জিগিরন

জিগিরন

(সংগৃহিত হাস্তর ও গীত)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

[আমাদের সখিপুরের গ্রাম এলাকায় ছোটবেলা লোক মুখে কিছু গল্প শুনতাম। সেগুলোকে বলা হতো হাস্তর। সুর করে কিছু কবিতা ও গান গাওয়া হতো। সেগুলোকে বলা হতো গীত। আমি সেসব হাস্তর বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছি গল্পাকারে আমার মতো করে। এসবের ভেতর দিয়ে আগের দিনের গ্রামবাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রকাশ পাবে বলে আমি মনে করি। এই লেখাটি তারই একটি অংশ]

 

নাক কাটার হাস্তর শুনার পর নানী বললেন, হাস্তরডা খুব ভালা অইছে। কিছুক্ষণ পর নানী একটা হাই তুললেন। ময়ফল বললো, নানী, অবা আম নিয়াস পারতাছুন ক্যা, ঘুম আইতাছে নিহি? নানী বললেন, ব্যাল ঘুম আইছিলাম। কও আরও হাস্তর কও। আম্বাতন বললো, তার আগে আমার গীত হুনুন। নানী বললেন, গাও তুমি গাও।

বাইর বাড়ি করাতি,

দুধের আওটা চড়াইছি।

দুধ থুইছি জুরাইয়া

কলা থুইছি এরাইইয়া

আমার বাবা খাবরে সাইকল দৌড়াইইয়া।…

 

তারপর জানি কি? মন নাই, আরেকটা গাই।

 

জাংলা তলে খারই রইছি দুলাভাই আইতাছে।

অ দুলাভাই দুলাভাই গ, বুবু কিবা আছে গ?

তোমার বুবুর কান্দনে, নদীর কূল ভাংগনে।

জাংলা তলে খারই রইছি ভাই আইতাছে।

অ ভাই ভাই গ, ভাবী কিবা আছে গ?

তোমার ভাবীর কান্দনে, নদীর কূল ভাংগনে।

জাংলা তলে খারই রইছি খালু আইতাছে,

অ খালু খালু গ, খালা কিবা আছে গ?

তোমার খালার কান্দনে, নদীর কূল ভাংগনে।

জাংলা তলে খারই রইছি, ফুবা আইতাছে।

অ ফুবা ফুবা গ, ফুবু কিবা আছে গ?

তোমার ফুবুর কান্দনে, নদীর কূল ভাংগনে।

জাংলা তলে খারই রইছি বাজান আইতাছে।

অ বাজান বাজান গ, মাইয়া কিবা আছে গ?

তোমার মায়ের কান্দনে, নদীর কূল ভাংগনে।।

 

এতটা গাওয়ার পর ময়ফল বললো, এই ছেড়ি, তুই এবা কইরা গীত গাইলে ত হারা রাইতেও তর গীত গাওয়া হেষ অবো না। তোর আত্মিয়স্বজন, ভাই বেরাদর আইতেই থাকপ। তুই গীত গাইতেই থাকপি। এইডা বাদ দিয়া আরেকটা গা। আম্বাতন বললো, তাইলে এইডা গাই-

আতে দিছি মেন্দি, পায়ে দিছি আলতা।

দেহুন ছে গ দুলাভাই কিবা দেহা যায়।।

হাতে দিছি মেন্দি, পায়ে দিছি আলতা।

দেহুন ছে গ মিয়া ভাই কিবা দেহা যায়।

– আবারও তুই একই কতা বারবার কইতাছস?

– এবা কইরাই ত গীত গাইতে অয়।

– ভালা দেইখ্যা একটা গা।

– মেসি দিলে ঝিক ঝিক করে,

সুরমা দিলে চিক চিক করে।

– আংগ নাহার বু দাঁতে মেসি দেয়, কিবা ঝিক ঝিক করে। তাই না?

– নাহার বুর জামাই চোখে সুরমা নাগায়। কিবা চিক চিক করে। তাই না?

– মাইনষের জামাইর আলাপ না কইরা তুই গীত গা।

– তুই হাস্তর ক। আমি গীত মনে কইরা নই। অনেকদিন ধইরা গীত গাইনা ত। এই, জিগিরনের হাস্তরডা ক।

এক দেশে আছাল এক রাজা। রাজার বউয়ের নাম আছাল জিগিরন। জিগিরনের পোলাইপান অইত না। তাই রাজারে বেক্কে আটকুরা কইত। রাজায় একরাইতে স্বপ্নে দেখলো এক দরবেশ কইতাছে, তুই যুদি বিরাট একটা পুস্কুনি খোদস তাইলে তর বউয়ের সোন্তান অব। রাজায় তাই বিরাট কইরা একটা পুস্কুনি খোদলো। জিগিরনের পেটে একটা মেয়া সন্তান আইল। মেয়া অইলে রাজা খুব খুশী অইল। অনেক গাতা কইরা পুস্কুনি খোদলো তারপরেও পুস্কুনিতে পানি উঠল না। তাই রাজার মন খারাপ অইলো। রাজায় আবার স্বপনে দেখলো দরবেশ কইতাছে, জিগিরনেরে গয়নাগাটি পরাইয়া পুস্কুনির মধ্যেহানে খারা কইরা রাখলে পুস্কুনিতে পানি উঠপ। রাজায় তাই করলো। জিগিরনের সারা শইলে গয়না পরাইয়া পুস্কুনির মধ্যেহানে খারা কইরা রাখল। আর রাজায় পুস্কুনির পারে খারই রইল। জিগিরনের পায়ের তল দিয়া ঝিরঝিরাইয়া পানি বাইরন শুরু অইল।

যেই নিহি জিগিরনের খারু পানি অইল, পায়ের গোলখারুডা খুইল্যা রাজার দিকে মেইল্যা মাইরা কইল, এই দিয়া পতি তুমি আরেক বিয়া কইরো। জিগিরনের ময়াদয়া ছাইড়া দিও।

যেই নিহি জিগিরনের কোমর হোমান পানি অইল। কোমরের বিছা খুইল্যা রাজার মুহি মেইল্যা মাইরা কইল, এই দিয়া পতি তুমি আরেক বিয়া কইরো। জিগিরনের ময়াদয়া ছাইড়া দিও।

যেই নিহি জিগিরনের গলা পর্যন্ত পানি অইল, গলার আরডা থুইল মেইল্যা মাইরা জিগিরন কইল, এই দিয়া পতি তুমি আরেক বিয়া কইরো। জিগিরনের ময়াদয়া ছাইড়া দিও।

যেই নিহি জিগিরনের কান পর্যন্ত পানি উডলো, কানের মাড়কি খুইলা মেইল্যা মাইরা কইল, এই দিয়া পতি তুমি আরেক বিয়া কইরো।

যেই নিহি জিগিরনের নাক পর্যন্ত পানি অইল জিগিরন আতের বালা, বাজু আর নাকের নোথ খুইল্যা মেইল্যা মাইরা কইল, এই দিয়া পতি তুমি আরেক বিয়া কইরো। জিগিরনের ময়াদয়া ছাইড়া দিও। এই কতা কোওয়ার পর জিগিরন ডুইব্যা গেলো পুস্কুনির পানিতে। পানি উইঠ্যা পুস্কুনি ভইরা গেলো।

