শেষ দেখা মুখ

শেষ দেখা মুখ

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

মানুষ মানুষকে অনেকদিন পর্যন্ত মনে রাখে। মনে রাখে তার কথা, তার কাজ, তার মুখ, তার চেহারা। কেউ কেউ বেশী দিন মনে থাকে, কেউ কেউ মন থেকে হারিয়ে যায়। বা ভুলে যায়। দীর্ঘদিন না দেখতে দেখতে ভুলে যায়। দীর্ঘদিন নাম না ডাকতে ডাকতে নাম ভুলে যায়। এমনও আছে চেহারা মনে আছে কিন্তু নাম মনে নেই। নাম মনে আছে কিন্তু চেহারা মনে নেই। আমি আমার এক আত্নীয়কে দীর্ঘদিন না দেখতে দেখতে সে যে আমার কেউ ছিলো সেটাই ভুলে গিয়েছিলাম। হটাৎ এক অনুষ্ঠানে তাকে দেখে মনে পড়লো এ তো আমাদের আত্নীয়। আমি ভুলে গিয়েছিলা! আমি যখন ক্লাস সিক্স বা সেভেনে পড়তাম তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ুয়া কচুয়ার সামাদ ভাই আমাদের স্কুলে বেড়াতে এসে অফ পেরিয়ডে ক্লাসে আমাদের সাথে গল্প করতেন। তিনি আমাকে বেশ স্নেহ করতেন। আমাদের স্কুলের একজন শিক্ষক ক্লাসে সামান্য একটু ভুল গ্রামার শিখিয়েছিলেন। আমি শুদ্ধ সেন্টেন্স বললেও স্যার ভুল ধরছিলেন। সেই কথাটা সামাদ ভাইকে বলেছিলাম। তিনি বললেন “তোমারটাই সঠিক। কিন্তু তুমি সেটা তোমার স্যারকে বলবে না। স্যার ইজ অলওয়েজ রাইট। স্যার যা বলেন তাই ঠিক। স্যারের ভুল ধরবে না।” আমি তার এই শিক্ষাটুকু সারাজীবন মনে রেখেছি। আমিও মেডিকেল কলেজে ২৮ বছর শিক্ষকতা করেছি। আমিও হয়ত অনেকবার ভুল পড়িয়েছি। আমার ছাত্ররা হয়তো সেই ভুল ধরতে পেরেছে। তারা আমাকে শ্রদ্ধা করে বলেই হয়তো আমার ভুল আমাকে শুধ্রে দিতে চায়নি। ক্লাস সেভেন অর্থাৎ ১৯৭৩ সনের পর থেকে আর সামাদ ভাইকে কোনদিন দেখিনি। প্রায়ই সামাদ ভাইকে মনে পড়তো। এভাবে না দেখতে দেখতে আমি সামাদ ভাইকে ভুলে যাই এক সময়। সামাদ ভাই চাকরি থেকে অবসরে গিয়ে কিছুদিন আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজে কি একটা পদে যেন কাজ করেন। প্রাক্তন ছাত্র হিসাবে তিনি একদিন আমাকে মোবাইল করেন অফিসের নাম্বার থেকে। আমি তার সাথে অনেক কথা বললাম অতীতের অনেক কথা স্মরণ করে। কিন্তু আমি সামাদ ভাইর মুখ মনে করতে পারলাম না। তারপর পেরিয়ে গেছে কয়েক বছর। অনেক চেষ্টা করেও সামাদ ভাইর মুখ মনে করতে পারছি না। এজন্য আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। এত প্রিয় একটা মুখ ভুলে গেলাম!

 

নাটকে-সিনেমায় বিচ্ছেদের নাটকে দেখেছি শেষ দেখার দিন একজন আরেকজনকে বলছে “এটাই হয়তো আমাদের ভাগ্যে ছিলো। আমাকে মনে করে কষ্ট পেয়ো না। যেখানেই থাকো ভালো থেকো। আমার সব কিছু ভুলে যেয়ো।” তারপর থেকে কেউ কাউকে ভুলে যেতে পারে না সারাজীবন। প্রতি রাতে ঘুমাবার আগে তাদের শেষ ডায়ালগটার কথা মনে করে ভুলে যেতে চায়। কী কী জিনিস ভুলে যেতে হবে তার একটা হিসাবও করতে থাকে। তাই, প্রতি রাতেই তাকে মনে করে ভুলে যাওয়ার জন্য। ভুলে আর যাওয়া হয় না। শেষবার দেখা মুখটি ভেসে আসে তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখের সামনে।

 

মানুষ যখন একজন আরেকজনকে স্মরণ করে তখন প্রথমেই তার শেষ দেখা মুখটি ভেসে উঠে কল্পনায়। তারপর চেষ্টা করে করে অতীতের আরও কিছু মুহুর্তের মুখ ভেসে উঠতে পারে। মুখের মধ্যে সবচেয়ে বেশী মনে দাগকাটে রাগান্বিত মুখটি। রাগান্বিত মুখটি মানুষ বেশীদিন মনে রাখে। এজন্য আমাদেরকে সদা হাস্যজ্বোল মুখ নিয়ে থাকতে হবে। যেনো কেউ আমাকে মনে করলে তার কাছে আমার সুন্দর মুখটিই ভেসে উঠে। ক্রোধান্বিত মুখ কুতশিত দেখায়। তাই ক্রোধ পরিহার করে থাকা ভালো। আমি পারতপক্ষে কারো সাথে রাগারাগি করি না। আমাকে যখন শেষে দেখেছেন তখন আমাকে ক্রোধান্বিত দেখেছেন এমন কেউ থেকে থাকলে জানাবেন আমি তার সাথে আবার হাসিমুখে দেখা করে আসতে চাই যেন তিনি আমার হাসিমুখটাই মনে রাখে।

 

মানুষ দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হলে মৃত্যু চিন্তা এসে যায়। মারা যাওয়ার আগে সব প্রিয়মুখ তিনি দেখে যেতে চান। তাই সবাই তাকে দেখতে যান। রোগীকে দেখতে যেতে হয়। আপনজনদের মুখ দেখে রোগী মনে প্রশান্তি পায়। সাথে করে কিছু ফল মুল ও পথ্য নিয়ে যেতে হয়। আগের দিনে রোগীর জন্য বেদেনা, আতাফল, ডালিম পেপে, আনারস, ডাব, মিশ্রি, দুধ ইত্যাদি নিয়ে যেতো। এখন রোগী দেখতে যাওয়ার প্রচলন প্রায় উঠেই গেছে। গেলেও দুই হালি মালটা নিয়ে যায়। মালটা যেনো রোগীদের জাতীয় ফল হয়ে গেছে। খেতে লাগে পানসে। রোগী খেতেও চায় না। এত মাল্টা দিয়ে কি করবে? অনেকেই কেউ অসুস্থ হলে ফেইসবুকে একটা স্ট্যাটাস দেয় অমুকের জন্য দোয়া করতে। সেই স্যাটাসে অনেক লাইক পড়ে। এত লাইক দিয়ে রোগী কি করবে তা আমি জানি না। অসুস্থ অবস্থার ছবি দিয়েও কেউ কেউ স্ট্যাটাস দেয়। আমি মনে করি তাও ঠিক না। সবাই চায় তার সুন্দর ছবিটি সবাই দেখুক। অসুস্থ খালি গায় অথবা লুঙ্গি পরা গেঞ্জি গায়ের ছবি সামাজিক মিডিয়ায় দেখাতে পছন্দ করেন না। অনেকে দেখতেও পছন্দ করেন না। হাতে সেলাইন লাগানো, নাক দিয়ে নল লাগানো ছবি দেখানো আমি ভালো মনে করি না। হ্যা, কেউ মারা গেলে স্ট্যাটাস দিয়ে জানিয়ে দেয়া যায় জানাযায় শরীক হওয়ার জন্য অথবা দোয়া করার জন্য অথবা মৃত্যু সংবাদটা জানিয়ে দেয়ার জন্য। কেউ কেউ এমনও করেন যে লাশের ছবি দিয়ে মৃত্যু সংবাদ প্রচার করেন। তা ঠিক না। ছবি দিতে হলে সুস্থ্য কালের সুন্দর একটা ছবি দিন যে ছবিতে মানুষ তাকে বেশী চেনে। মানুষ মারা যাবার পর শেষ দেখা দেখানো হয় মুখ বের করে। অনেকেই আছেন মারা যাবার পরের মুখ দেখতে পছন্দ করেন না। অনেকেরই মুখ বিকৃত হয়ে যায়। আমি একজনের মুখ দেখেছিলাম হা করে রয়েছে। তারপর থেকে আমি যখন তাকে মনে করি তার ঐ হা করা মুখ মনে পরে। কারন, হা করা মুখই ছিল আমার কাছে তার শেষ দেখা মুখ। সেদিন ইউটিউবে পিলখানা হত্যাকান্ডে নিহত এক আর্মি অফিসারের স্ত্রীর সাক্ষাৎকার শুনছিলাম। তিনি বলছিলেন যে তিনি তার স্বামীর লাশটি ইচ্ছে করেই দেখলেন না। কারন, তিনি মনে করেছেন গলিত অবস্থায় লাশ নিশ্চয়ই বিকৃত হয়ে গেছে। শেষ দেখা মুখটি তার সারাজীবন মনে পড়বে। তিনি চান তার স্বামী তার আগের সুন্দর চেহারা নিয়ে তার স্মৃতিতে থাকুক। মারা যাবার পর লাশের ছবি মিডিয়ায় দিলে একজন না দেখতে চাইলেও তার চোখের সামনে পড়ে যাবে সেই মুখটি। সারাজীবন মনে পড়ে থাকবে সেই শেষ দেখা মুখটি।

১৯/১১/২০২০ খ্রি.

Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/


 

পাগল নিয়ে যতো কথা

পাগল নিয়ে যতো কথা
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
ছোট বেলা গ্রামে নানান কিছিমের পাগল দেখেছি। সব পাগল ক্ষতিকর ছিলো না। খেপা পাগল বা ভোর পাগল ক্ষতিকর ছিলো। যারা হাল্কা পাগলামি করতো তাদের বলা হতো আধপাগলা বা আতপাগলা। আতপাগলা মানুষ যেখানে সেখানে অবর জবর কথা বলে ফেলতো অথবা কান্ড করে বসতো। কিছু কিছু লোক ছিলো তাদেরকে বলা হতো ভাবের পাগল। তারা বেশী কথা বলতো না। সারাক্ষণ ভাব ধরে থাকতো আজব আজব পোষাক পরে। কিছু মানুষ ছিলো সব সময় আল্লাহর ধ্যান খেয়ালে মগ্ন থাকতেন। তাদেরকে বলা হতো দেওনা পাগল (দেওয়ানা পাগল)। কোনো কোন মানুষ মাথায় চুলের জট পাকিয়ে ভাব ধরে থাকতো আর বুঝাতো যে তাদের লগে কিছু একটা আছে। এগুলোকে বলা হতো জৌটা পাগল। কিছু মহিলা পাগল ছেড়া কাথা গায় গিয়ে ঘুরতো। এদের বলা হতো খেতা পাগল। যারা ঘন ঘন বিয়ে করতে চাইতো তাদের বলা হতো বিয়ার পাগল। যেসব মেয়েরা সারাক্ষণ স্বামীর প্রশংসা করে গল্প করতো তাদের বলা হতো ভাতাড়ের পাগল। কিছু কিছু লোক মাঝে মাঝে মাতলামি করতো কিন্তু তারা সব কিছুতেই সাভাবিক ছিলো। অনেকে তাদেরকে কটাক্ষ করে বলতো “জাতে মাতাল, তালে ঠিক”, সংক্ষেপে জিএমটিটি।
গ্রামের পোলাপানরা পাগল দেখলে মজা পেতো। পাগলের পিছে পিছে হাটতো। যেসব পাগল ল্যাংটা থাকতো তাদেরকে ল্যাংটা পাগল বলা হতো। ল্যাংটা পাগল দেখলে পেছন থেকে পোলাপানরা ইটা দিয়ে ঢিল ছোড়তো। বিরক্ত হয়ে পাগলারা মা বাপ তোলে গালি দিতো। পোলাপানরা গ্রামের ঝগড়া বিবাদ দেখেও মজা পেতো। পাশাপাশি দুই বাড়ির মধ্যে মাঝে মাঝে বিবাদ বেঁধে যেতো। যার যার বাইর বাড়িতে দাঁড়িয়ে মায়ে ঝিয়ে মিলে যে যতো রকম বকা ঝকা করতে পারে করতো। পোলাপানরা অদুরে দাঁড়িয়ে সেইসব বকাঝকা ও ঝগড়াটেদের অঙ্গভঙ্গি দেখে উপভোগ করতো। এখনো শহরের শিক্ষিত মানুষ টেলিভিশন নাটকে পারিবারিক ঝগড়া দেখে উপভোগ করে।
কালিয়ার হাসমত ভাই ছিলেন কচুয়া পাবলিক হাই স্কুলের ছাত্র সংসদের জি এস। তিনি খুব মজা করে কথা বলতেন। তিনি কথা বললে আমরা মজা করে শুনতাম। ক্লাসের ফাঁকে তিনি প্রায়ই ঝইড়া পাগলার কথা বলতেন। ঝইড়া পাগলা কি কইলো, কি করলো, এসব হাসির কথা বলতেন। মজা পেতাম। তাতে ঝইড়া পাগলাকে আমার দেখার ইচ্ছে হয়েছিলো। এক রাতে কালিয়া বাজারে মঞ্চ নাটক দেখছিলাম। সেই মঞ্চে উঠে ঝইড়া পাগলা গান গাইতে চাইলেন। কর্তৃপক্ষ তাকে গান গাওয়ার অনুমতি দিলে দর্শক শ্রোতারা হাসাহাসি করছিলেন। আমি সেদিন তাকে প্রথম দেখলাম। এরপর আর আমি তাকে দেখিনি। তিনি হাতে এক তারা নিয়ে গাই ছিলেন ভক্তিমূলক বাউল গান “আর আমার নালিশের জায়গা নাই…. ….।” গান শুনে আমার মনে হলো তিনি পাগল নন। তিনি বাউল ফকির। আমি কচুয়া স্কুলে পড়াকালীন স্কুলের লাইব্রেরী থেকে বই তুলে তুলে পরতাম। তাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শরতচন্দ্র চট্রপাধ্যায় ও জসিম উদ্দিনের বেশ ক’টি বই পড়া হয়ে যায়। এদের মধ্যে পল্লী কবি জসিমউদদীনের স্মৃতির পট বইখানি আমার মনে খুব প্রভাব ফেলে। কবি ময়মনসিংহের গ্রামে গ্রামে ঘুরে লোকগীতি ও লোক সংস্কৃতি সংগ্রহ করতেন। তিনি গ্রাম্য বাউলদের বাড়িতে থেকেছেন, খেয়েছেন, গান শুনেছেন। সেসব মজার অভিজ্ঞতা তিনি স্মৃতির পট বইয়ে লিখেছেন। আমার স্মৃতি কথাগুলো লিখতে এই স্মৃতির পট বইটি বেশ প্রভাব ফেলেছে। সেই বইয়ে আছে কবি এক বাউলের গান শুনেন সারারাত ধরে। বাউলের গানের কথা ও সুর কবি জসিমউদদীনকে বিমোহিত করে। তিনি “আর আমার নালিশের জায়গা নাই” গানটি বিশেষভাবে লিখেছেন। সেই গান ঝইড়া পাগলা গাইছেন নাটকের মঞ্চে। আমি তখন খুব সম্ভব ক্লাস নাইনে পড়ি। তখনই আমি মনে করি তিনি পাগল নন, গ্রাম্য এক বাউল ফকির।
অল্প কিছু সংখ্যক পাগল ছিলো তারা ক্ষেপে গিয়ে জিনিসপত্র ভাংচুর করতো ও মানুষের শরীরে আঘাত করতো। এদের বলা হতো ভোর পাগল বা ঘোর পাগল বা ক্ষেপা পাগল। ক্ষেপা পাগল নিয়ে খুব ভয় ছিলো। যেকোনো সময় যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে দিতে পারতো। তাই তাদেরকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। তখন বলা হতো বান্ধা পাগল। পাগলিকে আমরা বলতাম পাগুল্লি। বর্গা গ্রামে এক ভোর পাগুল্লি ছিলো। বাড়ি থেকে দূরে রাস্তার ধারে ছোট্ট এক কুঁড়ে ঘরে তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। সেই ঘরে কোন বাতি ছিলো না। সেই পাগুল্লি সারাক্ষণ চিল্লাচিল্লি করতো সেই নির্জন কুঁড়ে ঘরে। বুবুদের বাড়িতে যাবার সময় রাতে তার চিল্লাচিল্লি শুনতে পেতাম। বুবুকে জিজ্ঞেস করেছি
– পাগুল্লিকে বাড়িতে রাখে না কেন?
– পাগুল্লির চিল্লাচিল্লিতে বাড়ির মানুষের ঘুম অয় না। তাই দুরের চড়া ক্ষেতে কুইড়া ঘর বানাইয়া দিছে থাকবার জন্য।
– পাগুল্লির অন্ধকার রাতে চড়া ক্ষেতে কুইড়া ঘরে ডর করে না?
– পাগলের আবার ডর আছে?
আমি সেই পাগুল্লির কষ্টের কথা ভুলতে পারিনা। আমজানি গ্রামেও এক ভোর পাগল ছিলো সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাকেও বেঁধে রাখতে হতো শিকল দিয়ে। আমি দেখেছি পালানের ক্ষেতে তাকে গরুর মতো করে বেঁধে রাখতে, যেনো হাচার দিয়ে রেখেছে। তার করুণ চাহনি আমাকে এখনো কষ্ট দেয়। রৌহা নানা বাড়িতেও নানার এক ভাই ভোর পাগল ছিলেন। তিনি সিজনাল পাগল হতেন। বছরে এক দু’মাস। সারাক্ষণ আবোল তাবোল বকতেন। মাঝে মাঝে ক্ষেপে যেতেন। তার ছেলেরা ধরে পিঠ মোড়া করে পুকুরে নিয়ে একশ একটা করে ডুব দেওয়াতেন। তাতে পাগলামি থেমে যেতো। সবাই মনে করতো পাগলের মাথা গরম হয়। পানিতে চুবাইলে মাথা ঠান্ডা হয়ে শান্ত হয়। আমি মনে করি, ডুব পারতে পারতে ক্লান্ত হয়ে পাগলারা শান্ত হয়ে যেতো। এই ধরনের চিকিৎসা ছিলো পাগলদের প্রতি নিষ্ঠুরতা। একবার এই নানাকে বারান্দার খামের সাথে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল। নানা বারান্দার চালে উঠে বসেছিলেন। তার স্ত্রীর কাছে এক গ্লাস পানি চান। নানী ভয়ে পানি দিয়ে আসেন বারান্দার মেঝেতে। কিন্তু নানা আবদার করেন তার হাতে পানির গ্লাস তুলে দিতে। নানি মায়া করে যেই পানির গ্লাস হাতে তুলে দিচ্ছেন অমনি নানির চুলের মুঠি ধরে টান মেরে চালে তুলে ঘার মটকে দেন। মার কাছে এই ঘটনা শোনার পর আমি এই নানাকে দেখে খুব ভয় পেতাম। একদিন দুই ঘরের চিপা রাস্তা দিয়ে আমি আসছিলাম। হটাৎ সামনে পড়লেন সেই নানা। আমার আত্মা শুকিয়ে গেলো। নানা জিজ্ঞেস করলেন “এই তর নাম কি?” আমি কাপতে কাপতে বললাম “সাদেক আলী।” নানা বললেন “তর ভাইর নাম কি?” বললাম “আকবর আলী।” নানা “আকবর আলী, সাদেক আলী” স্লোগান দিতে দিতে পুকুরের দিকে চলে গেলেন। তিনি সারাদিন সারারাত এই দুই নাম জপলেন। একই কথা বারবার বলতে থাকা পাগলের লক্ষণ। তিনি একবার সারারাত জপলেন “আল্লাহর নাম হয়না যেন ভুল, মওলা দিনের রসুল।” কোন একটা হাটে সেই নানাকে পাবলিক বুঝতে না পেরে বেদম নির্জাতন করে। তারপরই মর্মান্তিক ভাবে তার মৃত্যু হয়।
আমাদের বাড়ির দক্ষিণে চন পাড়ার আজগর ভাই প্রতিবছর বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসে ভোর পাগল হতেন। সারা বছর ঝিম মেরে থাকতেন। গরম কাল এলেই তার পাগলামি ভার হতো। দা, বটি নিয়ে মানুষকে মারতে যেতেন। সবাই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিতো। আমরা দৌড়ে যেতাম তামাশা দেখতে। তাকে বাগে আনতে খুব ব্যাগ পেতে হতো। তিন চার জন যুবক দিয়ে তাকে ধরে কুয়ার পাড়ে নিয়ে ঠিলার পানি মাথায় ঢেলে ঢেলে মাথা ঠান্ডা করা হতো। আমি মনে করি অতিরিক্ত পানি ঢালার কারনে শরীর অবসন্ন হয়ে পাগলামি কমে যেতো। আজগর ভাইর জন্য মায়া হয়।
আমি যখন এমবিবিএস থার্ড ইয়ারে পড়ি তখন মেডিসিনের অংশ হিসেবে কিছুদিন মনোরোগ বিভাগে ক্লাস করেছি। ওখানে গিয়ে বেশ কিছু পাগল দেখার সৌভাগ্য হয়। ক্লাসটি ছিলো ক্লিনিক্যাল। এধরণের ক্লাসে একজন রোগী নিয়ে স্যারগণ পড়ান। যে রোগী নিয়ে স্যার পড়াচ্ছিলেন সেই রোগী আমাদের এক ক্লাসমেট মেয়েকে তার ছেলের বউ মনে করে নানান কথা বলতে লাগলেন এবং বউ মা, বউ মা করে ডাকতে লাগলেন। ক্লাসমেট ক্লাসে অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। স্যার বললেন “এটা মানসিক রোগের লক্ষণ প্যারাময়েড ইলুশন। সে এই মেয়েকে তার ছেলের বউয়ের মতো দেখছে। তার দোষ না। সে এমন দেখছে। মানসিক রোগের আরেকটা লক্ষণ হলো হ্যালুসিনেশন। এতে এখানে যা উপস্থিত নেই তা দেখা, শোনা বা অনুভব করা। ধরো, লোকটার ছেলের বউ এখানে নেই। আমরা তাকে দেখতে পারছি না। কিন্তু সে তাকে দেখতে পারছে, তার সাথে কথা বলছে। এই জন্য পাগলেরা একা একা কথা বলে, একা একাই হাসে, কাঁদে।
