Category Archives: Literature

Borishaler Kohinur

বরিশালের কোহিনূর

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

স্মৃতি কথা

বরিশালের এই কোহিনূরকে আপনারা চিনবেন না। এই কোহিনূর একজন গরীবের মেয়ে। দেখতে ছিল রবি ঠাকুরের গানের কৃষ্ণকলির মতো। তার বাবার কাছে ছিল বৃটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত মোগল সম্রাজ্ঞীর ব্যবহার করা পৃথিবীর সবচেয়ে দামী হীরা কোহিনূরের মতো। ত্রিশ বছরেরও বেশী আগে আমার প্রথম পোস্টিং হয়েছিল বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়ন উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে মেডিকেল অফিসার হিসাবে। চিকিৎসা পেশার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা থাকায় দুঃসাহসিক ইচ্ছা নিয়ে আমি সেই গ্রামের জরাজীর্ণ টিনসেড হাসপাতালে গ্রামের মানুষের চিকিৎসা দিতে থাকি। পাশে একটা পরিত্যক্ত সরকারি বাসস্থান ছিল মেডিকেল অফিসারের জন্য। ইতিপূর্বে কোন এমবিবিএস ডাক্তার সেখানে পোস্টিং হয় নি। আমিই প্রথম। ১০০ টাকা দামের চৌকি কিনে সেই বাসাতেই আমি থাকা শুরু করলাম। সাথে একটা রান্নাঘর ছিল। ওটার ভিতর কোহিনূরের বাবা ধানের ক্ষর রেখেছিলেন। আরেকটা বৈঠককখানা ছিল। ওটার ভিতর কোহিনূরের বাবা ধানের আটি রেখেছিলেন স্তুপ করে। বাড়ীর চারিদিকে পরিত্যক্ত সিমেন্টের খুটি ছিল টিনের বেড়ার। কিন্তু টিন ছিল না। একটা কামলা নিয়ে বাঁশ কিনে সেই খুটিতে বাঁশ বেঁধে বাঁশের উপর দিয়ে কলাপাতা ভাজ করে ঝুলিয়ে বেড়া তৈরি করালাম। বাড়ির পশ্চিমপাশ সংলগ্ন একটা বিরাট জমিদারি পুকুর ছিল। খুব স্বচ্ছ ছিল তার পানি। সেই পানিতে জ্যোৎস্নার আলো ঝলমল করতো। রান্নাঘর ও থাকার ঘরের গলি বরাবর পুকুরপাড়ে একটা শানবাঁধানো ঘাট ছিল। এইগুলি চরামদ্দির জমিদারদের ছিল। তারাই প্রজাদের জন্য বৃটিশ আমলে ডিসপেনসারি করেছিল। সেইটাই এখন হয়েছে সরকারি উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্র। এই বাড়ি বাংলাদেশের এক সময়ের প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আহসানুল্লাহ সাহেবের শশুরবাড়ি ছিল। সেখানে অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা আছে। পুকুরের টলটলে পানিতে শানবাঁধানো ঘাটে আমি খালি গায়ে লুঙ্গী পরে গোসল করতাম। বয়স ছিল আমার ২৭ কি ২৮। দেখতে খুব সুদর্শন ছিলাম। খালি গা দেখে পুকুরের অপর দিকের মানুষ আমার দিকে চেয়ে থাকতো। তাই, শানবাঁধানো ঘাটে বাঁশ গেড়ে কলাপাতা ভাঁজ করে বেড়া দেওয়ালাম। ফার্মাসিস্ট এর সাথে পরামর্শ করে বৈঠকখানা খালি করার সিদ্ধান্ত নিলাম। কোহিনূরের বাবাকে ডেকে বললাম “আমি সরকারি মেডিকেল অফিসার। এখানে অবস্থান করে আমি চাকরি করব। বিকেলে একটু প্রাইভেট প্রেক্টিশ করব। আপনি ধানের আটি গুলি সরিয়ে ফেলুন। এখানে চেম্বার বানাবো। রান্নাঘর থেকে ক্ষর সরিয়ে ফেলুন। এখানে রান্না করার ব্যবস্থা করব।” শুনে কোহিনূরের বাবা আমার দিকে ফেল ফেল করে তাকিয়ে রইলেন। তার গায়ে জামা ছিল না। বুকের হার সবগুলি বের করা ছিল। পেট চিমটা লাগা ছিল। নাভীর নিচে লুঙ্গী পরা ছিল। লুঙ্গীর দুই পাশ খাটো করার জন্য দুই পাশে গুজে দেয়া ছিল। উপরের পাটির দাত উঁচু ছিল। দাঁত বের করার জন্য হাসতে হয় নি। অসহায় ভাবে দাঁড়িয়েছিল আমার সামনে। যেন এক জমিদারের সামনে প্রজা দাঁড়িয়ে আছে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর কোহিনূরের বাবা বললেন
– সায়েব, আমি খুব গরীব মানুষ। জমি জমা কিচ্ছু নাই। অন্যের জমি চাষ করে কয়েকটা ধানের আটি পাইছি। এইগুলি রাখার জাওয়গাও নাই আমার। সংসারে বুড়া মা, বউ, আর দুগগা মাইয়া। আমি বাজার থাইক্কা ধান কিন্না আনি। সিদ্ধ কইরা শুকাইয়া ঢেকিতে পাড় দিয়া চাইল বানায় কোহিনূরের মায়। বেইচা যা অয় তাই দিয়া কোন মতে চালাইয়া নেই। আপ্নে যা কইছেন বুইজ্জি।
– ঠিক আছে। একটু তাড়াতাড়ি কইরেন।

আমি দেখেছি কোহিনূরের মা ও বাপকে সব সময় এক সাথে কাজ করতে। তারা সবসময় হাসিখুসি থাকতেন। হাসপাতালের সামনের খালি জায়গায় ধান শুকাতেন। বৃষ্টি এলে হাসপাতালের বারান্দায় ধান উঠাতেন। বারান্দায় রেলিং-এ বসে কতো যে সুখের আলাপ তারা করতো! এতো সুখি দম্পতি খুব কমই দেখেছি। এত ভালো মানুষ আমি কমই দেখেছি।

পরেরদিন একজন পরিপাটি লোক এলেন। পরিচয় দিলেন ঢাকায় ডিসি অফিসে চাকরি করেন। খুবই ভদ্র। তিনি বললেন
– পুকুরের দক্ষিণ পারের বাড়িটাই আমাদের। কোহিনূরের মা আমার ছোট বোন। গরীব ঘরে বিয়ে হওয়াতে বড় সমস্যায় আছি। আপনি যা করতে বলেছেন তা ঠিকই আছে। আমি ওদের বলেছি খুব শীগ্রি ঘর খালি করে দিতে। দেরী হলে ক্ষমা করে দিয়েন।
– ঠিক আছে। আমি দেখব।

কোহিনূরের বাবা আমার ঘর খালি করে দিলেন। আমি পরিষ্কার করে চেয়ার টেবিল বসিয়ে চেম্বার বানিয়ে নিলাম। কোহিনূরের দাদী কোহিনূর ও তার ছোট বোনকে নিয়ে আমার থাকার ঘরে ঢুকে পড়লেন “দাদু, দাদু” করে ডাকতে ডাকতে। দেখলাম একটা দেড় দুই বছরের বাচ্চাকে পাতালি কোলে নিয়ে দুধ খাওয়াচ্ছেন বুড়ি। ব্লাউজ ছিল না তার গায়। গ্রামের এমন বুড়িরা ব্লাউজ প্রেটিকোট পরতেন না। শুধু ১৩ হাত সুতীর কাপড় এক পেচ দিয়ে পরতেন। তিনি বাচ্চাটাকে দুধ মুখে দিয়ে রেখেছিলেন প্রকাশ্যে। এজন্য আমি তার দিকে না তাকিয়েই বললাম
– একি ঘরের ভিতরে এলেন কেন? বাইরে থাকুন।
– দাদু, আমি কোহিনূরের দাদী। খালের ঐ পাড়েই থাকি। এইটা আমার নাত্নী কোহিনূর। কোলেরটা কোহিনূরের ছোট।
– নাত্নীকে কি কেউ দুধ খাওয়ায়।
– ও আল্লাহ, দাদু, কি বুলায়। আমি বুড়া মানুষ। দুধ শুকাইয়া গেছে। অর মায় সারাক্ষণ কাম করে। আমার কোলে দিয়া রাখে। খালি কান্দে। তাই দুধের বোটা মুখে দিয়া রাখি। দুধ নাই। খালি বোটা চাটে।
– আমারে দাদু বলছেন কেনো। আমি সরকারি অফিসার।
– হেই ছোট কাল থাইকাই সায়েব দেইখা আইতাছি। এইহানেই বাড়ি। সবাই আমারে আপনা মানুষই ভাবছে। আপনের আগের সায়েব বুড়া মানুষ ছিল। এইখানে অনেকদিন ছিল। এইখান থাইকাই তার চাকরি শেষ অইছে। তারে আমি দাদু ডাকতাম। আপনেও আমার দাদু।
– ঠিক আছে, এখন যান।
– দাদু, এই মাইয়াউগগার একছের পাতলা পায়খানা অয়।
– হাসপাতাল টাইমে আইসেন।
– আমি যামু হাসপাতালে? আমি হাসপাতালে যাই না। দাদু আমাকে বাসায় থাইকাই ঔষধ দিয়া দিতেন।
– খাবার সেলাইন লাগবে। আমার কাছে নাই। এখন যান।
– আগের দাদুর সময় টিনের বেড়া গুলি অমুকে নিয়ে তার বাড়িতে লাগাইছে। চার দিক দিয়া বেড়া ছিল।

আমি ফার্মাসিস্ট-এর কাছ থেকে জেনে নিলাম কে এই টিনের বেড়া নিয়ে গেছে। তার সাথে পরামর্শ করে ডেকে এনে টিনগুলি উদ্ধার করে কলারপাতা ফেলে দিয়ে টিনের বেড়া দেয়ার ব্যবস্থা করলাম।

এরপর থেকে আমি বাসায় খাবার সেলাইন রাখতাম। কেউ পাতলা পায়খানার কথা বললে আমি সেলাইন দিয়ে দিতাম। কিন্তু কোহিনূরের কোন দিন পাতলা পায়খানা হয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করিনি। আমি জানতাম যে তার দাদী পাতলা পায়খানার কথা বলে সেলাইন নেয়। কোহিনূরের বয়স তখন ৬ বছরের মতো ছিল। দাদীর সাথে আসতো। তার দিকে তাকালে চোখ নিচু করে মিষ্টি করে হাসতো। আমি জানতাম দাদী খাবার সেলাইন নিতেন নিজে খাওয়ার জন্য। খেয়ে তিনি শক্তি পেতেন। কোহিনূরের নাম ভাংগিয়ে নিতেন সেলাইন।

একা এক বাড়িতে থাকতাম। মাঝে মাঝে শুয়ে বিশ্রাম নিতাম। প্রকৃতি খুব শান্ত ছিল। মাঝে মাঝে কোহিনূরের বাবার কন্ঠের ডাক ভেসে আসতো “কনুরে…।” তার বাবা মা তাকে কোহিনূর না ডেকে কনুর ডাকতেন। এক বছর আমি চরামদ্দি চাকরি করেছি। শেষের চার পাচ মাস আমার ফ্যামিলি নিয়ে ছিলাম। কোহিনূরকে আমার স্ত্রী আদর করতো। কোহিনূরের মা আমার স্ত্রীর খোঁজ খবর নিতেন। আমার স্ত্রী তাকেও ভালবাসতো। এখনো আমার স্ত্রী মাঝে মাঝে চরামদ্দির স্মৃতিচারণ করার সময় কোহিনূর, কোহিনূরের মা ও বাবার কথা বলে। বলে “তারা খুব ভালো মানুষ ছিলেন। তাদের জন্য মায়া হয়। তাদের বাড়ি যেতে খাল পার হতে হতো। খালের উপর দিয়ে একটা তালগাছ না কি গাছ যেনো ফেলে সাঁকো বানানো হয়েছিল।” ওটা আসলে ছিল তাল গাছ। জোয়ারের সময় খাল পানিতে ভরে যেতো। ভাটার সময় তলা দেখা যেতো।

সেই ১৯৮৯ সনে চরামদ্দি থেকে বিদায় নিয়ে এসেছিলাম। রেখে এসেছিলাম ভালো একটি প্রতিবেশী পরিবার। এর ঠিক ১০ বছর পর ১৯৯৯ সনে বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজে এক্সটারনাল হিসাবে পরীক্ষা নিতে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে কির্তনখোলা নদী পার হয়ে কাউয়ার চর হয়ে রিক্সায় চরামদ্দি বেড়াতে গিয়েছিলাম, আমার স্মৃতি বিজড়িত কোহিনূরদের গ্রামে। সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম বরিশালে এই মেডিকেল কলেজে ৫ম বর্ষের ছাত্র আমার ভাতিজা শহিদুল্লাহ হুমায়ুন কবীরকে (এখন এনাস্থেসিওলজিস্ট)। ঘুরে ঘুরে আগের দিনের অনেক কিছুই দেখি। সেই টিনসেড হাসপাতাল নেই। বিল্ডিং হয়েছে। সেই পরিত্যক্ত বাড়ি নেই। কোয়ার্টার হয়েছে বহুতল। পুকুরের ঘাট সংস্কার করা হয়েছে। আমার শুভাকাঙ্ক্ষী মকবুল দফাদারের ছেলে মাসুদকে নিয়ে সব দেখলাম। তুলনা করলাম দশ বছর আগেকার চরামদ্দির সাথে। কত উন্নত হয়েছে আজ! কোহিনূরের বাবাকে পেলাম সামনে। সেই আগের হাসি। সেই আগের মতোই লুঙ্গী পরা খালি গায়। আমি বললাম “আপনার বাচ্চা দুইটিকে দেখতে চাই। কোহিনূরের মা কই?” তিনি খাল পেড়িয়ে বাড়ির দিকে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর কোহিনূরের মা, একজন শাড়ী পরা কিশোরী ও একজন পাজামা পরা মেয়েকে নিয়ে এলেন। কোহিনূরের দাদী এলেন কি না আমার মনে নেই। ৩০ বছর আগের কথা তো! সব মনে করতে পারি না। আমি বললাম
– কোহিনূর কই?
– এইটাই তো কোহিনূর।

সেই শাড়ী পরা কিশোরীটিই কোহিনূর। আমি চমকে গেলাম। আমার দেখা সেই হাফ প্যান্ট পরা কোহিনূর কই? সেই কোহিনূর, যার গায়ে জামা থাকতো না। গলায় থাকতো ৪ আনা দামের সীসার রুপালী চেইন। যার চোখের দিকে তাকালে চোখ নত করে মিষ্টি হাসি দিতো। সেই কোহিনূর আমাকে দেখে একটু ঘোমটা টেনে পাশ ফিরে তাকালো। কারন, এখন সে ৬ বছরের শিশু নয়, এখন ১৬ বছরের এক গ্রাম্য কিশোরী, কোহিনূর।
৪/৮/২০১৯ খ্রি.

Samad Sir

Samad Sir

সামাদ স্যার


সামাদ স্যার ছিলেন আমার হাই স্কুল জীবনের সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক। আব্দুস সামাদ বিএসসি স্যার। ক্লাসে সাধারণ গণিত, নৈর্বাচনিক গণিত ও পদার্থবিদ্যা পড়াতেন। এই তিনটি বিষয়েই আমি ভাল করতাম । তাই, স্যার আমাকে অন্যদের থেকে একটু বেশি স্নেহ করতেন। খুব সরল ছিলেন। সুন্দর করে বুঝিয়ে দিতেন। ১৯৭৫-৭৬ সনে ভালুকার বাটাজোর বিএম হাই স্কুলে স্যার আমাকে নবম ও দশম শ্রেনীতে পড়িয়েছেন। আমি এর আগে কচুয়া পাবলিক হাই স্কুলে পড়েছি । ১৯৭৫ সনে নবম শ্রেনীতে ওঠার পর কচুয়া স্কুলে আমাদের বিজ্ঞানের শিক্ষক কেউ ছিলেন না । ১৯৭৪ সনে দেশের অবস্থা ভালো ছিল না । মানুষের মধ্যে অভাব অনটন ছিল । গ্রামের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো ছিলো না । অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ রাতের অন্ধকারে দেশ ছেড়ে চলে যায় । আমাদের বিজ্ঞানের শিক্ষক ভীমচন্দ্র বিএসসি স্যারও নিরূদ্যেশ হলেন । জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম । আমাদের বিজ্ঞান ও গনিত বিষয় কেউ পড়ালেন না । কয়াদি স্কুলে আমার ফুফাতো ভাই আব্দুল মোত্তালেব তালুকদার (মতি ভাই)  বিএসসি টিচার ছিলেন। হেড স্যার আমাকে পাঠিয়েছিলেন তাকে কচুয়া স্কুলে চলে আসার প্রস্তাব নিয়ে । তিনি রাজি হলেন না ।

আমার পড়ার উদ্যেশ্য ছিল ডাক্তার হওয়ার । না হতে পারলে ইঞ্জিনিয়ার । না হতে পারলে বিএসসি-এমএসসি হওয়ার। কিন্তু নবম শ্রেনীর তিন মাস হয়ে গেলো বিজ্ঞান পড়া শুরুই করতে পারলাম না । মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো । চলে এলাম বাটাজোর স্কুলে। এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন শওকত স্যার । তিনি ছিলেন সেই সময়ের এলাকার মধ্যে শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক । তিনি যে স্কুলেই প্রধান শিক্ষক হতেন সেই স্কুলই রাতারাতি উন্নত হয়ে যেতো । তার আগে বাটাজোর স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন মরহুম কুতুব উদ্দিন স্যার। তিনিও খুব শক্তিশালী হেড মাস্টার ছিলেন । তার অবদানেই বাটাজোর স্কুল অত্র এলাকার মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্কুল ছিল । তিনি রাজনীতি করতেন । শুনেছি, তিনি একাই আওয়ামী লীগের অনেক সংঠনের প্রধান ছিলেন । এজন্য ভেতরে ভেতরে তার অনেক শত্রু তৈরি হয় । এক রাতের অন্ধকারে তিনি শত্রুদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরন করেন । সেই খুনের জের ধরে দীর্ঘদিন পর্যন্ত বাটাজোর এলাকায় খুনা-খুনি চলতে থাকে ।

শওকত স্যার ইংরেজি লিটারেচার পড়াতেন । প্রথম যেদিন তার ক্লাশ করলাম সেদিন তিনি ক্যাসাবিয়াংকা নামে একটা পয়েম (কবিতা) পড়াচ্ছিলেন । তিনি পাজামা-পাঞ্জাবি ও জিন্না-ক্যাপ পরতেন । বাম হাতে বই নিয়ে ডান হাত ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে মঞ্চের উপর হেটে হেটে কবিতা পড়ে পড়ে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন । তিনি বলছিলেন “ক্যানন এট রাইট অব দেম, ক্যানন এট লেফট অব দেম,  –“ । এমনভাবে অভিনয় করে করে পড়াচ্ছিলেন যে মনে হচ্ছিলো স্যারই কামানের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন । আমি তার পড়ানোর স্টাইল দেখে মুগ্ধ হলাম । আরেকদিন তিনি একটা কবিতা পড়াচ্ছিলেন । সেটা মেঘনায় বান কবিতার “শোন মা আমিনা, রেখে দেরে কাজ, তরা করে মাঠে চল, এখনি নামিবে দেয়া, এখনি নামিবে ঢল —“এর ইংরেজি ভার্সনের “ও মেরি, গো এন্ড কল দা ক্যাটল হোম —-”  পড়াচ্ছিলেন । মেরি বানে ভেসে মারা গিয়েছিল । তার খোঁজে গিয়ে দেখতে পেলো মেরির চুল পানিতে ভাসছে । দেখে চুল না শেওলা বুঝা যাচ্ছিল না । কবিতায় ছিলো “ইজ ইট উইড?” স্যার এমনভাবে অভিনয় করে পড়ালেন যে, যেনো স্যার নিজের চোখে দেখছেন। স্যারের পড়ানোর স্টাইল আমাকে মুগ্ধ করেছিলো । কিন্তু অল্প কিছুদিন পরই স্যারকে এই স্কুল ছেড়ে অন্য স্কুলে চলে যেতে হলো । আমরা আরেক শ্রেষ্ট প্রধান শিক্ষককে হারালাম ।

আমি ভর্তি হয়েছিলাম ২ এপ্রিল ১৯৭৫ সনে । দিয়েছিলাম ১ এপ্রিল । সেদিন এপ্রিল ফুল মনে করে কে যেনো ভর্তি হতে নিষেধ করেছিলেন ।  আমি সন্তুষ্ট হলাম । বিএসসি স্যার হিসাবে পেলাম আব্দুস সামাদ স্যার ও আব্দুর রউফ স্যারকে । আব্দুল বারী স্যার খুব সম্ভব আইএসসি, বিএ টিচার ছিলেন । সামাদ স্যার পড়াতেন গনিত ও পদার্থ বিজ্ঞান, রউফ স্যার পড়াতেন রসায়ন,  বারী স্যার জীব বিজ্ঞান, জামাল স্যার বাংলা সাহিত্য, সামসুল হক স্যার বাংলা ব্যাকরন, বিল্লাল  স্যার ইংরেজি গ্রামার এবং আনসার মৌলভি স্যার ইসলামীয়াত । শওকত স্যার চলে যাবার পর নতুন হেড স্যার আসেন আব্দুর রহমান স্যার । পরপর দুইজন হেড মাস্টার আসেন। দুইজনের নামই ছিল আব্দুর রহমান । যিনি হেড স্যার ছিলেন তিনিই ইংরেজি লিটারেচার পড়াতেন ।

যেহেতু আমি তিন মাস বিজ্ঞান ও অংক বিষয় ক্লাস করিনি সেহেতু আমি এই বিষয়গুলো ক্লাসে তেমন ফলো করতে পারছিলাম না । তাই, আমি স্যারদের দৃষ্টি আকর্ষন করতে পারছিলাম না । আমি ক্লাসে অপরিচিত এক আগুন্তুক হিসাবে রয়ে গেলাম । আমি বিষন্ন থাকতাম ক্লাসে । ক্লাসে ফজলু ও দেলোয়ারের খুব নাম ছিল । অথচ কচুয়া স্কুলে থাকাকালিন ওদের মতোই আমি ছিলাম । ওরা এই স্কুলে আসে ক্লাস সেভেনে থাকতে । জামাল স্যার ফজলুকে বেশী স্নেহ করতো । আমার হিংসা হতো । এপ্রিলেই প্রথম সাময়িক পরীক্ষা হলো । আমি পদার্থ বিজ্ঞানে দুই নম্বর কম পেয়ে ফেল করে বসলাম । জীবনে আমি থার্ড হইনি । সেই আমি একটা সাবজেক্টে ফেল করলাম! নিজেকে শান্তনা দিতাম এই বলে যে আমি গত তিন মাস কিছুই পড়ি নি । পাস মার্কের কাছাকাছি গিয়েছি, কম কিসের?

