মাছেরে

মাছেরে

(টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক মাতৃভাষায় লেখা স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

গ্রামে আমরা কেউ ঘাস কাটতে গেলে তারে কইতাম ঘাসেরে গেছে। আর কেউ মাছ ধরতে গেলে কইতাম মাছেরে গেছে। চেংরাকালে আমি মাছেরে গেতাম। আংগ বাড়ি সখিপুরের পাহার অঞ্চলে। উনা মাসে পাহারে পানি থাকত না। তাই মাছও পাও যাইত না। ভর অঞ্চলে হারা বোছরই পানি থাকত। মাছও মারন গেত হারা বোছর। উনা মাসে পাহাইরারা য়াটে তিগা মাছ কিন্যা আইন্যা খাইত। ১৫/২০ মাইল দূরে তনে মাঝিরা মাছ কান্দে কইরা নিয়া আইত পাহারে য়াটের দিন অইলে। এতদুর আনতে আনতে মাছ কুইয়া বকবকা অইয়া গোন্দ উইঠা যাইত। হেইন্যা ফালাই দিয়ন নাগত। তাই উনা মাসে জিওল মাছ, মাগুর মাছ, কই মাছ, ছাইতান মাছ, টেংরা, বাতাসি, গুইটা বাজাইল ছাড়া আর কিছু পাও গেত না। পাহাইরা মাইনষে জিওল মাছ, মাগুর মাছ, কই মাছ, ছাইতান মাছ বুরকা- পাইল্যায় পানি দিয়া জিয়াইয়া য়াকত। কয়দিন ভইরা য়াইন্দা খাইত। পঁচা মাছ গুলাইনের পাতা দিয়া য়াইন্দা খাইলে গোন্দ করতো না। ইন্যা খাইয়া পেট ভাটভুট করলে গোন্দবাদাইলের পাতা দিয়া হাক য়াইন্দা খাইত। বাইস্যা মাসে পাহারের ধাইরা দিয়া য়াট বইত। হেনু ভৌরারা নানান জাতের মাছ নিয়াইত বেচপার নিগা। বেশিরভাগই ছিল নোরাফেকা মাছ। পদ্মা নদীর ইলসা মাছও এই সব য়াটে নিয়াইত নাইয়ারা।

আমি যেবা কইরা মাছ মারতাম হেইন্যা হুইন্যা আন্নের মোনয়ব আমি বোধকরি বালা ছাত্র আছিলাম না। আমি খুব বালা ছাত্র আছিলাম। হেসুমকার দিনে বাটাজোর বি এম হাই স্কুল অত্র অঞ্চলের মদ্যে সব তিগা বালা স্কুল আছাল। হেই স্কুল তিগা এস এস সি পাস করছি য়েকর্ড ভাইঙ্গা, মানে আগে যারা পাস করছাল তাগ চাইতে বেশি নম্বর পাইছিলাম, জামাল স্যার কইছেন। এহন পর্যায়ের নিহি কেউ আমার নাগালা বালা এজাল্ট করপায় নাই।

আমি স্কুল তিগা আইয়া চাইরডা খাইয়া মাছেরে গেতাম। পুশ মাস তিগা জৈস্টি মাস পর্যন্ত পাহারে পানি থাকত না। তাই মাছেরে যামু কুনু? পাহারে পানি আইলে পানির নগে মাছ আইত। মাছ আইলে মাছেরে গেতাম। জৈস্টি মাসের হেষের দিকে যেদিন বেশি বিস্টি অইত হেদিন চালার বেবাক পানি ঘোনা ঘুনিতে নাইমা বাইদ ভইরা গেত। বাইদের পানিতে জোরা ভইরা গেত। জোরা অইল বাইদের মইদ দিয়া চিকন খালের নাগালা। জোরার পানি গিয়া নামত চাপরাবিলে। চাপরা বিল পানি দিয়া ভইরা গেত। চাপরা বিল উনা মাসেও হুকাইত না। হেনুকার মাছ বেশি পানি পাইয়া উজাইতে উজাইতে আংগ বাইদে আইয়া পড়ত আন্ডা পারনের নিগা। চলাচলা পুটি, হেলাম পুটি, টেংরা, গোলসা, নোন্দা, হৈল, বোয়াল, পাত্যা, ছাইতান, আগ্যা, ইচা, নোন্দা, বাইং, এবা নানান জাতের মাছ পেট ভর্তি আন্ডা নই আইত পাহাইরা হোতের মইদ্যে আন্ডা পারনের নিগা। আমরা বিস্টিত ভিজা, ছাতি মাথায় দিয়া, কলাপাতা পাথায় দিয়া, নয় মাতইল মাথায় দিয়া মাছেরে গেতাম। ক্ষেতের বাতর যেনু পানি যাওনের নিগা কাইটা দিত হেডা কইত জোর। আমরা জোরের হোতের পানিতে জালি পাইত্যা খারই থাকতাম। পানির নিচে জালির নগে ঠ্যাং ঠেহাই য়াকতাম। জালিতে মাছ ঢুইকা যেসুম ঠ্যাংগের মদ্যে গুতা মারত হেসুম জালি উচা করতাম। জালি তিগা মাছ ধইরা খালুইর মদে য়াকতাম। খালুই ভইরা যাইত মাছে। হেই মাছের পেট বোজাই আন্ডা থাকত। হেই জোরের মইদ্যে য়াইতে ঠুই পাইত্যা য়াকতাম। সক্কালে বেলা ওঠনের সোম গিয়া ঠুই চাইতাম। ঠুইয়ের আগায় হেই মাছগুনা বাইজা থাকত। ক্ষেতের বাতরে ঠুই উল্টাইয়া মাছ বাইর করতাম। খালুই ভইরা যাইত। মাছের নগে চেকমেকা, কাকরা, কুইচ্যা, টেপা, হামুক, ইন্যাও বাজত। ইন্যা বাইচ্যা পানিত ঢেইল মাইরা ফালাই দিতাম। জৈস্টি মাসে জাংলাভর্তি জিংগা, পোড়ল অইত। বাড়ির পালানে ডাংগা অইত নশনশা। মা হেইন্যা দিয়া মাছ য়ান্না করতেন। ঢলের মাছ নতুন তরিতরকারি দিয়া এবা মজাই যে নাগ ত গো, খাইয়া পেট ডিগ ডিগ করত।