মেডিকেল কলেজে শিক্ষকতা করার আগে আমি উপজেলা লেভেলে চাকরি করেছি। প্রথম একবছর ছিলাম বরিশালের এক গ্রামের সাবসেন্টারে। তারপর আড়াই বছর নকলা উপজেলা হাসপাতালে। বিকেল বেলা প্রাক্টিস করতাম। গ্রামে গ্রামে কলেও যেতাম। হাসপাতালে ভর্তিযোগ্য রোগী হাসপাতালে যেতে অপারগ হলে রোগীর বাড়ির বাংলা ঘরকে হাসপাতাল বানিয়ে চিকিৎসা দিতাম। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে যেভাবে চিকিৎসা করতে শিখেছিলাম সেভাবেই চিকিৎসা দিতাম। এভাবে অনেক ধনুষ্টংকার, এক্লাম্পসিয়া, এনক্যাফালাইটিস ইত্যাদি জটিল রোগের চিকিৎসা গ্রামেই করে ফেলেছি। তিন কিলোমিটার দূরে থেকে একটা কল এলো। তারা আমাকে রিক্সা দিয়ে নিয়ে গেলো। রোগী চেয়ারম্যান সাবের চাচাতো ভাইয়ের ছেলে। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে অনার্স পড়ে। ইউনিভার্সিটির হল থেকে রিক্সা ভাড়া করে নকলার গ্রামের বাড়িতে এসেছে আনুমানিক দু’শ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে। কিন্তু কেনো? কেউ বলতে পারছে না। ছেলেটি বাড়ি এসে অনবরত আবোল তাবোল কথা বলে যাচ্ছে। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে তখন এরশাদ বিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলছিলো। নেতাদের ভাষন তার ব্রেইনে গেঁথে গেছে। অনবরত সেসব ভাষন দিয়ে যাচ্ছে কারো দিকে না তাকিয়ে। চেয়ারম্যান সাব ঘুমিয়েছিলেন। তাকে ডেকে আমার কাছে এনে বসানো হলো। বুজতে পারলাম চেয়ারম্যান ব্যাপারটা তেমন জানেন না। চেয়ারম্যানের সাথে দু’চার কথা আলাপ হলো। রোগীকে কাছে নিয়ে আসতে বললাম। রোগী এসে সালাম দিয়ে এক হাত বাড়িয়ে দিলেন নেতার স্টাইলে হ্যান্ড সেইক করার জন্য। চেয়ারম্যান হাত বাড়ালেন না। আমার দিকে হাত বাড়ালে আমি হ্যান্ড সেইক করলাম। ছেলেটি “ডাক্তার স্যাব আমি একটু বাথরুমে যাবো” বলে বেড়া দেয়া টিউবওয়েল পাড়ের দিকে চলে গেলো। চেয়ারম্যান উচ্চারণ করলেন “বেয়াদব ছেলে!” হাত বাড়িয়ে হ্যান্ড সেইক করার একটা আদব আছে। সালাম বা আদাব বা নমস্কার বিনিময়ের পর হ্যান্ড সেইক করার জন্য সাধারণত বড়রা ছোটদের দিকে হাত বাড়িয়ে দেবে। ছোটরা আগে হাত বাড়াবে না। তাই, চেয়ারম্যান ছেলেটাকে বেয়াদব বলেছেন। আমি আরও অনেক্ষণ চেয়ারম্যানের সাথা গল্প করে কাটালাম। তার পিত্তে পাথর আছে। মাঝে মাঝে তীব্র ব্যাথা হয় এসব জানালেন। সেই ব্যাথা প্যাথেডিন ইঞ্জেকশন ছাড়া কমেনা তাও জানালেন। প্রায় এক ঘন্টা কেটে গেলো ছেলেটা আসছে না টিউবওয়েল পাড় থেকে। সমানে গায়ে পানি ঢালছে আর পেচাল পাড়ছে। কেটে গেল প্রায় দেড় ঘন্টা। বার বার তাকিদ দিলাম রোগী নিয়ে আসার জন্য। শরীরে পানি ঢালতেই লাগলো। আমার ডাক্তারি ব্যাগে সব সময় কিছু ইমার্জেন্সি ঔষধ রাখতাম। তারসাথে ক্ষেপাপাগলকে পুশ করার জন্য একটা ইঞ্জেকশনও ছিলো। নিরুপায় হয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম একটা মেরে দেই। চারজন তাগড়া যুবককে বুজিয়ে বললাম “আমি এর গায়ে পুশ করার জন্য একটা ইঞ্জেকশন ভরে রাখবো। আমি চোখ ইশারা দেয়ার সাথে সাথে একযোগে তাকে চেপে ধরবেন। সেকেন্ডের মধ্যে পুশ করে দেব ইঞ্জেকশন। কয়েক মিনিটের মধ্যে শান্ত হয়ে যাবে মাথা। যেই কথা সেই কাজ। কিছু খাওয়ার ট্যাবলেট প্রেস্ক্রিপশন করে দিয়ে চলে এলাম বাসায়। পরদিন সকালে একজন লোক সাথে নিয়ে সেই পাগলা ছেলেটি এলো আমার কাছে। একদম সাভাবিক কথা-বারতা ও আচরণ। তার নতুন সমস্যা ছিলো হাতের আঙ্গুল কাপছিলো। বুজতে পারলাম ইঞ্জেকশনের সাইড ইফেক্ট হয়েছে। তার জন্য ঔষধ লিখে দিয়ে বললাম “এবার সব ঠিক হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
একদিন আমার চেম্বারের সামনের বারান্দা দিয়ে চেম্বারের দিকে যাচ্ছিলাম। একজন লোক একাকি চুপ করে বসেছিলো চেয়ারে। অন্য রোগীরা ছিলো ওয়েটিং রুমে। আমি লোকটার সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। তাকে ক্রস করার সাথে সাথে জোড়ে আমার পায়ে একটা লাথি মারলো যে আমার আত্মা ধরে গেলো। আমি তারাতাড়ি রুমে ঢুকে পড়লাম। খোঁজ নিয়ে জানলাম যে লোকটা ভোর পাগল। পায়ে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব হলো। আমি যে লাথি খেয়েছি তা কাউকে বললাম না। বললে অপমানিত হতাম। শুধু বললাম পাগল রোগী তাড়াতাড়ি বিদায় করে দাও যে কাউকে লাথি মারতে পারে। সেই আঘাত সারতে আমার এক সপ্তাহ লেগেছিলো।
একদিন আমি ফজলু মুন্সিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম “আপনারা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চেম্বারের সাথে ফার্মেসিতে বসেন। পাগল রোগীরা উৎপাত করে না?” তিনি বললেন “রোগী তেরিবেরি করলে দুইতিনজনে চাইপ্পা ধইরা একটা ইঞ্জেকশন মাইরা দেই। সব ঠান্ডা অইয়া যায়। স্যারেই বইলা দিছে এই ইঞ্জেকশন দিতে।” হাসপাতালের মানসিক রোগীদের ওয়ার্ডেও সব রোগী খোলামেলা আছে। কেউ কাউকে আঘাত করে না। সবই ঐ ঔষধের গুণে।
একবার এক মানসিক রোগীর বাবার সাথে আমার আলাপ হলো। রোগী ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু পাগল। তাই তাকে পরিবার থেকে পৃথক রাখতে হয়। চার তলা বাড়ির নিচতলার এক পাশের একটা ফ্লাটে একাই সে থাকে দরজা জানালা বন্ধ করে। নিজের খাবার নিজেই রান্না করে খায়। বাবার কাছ থেকে মাস মাস টাকা নেয় খরচ করার জন্য। এতে কোন অসুবিধা নেই। অসুবিধা হলো হঠাৎ করে তার ছোট ভাইটার মুখের মধ্যে একটা ঘুষি মেরে দিলো। বা ঘরের জিনিসপত্র ভাংতে শুরু করলো। এমন অবস্থা হলে প্রাইভেট মানসিক হাসতালে ভর্তি করে রাখতে হয়। একটানা ৪০ দিন বা ৫০ দিন করে রাখতে হয়। প্রতিদিন ৪ হাজার টাকা করে ভাড়া দিতে হয়। লাখ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে চিকিৎসা করে। ভালো হয়ে বাড়ি ফিরে আসে কিন্তু আবার যেতে হয় হাসপাতালে। কারন, বাড়ি এসে সে ঔষধ সেবন করে না। আমি জিজ্ঞেস করলাম
– হাসপাতালে নেন কিভাবে?
– হাসপাতালে যেতে চায় না। তারা পিক আপ নিয়ে আসে। চারজন ইয়া মোটা তাগড়া জোয়ান কপ করে ধরে পিকআপে করে নিয়ে যায়।
– আপনার ছেলের জন্য মায়া লাগে না?
– মায়া লাগে। কি করবো? যদি বড় কোন অঘটন ঘটিয়ে ফেলে তাই পাঠাতে হয়।
– তাগড়া জোয়ান লোকেরা হাসপাতালে নিয়ে চিপা মাইর মারে না তো?
– মারতেও পারে। মারলে পাগলের কথা কি কেউ বিশ্বাস করবে? তারা যেভাবে শান্ত করে রাখতে পারে পারুক। ছেলেটা নিয়ে আমরা বড় পেরেশানিতে আছি।
সম্প্রতি একটা মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেছে অনুমোদনহীন এক মানসিক হাসপাতালে। খবরে দেখলাম সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারন করা একটা ভিডিও। জানা গেছে যে বিসিএস পাস এক পুলিশ কর্মকর্তা মানসিক অসুস্থতার জন্য উক্ত হাসপাতালে যান। সেখানে গিয়ে নাস্তাও করেন। নাস্তা করার পর তিনি ওয়াসরুমে যেতে চান। হাসপাতালের ওয়ার্ডবয় জাতীয় কিছু তাগড়া জোয়ান ছেলে, ৮ জনের মতো হবে, তাকে নিচ তলা থেকে তিন তলায় নিয়ে যায়। রোগীর সাথে আসা তার সহোদর বোনও একজন ডাক্তার নাম নিচেই বসা ছিলেন । তিনি মনে করেছেন ভালো টয়লেটে নিয়ে যাচ্ছে উপর তলায়। ভিডিওতে দেখা গেলো ঐ যুবকরা তাকে ছোট এক সাউন্ড প্রূফ কক্ষে ঢুকানোর চেষ্টা করছে। তিনি প্রবেশ করবেন না। তাই তারা টেনে হিছড়ে ভেতরে নিয়ে চেপে ধরছে ও কনুই দিয়ে বুকে আঘাত করছে। এক সময় চিত করে শোয়ানো হলে সেই পুলিশ অফিসার নিস্তেজ হয়ে যায়। ধস্তাধস্তি করার সময় পুলিশ অফিসার প্রস্রাব করে দেন মেঝেতে যার জন্য তিনি ওয়াসরুম খুজছিলেন। তারা ক্লিনার ডেকে প্রস্রাব পরিস্কার করায়। মুখে পট থেকে পানি নিয়ে খেতে দেয়। নাকে মুখে পানি ছিটায়। ডাক্তার ঢাকে। নিচ তলা থেকে ডাক্তার এসে বাচানোর চেষ্টা করেন। শেষে ঘোষণা দেন রুগী মারা গেছে। কি মর্মান্তিক ঘটনা! কি রহস্যময় কারবার। কোন যুগে আছি আমরা?
১২/১১/২০২০
ময়মনসিংহ

Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

<script async src=”//pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js”></script>

<!– mobileads –>
<ins class=”adsbygoogle”
style=”display:block”
data-ad-client=”ca-pub-9696652946187583″
data-ad-slot=”4053143233″
data-ad-format=”auto”
data-full-width-responsive=”true”></ins>

<script>
(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

</script>

থাপ্পড় দিয়ে ঠিক করা

থাপ্পড় দিয়ে ঠিক করা

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

কোন কিছু নষ্ট হলে মেরামত করতে হয়। কম্পিউটারের সফটওয়্যার প্রোগ্রামও নষ্ট হলে মেরামত করতে হয়। ইংরেজিতে বলা হয় ফিক্স করা। আমাদের গ্রামে ছোট বেলায় দেখেছি কোন পোলাপান দুষ্টুমি করলে বড়রা ভয় দেখায়ে বলতেন “থাপ্পড় মাইরা সই কইরা ফালামু।” এখানে সই করা মানে হলো ঠিক করে ফেলা। থাপড়াইয়া অনেক কিছু ঠিক করা যায়। আমরা যখন নতুন ডাক্তার হয়েছি তখন দেখেছি সন্তান জন্মগ্রহণের পর পরই নবজাতককে কাঁদাতে। যেসব বাচ্চা কাঁদতে দেরি করতো তাদের দু’পা ধরে মাথা নিচুর দিকে দিয়ে পিঠের উপর হালকা থাপ্পড় মারতেন ডাক্তাররা। এটাই নিয়ম ছিলো। বাচ্চাকে থাপড়াইয়া কাঁদাতে হবে। বাচ্চা কাঁদা মানে তার স্বাস নালী পরিস্কার আছে। এখন নাকি এই পদ্ধতি নেই।

খুব ছোট বেলা থেকেই আমরা রেডিও শুনতাম। ড্রাই সেল ব্যাটারি দিয়ে রেডিও বাজানো হতো। ব্যটারির মাথা ঠিক মতো না বসালে অথবা ভেতরে স্পিকারের সাথে তারের সংযোগের ত্রুটি থাকলে রেডিও বাজতো না। বাজলেও আবার ভেড় ভেড় ঘেড় ঘেড় শব্দ করতো। রেডিওর পেছনে থাপ্পড় দিলে অনেক সময় শব্দ পরিস্কার আসতো। বলা হতো “থাপ্পড় দিয়া রেডিও হজু কইরা ফালাইছি।” এখানে হজু করা মানে ঠিক করে ফেলা। রেডিও বাঁজিয়েছেন অথচ রেডিওকে থাপ্পড় দেন নাই এমন লোক কম আছেন। এখন রেডিও বাজাই না। থাপড়াইতেও হয় না।

আমি যখন মেডিকেলে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি তখন এক সন্ধায় স্টেশন রোডের দোকানে গিয়েছিলাম কিছু একটা কিনতে। সেখানে আমার আরও দু’জন বন্ধুও গিয়েছিলো কিছু কিনতে। দোকানে খুব ভির ছিলো। বন্ধু বার বার জিজ্ঞেস করছিলো “ভাই এটার দাম কতো।” দোকানী শুনতে পারছিলেন না। আরেক বন্ধু বললো “থাপ্পড় দিয়ে জিজ্ঞেস করো।” বলার সাথে সাথে সব দোকালিরা ক্ষেপে গেলো । বলতে লাগলো “এতো বড় কথা! থাপ্পড় মারতে চায়!” গন্ডগোল শুরু হয়ে গেলো। একসময় থেমে গেলে একজন জানতে চাইলেন যে থাপ্পড় মারতে চেয়েছেন কেনো। সে উত্তরে বললো “আমি কেন থাপ্পড় মারতে চাইবো? আমি বলতে চেয়েছিলাম দোকানীর দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য টেবিলে থাপ্পড় দিয়ে শব্দ করতে। আপনারা না বুঝেই হই চই শুরু করে দিলেন।”