আমিই ফার্স্ট হবো এই সংকল্প নিয়ে পড়া শুরু করলাম ।  সব পাঠ্য বইয়ের নোট বই কিনে ফেললাম । পাঠ্যবই ভাল ভাবে পড়ি । তারপড় কিভাবে প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে তা নোট বই দেখে শিখে নেই । কিভাবে অংক কষতে হবে নোট বই দেখে শিখে নেই ।  ক্লাসে ভালো করতে থাকি । মনোযোগ দিয়ে ক্লাসে স্যারদের কথা শুনি । সামাদ স্যার ধীরে ধীরে সরল ভাষায় কথা বলে পড়াতেন । আমি স্পষ্ট বুঝতে পারতাম । সামাদ স্যারের পড়ানোর ধরন আমার ভালো লাগে । আমি এটাকে স্টাইল না বলে ধরনই বললাম । আমি এমবিবিএস ক্লাসে স্টাইল করে পড়াই না । আমার পড়ানোর ধরন সামাদ স্যারের মতো । আমি জানি, আমি যেভাবে পড়াই ছাত্রদের বুঝার জন্য উপকারি । অল্প কিছু ছাত্রদের কাছে সেটা পছন্দ নাও হতে পারে । আমি মনে করি স্টাইল করার দরকার নাই, ভালোভাবে বুঝে ছাত্ররা ভা্লো ডাক্তার হলেই হলো ।

সামাদ স্যার ক্লাসে অংক করতে দিতেন । আমরা দ্রূত অংক করে মঞ্চে উঠে স্যারকে দেখাতাম । যে আগে দেখাতে পারতো স্যারের দৃষ্টি আকর্ষন করতো । আগের রাতে নোট দেখে চেপ্টারের সব অংক সল্ভ করা শিখে আসতাম । ক্লাসে অংক দেয়ার সাথে সাথে দ্রূত সমাধান করে ফার্স্টবয় ফজলুর আগে দেখাতে চেষ্টা করতাম । দ্রুত দেখাতে গিয়ে বেঞ্চের কোনায় আংগুলে ঠেলা লেগে গল গলি রক্ত পড়ে । আমার সেদিকে খেয়াল ছিল না । আমার টারগেট ছিলো স্যারকে আগে অংক করে দেখানো । ক্লাসমেট মজনু আমাকে বলল “এই খুন হয়ে গেছো । আঙ্গুল কেটে রক্ত পড়ছে ।” বলার পর আমি দেখি গলগলি রক্ত পড়ছে আঙ্গুল কেটে । এমন ছিলো আমার জেদ । ফার্স্ট হতেই হবে । সামাদ স্যারের দৃষ্টি আকর্ষন করতেই হবে । এরপর দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায় দ্বিতিয় স্থান অধিকার করলাম । সব স্যারের দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো আমার প্রতি । সামাদ স্যারের কাছে হয়ে গেলাম এক নাম্বার অনুগত ভালো ছাত্র।

১৯৭৬ সনে টেস্ট পরীক্ষা শেষে আমাদের ক্লাস বন্ধ রাখা হয়। ভাল ভাবে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়ার জন্য আমাদের ৩১ জন পরীক্ষার্থীকে স্কুলের হোস্টেলে রাখেন। এক রুমে অনেকজন রাখা হত। আমার পড়ায় ক্ষতি হতে পারে বলে জানালে স্যার আমাকে একাই এক রুমে রাখেন। আমাদের তত্বাবধান করার জন্য সামাদ স্যার ও বারী স্যার স্কুল বিল্ডিং-এ থাকতেন। মাঝে মাঝে বেত হাতে নিয়ে চুপি চুপি রাউন্ড দিতেন। এক দিন রাত ১২ টার দিকে স্যারগণ চুপি চুপি রাউন্ড দিচ্ছিলেন। ছাত্ররা ঐ সময় একটু দুষ্টুমি করছিল। বারী স্যার বললেন “এই তোরা কি শুরু করেছিস?” সুলতান একটু ফক্কর ছিল। সে ভিতর থেকে বলে উঠল “শুরু না স্যার, শেষের দিকে।”

আমাদের পাহারা দেয়া ছাড়া স্যারদের তেমন কাজ ছিল না। বারান্দায় বসে সারাক্ষণ দাবা খেলতেন সামাদ স্যার আর বারী স্যার। বন্ধুরা দুপুরে খেয়ে প্রায় সবাই দুই এক ঘন্টা ঘুমিয়ে নিত। আমি দুপুরে খেয়ে ঘুমাতাম না। টেস্ট পেপার থেকে সামাদ স্যারকে একটা প্রশ্নপত্র পছন্দ করে দিতে বলতাম। স্যার যে কোন একটা প্রশ্নপত্র পছন্দ করে দিতেন। তখন শীতকাল ছিল। মাঠে বেঞ্চ বসিয়ে তার উপর বসে ঘড়ি ধরে বিকেল ২ টা থেকে ৫টা পর্যন্ত পরীক্ষা দিতাম। একেক দিন একেক বিষয় পরীক্ষা দিতাম। সামাদ স্যার ও বারী স্যার খাতা দেখে নাম্বার দিতেন। বাংলা ও ইংরেজী ছাড়া সব বিষয়েই ৮০-র উপর নাম্বার পেতাম। ৮০-র উপর নাম্বার পেলে লেটার মার্ক বলা হতো । আমি তাই ৬ বিষয়ে লেটার পাবো বলে স্বপ্ন দেখতাম । খাতা দেখার জন্য স্যারগণ কোন ফি নেবার কল্পনাও করেন নি। বোর্ডের ফাইনাল পরীক্ষায় আমি ৪টা বিষয়ে লেটারমার্ক পেয়েছিলাম। সামাদ স্যারের সাবজেক্টগুলো বেশী ভাল করেছিলাম। সাধারণ গনিতে ৯৮, নৈর্বাচনিক গনিতে ৯৫ পদার্থবিদ্যায় ৯২ পেয়েছিলাম।

একদিন বিকাল ৩ টার দিকে আমি মাঠে বসে পরীক্ষা দিচ্ছিলাম । দেখলাম সামাদ স্যার লেট্রিন থেকে হারিকেন নিয়ে বের হচ্ছেন। টিনসেড কাঁচা পায়খানাঘর স্কুল ঘর থেকে ৪০-৫০ গজ দূরে ছিল। আমরা টিউবওয়েল থেকে বদনায় পানি নিয়ে কাঁচা পায়খানায় মল ত্যাগ করতাম। হারিকেন জ্বালিয়ে পড়তাম। হারিকেন একটি বিশেষ ধরনের কেরোসিনের বাতি ছিল যার আলো কমানো-বাড়ানো যে্তো। আমাদের সবার রুমে এ্কটা হারিকেন ও একটা করে বদনা থাকত। স্যারের হাতের হারিকেন নেভানো অবস্থায় ছিল। এমন ফকফকা দিনের বেলায় স্যারের হাতে হারিকেন কেন আমি তা বুঝতে পারছিলাম না। বুঝতে গেলে আবার আমার পরীক্ষার ক্ষতি হয়। হাতে হারিকেন আছে, কিন্তু বদনা নেই।  আরও জটিল মনে হচ্ছে। ফিরে আসার পর দেখি দুই স্যার হাসাহাসি করছেন। বুঝতে পারলাম দাবা খেলার নেশায় প্রকৃতির ডাকে যথাসময়ে সারা না দেয়ার কারনে জরুরী অবস্থায় তাড়াহুড়ো করে বদনার পরিবর্তে হারিকেন নিয়ে স্যার লেট্রিনে গিয়েছিলেন। পৃথিবীর বড় বড় বিজ্ঞানীরাও মাঝে মাঝে এমন আত্বভোলা হতেন। আমি পরীক্ষায় মনোনিবেশ করলাম।

১৯৭৭ সনের এসএসসি পরীক্ষায় পাস করার পড় মাত্র একবার বা দুইবার স্যারের সাথে দেখা । তিনি ছেলের চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজে ময়মনসিংহ আসেন আমার কাছে । স্যারের ছেলের নামও রেখেছেন আমার নামে ‘সাদেকুর রহমান’ । সে ময়মনসিংহ পড়ার সময় আমার সাথে দেখা করতো । দীর্ঘদিন স্যারের সাথে যোগাযোগ ছিল না । ২০১০ সনের দিকে অনেক কষ্ট করে স্যারের মোবাইল নাম্বার যোগার করে কল দেই । স্যারের কুশলাদি জানার পর আমি আমার অবস্থান জানাই । যানাই “আমার বড় মেয়ে কম্পিউটার সাইন্সে বিএসসি পাস করেছে। এখন এমবিএ পড়ে । ছোট মেয়ে এমবিবিএস পড়ছে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে । ওদের জন্য দোয়া করবেন ।“ শুনে স্যার বললেন “আমার জন্যও দোয়া করবে । আমি এখন শান্তা মারিয়াম ইউনিভার্সিটিতে বাংলায় এমএ পড়ছি। আমার একটা আফসোস ছিল এমএ পাস করার। দেখি পাস করতে পারি কিনা।”

এরপর থেকে স্যারের সাথে আমার মাঝে মাঝে মোবাইলে যোগাযোগ হয় ।  স্যার গ্রামের বাড়িতেই থাকেন। মোবাইল করলে খুশী হন। অনেক কথা বলেন। গত বছর বারবার স্যার বলছিলেন তার গ্রামে অনেক সম্পত্তি আছে। সেই সম্পত্তিতে একটা মেডিকেল কলেজ করবেন। তার অনেক ছাত্র ডাক্তার হয়েছে তারা সবাই সহযোগিতা করলে মেডিকেল কলেজ করা তার জন্য কঠিন না বলে তিনি জানান। আমি বলি গ্রামে মেডিকেল কলেজ করা সম্ভব না। স্যার বুঝতে চান না। আজও স্যারের সাথে কথা হয়েছে মোবাইলে। স্যার ভাল আছেন। আল্লাহ স্যারকে সুস্থ সুন্দর ধীর্ঘ জীবন দান করুন।

প্রথম লিখন – ৫/১০/২০১৭ খ্রি.

দ্বিতিয় সংস্করণ – ২৪/০৪/২০২০ খ্রি.

পুনশ্চঃ

আজো স্যারের সাথে কথা হয়েছে মোবাইলে । আমি বললাম

-স্যার, সকালে আপনাকে কল দিয়ে পাই নি । আপনাকে কল দেয়ার পর বারী স্যারকে কল দিয়েছিলাম । তিনি কল ধরেন নি ।

-বারী সাব ত ঢাকায় থাকেন । তার ছেলে এখন নৌবাহিনীর একটা জাহাজের প্রধান । খুব ভালো আছেন । ছেলে এতো বড় পদে চাকরি করে! আমার ছেলেও বিমান বন্দরে ভাল চাকরি করে ।

-স্যার, আমি ১৫ এপ্রিল ২০২০ তারিখ থেকে পিআরএল-এ গেছি ।

-তুমি এলপিআর-এ গেছো?

-স্যার, ওটাই এখন পিআরএল। আমি ১৩ তারিখে রিলিজ নেয়ার পর করোনা ভাইরাস লক ডাউনে যে ঘরে প্রবেশ করেছি তারপর থেকে আর নিচে নামি নি ।

-ভালোই হয়েছে তোমার জন্য । এই বিপদের সময় হাসপাতালে যেতে হবে না । তা কিভাবে সময় কাটাও?

-স্যার, আমি তিনটা মেডিকেল জার্নাল এডিট করি ঘরে বসে অনলাইনে । আরেকটা জার্নাল দেখাশুনা করি এডিটরিয়াল বোর্ডের মেম্বার হিসাবে । গল্প লেখি । দুইটা গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে । আরও ৮-৯টা প্রকাশিত হবে ইনশা আল্লাহ । আপনাকে নিয়ে একটা গল্প লিখছি । আমার প্রিয়জনদের নিয়ে একটা স্মৃতিচারণমূলক বইয়ে এটা থাকবে । প্রকাশ পাওয়ার পর সব বই আপনাকে দেব, ইনশা আল্লাহ ।

-আমিও লেখা লেখি করি । আমি একটা উপন্যাস লিখছি । করোনা পরিস্থি চলে গেলে ওটা ছাপতে দেব । নাম দিয়েছি ‘চন্দ্রকলা’ । চাঁদের যেমন কলা আছে, বড় হতে হতে পূর্ণ হয়ে যায়, আবার ছোট হতে হতে শেষ হয়ে যায়, তেমন আরকি।

-প্রিন্ট হবার পর আমি নিব, স্যার। ইনশা আল্লাহ। দোয়া করবেন ।

২৪/৪/২০২০ খ্রি.

নিচে সামাদ স্যারের ভিডিও দেখুন

Falani

Falani

ফালানি উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি

ফালানির একটাও কুরকা

ফালানির একটাও কুরকা আছাল না। তার বাহের তিগা পয়সা নিয়া নিয়া খুটির বিতর জরা করতো। এবা কইরা হে ১০০ টেহা জরা করছাল। হেই টেহা দিয়া তার বাহে আটে তিগা একটা ডেহি মুরগি কিন্না দিছাল। কয়দিন পরই হেই মুরগি করকরাইয়া ডোলের বিতর আন্ডা পারন ধরে। বালাই আন্ডা পারছাল। বাইসটা আন্ডা পারছাল। চাইরডা আন্ডা হিদ্দ কইরা রাইন্দা খাইছাল। চাইরডা আন্ডা আন্ডার পাইকারের কাছে বেইচ্যা নইটানা কিন্যা খাইছাল। দুইডা আন্ডা পচা বাইরইছাল। আর যেডি আছাল ঝাইঞ্জরে মইধ্যে খের বিছাইয়া মুরগিরে কুইচা বহাইছাল। মুরগি মইদ্যে মইদ্যে কক কক কইরা বাইরে গিয়া আদার খাইয়া আইত। হেসের দিকে হারাদিন কুইচা বইয়া থাকত। কুইচা মুরগির ঠোলার খের ভর্তি হুরহুরি পোকা অইছাল। হেই হুরহুরি পোকা বারির বেবাককের গতরেই হুরহুরাইত। বাইসদিন পর মুরগি বাচ্চা তোলায়। উঠানে খুদ ছিটাইয় দেয় বাচ্চাগুনারে খাওনের নিগা। বাচ্চাগুনায় চিয় চিয় কইরা ডাহে আর ঠুকরাইয়া খুদ খায়। একটা বাচ্চা ছাইয়ের ঠেংগিত পরছাল। ছাইয়ের বিতর গনগনা আগুন আছাল। হেই আগুনে পুইরা একটা বাচ্চা মইরা যায়। আরেকটা বাচ্চা আইশালের আগুনে পুইরা মইরা যায়। একটা বাচ্চা চিলে নিয়ে যায়। আরেকটা নেয় বেজিয়ে। আরেকটা গরুর পারা খাইয়া চেটকা অইয়া মইরা যায়। উঠানে ধান খেদানোর সোম ফালানির দাদির কোটার বারি খাইয়া মইরা যায় একটা । যেডি বাইচ্চা থাহে হেডির মইদ্যে অর্ধেক অয় ডেহি, আর অর্ধেক অয় মোরগ।

ফালানির বিয়া অইছে

(টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক গ্রাম্য ভাষায় লেখা গল্প)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

হেদিন যে ফালানির কতা কইছিলাম হে ফালানির বিয়া অইয়া গেছে। অইজে, কইছিলাম না যে, ফালানির ডেহি মুরগি বাইশটা আন্ডা পারছাল। হেন তিগা চাইরডা আন্ডা হিদ্দ কইরা আইন্দা খাইছাল। চাইরডা আন্ডা পাইকারের কাছে বেচচাল, দুইডা আন্ডা পচা বাইরইছাল। আর যেডি আছাল হেডি দিয়া মুরগিরে কুইচা বহাইছাল। হেন তিগা মুরগি যে কয়ডা বাচ্চা তোলাইছাল তার তিগা একটা আইশালের আগুনে পইরা পুইরা মরে, একটা ছাইয়ের ঠেংগিত পইরা পুইরা মরে, একটা গরুর পারা নাইগ্যা মইরা যায়, আর একটা ধান খেদাইন্যা কোটার বারি নাইগ্যা মইরা যায়, একটা নিয়া যায় চিলে আর একটা নিয়া যায় বেজিয়ে। যে ছয়ডা বাইচ্চা আছাল হেইগনা বড় অইয়া তিন্ডা অয় ডেহি আর তিন্ডা অয় মোরগ। হেন তিগা দুইডা মোরগ পলাই আটার য়াটে নিয়া বেইচ্চা একটা য়াসা আর একটা য়াসি কিন্না আনে। তাইলে অহন ফালানির অইল গিয়া পাচডা কুরকা আর দুইডা য়াস। য়াসগুলা ফালানিগ পাগারে হাতুর পারে। য়াসিডায় হারাদিন ঘাগ ঘাগ কইরা ডাহে, আর য়াসাডায় গলা হেস হেসাইয়া পাকপাক কইরা ডাহে। বিল পাড়ের ক্ষেত তিগা হামুক কুরাইয়া আইন্যা পাচন দিয়া ভাইংগা দেয় য়াসের হুমকে। য়াস হেগনা ক্যাত ক্যাতি গিলে আর গলা মোচড় পারে। ছোট ছোট হামুক আমানই গিল্লা হালায়। ফালানির বিয়ার পর য়াস মুরগি পালনের খুবই কষ্ট অইতাছে ফালানির মায়। ফালানিরে দুল্লা য়াইখাই ফালানির বাপে মইরা গেছে। ফালানিরে ডাংগর করতে অনেক কষ্ট করতে অইছে। বিয়া দিবার পর কষ্ট আবার বাইরা গেলো। কী আর করবো, মেও পোলা অইয়া জন্মাইলে হশুর বাড়ি ত যায়নই নাগব। মেয়াডারে বিয়া দিবার পর তিগা থাইকা থাইকা ফালানির মায় কান্দে আর আঁচল দিয়া চোখের পানি মুছে।

বালা ধনি বাইত্যেই ফালানির বিয়া অইছে। ফালানির চেহারাও বালা খপছুরতের। পরতম সরাদার দেইহা যায় তারে পাগার পাড়এ যেসুম হে কলস বোজাই কইরা মাঞ্জায় কইরা নিয়া য়াইটা যায়। ফালানির বিয়ার কতা তোলে আহাদুল্লা হিকদারের নাতি দিয়া, অর নাম অইল শাব্দুল। শাব্দুল মেট্রিক পর্যন্ত পড়ছে। হে অহন বিদেশ করব। গেরামের পোলারা মোছ একটু কালা অন ধরলেই আদম বেপারির দালাল ধইরা বিদেশ চইলা যায় জমিন জিরাত, বাড়ি ঘর, নোটা বাটি বেইচ্চা দিয়া। যাগ কিছু নাই তারাও গরীবের বন্ধু সমিতি তিগা সুদী কইরা টেহা নিয়া বিদেশ চইলা যায়। হেই ইন হোদাইতেই চাইর পাচ বোছর নাইগ্যা যায়। শাব্দুলের পাসপোর্ট ভিসা অইয়া গেছে। টেহাও যোগার অইছে। অর্ধেক যোগাইছে শাব্দুলের বাহে আর অর্ধেক যোদাইছে ফালানির চাচায়। দুই এক হপ্তার মধ্যেই শাব্দুলের ফেলাইট। পরতম গিয়া পাঁচ বোছর পর দুই মাসের ছুটি নিয়া দেশে আইব। যাওনের আগে যুদি ফালানির পেটে সোন্তান ধরে হেই সোন্তান তহন চাইর বোছইরা অইয়া যাবো। এই চাইরডা বোছর গেন্দাডায় বাপের আদর পাবো না। মইদ্যে মইদ্যে মোবাইলে দেকপার পাবো বাপের মুখ। তয় ছুইয়া দেকপার পাবো না। পেটের উপর গড়াগড়ি করার ভাইগ্যে থাকপ না। কান্দে নিয়া নাচনের ভাইগ্য থাকপ না। তুলতুলা গালের মইদ্যে নাক দিয়া ঘষা দিয়া উলু উলু করার সুযোগ পাব না। কতা হেস কইরা খালি কবো আব্বু টা টা। উম্মা উম্মা। আর যুদি এই কয়দিনে ফালানির পেটে বাচ্চা না ধরে তয়লে পাঁচ বোছর পর্যন্ত দেরি করন নাগব সোন্তান ধরনের নিগা। ভাগ্যে যুদি না থাহে হেই দুইমাসে সোন্তান না ধরে তাইলে আবার ছুটি নিয়া আহন পর্যন্ত দেরি করন নাগব। ফালানিরে বিয়া করার পর তিগা শাব্দুলের বিদেশ যাইতে ইচ্ছা করতাছে না। কিন্তু করার কিছু নাই। দালালেরে টেহা পয়সা দেয়া হেস। পাসপোর্ট ভিসাও কম্পিলিট। অহন না করন ঠিক অব না।

অ, ফালানির কিবা কইরা বিয়া অইল হেইডা কবার নইছিলাম। সোমবার দিন য়াটে যাওনের সুম হরাদারে ফালানিরে পাগার পাড়ে দেখছাল। মোঙ্গল বারে শাব্দুলের বাপের কাছে বিয়ার কতাডা তোলে। বুইধবারে ফালানির চাচার কাছে কতা নিয়া যায়। বিসুদবারে কয়জন নোক নিয়া ফালানিরে দেকবার যায়। পাঁচশ টেহা য়াতে দিয়া ফালানিরে দেইহা আহে। তাগো পছন্দ অয়। শুক্কুরবারে ফালানির চাচা কয়জন নোক নিয়া শাব্দুলেগ বাইত্যে ঘর দেহুনি আহে। তাগো ঘর বর পছন্দ অয়। হুনিবার যায়, অববার যায়। এবা কইরা বাজার হদায় হেস কইরা বিসুদবারে বিয়া পড়াইয়া ফালানিরে নিয়া যায় হশুরবাড়ি। ইনু তার সবই আছে। দাদা হশুর, দাদি হউরি, হশুর, হউরি, ভাশুর, জাও, নোনাশ, নোনদ, দেওর, চাচাহশুর, চাচিহউরি, ফুবুহউরি, খালাহউরি, ভাশুরের ঘরে ভাইস্তা, ভাস্তি ইন্না বেকই আছে। ই বাড়ির বেক্কেই বালা মানুষ। খালি জাওডা একটু জাইরা গোছের। বেশী জাউরামি করলে জামাইয়ে ঢেহির ওচা দিয়া বাইরাইয়া য়ান্দন ঘরে ফালাই য়াখে। চাইর ভিটায় চাইরডা টিনের ঘর। বাইরবাড়ি আছে কাছাড়ি ঘর। হেনু ইস্টি এগানা আইলে থাকপার দেয়। একটা জাগীরও থাহে হে ঘরে। কামলা জামলা নুইলেও এই কাছাড়ি ঘরে বহে, খায় থাহে। য়ান্দন ঘর আগে ছোনের ছাউনি আছাল। অহন টিন নাগাই দিছে। অর দাদাহশুর অনেক বুড়া। মুতুল্লায় এহান দাঁতও নাই। হক্ত খাবার খাপ্পায় না। তার নিগা আটার নুটানি য়াইন্দা দিওন নাগে। হউরির য়াতের য়ান্দন বেক্কের কাছেই বালা নাগে। তার য়াতের সালুন পাসের বাড়ির মাইন্সেও চাইয়া নেয়, এবা মজা কইরা সালুন য়ান্দে। ভাহুরের ডাইবিটিস আছে। তার নিগা উটি বানান নাগে। হশুরেরও ডাইবিটিস য়োগ আছে। উনি আবার য়োটি খাপ্পায় না। খাইলে গলা জ্বলে। য়াইতে দুধ দিয়া কলা দিয়া ভাত চেইতকা খান। কবিরাজে য়োগের জইন্যে জানি তারে মুধু খাইতে কইছে। য়াতের তালুতে মধু নিয়া চাইটা খান।

ছাগল, গরু, মইশ, ভেরা, য়াস, কুরকা ইন্না বেকই আছে। পালে একটা বড় পাঠা আছে, দুইডা বড় খাসি আছে, পাঠি আছে দুইডা, ভরুইন্যা দুইডা ছাগল আছে। বিয়াইন্য ছাগলো আছে একটা। হেডার আবার তিন বাচ্চা। দুইডা মাইগ্যা বাচ্চা আর একটা মর্দা বাচ্চা। ছাগলের ওলানে বোটা মাত্র একটা। দুই বোটা তিগা যেসুম দুই বাচ্চায় দুধ খায় আরেকটায় ফাল পারতে থাহে। এই জন্যেই কেউ বঞ্চিত অইলে কয় “আমি অইলাম গিয়া ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা।” পাঠি দুইডা ভরুইন্যা সময় অইছে। বাইস্যা মাসে ভরবার পারে। বিয়াইন্যা গাই আছে দুইডা। একটার কাচিল্যা বাছুর। কাচিল্যা গাইয়ের দুধ খাওন যায় না। বাছুরের বয়েস এক মাস অইলেই কাচুইল্যা ছাইড়া যাব। হেসুম তিগা ফালানিরা ইডার দুধ পানাবার পাব। আর যে গাই কাচুইল্যা ছাইড়া গেছে হেডার দুধ পানায় ফালানির হউরি। পরতম বাছুরেরে গাইয়ের ওলান চাটতে দেয়। ওলান চাটতে চাটতে গাই চোনাইয়া দেয়। এরপরই ওলানভর্তি দুধ আহে। যেসুম বাছুরে দুধের বোটায় চোশন দেয় হেসুম হউরি বাছুরের মুখ ঝেংটা মাইরা হরাই হালায়। বাছুরের গলায় পাগা নাগাইয়া ফালানি বাছুরেরে টাইন্যা ধইরা হরাই য়াখে। ফালানি বাছুরের গতর য়াতাইয়া দেয়। বাছুরে ফালানির আচল চাবায়। উম্মুর দিয়া য়াটুর উপর দোনা য়াইখা হউরি চই চই কইরা গাই পানায়। দোনা ভইরা দুধ অয়। অব না ক্যা, গাইয়েরে ধানের কুড়া, গোমের ভুষি, পান্তা ভাত, আর কত কি খাওয়ায়। দুধ ত অবই। হেই দুধ খাইয়া হাইরাও য়াট বাজারে নিয়া বেইচা টেহা পায়। পালে একটা বড় হাড় গরু আছে। ইডারে কুরপানির নাম কইরা য়াইখা দিছে। কুরপানি দিলে মেলা গোস্ত অব। ই বাইত্যে দুইডা বল্ দও আছে। হেগ্না দিয়া আলানে পালানে চিপা চুপা দিয়ে য়াল বায়। কারন, বড় বড় ক্ষেতগুনায় য়াল বাওয়া য়য় পাওর ট্রিলার দিয়া। বহন বাছুর আছে দুইডা। বুইড়া একটা গাই আছে। হেডা বিয়ায়ও না, য়ালেও জোড়ন যায় না। ইডা কামে নাগে মলন দেওনের সুম। মলন জোরার সুম ইডা মেউয়া ইসাবে কাম করে। মলনের মইদ্যে জোড়ে বল্দগুনারে। কিনারায় জোরে বহন বাছুরগুনারের। পানাইন্যা গাই মলনে জোড়ে না।