আষাঢ়, শাওন, ভাদ্দর মাসে খালি বিস্টি অইত। বাইদ বোজাই পানি থাকত। পাহারের পাগার, পুস্কুনি, কুয়া, জোরা পানিতে ভইরা থাকত। এইসুম মাছগুনা বাইদে ছড়াই ছিটাই থাকত। আর মাছের পোনা গুনা বড় অইতে থাকত। হেসুম খালি ঠুই পাইত্যা মাছ ধরতাম। ভাদ্দর মাসের হেষের দিকে যখন বিস্টি কইমা যাইত হেসুম বাইদের জমিতে আমন ধানের গোছা নাগাইত। আর আগে এই জমিগুনাতে ছিল আউশ ধান। বেশি ভাগই ছিল ভাতুরি ধান। ভাতুরি ধান কাটার পর ক্ষেতে য়াল বাইয়া কেঁদা বানাইহালত। ধানের গোছা দেওনের আগে মই দিয়া ক্ষেত হোমান করন নাগত। কেঁদা ক্ষেতে মই দেওনের সূম চংগের পাছের পানি হইরা গিয়া মাছ বাইরইয়া দাফ্রাইতে থাকত। এইন্যা ধইরা ধইরা আমরা খালই বোজাই করতাম। কোমরের পিছনে খালই ঝুলাইয়া বাইন্ধা নিতাম। দুই য়াত দিয়া ধরতাম, আর খালই মইদ্যে য়াকতাম। কই মাছ গুনা কেঁদার উপর কাতাইতে থাকত। কি মজাই যে নাগত! আমি, মজি ভাই, জিন্না ভাই, সিদ্দি ভাই, এবা অনেকেই দল ধইরা হেইন্যা ধরতাম। মজি ভাই মইরা গেছে গাড়ি এক্সিডেন্ট কইরা। পাহাইরা বাইদের মাটি খুব সারিল মাটি। কয়দিনেই ধানের গোছা মোটা য়ই গেত। ক্ষেতে হেসুম টলটলা পানি থাকত। হেই পানি দিয়া নানান জাতের মাছ দৌড়াদৌড়ি করত। দেহা গেত। আমরা ক্ষেতের বাতর কাইটা জোর বানাইয়া হেনু বাইনাতি পাইত্যা য়াকতাম। বাইনাতি বাঁশের বেতি দিয়া বুনাইয়া বানান নাগত। বাইনাতির সামন দিয়া ভাটার মাছ ঢোকার পথ আছে, আবার পিছন দিক দিয়া উজাইন্যা মাছ ঢোকার পথ আছে। মাছ ঢোকপার পায়, বাইরবার পায় না। দিনাপত্তি সকালে বাইনাতি চাওয়া য়ইত। বাইনাতি পাতার সুম মুখ কাঠের, নইলে বাঁশের কচি দিয়া বন্ধ কইরা দেও য়ইত। হেইডা খুইলা মাছ খালইর মদ্যে ঢাইল্যা দেও য়ইত। বেশি ভাগ বাইনাতিত গুত্তুম আর দারকিনা মাছ বাজত। ইন্যা পিয়াজ কাঁচা, মইচ, হৌষার তেল দিয়া ভাজা ভাজা কইরা খাইলে কিবা মজাই যে নাগত গ! যেনুকার বাতর মোটা আছাল, হেনুকার বাতর ভাঙ্গাও বড় বড় আছাল। হেনু বাইনাতি না পাইত্যা বড় বড় দোয়ারি পাতন নাগত। দোয়ারি বাইনাতির নাগালা দুইমুরা চোক্কা না। দোয়ারি অইল বাসকর মোত। ইন্যাও বাঁশের হলা দিয়া বুনাইয়া বানায়।

আশ্বিন মাসে বেশি বিস্টি অইত না। ধানের গোছাগুনাও মোটা মোটা অইত। হেইন্যার ভিতর দিয়া মাছ কপ কপ করত। য়ইদের তাপে ক্ষেতের পানি ততা অই গেত। মাছগুনা যেম্মুরা গাছের ছেওয়া পড়ত হেম্মুরা আই পড়ত। আমরা স্কুল তিগা আইয়া বশ্যি নিয়া মাছেরে গেতাম। বশ্যির আধার গাত্তাম খই, কুত্তাডেউয়ার আন্ডা, নয় চেরা দিয়া। চেরাগুনারে জির কিরমিরমির নাগালা দেহা গেত। উন্যারে গাছতলের ভিজা মাটি তিগা কোদাল দিয়া কোবাইয়া বাইর কইরা ছেনি দিয়া টুকরা টুকরা কইরা কাইট্যা নিতাম। বড় বড় পিপড়াগুনারে আমরা ডেউয়া কইতাম। কুত্তার মোত অইলদা য়োংগের ডেউয়ারে কইতাম কুত্তাডেউয়া। গজারি গাছের আগায় পাতা পেঁচাইয়া কুত্তাডেউয়ায় বাহা বানাইয়া আন্ডা পারত। হেই আন্ডা দিয়া বশ্যি হালাইলে বেশি মাছ ধরত। তরুই বাঁশ দিয়া বশ্যির ছিপ বানাইতাম। না পাইলে বৌরাবাঁশের কুইঞ্চা দিয়া ছিপ বানাইতাম। খালই বুনাইতাম তল্যা বাসের বেতি দিয়া। গোছা ক্ষেতে বশ্যি ফালাইলে বড় বড় আগ্যা মাছ ধরত। পানির মদ্যে বশ্যি নাচাইলে আগ্যা মাছ ফালাই ফালাই আইয়া বশ্যির আইংটায় বাইজা পড়ত। খোট্টা দিয়া টানে তুইল্যা হালাইতাম। কোন কোনডা ছুইট্টা গিয়া আড়া জোংগলে গিয়া পইরা হাটি পারতে থাকত। পাতা খুচখুচানির শব্দ হুইন্যা আগ্যা মাছের ঘারে ধইরা খালইর মইধ্যে ভইরা ফালাইতাম। মাছ যাতে তাজাতুজা থাহে হেইজন্য জগের মইদ্যে নয় বদনার মইদ্যে পানি দিয়া জিয়াই য়াকতাম। আগ্যা মাছ জাইরা আছে৷ বদনায় য়াকলে আগ্যা মাছ হাটি মাইরা বাইরই গেত দেইখা হিসার জগে য়াকতাম। শিক্ষিত মাইন্সে আগ্যা মাছরে রাগা মাছ কইত ফ্যারাংগি দেহাইয়া। ভৌরা মাইনষে আগ্যা মাছ খাইত না। তারা গুত্তুম মাছও খাইত না। বংশি-মান্দাইরা চুইচ্চা খাইত। তারা কাছিমও খাইত। কাছিম জোংগলেও থাকত। ইন্যা খুব বড় বড় ছিল। ইন্যারে কইত দুরা।