একবার জোবেদ ভুইয়া বিল্ডিংয়ে একজন নাম করা ডাক্তার এসে চেম্বার নিয়ে বসলেন। তার একজন চেম্বার এসিস্ট্যান্ট প্রয়োজন হলো। কয়েকজন ছেলে আগ্রহ প্রকাশ করলো এসিস্ট্যান্ট হতে। কিন্তু একজন নাছোড়বান্দা ছেলে বেঁকে বসলো যে তাকেই এসিস্ট্যান্ট হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। ভুইয়া সাব রাজি না হওয়াতে ছেলেটি প্রতিদিন বিকেলে এসে চিল্লাচিল্লি করতো চেম্বারের সামনে। এভাবে তাকে পরপর তিন দিন ডিস্টার্ব করতে দেখেছি। তাকে আর না আসতে দেখে আমি ভুইয়া সাবকে জিজ্ঞেস করলাম

– ঐ ছেলেটির কি হলো। আর যে আসতে দেখি না?

– আর আসবে না। একটা থাপ্পড় মাইরা ঠিক কইরা ফালাইছি। তিন দিন ধৈর্য্য ধইরা দেখলাম। ঠিক হইলো না। শেষের দিন আমাকে দেখিয়ে চিল্লাচিল্লি করে আর বিল্ডিংয়ের ওয়ালে লাথথি মারে। আমার হাতের নাগালেই ছিলো। গালের মধ্যে এমন জোরে একটা থাপ্পড় মারছি যে ঘুরতে ঘুরতে ওয়ালে বারি খাইয়া পইরা গেছে। তারপর উঠে চইলা গেছে। আর আইবো না। এক থাপ্পড়েই ঠিক অইয়া গেছে।

কয়েক বছর আগে একটি এইচ পি ব্রান্ডের প্রোবুক ল্যাপটপ কিনেছিলাম। অপারেটিং সিস্টেম দেয়া হয়েছিল উইন্ডোজ ১০। কিন্তু প্রথম থেকেই ল্যাপটপ প্রোগ্রামে ডিস্টার্ব দিতে থাকে। নিজে ঠিক করতে না পেরে কম্পিউটার মেরামতের দোকানে নিয়ে গেলাম। সেখানকার নিয়ম হলো কেউ রুমের ভেতর প্রবেশ করতে পারবে না। তারা স্লিপ দিয়ে ল্যাপটপ জমা রাখবে। মেরামত করা হয়ে গেলে ফোন করা হবে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বড় টেনশনের কাজ। কম্পিউটারে কত কি প্রাইভেট জিনিস থাকে। সেগুলো যদি তারা কপি করে রেখে দেয়? তারপরও নিরুপায় হয়ে তাদের হাতে ল্যাপটপ দিয়ে এলাম। দুই ঘুরানি খাওয়ালো, টাকাও নিলো কিন্তু ল্যাপটপ হজু হলো না। শেষে বললো যে এটাতে উইন্ডোজ ১০ চলবে না। দিয়ে দিলো উইন্ডোজ ৮। এটা দিয়েই এতদিন চালালাম। সম্প্রতি বড় ঝামেলা শুরু করলো আমার কম্পিউটারে। কাজ করছি, কাজ করছি, হঠাৎ উইন্ডোজ হেল্প ফাইল অটো ওপেন হতে লাগলো শত শত বার। শেষে হ্যাং হয়ে থাকে কম্পিউটার। কি কারনে এমন হয় তা খুঁজে গুগল থেকে বের করে পড়তে লাগলাম এবং ইউটিউব থেকে দেখতে লাগলাম। অনেক ঘন্টা নষ্ট করলাম। কিন্তু হজু করতে পারলাম না। শপে নিয়ে গেলাম না, যদি তারা কিছু কপি করে নিয়ে রাখে? আমি সাক্কেস কম্পিউটারের জাকিরকে বিশ্বাস করি। টুকটাক সমস্যা হলে তার কাছেই যাই। ফোনে আমার সমস্যাটা জানালে তিনি উইন্ডোজ ১০ ইন্সটল করতে বললেন। আমি কয়েকঘন্টা চেষ্টা করে ইউন্ডোজ ১০ ইন্সটল করলাম। কম্পিউটার আরও ফাস্ট হলো কিন্তু আবার আগের সমস্যাটা দেখা দিলো। এই কাজটা জাকির বা অন্য কেউ করে দিলে হয়তো আমি তাদেরকে দোষারোপ করতাম। আমি জাকিরকে ফোনে জানালাম “এতো সময় ব্যয় করে উইন্ডোজ পাল্টালাম সমস্যাটা রইয়াই গেলো।” জাকির বললেন “স্যার, আমার মনে হয় আপনার ল্যাপটপের কিবোর্ড-এ ময়লা ঢুকেছে। একটু থাপ্পড় দিন ঠিক হয়ে যাবে। অনেক সময় কি বোর্ডের ফাঁক দিয়ে ময়লা ঢুকে বাটন শর্ট হয়ে থাকে। ফলে বার বার কি বোর্ড থেকে সিগনাল গিয়ে কমান্ড চলতে থাকে। একটু থাপ্পড় দিয়ে দেখুন, স্যার। ঠিক হয়ে যাবে।” আমার ছোট বেলার রেডিও থাপড়ানির কথা মনে পড়লো। ল্যাপটপের কি বোর্ড উপুর করে ধরে ডান হাত দিয়ে কয়েকটা থাপ্পড় মারলাম। তারপর থেকেই ঠিক। কাজ করেও আরাম পাচ্ছি আগের থেকে। ইচ্ছা করলে জাকির তার শপে নিয়ে আমার ল্যাপটপটাকে কয়েকটা থাপ্পড় দিয়ে ঠিক করে আমার থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু জাকির তা করবে না। জাকিরের জীবন সাক্কেস ফুল হউক। সাক্কেস কম্পিউটারের জাকির।

৬/১১/২০২০

ময়মনসিংহ

 

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/


নোনা ইলিশ

নোনা ইলিশ
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বাজারে দু’রকম ইলিশ পাওয়া যায়। একটা হলো নোনা ইলিশ, আরেকটা হলো তাজা ইলিশ। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন বর্ষা সিজন ছাড়া ইলিশ পাওয়া যেতো না। পদ্মা নদীতে ইলিশ ধরে মাঝিরা পাইকারের কাছে বিক্রি করতো। সেখান থেকে আমাদের এলাকার মাছ ব্যবসায়ীরা বরফ দিয়ে নৌকায় করে নিয়ে এসে বিক্রি করতো। পাহাড় ও ভর অঞ্চলের সংযোগ স্থলের হাটগুলো বর্ষাকালে জমতো বেশী। সবচেয়ে বেশী জমতো ইন্দ্রজানীর হাট। এই হাটে বেশ ইলিশ উঠতো। আখকে আমরা কুশাইর বলতাম। কুশার আমাদের এলাকায় হতো না। ইন্দ্রজানীর হাটে কুশাইর আসতো ভুয়াপুর -গোপালপুর এলাকা থেকে। বরফ দেয়া না হলেও ইলিশ তেমন পঁচতোনা। আর ইলিশ পঁচলেও দুর্ঘন্ধ না ছড়িয়ে বিশেষ এক একধরনের সুগন্ধ বের হয়। খেতেও ভালো লাগে। নদী থেকে ইলিশ ধরার পর কিছুক্ষণ ছটফট করে মারা যায়। ইন্দ্রজানীর হাটে থেকে কিন্তু আমরা মরা ইলিশ কিনতাম। বলতাম তাজা ইলিশ। পদ্মানদীতে জেলেরা প্রচুর ইলিশ ধরে। এতো ইলিশ তারা বরফে সংরক্ষণ করতে পারে না। তাই, ইলিশ চাক চাক করে কেটে তার ভেতর লবন ভরে দেয়া হয়। আমরা এগুলোকে কাটা ইলিশও বলি। লবন দেয়ার ফলে ইলিশ পঁচে না। অনেকদিন পরেও খাওয়া যায়। ইন্দ্রজানীর হাটে পাট বিক্রি করে এলাকার মানুষ ইলিশ কিনতো। পোলাপানদের জন্য কিনতো কুশাইর। কুশাইরের একদিকে সদাইর টোবলা আরেক দিকে ইলিশ ঝুলিয়ে কাঁধে করে নিয়ে যেতো বাড়িতে। কেউ কেউ শুধু কাটা ইলিশ, আবার কেউ কেউ তাজা ও কাটা ইলিশ দু’টাই নিতো। আমার একটা দৃশ্য এখনও মনে আছে। বাবা আমাদের জন্য এভাবে কাঁধে করে ইন্দ্রজানি হাট থেকে কুশাইরের একদিকে বিরাট এক তাজা ইলিশ এবং কাটা ইলিশ, আরেক দিকে সদাইর টোবলা নিয়ে এলেন। আমরা এগিয়ে গিয়ে কুশাইর নিয়ে নিলাম। দা দিয়ে কুপিয়ে খন্ড কন্ড করে দাঁত দিয়ে ছিলিয়ে কুশাইর খেলাম। টোবলার ভেতর পদ্মপাতায় পেঁচানো ছিলো জিলাপি। ইন্দ্রজানি হাটের বানানো জিলাপি। আমরা তখন বলতাম জিলাপা। হায়রে স্বাদের ছিলো সেই জিলাপা! কুশাইরা গুড়ের জিলাপা। টসটসে রসে ভরা ছিলো। মা রান্নাঘরের মেঝেতে বসে সেই তাজা ইলিশ কাটছিলেন। সেই ইলিশের বিশেষ ধরনের ঘ্রাণ ছিলো। বিরাট সাইজের কাটা ইলিশটা ছেতুকা দিয়ে বাঁকা করে বাধা ছিলো। সেটা ঝুলিয়ে রাখা ছিলো ঢেকির আরহলুইর সাথে। বেশীরভাগ সময় মা তাজা ইলিশ রান্না করতেন মোটা মোটা ডাটা দিয়ে। কাটা ইলিশ চাক চাক করে লবন সহ কাচের বৈয়ামে ভরে শিকের উপর রেখে দিতেন বৈয়ামের বুটুম টাইট করে লাগিয়ে। তাতে অনেক দিন এভাবে রাখা যেতো। যেদিন রান্না করার তেমন কিছু থাকতো না সেদিন কাটা ইলিশ বটুরি করে কেটে ডাটা বুঝুরির সাথে ভাজি করতেন। ভাজির সাথে আলাদা লবন দিতে হতো না। ইলিশের সাথে থাকা লবনেই হয়ে যেতো। কোন কোন সময় ডাটা মিশিয়ে ভাত খেয়ে ফেলতাম। ইলিশের টুকরো তুলে রাখতাম টিনের প্লেটের কিনারে। শেষে শুধু মাছের টুকরা একটু একটু করে ছিড়ে ছিড়ে খেতাম দেখিয়ে দেখিয়ে। আমি দেখাতাম ছোট বোন সোমলাকে। সোমলা দেখাতো আমাকে। দেশে পাকা রাস্তাঘাট হওয়াতে ইন্দ্রজানি হাট আর আগের মতো জমে না। আমিও শহরে থাকার দরূন হয়তো তেমন জানিনা। তবে শহরে থাকলেও নোনা ইলিশ আমি বাসায় আনি। চিচিঙ্গা ও কচি ডাটা দিয়ে নোনা ইলিশ আমি প্রায়ই খাই। আমার স্ত্রী স্বপ্নাও পছন্দ করে নোনা ইলিশ।

