যবই থেকে সত্যেন্দ্র নাথ দত্তের কবিতা পরছিলাম ছন্দে ছন্দে শরীর দুলিয়ে। পড়ছিলাম

“ছিপ খান তিন দার

তিন জন মাল্লা

চৌপর দিন ভর

দেয় দৌড় পাল্লা।।”

মাথা উচু করে চেয়ে দেখি একজন শুকনো চেহারার লম্বা লোক দাঁড়িয়ে আমার পড়া শুনছেন। আমি লজ্জা পেয়ে চুপ করে গেলাম। তিনি বললেন “খুব ভালোই তো আবৃতি করছিলে। আবার পড়।” আমি লজ্জায় কথা বলতে পারছিলাম না। তিনি আবার বললেন “তোমার কবিতা আবৃত্তি আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে। তুমি আবার শুনাও।” কিছুতেই শুনাচ্ছিলাম না। বারবার অনুরোধ করাতে আমি আবার কবিতা আবৃত্তি করলাম। কিন্তু আগের মতো হলো না। তিনি বললেন “আগের মতো শরীর দুলিয়ে পড়। কিন্তু আমি আর আগের মতো শরীর দুলিয়ে পড়তে পারলাম না। তিনি বললেন “আমার নাম বুলবুল হায়দার। তুমি আমাকে চেনো?” আমি মাথা নাড়িয়ে বুঝালাম যে চিনি না। তিনি বললেন

– আমার বাড়ি জিতাশ্বরি। মসজিদের দক্ষিণের বাড়িটাই আমাদের। আমার বাবার আজান হয়তো তুমি শুনেছ। খুব জোড়ে শব্দ করে সুর করে আজান দেন মসজিদে। তুমি শুননি?

– একটা আজান পশ্চিম দিক থেকে শুনা যায়। তবে ভোরে ফজরের আজান এবং রাতের ঈশার আজান শুনা যায়। অন্যসময় শুনি না। খুব সুন্দর সেই আজানের আওয়াজ।

– আমার বাবা নামাজের ৫ ওয়াক্তই আজান দেন। দিনের বেলায় অন্যান্য শব্দের জন্য হয়তো তুমি দিনের আজান শুনতে পাওনা।

– তা হতে পারে।

– তুমি কোন ক্লাসে পড়?

– আমি ক্লাস থ্রিতে পড়ি।

– কোন স্কুলে যাও?

– কাইলা স্কুলে।

– ওভাবে বলে না। বলতে হয় ‘ঘোনারচালা ফ্রি প্রাইমারি স্কুল।’

– তোমাদের হেড স্যারের নাম কি?

– খোরশেদ স্যার।

– অভাবে বলতে নেই। বলতে হয় “জনাব খোরশেদ আলম।”

– আপনে কোন ক্লাসে পড়ুন?

– আমি এবার এসএসসি পরীক্ষা দেব।

– মানে মেট্রিক পরীক্ষা?

– হ্যা, মেট্রিক পরীক্ষাও বলে।

– আমাগ ভুলু ভাই গতবার সেকেন্ড ডিভিশনে মেট্রিক পাশ করছে । আপনের নাম কি ভাই?

– আমার নাম বুলবুল হায়দার। বুলবুল বলেই ডাকে।

এভাবে কথা বলে পরিচয় হয় বুলবুল ভাইর সাথে। আরেকদিন আমি পড়ছিলাম গাছের ডালে বসে। গাছের বড় ডালটার দু’শে দু’পা ঝুলিয়ে ঘোড়ায় চড়ে বসার মতো করে বসে গাছের কান্ডে হেলান দিয়ে পড়ছিলাম নিঃশব্দে। আমি বেশী সময়ই নিঃশব্দে পড়তাম। গাছে বসে পাখির ডাক শুনতাম। পাখি কিন্তু সুরে সুরে ডাকে। একেক পাখির সুর একেক রকম। কোন কোন পাখি এমন ভাবে ডাকে যেনো মনে হয় কথা বলছে। বুলবুল ভাই পশ্চিম দিক থেকে এলেন। গাছের নিচে এসে দাড়ালেন। আগেরবার আমি শিকরে বসে পড়ছিলাম সেখানে কিছুক্ষণ চোখ রাখলেন। আমি উপর থেকে বলে উঠলাম “ভাই কি আমাকে খুজছেন?” বুলবুল ভাই উপর দিকে তাকিয়ে আমাকে দেখতে পেয়ে বললেন “তুমি গাছে বসে পড়ছ?”