বাইদের পানির টান পরলে মাছগুনা পাগার, জোরায় গিয়া জরা অইত। আমরা হেইন্যারে খুইয়া, জালি, জাহি জাল, নয় ছিপজাল দিয়া মাইরা খাইতাম। বিষগোটা ছেইচ্ছা পাগারে ছিটাই দিলে মাছ গাবাই উঠতো। গাবাইন্যা মাছ ধইরা আরাম পায়ন গেত। পাগারের মাছ, জোরার মাছ ইন্যা পালা মাছ আছাল না। তাই যে কেউ ইন্যা মারতে পারত। আমরা চন্দের জোরা, আলম ঠাকুরের জোরা, ওহা বেপারির জোরা, খাজাগ জোরা, নাটুগ পাগার, কলুমুদ্দি তাওইগ পাগার তিগা ভরা মাছ মারছি। ঘাট চওনার জোরায় তনে ভরা ইচা মাছ মারছি খুইয়া দিয়া দোয়াইয়া। এনুকার পানি কইমা গেলে কেঁদার নিচে বাইং মাছ বই থাকত। কেঁদা পারাইলে পায়ের নিচে পিচলা নাগত বাইং মাছ। পায়ের নিচ দিয়া য়াত দিয়া কেঁদা হুইদ্যা বাইং মাছ টানে মেইল্যা মারতাম। য়াত দিয়া ধরতে গেলে বাইং মাছ পিচিল্যা যায় গা। একবার করছিলাম কি, এবা কইরা এডা মাছ কেদাসুদ্যা মেইল্যা মারছি, হেডা গিয়া পড়ল এডা ঝোপের ভিত্তরে। আমি ঝোপের ভিতর ফুস্কি দিয়া দেহি মেলা মাইনষের কংকাল, এহেবারে ঠেংগি দিয়া য়াকছে। ডরের চোটে তাত্তারি মাছ মারন বাদ দিয়া বাইত আই পরছি। য়াইতে হুইয়া হুইয়া বাবার নগে হেই কতা কইছি। বাবা কইল যে বংশি – মান্দাইরা কলেরা-বসন্ত হইয়া বেশি মানুষ মইরা গেলে চিতায় না পুইরা এবা ঝোপের মইদ্যে পালা দিয়া য়াকত। হেইন্যা মোনয় হুকাইয়া কংকাল অইছে।

কাতিমাসে বেশি মাছ মারন গেত। বাইদের ছোট ছোট গাতায় ভরা মাছ থাকত। টিনের থালি দিয়া হেই পানি হিচ্চা মাছ ধরতাম। এলকা পানি হিস্তে কষ্ট অইত। হেইজন্যে হাজা ধইরা হিচা মাছেরে গেতাম। পানি হিচা যে যেডি ধরাহারি হেডি ধইরা নিয়াইতাম। শাজাহান ঠিকমোত চোহে দেকত না। কেঁদার মইদ্যে খালি আতাপাতা করত। এই জন্যে যদি কইতাম “শাজাহান, হিচা মাছেরে যাবি নিহি?” শাজাহান কইত “ভাগে নিলে যামু।” আমি যে বোছর সেভেনে পড়ি, হেই ১৯৭৩ সোনে, হে ট্রাক্টরের চাকার নিচে পইরা মইরা গেছে। অহনো তার নিগা আমার পরণ পোড়ে। কেঁদার মইদ্যে মাছ ধরতে গেলে শইলে কেদা নাগত। যতই বালা কইরা গোসল করতাম কানের নতির পাছে কেদা নাইগাই থাকত ধলা অইয়া। খাবার বইলে পড়ে মা হেই কেঁদা আচল দিয়া মুইছা দিত।

কাতিমাসে পাহারের পানি হুকাই গেলে সব মাছ গিয়া চাপরাবিলে জরা অইত। মাছে বিল কপকপ করত। হুনিবার মোংগলবারে চাপরাবিলে মাছ মারনের নিগা মানুষ পিল্টা পরত। হেইডারে কইত বাওয়ার মাছ। বেশি মানুষ একবারে পানিত নামলে মাছ গাবাই উঠতো। তাই ধরাও পড়ত বেশি বেশি। এই জন্য সবাই বিলে মাছেরে যাওনের নিগা ডাহাডাহি পারত। অনেকে পরভাইত তিগাই শিংগা ফুয়াইত। শিংগার ফু হুইন্যা পাহাইরা মানুষ গুনা যার কাছে যেডা আছে হেডা নিয়া ভাইংগা চুইরা আইত চাপরা বিলে। এক নগে জাহইর দিয়া বিলে নামত নানান ধরনের জিনিস নিয়া। হেন্যা অইল মোন করুন চাবি, পলো, টেপারি, ফস্কা, কোচ, খুইয়া, জালি, ছিপজাল, ঝাকিজাল, চাকজাল আরও কত কী! ইলশা মাছ ছাড়া আর যত ধরনের মাছ আছে সব পাও গেত এই বিলে। খালইর চাইরমুরা পাটখরির মোঠা বাইন্দা দিত যাতে খালই পানিত ভাইসা থাহে। বড় বড় খালই ভইরা মাছ আইন্যা উঠানে ঢাইল্যা দিত। মেওপোলা মাইনষে হেইন্যা দাও বটি দিয়া কুইটা পাট খরিতে গাইতা দড়ি দিয়া ঝুলাইয়া অইদে হুকাইয়া হুটকি কইরা য়াকত নাইন্দার মইদ্যে। খাইত কয় মাস ধইরা। চাপরা বিলের আশে পাশের পাহাইরা গ্রামের মানুষ তিগা নিয়া হেম্মুরা হেই আংগারগাড়া পর্যন্ত মানুষ চাপরা বিলের মাছ মারতে আইত। হেই গেরামের নামগুনা আমি কইতাছি হুনুন – গবরচাহা, বৈলারপুর, য়ামুদপুর, বাঘেরবাড়ি, বেড়িখোলা, আন্দি, হুরিরচালা, চেল ধারা, নাইন্দা ভাংগা, গড়বাড়ি, বুড়িচালা, ইন্দাজানি, কাজিরামপুর, আদানি, ভাতগড়া,, ভুয়াইদ, পোড়াবাহা, ছিরিপুর, খুইংগারচালা, চটানপাড়া, ছোট চওনা, বড় চওনা, ঢনডইনা, হারাইসা, বাহার চালা, কাইলা, কৌচা, আড়াই পাড়া, ধলি, জামাল আটখুরা, দাইমা, ডাকাইতা, আরও ভরা গেরাম যেগ্নার কতা অহন মোনাইতাছে না। আমি হুনছি ভৌরারা চাপরা বিলে মাছেরে আইত না। আব ক্যা, তাগ কি মাছের অভাব আছে?