এমমুরা দিয়া জিগিরনকে না পাইয়া জিগিরনের গেন্দি মেয়াডা দুধ খাওনের নিগা ধাওয়া কান্দন শুরু কইরা দিল। হারাদিন হারারাইত কান্দিল। কানতে কানতে মেয়াডা খালি পুস্কুনির মুহি আংগুল দেহাইল। রাজায় মেয়াডারে কোলে নিয়া পুস্কুনির পাড়ের গেলো। মেয়াডার কান্দন হুইন্যা জিগিরন পানিত থিগা মাথা বাইর করলো। রাজায় দেখল যে জিগিরন রাজার মুহি চাইয়াও দেহে না। আবার মেয়াডার দিকে ময়া কইরা চাইয়া থাহে। রাজায় একসুম মেয়াডারে পুস্কুনির পাড়ে বহাইয়া একটু দূরে গিয়া পিতরাজ গাছের পাছে পলাইয়া রইল। দেহে, জিগিরন পানিত থিগা উইঠা আইয়া মেয়াডারে বুকের দুধ খাওয়াইয়া আবার ডুব দিয়া চইল্যা গেলো। রাজায় কয়দিন এবা কইরা মেয়াডারে দুধ খাওয়াইয়া বাচাইয়া রাখলো। একদিন রাজায় একটা চালাকি করলো। জিগিরন যেসুম মেয়ারে দুধ খাওয়ার নবো, হেসুম ঝাহিজাল ফালাইয়া আটকাইয়া ফালাব। ঠিক তাই। যেই জিগিরন দুধ খাওয়ান শুরু করলো হেসুম রাজায় ঝাকিজাল ফালাইল জিগিরনের উপুর। জিগিরন জাল ছিড়ড়া ছুইট্টা গিয়া এই যে ডুব দিলো আর কোন্দিন মেয়াডারে দুধ খাওয়াইতে আইল না।

নানী ঘুমাই পরছুন?

– না, ঘুমাই নাই। হোন্তাছি। ভালাই নাগতাছে। আরেকটা কও।

২১/১/২৯২১ খ্রি.

সৌজন্যে – হাসনা ভানু বুবু, সালমা বুবু ও আজহার ভাই।

Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/




হক স্যার টুপি ঘুরাতেন

হক স্যার টুপি ঘুরাতেন

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

[প্রফেসর ডা. আব্দুল হক স্যার ছিলেন একজন সৎ ও আদর্শবান মানুষ। তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ছিলেন। তিনি উক্ত কলেজের প্রিন্সিপাল এবং ময়মনসিংহ বিএমএ-র প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। আমি উক্ত বিভাগে দুইবার বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছি। ভয়ে ভয়ে স্যারের চেয়ারটিতে বসেছি। স্যারকে নিয়ে আমার অল্প কিছু স্মৃতি কথা আছে। তারই কিছু ধারাবাহিকভাবে লিখে যেতে চেষ্টা করছি]

 

প্রথম দেখাতেই প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হক স্যার আমার হাত থেকে নতুন বইগুলো ছুড়ে মারাতে আমি মনক্ষুন্ন হই। নজরুল দেখে ফেলাতে আমি অপমান বোধ করি। মনে মনে ভাবী ইনি কেমন মানুষ? আমাকে তো সুন্দর করে বুঝিয়ে বলতে পারতেন। যদি এমন করে বলতেন “বাবা, তুমি তো বেস থার্ড ইয়ারে উঠেই নতুন বই কিনে ফেলেছো। খুব ভালো করেছো। তবে এই সব লাল নীল দেশী লেখকদের বই পড়ে ভালো ডাক্তার হওয়া যাবে না। তুমি বরং বিদেশী লেখকদের বই কিন। এসব বই পড়ে পাস করা যাবে না।” তা না করে তিনি আমার সাথে কিছুই না বলে বই ছুড়ে মেরে তার রুমে প্রবেশ করলেন। এই ক্ষোভ আমার ভেতরে অনেকদিন পর্যন্ত ছিলো, যতদিন না আমি স্যারের খুব কাছে আসতে পেরেছি।

 

তখন থার্ড ইয়ার থেকেই প্যাথলজি ক্লাস শুরু হতো। প্রফেসর ডাঃ আব্দুল মান্নান সিকদার স্যার অল্প বয়সের শিক্ষক ছিলেন। তিনি সুটেড-বুটেড হয়ে ক্লাসে আসতেন। তিনি তখন প্যাথলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন। প্রফেসর হক স্যার ছিলেন সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। এটা কিন্তু ১৯৮৩ সনের কথা বলছি। সিকদার স্যার সব কথা ইংরেজিতে বলতেন। আমি গ্রামের ছেলে। ইংরেজি খুব কম বুঝতাম। যদিও আমি ইন্টারমেডিটে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েছি। বইয়ের ইংলিশ মিডিয়াম বাংলা মিডিয়ামের চেয়ে সহজ ছিলো। কিন্তু ইংলিশ মিডিয়ামের লেকচার শোনা আমার জন্য কঠিন ছিলো। সিকদার স্যার গ্যালারির ভেতরে ছাত্রদের কাছে এসে পড়া ধরতেন। তাও আবার ইংরেজিতে কথোপকথন করে। আমি সবসময় ভীতসন্ত্রস্ত থাকতাম এবং স্যারের মুখের দিকে চেয়ে থাকতাম। স্যার আমার এই দুর্বলতা বুঝে ফেলে আমাকে পেয়ে বসেন। আমার এই অবস্থার কথা ক্লাসের সবাইকে বলতে থাকেন। আমি লজ্জিত হয়ে পড়ি। আমি যখন প্যাথলজির সহকারী অধ্যাপক হয়ে সেই একই গ্যালারিতে ক্লাস নিতাম মান্নান সিকদার স্যারের কথা মনে পড়তো। তাই, আমি ক্লাসে ইংরেজি বলার পাশাপাশি সরল বাংলায় ছাত্রদের বুঝিয়ে দিতাম। মান্নান স্যার ছাত্রদের মাঝে এসে পড়াতে ছাত্ররা অন্য মনস্ক হতে পারতো না। আমিও মাঝে মাঝে তাই করি। সিকদার স্যার পরের বছর বদলি হয়ে যান অন্য কোন মেডিকেল কলেজে। দীর্ঘদিন পর আমি যখন এম ফিল পড়ি তখন স্যারের দেখা পাই প্যাথলজি সোসাইটির এক সম্মেলনে। শুনলাম তিনি চট্রগ্রাম মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। তারপর থেকে স্যারের স্যাথে আমার অনেক দেখা সাক্ষাত হয়। মোবাইলে অনেক কথা বলেন। অনেক স্নেহ করেন আমাকে। তিনি আমার সাহিত্যের বইয়ের একজন ভালো রিভিউয়ার।