– আমার গাছে বসে পড়তে ভালো লাগে। পড়তে পড়তে পাখির গান শুনি।

– আজ স্কুলে গিয়েছিলে?

– গিয়েছিলাম।

– ঠিক আছে, পড়।

বুলবুল ভাই পুর্ব দিকে চলে গেলেন। এরপরও বুলবুল ভাইর সাথে আমার অনেকবার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। আমার পড়াশোনার খোজখবর নিতেন সবসময়। বুলবুল ভাই সবসময় সাদা পাঞ্জাবী ও সাদা পাজামা পরতেন। সাথে স্পঞ্জের সেন্ডেল পা দিতেন। হাটার সময় সেন্ডেলের ধুলা লেগে পাজামার নিচের অংশ ময়লা হয়ে থাকতো। পাহাড়িয়া লালমাটির ধুলায় ঘাম লেগে লালচে দাগ হতো।

১৯৭১ সনের স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় বুলবুল ভাইকে দেখেছি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী করতে। প্রত্যেক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর হাতে একটা করে বেত থাকতো। তার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধার খাবার যোগান দিতো। এলাকার সকল অন্যায়ের বিচার করতো। কেউ যাতে না খেয়ে না থাকেন তার দেখাশোনা এই বাহিনী করতো। ধনীদের থেকে শস্য নিয়ে গরীবদের মাঝে বন্টন করে দিতেন বুলবুল ভাই।