আংগ খালাগ বাড়ি মাইজ বাড়ি, আর বুগ বাড়ি অইল আমজানি। দুইডাই গাংগের পারে। বংশি নদীডারে আমরা গাং কই। আপারে আমরা বু ডাকতাম। জৈস্টি মাসের হেষের দিকে গাং পানিতে ভইরা যাইত। আমি বুগ বাইত গেলে, খালাগ বাইত গেলে বশ্যি নইয়া গাংগে মাছেরে গেতাম। আমজানির এবাদত ভাই, য়শি ভাই, হায়দার ভাই, আর মাইজ বাড়ির ইয়াছিন, ইসমাইল ভাইর নগে বশ্যি বাইতাম। ইয়াসিন ক্যান্সার অইয়া মইরা গেছে। তার নিগাও পরণ পোড়ে। আমার খালাত ভাই। বড় বড় নাইয়া বাইং, গুজা মাছ, হেলাম পুটি, বাইলা মাছ ধরত বশ্যিতে। ধরার আগে মাছে আধার ঠোকরাইত। হেসুম পাতাকাটি পানিতে নাচন পারত। তা দেইখা মোনের মইদ্যেও নাচন আইত। পাতাকাটি তল অইলে খোট্টা দিয়া মাছ তুইল্যা ফালাইতাম। বশ্যির মইদ্যে আটকাইয়া মাছ দাফরাইতে থাকত। কান্তা তিগা বশ্যি খুইলা মাছ খালইর মইদ্যে য়াকতাম। বুগ পাট ক্ষেতে চলাচলা পুটি মাছ দৌড় পাড়ত। হেইন্যা য়াত দিয়াই ধইরা ফালাইতাম। খালুই ভইরা যাইত পুটি মাছে। একটা আগ্যা মাছ ধরছিলাম দেইক্যা য়শি ভাই কয় “শালার পাহাইরায় আগ্যা মাছ ধরছে। আগ্যা মাছ মাইনষে খায়?” অশি ভাই দুলাভাইর চাচত ভাই। হেও মইরা গেছেগা। আগন পুষ মাসে গাংগের পানি কুইমা যাইত। কয়জনে মিল্যা গাংগে ঝার ফালাইত। হেই ঝারে বড় বড় বোয়াল মাছ, আইর মাছ, চিতল মাছ জরা অইত। ডল্যা জাল, নয় ঝাকি জাল, নয় চাক ঝাল দিয়া হেইন্যা ধরত। দুলাভাইরা কয়জনে ভাগে গাংগে ঝার ফালাইছাল। হেই ঝার তনে একটা মস্ত বড় পাংকাশ মাছ

ধরছাল। হেইডা কাইটা ভাগ কইরা নিছাল দুলাভাইরা। হেসুম বু আংগ বাইত্যে আছাল। দুলাভাই হেন তিগা এক ভাগা আংগ বাইত্যে নিয়াইছাল। আমি হেসুম দুল্যা আছিলাম। পাংকাশ মাছের নাম হেদিন হুনলাম। হায়রে মজা নাগছাল হেইডা!

আংগ নানিগ বাড়ি অইল ভরে, য়ৌয়া গেরামে। শিক্ষিত মাইনষে কয় রৌহা। হেনু গিয়াও মাছেরে গেছি। য়াইত কইরা আন্ধাইরের মইদ্যে বোরো ধান ক্ষেতের বাতর দিয়া আইটা যাওনের সোম হলক ধরাই যাইতাম। হলকের আলো দেইখা হৈল মাছ আইগাই আইত। কাছে আইয়া চাই থাকত। হেসুম ফস্কা দিয়া ঘাও মাইরা ধইরহালতাম। যাগ ফস্কা না থাকত তারা পাট কাটনের বাগি দিয়া কোপ মাইরা হৈলের ঘার কাইটাহালত। হৈল মাছ, সাইতান মাছ এক ঝাক পোনা নিয়া ঘুরাঘুরি করত। হেই পোনা খুইয়া দিয়া খেও দিয়া মারতাম। পোনামাছ ভাজি খুব বাসনা করত। এহন বুঝি উগ্না মারন ঠিক অয় নাই।