প্রফেসর ডাঃ আব্দুল মজিদ সিদ্দিকী স্যার ও রজব আলী স্যার আমাদের জুরিস্প্রুডেন্স পড়াতেন। ফরেনসিক মেডিসিনকে তখন জুরিস্প্রুডেন্স বলা হতো। আমি ছিলাম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ১৭তম ব্যাচের ছাত্র। তার মানে কলেজের বয়স ছিল ১৭ বছর। এমন বয়সে কলেজে শিক্ষক সংকট থাকে। মজিদ সিদ্দিকী স্যার রেডিওলজি (এক্স-রে) বিভাগের ডাক্তার হয়ে জুরিস্প্রুডেন্স লেকচার ক্লাস নিতেন। এমন সমস্যা দিনাজপুর মেডিকেল কলেজেও ছিলো। এই কলেজের বর্তমান নাম এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ। আমার মেয়ে ডা. মার্জিয়া ইসলাম দীনা এই কলেজের ১৭ ব্যাচের ছাত্রী ছিলো। তখন আমিও এই মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলাম। দীনাদের বায়োকেমিস্ট্রির প্রফেসর লেভেলের শিক্ষক না থাকাতে প্রথম দিকে আমিই অনেকগুলো বায়োকেমিস্ট্রি লেকচার ক্লাস নিয়েছি। মজিদ সিদ্দিকী স্যারের বাড়ি আমাদের পাশের উপজেলা ঘাটাইলে হওয়াতে তার কথাবার্তা আমার কাছে খুব পরিস্কার লাগতো। চিকন মানুষ, টনটনে কথা ছিলো মজিদ স্যারের। রজব আলী স্যার পরিপাটি ও দেখতে সুন্দর ছিলেন। ফরেনসিক মেডিসিনের পড়ায় বেশ কিছু লজ্জার কথা আছে। সেইগুলি বলার সময় রজব আলী স্যার স্মীত হাসতেন এবং তার গালে টোল পড়তো। এখনো স্যারের সেই টোল পরা গাল আর মোটা সুন্দর দাঁতের মিষ্টি হাঁসি আমার মনে আছে। ফিজিওলজির প্রফেসর এম এ জলিল স্যার আমাকে খুব ভালোবাসতেন। টাঙ্গাইলের মানুষ হওয়াতে তার কাছে খুব যেতাম। তিনি পড়াতেন খুব ভালো। খুব জ্ঞানী ছিলেন। কিন্তু তিনি যখন ব্লাকবোর্ডের কাছে গিয়ে কিছু লিখতেন তখন নিচু স্বরে কথা বলতেন যেগুলো আমি ফলো করতে পারতাম না। আমি যতদিন শিক্ষকতা করেছি সেই কথাটি মনে রেখেছি। তবে সব ক্লাস তারাতারি ডিজিটাল হয়ে যাওয়াতে আমাকে ব্লাকবোর্ডের দিকে ঘুরতে হয় নি। আমি ক্লাস নেই সামনে ক্যাপটপ রেখে। স্ক্রিনের দিকে তাকাই না বেশী। যেহেতু দৃষ্টি থাকে সামনের দিকে সেহেতু ছাত্ররা গন্ডগোল করতে পারে না। এনাটমির প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হাই ফকির স্যার সবসময় সুট টাই পরে থাকতেন। খুব পরিস্কার করে কথা বলতেন। শোনতে খুব ভালো লাগতো। তিনি বোর্ডে তেমন কিছু লিখতেন না। ইপিডায়াস্কোপে বইয়ের পাতা প্রজেক্ট করে স্ক্রিনে ফেলতেন। আমার কাছে স্যারের পড়ানোর স্টাইল ভালো লাগতো। এনাটমিতে হারুন স্যার নামে আরেকজন স্যার ছিলেন। তিনি কবিতা লিখতেন। পড়ানোর সময় মুখে হাসি লেগেই থাকতো। তিনি এপ্রোন পড়ে ক্লাসে আসতেন। ফার্মাকোলজির প্রফেসর ডাঃ জগদীশ চন্দ্র স্যার প্রথম দিন পরিচিতি মূলক ক্লাসে খাটি নেত্রকোনার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছিলেন মনে আছে। তিনি বলছিলেন এই কলেজটা যেইহানে অইছে সেইহানে পাট কেত আছিল। সহজ করে সুন্দর পড়াতেন। সার্জারীর প্রফেসর ডাঃ এনায়েত কবীর স্যার ক্লাসে খুব রাগারাগি করতেন। কেন করতেন তা বুঝতে পারতাম না। রাগারাগির এক পর্যায়ে পকেট থেকে ট্যাবলেট বের করে খেতেন। তারপর শান্ত হয়ে আবার পড়াতেন। বেস ভারী শরীর ছিলো স্যারের। জ্যাকেট গায়ে দিয়ে থাকতেন। দুই হাত প্রসারিত করে কথা বলতেন। একদিন সহকারীকে বললেন মাইকের মাউথ পিচটা সুতা দিয়ে গলায় ঝুলিয়ে দিতে। তারপর তিনি দুই হাত ছোড়াছুড়ি করে পড়ালেন। তিনি ছাত্রদেরকে তুই করে বলতেন। একদিন হঠাৎ তিনি ক্লাসে অনেককেই প্রশ্ন করা শুরু করলেন কে কোন কলেজ থেকে পাশ করে এসেছে। আমাকে যখন প্রশ্ন করলেন “তুই কোন কলেজ থেকে পাস করেছিছ?” আমি দাঁড়িয়ে গর্বের সাথে বললাম “আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ থেকে, স্যার?” তিনি সাথে সাথে তাচ্ছিল্যের সাথে বলে ফেললেন “বাহ, আলাউদ্দিনের মিষ্টি, অপুর্ব সৃষ্টি।” তিনিও হাসলেন, ছাত্ররাও হাসলো। কারন, কেউ তো জানতো না যে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কার দাদার নাম। সার্জারীর প্রফেসর ডাঃ আব্দুস শাকুর স্যার ছিলেন মাটির মানুষ। ধীরে ধীরে পড়াতেন। আমাকে বেশ স্নেহ করতেন। কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ডাঃ মোফাখখারুল ইসলাম স্যারকে রাগ করতে দেখিনি। তিনি ইংরেজ স্টাইলে থাকতেন। হাসি হাসি মুখ ছিল সব সময়। তিনি কিছুক্ষণ লেকচার দিয়েই বিলাতের কথা বলতেন। কথায় কথায় কমিউনিটি বেইজড মেডিকেল এডুকেশন, আলমা আটা, জেনেভা ডিক্লারেশন শব্দগুলো উচ্চারণ করতেন। শুনতে ভালোই লাগতো। মেডিসিনের অধ্যাপক শামসুল ইসলাম স্যার ছিলেন একটু ভার বুদ্ধিসম্পন্ন। তিনি ক্লাসে এসে কিছুক্ষণ সিগারেট টেনে শক্তি সঞ্চয় করে কেশে পড়ানো শুরু করতেন। তখন সিগারেট খাওয়াটা এখনকার মতো অতো দোষের ছিলো না। তিনি ক্লাসে পড়া ধরতেন না। তিনি সাধারণত সাদা হাফ শার্ট পরতেন। কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের সাদেক স্যার ছিলেন খুবই মাটির মানুষ। খুব বিনয়ের সাথে পড়াতেন। হাটার সময় তিনি এদিক সেদিক তাকাতেন না। চুক্ষু বিভাগের প্রফেসর মুক্তাদির স্যার ছাত্রদের সাথে বেশ মিশুক ছিলেন। তিনি দেখতে সুন্দর ছিলেন। সাফারি পরতেন সাধারণত। বিভাগীয় প্রধান ছিলেন প্রফেসর ডাঃ শামসুদ্দিন স্যার। তিনি জোক করে পরাতেন। একবার ক্লাসে আমি একটু অন্যমনস্ক ছিলাম। হঠাৎ তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন “এই, তিন মাসের বাচ্চার ভিটামিন কম পড়লে কি করবে।” আমি বলে দিলাম “সবুজ শাক সবজি খেতে দেব।” স্যার মুখের এক অদ্ভুত ভঙ্গি করে বললেন “হ্যা, তিন মাসের বাচ্চা ত শাক খেতে পারবেনা। নাকইর দিয়া ঠেলে ঠেলে পাছা দিয়ে শাক ঠুকাতে হবে।” আমি ত লজ্জা পেয়ে ঝিম মেরে গেলাম। স্যারের সামনে ত হাসা যায় না। বন্ধুদের কারো কারো শরীর ঝাকুনি দিতে দেখলাম চিপা হাসিতে। শামসুদ্দিন স্যার কোট-টাই পরতেন। হাটতেন দৈত্যে মতো। প্রফেসর ডাঃ জোবায়েদ হোসেন স্যার ছিলেন খুব জাদরেল এক শিক্ষক। সবাই তাকে ভয় পেতো। তিনি গাইনি বিভাগের প্রধান ছিলেন। প্রথম দিকে আর্মি অফিসার ছিলেন। হাটতেনও আর্মি স্টাইলে। লম্বা ছিলো স্যারের শরীর। টাই পরতেন। সার্জারীর প্রফেসর গাফফার তালুকদার স্যার বাংলা উচ্চারণ করতেন বিলাত প্রবাসী মানুষের মতো। তিনি শার্টের উপর জ্যাকেট পরতেন। সার্জারির আরেকজন শিক্ষক ছিলেন প্রফেসর ডাঃ সেলিম ভুইয়া স্যার। খুব নরম মানুষ ছিলেন। স্যারের আন্ডারে আমি ৬ মাস সার্জারিতে বিশেষ ট্রেইনিং নিয়েছিলাম। তিনি কথায় কথায় ইংল্যান্ডের ব্যবস্থার কথা বলতেন। আমি আমার কয়েকজন শিক্ষকের কথা এখানে উল্লেখ করলাম যারা আমাদের লেকচার ক্লাস নিতেন। আরও অনেক শিক্ষক ছিলেন, তারাও লেকচার ক্লাস নিতেন। সবার কথা লেখলে আপনি অধৈর্য্য হতে পারেন। হক স্যারকে নিয়ে লেখতে গিয়ে কয়েকজন শিক্ষকের নাম এসে গেলো। আমাদের সব শিক্ষকই অত্যধিক বিজ্ঞ ছিলেন। সবাই ভালো পড়িয়েছেন। একেকজন শিক্ষক একেক ভাবে স্মৃতিতে রয়ে গেছেন। আজ লিখবো হক স্যারকে নিয়ে। তার আগে একটু প্রফেসর আবু আহমেদ স্যারকে নিয়ে বলে নেই। স্যার ছিলেন প্যাথলজি বিভাগের সেকেন্ড স্যার। পড়াতেন মাইক্রোবায়োলজি। স্যারের লেখচার আমার খুব পছন্দ হতো। গল্প করে করে মজা করে পড়াতেন। যেদিন তিনি ফিতাকৃমি পড়ালেন সেদিন ক্লাস শুরুতেই একটি গল্প শুনালেন।