১৯৭৪ সনের এক বিকেলে বুলবুল ভাই আমাদের এলাকার সব ছাত্রদের ডেকে জিতাশ্বরির এক বাচ্রাক্ষেতে বসে মিটিং করলেন। সে বছর দেশে খুব আকাল পড়েছিল। সবাই অভাবে পড়ে যায়। অনেকে কষ্ট করে ভাত হয়তো যোগার করতে পারতো কিন্তু তরকারি যোগার করতে পারতো না। রান্না করে গরম ভাতে পানি দিয়ে পান্তাভাত বানিয়ে লবন মরিচ দিয়ে খেতো। সেই লবনও বাজারে পাওয়া যেতো না। পাওয়া গেলেও দাম ছিল খুব চড়া। দাম বাড়তে বাড়তে একবার ৬০ টাকা শের (প্রায় এক কেজি) হয়েছিল লবনের দাম। তখনকার এক টাকা এখনকার ১৫-২০ টাকার সমান। এমন অভাবের সময় কেউ পরনের নতুন কাপড় কিনতে পারতো না। আমরা ছিলাম গ্রামের ছাত্র। প্রায় সবাই লুঙ্গি পড়তাম। জহিরুল ভাইকে দেখেছি ফুল প্যান্ট পরতে। বুলবুল ভাইর ডাকা সেই মিটিংয়ে ছত্তর ভাই এসেছিলেন এমন একটা ছেড়া লুঙ্গি পরে যে সামনে পেছনে ডানে বামে সব দিকেই ফুটা ছিল। ফুটা দিয়ে তার থোরার ফর্সা চামড়া দেখা যাচ্ছিলো। সবচেয়ে বেকায়দায় ফেলেছিলো তার পেছনের ছিদ্রটা। বুলবুল ভাই ছত্তর ভাইকে বললেন লুঙ্গিটা ঠিক করে পরতে। ছত্তর ভাই লুঙ্গি যেদিকেই ঘুরান তার পিছনে একটা ছিদ্র পড়ে। বুলবুল ভাই বললেন লুঙ্গিটাকে উল্টিয়ে দুই ভাঁজ করে পড়তে। ছত্তর ভাই লুঙ্গি ভাঁজ পরলেন। এবার লুঙ্গির দুই পারই উপর দিকে পরা হলো। ছেড়া ছিদ্র ঢাকা পড়লো। কিন্তু লুঙ্গি শর্ট হয়ে হাটু পর্যন্ত উঠে এলো। ছত্তর ভাই মাঠে লেটা দিয়ে বসে পরলেন। মিটিং শুরু হলো। মিটিংয়ের বিষয়বস্তু ছিল পাড়ায় ছাত্রদের নিয়ে সমিতি করা। ছাত্রদের কল্যাণ করা ও সমিতির দ্বারা এলাকার উন্নয়ন করাই সেই সমিতির উদ্দেশ্য ছিল। সবাই সমিতি করার পক্ষে কথা বললো। কিন্তু ছত্তর ভাই রাজি হলেন না। কেনো হবেন না তার কোন ব্যখ্যা দিলেন না। বুলবুল ভাই সমিতির নাম প্রস্তাব করলেন “জোনাকি ছাত্র সংঘ।” মুকুল ভাই জিজ্ঞেস করলেন “ভাই, জোনাকি ছাত্র সংঘ নাম দেয়ার ব্যখ্যা কি?” বুলবুল ভাই ব্যাখ্যা দিলেন “জোনাকি পোকা অন্ধকারে ঝোপঝাড়ে থাকে। রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে জোনাকি পোকা নিজের শরীর থেকে আলো জ্বালায়। অনেকগুলো জোনাকি যখন একসাথে আলো জ্বালায় তখন ঝোপঝাড়ের অন্ধকার দুর হয়ে আলোকিত হয়। আমাদের এই পাহাড়ি এলাকা অনুন্নত। অন্ধকারে পড়ে আছে। আমরা ছাত্ররা এই অন্ধকারের একেকটা জোনাকি পোকা। আমরা একসাথে শিক্ষার আলো জ্বালবো। আমাদের এলাকায় শিক্ষায় আলোকিত হবে। ছাত্রসংঘ করে আমরা সেই আলোর পথে এগিয়ে যাবো।” সবাই রাজি বুলবুল ভাইর প্রস্তাবে। একমাত্র ছত্তর ভাই রাজি হলেন না। সমিতির কর্মকাণ্ড দেখে পরের বছর ছত্তর ভাই সমিতিতে ভর্তি হন। সবাই সমিতিতে কিছু কিছু চাঁদা দিতো। সমিতির কর্মকান্ড দেখে খুশী হয়ে এলাকার মুরুব্বিরা বেশী পরিমানে চাঁদা দেন। তাতে বুলবুল ভাইর হাত শক্তিশালী হয়। বুলবুল ভাই সমিতির মাধ্যমে গ্রামে একটা পাঠাগার গড়ে তুলেন। প্রচুর বইয়ের কালেকশন আছে সে পাঠাগারে। এলাকার ছাত্র যুবা মুরুব্বি সবাই সে পাঠাগারে বসে বই পড়ে। বইয়ের মাধ্যমে এলাকা জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে পড়ে। সমিতির মাধ্যমে বুলবুল ভাই প্রতি বছর দু’বার আনন্দ উৎসবের আয়োজন করেন। সেই উৎসবে এলাকার ছোট বড় সবাই আনন্দে মেতে উঠে। সারাদিন দেশীয় খেলাধুলা চলে। সন্ধায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। চলে গান বাজনা ও সাহিত্যের আসর। পুরুস্কার বিতরনি হয়। মেধাবী ও গুণিজনদেরকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা হয় সবার সামনে। সব শিশু স্কুলে গেলো কি না সেটা বুলবুল ভাই দেখভাল করেন।

 