বাইস্যা মাসে আমি, ফজু ভাই, কাদে ভাই, নজু ডিংগি নাও নিয়া হুক্নি বিলের মইদ্যে গিয়া বশ্যি ফালাইতাম। বড় বড় ফইল্যা মাছ ধরত। নজু আমার তিগা এক বোছইরা ছোট আছাল। হে ছোট বালাই য়ক্ত আমাশা অইয়া মইরা গেছে। আশিন মাসে পানি নিটাল অইয়া গেত। চামারা ধান ক্ষেতের ভিতর হল্কা মাছ খাওয়া খাইত। হেসুম পানিত ছোট ছোট ঢেউ উঠত। আমি আর ভুলু ভাই ডিংগি নাও নিয়া যাইতাম মাছেরে। আমি পাছের গলুইয়ে বইয়া নগি দিয়া নাও খোজ দিতাম। ভুলু ভাই সামনের গলুইয়ে কোচ নইয়া টায় খারই থাকত। বিলাইর নাগালা ছপ্পন ধইরা। মাছে যেই য়া কইরা কান্তা নড়াইত অবাই ভুলু ভাই কোচ দিয়া ঘাও দিয়া ধইরা ফালাইত। আমি পৌকের নাগাল পাছের গলুইয়ে বই থাকতাম। ভিয়াইল আংগ ফুবুগ বাড়ি। হেনু গিয়াও এবা কইরা মাছ মারতাম গিয়াস ভাই, মতি ভাই, সূর্যভাই, সামসু ভাই, জিয়াবুল ভাই, চুন্নু ভাইগ নগে। চুন্নু ভাই, জিয়াবুল ভাই মইরা গেছে। ভিয়াইল আংগ কাক্কুগ বাড়িও। হায়দর ভাইর নগেও এবা কইরা মাছ ধরছি। ভৌরা মাইনষে আশিন মাসে পানির দারার মইদ্যে বড় বড় খরা পাইত্যা নোড়া ফেকা মাছ মারত। ফুবার নগে গিয়া ভরা নোড়া ফেকা মাছ কিন্যা আনছি নায় চইরা। কাতি মাসে তালতলাগ বোগল দিয়া যে বিলগুনা আছাল হেইগ্নার যত মাছ গোলাবাড়ির খাল দিয়া আমজানির গাংগে গিয়া নামত। আংগ গেরামের মাইনষে হেই খালে ছিপ জাল পাইত্যা হেই মাছ ধরত। খালের পাড়ে মাচাং বাইন্দা বইয়া বইয়া ছিপজাল বাইত। এহাকজোনে বাইক কান্দে নইয়া এক মোন দের মোন গোলাবাড়ি তিগা মারা পুটিমাছ আইন্যা উঠানে ঠেংগি দিয়া ঢালত। এত মাছ কিবা কইরা মারে ইডা দেকপার নিগা আমি আর জিন্না ভাই এক নগে গোলাবাড়ি গিয়া য়াইতে মাচাংগে হুইছিলাম। যাওনের সুম দেহি হাইল হিন্দুইরা খালে গুদারা নাই। অহন পাড় অমু কিবায়? ঘাটে কোন মানুষ জোনও আছাল না। জিন্না ভাই কইল “তুই অম্মুহি চা।” আমি চাইছি। ঘুইরা দেহি জিন্না ভাই এক য়াতে কাপর উচা কইরা ধইরা আরেক য়াত দিয়া হাতুর পাইরা খাল পাড় অইতাছে। দিস্ কুল না পাইয়া আমিও কাপড় খুইলা এক য়াতে উচা কইরা ধইরা হাতুর পাইরা পার অই গেলাম। য়াসুইন না জানি। হেসুম পোলাপান মানুষ আছিলাম। কেউ ত আর আংগ দেহে নাই। শরমের কি আছে? গোলাবাড়ি গিয়া দেহি হারা খাল ভর্তি খালি ছিপ জাল। ষাইট সত্তুরডা জাল পাতছে ছোট্ট এডা খালে, ঘোন ঘোন, লাইন দইরা। বেক্কেই য়াইত জাইগা জাল টানে। দিনে বেশি মাছ ওঠে না। য়াইতে নিটাল থাকে দেইখা মাছ খালে নামতে থাহে। দিনে বেক্কেই ঘুমায়। আমি আউস কইরা কয়ডা খেও দিছিলাম। অত বড় জাল আমি তুলবার পাই নাই। তাত্তারি মাচাংগে গুমাই পড়ি। হেষ আইতে ঘুম ভাইংগা যায় জারের চোটে। কাতি মাস অইলে কি অব, য়াইতে জার পড়ত। দেহি য়াত পাও টেল্কায় শান্নিক উইঠা গেছে গা। বিয়ান বেলা কোন মোতে কোকাইতে কোকাইতে বাইত আই পড়লাম। এন্তিগা এবা সর্দি নাগল গ, এক হপ্তা পর্যন্ত সর্দি জ্বর বাইছিল। জ্বর নিয়া কাতি মাসে বিয়ানবেলা য়ইদ তাপাইতে বালাই নাগত। এক নাক ডিবি ধইরা বন্ধ অই থাকত। নজ্জাবতি ফুলের বোটা ছিড়া নাকে হুরহুরি দিলে বাদা আইত। হাইচ্চ দিলে নাক বন্ধ খুইলা গেত। জোড়ে জোড়ে নাক ঝাইরা পরিস্কার করতাম। আমি গোলাবাড়ি একবারই গেছিলাম।

গোলাবাড়ির মাছ মারা নিয়া এডা মজার কতা কই। একবার এডা মেওপোলা য়োগী নিয়া আইল এক বেটা আংগ এলাকা তিগা। কাগজপাতি ঘাইটা দেকলাম সখিপুর আর টাঙ্গাইল তিগা ভরা টেহার পরীক্ষা করছে। খালি টেহাই গেছে। আমি কইলাম “ভরাইত পরীক্ষা করছুইন।” বেটাডায় য়াগ কইরা কই উঠলো “আন্নেরা সখিপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিং য়োগীগ কাছ তিগা টেহা নিয়নের নিগা গোলাবাড়ির খালের মতো জাল ফালাইছুন ক্লিনিক কইরা। গোলাবাড়ির খালে যেবা উজান ভাটি সব জালেই হোমানে মাছ বাজে, হেবা আন্নেগ বেবাক ক্লিনিকেও গেরামের মাইনষের টেহা বাজে। বেটা মাইনষে বিদেশে কষ্ট কইরা টেহা কামাই কইরা দেশে পাঠাইতাছে, আর হেই টেহা আন্নেরা জাল পাইত্যা ছাইব্বা তোলতাছুইন। য়োগী বালা অওনের নাম নাই। খালি টেহা নিতাছুইন। ” আমি কইলাম “য়োগী ডাকতরেরা বালা করবার পাবনা। বেটির জামাইরে দেশে নিয়াই পড়ুন। দেকবাইন এবাই বালা অই যাবো গা। ”

জারের দিনে নানিগ বাড়ির চহের পানি হুকাই গেত। পাগারের পানি পানায় ঢাইকা গেত। আমি আর ফজু ভাই হেই পানিত তিগা খুইয়া দিয়া দোয়াইয়া মাছ মারতাম। ফজু ভাই পানার নিচ দিয়া খুইয়া ঠেইল্যা দিত। পানা হুইদ্যা খুইয়া উচা কইরা ধরত। আমি খাবলাইয়া পানা হরাইয়া দিতাম। হেই খুইয়ায় খইলসা মাছ, চাটা মাছ, কই, জিওল, মাগুর মাছ উঠত। চাটা মাছ খইলসা মাছের নাগালা দেখতে, তে একটু ছোট। আমি চাটারে খৈলসা কইছিলাম দেইকা ফজু ভাই কইল “এই শালার পাহাইরা, চাটা মাছ চিনে না!” তিন আংগুল দিয়া মাথা আর ঘার পেইচা ঠাসি মাইরা ধরন গাগত জিওল মাছেরে। কাতা দেয় দেইকা আমি ডরে জিওল মাছ ধরহাইতাম না। একদিন সায়স কইরা ধরবার নিছিলাম। অবাই একটা কাতা খাইলাম। হায়রে বিষান নইল! বিষের চোটে উজা নাফ পারন নইলাম। কানতে কানতে নানিগ বাইত গেলাম। মামানি কাতা দিওন্যা যাগায় চুনা নাগাই দিলে বিষ কিছুডা কমল। তারপর বিষ নামাইন্যা ঝারা দিল এবা কইরা

আউরা জাউরা বিষের নাম,

কোন কোন বিষের নাম।

অ বিষ ভাটি ছাইড়া যাও।

যুদি ভাটি ছাইরা উজান ধাও,

মা পদ্মার মাথা খাও।

অ বিষ ভাটি ছাইরা যাও।

ঝারা দেওনের ভরাক্ষোন পরে বিষ কোমলে ঘুমাই পড়ি। আমি আর কূন্দিন কাতা খাই নাই। কাতা খাইয়া এডা উপুকার অইছে। য়োগিরা যেসুম কয় “য়াত পাও এবা বিষায় জানি জিওল মাছে কাতা দিছে। ” হেসুম আমি বুঝি কিবা বিষায়।