সোংসারের কাম করনের বাবাকই আছে শাব্দুলেগ। নাঙ্গল, জোয়াল, চংগ, নাঙ্গুইলা, কোদাল, খোন্তা, ছেনি, পাচন, কাঁচি, দাও, বটি, বাগি, ইন্যা বেকই আছে। মেওপোলা মাইনষের কাম করনের সব জিনিসই আছে এগ বাইত্যে। ঢেহি আছে ধান ভানার, হাফট আছে ধান হুকাবার, কোটা আছে গাছ তিগা আম কাঠল পারবার, হলা হাছুন আছে ঘর বাড়ি হোরনের নিগা, উচি আছে ময়লা ফালাবার। ডাহি আছে ধান নেওয়ার, ঝাঞ্জইর ছাপ্নি আছে খই ভাজনের। জাতা আছে ছাতু ভাঙ্গনের নিগা। বুরকা, পাইল্যা, চাপ্নি, খোরা, হানকি, বাটি, ঘটি, নাইন্দা, কোলা, জালা, ডোল, বেড়, চালা, ডালা, ঝান্না ইন্না বেকই আছে। তাগ টিনের থালিও আছে, আবার করইর থালিও আছে। জামাই জোড়া, ইস্টি এগানাই আইলে করইর থালিতে খাবার দেয়। ট্রাংগ সুটেসও আছে। ধরতে গেলে ফালানির বালা বাড়িতেই বিয়া অইছে।

পালানের ক্ষতের ধাইরায় নাউ, কুমরা, হশা, ঝিংগা, পোড়ল, শিমইর, শীবচরণ এইন্যা আরজিছে ফালানির হউরি। ইন্যার জইন্যে বাশ দিয়া জাঙলা বানাই দিছে। হেইন্যা মইদ্যে ঝলমি ঝলমি তরিতরকারি ধরে। বাপের বাড়ির নিগা ফালানির পরাণ পোড়ে। তাই জাংলা তলে খারইয়া পুম্মুহি চাইয়া থাহে। বুক ভাইঙা কান্দন আহে তার।

ফালানির জামাইর ফেলাইট ছাড়নের তারিখ ঠিক অইছে। বিমান বন্দর পর্যন্ত তার নগে ক্যারা ক্যারা যাবো হেডা ঠিক অইল। একটা মাইক্রোবাস ভাড়া করলো। মাও বাপেরে হেলাম কইরা শাব্দুল গাড়িতে উঠলো। গাড়িতে শাব্দুলের নগে উঠলেন এলাহি মেম্বর সাব, ফালানির ভাহুর, আর ফালানি। বিমান বন্দরে যাওনের পর পেঁচ মাইরা দালালে আরও ১০ য়াজার টেহা চাইয়া বইল। কয় যে কুনু কুনু জানি দেওন নাগব। অহন টেহা পাব কুনু? বিমান ছাইড়া দেওনের সোময়ও অইয়া গেল গা। হারাহারি কইরা মোবাইল কইরা বিকাশ কইরা দশ য়াজার টেহা আইন্যা দালালের য়াতে দেয়। শাব্দুল বিমানের সীটে গিয়া বহে। একসুম বিমান ছাইড়া দিল। শো শো শব্দ কইরা আসমানের দিকে উঠতে নইল। ফালানি বিমানের দিকে ফ্যাল ফ্যাল কইরা চাইয়া রইল। একসুম পচিম দিকের আসমানের দেওয়ার হাজের বিতর বিমানডা য়ারাইয়া গেল গা।

১০/৫/২০২১ খ্রি.

লেখকের কথাঃ

মাতৃভাষায় কথা বলতে ও শুনতে সবাই ভালো বাসে। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। আমাদের অনেকেই মায়ের ভাষায় কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। অনেকেরই নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা আছে। তারা পরিবারের সদস্যদের সাথে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। আমার বাড়ি টাঙ্গাইল। আমার এলাকায়ও নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা আছে। সেই ভাষাটাকে আপনাদের মাঝে তুলে ধরার জন্য ফালানির গল্পের ছলে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমাদের গ্রাম বাংলার জিনিসপত্রের আঞ্চলিক নামের সাথে পরিচয় করার প্রয়াস করেছি এই গল্পে। গল্পের ব্যাকগ্রাউন্ডে ফালানি ও শাব্দুল নামের দুটি কাল্পনিক চরিত্রে তাদের মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাটা সামান্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। কাউকে দোষারোপ করার উদ্দেশ্য আমার ছিল না।

ফালানির নোনাশের জামাই

ফালানির নোনাশের জামাই একটু ভেবলা কিছিমের। কয় বছর ধইরা বিয়া করছে এহনো কোন পোলাহান ছোলাপান অয় নাই। বাপ মাও মইরা গেছে গা। দুইডা গরু আছে য়াল বাওনের। হেন্নারে পালতে অয় অর নোনাশেরই। খের কাইটা কুরার নগে মিশাইয়া চারিত দিয়া খাওয়ায়। নগে এক মোট নুনও মিশাই দেয়। অর নোনাশের জামাইই গরুগুনারে বাছ্রা ক্ষেতে নিয়া হাচার দেয়। গরুগুনা বালাই আছে, গামচাইয়া ঘাস খায়। টাইক ধইরা পানি খায়। নোনাশের জামাইরে হশুর বাড়িত নিতার দাওত দিলে নোনাশেরে নিয়া ত আহেই, নগে গরু দুইডারেও নিয়াহে। হেন্নারে ফালানিগ গরুর নগেই বাইন্দা থয়। অগ গরুয়ে হেগ গরুরে দেকবার পায় না। হিং দিয়া খালি গুতায়। ইন্না এহেবারে যাইরা গরু। নিতা খাবার আইয়া এক হপ্তা ভইরা তাহে। নোনাশে বাপের বাড়ি আইয়া একটা কামেও য়াত দেয় না। বইয়া বইয়া খালি ফালানির ছক্কল ধরে। আর ইডা ওডা কয়। ফালানি য়াও করে না। ফালানি মনে মনে কয় “নোনাশডা পাজি অইলেও বাপের বাড়ি আইয়া থাকপার চায় থাকুক। তার জামাইডারে নিয়া এত দিন থাহে ক্যা? জামাই খাওনের সুম একবার ইডা চায়, একবার ওডা চায়। একবার কয় কাচা মইচ দেও। একবার কয় পিয়াইচ কাইটা দেও। থাহুক মরারডা। ওডার গরুগুনা কিয়েরে নিয়ায়?”

২৭/৫/২০২১

ফালানির ঘাউড়া চাচা হশুর

ফালানির চাচা হশুরের একজোন বছরকারী কামলা আছে। কামে কাইজে বালাই। হেদিন য়াল বাওনের সুম নাংলের ফালাডা ভাইংগা ফালায়। দেহা অইলে তারে হইচ করে

– তুই নাংগল ভাংলি কিবায় রে?

– চাচা, উত্তর মুরার ক্ষেতে য়াল জুরছিলাম। দুই ঘুরানি দেওনের পরে একটা গাছের হিকরে বাইজা নাংগলডা ভাইংগা গেল গা।

– হে ডা ত বুজলাম। তুই নাংগল বাংলি কিবা কইরা হেইডা বালা কইরা ক?

– হেইডাই ত কইলাম। য়াল জোরার পাজুন দিয়া দুই বলদরে দুইডা বারি মারলাম। দুই ঘুরানির পরই মাটির নিচের একটা হক্ত হিকরের নগে বাইজা নাংগলডা ভাইংগা গেল গা।

– আরে বাইরা বেটা, নাংগল ভাংলি কিবা কইরা হেইডা ভাইংগা ক?

– য়াল জুইরা কুটি হক্ত কইরা ধইরা আছিলাম। ক্ষেতের মইদ্যে দুই ঘুরানি দেওনের সুম হিকরের নগে বাইজা টাস কইরা নাংগল্ডা বাইংগা গেল গা। মটকা কাঠের নাংগল মোনয়।

– আরে গাবর, নাংগল কিবা কইরা ভাংলি হেইডা ক।

এবা কইরা যতই বুঝায় ফালানির চাচাহশুর খালি হইচ করে লাংগল ভাংল কিবায়। কামলায় দেখল ইডা ত বালা ঠেটা মানু রে! ইডারে বালা একটা শিক্ষা দিওন নাগব।

কামলাডায় কয়দিন পারে দুপুরে খওনের সুম একটা ডাংগর মেয়ায় তারে খাওন বাইরা দিছাল। খাইয়া হাইরা বাইর বাড়ি গিয়া ফালানির চাচা হশুরের নগে দেহা য়য়। কামলায় হইচ করে

– চাচা, আইচকা দুপুর সুম আমারে যে মাইয়াডায় বাইরা দিছাল হেডা ক্যারা?

– আরে ছেরা, তুই অরে চিনস নাই। ওডা আংগ ছোট গেদি জয়গন।

– তাত চিনলাম। অইজে যে ছেরিডায় আমারে ভাত বাইরা দিল হেডারে ত চিনলাম না?

– আরে বাইরা বেটা, ওইডাই ত আংগ জয়গন। বেহের ছোট। আইজকা শাড়ী পিনছে। হেই জিন্তেই তুই চিনবার পারস নাই।

– আরে চাচা, আমি ত হেইডাই জানবার চাইতাছি ঐ মাইয়াডা ক্যারা?

এমুন্সুম জয়গন আইয়া কইল “এই যে আন্নেরা যে এনু মিটাই মিটাই কতা কইতাছুইন, উম্মুরা দিয়া গরু ছুইটা পাহা ধানের হিঞ্জা গুনা আমচাইয়া খাইহালাইতাছে। হেইডা দেহুইন গা।

১/৭/২০২১

ফালানির চাচি হউরিডা এহেবারে কিরপিন। মাছ পইচ্যা যুদি বগবগা কুইয়া অইয়া গোন্দ উইঠাও যায় তাইলেও ফালব না। আন্দন ঘরের পাছ তনে গুলাইলের পাতা তুইলা হেগনার নগে নাড়াচারি কইরা খায়। পেট পরিস্কার য়াখনের নিগা গোন্দ বাদাইলের পাতা ভাইজা খায়।

ফালানির চাচত দেওর

(টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ফালানির চাচত দেওরডারে কিবা কিবা জানি ঠেহে। য়াটবার সুম মাঞ্জা ঢুলাইয়া য়াটে। মেওপোলা মাইনষের নাগাল য়োঠে লিবিস্টিক দেয়। বাবরি চুল য়াকছে। মইদ্যেহানে হিতি করে। কপালে টিপও দেয়। য়াইসা য়াইসা কতা কয়। গুঞ্জি গায় দেয়। তপন পিন্দে। আবার ছেরিগ নাগাল ওড়না গায় দেয় গামছা দিয়া। খালি মেয়া মাইন্সের নগে মেল দিবার চায়। কেউ বাড়া বানবার নইলে তার নগে গিয়া ঢেহি পার দেয়। ফালানির নগেও ঢেহি পার দিবার নইছাল। ফালানি কইল “ছুট মিয়া, আন্নে অইলাইন গা মর্দাই মানুষ। আন্নে মাইগ্যা মাইনষের নাহাল করুইনকে ক্যা?” দেওর কয় “আলো মাই, ভাউসে কি কয়, আমার অহনই বিয়ার বয়স অইছি নিহি?” কতা কবার নইলেই দুই তিনডা তালি মারে হাতে। আর পান চিবায়। ফালানি হউরির কাছে কইছাল “ছুট মিয়া অবা মেয়া মাইন্সের নাগাল করে ক্যা? আমার নগে ঢেহি পার দিবার চায়। আমার শরম করে।” হউরি কইল “ওডা অর জর্মের দোষ। নাদের ডাক্তর কয় যে পোলা মাইন্সের গতরে যুদি জর্মে তিগা কিছু কোষ মেয়া মাইন্সের কোষের মোত থাহে তাইলে হেডায় অবা করে। হেডারে মাইন্সে হিজরা কয়। মেয়ানোকের কোষ যত বেশী থাকপ তত বেশি মেয়ালিপানা করব। আংগ ভাইস্তাডা কিছুডা হিজরার সভাব পাইছে। ওডারে বিয়া করাইলে বউ থাকপ না।”

ইবারের মরা পরের উপুর দিয়া গেছেঃ

ফালানি তার হউরির নগে তার ফুবু হউরিগ বাড়ি ফয়তার দাওয়ত খাইতে গেছাল। তারা ফবু হউরির নগেই খাবার বইছাল। খায়ন দায়ন ভালাই দিছাল। চামারা ধানের ভাতের নগে হাঁড় গরুর গোস্ত আর মাস কালাইর ডাইল। হেষে চুকা দুই। পাতলা দইয়ে কুশাইরা চিনি দিয়া মাহাইয়া চুমুক পাইরা খাইয়া ফুবু হউরি ঢেউক দিয়া কয় “ইবারের মরা পরের উপর দিয়া গেছে।” হুইন্যা ফালানির হউরি কয় “এল্লা বুঝি ইডা কি কইলাইন, বুঝবার পাইলাম না।” ফুবু হউরি বুঝাইয়া কয় “ইবার কলেরা য়ইয়া আংগ পোলার বউডা মইরা গেল গা, যেডার নিগা আমরা ফয়তা খাপ্পাইলাম। উম্মুরা আবার আংগ বড় গেদির জামাইডা মইরা গেছে কলেরা য়ইয়া। হেডার ফয়তা খামু আগামী শুক্কুরবার। দুইডাই পরের সোন্তান। তাই কই, ইবারের মরা পরের উপুর দিয়া গেছে। “

১২/৯/২০২১

ফালানির খাওনের কষ্টঃ

ফালানির হউরিডা কিবা জানি। পোলার বউগুনারে চাপে য়াখে। য়াকপ না ক্যা, ওডার হউরিও পোলার বউগরে চাপে য়াকত। তাই, হেইডা শোধাইতাছে হের পোলার বউগ উপুর দিয়া। ফালানি একবার মোনে মোনে কয় “আমি হউরি য়ইয়া তা করমু না। তয় এই হউরি বেটি যেসুম বুড়া অইয়া য়াতুর য়ইয়া যাব হেসুম মজা দেহামু। মজ্জালেও কাছ দিয়া যামুনা। বিছনা নষ্ট কইরা ফালাইলেও হেগ্না ধুমু না। ক্যারা বলে কইছে ‘ধারাইলে শোধানী আছে।” ফালানির মায়ের কতা মোনে য়য়। মায়ে কই দিছে “হউরি যত খারাবই য়উক হউরিরে কষ্ট দিবি না। পাপ য়ব।” হেই কতা মোনে কইরা ফালানি মোনে মোনে কয় ” থুক্কু ইন্যা কি চিন্তা করলাম! তওবা, হউরিরে কোন দিনও কষ্ট দিমু না।”

অহন হুনুন, ফালানির হউরি কিবা কইরা তারে খাওনে কষ্ট দেয়। ভাত য়ান্দনের সুম যুদি ফালানি হউরিরে হইছ করে “আম্মা চাইল কয় কাঠা দিমু?” হউরি চোপা কইরা উঠে “ক্যা, তোমার হোদ নাই? তোমার মায় হিকাই দেয় নাই, কয়জোন মাইনসের নিগা কয় কাঠা চাইল দিওন নাগে বুরকার মইদ্যে?” ফালানি আন্দাজ কইরা চাইল দেয়। বাড়ির বেক্কের খাওন শেষ য়ইলে ফালানির খাওন নাগে। কোন কোন দিন দুপুরের খাওন খাইতে ফালানির আছরের জের ওক্ত য়ইয়া যায়। বুরকায় ভাত কোম থাকলে কোমই খাইতে অয়। বেশি থাকলে খাইয়া হাইরা পানি দিয়া পান্তা ভাত বানাইতে য়য়। হেই পান্তা আবার য়াইতে খাওনের সুম ফালানিরই খাইতে অয়। ভাত যুদি পুইড়া ধরে হেই পোড়া ভাত ফালানিরই খাইতে অয়। ভাতের মইদ্যে যুদি ঘাসের বিচি, আখির দানা থাহে হেগ্না হুধ্যাই খাওন নাগে তার। বাড়িতে যুদি তার হশুর, ভাশুর কোন য়াবি জাবি আনে হউরি কোন কোন সুম ফালানিরে হাদে। আবার হাদেও না। হরবি কলাগুনা পাইক্যা মইজ্যা পইচ্যা যাইতাছে। তাও হউরি কোন সোম কয় না “বউ গ কলা গুনা খাও।” যেসুম ফালাই দিওন নাগব হেসুম কয় “এল্লা, বউ কলা খাইলা না?”

এবা।

৮/৯/২০২১

মুরগির আওয়াদানিঃ

(টাংগাইলের আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার)

ফালানির হউরির আন্ডা পারা মুরগিডা ঘরের পাছে ঠোরকাইয়া ঠোরকাইয়া আধার খাইতাছাল আর মইধ্যে মইধ্যে গলা উচা কইরা করকরাইতাছাল। তারপর ঘরের ভিতর ঢুইকআ পড়লো। ফালানি এই কুরকা কইয়া ডাক দিয়া ঘরের ভিতর হান্দাইয়া দেহে মুরগিডা কিবা করে। এক বার নাফ দিয়া কারে ওঠে, আবার নাফ দিয়া চকির উপুর ওঠে, একবার নাফ দিয়া উগারের উপুর ওঠে, একবার নাফ দিয়া ডোলের উপুর ওঠে। আবার নাফ দিয়া ডোলের ভিতর ধানের উপুর চুপ কইরা বই পড়ল। ফালানি য়ান্দন ঘরে তার হউরিরে ডাক দিয়া কয় “আম্মা গো, মুরগিডা কিবা জানি ঘরের ভিতর আওয়াদানি করতাছে।” হুইন্যা হউরি কয় “করুক, আন্ডা পারবো, তুমি উন তনে আই পড়।”

একটু পর মুরগি কক কক কইরা নাইরা নুইল। তারপর বাইরইয়া কক কক করতে করতে ঘরের পাছে গিয়া মিলাই গেলো গা।

৩০/৯/২০২১

ফালানি বাপের বাড়ি আইপড়ছে

(টাঙ্গাইলের গ্রাম্য আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার)

ফালানি বাপের বাড়ির পুস্কুনি তরি আইলে পড়ে দেহে তার ভাবী ঘাটপাড়ে চুল আলগা কইরা মাথা মোল্কাইয়া গোসল করতাছে। নোন্দের জামাই দেইখা ফালাইলে ভাবীয়ে শরমাবো। তাই, জামাইরে কইল “ভাবী ঘাটপাড়ে মাথা আলগা কইরা গোসল করতাছে। শরম পাবো। গলা খাউর দেও।” জামাই গলা খাউর দিলে ভাবী চইমকা গিয়া তাত্তারি কইরা আঁচলডা ঝাহি দিয়া সোজা কইরা মাথায় দিলো। তাতে কি অইল, জামাই মাথা ত দেখলই এক ঝলক শরীরও দেইখা ফালাইল। তাই, মাথা নিচা কইরা কইল “সালামাইকুম, ভাবী সাপ কিবা আছুইন?” ভাবী কইল “এইত্ত, আছি, আন্নেরা যেবা দোয়া করুইন। যাইন বাইত্যে যাইন। আমি আইতাছি গোসল কইরা। ” ফালানি জামাইরে পিঠের মইদ্যে ধাক্কা দিয়া কয় “নও, ভাবী গোসল কইরা আহুক। ” ফালানি জামাই নইয়া বাড়িত গেলো।

ভাবীয়ে ভাবনায় পইড়া গেলো। ফালানিরে আনবার না গেলে ত আবার দেয় না। আইচকা জামাই যে নিজেই নিয়াইল? হউরিয়ে বাইর কইরা দিল নিহি?

বাইত্যে গিয়া দেহে যে ফালানির মায় হুতি দিয়া য়াইসালে তিগা ভুইত্যা একটা ডেগ নামাইতাছে। জামাই গলা খাউর দিয়া কইল ” আম্মা কিবা আছুইন?” হউরিয়ে কইল “কিবা আর থাহি। মাঞ্জায় টাস নাগছে হুতি দিলে সোজা য়নজায়না। তোমরা ভালা আছো? বিয়াই, বিয়ানি, পুতুরা, জিয়ারি, বুইনেরা ভালা আছে?”

ফালানিরে কইল “গেদি, জামাইরে অজুর পানি দেও। খই ভিজাইয়া চিপ্পা মিঠাই দিয়া নাস্তা দেও।”

জউরিরেও চিন্তায় পইরা গেলো। কতানাই বার্তা নাই, জামাই যে ফালানিরে নইয়া অভম্বিতি হশুর বাড়ি আইল?

ads banner:

ফালানি চুক্কা আম খাইল

(টাঙ্গাইলের গ্রাম্য আঞ্চলিক ভাষায় লেখা উপন্যাসের অংশ)

গেছেকাইল ফালানির জামাই বাড়িত গেছে গা। যাওনের সুম ফালানির মায় বুরকায় কইরা কয়ডা জিয়ল মাছ দিয়া দিছে। আর কইয়া দিছে “বাজান, মাছগুনা বিয়াই বিয়ানিরে য়াইন্দা খাবার কইয়। জিয়ারিগ নইয়া আবার আইয়। কয়ডা টেহা দিয়া দিলাম। এডা তপন কিন্যা নইয়।” যাওনের সুম ফালানিয় কইছে “আন্নে আমারে নিবার আহুইন জানি। আম্মা কইছাল পেটের সোন্তান তিন মাস অইলে বাপের বাড়ি তিগা আই পড়বা। জৈষ্ঠ্যমাসে তিন মাস পড়ব। নিবার আহুইন জানি। তার আগে যুদি আবার পারুইন এডা বেলাউছ নিয়াইবাইন।

করিম আর ফালানি বাইরবাড়ি আম গাছ তলে বইয়া বইয়া আলাপ করতাছে। করিম কইল

– বুগ, আমগুনা ভালাই ডাংগর অইছে। অহনো ক’ড়া আছে। কয়দিন পরে আইট অইযাবো। খাবা নিহি। ইগাছের আম কাচামিঠা। ওগাছের আম জাউন্যা জাউন্যা নাগে। আর কাচারি ঘরের পাছের আম এবা চুক্কা গো!