১৯৭৫ সনে বুলবুল ভাই বিয়ে করেন। তার শশুর বাড়ি গোবর চাকা গ্রামে। রোকন বিএসসি স্যার তার চাচাশ্বশুর। বুলবুল ভাই নতুন নতুন শশুরবাড়ি গিয়েছিলেন। রাতে শশুরবাড়ি নতুন বউকে নিয়ে ঘুমিয়েছিলেন। রাত দুইটার পর পুলিশ তার ঘুম ভাঙ্গিয়ে এরেস্ট করে নিয়ে যায়। ধরতে এসেছিলো রোকন বিএসসি স্যারকে। তিনি ছিলেন গণ বাহিনীর সদস্য। বিএসসি স্যার ছিলেন খুব চালাক লোক। তিনি রাতে নিজ বাড়িতে থাকতেন না। পুলিশ রোকন স্যারকে না পেয়ে বুলবুল ভাইকে ধরে নিয়ে যান। বুলবুল ভাই পুলিশকে বুঝাতে চান যে তিনি গণবাহিনীর সদস্য না, তিনি শশুরবাড়ি এসেছেন। কিন্তু পুলিশ সন্দেহ করেন যে বুলবুল ভাই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এই বাড়িতে অবস্থান করছেন। এভাবে আরও ৩০/৪০ জন লোককে রাতের বেলায় ধরে এনে বর্গা বাজারে এনে জড়ো করে। কাইলার মহশিন ভাই যাচ্ছিলেন টাঙ্গাইলের উদ্দেশ্যে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে। বর্গার গুদারা (খেয়া) পার হবার সময় পুলিশ তাকেও গণবাহিনীর সদস্য বলে এরেস্ট করলো। দুইজন ভালো মানুষ ধরা পরলো গণবাহিনীর সদস্য সন্দেহ করে। শোনা যায় কিছু লোক পুলিশকে গোপনে টাকা দিয়ে ছাড় পেয়ে যায়। বুলবুল ভাইর মামাশ্বশুর ছিলেন একজন আর্মির লোক। সেসয় আর্মি শাসিত সরকার ছিলো। তিনি ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছিলেন। আর্মিতে চাকরি করা অনেকেই বাড়ি এসে একটা বেত হাতে নিয়ে ঘুরাফেরা করতেন। বেত হাতে থাকা লোককে গ্রামের মানুষ ভয় পেতো। বুলবুল ভাইকে ছাড়িয়ে রাখার জন্য মামাশ্বশুরকে অনুরোধ করলে তিনি বর্গার পুলিশ ক্যাম্পে গিয়ে পরিচয় দিয়ে বেত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলেন “বুলবুল অত্যন্ত ভালো ছেলে। তাকে কেনো ধরে এনেছেন।” উত্তরে পুলিশ বলেন “আপনি আর্মির লোক। আমি পুলিশের লোক। এলাকার ক্রিমিনাল কেইস আপনার চেয়ে আমি বেশী বুঝি।” পুলিশ ক্ষেপে গিয়ে বুলবুল ভাইকে অন্যান্য গণবাহিনীর সদস্যের সাথে টাঙ্গাইল জেল হাজতে চালান দিয়ে দেন। সাথে অগণবাহিনী মহসিন ভাইও জেলে ঢোকেন। এভাবে জেলে ২৯ দিন কাটে গণবাহিনীর সদস্যদের সাথে বুলবুল ভাই ও মহসিন ভাইর। আমি ঘটনা শুনে খুবই ভেঙ্গে পড়েছিলাম। শুনেছি একই জেলে এলাকার বাহিনীর মুক্তি বাহিনীর একজন কমান্ডারও ছিলেন। তাকে জেল কর্তৃপক্ষ সমিহ করে চলতো। তার নির্দেশে বুলবুল ভাই ও মহসিন ভাই বিশেষ সুবিধা পান খাওয়া দাওয়া ও কম্বল পাওয়ার ব্যাপারে।

 

আমি তখন ছোট ছিলাম। ১৯৭৪ সনে ক্লাস এইটে পড়তাম। একদিকে দেশে অভাব অনটন লেগে আছে অন্যদিকে আইন শৃঙ্খলার ব্যপক অবনতি ঘটছে। খুনাখুনির ঘটনা ঘন ঘন ঘটছে। বিচার আচার তেমন হচ্ছে না। গণবাহিনী নামে একটা আন্ডারগ্রাউন্ড বাহিনী গঠিত হয়েছিল। তাদের সদস্যরা বেশী ভাগ নাইন টেন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্র ছিল। কেউ কেউ বলতো সর্ব হারা পার্টি। তারা মানুষ মারতো দিনে দুপুরে গুলি করে। কি ভয়াবহ অবস্থা দিয়ে দিন যাচ্ছিল। এলাকার প্রভাবশালী কয়েকজন লোক তাদের দ্বারা খুন হয়। ১৯৭৫ সনে সরকার এদেরকে কঠোর হস্তে দমন করে। তারই ধারাবাহিকতায় বুলবুল ভাই ভুল ক্রমে জেল খেটেছিলেন। আমি বড় হয়ে একজন গণবাহিনীর প্রক্তন সদস্যকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তারা এমন করছিলেন কেন। উত্তরে তিনি বললেন “আমাদের উদ্দেশ্য ভালো ছিল। আমরা দেশে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েম করতে চেয়েছিলাম। সেটা করতে গেলে শ্রেণীশত্রু খতম করতে হবে। সমাজে গুটিকয়েক সুবিধাবাদি শাসনকারী ও শোসনকারী লোক আছে তাদের খতম করতে হবে। সেজন্য আমরা সমাজতান্ত্রিক দেশ থেকে অস্ত্রও সংগ্রহ করেছিলাম। কিন্তু আমাদের বাহিনীর তরুন ও যুবকরা এই অস্ত্রের অপব্যবহার করতে থাকে। তাতে আমাদের বাহিনী সফল হতে পারেনি।