শাওন ভাদ্দর মাসে আমজানি দুলাভাইগ পালানের পাট কাটার পরে কোমর তুরি পানি থাকত। হেই পানিত চেলা, মলা, ঢেলা, বাতাসি, তিতপুটি, এবা ভরা মাছ থাকত। দুলাভাইর নগে মুশুরি টাইনা হেইন্যা ধরতাম হিসার পাইল্যা বোজাই কইরা। হিসার পাইল্যা পানিত ভাইসা থাকত। মাছ ধইরা পাইল্যায় য়াকতাম।

চৈত বৈশাখ মাসে পানি হুকাই যাইত। নানিগ বোরো ক্ষেতে হিচা দিয়া পানি হিচপার নিগা গাড়া কইরা মান্দা বানাইত। হেই মান্দা হিচা মাছ ধরতাম। অইদের তাপিসে কাঠের নাও হুকাইয়া বেহা ধইরা গেত দেইখা ইন্যারে পুস্কুনির পানিতে ডুবাই য়াকত। নায়ের পাটাতনের নিচ দিয়া মাছ পলাই থাকত। আমরা দুই তিন জোনে মিল্যা ঝেংটা টান মাইরা নাও পারে উঠাই ফালাইয়া নাও তিগা মাছ ধরতাম। মামুরা পুস্কুনিতে ডল্যা জাল টাইনা বড় বড় বোয়াল মাছ ধরত। জালে মইদ্যে বাইজ্যা হেগ্নায় হাটিহুটি পারত। মামুগ কান্দের উপুর দিয়া নাফ দিয়া যাইত গা বড় বড় বোয়াল। পুস্কুনির পাড়ে খারইয়া আমরা তামসা দেখতাম।

মাছ মারনের এবা ভরা কতা লেহন যাবো। কিন্তু এত সোময় আমার নাই। আন্নেরা ত জানুইনই আমি একজোন ডাকতর মানুষ। ডাকতরে গ কি অত সোময় আছে? একটা হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের প্রধান আমি। দিনাপত্তি বিয়ানবেলা সারে আটটা তিগা বিকাল আড়াইডা পর্যন্ত হেনু কাম করন নাগে। বৈকাল চাইরডা তিগা য়াইত নয়ডা পর্যন্ত নিজের প্রাইভেট ল্যাবরেটরিতে কাম করি। হেনু গেরামে তিগা মেলা লোক আহে। তাগ নগেও কতা কওন নাগে। শুক্কুরবারে বন্ধ থাহে। হেদিন য়াবিজাবি কাম করি। চাইরডা মেডিকেল জার্নাল সম্পাদনা করন নাগে আমার। বই লেহি। কম্পিউটারের সফটওয়্যার বানাই বিক্রি করি। ছাদবাগান করি। অনলাইনে ক্লাস নেই। জুমে মিটিং করি। ইউটিউব ভিডিও বানাই। মেয়াগ নগে, নাতি নাত্নিগ নগে, বন্ধুগ নগে, শালা সুমুন্দি গ নগে ভিডিও কলে কতা কইতে য়য়। এবা আরবিলের মইদ্যে থাকি। আন্নেগ নগে মাছ মারা নিয়া আর লেহনের সোময় নাই। অহন চেম্বারে যামু, থাইগ্যা। দোয়া করুইন জানি।

১৩/৭/২০২১ খ্রি.

ময়মনসিংহ

 