করিম গাছে উইঠা কয়ডা কাঁচা আম পাইরা নিয়াইল।

ফালানি কইল

– তুই কাঁচামিঠাডা খা। আমারে চুক্কাডাই দে।

– আম ছিলামু কি দিয়া? ইবার চৈতপূজায় মেলায়ও যাইনাই, ছুরিও কিনি নাই। ঝিনই আছে। ঝিনই নিয়াহিগা। কাইলকা পাটার মইদ্যে ঝিনই ঘইষা দাড় দিছি। য়াসেরে খাওনের নিগা বড় বড় ঝিনই কুড়াইছিলাম। ঝিনইডা খুব ভালা অইছে। চক পাড়ারা ঝিনই পুইড়া চুনা বানায়। পাথর চুনার দাম বেশি। তাই বেশিরভাগ বাইত্যেই ঝিনইর চুনা খায়। অহন খাল হুকাইয়া মেলা ঝিনই বাইরইছে।

– ঐযে এডা হিল পড়া আম দেখতাছি। ঐডা পাইরান। হিল পড়া আম খাইতে ভালাই নাগে। কিবা জানি দেওয়ায় গুড়্গুড়াইতাছে। গুমাও নাগতাছে। ঝড়ি আবার পারে। ঝড়ি আইলে মেলা আম পইড়া যাবগা।

– বু, কাক্কি কি ইবার কাসন্ড বানাইছে? যেসুম আম পাহন ধরব হেসুম কাঁচা আর পাহা আম বটি দিয়া কুচা কুচা কইরা কাইট্যা কাঁচা মইচ দিয়া ভাঞ্জাইয়া ভত্তা কইরা দিবা।

এদুল্যা বাতাস আইলো। হিল পড়া আমডা পইড়া গেলো। ফালানি দৈড় দিয়া খোটতে গিয়া উইস্টা খাইয়া পইড়া গেলো। করিম কইল “ভারে গেলেই ত অইত। অহন পইড়া দুক্কু পাইলানা?”

ফালানির ভাশুর চেতাং মাইরা হুইয়াছাল

(টাঙ্গাইলের গ্রাম্য আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার)

ফালানি বাইরবাড়ি তনে আইয়া বড় ঘরে গেছাল তেতইল খাবার নিগা। কয়দিন দইরা খালি চুক্কা খাবার চায় ফালানি। ভাতত খাবারই পায়না। মাছ গোস্ত যেডাই দেইক হেইডাই খালি বয় আহে। তেতইল চাইটা খাইলে চাইরডা ভাত খাবার পায়। ঊমা, ঘরে গিয়া দেহে ভাশুরে চকির উপুর চেতাং মাইরা হুইয়া ঘোম দিছে। ইবাড়ির মানুগুনা এবাই। এহাকজোনের ঘোম পারনের ডিল এহাক ধরনের। কেউ ঘোমায় চিত্তর অইয়া, কেউ ঘোমায় উপ্পুর অইয়া, কেউ ঘোমায় কাইত অইয়া, কেউ ঘোমায় কাউব্দা দিয়া, কেউ ঘোমায় মোক ঢাইকা, কেউ ঘোমা য়া কইরা, কেউ ঘোমায় নাক গাইকা আবার কেউ ঘোমায় তপন খুইলা বুক তরি টান দিয়া। অসুবিধা য়য় না হেসুম তপন দিয়া বুক তনে য়াটু উব্দি ঢাকা থাহে। শরমের কতা, ভাশুরের হুমকে তেতইল খাব কিবায়। এমুন সুম য়ান্দন ঘর তিগা হউরি কইল “বউগ, তোমার ভাশুরেরে ডাক দেও, জহুরের নোমাজের ওক্ত গেতাছেগা, চিত্তর অইয়া হুইয়া ঘোম দিছে।” ভালাই অইল। ফালানি অস্তে কইরা ডাক দিল “মিয়া ভাই, ওটবাইন না? আম্মা নামাজ পড়বার কইতাছে।” ভাশুরের ঘোম ভাইংগা গেলো গা। দুই য়াতের দুই আঙুল দিয়া চউক ঘষা দিয়া য়া কইরা য়াম নিয়শ ছাইরা কয় “ঘোমাই পরছিলাম। এর মইদ্যেই হপন দেখলাম ঘরে এক চোর ঢুইকা কি জানি নিবার নিগা য়াতাপাতা করতাছে। তোমার ডাহনে ঘোম ভাইংগা গেলো গা।

– হেডা বেটা চোর, না বেটি চোর আছাল?

– বেটি চোরই ত দেকলাম।

– তাইলে মোনয় তেতইলের আচার খাবার আইছাল।

– য়বার পারে।

ভাশুর উইঠা চউক কচলাইতে কচলাইতে নাইয়ের তলে তপন পিন্দা য়াটতে য়াটতে কলের পাড় উম্পি গেলোগা।

ভালাই অইল। ফালানির হউরি উগার উপুরের ধন্নার নগে সিকার মইদ্যে করইর বইয়মে তেতইলের আচার য়াকছাল। হেইডা পারবার সুম একটা বুরকার মইদ্যে ঠ্যালা নাইগ্যা ঢুস কইরা পইরা গেলগা। হউরি হইছ করল

– বউগ, শব্দ অইল কিয়ে, কী পড়ল?

– বিলাই, বিলাইয়ে বুরকার মইদ্যে মুক দিয়া কাইত কইরা ফালাইছে।

– ভাংগে নাইত?

– না, ভাংগে নাই।

ফালানি বইয়ম তিগা তেতইল বাইরা কইরা চোটকাইয়া খাওনের সুম জিলবায় চট চট শব্দ য়ইছাল। হউরি বুজবার পাইয়া কইল ” বউগ, বেকটি খাই ফালাইও না। গেদির নিগা য়াইখা দিও। গেদি আইলে তেতইল খাবার চাবো। ” ফালানি শরম পাইল।

ফালানির মাথার চুলে বিলি দিলো

(টাঙ্গাইলের গ্রাম্য আঞ্চলিক ভাষায় লেখা উপন্যাসের অংশ)

দুপুইরা খাওন শেষ কইরা ফালানির মায় ঘরের হাইঞ্চায় হরবি গাছটার তলে টুলডা নইয়া বইল। ফালানিরে ডাক দিয়া কইল “গেদি, আয়ছে, তোর চুলে বিলি দিয়া দেই।” ফালানি ফিরাডা টান দিয়া আইন্যা মায়ের হুমকে বইল। ফালানির ছোট বুইনডারে ডাক দিয়া কইল “অ গেদি, তুইয় আয় মাথায় বিলি দিবার। তর ভাবীরেও আবার ক। আর বড় ঘর তনে মোস্কা, হাড়ের কাহই আর খাস তেলের বোতলডা নিয়ায়। এরপর বেক্কেই লাইন দইরা গাছতলে বইল মাতায় বিলি দিবার নিগা। বেকের আগে বইল ফালানির ছোট বুইন। তার পাছে ফালানি। তার পাছে ফালানির মাও। তার পাছে ফালানির ভাবী বইল। মাথায় বিলি দেওন শুরু অইল। ভাবীডার পাছে কেউ বহে নাই। তাই ভাবীর বিলি দেওনের কেউ নাই। পরের বাড়ির মেয়াগ এবাই অয়।

গেরামের মেয়া মাইনষের যেসুম কাম কোম থাহে হেসুম তারা লাইন দইরা মাথায় বিলি দিতে বহে। বিলি দিয়া তারা উহুন আনে। মোস্কা দিয়া উহুন আইব্যা মুচমুচি মারে। য়াড়ের কাহই দিয়া চুলে হিতি করে। যারা মাথা মোলকাইয়া গোসল ধয় না তাগ মাথায় উহুন য়য়। উহুনে চুলের গোড়ে বই বই য়স খায় আর আগে। এই জোন্যে উহুন অইলে মাথা খাইজায়। উহুনে গুড়া গুড়া আন্ডা পারে চুলের গোড়ে। হেই আন্ডা ফুইটা নিক বাইরয়। এবা খুদি খুদি নিক বাইটা বাচ্রার নাগাল, চুলের নগে নাইগ্যা থাহে। এই নিক গুনা নউখ দিয়া চিমটি দিয়া দইরা আনা যায়। দুই য়াতের বুইড়া আঙ্গুলের চিপা দিয়া টিপি দিয়া ইন্যারে ফাটাইয়া মাইরা ফালান যায়। আবার মোসকা দিয়া ধুইরা টান মাইরা আইন্যা চাপ দিলে মুচমুচি ফাইট্যা মইরা যায়। বড় উকুন দুই আঙ্গুল দিয়া ধইরা আইন্যা দুই বুইরা আঙুলের নউখ দিয়া চিপা দিয়াও মাইরা ফালান যায়।

মাথায় বিলি দিতে দিতে মেওপোলাগুনায় আলাপ জুইরা নইল।

ফালানির বুইন – তোমরা ঢেলা ঢেলা উহুন আইন্যা আমার য়াতে দিবা। আমি আঙ্গুল দিয়া চাপা দিয়া টাসটাসি মাইরা ফালামু।

ফালানি – এই যে এডা ধরছি। গালাই ফালা।

বুইন – ইডা না উরুসের নাগাল ভুইত্তা। হেদিন দেহি দুলাভাইর ঘারের নিচে পিঠের উপুরে নাল টক টকা অইয়া চাক্কা বান্দিছে। আমি কইলাম, এল্লা দুলাভাই, আন্নের পিঠে কী অইছে? দুলাভাই কইল যে তোংগ চকিত উরুস আছে। উরুসে কামড়াইছে।

ফালানি – তুই আবার দেকলি কিবায়?

বুইন – দুপুরসুম গোসল কইরা উঠানে বাশের আড়ের উপুর তপন হুকা দেওনের সুম দেখছি।

ফালানি – মাইনষের প্যাচাল বাদ দ্যা, সোজা অইয়া ব। তর চুল এবা পাটের ফেউয়ার নাগাল ক্যা? এই ফেইস্কা চুলের আগা হোমান কইরা কাইট্যা ফালান নাগব। কাহই দিয়া চুল দোয়াবি। চুলের মইদ্যে জট অইগেছে।

বুইন – চুলের মইদ্যে ভালা দামী দামী তেল দিওন নাগে। মাইনষের কাছে হুনছি কি একটা তেল জানি আছে, হেডা চুলে দিলে চুল তোসা পাটের নাগাল বড় অইয়া মাটি ছেচইরা যায়।

ফালানি – তর দুলাভাই আমারে বোতলের বাসনা নাইরল তেল আইন্যা দেয়। আমার হউরি খালি হস্তা জিনিস আনবার কয়। হে আনবার কয় আলগা নাইরল তেল। হেন্যা আমার কাছে পোড়া পোড়া গোন্ধ করে। নাইরল করাইর মদ্যে আইসালের আগুনে জ্বাল দিয়া আলগা তেল বানায়। হেই জোন্যে গোন্ধ করে।

বুইন – তাইলে বতলের নাইরল তেল বাসনা করে ক্যা?

ফালানি – মিশিনে নাইরল তেল বানাইয়া তার নগে বাসনা ফুলের পাপড়ি ভিজাইয়া থয় মোনয়।

মা – তর বাপে সব সুমই আমার নিগা বাসনা তেলের বতল আনত। বিয়ার সুম দিছাল গোন্ধরাজ তেল। তুই য়বার পর আমার মাথার চান্দি জ্বলত। চান্দি দিয়া ততা ভাপ বাইরইত। এবা ততা য়ইত জানি চান্দিতে আলই ধানের চাইল দিলে ফুইট্টা উঠব। হিম কবরি তেল দিলে মাথা ঠান্ডা য়ই গেত। তাই, হেসুম হিম কবরি তেল আনত আমার নিগা।

ভাবী – আংগ মা মাথায় কদুর তেল দেয়।

বুইন – মা, কদুর তেল বানায় কি দিয়া গ?

মা – মাইনষে কয় না, যেই কদু হেই নাউ। নাউরেই কোন কোন মাইনষে কদু কয়। নাউয়ের বিচি তনে তেল বাইর করলে তারে কয় কদুর তেল। জয়না গোটার বিচির তনে তেল বাইর করলে কয় জয়না তেল। বয়রা গোটার বিচি তিগা অয় বয়রা তেল। বাজনা গোটার নিচি তনে বাজনা তেল, তিলের তিগা তিলের তেল, ভেন্না গোটা তিগা ভেন্না তেল, বাদাম তিগা বাদাম তেল, হউসা তিগা খাস তেল। সূর্যমুখীর বিচির তনেও তেল য়য় সূর্যমুখী তেল।

ফালানি – সোয়াবিন তেল, জল্পইর তেল, কালিজিরা তেল, জয়তুন তেল, ইন্নার কথা ত কওই নাই।

বুইন – মইয়রজান বুর চুলগুনা দীলগা আছে। ছাইড়া দিলে য়াটুর নিচ তুরি পড়ে।

ভাবী – মইয়রজানের চেহারাডা খপসুরুতের অইলেও সুখ অইল না। জামাইয়ে ছাড়া কইরা দিছে।

ফালানি – ক্যা, কি অইছিল?

বুইন – ওডার হউরিও যেবা জাউরা, ওডার জামাইডাও হেবা জাউরা। জমিন জিরাত বেইচ্যা, ওডার গয়নাগাটি বেইচ্যা বিদেশ করবার গেছে গা। মইয়রজান বু জিদ ধরছাল গয়না বেচপার দিব না। জোর কইরাই গয়নাগুনা বেইচ্যা ফালাইলে বু বাপের বাড়ি আই পড়ে। আর শশুরবাড়ি যায় না। জামাইয়েও তারে কাগজ কইরা খেদাই দিছে।

ফালানি – এই জোন্যেই কয়দিন ধইরা দেখতাছি ছেড়ি গরু-ছাগল হাচার দেয়। অইদে মদে কাম করে। বেজার অই থাহে। আমার নগেও মোন খুইলা কতা কইল না। গয়না নইয়া কি কেউ কব্বরে যায়? গয়নার নিগা কিয়েরে বিয়া ভাংগন নাগব? বেক্কুইল্যা মেয়ানোক! জামাই বিদেশ তনে টেহা কামাই কইরা আইন্যা ওর থিগা আরও ভরা গয়না কিনবার পাইত।

মা – কিবাজানি দেওয়ায় গুড়্গুড়াইতাছে। টিনের চালে ঢাসঢাসি ফোটা পরতাছে। বৌগ, উঠ, তোমার হশুরের তপনডা ভিজ্জা যাব। তুইল্যা ফালাওগা। উইঠা পর তরা।

ফালানি গরুরে গোস্ত খাইতে দিছাল

(টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার)

গয়নাগাটি বেইচ্চা ফালানের পর তিগা ফালানির মুহে য়াসি নাই। এরপর আবার পালের হাড় গরুডা বেইচ্চা ফালাইছে। এই জোন্যে তার মোনডা এহেবারে ভাইংগা গেছেগা। গুতাইন্যা হাড় অইলেও ফালানিরে কুনদিন গুতায় নাই। গরুডার নিগা ফালানির পরন পোড়ে। খালি চাড়ির পাড়ের মুহি চাই থাকে। মশায় যাতে না কামুর দিবার পারে হে জুন্যে চট কাইটা হাড়ডার গতরে পিনদাইয়া দিত। হেই চটটা অহন গোয়াইল ঘরের বেড়ার উপুর ঝুলতাছে।

ফাগুন মাস। গাছে গাছে পলাশ আর শিমুল ফুল ফুইটা গাছ নাল য়ইয়া গেছে। গাছ ভর্তি হালিক ফুলের মধু খাইতাছে আর কালকিল করতাছে। ঝোপের ভিতর তিগা কুকিল পৌখে কু কু করতাছে। কিবা জানি হুনা হুনা নাগতাছে ফালানির। দুপুর বেলা পুস্কুনির পাড়ে আম গাছ তলার বাসের মাচাংগে গিয়া বইল। চৌখ আবার চাড়ির পাড়ের মুহি। মোনে অইয়া গেল হেই হাড়ের কথা। নতুন বউ কালে এক বার চাড়ির হাড়ের খাবারের নগে ফালানি গোস্তের সালুন মিশাই দিছাল। গরু যে গোস্ত খায় না হেডা ফালানি জানত না। ফালানি ভালাবুইজা গরুর খাওনের নগে গোস্ত মিশাই দিছাল। হাড়ে চাড়ি খায় না ক্যা, খায়না ক্যা, ইডা নইয়া বেবাকে যেসুম পেচাল পারতাছে হেসুম ফালানির জ্যাডা হশুর আইয়া চাড়ির খাওন আওলাইয়া দেহে গোস্ত মিশাইন্যা। কইল “এই, ইন্যার নগে গোস্ত মিশাইছে ক্যারা? ফালানি কইল ” আমি গো।”

– মিশাইছ ক্যা?

– আমার গরুডার নিগা পরন পোড়ে, তাই।

– এই পাগুল্লি, গরুয়ে যে গোস্তের বয় সইয্য করতে পারে না হেইডা তোমার মাও বাপে হিকাই দেয় নাই? গোস্ত ভাঞ্জাইয়া দিছ দেইখাই গরুয়ে খাইতাছে না। চাড়ির বেবাক খাবার হেইমটা পরিস্কার কইরা নতুন কইরা খাবার দেও।

ফালানি বেবাকের হুমকে চাড়ি পরিস্কার কইরা নতুন কইরা খাবার দিল। গরু হেইন্না গামছাইয়া খাইল।

ফালানি এক ঢেইলেই য়াঁস মাইরা ফালাইছাল

(টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার)

ফালালি হেদিনকাও বাইরবাড়ির গাছ তলের মাচাংগে বইয়া ঠ্যাং নাচাইছাল। দেহে পুস্কুনির পানিতে দুইডা য়াঁস হাতুর পারতাছাল জোড়া ধইরা। এডা য়াঁসা আরেডা য়াঁসি। দেইখা ফালানির মেলা খুশি নাগছাল। হেসুম অচমবিতি তাগ বাড়ির কতা মোনইল। হেডা বিয়ার আগের কতা। হেগ পুস্কুনিতেও হেগ দুইডা য়াঁসা-য়াঁসি হাতুর পারত। হেডাও তার কাছে বালা নাগত। মস্কিল য়ইল, একদিন দেহে ঘাটের যেনু বইয়া ফালানি কাপড় ধোব হেনু ঢাল্লা একটা আগা দিছে। য়াঁসের কামই অবা। গ্যাতগেতি খাব, আর যেনুনা হেনু পেঁচপেঁচি আগবো। য়াঁসের গু ঘাটে দেইখা ফালানির য়াগ উইঠা গেলো গা। পুস্কুনির পাড়ে তিগা পাইল্যা ভাঙার চেড়া দিয়া একটা ঢেইল মারছে। হেই ঢেইল নাগল গিয়া য়াঁসিডার মাতার মইদ্যে। মাতায় ঝাই ধইরা কাইত অইয়া পানিত ভাসপার নইল। ফালানি তাত্তারি কইরা য়াঁসটারে ধইরা বাড়িত নিয়া গিয়া মায়রে কইল “মইরা গেলো গ।” মায় কইল “জব কর তাত্তারি।” ফালানির বড় ভাইয়ে অবাই নেংগা বঠি দিয়া য়াঁসিডারে জব কইরা ফালাইল। উনুকার মানু অবাই করে। য়াঁস কুরকা যুদি কোন কারনে মইর যাবার নয়, তাত্তারি জব কইরা ফালায়। ফালানি হেসুম ছোট আছাল। বিয়ার যোগ্যি অইছাল না। পোলাইপানির ভাবে যায় নাই। হেই য়াঁসের সালুন খুব বাস্না অইছাল। গোস্তের টুকরা য়াতে নইয়া বারিন্দায় খারই খারইয়া যেসুম ফালানির চাচত ভাইরে দেহাই দেহাই ফালানি খায়, হেসুম চাচত ভাই কয় “আমগোও য়াঁস কুরকা আছে! আমগো য়াঁস কুরকারও ব্যারাম অব। ব্যারাম অইলে আমরাও জব করমু। হেসুম আমরাও অবা দেহাই দেহাই খামু।” এবা য়াসুইন্যা কতা মোনে অইল ফালানির। যে য়াঁসাডা বাইচ্যা আছাল, হেডাও কয়দিন পরে ফালানির দুলাভাই আইলে জব কইরা খাই ফালায়। এই য়াঁস দেইখা হেই য়াঁস গুনার কতা মোনয়। পরান পোড়ে।

ads banner:

ফালানির জামাইরে বিদেশ করবার দিবনা

(টাঙ্গাইলের গ্রাম্য আঞ্চলিক ভাষায় লেখা উপন্যাসের অংশ)

পরদিন দুপুসুম ফালানি, ফালানির জামাই আর করিম গাছতলে বইয়া আলাপ করাতাছিল। এমুনসুম শুয়াকুরের মুহি তিগা মগ্য মিয়া এডা ছাগল নইয়াইতাছিল। বাইরবাড়ি তুরি আইয়া ছাগলডায় খুট্টি ধরলো। যতই টান দেয় ততই খুট্টি ধরে। পাইছায় খালি, আইগায় না। হেসুম মেলা বাতাস আছিল। মগ্য মিয়া ফালানির ভাবীর কিবা ভাই অয় জানি, কপ্পামু না। হেই জোন্যে তাগ মইদ্যে বেয়াই বিয়ানি সোম্পর্ক। তার নগে ফালানিরে দিয়া একবার বিয়ার কতাও অইছাল । ফালানির পছন্দও অইছাল। কিন্তু ফালানির বাপে কি জোন্য জানি পছন্দ করল না। ইডা আবার জামাইয়েও জাইন্যা ফালাইছে। এই জোন্যে মগ্য মিয়ারে জামাই ভালা চৌক্ষে দেহে না।

ফালানি মগ্য মিয়ারে হইছ করলো “ছাগল কিন্না আনলাইন নিহি?” মগ্য কইল “টাইন্যাই নিমু। ” আবার হইছ করল “আমি হইছ করতাছি, ছাগলডা কিন্যা আনলাইন নিহি।” কয় “হেছড়াইয়াই নিমু।” ফালানি কয় “কানে কোম হুনুইন নিহি?” মগ্য কয় “দড়ি ছিড়ব না। দড়ি হক্ত আছে। ” আসলে মগ্য মিয়া য়ারকালা না। বাতাসের শব্দে কতা ঠিকমতো হোনা যায় নাই। মগ্য মোনে করছে ছাগলের খুট্টির কথা কইতাছে। করিম খুট্টি ছাড়াইন্যা কাম করল। গাছ তিগা অল্প কয়ডা কাঠলের পাতার ডাইল য়াতে নিয়া কইল “আয় আয়।” অবাই ছাগলডা খুট্টি ছাইড়া ফালানিগ কাছে আইল। মগ্য মিয়া তাত্তারি কইরা ঘোড়া কাঠের পয়ার মইদ্যে ছাগলডারে বাইন্দাহালাইল। ছাগলডায় হেনু চোনাই দিল। চোনাই হাইরাই নাদান নইল। বটি বটি নাদা। করিম কয় “ছাগলের নাদা অবা বটি বটি য়য় কিবায়? আট্টু বড় অইলে ইন্যা দিয়া মাডবল খেলান গেতো। ছোট পোলাপাইনে বুট মোনে কইরা মুহে দিব।” ফালানি কয় “তুই যেসুম আকুরা পারস হেসুম বুট মোনে কইরা ছাগলের নাদা মুখে দিছিলি।” করিম কয় “ফালানি বু, বেশী কিছু কইলে কইল আমি তোমার কতা দুলাভাইর কাছে কইয়া দিমু।”

ফালানি মগ্যরে যেই কইছে “আন্নে একটা য়াম ছাগল” অবাই মগ্য কইয়া উঠল “আন্নের জামাইই একটা য়াম ছাগল।” ফালানি কইল “আমি কবার নইছিলাম আন্নে একটা য়াম ছাগল কিনবাইন। য়াম ছাগলে লাভ বেশী। মেলা দাম পাওযায়। হবি ভাই একটা য়াম ছাগল পাইল্যা ডাংগর কইরা পায়তিরিশ য়াজার টেহা বেচ্চে।” মগ্য কইল “আবার ঠাস কইরা পইরা মইরা গেলে পায়তিরিশ য়াজার টেহাই গেলো গা।” ফালানির জামাই বিরক্তি য়ইয়া কইল “ছাগলের পেঁচাল বাদ দেওছে।”

ফালানি মগ্যরে হইছ করলো

– আইচ্ছা বিয়াই, আন্নে বিদেশে গিয়া কিয়ের চাকরি করুইন?

– আমি কোম্পানির চাকরি করি। সহাল বেলা অফিসে আর বিহাল বেলা মালিকের বাসায়। য়াইতে মালিকের বাসায়ই থাহি।

– খাওয়া দাওয়া য়ান্নাবাড়ি?