বললেন, একবার এক রাজকন্যার পেট থেকে ১৮ ফুট লম্বা একটা মাছ বের হলো পায়খানার সাথে। আমি শুনে তাজ্জব বনে নড়েচড়ে বসলাম। শোনার জন্য ব্যাকুল হলাম। আসলে এই গল্প থেকে স্যার চলে গেলেন ফিতা কৃমি পড়াতে। পদ্ধতিটা আমার খুব ভালো লেগেছিল। স্যার পড়ানোর সময় একটা কিছু বলে সামান্য হা করে জিহবার আগা নাড়াতেন এবং গাল ও ঠোঁটে হাসির ঢেউ খেলে যেতো। খুব ভালো লাগতো। থেমে থেমে পড়াতে বুঝতেও সুবিধা হতো। স্যারের দেখাদেখি আমিও ক্লাসে প্রসংগের সাথে মিল রেখে ছোট একটি গল্প বা ঘটনা শুনিয়ে দেই। ছাত্ররা যাতে গল্পটা মনে রাখতে গিয়ে পড়াটাও মনে রাখে এটাই আমার উদ্দেশ্য। একবার লন্ডন থেকে এক মেয়ে আমাকে মোবাইল করলো। সালাম দিয়ে কেমন আছি তা জানতে চাইল। কুশল বিনিময়ের পর জানতে চাইলাম

– কী মনে করে ফোন করেছ।

– স্যার, গভীর রাত এখানে। ঘুম আসছিলো না। দেশের কথা মনে হলো। শেষে আপনার ক্লাসের কথা মনে পড়লো। আপনি একদিন ভুত দেখেছিলেন। সেই কথা মনে হবার পর আপনাকে ফোন করেছি।

– আমার ভুতের গল্প ত মনে আছে। কেনো বলেছিলাম তা কি মনে আছে?

– জি স্যার, ট্রমাটিক ফ্যাট নেক্রোসিস হলে ফ্যাট সেল মরে গিয়ে তার শুধু আবসা আবসা আউট লাইন দেখা যায়। মানে মৃত কোসের ছায়ার মতো দেখা যায়, যেটাকে বলা হয় ঘোস্ট সেল। আপনার গল্পগুলো মনে হলে প্যাথলজির পড়াও মনে এসে যায়।

ভুতের গল্প প্রায় সবাই ভালোবাসে। সেদিন ফেইসবুকে একটা পড়েছি এমন। গোরস্থানে পাসের বাড়িতে সাধারণত কেউ থাকিতে চায় না। এমন একটি বাড়ি ছিলো গোরস্থানের পাশে। আসেপাশে আর বাড়ি ছিলো না। সস্তা পেয়ে এই বিল্ডিংয়ের দোতলা ভাড়া নিলেন এক শিক্ষিত ভদ্রলোক। এক রাতে এক একা ভালো লাগছিলো না তার। সিদ্ধান্ত নিলেন তৃতীয় তলার ভদ্রলোকের সাথে কিছুক্ষণ আলাপ করে আসা যাক। তাই, টিপ টিপ করে সিড়ি বেয়ে তৃতীয় তলায় উঠে বেল টিপ দিলেন। শীর্ণকায় লম্বা এক ভদ্রলোক দরজা খুলে দিয়ে বসতে দিলেন। কিছুক্ষণ কথা বলার পর লক্ষ্য কিরলেন ভদ্রলোকের হাতের আঙুলগুলো অত্যধিক লম্বা এবং গলাও বেশ লম্বা। তাকে ভুত বলে সন্দেহ হলো। জিজ্ঞেস করলেন “আচ্ছা ভাই, আপনি কি ভুত আছে বলে বিশ্বাস করেন?” উপর তলার সেই লোকটি জবাব দিলেন “মরার আগে বিশ্বাস করতাম না। এখন করি।” শুনে নিচ তলার লোকটির ভয়ে শরীম হীম হয়ে এলো। তারাতাড়ি কথা সেরে চলে এলেন।

 