১৯৮৮-৮৯ সনে বরিশাল ছিলাম। সেখানে আমি দেখেছি নদী থেকে আসলেই তাজা ইলিশ ধরতে। নৌকার পাটাতনে পুটিমাছের মতো ছটফট করতে দেখেছি। আর আমরা মরা পঁচা ইলিশকে বলি তাজা ইলিশ। এই ইলিশ ওখানে খুব সস্তা ছিলো। কিন্তু সেগুলো ইন্দ্রজানি হাটের ইলিশের মতো স্বাদ লাগতো না। ওদের সাথে আলাপ করতে গিয়ে বলি যে আমরা এমন নোনা ইলিশ খাই। ওরা বলাবলি করতো “ময়মনসিংহের মানুষ নাকি পঁচা ইলিশ খায়। ওদের হাটে আমি নোনা ইলিশ দেখিনি।

একবার বাকেরগঞ্জের বাস খুজতে কীর্তন খোলা নদীর পার ধরে একটু পেছনের দিকে গিয়েছিলাম। দেখলাম এক লোক বসে বটি দিয়ে তাজা ইলিশ মাছ গ্যাচগ্যাচি কেটে লবন মেখে ছুড়ে মারছেন। তাতে প্রতিটি ইলিশ কেটে লবন লাগাতে সময় লাগছে ১০-১২ সেকেন্ড। এত দ্রুত কাজটি করছেন। ইলিশ মাছগুলো খেরের পালার মতো স্তুপ হয়ে বসে যাচ্ছে। অভিজ্ঞতা হলো কিভাবে কাটা ইলিশ বানায়।

গত দু’বছর আগে শহরের বাজারে গেলাম নোনা ইলিশ কিনতে। এক দোকানী দেখলাম নোনা ইলিশ চাকা ধরে বিক্রি করছেন। আমি এত বড় ইলিশের চাকা দেখিনি। আমি জিজ্ঞেস করলাল এমন বড় ইলিশ আস্ত আছে কিনা। তিনি বললেন
– এত বড় ইলিশের দাম অনেক। কেউ নিতে চায় না। তাই চাকা ধরে নোনা ইলিশ বিক্রি করছি।
– এতো বড় তাজা ইলিশও তো দেখি না।
– এগুলো পদ্মা নদীর ইলিশ। ইন্ডিয়া চলে যায়।
– আমি কোলকাতার ধানসিঁড়ি হোটেলে খাওয়ার সময় ইয়া বড় একটা ইলিশের পিস নিয়েছিলাম। সরিষা-ইলিশ। খুব স্বাদের ছিলো সেই ইলিশ।
– সাব, নোনা ইলিশের এই পিসটা নিয়ে যান খুব স্বাদ পাবেন। ইলিশ যত বড় হবে স্বাদ তত বেশী হবে।
– এই পিসটার দাম কত?
– সাব, এটার দাম ৫০০ টাকা। আপনি নিলে ৪৫০ টাকা, এক দাম।
– এক টুকরো ইলিশের দাম ৪৫০ টাকা? ১৫০ টাকায় তো আস্ত ইলিশ কেনা যায়।
– কি যে কন সাব? ১৫০ টাকায় ইলিশ পাবেন না, ঝাটকা পাবেন।
– ঠিক আছে। বাদ দেন সব কথা। কত হলে দেবেন?
– বিশ্বাস করুন, খোদার কসম এই টুকরাটা বেচলে আমার লাভ অবো মাত্র ১০ টাকা। বিশ্বাস করে নেন। খাইয়া দেখুন মাছটা।
– কিন্তু আপনিতো আমাকে ঠকাচ্ছেন।
– আল্লাহর কসম। বিশ্বাস করুন।

লোকটাকে দেখে ধার্মিক মনে হলো। মাথায় টুপি আছে, লম্বা দাড়ি আছে। বিশ্বাস করে ৪৫০ টাকা দিয়েই নোনা ইলিশের পিসটি নিলাম। মাছ নিয়ে ঘুরে রওনা দেয়ার সাথে সাথে লোকটা গেয়ে উঠলেন “আল্লাহ, মাফ করে দাও, ক্ষমা করে দাও।” শুনে কেমন যেনো মনে হলো লোকটি আমাকে ঠকিয়ে আল্লাহর কাছে গানের সুরে সুরে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছেন। আমি ঘুরে দাড়ালাম। লোকটা অন্য দিকে ঘুরে আবার গাইলেন “মাফ করে দাও, ক্ষমা করে দাও।” মানুষের প্রতি অবিশ্বাস না থাকাই ভালো ভেবে নোনা ইলিশের পিস নিয়ে চলে এলাম।
৪/১১/২০২০ খ্রি.
ময়মনসিংহ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/


তিন চাচী ও কিছু আপনজনের স্মরণে

তিন চাচী ও কিছু আপনজনের স্মরণে

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমার সবচেয়ে কাছের চাচী এবার মারা গেলেন। তাও আবার করোনাকালে। জানাজায় যেতে পারলাম না। এক বছরের মধ্যে তিন চাচী মারা গেলেন। এবার আরও অনেকজন আত্নীয় ও প্রিয়জন মারা গেছেন। তবে আজ আমি বিশেষ করে আমার মার ঘনিষ্ঠ বন্ধবী যে চাচী ছিলেন তাকে নিয়ে কিছু কথা লিখবো। তিনি হাছেন কাক্কুর স্ত্রী, হবির মা, মামুনের দাদী।

 

এবার করোনায় আমার খুব কাছের বড় ভাই, ৫ বছরের সিনিয়র, এম-১২ নং ব্যাচের প্রফেসর আনিসুর রহমান ভাই মারা যান করোনা হয়ে করোনার প্রথম দিকেই। তারপর মারা যান আমার ৪ বছরের সিনিয়র রাজু ভাই। একই হোস্টেলে থাকতাম। টাঙ্গাইলের রাজু ভাই। তিতাসের এম ডি না কি যেনো ছিলেন। করোনা হয়ে মারা গেলেন। আমারই ক্লাস মেট এম-১৭ ব্যাচের বন্ধু জহিরও মারা গেলো করোনা হয়ে। এক বছরের সিনিয়র, কচুয়ার আব্দুল্লাহ স্যারের ছেলে সাইফুল ভাইও এবার মারা গেলেন করোনা হয়ে। কতো যে ভালো বাসতেন আমাকে! আমাদের মুকুল যে হার্ট এটাক হয়ে মারা গেলো তারও কিন্তু প্রথম করোনা হয়েছিলো। করোনা নেগেটিভ হওয়ার কিছুদিন পর তার হার্ট এটাক করে। করোনায় এমন অনেক আপন জন মারা গেছে। মকুল মারা যাবার মাত্র ৪ দিন আগে আমার আরেক প্রিয় চাচাতো ভাই সাইফুলও মারা গেলো রক্তশুন্যতা হয়ে। এক বছর ধরে বার বার মৃত্যু সংবাদ শুনতে হয়েছে আমাকে।