– কামের ফাকে আমিই দু’য়ান য়ান্দি। বেশী আন্দন নাগে না। মালিকে খাইয়া যেডি বেশী য়য় হেডিই খাইহারন যায় না। থালি ভইরা ভাত, নয় পোলাও নিব। আস্ত মুরগী পাতে নিব। এক কামুর খাইয়া আর খাব না হালায়। হেইন্যা আমারে ফালাবার দেয়। আমি নিয়া কামড়াই খাই। য়াইতে এসি ছাইড়া হুই থাহি মালিকের বাসায়ই। আরাম আছে।

– হেই জোন্তেই ত আন্নের এবা ভুড়ি অইছে। আরামে থাহুইন ত, আর আই পরনের নাম নাই। এনু থাকলেত ছাগল টানন নাগব। বউয়ের ফরমাইস করন নাগব। অহন আলা আইপরুইন গা।

– এই, বিয়াই, নইন আন্নেরে নিয়া যাই বিদেশ। আমি ভিসা আইন্যা দিমু নি, আমার মালিকেরে কইয়া।

– ফালানি হুইন্যা তেলে বাগুনে জ্বইল্যা উঠলো। আন্যের কুবুদ্ধি দেয়ন নাগবনা। আংগ বিদেশ করন নাগব না। আমরা কষ্ট কইরাই থাকমু। অহন আলা বিয়ানির কাছে যাইন।

ফালানি হশুরের তপন ফালাই দিছাল

(টাঙ্গাইলের গ্রাম্য আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার)

গয়নাগুনা আর পালের হাড় গরুডা বেচনের পর তিগা ফালানির বেশী ভালা ঠেহে না। কামে মোন ধরে না। হউরিয়ে বুজবার পায়। তাই বেশী কিছু কয় না। ফালানি কাম বাদ দিয়া খালি বাইর বাড়ি মাচাংগে বই থাহে। এমমুর দিয়া হউরি য়ান্দন ঘরে বইয়া বটি দিয়া তরিতরকারি কাটতাছে। ছিমইর কাটা শেষ। যেসুম নবিল্লা কাটতাছে হেসুম ফালানি বাইর বাড়ি তিগা বাইত্যে আই পরতাছে। উঠানের মইদ্যে দড়ির উপুর হশুরে তপন হুকা দিয়া য়াকছে। হেই তপনের নিচ দিয়া যাওনের সুম মাথার কিলিপের নগে বাইজা তপনডা মাটিত পইরা গেলো গা। ফালানি ধাতুবাত কইরা তুইল্যা ঝাহি দিয়া আবার হুকা দিয়া য়াকলো। হউরি আবার হেডা দেইখা ফালাইছে। কয় “কিবা কইরা য়াটো, হশুরের তপনে বাইজা পড়? হোদ নাই?”

ফালানিগ গাই বিয়াইছে

(টাঙ্গাইলের ভাষার ব্যবহার)

ফালানিগ চিত কপাইল্যা গাইডা আইজকা বিয়ানবেলা বিয়াইছে। একটা বহন বাছুর অইছে। এটের পর তিনবার বহন বাছুর অইল। এডা হাড় বাছুর অইলে ভুষি টুষি খাওয়াইয়া পাইল্যা নাইল্যা ডাংগর কইরা বড় কইরা কুরবানির য়াটে বেইচা ভালা দাম পাওন গেত। তাই, ফালানির হউরির মোন ভালা না। অওনের পর থিগাই বাছুরডা জারে থইরালে কাপতাছে। ফালানি গরুর নিগা গোয়াইল ঘরে খের বিছাই দিছে জানি টেল্কা না নাগে। বাছুরডার নিগা ফালানির পরণ পোড়ে।

শব্দার্থঃ

চিত কপাইল্যা – কপালে সাদা রঙ আছে

গাইডা – গাভীটা

আইজকা – আজকে

বিয়ানবেলা – সকালে

বিয়াইছে – প্রসব করেছে

বহন বাছুর – বকনা বাছুর

হাড় বাছুর – ষাড় বাছুর

অইছে – হয়েছে

অইল – হলো

এটের পর – পরপর

পাইল্যা নাইলা – লালন পালন করে

য়াটে – হাটে

গেত – যেতো

ডাংগর – বড়

জারে – শীতে

থইরালে – থরথর করে

টেল্কা – ঠান্ডা

পরণ পোড়ে – মায়া লাগে, প্রাণ পোড়ে।

in-feed-ads:

ফালানির বেক গয়নাগাটি বেইচা ফালাইছে

(টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার)

ফালানির চাচত দেওর চাকরি করবার নিগা ছৌদি যাবো। চাইর লাখ টেহা নাগব। দালালেই সব কিছু কইরা দিতাছে। মাও-বউয়ের গয়নাগাটি, ইডা ওডা বেইচা দুই লাখ টেহা দালালের য়াতে তুইলা দিছে। মেডিকেলে আনফিট কইরা কিছু টেহা বেশী নিছে দালালে। টেহা দিলেই যুদি আনফিট তিগা ফিট য়য়, তাইলে আনফিটের ইপোর্টটাই ভুয়া মোনে য়ইতাছে। যাইগ্যা, নেয় নেইগ্যা। ছলের টেহা জলেই যাবো দালালের। অহন অনেক টেহা যোগার করতে য়বো। ফালানির চাচাহশুর পালানের ক্ষেতটা বেচপার চাইল ফালানির হশুরের কাছে। কইল “আন্নের ক্ষেতের নগে ক্ষেত, পালানের ক্ষেত, য়াস, কুরকা, ছাগল, গরু ছাইড়া দিলেই এই ক্ষেতে আইয়া পড়ে। আমি চাই আন্নেই এই ক্ষেতটা নেইন। মাইনসের কাছে জমিন বেচাডা ঠিক অব না।” ফালানির হশুরের য়াতে টেহা নাই জমিন কিনবার। য়াইতে ফালানির হশুর- হউরি গিরিমিন্টি কইরা বুদ্ধি বাইর করলো ফালানির গয়নাগাটি বেইচ্যা টেহা যোগার করবার নিগা। বড়ঘরে ডাইকা নিয়া হউরি ফালানিরে বুজাইয়া কইল “বউগ, পালানের জমিনডা বেইচা ফালাইতাছে। আংগই নিনন নাগব। আংগ য়াতে অহন টেহা নাই। কইছিলাম কি, তোমার বাপের কাছে কইয়া যুদি কিছু টেহা যোগার কইরা দিতা!” ফালানি নাক খাউজাইয়া কইল “আম্মা, আংগ বাবার কাছেও অহন টেহা নাই। টেহা চাওন ঠিক য়ব না। ” হউরি পানের পিস্কি ফালাইয়া কইল “তাইলে তোমার গয়নাগুনা বেইচা ফালাও। উন্না ত আমরাই দিছিলাম। ক্ষেতের ফসল বেইচ্চা আবার বেক গয়না কিন্যা দিমুনি।” মেলা বুজানির পরে ফালানি য়াজি অইল। হেই গয়নাগুনা কিনল ফালানির নোন্দে। গেছে কাইল, না, গেছে পশুদিন, ফালানির নোন্দে হেই গয়নাগুনা পইরা জামাই নইয়া পাপের বাড়ি আইছে ফুর্তি কইরা। এবাই কইল কূন্দিন আহেনা আনবার না গেলে। হেদিন নাচন মাইরা আই পড়ছে। আইয়া দাঁত বাইর কইরা য়াইসা য়াইসা ডাইন কানের মার্কি দুলাইয়া, গলার মপচেইন কামড় দিয়া ধইরা ফালানিরে কয় “ভাবী, কিবা আছুইন?” ফালানির আত্মার মইদ্যে ছেত কইরা উঠলো। উঠব না ক্যা, উন্না যে আছাল ফালানির বিয়ার গয়না!

ফালানির সোন্তান পেটে

(টাঙ্গাইলের গ্রাম্য আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার)

ফালানির বড় ভাশুরের মেয়াডা ভালাই গায়গতরে বাইড়া ওঠছে। বিয়ার যোগ্যি অইয়া ওঠতাছে। পরায় সুমই ফালানির নগে থাহে। হেও বুঝবার পাইছে গয়না আর পালের হাড় গরুডা বেচনের পর তিগা ফালানি কিবা জানি অই গেছে। কতা কয় না, খায় না-দায় না। হুকাইয়া চোউক ডো~রে গেছেগা। হে য়ান্দন ঘরে গিয়া ফালানির হউরির কাছে কইল “দাদি, কাক্কিরে মোনয় ভুতে ধরছে।”

– কিবা কতা কস?

– কাক্কি যে খালি ভুতলামি ধইরা বই থাহে, খায় না, বিয়ান বালা ওঠে না। তাইতে কই।

– গয়নাগুনা বেচনে মোন ভালানা, তাই।

– একবার মোনয় য়াক্কস য়ই গেছে।

– ক্যা?

– আইসালের পোড়ামাটি খায়, মাটির পাইল্যাভাংগা চ্যাড়া খায়। কোমরের কোচের মইদ্যে হাইরা থয়। ঘরের পাছে গিয়া কুরমুড়াইয়া চাবাইয়া খায়। ইডা য়াক্কস না, কী?

– তাই নিহি? কয়দিন দইরা কইতাছে মাথা ভার ভার নাগে। বমি অবার চায়। তেতইল খায়। বুইজা ফালাইছি কি অইছে। তর কাক্কিরে ডাক দ্যাছে।

ভাশুরের মেয়া ঘরের পাছে গিয়া দেহে ফালানি উছাত করতাছে। দাদির কাছে আইয়া কইলে দাদি কয় “এহেবারে বুইজা ফালাইছি। বউয়ের সোন্তান পেটে আইছে।”

ফালানি নোন্দের জামাইর বেক টেহা নিয়া গেছেগা

(টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার)

এক্সো কইরা দেহা গেছে ফালানির নোন্দের মাঞ্জার য়াড্ডি ভাইংগা গেছেগা। ডাকতরেরা নোয়ার পাতি নাগাইয়া স্ক্রুপ দিয়া আটকাই দিব। হেইন্যা মেলা দামের। এই জুন্যে বাড়িত তনে পোনর য়াজার টেহা নিয়াইছে নোন্দের জামাই। বুকের বাম পকটে য়াইখা দিছে। টেহা পকটে নিয়াই গেছাল অইটালে খাবার নিগা। এক বেটা হোমকে তিগা সালামালকি দিয়া কয় “মিয়া ভাইরে চিনা চিনা নাগতাছে! নাম জানি কী?” জামাই নাম কইয়া দেয়। “বাড়ি জানি কোন গেরামে?” জামাই গেরামের নাম কইয়া দেয়। “তাইলে ত আন্নে আমগ বাড়ির কাছেরই মানুষ। এই জোন্যেই চিনাচিনা নাগতাছে। আহুইন নাস্তা করি।” জামাই খুশি য়ইয়া নাস্তা খাইতে বহে। নাস্তার অর্ডারি বেটাডায়ই দেয়। দুইজোনে পেট ভইরা নাস্তা খায়। ইডা ওডা আলাপ কইরা বেটাডায় বেবাক জাইন্যা ফালায়। একসুম বেটায় কয় “আপনে খাওয়া দাওয়া অইটালে না কইরা আংগ বাসায়ই করবাইন। হাসপাতালে চাকরি করি। মোটামুটি ভালাই চলে। অসুদপাতি বাইরে তিগা কিনবাইন না। আমি হাসপাতাল তিগা পাওনের কাম কইরা দিমুনি।” অচমবিতি জামাইর বুক পকেটের টেহাডি তার য়াতে নিয়া কয় “এনু কয় টেহা আছে? বেশি টেহা নগে য়াকবাইননা। শহরে টাউট বাটপার আছে নিয়া যাবগা।” এই বিল্লা খুচরা পঁচাত্তর টেহা জামাইর পহেটে দিয়া বাকী টেহাডি বেটার য়াতে নিয়া নিলো। এক কাপ চায়ের অর্ডারি দিয়া বেটায় কইল “চা খাইতে থাকুন। আমি সামনে তিগা খিলি পান নিয়া আহি। আন্নেরে নিয়া আমগো বাসায় যামু। আন্নের ভাবির নগে পরিচয় করাইয়া দিমু।” জামাই শুনে খুশি য়য়। চা খাওয়া শেষ, বেটায় পান নিয়া আহে নাই। আধা ঘন্টা পার অইয়া গেছে বেটার কোন খোজ পাত্তা নাই। অইটালের বেটারা কয় “কি, বই আছুইন ক্যা? টেবিল খালি করুইন। কাউন্টারে গিয়া বিল দেইন গা।” কাউন্টারে গিয়া বিল কত য়ইছে হুইন্যা জামাইর মাথায় য়াত। জামাইর য়াতে আছে মাত্র পঁচাত্তর টেহা। সব টেহা নিয়া গেছে সেই টাউট বেটায়। জামাই কাহিনি হুনাইলে ম্যানেজার কয় “দুই টাউটে যুক্তি কইরা মাংনা খাবার আইছস? একটা ঘুষি দিয়া নাক ফাটাই ফালামু, টেহা দে?”

in-article-ads:

ফালানির নোন্দের গয়নাগাটি চোরে নিছে

(টাঙ্গাইলের গ্রাম্য আঞ্চলিক ভাষায় লেখা উপন্যাসের অংশ)

বিসুদবারের য়াটে গিয়া য়াবিজাবি বেইচ্যা ফালানির জামাই কিছু জিনিস কিনলো শশুরবাড়ি নইয়া যাওনের নিগা। ফালানির নিগা এডা বেলাউছ নিল। ফালানিই কইছিল নিয়া যাওনের নিগা। দোহানদার হইচ করছাল “কয় নম্বার বেলাউছ গতরে দেয়?” জামাই কইল “নোম্বর ত কপ্পামু না। তয় গতর বেশী মোটাও না, আবার বেশী চিকনও না। তিন মাইসা সোন্তান পেটে। আরও মোটা য়ব। এবা দেইখা দেইন জানি সোন্তান য়ওন তুরি গতরে দিবার পায়। অহন যে ছায়া পিন্দে হেগনাও পরে কষা অব। তাই, ডোলা দেইখা দুইডা ছায়া দেইন।” ফালানির ছোট বুইনের নিগা এডা নিমা, আর এডা কাচুলি নইল। ফালানির চাচত ভাই করিমের নিগা এডা বাটইল কিনল। বেক্কের নিগা কিছু জিলাপা আর য়স গজা নইল। ফালানি বাদামটানা আর নইটানা পছন্দ করে। তাই, তার নিগা আলাদা কইরা একটা বাদামটানার তক্তি, আর এডা নই টানার তক্তি পলিথিন দিয়া পেচাইয়া নইল। এই দুইডা জিনিস যুত কইরা ফালানির য়াতে দিল। বাটইল পাইয়া করিম খুশির চোটে কয় “দুলাভাই, ইডা দিয়া ঘুগু মাইয়া আন্নেরে খিলামু। য়াইত পোহাই নউক।” বুইনে কইল “দুলাভাই, কাচুলি আনছুইন ক্যা? কাচুলি গতরে দিতে আমার ভালা ঠেহে না।” ডোলা ছায়া দেইখা ফালানি কইল “ইডা এডা ভালা কাম করছুইন বুদ্ধি কইরা।”

য়াইতে হুইয়া হুইয়া মেলা আইত তুরি প্যাচাল পারল ফালানি জামাইর নগে। ফালানি হইচ করল

– আম্মা কি আমারে নিয়া যাওনের কোন কতা কইছে? আমার ইনুও মাইয়ার নগে থাকপার মোন চায়, আবার উনুও আন্নের কাছে থাকপার মোন চায়। আমি পরছি দোটানায়।

– মা, কইছে আর কয়দিন পর তোমারে নিয়া যাবো। আবার সোন্তান য়বার আগ দিয়া এনু পাঠাই দিব। সোন্তান য়বার সুম নিহি মায়ের কাছে থাহন ভালা। মায় যেবা ঝালাম সইতে পারব হউরি কি তা পারবো?

– আম্মা যেডা কয় হেডাই য়ব নি। আমার য়হন তিগাই কিবা জানি ডর করতাছে। য়ানি বুজি পরতম সোন্তান য়বার সুমই পইরা গেছে। হেই কতা মোনইয়া আমার ডর করে।

– এই যে দুনিয়া ভইরা মানুষ দেকতাছ, ইন্নার মাও কি সোন্তান য়বার সুম মইরা গেছে? একটা খারাপ খবর আছে।

– কী?

– ছোট বুইনডার গয়নাগুনা চোরে নিছে গা।

– কি কও? তারমানে আমার কাছ তনে যে গয়নাগুনা কিন্না নিছাল হেইন্যা বেইকটি চোরে নিছে গা? কিবায় নিলো।

– তার আগের গয়নাগুনা, তোমার কাছ তনে কিনা গয়নাগুনা, সব চোরে নিছে।

– কিবায় নিলো? শিং কাইটা চোর ঘরে ঢোকছাল?

– হেদিন খুব গুমা আছাল। ছেড়িডায় য়াইতে খাইয়া গুমার চোটে চকির উপুর একটা গইর দিছাল। কুনসুম জানি ঘোমাই পড়ে। আর জাগনা পায় না। জানলা-দুয়ার বেকই খোলা আছাল। দুয়ার খোলা পাইয়া চোর ঘরে ঢুইকা পরে। চাংগের উপুর তার সুটকেস আছিল। সুটকেস ধইরা গয়নাগাটি নিয়া গেছে। একটু ভাছও পায় নাই। কুত্তায় এটু ঘেউঘেউ করছিল। হুইন্যা তার হউরি কইছে “এই কুত্তা।” কুত্তায় থাইমা গেছে। উত্তরমুরা ক্ষেতে নিয়া সুটকেসের তালা ভাইংগা সব কিছু থুইয়া খালি গয়নাগুনা নইয়া গেছে। চোর মোনয় বাড়ির কাছেরই য়ব।

– ক্যান, কাউরে সন্দে য়য়?

– চোর মোনয় অগ উত্তর বাড়ির আজিতে। চুরি য়ওয়ার পরের দিন আজিত কইট্টার য়াটে গেছিল। তারে দেহা গেছে সোনারুপার য়াটে ঘুরাফিরা করতে। ইডা অগ পাড়ার একজোনে এখছে। টাঙ্গাইল তনে এডিও আর ঘড়ি কিন্যা নিয়াইছে। এত ফ্যারাংগি করনের টেহা পাইল কুনু? টায় টায় থাইক্যা আসল ঘটনাডা বাইর করন নাগবো।

– আন্দাজি মাইনষেরে সন্দে কইরা শউত্রামি বাড়াইও না। এতদিন আশা আছাল কোন দিন যুদি নোন্দে গয়নাগুনা বেচপার চায় আমিই হেইন্যা কিন্যা নিমু। আমার পইরনের গয়না আমার তনেই আবো। তাও অইল না।

এবা ভরা কতা কইতে কইতে কুনসুম জানি অরা ঘুমাই পড়ে। সকালে নাস্তা খাইয়া জামাই যায়গা।

ads banner:

ফালানিগ হেই গুতাইন্যা হাড়ডা বেইচ্যা ফালাইছে

(টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার)

ফালানির নোন্দের জামাই টেহা য়ারাইয়া এহেবারে হাতারে পইরা গেছে। হউরিরে কইল “আন্নেগ হাড়ের গুতা খাইয়াই আন্নের মেয়ার পাঞ্জা ভাংছে। আর তার চেস্টা করার নিগাই আমি হাসপাতালে টেহা নিয়া গেছিলাম। হেই টেহাগুনা জাউরা মাইনসে নিয়া গেলো গা। অহন আমি কোন মুহে বাপের কাছে টেহা চামু? কাজে কাজেই, আন্নেরগই টেহা দিওন নাগব।” ফালানির মায় কইল “বিয়াই-বিয়ানির ত য়াগ করনেরই কথা। আমরা অইলেও য়াগ করতাম। বাজান, আমরা অহন টেহা পামু কুনু?” জামাই কইল “ক্যা, ওই গুতাইন্যা হাড়ডাই বেইচ্যা ফালাইন। পালে থাকলে আবার কারে গুতা দিয়া মিন্দারার য়াড্ডি ভাইংগা ফালায়, কেরা জানে। দেহা যাবো আন্নেরডাই ভাইংগা ফালাইছে।” হউরিয়ে হুইন্যা য়াজি অইল। সয়ার য়াটে নিয়া হারডা বেইচা জামাইডারে টেহা দিয়া দিল। হেই টেহায় মাঞ্জার অপারেশন করাইল। অপারেশন কইরা ভালা অইছে। খালি একটু টেংগুস পাইরা পাইরা য়াটে।

ফালানির পিঠে আম পড়লো

(টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক ভাষায় লেখা “টাঙ্গাইলের ফালানি” উপন্যাসের অংশ)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ফালানির জামাই যাওনের পর তিগা ফালানির মোনের ভিতরে খালি আইরাম বাইরাম করে। একবার বাইরবাড়ি যায়। আবার আই পড়ে। কোনহানেই তার ভালা নাগে না। তার মোনে দোমনদসা। একমোনে চায় জামাইর কাছে যায়। আরেক মোনে চায় মায়ের নগেই থাহে। দুপুরসূম ফালানি বাইরবাড়ির আম গাছের তলে গিয়া ঘোড়াকাঠের উপুর বইল। দহিন পাড়ায় কয়ডা গুড্ডি উড়তাছাল। এইন্যারমুহি চাইয়া আছাল ফালানি। একটা গুড্ডির নাম পাইল্যা গুড্ডি। ওডার নিচমুহি মাটির পাইল্যার নাগাল। তাই, ওডার নাম পাইল্যা গুড্ডি। আরেকটা গুড্ডির নাম ফেইচ্ছা গুড্ডি। ওডার নিচমুহি ফেইচ্ছা পৌখের নাগাল নেজ আছে। তাই, কয় ফেইচ্চা গুড্ডি। একটা চং গুড্ডি উড়তাছাল। ওডার উপুরমুহি দুইমুড়া দুইডা নিশান নাগান আছে। নিচমুহি দুইডা পায়জামার মোতন আছে। ওড়ারসুম উন্না পতপত করে। ওডার মাথায় বেত নাগান আছে। বাতাস নাইগ্যা গুনগুন কইরা বাজে। হোনতে ভালাই নাগে। একটা পতিঙ্গা, আরেকটা সাপা গুড্ডিও উড়তাছাল। সাপা গুড্ডিডা ওড়ারসুম মোনে য়য় জানি আসমানে অজগর সাপ মোচড় পারতাছে। এমুনসুম বাড়িরমুহি তিগা করিম আইল ঝিনই দিয়া আম ছিলাইয়া খাইতে খাইতে। কইল

– ফালানি বু, আম খাবা?

– কোন গাছের আম?

– জাউইন্যা গাছের।

– দ্যা এক ফালা।

করিমও ঘোড়া কাঠে বইল। আম চোটকাইতে চোটকাইতে ফালানি কইল

– ঐ, অতগুনা গুড্ডি উড়াইতাছে ক্যারা?

– দুইখার পোলা জাফরে। দুইখা যেবা বেইন্যা, জাফরেও হেবা বেইন্যা অইছে। খালি জমিন বেইচা মুচমুচাইয়া খায়। কাম ত করেইনা। খালি আকাইমা খরচ করে। খাইয়া খাইয়া এবা মোটা অইছে যে ভুড়ি ভাসাইয়া কেদরাইয়া কেদরাইয়া য়াটে। অতগুনা গুড্ডি উড়ানের কি দরকার? খালি ঐ তালেই থাহে। বু, দেহছে, আমার ঘারের তলে পীঠের মইদ্যে কিবা জানি উচবিচ করতাছে। এটু খাইজাই দেও ছে।

– এনু?

– না, আট্টু নিচমুহি, গুঞ্জির তলে।

– এনু?

– হ, আট্টু ডাইনমুহি।

– কুনু গেছিলি যে পিঠ খাইজাইতাছে?

– পাট ক্ষেতে গেছিলাম।

– পাটের পাতা থিগা মোনয় ছেংগা নাগছে। পাট ক্ষেতে গেছিলি ক্যা?

– পাট ক্ষেতে কিয়েরে যায় হেডা জানো না?

– পানি খরচ করলি কুনু?