আমি ক্লাসে গল্পের সাথে পড়া মিলিয়ে ছাত্রদেরকে শেখাতে চেষ্টা করি। ফলো করেছিলাম আবু আহমেদ স্যারকে।

আপনি বিরক্ত হচ্ছেন, হক স্যারের কথা লিখতে গিয়ে এসব কী লিখছি। আসছি এখন হক স্যারের কথায়। আজ হয়তো হক স্যারের কথা আপনার কাছে ভালো লাগবে না। আসলে হক স্যারের আমি প্রথম দিকে শুধু বাইরেরটাই দেখছিলাম। তাই প্রথম দিকে তিনি আমার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কেউ ছিলেন না। অনেক বছর পর যখন আমি হক স্যারের ভেতরের জিনিস আবিস্কার করলাম তখন থেকে আমি জানি স্যার একজন অসাধারণ মানুষ। সেই সময় টুপিওয়ালা স্যার মাত্র দু’জনই ছিলেন। দু’জন আবার দূরকম। একজন হলেন ফিজিওলজির দাদু স্যার আরেকজন হলেন প্যাথলজির হক স্যার।দাদু স্যারের নাম খুব সম্ভব ডাঃ আমিনুল ইসলাম ছিলো। দাদু স্যারের গালে লম্বা সাদা চাপ দাড়ি ছিলো। লম্বা জুব্বা পরতেন। বয়স্ক দাদাদের মতো করে কথা বলতেন। তাই, ছাত্ররা দাদু স্যার বলত। দাদু স্যার বলতে বলতে স্যারের আসল নামটি ভুলে গেছি হয়তো । হক স্যার টুপি মাথায় দিতেন, কিন্তু শার্ট পরতেন। হক স্যারের টুপির ধরনটি অনেকটা ডাঃ জাকির নায়েকের টুপির মতো গোল। স্যার মাথার চুল সবসময় চেঁছে রাখতেন। তাতে মাথার সাথে টুপি লেপটিয়ে থাকতো। চুল না থাকায় টুপিটি সহজেই মাথার উপর ঘুরানো যেতো। আমি যতদিন ছাত্র ছিলাম ততদিন স্যারের দাড়ি ছিলো না। দাড়ি রেখেছেন পরে। স্যারের চোখের উপর ভ্রু কম ছিলো। স্যার একটি বিশেষ ধরনের শার্ট গায় দিতেন। সাভাবিকের চেয়ে একটু লম্বা শার্ট। শার্টের কলারও ছিলো সাভাবিকের চেয়ে বেশ লম্বা। শার্টের রঙ ছিলো সাদাটে। আমরা অফ হোয়াইট বলতে পারি। মোটা কাপড়ের শার্ট ছিলো। ছেড়ার কথা না সহজে। আমি এক যুগ ধরে একই অথবা একই রকম শার্ট দেখেছি। একই রকম শার্ট কয়েকটি ছিলো কি না আমি জানি না। আমার কাছে মনে হতো একই। পাজামা, না ফুল প্যান্ট পরতেন তা বুঝা যেতোনা। মোটা অফ হোয়াইট কাপরের এক ধরনের ফুল প্যান্ট পরতেন শার্টের নিচ দিয়ে টাকনুর উপর পর্যন্ত। ফিতাবিহীন শু পরতেন পায়। হাটতেন সামনের ৪-৫ ফুট মাটির দিকে তাকিয়ে । স্যারকে প্রাইভেট কারে চড়তে দেখিনি। স্যারের স্ত্রী ডাঃ বীণা হক ম্যাডাম ছিলেন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ। তাকে আমি সবসময় প্রাইভেট কারে চলাফেরা করতে দেখেছি। স্যারকে রিক্সায় উঠতেও দেখিনি। চরপাড়ায় রাস্তা দিয়ে দু’হাতে ভারী ভারী বাজারের ব্যাগ নিয়ে বাসার দিকে হেটে যেতে দেখেছি। আমি একদিন একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম হক স্যার নিজের জন্য গাড়ি কেনেন না কেনো। উত্তরে জানতে পেলাম তিনি গাড়িতে চলা পছন্দ করেন না। আমেরিকা প্রবাসী তার বুয়েট থেকে পাস করা ইঞ্জিনিয়ার ছেলে দেশে এসে স্যারের জন্য একটি কার কিনে দিয়ে যান। স্যার সেটা ব্যবহার না করে জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসায় দান করে দেন। জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার মাঠে একটি টীন সেডে প্রাইভেট কার দেখেছি। খুব সম্ভব ওটাই হবে।

 

দোতলায় প্যাথলজি ডিপার্টমেন্ট। সিড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে এসে ক্লাসের মঞ্চে এসে নিঃশ্বাস ছাড়তেন। খুব সিরিয়াস হয়ে পড়ানো শুরু করতেন। যা বলতেন সবই যেনো গুরুত্বপূর্ণ। মানে প্যাথলজির কোন কিছুই বাদ দেয়া যাবে না। সবাই নিরব হয়ে স্যারের লেকচার শুনতাম। স্যারের টেবিলের সামনে বিদেশি বিরাট টেক্সট বই খোলা রাখতেন। কিছুক্ষণ পর পর বইয়ের দিকে চোখ দিতেন। ডান হাতে চক আর বাম হাতে ডাস্টার ধরা থাকতো। কথা বলার সময় ডান হাত ঘুরাতেন। চট করে ব্লাকবোর্ডে গিয়ে কিছু লিখতেন। মাঝে মাঝে প্রশ্ন করতেন কাউকে নির্দিষ্ট না করে। কেউ উত্তর দিয়ে দিলে গুড বলে আবার শুরু করতেন। কেউ উত্তর না দিলে বলতেন “এই লিসান জামিল কই? লিসান বলো।” অথবা “দীপক কুমার ধর বলো।” দীপক আমাদের মধ্যে সবসময় ফার্স্ট হতো । লিসান জামিল সেকেন্ড হয়েছিল। তারপরই ছিল মিজানুর রহমান স্বপন। শেষের দিকে স্বপন সেকেন্ড হতো। আমি ওদের মতো না হলেও ৮ম, ৯ম অথবা ১০ম অবস্থানেই সাধারণত থাকতাম। বেশী ভালো ভালো না। সেই ভালো ছাত্ররা মাতৃভূমি ছেড়ে চলে গেছেন সুখের দেশে। এদেশ তাদের চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। হক স্যারও বিদেশে গিয়েছিলেন উচ্চ শিক্ষা অর্জন করতে। ফিরে এসে দেশের সেবাই করেছেন। কিন্তু স্যার তার ইঞ্জিনিয়ার ছেলেকে দেশে রাখতে পারেননি। যাহোক, যখন স্যার যা পড়াতেন তাকেই বলতেন ভেরি ভেরি ইমপোর্টেন্ট। তিন বার করে বলতেন ভেরি ভেরি ইমপোর্টেন্ট। বলার সময় প্রত্যেকবার মাথার টুপি ঘুরাতেন। আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে তিনি লোবার নিউমোনিয়া চারটি স্টেজ বলার সময় চার বার টুপি ঘুরিয়েছিলেন। বলছিলেন, লোবার নিউমোনিয়ার চারটি স্টেজ আছে – স্টেজ অব কঞ্জেশন, স্টেজ অব রেড হেপাটাইজেশন, স্টেজ অব গ্রে হেপাটসিজেশন অ্যান্ড স্টেজ অব রেজুলুশন। হক স্যার বাংলা ও ইংরেজি সংমিশ্রণ করে পড়াতেন। তাই ভালো বুঝতে পারতাম। আমি স্যারের এই বৈশিষ্ট্যটা অনুসরণ করে ক্লাস নেই। আমি আরেকটা ব্যাপারে স্যারকে অনুসরণ করি। সেটা হলো আমি ঠিক সময়ে ক্লাসে উপস্থিত হই। স্যার কোনদিন ক্লাসে অনুপস্থিত থাকতেন না। আমিও কোনদিন ক্লাসে অনপস্থিত থাকি না, একান্ত জরুরি অবস্থা ব্যাতিরেকে। ছাত্রাবস্থায় স্যারের ভেতরের মহত্ব আবিস্কার করার মত জ্ঞান আমার ছিলো না। ছাত্রাবস্থায় স্যার আমার সাথে কয়কবার দুরব্যাবহার করেছিলেন বলে মন থেকে স্যারকে কম পছন্দ করতাম। পছন্দ করা শুরু করলাম সেদিন থেকে যেদিন থেকে স্যারের ভেতরের জিনিসটা আবিস্কার করতে পারলাম। সে কথা পরে লিখবো।