 

তালুকদার বাড়ির সবার বড় বোন নূরজাহান বুবুর স্বামী, আমাদের প্রথম দুলাভাই ছোট চওনার মজিবুর রহমান, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আমাদের কাকরাজান ইউনিয়ন পরিষদ, মারা গেলেন এই বছরের প্রথম দিকেই। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। নুরজাহান বুবুর ছোট বোন হলো নাজমা। তার স্বামী হাতেম খাও মারা গেলো গত ঈদুল ফিতরের পর। আমার সাথে তার বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিলো। আমার আপন চাচা ভিয়াইল থাকতেন। তার মেয়ে, আমার চাচাতো বোন শেফালী অল্প বয়সেই বিয়ে হয়েছিল আমি যখন ক্লাস সিক্স বা সেভেনে পড়তাম। সে আমার থেকে অল্পদিনের ছোট ছিলো। দূরে থাকার জন্য তাকে আর বেশী দেখিনি। এবার ময়মনসিংহ আসে অসুস্থ হয়ে। চিকিৎসায় ভালো হয়ে যায়। অল্প কিছুদিন পরই আবার আসে স্ট্রোক করে অজ্ঞান হয়ে। এসে মারাই গেলো আমার চোখের সামনে।

 

এই এক বছরের মধ্যে তিন চাচী মারা গেলেন। আমরা চাচাকে কাক্কু ও চাচীকে কাক্কি ডাকি। আবুল কাশেম তালুকদার যাকে আমরা মিয়া কাক্কু ডাকতাম তার স্ত্রী, মানে কাদেরের মা এই এক বছরের মধ্যেই মারা গেছেন স্ট্রোক করে। খুব হাসি খুশি ছিলেন সেই কাক্কি। আমরা ডাকতাম নয়া কাক্কি বলে। কাক্কির বড় বোন ছিলেন কুলসুম বুবুর মা। কুলসুম বুবুর জন্মের পরই সেই কাক্কি মারা গেলে সেই কাক্কির ছোট বোনকে মিয়া কাক্কু বিয়ে করেন। তাই নয়া কাক্কি ডাকা হতো। তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমাদের কাছে নয়া কাক্কিই ছিলেন। কাক্কি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। আমি কাক্কিকে কারো সাথে রাগারাগি করতে দেখিনি। নয়া কাক্কির বড় ছেলে শাজাহানের বয়স ছিল আমার থেকে সামান্য বেশী। আমার নিত্যদিনের খেলার সাথী ছিল সে। সেও ট্রাক্টর এক্সিডেন্টে মারা গেছে আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়তাম, সেই ১৯৭৩ সনে। খেলার সাথীর মা হওয়াতে কাক্কিও আমাকে অনেক স্নেহ করতেন। কাক্কির বাবার বাড়ি ছিলো মাইজবাড়ি। কাক্কির বাবার নাম ছিলো ঠান্ডু। আমরা কাক্কিকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতাম “আইজকা খুব ঠন্ডা নাগতাছে ।” কাক্কি মনে করতেন কাক্কির বাপের নামকে ব্যাঙ্গ করা হচ্ছে । কাক্কি “এই জাউরা” বলে হেসে হেসে ঢলে পড়তেন। কাক্কির এই হাসিটা দেখার জন্য ঠান্ডা কথাটা উচ্চারণ করতাম। কাক্কির হাসি যদি কেউ দেখতো অনেক্ষণ পর্যন্ত মন ভালো থাকতো তার। কাক্কির উদরের বড় ছেলে শাজাহানের খেলার সাথী ছিলাম বলেও কাক্কির বেশী বেশী আদর পেয়েছি। মারা যাওয়ার প্রায় এক বছর আগে কাক্কির সাথে একটা ছবি তুলেছিলাম। কাক্কিদের ঘরের সামনের সিড়ির সাথে কংক্রিটের বেঞ্চিতে মাঝখানে আমি বসেছিলাম। আমার দু’পাশে দুই কাক্কি হবির মা কাক্কি আর নয়া কাক্কি বসেছিলেন। দু’জনেই খুশী খুশী ছিলেন ছবি তোলার সময়। এমন একটা ভালো কাক্কি এক বছরের মধ্যেই চলে গিয়েছেন পরপারে।

 

আমাদের তালুকদার বাড়ির সবচেয়ে বড় চাচী, সোলায়মান তালুকদার মাস্টারের স্ত্রী, রাজ্জাকের মা মারা গেছেন সম্ভবত এ বছর জানুয়ারির দিকেই। এই কাক্কির বাপের বাড়ি ছিল গোহাইল বাড়ি। নানার নাম ছিল খুব সম্ভব চান মামুদ। আমরা কাক্কিকে কোন কোন সময় ঠাট্টা করে চান্দের মেয়া বলতাম। কাক্কির উদরের বড় ছেলে রাজ্জাক আমার থেকে বয়সে সামান্য ছোট। একসাথে খেলতাম, একসাথে বেড়াতাম, একসাথে স্কুলে যেতাম। প্রথম দিকে খেলার সাথী ছিল মজি ভাই, শাজাহান ও রাজ্জাক। তারপর মুকুল তারাতারি বড় হয়ে গেলে সেও খেলার সাথী হয়ে যায়। রাজ্জাককে যখন কাক্কি খাওয়াতেন তখন আমি রান্নাঘরের ঢেকির উপর বসে অপেক্ষা করতাম। খাওয়া শেষ হলেই খেলতে চলে যেতাম। রাজ্জাকের খেলার সাথী হিসাবে কাক্কি আমাকেও খুব স্নেহ করতেন। আদর করে গেঁদা ডাকতেন আমাকে। কাক্কির সারা শরীরে লাল লাল চাক্কা দাউদ ছিলো। সারাক্ষণ চুলকাতেন। গরমের দিনে বেশী হতো। হাতের নোখেও ছিলো। কাক্কির এই সমস্যার জন্য আমার কাক্কির জন্য কষ্ট হতো। এটাতে কাক্কি টোটকা মলম টলম লাগাতেন। কিন্তু নিচুইটা ভালো হতো না। আমি ডাক্তার হয়ে প্রথম চিকিৎসা করেছি কাক্কির এই দাউদ। আমি একটানা দেড় মাস কাক্কিকে ঔষধ খাইয়েছি। দাউদ ভালো হয়ে যায়। চান্দের মেয়ে চান্দের মতোই চেহারা ছিলো। দাউদ পরিস্কার হয়ে চান্দের মতোই হয়ে যায়। কাক্কি খুব খুশী হন। আমি চিকিৎসা করে খুব তৃপ্তি পাই। কাক্কি হজ্জ করেছিলেন। হজ্জের অভিজ্ঞতা অনেক শেয়ার করেছেন আমাদের কাছে। কাক্কির সন্তানরা সবাই শহরে সেটলড হয়েছেন। তাই বাড়িও নেই গ্রামে। এসে যখন এবাড়ি ওবাড়ি বেড়াতেন আমার খুব খারাপ লাগতো। এই চাচী এই তালুকদার বাড়ির বড় বউ ছিলেন। সেই চাচীও এবার স্ট্রোক করে মার গেলেন ।

হাছেন কাক্কুর শশুর বাড়ি বড় চওনা চৌধুরী বাড়ি। কাক্কির বাবার ডাক নাম ছিলো সোনাউল্লাহ চৌধুরী। কাক্কির প্রথম মেয়ের নাম ছিলো হাজেরা। আমি হাজেরা বুবুকে দেখেনি। আমাদের লাইলি বুবুর সমান বয়স ছিলো। এখনো বুবু বলেন হাজরাগ বাড়ি গেলাম। হাজরা বুবুর পর ভানু বুবু। তারপর মজি ভাই। তারপর মনো। আমি মজিভাইর ছোট ও মনোর বড়। আমরা দল বেঁধে মজি ভাইগ ঘরে পলান পলান খেলতাম। তখন পাঁচ কাক্কু একই বাড়িতে থাকতেন। মাঝখানে ছিলো বিরাট উঠান। কাক্কুরা যার যার ঘরের সামনে বসে ফজরের নামাজ পড়ে উচ্চস্বরে কোরআন পরতেন। কাক্কিগ উগারের মাঝখানে একটা গোল প্রবেশ পথ ছিল। এখানে পলায়ে টুক্কু দিতাম। ডোলের ভেতর পালিয়েও টুক্কু দিতাম। কাক্কির রাইংগভর্তি পাকা কলা ছিল। একদিন আমরা পলান পলান খেলার সময় ডোলের ভেতর বসে সব কলা খেয়ে ফেলেছিলাম। জেনেও কাক্কি বেজার হননি। কাক্কির চেহারা আর আমগ মার চেহারা খুবই সুন্দর ছিলো। দু’জনের মধ্যে খুবই খাতির ছিলো। মা সময় পেলে কাক্কির রান্নাঘরে বসে আলাপ করতেন। কাক্কির সময় হলে মার সাথে আমাদের রান্নাঘরে বসে বসে আলাপ করতেন। হাছেন কাক্কু বাবার থেকে সামান্য বয়সে বড়। তাই, কাক্কিকে মা বুঝি ডাকতেন। কাক্কি মাকে ডাকতেন নাইলির মাও বলে। বাবাকে ডাকতেন নাইলির বাপ বলে।

 