– পাট ক্ষেতের বাতর এটু কাটা আছে। অনুই পানি আছে কিছু। অনুই পানি করচ করছি। আইজকা কিবাজানি চুটমুটুইন্যা গুমা করতাছে। দেওয়া আইতে পারে। দেওয়া আইলে ঝুপঝুপি ভিজমু। দমকা বাতাস আইতাছে। ধলা বকগুনা উড়াল পারতাছে। দেওয়ায় হাচ করছে। ঝটকা বাতাসে পাইল্যা গুড্ডিডা ছুইটা গেলো। কাতাইতে কাতাইতে গিয়া পড়লো পাগাড়ে। দেওয়া অইলে উজাইন্যা কৈ মাছ ধরমু। হেদিন ভরাগুনা ধরছিলাম। উজাইন্যা কৈ ধরতে ভালাই নাগে।

বাড়ির ভিতর তিগা ফালানির মায় ডাক দিলেন “গেদি, বানাস চালাইছে। ঘরে আইপর। মাথার উপুর আম পড়বো।” কওয়ার নগে নগেই আগ ডাইল তিগা একটা ভুইত্যা আম পড়ল গিয়া ফালানির পিঠের মিনদাড়ার য়াড্ডির উপুর। ফালানি বেহা ধইরা এক নোড়ে বাইত গেলো গা।

—-

আজকের পর্বের বৈশিষ্ট্যঃ

গ্রামের বিভিন্ন রকমের ঘুড়ির পরিচয় দেয়া হয়েছে। জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রাকৃতিক পরিবেশ বর্নিত হয়েছে। বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যথা আইরাম বাইরাম, চুটমুট, খাইজায়, গুমা, বাতর, পানি খরচ, ছেংগা, ভুইত্যা, নোড়, গেদি, মিনদাড়া, বানাস, উজান্যা, কাতাইতে কাতাইতে, কেদরাইয়া, ঝুপঝুপি, বেহা, গুঞ্জি, ধলা, হাচ, চুটমুটুইন্যা, ঝিনই, জাউইন্যা, কুনু, ক্যা ইত্যাদি।

ফালানির মামুর অবস্থা ভালানা

(টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক ভাষায় লেখা “টাঙ্গাইলের ফালানি” উপন্যাসের অংশ)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বড়বাইদপাড়া, সখিপুর

ফালানি বাইরবাড়ি ঘোড়া কাঠে বইয়া পাও নাচাইতেছিল। এমুনসুম তার মামু আইলো খোরাইয়া খোরাইয়া য়াটতে য়াটতে। দুই বোছর ধইরা তার এবা য়োগ য়ইছে। মাইনষে কয় অর্ধঙ্গের বাতাস নাইগ্যা এবা য়ইছে। কিননিগা কয় তা জানুইন? তারা মোনে করে খারাপ কিসিমের বাতাস তার গতরে নাগছে। যে বাতাস নাগলে শৈলের একমুরা দিয়া অবস য়ইয়া যায়। মানে অর্ধ অঙ্গ অবস য়ইয়া যায়। মুক একমুহি বেহা য়ইয়া গেছে। এক চৌক মুনজে না। খালি পানি পড়ে। জিবলা একমুহি নড়ে না। তাই, বেক কতা বোজন যায় না। বাইয়াত নুলা য়ই গেছে। বাইয়া ঠ্যাংও নড়ে না। ছেছুড় পাইরা য়াটন নাগে। এবা কইরা য়াইটা য়াইটা এনু উনু যায়। ডাকতর দিয়া চিগিস্যা করাইছিল। কাম য়য় নাই। কবিরাজেও কিছুদিন চিগিস্যা কইরা না পাইরা কই দিছে “ডাকতরেরা ইঞ্জিশন দিয়া য়োগ ডাবাই ফালাইছে। অহন কবিরাজি অসুধে কাম অব না। ফালানি কইল

– মামু, এবা কষ্ট কইরা এত দূর আইলাইন?

– কি করমু গেদি, ভরা দিন ধইরা তগ দেহি না। তাই আইজকা এবা কইরাই আইলাম। তা গেদি কিবা আছো? তর মায় কিবা আছে?

– আল্লায় বাচাইলে বালাই আছি। আংগ মামানিরে নই আইতাইন।

– কি আব, বাড়ি খালি থুইয়া আহন যায়?

– ক্যা, আন্নেগ য়শিদের বউ বাইত্তে নাই?

– গেদি, তুই মোনয় জানস না। হে জাউরাডা আমাগ নগে আর থাহে না। আংগ বাদ দিছে।

– ইন্না কী কইন? থাহে না মানে? ভাইংগা কইনসে।

– য়শিদ আছিল এডা ফকিন্নির পোলা। অরে গেন্দা থুইয়া অর বাপ মাও মইরা যায়। অর দাদীর কাছ তনে অরে পালবার আনছিলাম আংগ কোন সয়সোন্নতান য়ইল না দেইখা। হেই পোলারে কত যত্ন কইরা ভরা টেহা ভাইংগা পড়াইয়া আই এ পাস করাইছিলাম। এডা কাম অ করবার দেই নাই। জমিন জিরাত বেইচা পড়াইছিলাম। সিঙ্গাপুর যাবো কইরা কিয়েরজানি এডা টেনিং নাগবো কইরা দুই লাখ টেহা খরচ কইরা ঢাহা তনে টেনিং করাই আনলাম। তিন চাইর লাখ টেহা খরচ কইরা সিঙ্গাপুর পাঠাইলাম। যাওনের আগে তারে বিয়া করাইলাম ধনি বাড়ি দেইখা। বৌডাও শৈষ্ঠবের। বিদেশ যাওনের সুম তার হশুরের তনে তিন লাখ টেহা নিছিলাম। হেইডার নিগাই আমি ধরা খাইলাম। পোলা অহন বৌয়ের পাগল। হউরিরে ছাড়া কিছুই বুঝে না। বউডা এহেবারে ঝাউরা। খালি কুবুদ্ধি দেয়। পালুইন্যা পোলা আমার। পোলার বউরে জমি নেইকা দিবার কয়। জমি নেইকা না দিলে ত পালুইন্যা পোলায় পাবো না। আমার জমি ওই এটু। এও যুদি তারে নেইকা দেই, আর হে বউ যে ঝাউমারি করবো না ক্যারা কবো। ওই বৌ অই পোলা আংগ ভাত দিব না। আমি বুইজা ফালাইছি। অহন আংগ খোজ খবর তারা নেয় না। বিদেশ তনে টেহা পাঠায় বউয়ের কাছে। হেইন্যা দিয়া তার বাপ মাও নিয়া তেলে ঝোলে খায়। হশুর বাইত্যে এডা বিল্ডিং দিছে। হেনুই থাহে। পরের পোলা কি আপন য়য়? য়াতে জমিন যা আছে তা বাগি দিয়া যা পাই তাই দিয়া কোন মোতে চইলা যাইতাছে। গেদি, তরে অবা ওশা ওশা দেহা যাইতাছে ক্যা, ব্যারাম য়ইছে নিহি?

ফালানি মামুর হুমকে শরম পাইল। কইল “মামু, আন্নে যেসুম আন্নের মায়ের পেটে আছিলাইন হেসুম আন্নের মাও এবা ওশা ওশা ধরছাল।” ফালানির মামু খুশি হইয়া কইল “গেদি, তাইলে আমি নানা হইতাছি নিহি!”

২/৬/২০২২

কচু,গেচু, হালুক

(আঞ্চলিক ভাষায় রচিত “টাঙ্গাইলের ফালানি” উপন্যাসের অংশ বিশেষ)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বড়াবাইদপাড়া, সখিপুর, টাঙ্গাইল

ফালানিগ বাড়ির পচিম উত্তর কোনার দুই তিন ক্ষেত পরেই নছুগ বাড়ি। মেলা বোছর ধইরা নছুর বাতের ব্যারাম। য়াত পাওয়ের আঙ্গুলের গিড়ায় গিড়ায় বিষ। কালকাল কইরা বিষায়। গরীম মানুষ। ভাত খাওনের টেহা নাই। অসুধ কিনব কি দিয়া? কবিরাজের কাছ তনে হস্তা অসুদের বোতল আনে। হেইন্না খাইয়া কিছুই অয় না। ছাগল বেচা টেহা নইয়া একবার ডাক্তরের কাছে গেছাল। ডাকতরে ভরা টেহার পরীক্ষা কইরা টেহাই ফুরাই ফালাইছে। ভরা টেহার অসুদ লেখছে। অত টেহার অসুদ খাওনের মুরাদ নাই নছুর। অহন আলা ডাক্তুরি অসুদ খাওন বাদ দিছে। বিষের চোটে য়াত পাওয়ের আঙ্গুলগুনা কোরকামোরকা ধইরা গেছে গা। কাম করবো কিবায়? নছুর বৌ মাইনষের ধান নইয়া দিয়া কিছু কিছু পায়। তাই দিয়া কোন মোতে এক বেলা খাওন যায়। আরেক বেলা কচু ঘেচু খাইয়া থাকন নাগে। নছুর ডাইন ড্যাংগের য়াটুর একটু নিচের য়াড্ডির মইধ্যে গুল দিছে। লোহার প্যারেক ততা কইরা য়াড্ডির উপুর ছেক দিয়া ঘাও বানাই ফালাছে। হেই ঘাওয়ের মইধ্যে এডা গোল কাঠের বল বহাইয়া তেনা দিয়া বাইন্দা থোয়। মইধ্যে মইধ্যে তেনা খুইলা গুলডা ধুইয়া আবার বহাইয়া তেনা দিয়া বাইন্দা থয়। গুলের গোড়া দিয়া য়স পড়ে। নছু মোনে করে বিষ পইড়া যায়। আসলে শৈলের পানির নগে ভালা জিনিস বাইরই পড়ে। নছু হেডা বুঝে না। শরীর হুকাইয়া কাঠ য়ইগেছে।

নছুর আছাল চাইর মেয়া আছাল । পোলা নাই। বড় মেয়াডার ওঠকাটা আছাল জন্মের তিগাই। হেডারে মেলা টেহা খরচা কইরা বিয়া দিছাল। জামাই খালি টেহা নিত নছুর কাছ তনে। টেহা না দিলে ছেড়িডারে খালি বাইরাইত। হউরিয়েও তারে মেলা শাজা দিত। হেডার কাপরে আগুন ধইরা মইরা গেছে। কেউ কেউ কয় হউরিয়ে কাপরের মইধ্যে কেরাইশ তেল ছিটাই দিয়া মেছের কাঠি দিয়া আগুন ধরাইয়া মাইরা ফালাইছে। হেডার কোন বিচার আচার য়য় নাই। গরীম মাইনষে কি বিচার পায়?

নছুর তিন মেয়া বিলের পারমুহি তিগা আইতেছিল। ফালানি হইছ করলো

– এই ছেড়িরা, কুনু গেছিলি?

– আমরা বিলে গেছিলাম।

– মাছেরে গেছিলি?

– না, আবিজাবি আনবার গেছিলাম।

– এই খালইর মইধ্যে কী?

– হামুক, য়াসেরে খাওয়ানোর নিগা। আংগ দুডা য়াস আছে। হামুক ভাইংগা দিলে গেত গেতি খায়।

– এই খালুইর মইদ্যে কী?

– ইন্যা ঘেচু। বিলের পাড় তিগা তুইল্লা আনলাম।

– ইন্যা দিয়া কী করবি?

– এইন্যা হিদ্দ কইরা খামু। এইন্যা খাইয়াই আংগ বাচন নাগে। কচু ঘেচু না থাকলে আংগ মরন ছাড়া আর কোন উপায় আছাল না। জাউরা মাইনষে হুয়রের বাতান নইয়া আহে কচু খেচু খাওয়াবার নিগা। অহন কচু ঘেচুও পাওন যায় না।

– ওডার মইদ্যে কী?

– ইডার মইদ্যে? ইডার মইদ্যে হালুক। হালুক গাছের বেকই কামে নাগে। উপুরে ডোগার মইদ্যে ধলা ফুল ফুটছে ছোট বোইনডায় মাথায় বানছে। স্যারে হাবলা ফুলরে কয় শাপলা ফুল। হাবলার ফুল তিগা যে ফল ধরে হেডা অইল ঢেপ। ঢেপও আনছি, এই যে। আংগ মা ঢেপের বিচি হুকাইয়া ভাইজা ঢেপের খই বানায়। মোয়া বানায় কুশাইরা মিঠাই দিয়া। এই যে হাবলা গাছ তুইলা আনছি। মা ইন্যা দিয়া তরকারি য়ান্দিব। হাবলা গাছের গোরে এই হালুক ধরছিল। হালুক হিদ্দই বেশী মজা। ফালানি বু তুমি কয়ডা হালুক নেও। হিদ্দ কইরা খাই দেইখো।

৮/৬/২০২২

in-feed-ads:

কাঠলের আঠা
ফালানীর একটা দেওর ঢাহা থাহে। ফ্যাক্টুরিতে চাহুরি করে। হেনু ঢাহাইয়া এডা পোলার নগে খাতির য়ইছে। তারে নগে কইরা ফালানীর হশুর বাড়ি নইয়াইছে। তারে গাছ পাহা এডা কাঠল ভাইংগা দিছে। নাকে, ওঠে, মুছে কাঠলের কষ নাইগ্যা এহেবারে চ্যারাব্যারা য়ইগেলোগা। কষ তোলার নিগা যতই গষে ততই আঠা ছড়তে থাহে। ফালানীর আরেকটা চাচত দেওর আছে ১০ বছইরা। হে এহেবারে যাইরা পোলাপান, কইলো
– য়াত দিয়া ঘষা না দিয়া শিমুইল তুলা দিয়া ঘষা মারুইন। কাঠলের আঠা তুলার নগে উইঠা আবো।
– তুলা পামু কুনু?
– আহুইন আমার নগে বড় ঘরে উগার পাড়ে।
মেমান উগার পাড়ে গিয়া খারইল। ফালানীর দেওর ডোলের ভিতর তনে এক খামছা তুলা বাইর কইরা মেমানের য়াতে দিলো। মেমান মুখের উপুর দিয়া ডলা দিলে মুখ গাল ভইরা তুলা নাইগ্যা গেলো। এমুন সুম ফালানীর হউরি ঘরে আইয়া দেহে মেমানের মুখ ধলা বিলাইর মোতন দেহা যাইতাছে।

কাঠলের আঠা

১০/৩/২০২৪ খ্রি.

tiner thali

টিনের থালি

টিনের থালি

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন গ্রামের অধিকাংশ মানুষ টিনের থালাবাসন ব্যবহার করতো। গরীবরা ব্যবহার করতো পোড়ামাটির থালাবাসন। থালা, বাটি ও ডিস ছিলো টিনের তৈরি। সানকি, বাটি ও গামলা ছিলো পোড়ামাটির তৈরি। ধনি বাড়িতে অল্প কিছু পোরসেলিনের বা চিনামাটির থালাবাসন ছিলো। এগুলোকে করইর বাসনও বলা হয়। এগুলো সাধারণত সিকায় তুলে রাখা হতো। মেহমান এলে করইর থালায় খাবার পরিবেশন করা হতো। এগুলোর সাথে পিতলের চামচ ব্যবহার করা হতো।

টিনের থালির উপর দিয়ে সাদা রংগের প্রলেপ দেয়া থাকতো যাতে জং (মরিচা) না ধরে। থালি পুরান হলে ঘসায় ঘসায় রং উঠে গিয়ে জং ধরে যেতো। জং ধরলে থালি ছিদ্র হয়ে যেতো। আমরা বলতাম ছেন্দা। অন্য এলাকার মানুষ বলতো কানা। ছেন্দা থালি বড় চওনা হাটে নিয়ে মেকার দিয়ে ঝালাই করে আনা হতো। রং উঠে গেলে বলা হতো কালাই উইঠা গেছে। বারবার ঝালাই করলে খালিতে ভাত খাওয়ার অনপোযুক্ত হয়ে যেতো। এমন থালি দিয়ে ভৌরা (নিচু এলাকার) মানুষ নায়ের (নৌকার) পানি হিচতো (সেচতো)। মেয়েরা ছাই ফেলতো বা ছাই রেখে জিয়লমাছ (শিং মাছ) কাটতো। পাহাইড়া (পাহাড় এলাকার) মানুষ মান্দা হিচতো।

ফকিররা (ভিক্ষুক) ভিক্ষার থলেতে একটা টিনের থালি রাখতো। কেউ খাবার দিলে এই টিনের থালিতে নিয়ে খেতো। ভিক্ষা নিতো আইচায় করে। আইচার ভিক্ষা থলের চাউলের সাথে মিশিয়ে নিতো।

এখন গ্রামে বা শহরে টিনের থালি চোখে পড়ে না। আমি কয়েকমাস আগে ময়মনসিংহের স্বদেশী বাজারে কাঁচের বৈয়ম কিনতে গিয়ে এই থালির দেখা পাই। সখ করে একটা থালি কিনে আনি। আজ ভাগনে ফারহানকে দেখিয়ে বলি “এমন টিনের থালিতে আগের দিনে বেশী ভাগ মানুষ ভাত খেতো। এখন এগুলো দেখা যায় না।” ফারহান বললো “আমি যেনো কোথায় দেখেছি। মনে পড়েছে, ভিক্ষুকের হাতে দেখেছি।” শুনে সবাই হা, হা করে হেসে দিলো। আমি এরপর আমার এই স্মৃতি কথাটি লিখে ফেললাম।

ময়মনসিংহ

২৩ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রি.

#memoryofsadequel

haque-sir-fnac

Introduced by Haque Sir

হক স্যারের কারনে পরিচিতি পেলাম

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

সময়টা খুব সম্ভব ১৯৯৭ বা ৯৮ সন। ডাঃ ফজলুল হক পাঠান ভাই ময়মনসিংহ বিএমএ-র জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন। তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহের সব জেলার ডাক্তারদের নিয়ে একটা বিরাট সম্মেলন করেছিলেন। সেই সম্মেলনে আমি একটা সাইন্টিফিক পেপার প্রেযেন্ট করেছিলাম। প্যাথলজির প্রফেসর, সাবেক বিভাগীয় প্রধান, সাবেক অধ্যক্ষ, সাবেক বিএমএ প্রেসিডেন্ট ডাঃ আব্দুল হক স্যার সেদিন অন্যতম লিজেন্ড হিসাবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি তার বকৃতায় সম্মেলন আয়োজকদের ভুয়সী প্রশংসা কনেন। বিশেষ করে সাইন্টিফিক পর্বের প্রতি বেশ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন “সাইন্টিফিক প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে আমরা চিকিৎসা বিজ্ঞানের নতুন নতুন বিষয়গুলো জানতে পারি। যেগুলো এখনো বইয়ে আসেনি। আমার এক ছাত্র ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার সুন্দর করে প্রেজেন্ট করেছে। সে প্যাথলজি বিভাগের হিস্টোপ্যাথলজির পাশাপাশি সাইটোপ্যাথলজি বিশেষ করে এফ এন এ সি ও পেপস স্মিয়ার করা হচ্ছে তা সুন্দর করে প্রেজেন্ট করেছে। এফ এন এ সি পরীক্ষার কথা তো আমার জানাই ছিলো না। আমার এক আত্মীয় কয়েকদিন আগে হাসপাতালে এসে ভর্তি হয়। আমি দেখে অনুমান করি তার ক্যান্সার হয়েছে। বায়োপসি পরীক্ষা করতে হবে ডায়াগনোসিস করার জন্য। কয়েকদিন সময় লাগবে। বিকেলে আমার বাসায় ওরা খবর নিয়ে এলো যে পরীক্ষায় ক্যান্সার ধরা পড়েছে। আমি বললাম যে আমাদের এখানে বায়োপসি পরীক্ষা করতে ৩ থেকে ১০ দিন সময় লাগে। আজকেই কিভাবে পরীক্ষা করলো। ওরা বললো, দুই ঘন্টার মধ্যেই রিপোর্ট দিয়েছেন। আমি বললাম যে রিপোর্ট নিয়ে আসো। রিপোর্টে দেখি ঠিকই ক্যান্সার ডায়াগনোসিস করেছেন আমারই ছাত্র, সম্প্রতি পিজি থেকে এম ফিল পাস করে এসেছেন ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার। তারপর এনিয়ে প্রফেসর মীর্জা হামিদুল হকের সাথে কথা বললাম। জানতে পারলাম এফ এন এ সি করে এখানে দ্রুতই ক্যান্সার ডায়াগনোসিস করা যাচ্ছে……।”

স্যারের বকৃতা শুনে অন্যান্য জেলার চিকিৎসকগণও জেনে গেলেন এফ এন এ সি ও পেপ্স স্মিয়ার পরীক্ষার গুরুত্ব এবং আমিও পরিচিতি পেয়ে গেলাম বৃহত্তর ময়মনসিংহের সকল ডাক্তারদের কাছে। প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ হিসাবে ডাক্তারদের সাথে পরিচিতি পেলে যে কি লাভ তা ডাক্তারগণ জানেন। কাজেই ময়মনসিংহে ডাক্তারদের মাঝে পরিচিতি পেতে আমার সরাসরি শিক্ষক প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হক স্যারের বিরাট অবদান আছে। আমি স্যারকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।

১০ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রি

ময়মনসিংহ

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ম-১৭ ব্যাচ (১৯৮৫ এম বি এম এস)

সাবেক বিভাগীয় প্রধান, প্যাথলজি

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ

#memoryofsadequel

Haque-sir-er-basay

Haque Sir-er Basay

হক স্যারের বাসায় গিয়েছিলাম

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হক স্যার তখন অবসর জীবন যাপন করছিলেন। ময়মনসিংহের চরপাড়ার লাশকাটা ঘরের বিপরীত দিকের রাস্তায় তিনি বাড়ি করে থাকতেন। ১৯৯৭ সনের পরে হবে। বাংলাদেশ জার্নাল অব প্যাথলজি-তে আমার প্রথম দুটি সাইন্টিফিক রিসার্চ আর্টিকেল প্রকাশিত হলো। এগুলো ছিলো ঢাকার শাহবাগে ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিসিন এন্ড রিসার্চ (আইপিজিএম আর)-এ এম ফিল কোর্স করার সময় আমার থিসিস। পাকস্থলীর ক্যান্সারের সাথে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি জীবাণুর সম্পর্কে গবেষণা করছিলাম। আমার গবেষণার ফলাফল জার্নালে প্রকাশ পাওয়ায় খুব আনন্দিত ছিলাম। এই আনন্দ সবার সাথে শেয়ার করা যায় না। সবাই এর মর্জাদা বুঝে না। ঢাকার হোটেল শেরাটনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সোসাইটি অব প্যাথলজিস্ট-এর সম্মেলনে জার্নাল বিতরণ করা হয় নিবন্ধিত মেম্বারদের মাঝে। আমি আমার প্রিয় শিক্ষক প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হক স্যারকে প্রদান করার জন্য অতিরিক্ত দুটি কপি সংগ্রহ করেছিলাম। হক স্যার ছিলেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ও অধ্যক্ষ। তিনি ময়মনসিংহ বিএমএ-এর এক সময় প্রেসিডেন্টও ছিলেন।

আমি তখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের লেকচারার ছিলাম। অফিস থেকে বের হয়ে সকাল আনুমানিক ১০ টার দিকে জার্নাল দুটি হাতে নিয়ে স্যারের বাসার দিকে গেলাম। গেইটে করা নাড়ায় স্যার নিজেই দরজা খুলে দিলেন। আসেন আসেন বলে স্যার খুব খুশি হয়ে আমাকে তার বেড রুমে নিয়ে গিয়ে বাসালেন। সিম্পল একটা খাটে সাধারণ বিছানা পাতা। মশারীর দুই কোণা বাঁধা আছে। অন্য দুই কোণা বিছানার অর্ধেক পর্যন্ত কভার করে আছে। বাসায় অন্য কেউ আছে বলে মনে হলো না। স্যারের স্ত্রী ঢাকার বাসায় থাকেন। মেয়েরাও ঢাকায় থাকে। বাসার পরিবেশ দেখে মনে হলো আমি সেই হাজার বছর আগের দিনের কোন এক দার্শনিকের কাছে এসেছি। স্যার জার্নাল দুটি হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলেন। আমি আমার আর্টিকেল বের করে দিয়ে বললাম “স্যার, এ দুটি আমার প্রথম আর্টিকেল।” স্যার আমাকে

অভিনন্দন জানিয়ে আনন্দিত চোখে পড়া শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পড়ার পর বললেন “খুব ভালো হয়েছে। তবে বেশ কিছু গ্রামার ভুল আছে।” আমি বললাম

– স্যার গতকাল আমাদের সোসাইটির বার্ষিক সম্মেলন ছিলো। সেখানে সবাইকে এই জার্নাল দিয়েছে। আমি আপনার জন্য দুটি নিয়ে এসেছি।