১৬/১২/২০২০

ময়মনসিংহ
Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/





 

সোনালি শৈশব

বইয়ের নামঃ সোনালি শৈশব

লেখকঃ ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

প্রকাশকঃ ছায়াবীথি

পৃষ্ঠাঃ ১৪৪

কভারঃ হার্ড

মূল্যঃ ২৫০ টাকা

বিবরণঃ

সোনালি শৈশব  একটি স্মৃতিকথার কথা সাহিত্যের বই। লেখক অতীতের গ্রাম বাংলার প্রকৃতি, পরিবেশ, মানুষ, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ইত্যাদি  মজার  মজার মজার কথা দিয়ে এই বইয়ে তুলে ধরেছেন।

পাওয়ার উপায়ঃ

১। নিকটস্থ লাইব্রেরি।

২। অনলাইন শপ (লেখকের নিয়ন্ত্রণে): www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

৩। অনলাইন শপ (প্রকাশকের নিয়ন্ত্রণে):  www.rokomari.com

৪। কুরিয়ার সার্ভিসেঃ মোবাইল নম্বর 01711683046 তে অর্ডার করে।

৫। সরাসরি লেখকের চেম্বারের সহকারীর কাছ থেকে।

গেন্দু মিয়ার শশুর বাড়ি গমন

গেন্দু মিয়ার শশুর বাড়ি গমন

(হাসির হাস্তর)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

[সখিপুর এলাকার লোক মুখে শোনা গল্প। জোড়াতালি দিয়ে অলংকৃত করে লেখা হয়েছে। গল্প সংগ্রহে সাড়াসিয়ার ক্লাস মেট বন্ধু আবু বকর সিদ্দিকের সহযোগিতা নেয়া হয়েছে]

 

সিনেমা দেখার পর থেকেই গেন্দু মিয়ার বিয়ে করার ইচ্ছে জাগে। একদিন সে করিম বকসের কাছে তার মনের ইচ্ছাটা জানালে করিম বকস কথাটা গুরুত্বের সাথে নিলেন। গেন্দুর বাবার কাছে জানালেন। বাবায় বললেন

– পোলা হয়ে যখন জন্মেছে তখন বিয়েতো করাতেই হবে। ছেলের মোছ কালো হতে শুরু করেছে। বিয়ের বয়স এখন হয়েছে। সাবালক পোলা বিয়ে করিয়ে দেয়া আমাদের দায়িত্ব। কিন্তু পোলা যে বিয়ে করাবো তাতে একটু সমস্যা আছে। গত বছর মাইয়াটারে বিয়ে দিতে গিয়ে উজান বাইদের ক্ষেতটা বগুরাহান লাগিয়েছিলাম। দশ হাজার টাকা ফেরত দিতে পারলে ক্ষেতটা ফেরত পাওয়া যাবে। ছেলের শশুরের কাছ থেকে যদি টাকাটা নিয়ে বিয়ে করানো যায় তবে মন্দ না। আমি ছেলের জন্য সাইকেল ঘড়ি চাবো না। ছেলে আমার সাইকেল চালাতে পারবে না। ঘড়িও তার কাছে বেমানান।কাজেই, নগদ টাকাটাই নিতে হবে।

– আপনে যে টাকা নিতে চাচ্ছেন তা হলো যৌতুক। এটাকে এখন মানুষ ঘৃনা করে।

– আমরা নিলে হবো অন্যায়। আমিওতো মেয়ে জামাইকে ১০ টাকা হাজার দিয়েছি। আবার সেই টাকাই ফিরিয়ে আনবো ছেলে বিয়ে করিয়ে।

– আচ্ছা, ঠিক আছে। দেখি কোনো মেয়ে পাওয়া যায় কি না।

 

রহিম ও করিম বকসরা দু’জন মিলে খোঁজাখুঁজি করে অবশেষে মেয়ে একটা ঠিক হয়ে গেলো। ভর এলাকায় বাড়ি। গ্রামের নাম হদিলাপুর। মেয়ে একটু শ্যামলা হলেও স্বভাব চরিত্র ভালো। রহিম বকসরা ঘটকালি করে উভয়েই পাজামা পাঞ্জাবি উপহার পেলেন বিয়েতে। বিয়ে হলো, ফিরানি ঘুরানি পর্বও শেষ হলো। মেয়ের বাপে লক্ষ্য করলেন যে মেয়ে জানাই গেন্দুর বুদ্ধি শুদ্ধি কম। গেন্দুর সুমুন্দির বউরাও জানতে পারলো যে তাদের নোন্দের (ননদের) জামাই বাবাগোবা। বউয়ের ভাবীদের সাথে, ছোট ভাই-বোনদের সাথে সাধারণত জামাইদের হাসি-তামসা ঠাট্টা -মস্করার চল ছিল। গ্রামে হাসি তামাশার খুব প্রচলন ছিলো আগের দিনে। দাদা-দাদী ও নানা-নানিরা নাতি-নাত্নিদের নিয়ে হাসি-তামাসা করতো।

 

শ্যালকশ্যালিকাদের দুলাভাইদের সাথে এবং বেয়াই-বিয়ানিদের মধ্যেও ঠাট্টা মস্করা হতো। চাচী, ফুফু, খালা, মাঐদের সাথেও একধরনের ঠাট্টার চল ছিলো। তারা বাপ নিয়ে ঠাট্টা করতো। যেমন, ধরুন, মাঐ সম্পর্কের একজন পুতুরাকে (মেয়ের দেবর বা ছেলের শ্যালক) শুনিয়ে বললেন “বেগুনের দাম কমে গেছে, চার আনা সের।” পুতুরায় শুনে বললো “দিবোনা আপনের বাপেরা। বেগুন হাটে আট আনা সের।” অথবা পুতুরা মাঐ বাড়ির কাছে এসে গলা খাকিয়ে জানান দিলো “মাঐ আপনের বাপেরা আইলো গো।” মাঐ সতর্ক হয়ে আঁচল টেনে মাথায় উঠালো। এমন ঠাট্টার প্রচলন ছিলো আগের দিনে। গেন্দু মিয়ার সুমুন্দি বউদের অভিযোগ হইলো সে তাদের সাথে মস্করা করে না। লাজুক ভাবে চুপচাপ বসে থাকে রুমাল হাতে নিয়ে। গেন্দুর শশুর রহিম বকসকে বললেন কী বোকাসোকা জামাই দেখে মেয়ে বিয়ে দিলাম সে মেয়ের ভাবীদের সাথে একটু ঠাট্টা মস্করাও করতে পারে না। জামাইরে একটু বইলা দিয়েন যেনো সুমুন্দির বউদের সাথে ঠাট্টা মস্করা করে।” করিম বকস সেইমত গেন্দুকে বলে দিলেন “শশুরবাড়ি গিয়ে ভাবীদেরকে সালামাল্কি দিবি। একটু ঠাট্টা মস্করা করবি।”