 

জেল থেকে বেরিয়ে এসে বুলবুল ভাই আবার সামাজিক কাজে জড়িয়ে পরেন। ইউনিয়ন কাউন্সিলের মেম্বার পদে দাড়া করিয়ে দেয় গ্রামের সবাই। বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে বুলবুল ভাই মেম্বার হন। আনতে থাকেন সরকারি অনুদান গ্রামের উন্নয়নের জন্য। এর আগেও মেম্বাররা সরকারি অনুদান আনতেন। সেই অনুদান দিয়ে সড়ক ভাঙ্গায় মাটি ফেলতেন। তাতে ছয়মাস সড়ক দিয়ে গরুর গাড়ি ও সাইকেল চালিয়ে যাতায়াত করা যেতো। জ্যৈষ্ঠ -আষাড় মাসে পাহাড়ি ঢলের পানি বাইদ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সড়কে বাধা পেয়ে মেরামত করা স্থান ভেঙ্গে কল কলি পানি যেতো। স্রোতের পানিতে জালি, খুইয়া ও ছিপজাল ফেলে পড়ার মানুষ মাছ ধরতো। সড়কে যাতায়াত বন্ধ হয়ে যেতো। মেম্বার সাব আবার অনুদান আনতেন বাঁশের সাঁকো তৈরি করার। তাতে সাঁকো দিয়ে মানুষ পারাপার করতে পারতো। গাড়ি পার করতে পারতো না। বছরে দুইবার সরকারি অনুদানের অপচয় হতো। বুলবুল ভাই মেম্বার হয়ে এই অপচয় বন্ধ করেন। তিনি মাটি দিয়ে বাইদের সড়ক ভাঙ্গা বন্ধ না করে একবারে কালভার্ট ও সিমেন্টের ব্রিজ করে ফেললেন। তিনি আমাদের ওয়ার্ডের সব সড়ক ভাঙ্গায় ব্রিজ ও কালভার্ট পূর্ণ করে দিলেন। পরের বার তিনি চেয়ারম্যান পদে ইলেকশন করে বিপুল ভোটে জয়ী হলেন। একবার না পরপর তিন বার ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হলেন। রাস্তা ঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ব্যপক উন্নয়ন করলেন।

 