– খুব ভালো করেছেন। সাদেক, কেউ এখন দায়িত্ব নিয়ে খোঁজ খবর নেয় না। অথচ, দেখেন, আমি এই সোসাইটির আজীবন সদস্য। একটা চিঠিও পাই না। আপনি আমার কথা মনে করে জার্নাল নিয়ে এসেছেন, এজন্য অনেক ধন্যবাদ। আপনি আরও পেলে আমার জন্য নিয়ে আসবেন। নতুন কিছু জানতে হলে জার্নাল পড়তে হবে। এই যে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি জীবাণু যে স্টোমাকে থাকে কজনে জানেন? আপনি স্টোমাক থেকে জীবাণু আইসোলেট করেছেন এবং তার সাথে যে ক্যান্সারের এসোসিয়েশন আছে তার প্রমাণও করেছেন।

স্যার ছোট বড় সবাইকে আপনি করে বলতেন। আমি স্যারের ছাত্র হলেও তিনি আমাকে আপনি করে বলতেন। অনেক্ক্ষণ তিনি অনেক স্মৃতিচারণ করে কথা বললেন। বিশেষকরে তিনি যখন ইংল্যান্ডে পোস্ট গ্রাজুয়েট কোর্সে ছিলেন সেই সময়ের স্মৃতি কথা বলছিলেন। আমার ক্লাস আছে বলে উঠতে চাইলে স্যার বললেন “সাদেক, একটু বসেন। চা দিচ্ছি” বলে দ্রুত ভিতরের রুমে গিয়ে নিজেই চা বানিয়ে আমার জন্য নিয়ে এলেন।” আমি বিনয়ের সাথে বললাম “স্যার, আপনি কষ্ট করে চা বানালেন!” স্যার, হালকা হেসে বলেলেন “এই সামান্য এক কাপ চা, আর কি, খান। এভাবেই কেটে যাচ্ছে। “

৯ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রি

ময়মনসিংহ

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ম-১৭ ব্যাচ

সাবেক বিভাগীয় প্রধান

প্যাথলজি বিভাগ

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ

#memoryofsadequel

Jummaghor

Jummaghor

আমাদের গ্রামের জুম্মাঘর

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমি বুঝমান হয়েই দেখেছি আমাদের বড়বাইদপাড়া গ্রামের আজিম উদ্দিন সিকদার বাড়ির কেন্দ্রীয় মসজিদটি। আমরা বলতাম জুম্মাঘর। এটার চালের ছাউনি ছিলো ঢেউ টিনের। বেড়া ছিল চেপটা টিনের। মেঝে ছিল কাঁচা। চট বিছিয়ে নামাজ পড়তাম। ঐ বাড়ির মানুষ জুম্মা ঘরে পাঞ্জেগানা নামাজ আদায় করতেন আজান দিয়ে। গ্রামের মুছুল্লিরা শুধু শুক্রবার জুম্মার নামাজ জামাতে আদায় করতেন। প্রতি বৃহস্পতিবার কাক্কী (জয়নাল ভাইর মা) জুম্মাঘরের মাইঝাল (মেঝে) ও পিড়া (ডোয়া) হাইল মাটি (বাইদের মাটি) দিয়ে লেপে দিতেন।

আজিম উদ্দিন সিকদার দাদা বহরমপুর থেকে এসে এখানে বাড়ি করে একটা পুকুর খনন করেন সেই ব্রিটিশ আমলে। পুকুরের পশ্চিম পাশে তিনি এই জুম্মাঘর নির্মাণ করেন গ্রামের মানুষের নামাজ আদায় করার জন্য। উত্তর পাড়া, পশ্চিম পাড়া, পূর্বপাড়া, তালুকদার বাড়ি, নওপাড়া ও চনপাড়ার সব মুছুল্লিরা এই মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করতেন। এই মসজিদকে কেন্দ্র করে গ্রামের মানুষের মিলন মেল হতো। মসজিদ প্রাঙ্গণে বড় আম গাছ ছিলো। সেই আমগাছের নিচে একটা বাঁশের মাচাং ও দুইটা ঘোড়া কাঠ ছিলো। নামাজ শুরুর আগে ও পরে এখানে বসে যুকক ও কিশোর বয়সের মুছুল্লিরা খোস গল্প করতো। গ্রামের মানুষের সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে বড়রাও আলাপ আলোচনা করতেন। গ্রামের মাতবর ছিলেন কোরবান আলী সিকদার কাক্কু ও কাশেম তালুকদার কাক্কু (মিয়াকাক্কু)। মাতবরের মুখের উপর কেউ কথা বলতে পারতো না।

এই মসজিদের ইমাম ছিলেন শিরিরচালার হাছেন ক্কারীসাব। তিনি শুক্রবারের জুম্মার নামাজে ইমামতি করতেন। বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে দাওয়াত খেয়ে মিলাদ পড়ে দোয়া করে বখসিয়ে দিতেন। আমাদের শমে কাক্কুও মিলাদ পড়াতেন। আমাকেও সাথে নিয়ে যেতেন তালেবে ইলিম হিসাবে।

আমগাছ তলায় মাঝে মাঝে মাসআলা নিয়ে অল্প বয়সের যুবকদের মধ্যে তর্ক লেগে যেতো। মিয়া কাক্কু এগিয়ে এসে থামিয়ে দিয়ে সঠিক মাসআলা কি হবে বলে দিতেন। মিয়া কাক্কুর উপরে কেউ কোন মাসআলা বলতে সাহস পেতো না। মাসআলা বলার পরে এটা পাকাপোক্ত করার জন্য ইমাম সাবকে জিজ্ঞেস করতেন “তাই না হুজুর?” হুজুর ইতস্তত করে গোল টুপিটা ডান হাত দিয়ে হালকা ঘুরান মেরে বলতেন “ঐত্য।” তারপর টুপিটা মাথা থেকে খুলে ফু দিয়ে গোল করে আবার মাথায় পরে দ্রুত চলে যেতেন জুম্মা ঘরের ভিতর। ‘ঐত্য’ কথাটি একটি হালকা সম্মতিসরূপ একটি শব্দ। আমার মেয়ে দুটি যখন ছোট ছিলো তখন দুজনে মাঝে মাঝে তর্কে করে কার কথা ঠিক এটির সমাধান নিতে আমার কাছে এলে আমিও বলে দিতাম “ঐত্য। তোমাদের জন্য আজ কি যেনো আনত হবে?”

ইমাম সাব ছিলেন ক্কারী। অল্প কিছু মাস আলা জানতেন। অল্প কিছু বয়ান করতেন খুতবার আগে অথবা নামাজের পর দোয়ার আগে। দোয়াকে মুছুল্লিরা খুব প্রয়োজন মনে করতেন। শেষ দোয়া না করে কেউ বের হতে চেতেন না। জুম্মার নামাজ শেষ হতে প্রায় দুটো বেজে যেতো। মুছুল্লিদের ক্ষুধা পেতো। হুজুর দোয়া করার আগে কিছুক্ষণ বয়ান করতেন। মুছুল্লিরা কেউ কেউ বলে উঠতেন “হুজুর, দোয়া কইরা দেইন।” হুজুর বলতেন “মুক্তাছার করতাছি। আর এটু বহুন।” মুক্তাছার মানে কি আমি জানি না। তবে বুঝে নিয়েছি ‘সংক্ষিপ্ত’। হুজুর হাছেন ক্কারী সাব ছিলেন মুক্তার আলী মাস্টার স্যারের বড় ভাই। উভয়ই খুব ভালো মানুষ।

আয়েন উদ্দিন সিকদার দাদার ছেলে হাছেন সিকদার কাক্কু খুব নিয়মিত মুছুল্লি ছিলেন। তিনি সবার আগে এসে প্রথম কাতারে ইমাম সাবের পিছনেই বসতেন। সবার শেষে তারাহুরো করে উপস্থিত হতেন ওহাদালী কাক্কু (ওয়াহেদ আলী)। ওহাদালী কাক্কু অল্প লেখাপড়া জানলেও সুর করে ভালো পুথি পড়তে পারতেন। আমি মাঝে মাঝে কাক্কুদের বাড়ি গিয়ে পুথি পড়তে বলতাম। কাক্কু বারান্দায় জলচৌকিতে বসে আমাকে পুথি পড়ে শুনাতেন। আমরা পুথিকে বলতাম কিতাব। এটা ছিলো জংগে কারবালার কিচ্ছা। কাক্কু চৌকিতে কিতাব খুলে রেখে সোজা হয়ে বসে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে অভিনয় করে কিতাব পাঠ করতেন। “ঘোরায় চড়িয়া মর্দ চলিতে লাগিলো ” বলার সময় মনে হতো যেনো কাক্কুই চড়ে তলোয়ার হাতে ছুটে চলেছেন। “শত শত মারা গেলো মর্দ কাতারে কাতার” শুনে মনে হতো কাক্কুর সামনেই শত শত সৈন্য শহীদ হয়ে পড়ে আছে। কিতাবের করুণ পংতিগুলো কাক্কু এক গালে হাত রেখে করুণ শুরে বিলাপ করে পড়তেন “ও সিমার সিমাররে……। “

জুম্মার নামাজের কোন টাইম টেবিল ছিলো না। সব মুছুল্লিরা চলে এলেই নামাজ শুরু হতো। সব মুছুল্লিরা চলে এলেও অনেক সময় মাদবর কাক্কুরা আসা পর্যন্ত হুজুর অপেক্ষা করতেন। ওহাদলী কাক্কু সবার শষে তারাহুরো করে এসে অজু করে টুপিটা মাথায় ঢুকাতে ঢুকাতে জুম্মাঘরে প্রবেশ করতেন। হাছেন সিকদার কাক্কু বলতেন ” হুজুর, নামাজ শুরু করুন। ওহাদালী আইপড়ছে।” হাছেন কাক্কু খুব ফক্কর ছিলেন। তিনি খালি হাসাতেন। একবার জুম্মায় আগে আসার গুরুত্ব নিয়ে মুক্তাছার বয়ান করছিলেন “জুম্মার নামাজে আগে আইলে বেশী লাভ। যেমন ধরুন, যে অজ প্রথম আইলো, হে পাইল একটা উট কোরবানি করার সমান ছোয়াব, যে তারপর আইল, হে পাবো একটা গরু কোরবানি করার সমান ছোয়াব, তারপর যে আইলো হে পাবো একটা ছাগল কোরবানি করার সমান ছোয়াব, এভাবে কমতে কমতে সবার শেষে যে আইলো হে পাইলো একটা মুরগি কোরবানি করার সমান ছোয়াব।” হাছেন কাক্কু হেসে বলেন “হুজুর, মুরগি কোরবানি করার ছোয়াবটা তাইলে ওহাদালী পাবো।” হুজুর বললেন “বয়ানের সোম কথা কইন না জানি কেউ।” আমি মনে করলাম “উট কোরবানি করার সমান ছোয়াবটা হাছেন কাক্কুই পেলেন।” অথচ ওয়াদালী কাক্কুর বাড়ি কিন্তু জুম্মাগরের কাছেই ছিলো। তারপরও উট কোরবানি করার সমান ছোয়াব কামাই করতে পারেননি।

আরেকদিন আল্লাহর নিয়ামত ও কুদরত নিয়ে হুজুর জুম্মাঘরে বয়ান দিতেছিলেন “আল্লাহ কত নিয়ামত আমাদেরকে দিয়েছেন! কত সুস্বাদু ফল দিয়েছেন আমাদের জন্য! কাঠাল, আম, জাম, কলা, লিচু, আনারস, এমন অনেক কিছু।” হাছেন কাক্কু খুশি হয়ে বলে উঠলেন “হুজুর, আর তেঁতুল। ঐডাই ত মজা বেশি। মনে অইয়াই জিলবায় পানি আই পড়ছে।” হুজুর বললেন “বয়ানের সোম কতা কইন না জানি।”

আমাদের বাড়ি জুম্মা ঘর থেকে বেশ দূরে ছিলো। প্রায় আধা কিলোমিটার হবে। পাঞ্জেগানা নামাজ জামাতে আদায় করা সম্ভব হতো না। বাড়িতেই পড়ে নিতাম। উট কোরবানি করার সমান ছোয়াব কামাই করার ইচ্ছা থাকলেও আগে যেতে পারতামনা। তালুকদার বাড়ির বড় ছোট সব মুছুল্লিরা একত্র হতে সময় লাগতো। দল বেধে মুরুব্বিদের পিছনে হেটে যেতে হতো জুম্মায়। তাই একটু দেড়িতে পৌছতে হতো জুম্মায়। রমজান মাসে তারাবি নামাজে যেতে হতো রাতের অন্ধকারে সরু পথ দিয়ে। বুইদ্যা চালা ও জুয়াদালী কাক্কুদের জঙ্গলের ভিতর দিয়ে। সাপ ও জংলী শুকুরের ভয় ছিলো রাস্তায়। তাই দলবেধে হারিকেন, চুঙ্গাবাতি (মশাল), দোয়াত (কুপি বাতি), বদনাবাতি, বা পাটখড়ির (সোলা) আগুন জ্বালিয়ে এই দুর্গম পথে যেতে হতো তারাবি নামাযে। এই পথে ৪ টা ঘোনাও পারি দিতে হতো। ঘোনার পিচলা বাতর (আইল) থেকে অনেকেই কাদা ক্ষেতে অন্ধকারে পড়ে যেতাম। এমন কষ্ট করে যেতে হতো আমাদের জুম্মায়।

আমাদের মক্তবে যারা প্রথম কোরআন পড়ার উপযুক্ত হতেন তারা জুম্মার দিন জুম্মায় গিয়ে সবার সামনে কোরআন হাতে নিতেন। সবাই দোয়া করতেন। মিষ্টি বিতরন করা হতো এ উপলক্ষে। আমি ও এছাক ভাই একসাথে এই জুম্মায় এসে সবার সামনে কোর আন হাতে নিয়েছিলাম। আমাদের শিক্ষক ছিলেন নোয়াখালী নিবাসী আব্দুল কদ্দুস ক্কারী সাব। তিনি পরে পাইন্নাবাইদ গ্রামে স্থায়ী হন। খুব ছোট ছিলাম। এত ছোট কাউকে কেউ কোরআন হাতে নিতে দেখেননি। তাই, সবাই আমার দিকে উৎসুক দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়েছিলেন।

জুম্মায় আনন্দও ছিলো। একবার সবে ক্কদরের রাত জেগে ইবাদত করতে আমরা জুম্মাঘরে একত্র হয়েছিলাম। মাওলানা সালাউদ্দিন দুলাভাই এটার কো-অর্ডিনেটর ছিলেন। একটা খাসি জবাই করা হয়েছিলো। জুম্মাঘরের উত্তর পাশে মাটি কেটে চুলা করা হয়েছিলো। কয়েকজনে মিলে রান্না করছিলেন। বাকীরা জুম্মাঘরে বসে ইবাদতে মসগুল ছিলেন। আমার ভাগে পড়েছিলো দুই পাড়া কোরআন পড়া। একেক জনে একেক রকম ইবাদত করছিলেন। কোরআন পড়া শেষ করে আমি রান্না দেখতে গেলাম। এক জনে বললেন যে যারা রান্না করছে তারাও ইবাদতের ছয়াব পাবেন। ফিরে গিয়ে দেখি মাওলানা দুলাভাই বয়ান করছেন। আমি প্রবেশ করা মাত্রই দুলাভাই বললেন “এই যে, সাদেকই বলতে পারবে। সাদেক, বলতো চাঁদে কে কে পৌছেছিলো?” আমি একটু স্টাইল করে কথা বলে উত্তর দিলাম “নীল আর্মস্ট্রং, এড উইন ই অল্ড্রিন এন্ড মাইকেল কলিন্স।” তিনি বললেন “হে, সাদেক ঠিক বলছে। ও বিজ্ঞান জানে। কাজেই আমরা যে রকম দেখি চাঁদ সে রকম না। আল্লাহ চন্দ্র সূর্য গ্রহ নক্ষত্র সব সৃষ্টি করেছেন……….। “

আমাকে ১৯৭৫ সন থেকে পড়শুনা ও চাকরি করার জন্য গ্রামের বাইরে থাকতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে গ্রামে আরও দুটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে। সেহেতু ঐ কেন্দ্রীয় মসজিদে আমার আর যাওয়া হয় না। নওপাড়া ও চনপাড়ার মুছুল্লিদের সুবিধার্থে দুইপাড়ার সংযোগ স্থলে একটি পাকা মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। তালুকদার বাড়ির মুসুল্লিদের সুবিধার্থে তালুকদার বাড়ির পারিবারিক গোরস্থানের পশ্চিম পাশে শিরিরচালা – সারাসিয়া রাস্তার ধারে আরেকটি পাকা মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। আমি বাড়ি গিয়ে তালুকদার বাড়ি জামে মসজিদে জুমআর নামাজ পড়ি। ইচ্ছা থাকলেও কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ও চনপাড়া জামে মসজিদে যেতে পারিনা। যদি যাই, তবে নিন্দুকেরা বলবে “ডাক্তরে নিজের বাড়ির মসজিদে না গিয়ে অন্য পাড়ার মসজিদে গেছে।” বস্তুত তিনটি মসজিদই আমাদের। তিনটি মসজিদেই গ্রামের মানুষের আর্থিক সহযোগিতা আছে। নামাজে মুছুল্লিদের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই আরও দুটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে। শুধু মসজিদ না, গ্রামের সবার সহযোগিতায় মাদ্রাসা, স্কুল, হাসপাতাল, বাজার ইত্যাদি তৈরি হয়েছে। একটা জিনিসের অভাব আছে, সেটা হলো পাকা রাস্তা। পাকা রাস্তা করার এখতিয়ার গ্রামের মানুষের নেই। এটা সরকারি অর্থায়নের কাজ। সরকার দেশের মেঘা মেঘা রাস্তার প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত। একদিন হয়তো পাকা রাস্তা হবে। সেদিন হয়তো আমরা থাকবোনা। ঘুমিয়ে থাকবো চির নিদ্রায় রাস্তার ধারের তালুকদার বাড়ি পারিবারিক গোরস্থানে বাবা-মার পাশে আসাদুজ্জামান তালুকদার মুকুলের মতো। পথচারীরা সালাম দিয়ে যাবে। মসজিদের মুছুল্লিরা জুমআর নামাজ শেষে দোয়া করবে “ইয়া, আল্লাহ, মেহেরবানী করে করববাসীদেরকে মাফ করে দিন।”

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বড়বাইদপাড়া, সখিপুর, টাঙ্গাইল।

১৮ নভেম্বর ২০২২ খ্রি.

ময়মনসিংহ

এমন স্মৃতি কথা আরও পড়তে নিচের হ্যাস ট্যাগ শব্দের উপর ক্লিক করুন

#memoryofsadequel

ads banner:

baba

আমার বাবা

(স্মৃতিকথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমার বাবার নাম দলিল উদ্দিন তালুকদার। জন্মগ্রহণ করেন কালিহাতির ভিয়াইল গ্রামের দক্ষিণ পাড়ায় তালুকদার বাড়ি। আমার দাদা ছিলেন মোকছেদ আলী তালুকদার। বাবার ডাক নাম ছিল দলু । বাবার শরীরে ইমুনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম ছিল। তাই, ঘনঘন অসুস্থ্য হতেন । অসুস্থ থাকার কারনে বাবা পরিশ্রমের কাজ করতে পারতেন না। একজন কৃষক হয়েও কৃষিকাজ তেমন করতেন না। যার দরুন অনেক জমি জমা থাকলেও তিনি তেমন সচ্ছল ছিলেন না।

বাবা বেশিরভাগ সময়ই ঘুরে বেড়াতেন। লাইলি বুবু ও আকবর ভাইর জন্মের পরই দাদা বাবাকে পাঠিয়ে দেন পাহাড় অঞ্চলের জমি দখল করে আবাদ করার জন্য। বাবা ঢনডনিয়া গ্রামের বড়বাইদ পাড়া এসে বাড়ি করেন। মা আমাকে গর্ভে করে নিয়ে আসেন আমাদের নতুন বাড়িতে। তাই, আমার জন্ম হয়েছে এই গ্রামে আনুমানিক ১৯৫৮ সনে । তখন এটা কালিহাতি থানার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখন এটা পড়েছে সখিপুর উপজেলার অধীন।

বাবাকে দেখেছি ঘনঘন ভিয়াইল যেতে। জিজ্ঞেস করলে বলতেন “তোমার দাদাগো বাড়ি গেছিলাম। তোমার ফুফুগ বাড়ি গেছিলাম।” অল্প বয়সেই আমার দাদী অন্ধ হয়ে যান। আমার দাদার স্বভাবও উড়াটে ধরনের ছিলো। আমার বড় ফুফু খুব বুদ্ধিমতি ছিলেন। অল্প বয়সেই ভাই বোনদের দায়িত্ব নিতে হয় তাকে। আমার বাবা-চাচার একজন নির্ভরযোগ্য বোন ছিলেন আমার বড় ফুফু। তাই তিনি ফুফুর কাছে চলে যেতেন। ফুফুর বিয়েও হয়েছিল ভিয়াইল গ্রামের উত্তর পাড়ার তালুকদার বাড়ি। মফিজ উদ্দিন তালুকদার ছিলেন আমার ফুফা।

বাবা জমিতে ফসল তেমন ফলাতে পারতেন না। তাই, তালুকের জমি বিক্রি করে বাজার সদায় করে খেতেন। বাবার কাছে আমাদের কিছু চাইতে হয়নি। আমাদের যার যখন যা কিছু লাগতো বাবা জমি বেচা টাকা দিয়ে কিনে আনতেন।

বাবা খুব পাড়া পেড়াতেন। খেয়ে কুলি ফেলতেন নওপাড়া গিয়ে। জিতাস্বরি পাড়ার হাতু কাক্কু, দলু তাঐ ও বুর্জু কাক্কুর সাথে বাবার খুব খাতির ছিলো। তারাও বাবার মতো অলস ছিলেন। তাদের সাথেই বেশি সময় কাটাতেন। বর্ষাকালের অর্ধেক সময় নৌকায় কাটাতেন। ভিয়াইলের মধ্য পাড়ার তোমজ বেপারির ছেলে হাসান বেপারি আমাদের দাদা হতেন। আমাদের কাছে হাছেন দাদা নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি তায়েজ উদ্দিন কাক্কুর বাবা। হাছেন দাদা আমাদের খুব আদর করতেন। আমাদের জন্য জিলাপি নিয়ে আসতেন। কিন্তু আমরা তাকে পছন্দ করতাম না। কারন হলো, তিনি বাবাকে আমাদের থেকে নিয়ে যেতেন তার সাথে ব্যবসা করতে। তিনি পাট ও কাঠের ব্যবসা করতেন। তার বিরাট নাও (নৌকা) ছিলো। নাওয়ের সামনের অংশ প্রসস্থ ছিলো। এই অংশে মালামাল বোঝাই করা হতো। পিছনের অংশে ছই ছিল। এই ছইয়ের নিচে বসে হাছেন দাদা, বাবা ও হাছেন দাদার বড় ছেলে কদ্দুস কাক্কু গল্প করতে করতে হুক্কা খেতেন। আমি মাঝে মাঝে এই নায়ে বাবার সাথে ছোট চওনা ঘাট থেকে উঠে ভিয়াইল গিয়েছি। ছোট চওনা ঘাট থেকে গজারি কাঠের গুড়ি অথবা পাট কিনে নায়ে ভরে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে বিক্রি করার উদ্যেশ্যে রওনা দিতেন। চারজন মাল্লায় এই নাও বেয়ে নিতেন। সামনে দুই পাশে দুইজন, পিছনে দুইপাশে দুইজন মাল্লা লগি দিয়ে খোজ দিতেন এক সাথে। ভারী নাও ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতো। বাবা অথবা কদ্দুস কাক্কু পিছনের গলুইয়ে বসে হাল ধরে থাকতেন। আমি বাবার টোনায় বসে বাবার সাথে হাল ধরে মজা পেতাম। খাল ও নদী দিয়ে যাওয়ার সময় মাল্লারা পাড় দিয়ে হেটে হেটে গুন টেনে যেতেন। গুনের কাঠি কাঁধে নিয়ে বাঁকা হয়ে আঁকা বাঁকা শুকনো ও কাঁদা পথে হাটতেন মাল্লারা। তাদের কষ্টের কথা আমি এখনো ভুলতে পারিনি। পথে রাত হয়ে যেতো। হাছেন দাদা মাটির চৌকায় রান্না করতেন। ভাতে বেগুন সিদ্ধ দিয়ে খাস (সরিষা) তেল দিয়ে ভর্তা করতেন। চামারা চাউলের গরম ভাত দিয়ে খেতে কি যে স্বাদ পেতাম! খেয়ে নায়ের গুড়ায় বসে পানিতে প্রশ্রাব করে ছইয়ের নিচে বেতের পাটিতে ঘুমিয়ে পড়তাম। ঘুমের ভিতরেই বাবা আমাকে কোলে নিয়ে নাও থেকে নামিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিতেন।