 

বর্ষাকাল ছিলো। খাল বিল নদী নালা সব পানিতে ভরে গিয়েছিলো। সেবার খুব চামারা ধান হয়েছিলো মাঠভর্তি। চামারা ধানের বৈশিষ্ট্য হলো মাঠের পানি যতই বাড়তে থাকতো ধান গাছও তত বাড়তে থাকতো। শুধু ধানের সবুজ পাতা মাঠভর্তি দেখা যেতো। বিলের পানি দেখা যেতো বিস্তির্ন এলাকা জুরে। নৌকা ছাড়া কোথাও যাওয়া যেতো না। মাঠের উপর দিয়ে নৌকা সোজা বেয়ে নিতে হতো চামারা ধান ক্ষেতের উপর দিয়ে। তাতে ধান গাছগুলো দু’দিকে সরে গিয়ে পানিতে নৌকা চলার রাস্তা হতো। এই পানির রাস্তাকে বলা হতো দারা। দারা দিয়ে নৌকা চলার সময় ধান গাছে ঘষা লেগে এখরনের শব্দ হতো। সেই বর্ষাকালে গেন্দুর শাশুড়ি গেন্দুর শশুরকে বললেন জামাইকে নিতার দাওয়াত খাওইতে। বললেন “জামাইরে নাইরল-চিড়া পার ও কুশাইরা গুরের ফুকা পিঠা ও খির খাওয়াইতে অইবো। জামাইরে দাওয়াত কইরা নিয়া আহুন গা।” আগের দিনে মেয়ে-জামাইকে শাশুড়ী খুব খাওইতো।

গেন্দুর শশুর ডিংগি নাও নিয়া গেন্দুকে আনতে গেলেন। নাও খোজ দেয়ার জন্য একজন লোক নিয়ে গেলেন। জয়নাতলা ঘাটে নৌকা রেখে জামাইবাড়ি গেলেন। গেন্দুর বাবাকে বলে নিয়ে এলেন গেন্দুকে।

গেন্দু দাঁত মাজত না। দাতের গোড়ায় পঁচামুইনা ঘাঁও ছিলো। কথা বলার সময় পাঁচকাঠা দাঁত বের হয়ে থাকতো। দাঁতের ময়লা দেখে শশুরের খারাপ লাগছিলো। জয়নাতলা ঘাটে একজনে কুশাইর কেটে বেঁচছিলো। শশুর জামাইকে চার আনা পয়সা দিয় বললেন “জামাই, এই পয়সা দিয়া একটা কুশাইর কিনে খাওগা।” শশুরের উদ্দেশ্য ছিলো কুশাইর চিবিয়ে খাবার সময় কুশাইরের ছোবলার ঘষায় জামাইর দাঁত পরিস্কার হবে। জামাই পয়সা হাতে নিয়ে জয়নাতলা গিয়ে দেখেন কুশাইরের দোকানের পাশেই একজনে ভেজা সেদ্ধ বুট বিক্রি করছে। সে কুশাইর না কিনে বুট কিনে খেতে খেতে আসছে, আর দাঁত বের করে বলছে “আব্বা, বুট খাইতে ইচ্ছা অইলো তাই বুট কিনলাম।” শশুর দেখলেন যে গেন্দুর দাঁতের চিপা দিয়ে ভিজা বুটের চোঁচা লেগে আরও বিছছিরি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কি আর করা যায়! নতুন জামাই তো।

 

গেন্দুর সকাল থেকেই পেটটা কেমন ফাঁফা ফাঁফা মনে হচ্ছিল। অত্যধিক গ্যাস জমেছিলো পেটে। বুট খেয়ে আরও গ্যাস বৃদ্ধি পেলো। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল বেরিয়ে যাবে ফস করে। কিন্তু গেন্দুর শশুর সাথে থাকাতে ছাড়তে পারছিলো না। গেন্দু মাঝে মাঝে চিন্তা করছিলো শব্দ না করে চুপি চুপি ছেড়ে দিতে। কিন্তু তার ভয় ছিলো যদি সেটা দুর্গন্ধ ছড়ায়! সাথে শশুর আছে, লজ্জার কথা। নাও চলছিলো দারা দিয়ে। শশুর নায়ের সামনের গলুইয়ে বসেছিলেন কপালে হাত দিয়ে। কপালে রোদ লাগছিলো বিকেলের। নায়ের মাঝির সন্দেহ হলো নায়ের গুড়া দিয়ে পানি প্রবেশ করছে। সে গেন্দুকে বললো “জামাই, দেহুনছে নায়ে পানি ওঠতাছে নিহি।” গেন্দু হুতি দিয়ে পাটাতন তুলে যেই দেখতে নিয়েছে অমনি পুত শব্দ করে কিছু গ্যাস বেরিয়ে গেলো। শশুরের দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো। গেন্দু ধান ক্ষেতের দিকে দৃষ্টি দিলো লজ্জায় পড়ে। একটা চালাকি তার মাথায় এলো। শশুরকে ভুলানোর জন্য সে চলন্ত নায়ের গুড়ায় বসে ধান পাতায় দুই আংগুলের চাপ দিয়ে ধরে চিক করে শব্দ করলো কয়েকবার। শশুর জামাইর চালাকি বুঝতে পেরে বললেন “জামাই, ধানের পাতার শব্দ আগের মতো আর অইব না।” নায়ের মাঝি বুঝতে পেরে চিপা চিপা হাসতে থাকলো। এক সময় ফেককত করে হাসি দিয়ে লগি সহ ঢলে পড়লো পানিতে। শশুর তাকে টেনে উঠালেন। নাও আবার চললো। আসরের নামাজের জের ওয়াক্তে গিয়ে তারা শশুরবাড়ি পৌঁছলো। নতুন জামাই আসতে দেখে সমুন্দির বউরা বাড়ির ঘাটে অপেক্ষা করছিলো। গেন্দু মিয়ার মনে পড়লো করিম বকসের উপদেশের কথা। সালামাল্কি দিয়ে ভাবীদের সাথে হাসি তামসা মস্করা করতে। তাই, গেন্দু বলে উঠলো “সালামালাইকুম, ভাবীসাবেরা, আইলো কইল আপনের বাপেরা।” শশুর জিহবায় কামর দিয়ে বললেন “জাউরাডায় ইডা কী কয়।”

৫/১২/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ
Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/