এলাকার পাশকরা ডাক্তারদের দিয়ে ঘন ঘন ফ্রি চিকিৎসা ক্যাম্প করে স্বাস্থ্য সেক্টরে ব্যপক উন্নয়ন করলেন। সরকারি অনুদান এনে ইউনিয়নের প্রতিটা রাস্তা পাকা করেছেন। এই ইউনিয়নের কোন রাস্তা এখন কাঁচা নেই। সব পাকা। শুধু পাকা না, একদম তেলতেলে মসৃণ রাস্তা। সব রাস্তার দু’পাশে গাছ লাগিয়েছেন সারিবদ্ধভাবে। একেক রাস্তায় একেক রকম গাছ। কোন রাস্তার দুপাশে শুধু দেবদারু গাছ, কোন রাস্তার দু’পাশে কৃ্শ্মচুরা গাছ, কোন রাস্তার দু’পাশে শুধু ছেচড়া গাছ, কোন রাস্তার দু’পাশে শুধু তাল গাছ, কোনটিতে শুধু খেজুর গাছ, এমন রাস্তা। কিন্তু কোন একটা রাস্তার গাছের সাথে অন্য কোন রাস্তার গাছের মিল নেই। পূরা ইউনিয়নটাকে বুলবুল ভাই তার মনের মতো করে সাজিয়েছেন। ইউনিয়নের পশ্চিম অংশে নিচু বা ভর অঞ্চল। বর্ষাকালে পলাশতলীর পাদদেশে প্রচুর পানি থাকে। দেখে মনে হয় যেন সমুদ্র সৈকত। তিনি পলাশতলীকে এমন ভাবে সাজিয়েছেন যে প্রতিদিন শত শত পর্যটক বেড়াতে যায় পলাশতলীতে। দিঘীচালার বক্তার খা’র দিঘীর কাছে একটা সুন্দর মনোমুগ্ধকর রেসোর্ট বানিয়েছেন ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য। পুরা ইউনিয়নটাকে বুলবুল ভাইর স্বপ্নের রাজ্য বানিয়ে ফেলেছেন। মইলানি পুকুরটাতে শুধু পদ্মফুল লাগিয়েছেন। যেনো বুলবুল ভাইর স্বপ্নপুড়ী। আমি চাচ্ছিলাম যে অবসরে গিয়ে আমি বুলবুল ভাইকে সময় দেব। তাই, প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছিলাম। গত শীতে বুলবুল ভাইকে নিয়ে গ্রামের বাজারে বসেছিলাম জ্যোস্না রাতে। প্রায় তিন শত লোক জমায়েত হয়েছিল সেই মজলিসে। বুলবুল ভাইয়ের উত্থানের সেই সব গল্প আমি শুনালাম। বুলবুল ভাই মন্তব্য করলেন “তোমার দেখি অনেক কিছুই মনে আছে।” এপ্রিলে আবার যেতে চেয়েছিলাম গ্রামে, স্বপ্নের গ্রামে। কিন্তু করোনা ভাইরাস এসে সব পরিকল্পনা লন্ড ভন্ড করে দিয়েছে।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে সারাদেশ লকডাউন করে দেয়া হলে এলাকার কিছু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে। ফেইসবুকে দেখলাম বুলবুল ভাই ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে অনুদান বিতরন করছেন। সেই ফান্ডে আমিও বিকাশ করে কিছু টাকা পাঠালাম। বুলবুল ভাইর ফেইসবুক ঘেটে আমার মনে হলো তিনি বেশী কিছু লিখতে পারেন না। শুধু কিছু ছবি পোস্ট করেন। কারো পোস্ট পড়ে ইংরেজিতে শুধু কমেন্ট করেন “nice” অথবা “thanks”। আমি মোবাইল করে বললাম

– ভাই, আপনি ফেইসবুকে তেমন কিছু লেখেন না কেন?

– আসলে আমি তেমন কিছু লেখতে পারি না মোবাইল দিয়ে। তুমি তো দেখি বিরাট বিরাট একেকটা গল্প লেখ। কিভাবে লেখো?

– ভাই, আপনে মনে হয় মোবাইলে বাংলা টাইপ করতে পারেন না। বাংলা টাইপ করতে পারলে অনেক কিছু লেখতে পারবেন। বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা। মায়ের ভাষায় লেখা শিখুন।

– ইংরেজির চেয়ে বাংলাই কঠিন।

– কঠিন না। আমি আপনাকে শিখিয়ে দিচ্ছি। দেখবেন এখই লিখতে পারবেন।

আমি বাংলা লেখার সব কিছুই মোবাইল কলের মাধ্যমেই শিখিয়ে দিলাম। ঈদের পর থেকে প্রতিদিন দুই তিন জন করে ডাক্তার মারা যাচ্ছে করোনায় আক্রান্ত হয়ে । ফেইসবুকে নিউজ ফিডে মৃত্যু সংবাদ আসছে। আমি সব নিউজ আমার টাইম লাইনে শেয়ার করছি করোনায় শহীদ ডাক্তারদের ছবি সহ। এখন এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে ফেইসবুকে কারো ছবি দেখলেই “ইন্না-লিল্লাহ ” লিখা শুরু করে দেয় কেউ কেউ। গতকাল পর্যন্ত প্রায় ৪৩ জন ডাক্তারের করোনা হয়ে শহীদ জবার খবর জানা গেছে। এরমধ্যে হঠাৎ খবর এলো আমার স্বপ্নের বুলবুল ভাই আর নেই। মনে পড়লো সেই গাছটার কথা। সেই কাছটা এখনো সেখানেই আছে। আমিও আছি। নেই সেই বুলবুল ভাই। একজন ভালো মানুষ চলে গেলেন এই অসময়ে।

১৯/৬/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

[গল্পটা কাল্পনিক]

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ থেকে বই কেনার জন্য ক্লিক করুন

এখানে

#সাদেকুল #গল্প