বাবা যখন নায়ে যেতেন তখন একটানা ১০-১৫ দিন কাটিয়ে আসতেন। ঐসময় আমার মন খারাপ থাকতো। আমি হাছেন দাদার প্রতি বিরক্ত থাকতাম। মাও বিরক্ত হতেন হাছেন দাদাকে দেখে। তিনি বলতেন “অইজে আবার আইছে, তোমার বাবাকে নিয়ে যেতে।” বড় হয়ে আমার হাছেন দাদার প্রতি অভিযোগ ছিলনা। আমি বুঝতে পেরেছি আয় রোজগার করতে বাড়ি ছেড়ে থাকতে হয় অনেকদিন। হাছেন দাদাই ছিলেন বাবার সবচেয়ে ভালো বন্ধু।

বাবাকে বিদায় দেয়ার জন্য মা অনেকদূর পিছে পিছে যেতেন। আমিও মার সাথে গিয়েছি। আমার চোখের পানি গাল বেয়ে পড়তো। বাবা গামছা দিয়ে মুছে দিতেন। কোলে নিয়ে আদর করে বলতেন “বাজান, কাইন্দো না, কয়দিন পরই আই পরমু।” মার কোলে আমাকে বসিয়ে দিয়ে বাবা বুইদ্দাচালার সরু পদ দিয়ে আড়াল হয়ে যেতেন। আমি নিশ্চুপ দাড়িয়ে থাকতাম। চারদিক নিরব হয়ে যেতো। সবুজ গাছের আড়াল থেকে থেকে-থেকে ঘুঘু ডেকে উঠতো। আমার মনে হতো বাবা চলে গেলেন বলেই ঘুঘুরা কাঁদছে। অন্যদিন অত ডাক শুনিনি।

আমার কপালের এক পাশে, গাল ও চোখ সহ প্রতিবছর শীতকালে ব্যাথা করতো। তীব্র ব্যাথা। যন্ত্রনায় কান্না করতাম মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে, কপাল দু’হাতে ধরে। এটাকে বলা হতো আধকপালে মাথার বিষ। আমার কষ্টে বাবাও কষ্ট পেতেন। বাবা বড় চওনা ও কচুয়া হাট থেকে বড়ি এনে দিতেন। পানি দিয়ে খেতাম। কোন কাজ হয়নি। একজন বললেন যে, ভুয়াইদের এক মান্দাই মহিলা কবিরাজ আধকপালে মাথার বিষের চিকিৎসা জানেন। বাবা আমাকে কাঁধে নিয়ে ভুয়াইদ গেলেন। মহিলা বিধান দিলেন “সকালে উদিয়মান সূর্যের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মাটিতে সেজদা দিতে হবে কিছুক্ষণ করে কয়েকদিন।” তাতে কোন কাজ হলো না। ছোট দাদা জয়নাল আবেদীন তালুকদার শুনে বললেন ” মুসলমানের পোলা হয়ে হিন্দু কবিরাজের কথায় সূর্যপূজা করতাছ? বাড়ির পাশেই কবিরাজ থাকতে গেছস ভুয়াইদ! আমিই তো আধকপালে বিষের চিকিৎসা জানি।” এই বলে তিনি গাছান্ত বেটে বটিকা বানিয়ে দিলেন। আমি প্রতিদিন সকালে বিষ ওঠার শুরুতেই ঐ বটিকা খেতাম। ওটা এমন ঝাল লাগতো যে বিষের যন্ত্রনার চেয়ে ঝালের তীব্রতাই বেশি ছিল। দাদার ঔষধ বাদ দিলাম। বাবা খবর পেলেন বাঘেরবাড়িতে একজন আধকপালী মাথা বিষের ভালো কবিরাজ আছেন। বাবা আমাকে পর পর তিন দিন কাঁধে করে নিয়ে গেলেন ঝার ফুক দিতে। কোন কাজ হলো না। প্রতিবছর আমার এমন রোগ হতো। আমি কষ্ট পেতাম। কোন চিকিৎসা নেইনি। মেডিকেল কলেজে ৩য় বর্ষে পড়ার সময় শিখলাম যে ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়াতে এমন কপালের এক পাশে ব্যাথা হয়। এর ঔষধ কি তাও বই পড়ে জেনে নিলাম। আমি নিজের বুদ্ধিতেই ফার্মেসী থেকে ঔষধ কিনে কাউকে না জানিয়ে সকালে খেয়ে নিলাম। শুরু হলো সারা শরীরে তীব্র যন্ত্রণা। বুঝতে পেলাম। ভুল করেছি। ভুল চিকিৎসা করেছি নিজের উপর। অসহ্য যন্ত্রণায় বিছানায় ছটফট করলাম। বিছানা থেকে উঠতে পারলাম না। কাউকে আমার বোকামির কথা বললাম না। মৃত্যুর জন্য প্রস্তত হলাম। কিন্তু আল্লাহ বাচিয়ে দিলেন। এরপর নাক-কান-গলা বিভাগের আউটডোরে মেডিকেল অফিসারকে দেখালাম। তিনি আর এস ডাঃ সিরাজুল আরেফিন স্যারের কাছে রেফার্ড করলেন। তিনি আমার সব ইতিহাস শুনে এবং নাক-কান-গলা দেখে বললেন “তোমার প্রতিবছর শীতকালে সাইনোসাইটিস রোগ হয়। তোমার সাইনোসাইটিস রোগ হয়েছে।” তিনি সাইনোসাইটিস সম্পর্কে বিস্তারিত আমাকে শিখিয়ে দিলেন। তারপর থেকে আমার আর সাইনোসাইটিসের ব্যাথার কষ্ট হয় নি। আলহামদুলিল্লাহ।

বাবা আমাকে প্রথম হাট দেখিয়েছেন। বড় চওনা, কচুয়া, ইন্দ্রজানী, বর্গা ও পলাশতলীর হাট বাবাই আমাকে প্রথম দেখিয়েছেন। বাবার সাথেই আমি প্রথম বাসে উঠি। বাবাই আমাকে প্রথম সিনেমা দেখান। বাবার পেটের নাভীর কাছে ব্যথা করতো। তীব্র ব্যাথায় অনেক রাতে পেট ধরে কাঁদতে দেখেছি। হাট থেকে বোতলের ঔষধ এনে খেতেন। কোন কাজ হতো না। একবার, তখন আমি খুব ছোট, আমি মার সাথে রৌহার মামাবাড়ি ছিলাম। বাবা কোথাও যাচ্ছিলেন। আমি বললাম

– বাবা, কুনু যাবাইন?

– তোমার হাছেন দাদার সাথে সয়ার হাটে যামু। তোমার দাদা একটা গরু কিনবেন।

– আমি যামু।

– দুর আছে। মোটরে চইড়া যাইতে অয়।

– ভোঁ মোটর সাইকলে?

– না, মোটর গাড়িতে।

– আমি মোটরে চরমু।

– এখন না। বড় অইলে নিয়া যামুনি।

– না, আইজকাই যামু।

বলে কান্না শুরু করে দিলাম। বাধ্য হয়ে বাবা আমাকে সাথে নিতে রাজি হলেন। মা আমার গায়ে একটা হাওই শার্ট পরিয়ে দিলেন। কালিহাতির রাজাফৈরের কাছে গেলে ভোম ভোম রকম শব্দ পেলাম। বাবা বললেন “এইটা মোটরের শব্দ।” চামুরিয়া পাড়ি দিলে ফটিকজানি নদীর উপর ব্রিজ দেখিয়ে বললেন “ঐযে দেখ কত বড় পুল।” পুলের উপর তাকাতেই দেখা গেলো বিরাট এক কাছিমের মতো জিনিস পুলের উপর দিয়ে চলে গেলো। আমি বললাম “ওঠা কি গেলো?” বাবা বললেন “ওঠা, প্রাইভেট কার। বড় লোকেরা ওডায় চড়ে।” এরপর বড় একটা কিছু যাচ্ছিল। বললেন “এইডা মোটর গাড়ি।” কালিহাতি বাসস্ট্যান্ডে কিছুক্ষণ দাড়ালে ময়মনসিংহ থেকে একটা মোটর গাড়ি এসে থামলো। কাঠবডি বাস। কাঠের জানালা। সীট খালি নেই। আমরা দাড়িয়েই গেলাম। সয়া গিয়ে নেমে পড়লাম। কালিহাতি ও এলেঙ্গার মাঝামাঝি হলো সয়ার হাট। ঘুরে ঘুরে গরু কিনতে রাত হয়ে গেলো। রাতে আমরা চলে গেলাম বাগুনডালি গ্রামে। সেই গ্রামে একজন কবিরাজ ছিলেন। সেই বাড়ি গিয়ে রাত কাটালাম। কবিরাজ বাবার পেটের ব্যাথার ঔষধ দিলেন। ঔষধ দেখতে লোহার করাতের গুড়ার মতো। খেলে ব্যাথা ভালো হয়। পরেরদিন সকালে ঐ বাড়িতে নাসতা করে আমরা পা পথে গরু নিয়ে ভিয়াইল চলে আসি। সেই ঔষধ খেয়ে বাবা ভালো থাকতেন। এরপরও কয়েকবার বাবা সেই ঔষধ এনে সেবন করেছেন। কিন্তু ঔষধের দাম খুব বেশি ছিল। আমি এখন মনে করি ওগুলো আসলেই করাতের গুড়া। করাতে থাকে এলুমিনিয়াম। এই এলুমিনিয়াম পাকস্থলির হাইড্রোক্লোরিক এসিডের সাথে বিক্রিয়া করে এসিডকে নিউট্রাল করে দিয়ে পেট ব্যাথা তথা পেপ্টিক আলসার ভালো করে। বাবা এরপর খোঁজ পান খাওয়ার সোডা বেকিং পাউডার। বাবা বেকিং পাউডার খেয়ে পেপ্টিক আলসারের ব্যাথা থেকে উপসম হতেন। আমি ডাক্তার হবার পর আর বাবাকে বেকিং পাউডার খেতে হয় নি।

বাবা আমাকে কোনদিন কোন কাজ করতে বলেন নি। বাবা না বললেও আমি সংসারের অনেক কাজ করেছি। বাবা আমাকে কোনদিন পড়তে বলেননি। কারন, তিনি জানতেন সাদেককে পড়তে বলতে হবে না। আল্লাহ সাদেককে ও গুণটি দিয়েই তৈরি করেছেন। আমি যখন দোয়াত জ্বালিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত পড়তাম বাবা আমার পাশেই শুয়ে শুয়ে মশা মেরে দিতেন এবং বিচুন দিয়ে বাতাস দিতেন। পিঠে হাত বুলিয়ে দিতেন। প্রাইমারির পড়া বুঝিয়ে দিতেন। বাবার অনেক বিষয়ে ভালো সাধারণ জ্ঞান ছিলো। তিনি কোন নিতিকথা শিখাননি। কারন, তার বিশ্বাস ছিল সাদেক কোন অনৈতিক কাজ করতে পারে না।

১৯৭৯ সনে যখন মা মারা যান তখন বাবার বয়স হয়তো ৫৫ বছর। ঘটকরা চেষ্টা করেছিলেন বাবাকে পুনরায় বিয়ে করিয়ে দিতে। আমি তখন এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। আমরা বিয়ের ব্যাপারে হা না কিছু বলিনি। বাবা বিবেচনা করে দেখেছেন যে সংসারের আমাদের নতুন মা এলে আমাদের শান্তি বিগ্নিত হতে পারে। তাই তিনি ধৈর্য ধরেন।

আমি ডাক্তার হবার পর বাবাকে সতর্ক করে দেই যে এখন থেকে তিনি জমি বিক্রি করে খেতে পারবেন না। আমি সংসারের জন্য যতটুকু পারি করে যাবো। তারপর থেকে তিনি আর জমি বিক্রি করেননি। তিনি ঘনঘন জ্বরে আক্রান্ত হতেন। আমি তখন আমার এম ফিল কোর্সের পড়া নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। বাবার জন্য সময় দিতে পারিনি। এম ফিল শেষ করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে যোগদান করে বাবাকে আমার বাসায় রাখলাম। কিন্তু আমার মনে হয়েছে বাবাকে জেল খানায় বন্দী করে রেখেছি। বাবার সাথে সময় দেয়ার কেউ ছিল না। বাবা ঘনঘন বাড়ি চলে যেতেন। আমি বুঝতে পারি বাবা এখন গ্রামময় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বন্ধুদের সাথে গুপ ছেড়ে হেসে হেসে গল্প করছেন। তাই আমি শহরে এসে থাকতে বাবাকে পিড়াপিড়ি করিনি।

২০০১ সনের দিকে বাবা খুব বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দেখানো হয়। পরীক্ষা করে দেখা যায় বাবার প্যানসাইটোপেনিয়া আছে। অর্থাৎ সব রক্তকণিকা কম আছে। এজন্যই ঘনঘন ইনফেকশন হয়। ইনফেকশনের জন্যই জ্বর হয়। বাবাকে অনেকদিন হাসপাতালে ভর্তি রাখতে হয়। ভাতিজা আব্দুল মান্নান তালুকদার তখন কলেজে পড়তো। ওর পড়াশোনা ক্ষতি করে বাবার সাথে থাকে অনেক দিন। এরপর ধরা পড়লো বাবার লিভারে সিরোসিস হয়েছে। এরোগ ভালো হবার নয়। ৭৫ বছর বয়সে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করাও ঠিক হবে না মনে করলাম। যতটুকু সম্ভব সাধারণভাবে চিকিৎসা করে যেতে লাগলাম। বাবার ইচ্ছে অনুযায়ী বাড়িতে রাখলাম। সুবিধা ছিল, ভাই, ভাবী, মান্নান ও আফ্রোজা বাবার ঠিকমতো যত্ন নিতে পারবেন নিজ বাড়িতে। তখন ছিল অক্টোবর মাস। আবহাওয়া ছিল দুর্যোগপূর্ণ। বাড়ির চারিদিকে ছিল কাদা আর কাদা। এমন একটি দিনে ২০০১ সনের ২০ অক্টোবর বাবার ইন্তেকালের সংবাদ পেলাম। কার নিয়ে ছুটে গেলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। দুই কিলোমিটার দুরে পাকা রাস্তায় নেমে কর্দমাক্ত রাস্তা দিয়ে হেটে গিয়ে বাবার মৃতদেহের কাছে উপস্থিত হলাম। দেখলাম আমার নিস্পাপ বড় ভাই আকবর হোসেন তালুকদার বাবার কাছে বসে বাবার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। আনুমানিক ৭৫ বছর বয়সে বাবা চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। বাবাকে ছেড়ে মা চলে গিয়েছেন পরপারে ২০ বছর আগে। আল্লাহ আমার ধৈর্যশীল বাবার জন্য বেহেস্ত নসীব করুন।

১৫/৪/২০২০ খ্রি.

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

#memoryofsadequel

Jibito Uddhar

Mohilake Jibito Uddhar

মহিলাকে জীবিত উদ্ধার

(স্মৃতি কথা)

ঢাকা থেকে বরিশাল যাচ্ছিলাম লঞ্চে ১৯৮৮ সনে। রাতের খাবার খেয়ে ডেকে বিছানার চাদর বিছিয়ে ব্রিফকেস মাথায় দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। গভীর রাতে যাত্রীদের কোলাহল শুনে ঘুম ভেঙে গেলে চমকে গেলাম। তখন মাঝে মাঝে লঞ্চে ডাকাতি হতো যাত্রীদের মাথায় হাতুড়ি পেটা করে। সেই ইঞ্জুরির চিকিৎসা চরামদ্দিতে ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আমিই করেছিলাম। কি ভয়াবহ সেই হাতুড়ির আঘাত! তাই, ডাকাতির কথা মনে হলেই আমি আঁতকে উঠতাম। উঠে দাঁড়ালাম। না, এটা ডাকাতের ঘটনা নয়। দেখলাম সবাই লঞ্চের ডান কিনারে জড়ো হয়ে নদীর পানিতে কী যেনো দেখছে। আমিও দেখতে গেলাম। দেখলাম কেউ একজন শ্রোতোশ্বনি নদীর পানিতে ভেসে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে হাত উচু করে দেখাচ্ছে। দেখতে দেখতে সব যাত্রী যখন লঞ্চের ডান কিনারে জড়ো হলো লঞ্চ কাত হয়ে পানি প্রবেশের উপক্রম হলো। আমরা দৌড়ে এক যোগে বাম কিনারে চলে গেলাম। লঞ্চ বাম দিকে কাত হলো। ভয়ে দৌড়ে ডান কিনারে চলে গেলাম। এভাবে ডান-বাম খেলা চলো কয়েকবার। এবার মানুষটাকে লঞ্চের খালাসিরা নদী বক্ষ থেকে উঠাতে সমর্থ হলো। রাখা হলো ডেকের মাঝখানে। সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো। আমিও পেছন থেকে উকি দিয়ে দেখবার চেষ্টা করলাম। এক নজর দেখেই চোখ নত করে চলে এলাম। দেখলাম উদ্ধারকৃত মানুষটি একজন মধ্য বয়সি মহিলা, একজনে গরম কাপড় দিয়ে ঢেকে দিচ্ছেন। মহিলা মৃত মানুষের মতো পড়েছিলেন। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে জীবন মরণ চেষ্টা করে বেচে ওঠা মানুষ উদ্ধার হবার পর এভাবেই সাধারণত অবসাদগ্রস্ত হয়ে নিস্তেজ পড়ে থাকে। সবাই যার যার বিছানায় ফিরে এসে নৌকাডুবি নিয়ে নানান কাহিনী বলতে লাগলো। শুনলাম মহিলা সুস্থ আছেন। এখান থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার উজানে তারা নৌকাডুবির কবলে পড়েন। তারা এক নৌকা ভর্তি করে আটরশির পীরের খানেকায়ে যাচ্ছিলেন। সেই নৌকা পদ্মা নদী বক্ষে ডুবে যায়। শ্রোতের টানে মহিলা ভাসতে ভাসতে এপর্যন্ত এসে পড়েছেন। হালকা সাতার কেটে তিনি পানির উপর ভেসে থাকেন। পাহাড়ি মানুষ হলেও আমি সাতার কাটতে জানি। যেভাবে লঞ্চ একবার ডান দিকে এবং বাম দিকে কাত হচ্ছিলো, যদি লঞ্চডুবি হতো আমাকেও হয়তো এভাবে ভেসে সাতার কেটে বরিশালের দিকেই যেতে হতো।

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ময়মনসিংহ

৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ খ্রি.

#momoryofsadequel#charamoddisadequel

Bag Niye Nadite Jhap

Bag Niye Nadite Jhap

ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে নদীতে ঝাপ দিলো

(স্মৃতি কথা)

ঢাকা থেকে বরিশাল ফিরছিলাম লঞ্চে কর্মস্থল চরামদ্দি ইউনিয়ন হেলথ সাব-সেন্টারে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। প্রতিমাসেই একবার এভাবে লঞ্চে রাতে যাতায়াত করতে হতো বরিশাল-ঢাকা-বরিশাল ১৯৮৮-৮৯ সনে। সরকারি বেতন মাসে ছিলো ১৮৫০ টাকা। লঞ্চের কেবিন ভাড়া ছিলো ৬০০ টাকা। তাই, সবসময় কেবিনে যাওয়া সম্ভব হয়নি। বেশি সময় লঞ্চের ডেকে শুয়ে যাতায়াত করতাম। ব্রীফকেসে একটা লুঙ্গি ও একটা তোয়ালে রাখতাম। বিকাল ৬ টা বা ৭টায় লঞ্চ ছাড়তো এদিকে ঢাকার সদরঘাট থেকে, ওদিকে বরিশাল সদরঘাট থেকে। সবাই একটা করে সিংগেল বিছানার চাদর সাথে রাখতো। এই চাদরে যতটুকু জায়গা দখল করা যায় ততটুকু জায়গা যাত্রীর অধীন ছিলো। ভাড়া ছিলো ৩০ টাকা। আমি ৩০ টাকার টিকিট কিনতাম। বরিশালের মানুষ আমাকে চিনত না। তাই, অতি সাধারণ ভাবে চলাফেরা করতে আমার লজ্জাবোধ হতো না। লঞ্চের হোটেলে ইলিশের ডিম দিয়ে পেট ভরে ভাত খেয়ে রাত আটটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়তাম লুঙ্গি পরে, বিছার চাদর বিছিয়ে ব্রিফকেসের উপর মাথা রেখে। ব্রিফকেসের উপর তাওয়েল বিছাতাম। লঞ্চের ইঞ্জিনের শব্দে ভালো ঘুম হতো। ছেলে বা মেয়ে আগে উঠলে আগে যে যেখানে জায়গা পেতো সেখানেই চাদর বিছিয়ে জায়গা দখল করতো। পরিচয় যাতে কেউ জানতে না পারে সেজন্য সহযাত্রীদের সাথে তেমন আলাপ করতাম না। ব্রিফকেসের উপরের ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার লেখা নেইম কার্ডটি উল্টিয়ে রাখতাম। যখন বাসে যাতায়াত করতাম তখন নেইম কার্ডটি সোজা করে রাখতাম। কারন, ডাক্তার পরিচয় পেলে সহযাত্রীরা সম্মান করে ৩/৪ ইঞ্চি জায়গা ফাঁক করে দিতো। নিজের পরিচয় প্রকাশ করার জন্য আমি নিজেই সহযাত্রীকে জিজ্ঞেস করতাম “ভাই, কি করেন?” সহযাত্রী উত্তর দিয়ে কিছুক্ষণ আলাপ করে উল্টো আমাকে জিজ্ঞেস করতেন “ভাই, আপনি কি করেন?” আমি ডাক্তার পরিচয় দিলে একটু নড়ে চড়ে বসে ৩/৪ ইঞ্চি জায়গা ছেড়ে দিতো। আমি কাছে এসে বসুন বললে আরও বেশি করে জায়গা ছেড়ে দিতো।

যাহোক, লঞ্চের কথায় আসি। মেডিকেল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা সাধারণত একটা নির্দিষ্ট এলাকা নিয়ে বিছানা পারতো। ঐ এলাকাটার চারিদিকে চাদর ঝুলিয়ে পর্দা করে দিতো। তারা ঘুমাতো কিনা জানি না। যতক্ষণ আমি চেতন থাকতাম তাদেরকে গল্পসল্প, হৈহল্লা করে কাটাতে শুনতাম। এদের সংখ্যা সাধারণত ১২/১৪ জন হতো। এমনি এক লঞ্চ জার্নির সময় আমার শিতানের দিকে শুয়েছিলেন এক ভদ্রমহিলা ও তার পাশের জায়গায় শুয়েছিলো এক যুবক ছেলে। গভীর রাতে হঠাৎ সেই যুবক ভদ্রমহিলার ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে মাঝ নদীতে ঝাপ দিলো। যাত্রীদের কোলাহল শুনে আমার ঘুম ভেঙে গেলো। লঞ্চ থামতে থামতে ছেলেটি অনেক দূরে পড়ে গেলো। লঞ্চ ছেলেটিকে ধরার জন্য পেছাতে লাগলো। ততক্ষণে ছেলেটি নদীর কিনারে কাঁশবনে উঠে পড়লো। ওখানে আগে থেকেই তার সহকর্মীরা তাকে রিসিভ করার জন্য অপেক্ষা করছিলো। তারা ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে কাঁশবনে হারিয়ে গেলো। আমার ব্রিফকেস কেউ ছিন্তাই করতে পারেনি। কারন, ওটা থাকতো আমার মাথার নিচে। নিলেও সমস্যা ছিলো না। টাকা রাখতাম আন্ডারওয়্যারের নিচের পকেটে।

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ময়মনসিংহ

১ সেপ্টেম্বর ২০২২ খ্রি.

#memoryofsadequel #charamoddisadequel

এমন গল্প আরও পড়তে হ্যাস্ট্যাগ শব্দে ক্লিক করুন।