আব্দুল হক স্যার বই ছুড়ে মারলেন

আব্দুল হক স্যার বই ছুড়ে মারলেন

(স্মৃতি কথা)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

[প্রফেসর ডা. আব্দুল হক স্যার ছিলেন একজন সৎ ও আদর্শবান মানুষ। তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ছিলেন। তিনি উক্ত কলেজের প্রিন্সিপাল এবং ময়মনসিংহ বিএমএ-র প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন]

 

১৯৮৩ সন। ফার্স্ট প্রফেসনাল পরীক্ষা পাস করে এমবিবিএস তৃতীয় বর্ষে ওঠলাম। বড়ভাইদের পরামর্শ নিয়ে কিছু নতুন বই কেনলাম ঢাকার নিউমার্কেট থেকে। ফার্স্ট প্রফেসনাল পরীক্ষা হলো এমবিবিএস কোর্সের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। এনাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হাই ফকির স্যার থাকাতে আরও কঠিন হয়ে পড়েছিলো এই পরীক্ষা। এই পরীক্ষা এক চাঞ্চেই ভালো নম্বর পেয়ে পাস করাতে আমার মনের মধ্যে ফুরফুরে ভাব ছিলো। জিন্সের পেন্ট বানালাম। একটু স্টাইল করে হাটার চেষ্টা করলাম। কিন্তু স্টাইলে হাটা হচ্ছিলো না। আগে থেকে অভ্যাস না থাকলে কি করে স্টাইল আসবে? থার্ড ইয়ারের সব ক্লাস ঠিকমতো হচ্ছিলো না। বন্ধুরা মিলে ট্যাং ট্যাং করে ঘুরে বেড়াতাম। একসাথে ঘুরে বেড়ানোর বন্ধুদের মধ্যে ছিলো নজরুল, সদর, মোহাম্মদ আলী খান, সেবাব্রত, সফি, নাসিম, মাহবুব, খোরশেদ, সাধারণত এরাই। এনাটমির ডিসেকশন হলের সামনে, এখন যেখানে অডিটোরিয়াম আছে, এখানে বসে আড্ডা দিতাম। একবার আড্ডার সময় দেখলাম হঠাৎ আমাদের মাঝে নাসিম নেই। কিভাবে উধাও হয়ে গেলো আমরা বুঝলাম না। আসলে ওর একটু বেশী শয়তানি বুদ্ধি ছিলো। আমাদেরকে চমকিয়ে দেয়ার জন্য পেছন থেকে স্যানিটারি পাইপ বেয়ে নিচে নেমে গিয়েছিলো।

 

ডিসেকশন হলের উপর তলায় বিল্ডিং ছিলো না। এখন ওটার উপরে গেলারি ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ হয়েছে। তখন প্যাথলজি ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ মিলে একটা বিভাগ ছিলো। মাইক্রোবায়োলজি প্যাথলজির একটা সাবজেক্ট ছিলো। পড়াতেন প্রফেসর ডাঃ আবু আহমমেদ স্যার। স্যার খুব মজা করে পড়াতেন। মুখে হাসি লেগেই থাকতো। স্যারের সব চুল পাকা ছিলো। মাথায় ধব ধবে সাদা চুল ছিলো। তাই আমরা আড়ালে পাকু স্যার বলতাম।

 

প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ছিলেন প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হক স্যার। আসলে আমি স্যারকে তখনও ভালো ভাবে চিনিনি। বিভাগীয় প্রধানের রুমের সামনের করিডোর দিয়ে আমি ও নজরুল পশিম দিকে হেটে যাচ্ছিলাম খুব সম্ভব ছাত্রসংসদ রুমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। আমার ডান হাতে দু’টি নতুন বই ছিল। বই দু’টির কভারের রঙ ছিলো লাল। বইয়ের অথর ছিলেন প্রফেসর ডাঃ এম এ খালেক স্যার। বলা হতো এম এ খালেকের প্যাথলজি বই। প্রাক্টিকেল পার্টসহ আরেকটা প্যাথলজি বই ছিলো নিল রঙের কভারের। ওটার অথর ছিলেন প্রফেসর ডাঃ কাজী খালেক স্যার। বলা হতো কাজী খালেকের বই। ছাত্র জীবনের এই খালেক স্যারদের ওজন মাপার মতো অতোটুকু জ্ঞান আমার ছিলো না। স্যারদের পরিচয় পেয়েছি ডাক্তার হবার পর এম ফিল কোর্স করার সময় আমার স্যারদের মুখে তাদের ইতিহাস শুনে। যাহোক, যখন বিভাগীয় প্রধানের রুমের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হক স্যার বের হলেন। আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন “এই দাড়াও।” দাড়ালাম। “দেখি কী বই এগুলো” বলে আমার হাত থেকে লাল রঙের বই দু’টি নিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করলেন। আমি খুব খুশী খুশী ছিলাম এই ভেবে যে আমি থার্ড ইয়ারে উঠেই নতুন চক চকে বই কিনে ফেলেছি। দেখে স্যার খুব খুশী হবেন। কিন্তু একি! স্যার রাগে চোখ বড় বড় করছেন। এদিক সেদিক তাকাছেন। ঠোঁট বির বির করে কি যেনো বকছেন। এক পর্যায়ে স্যারের রুমের বিপরীত দিকের দু’রুমের চিপা দিয়ে একটি কাঁচের জানালা ছিলো। সেই জানালার একটি পাল্লা খোলা ছিলো। বই দু’টি ছুড়ে মারলেন সেই জানালা দিয়ে। জানালার গ্রিলের সাথে বারি খেয়ে ফ্লোরে পড়ে গেলো। দেখলাম মাঝখানের সেলাই ফেটে গেছে। স্যার রুমের ভেতরে চলে গেলেন। আমি হত বিহবল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কীসের থেকে কী হলো কিছুই বুঝলাম না। দেখি নজরুল ভেগে পড়েছে। আমি বই দু’টি কুড়িয়ে তুলে ধুলা ঝেরে আবার হাতে তুলে নিলাম। চলে এলাম। কিন্তু কিসে থেকে কী হলো কিছুই বুঝলাম না।

 

কয়েকদিন পর প্যাথলজি প্রথম লেকচার ক্লাস করলাম আব্দুল হক স্যারের। তিনি প্রথম ক্লাসে অনেক নীতিকথা শুনালেন। তিনি ইংল্যান্ড থেকে এমআরসিপ্যাথ পাস করেছেন। সেখানকার জ্ঞান গড়িমার কিছু বক্তব্য তুলে ধরলেন। বুঝলাম প্যাথলজি বিষয়ে তিনি অগাধ জ্ঞান রাখেন। দেশী লেখকদের পাঠ্য বই পড়া যাবে না। লাল খালেক, নীল খালেক পড়ে পরীক্ষা দিতে এলে ফেল করিয়ে দেবেন। পড়তে হবে বিদেশি লেখক মুইসের প্যাথলজি বই। আমি আবার নিউমার্কেট গিয়ে মুইসের প্যাথলজি বই কিনে নিয়ে এলাম। তবে, পাস করার জন্য কাজী খালেক স্যারের বইটিই বেশী কাজে লেগেছে। আমি যখন শিক্ষকতা করি তখন পড়িয়েছি রবিন্সের প্যাথলজি বই। সাথে কাজী খালেক। কিন্তু ছাত্ররা আমার মেধাবী ছাত্র জহিরের বই না পড়ে পরীক্ষা দিতে আসছে না মনে হচ্ছে।

৫/১২/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/