আমার যেবছর মুসলমানী হয় সে বছর আমার নিজের নানী মারা যান মুসলমানীর দু’এক দিন পরই। মা আমাকে রেখে রৌহা নানীগ বাড়ি চলে যান। বাড়িতে ছিলাম আমি আর বাবা। বাবার রান্না করার কোন অভিজ্ঞতা ছিলো না। ভর্তাভাত রান্না করতে পারতেন। আমি আবার ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে পারতাম না। তাই বাবা ক্ষেত থেকে বেগুন তুলে লম্বা করে কেটে লবন পানি দিয়ে সেদ্ধ করেছিলেন ছালুন হিসাবে। কারন, ছালুন হলে সামান্য চারটে ভাত খেতে পারতাম। এমন সময় কাক্কি এলেন আমাদের রান্না ঘরে। চুলার পারে গিয়ে “দেখি, নাইলির বাপে কি রানছে” বলে পাইলচাপনি উচু করে ছালুন দেখে মুসকি হাসলেন। বললেন “এইডা ছালুন অইছে? মনে অইতাছে বেগুন সিদ্ধ।” বাবা বললেন “সাদেক ছালুন ছাড়া খেতে পারে না, তাই বেগুনের ঝোল রানছি।” কাক্কি ওর মধ্যে কিছু মসলা মিশিয়ে ছালুন রেঁধে দিলেন। এরপর বুবু এলেন তার শশুরবাড়ি আমজানি থেকে। বুবুই রান্না করে দিলেন ছালুন। মুসলমানী করার সাত দিনের দিন গোসল করানো হয় বিয়ের গায়ে হলুদের মতো আনন্দ করে। বুবু ও কাক্কি আমাকে কাপড় কাঁচার ফিড়াতে (পিড়ি) দাঁড় করিয়ে গোসল করালেন। অন্যান্য বাড়িতে মুসলমানীর ৭ দিনের দিন খুব আনন্দ ফুর্তি হতো। গ্রামোফোন রেকর্ডের গান মাইকে বাজানো হতো। কিন্তু তালুকদার বাড়িতে এসব নিষেদ ছিল। মুসলমানির উৎসবে অন্যরা বিভিন্ন রকম উপহার সামগ্রি দিতো। আমাদের বাড়িতে উৎসব না হলেও বুবু আমাকে গোসল করায়ে একটি কাশার গ্লাস উপহার দেন। সেই কাশার গ্লাসটি অনেক বছর আমাদের বাড়িতে ছিলো। আমি কাশার গ্লাসে পানি খেতাম না। আমি পানি খেতাম ফটিকের গ্লাসে। কাঁচের গ্লাসকে আমরা ফটিকের গ্লাস বলতাম। খুব সম্ভব স্ফটিক থেকে ফটিক হয়েছে। যখন গ্রামে বিদ্যুৎ ছিলো না তখন ইসতিরির ভেতর কয়লা জালিয়ে ইসতিরি গরম করা হতো। আমি জলন্ত কয়লা আমার সেই কাশার গ্লাসে ভরে গরম করে তার মসৃন তলা দিয়ে ঘসে আমার শার্ট ইসতিরি করতাম।

 

একবার মজি ভাই নাড়াই করে আমাকে চেরা দিয়্র ডেইল দিয়ে কপাল কেটে ফেলেছিলেন। গভীর রাতে কাক্কু হাটে থেকে এলে কাক্কুকে নিয়ে কাক্কি বদনা বাতি জালিয়ে আমাকে দেখতে আসেন। আমাকে শান্তনা দেন “মজির বাপে আট থাইকা আইয়া হুইনা মজিরে মাইর দিছে। ইন্ডিয়ান বাম লাগাইলেই ভালো অইয়া যাবোগা।”

আমি এইচএসসি পরীক্ষা দেয়ার সময় ১৯৭৯ এ আমার মা ইন্তেকাল করেন। আমি আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ থেকে এসে রাতেই মাকে দাফন করে ভোরে ফিরে গিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। ফিরে যাবার সময় কাক্কি মনে করিয়ে দেন “সাদেকে মনে হয় বছরকারি ফল আম খায় নাই। কবে না কবে আবার আবো। হেসুম আম থাকপো না। ওরে আম ছিলাইয়া দেও।” বুবু আমাকে আম ছিলিয়ে দিলেন দুধের সাথে। আমি খেলাম।

 

কাক্কু মারা যাবার পর থেকে মুলত কাক্কির স্বভাব স্তিমিত হতে থাকে। আমি এক বছর বা ছয়মাস পর পর বাড়ি যাই। বাড়ি এসেছি শুনেই কাক্কি আমাদের বাড়িতে আসতেন। হাসি হাসি মুখে বলতেন “সাদেক কুনসুম আইলা। মুনার মায় আইছে?” কাক্কির কোলে ও সাথে বেশ কয়েকজন করে নাতি নাত্নি থাকতো। আমি জিজ্ঞেস করতাম কোনটা কার ছেলে/মেয়ে? কাক্কি বলতেন “এইডা আমগো আলমগিরের, এইডা আমগো ছাদ্দাকাছের পোলা, এইডা হবির পোলা” ইত্যাদি। আমি এগুলো মনে রাখতে পারতাম না। আমি কাক্কির হাতে মজার প্যাকেট দিলে সব নাতী নাত্নিদের বিলিয়ে দিতেন। কাক্কির ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠতো। কাক্কি এসে আমার কাছে বসতেন। বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজ খবর নিতেন।

বয়স বাড়তে থাকে কাক্কি ক্রমশ দুর্বল হতে থাকেন। তখন তিনি আমাদের বাড়িতে তেমন আসতে পারতেন না। বাড়িতে কিছু খাবার জিনিস নিয়ে গেলে আমি কাক্কির জন্য নিয়ে গিয়ে দেখা করে আসতাম। শেষের দিকে কাক্কির শরীর শুকিয়ে কংকালসার হয়ে যায়। গাল কপাল ও চোখের কোনায় চামড়ার ভাঁজ পড়ে যায়। এই ভাঁজ পড়ার চামড়ার হাসিও আমার কাছে ভালো লাগে। কাক্কির কমন সমস্যার কথা বলতেন এভাবে “বাজান, কিচ্ছু ভালা নাগে না গো, কিচ্ছু ক্ষাপ্পাই না।” আমি ভাবতাম আমার মা যদি বেঁচে থাকতেন তা হলে এমনি ভাবেই হয়তো বলতেন “কিচ্ছুই খাপ্পাই না গো সাদেগালী বাজান।” তাও আমার ভালো লাগতো। আল্লাহ আমার মা ও এই চাচীকে মাফ করে দিয়ে বেহেস্তের ঘরে বসে আলাপ করার সুযোগ করে দিন। সাথে আমাদেরও।

 

গত ফেব্রুয়ারিতেই কাক্কির সাথে আমার শেষ দেখা। আমি ফেরার সময় কাক্কির হাতে অল্প কিছু টাকা দিয়ে আসতাম কিছু কিনে খাওয়ার জন্য। আমার স্ত্রী স্বপ্নাও কাক্কির জন্য বেশ টাকা পয়সা দিয়ে দিতেন আমার কাছে। আমার মেয়েরাও আমার হাতে দিয়ে দিতো এই বলে “দাদুর হাতে এই টাকাটা দিয়ে বলবে কিছু কিনে খেতে।” এবার কাক্কিকে খুব দুর্বল দেখেছিলাম। আরেকবার এসে পাবো কিনা সন্দেহ হলো। ঠিক তাই হলো। এবার ঈদুল আজহা হয়েছিল পহেলা আগষ্ট। করোনা মহামারির প্রকোপ খুব বেশী ছিলো। আমি বাড়ি যাইনি। মুকুল ও কদ্দুস রিস্ক নিয়ে বাড়ি গিয়েছিলো। আমি বাড়িতে কোরবানি দিয়েছিলাম। ভাতিজারা ম্যানেজ করেছিলো। ঈদ হয়েছিলো শনিবার। রবিবার দিন গত রাতে অর্থাৎ আগষ্টের ৩ তারিখে সোমবার কাক্কি ইন্তেকাল করেন। আমি জানাযায় শরীক হতে পারিনি।

 

তারপর মুকুলের জানাজায় শরীক হতে ১১ অক্টোবর বাড়ি গিয়েছিলাম। কাক্কির কথা খুব মনে পড়লো। মুকুলও কাক্কিকে খুব খোঁজ নিতো। সেও চলে গেলো। ৪ দিন আগে চলে গেছে আরেক প্রিয় চাচাতো ভাই সাইফুল। গত বছর চলে গেছে খসরু কাক্কু। তারপর কায়সার। সব নতুন কবর। কেমন জানি মনে হলো এরপরই আমার ডাক আসবে। আমি কি প্রস্তুত?

ফেরার সময় আগের মতোই কাক্কিদের বাড়িতে প্রবেশ করলাম। এবার আগের মতো ডাক দিলাম না “কাক্কি কোন ঘরে” বলে। দেখলাম বাড়িতে কেউ নেই। কাক্কি যে ঘরে থাকতেন সেই ঘরের দরজায় তালা লাগানো। আমি ডাক দিলাম বাড়িতে কেউ নাই নাকি। কার বউ যেন এসে বললো “বসুন।” আমি বললাম “কাক্কি এই ঘরে থাকতেন।” সে বললো “না পরে এই ঘরে থাকতেন। এই ঘরে মারা গেছেন। আমার বুক ফেটে কান্না এলো। চলে এলাম চোখ ভর্তি অশ্রু নিয়ে।

৩০/১০/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/