তুষারের সাথে ভ্রমণ

তুষারের সাথে ভ্রমণ
(অন্য রকম ভ্রমণ কাহিনী)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ডাঃ তুষারের সাথে আমার আগে পরিচয় ছিল না। পরিচয় হয় পিজিতে এম ফিল পড়তে গিয়ে ১৯৯৩ সনের জুলাই সেসনে। আমি পরছিলাম প্যাথলজি নিয়ে আর ডাঃ তুষার নিয়েছিলেন মাইক্রোবায়োলজি। কোন একটা সাব্জেক্ট কমন ছিল আমাদের। সেটা হেমাটোলজি না বায়োকেমিস্ট্রি তা আমার মনে নেই। ফতুয়া পড়ে তিরিং বিরিং করে হাটতেন তুষার। পেছন দিক থেকে তালুকদার ভাই বলে ডাক দিতেন। ডাঃ মুসা আমার এমবিবিএস-এর সহপাঠী। সেও মাইক্রোবায়োলজি পড়তো। মুসাকে বললাম
– ইনি কে যেন? খুব আপন করে ডাক দেন?
– ওর নাম তুষার। ডাঃ শামসুজ্জামান তুষার। খুব টেলেন্ট। এমবিবিএস-এ আমাদের এক বছর জুনিয়র। খুব ভালো ছেলে। ময়মনসিংহের ফুল বাড়িয়ায়ই বাড়ি। পাশ করেছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে।
এরপর থেকে লক্ষ্য করতাম তুষার আমাকে খুব পছন্দ করেন। সাদেক ভাই বলে ডাকেন। আমিও তুষার ভাই বলে ডাকি। দুই বছর আমি পিজিতে পড়ি। সেসময় তার সাথে আমার অনেক খাতির ছিল। আমার সাথে ঠাট্টা মস্করা করেও কথা বলতেন। আমিও তার সাথে ঠাট্টা মস্করা করেই কথা বলতাম। আমরা এম ফিল পাস করে ১৯৯৬ সনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ফিরে আসি। তুষার আর আমি মেডিকেল কলেজের উন্নয়ন মূলক অনেক কাজ এক সাথে করি। কলেজ ডিজিটাল করন, বিভিন্ন সেমিনার সিম্পোজিয়াম আয়োজন ইত্যাদি একসাথে করতাম। এখানে এসেও ফতুয়া গায় দিয়ে তিরিং বিরিং করে হেটে কলেজে আসতেন। আর্মিদের মতো খাটো করে চুল কাটাতেন। ক্লিন সেইভ করা থাকতো সবসময়। আমি মনে করতাম তুষারের দাড়ি মোছ গজায়ই নাই। একদিন আমি তাকে বললাম
– মেডিকেল কলেজের টিচার হয়ে ফতুয়া গায় কলেজে আসা ঠিক না।
– তালুকদার ভাই, ফতুয়া গায় দিয়ে আমি খুব আরাম পাই।
যাহোক, তুষার ধীরে ধীরে ফতুয়া ছেড়ে দিয়ে শার্ট গায় দেয়া শুরু করে। আমরা উভয়েই পরিবার নিয়ে কোয়ার্টারে থাকতাম। কিন্তু ফ্যামিলি লেভেলে আমাদের তেমন যোগাযোগ ছিল না।
১৯৯৮ সনের মে মাসে সহকারী অধ্যাপক হবার পর প্রথম এক্সটার্নাল হবার সুযোগ পাই। নভেম্বরের প্রফেশনাল পরীক্ষায় তুষার আমাকে ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে প্যাথলজির এক্সটার্নাল করার জন্য ডিনকে অনুরোধ করেন। তিনিও মাইক্রোবায়োলজির এক্সটার্নাল হন একই কেন্দ্রে। দু’জনেরই প্রথম অভিজ্ঞতা হলো এক্সামিনার হবার। তখন প্যাথলজি বিচাগের প্রধান ছিলেন প্রফেসর ডাঃ খালেক আকন্দ স্যার। আমি স্যারের সাথে বসতাম। সেই থেকেই স্যার আমাকে চেনেন এবং আমাকে ভালোবাসেন। পরের বারও আমরা ওখানে এক সাথেই এক্সটার্নাল এক্সামিনার হয়েছিলাম। তারপর দুজনই এক সাথে যাই খুলনা মেডিকেল কলেজ কেন্দ্রে। ঐসময় প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ছিলেন প্রফেসর ডাঃ মণিমোহন সাহা স্যার। ইচ্ছা ছিল পরীক্ষা নেয়া শেষ করে ঐ এলাকার দর্শনীয় স্থানগুলো দেখবো। কিন্তু পরের দিন থেকেই পরিবহন ধর্মঘট হবে অনির্দিষ্টকালের জন্য বলে আমরা দ্রুত ফিরে আসি ময়মনসিংহে।
২০০২ সন থেকে মেডিকেলের পরীক্ষা পদ্ধতির আমুল পরিবর্তন হয়। নতুন পরীক্ষা পদ্ধতি আয়ত্ত করার জন্য আমি প্যাথলজি বিষয়ে এবং তুষার মাইক্রোবায়োলজি বিষয়ে অনেক ওয়ার্কশপের আয়োজন করি। এমসিকিউ প্রশ্নমালার ব্যাংক তৈরি করি। সেগুলো এখনো বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে ভাইভা টেবিলে ব্যবহার করা হচ্ছে। এজন্যই, আমি মনে করি, প্রফেসর ডাঃ শাহ মুনির হোসেন স্যার আমাকে প্রফেসনাল এমবিবিএস প্যাথলজি পরীক্ষায় এক্সটার্নাল হিসাবে টাঙ্গাইল মির্জাপুর কুমুদিনী উইমেন মেডিকেল কলেজে নিয়েছিলেন এবং প্রফেসর ডাঃ ফজলুর রহমান স্যার তুষার ও আমাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে নিয়েছিলেন।
আমি টাঙ্গাইল শহরে শশুরবাড়ি অবস্থান করে মির্জাপুর যাতায়াত করি পরীক্ষার সময়। কলেজের মাইক্রোবাস দিয়ে প্রতিদিন আমাকে টাঙ্গাইল থেকে মির্জাপুর আনা নেয়া হতো। মুনির স্যার আমাকে মির্জাপুর বিশাল কমপ্লেক্সটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখান। তিনি দানবীর রনদা প্রসাদ সাহা সম্পর্কে আমাকে বিস্তারিত বলেন। তার পরিবারের সবার অবদানের কথা বিস্তারিত বলেন। স্যারের সহধর্মিণী প্রফেসর ডাঃ আভা ম্যাডাম কুমুদিনী ভারতেশ্বরী হোমসে লেখাপড়া করেছেন বলেও জানান। স্যারের শশুর এই প্রতিষ্ঠানেই চাকরি করতেন বিধায় আভা ম্যাডাম এখানেই বড় হয়েছেন বলে জানান। তাই এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি স্যারের অগাধ মায়া। স্যারের শশুরের মূল বাড়ি আসলে আমাদের বল্লা এলাকায়। স্যার সেই সময় আমাকে অনেক যত্ন করে খাওয়ান। পুকুর থেকে টাটকা মাছ ধরে রান্না করা হয় আমার জন্য। স্যার আমাকে যত্ন করেন বলে অফিস স্টাফরাও আমাকে খুব খাতির করে।
শেষের দিন থেকে টাঙ্গাইল ফেরার পথে একটা মজার ঘটনা ঘটে। মাইক্রোবাস চলার পরই বিশ্রি একটা গন্ধ পেতে থাকি। আমি ড্রাইভারকে বললাম “গাড়িতে কী উঠিয়েছিলেন যে এত বিশ্রি গন্ধ করছে?” ড্রাইভার বললেন “না, তেমন কিছুত উঠাই নি।”
– তয় এত দুর্ঘন্ধ কেনো?
– বুঝতে পারছি না,স্যার।
– গাড়ি থামিয়ে ভালো করে চেক করুন।
ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে তন্ন তন্ন করে চেক করলেন কিছু পেলেন না। আমি গাড়িতে ডিওডোরেন্ট স্প্রে করতে বললে তিনি স্প্রে করলেন। গাড়ি আবার চললো। কিছুক্ষণ পর আবার তীব্র আকারে দুর্গন্ধ শুরু হলো। আবার স্প্রে করা হলো। কাজ হলো না। এক সময় জ্যামে পড়ে গাড়ি থামলো। এবার আরও তীব্র হলো দুর্গন্ধ। জ্যামে আটকে পড়া সামনের একটা ট্রাকে আমার চোখ গেলো। দেখি ট্রাক বোঝাই মুরগির পায়খানা ঢেউ খেলছে। বুঝতে পারলাম এটা থেকেই দুর্গন্ধটা আসছে। আমি ড্রাইভারকে ব্যাখ্যা করে বললাম আমাদের সামনে থেকে এই মুরগির পায়খানা সব সময় দুর্ঘন্ধ ছড়াচ্ছে। জ্যাম কেটে গেলে আপনাকে দ্রুত এই ট্রাকটাকে ওভারটেক করে চলে যেতে হবে।
এরপর তুষার আর আমি এক্সটার্নাল হয়ে পরীক্ষা নিতে গেলাম রাজশাহী মেডিকেল কলেজ কেন্দ্রে। সেটাও ছিলো ২০০২ সনের মে মাসের পরীক্ষা। সকালে ময়মনসিংহ থেকে বাসে রওনা দিয়ে রাত নয়টার পর রাজশাহী গিয়ে পৌছলাম। প্রিন্সিপাল ছিলেন প্যাথলজির প্রফেসর ডাঃ ফজলুর রহমান স্যার। স্যার তখন নতুন বাড়ি করে সেই বাড়িতে থাকেন। নিচতলায় প্যাথলজি প্রাক্টিস করেন। তাই প্রিন্সিপালের সরকারি বাসভবনটি খালি পড়ে থাকায় এক্সটার্নাল এক্সামিনারদের জন্য থাকার কাজে ব্যবহার করা হতো। আমরা গিয়ে উঠলাম সেখানে। আমাদের দেখাশোনা ও খাওয়ানোর জন্য একজন ভালো এবং দক্ষ কেয়ারটেকার ছিল। তার নাম ভুলে গেছি। সেবার সেখানে ৭-৮ দিন অবস্থান করেছিলাম। পরীক্ষা নেয়া শেষ করে দুপুরের খাবার খেয়ে, সামান্য কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে প্রতিদিন তুষারকে নিয়ে বেড়াতে বেড় হতাম। কোথায় বেড়াবো সে সিদ্ধান্তটা তুষারই নিতেন। কারন, তিনি এই মেডিকেল কলেজেরই প্রক্তন ছাত্র ছিলেন। তিনিই বেশী জানেন কোথায় কোথায় যেতে হবে। তিনি আমাকে প্রথমেই দেখালেন শাহ মকদুম (রঃ)-এর মাজার। এই পীর সম্পর্কে আমার তেমন কিছু জানা ছিল না। ডাঃ তুষার বেশ কিছু কেরামতির কথা বললেন। লক্ষ করলাম তিনি আধ্যাত্মিক বিষয় বেশ জানাশোনা।
শাহ মখদুম রূপোশ (১২১৬-১৩১৩ খ্রিষ্টাব্দ) বাংলার প্রথিতযশা সুফী সাধক এবং ধর্ম-প্রচারকদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষার্ধে এবং চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলাদেশ তথা রাজশাহী অঞ্চলে ইসলামের সুমহান বানী প্রচার করেছিলেন। তার অনুপম ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে শত শত মানুষ ইসলাম ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। মূলত শাহ মখদুমের মাধ্যমেই বরেন্দ্র এবং গৌড় অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম বিস্তার লাভ করে।
পরেরদিন বিকেলে পদ্মানদীর তীর ঘেষে বেশ কিছুক্ষণ হাটলাম। পদ্মানদীর কাল্পনিক সৌন্দর্য বাস্তবে উপভোগ করলাম। পরের বিকেলে শহর দিয়ে ঘুরলাম। তুষার আযব আযব জায়গায় গিয়ে স্তব্ধ হয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেন। আমি তার কাছে জানতে চেয়েছি “এখানে দেখার কী আছে?” তুষার বলেছেন “সাদেক ভাই, আপনে বুঝবেন না। এখানে আমরা দু’জন যে কত সময় কাটিয়েছি!”
– আপনারা কী প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন?
– জি।
– ভাবী আপনার ক্লাস মেট ছিলেন?
– জি।
– ভাবীকে দেখে ত তা মনে হয় না। ভাবী এতো নরম সভাবের মানুষ যে সামান্য উঁচু স্বরে কথা বললে মনে হয় কেঁদে দিবেন। ওনার পক্ষে কী করে সম্ভব প্রেম করা?
– সাদেক ভাই, ঠিক বলেছেন। আমি ক্লাসের অন্যান্য মেয়েদের সাথে তুলনা করে দেখেছি ও একটু আলাদা। ভেবে দেখলাম এমন বৌই আমার দরকার। আমি অবুজ থাকতেই আমার বাবা ইন্তেকাল করেছেন। মা আমাকে অনেক কষ্ট করে বড় করেছেন। সেই মায়ের জন্য এমন নরম সভাবের ছেলে বৌই প্রয়োজন। আমি ছিলাম ক্লাসে ফার্স্ট বয়। ছিলাম চঞ্চল। রাজনীতিও করতাম। একদিন তাকে আমার ইচ্ছার কথা জানালে সে আর না করতে পারেনি। মাকে একদিন রাজশাহীতে হোস্টেলে এনে ওকে ডাক দিয়ে মায়ের পা ধরতে বলি। ও তাই করে। মাও ওর প্রতি সন্তুষ্ট হয়। এভাবেই আমাদের মধ্যে আন্ডারস্ট্যান্ডিং চলতে থাকে এবং পরিশেষে বিয়ে হয়। আমার শশুরবাড়ির সবাই আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছেন। ওই শুধু রয়ে গেছে এদেশে। শশুরের অনেক জমি আছে শহরে। এগুলো এখন আমাকেই খোজ খবর নিতে হয়। কোর্সে থাকাকালীন ওকে নিয়ে কত জায়গায় যে ঘুরেছি! যেসব জায়গায় আমরা সময় কাটিয়েছি সেসব জায়গায় গিয়ে গিয়ে আমি আজ কিছুক্ষণ করে সময় কাটালাম। আপনি এর গুরুত্ব বুজবেন না।
তুষার আমাকে চারটা বাসায় দাওয়াত খেতে নিয়ে যান রাজশাহী শহরে। একজন হলেন তারই ক্লাস মেট ডাঃ আসাফউদ্দৌলা। তখন তিনি এম ডি (প্যাথলজি) কোর্সে ছিলেন। এখন প্রফেসর ও প্যাথলজি বিভাগের প্রধান। আরেকজন তার ক্লাস মেট বান্ধবী, নামটা মনে নেই, তার বাসায়। আমাদেরকে খুব করে আপ্যায়ন করান। তার ছোট ছোট দু’জন ছেলে-মেয়েকে তুষারকে দেখিয়ে বললেন “দেখেছ, এই সেই তোমার তুষার আংকেল, আমাদের ক্লাসের খুব নাম করা ছাত্র ছিলো, আমাদের ফার্স্ট বয়।” বাচ্চা ও বাচ্চার মা অনেক্ষণ ফার্স্ট বয়ের দিকে তৃপ্তি নিয়ে তাকিয়েছিল। মনে হলো তারা ফার্স্ট বয়কে খাওয়াতে পেরে ধন্য হলেন। আমিও ফার্স্ট বয়ের সাথে দাওয়াত খেতে পেরে ধন্য হলাম।
মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ভাইর বাসায় তুষার একদিন দাওয়াতে নিয়ে গেলেন। সেখানেও আমরা খুব খেলাম।
মাইক্রোবায়োলজির আরেকজন সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ ইফতেখার ভাইও দাওয়াত খাওয়ালেন তুষারকে। সাথে আমিও খেলাম। কী কী খেয়েছিলাম তা এতদিন পর ভুলে গেছি। তবে প্রত্যেকটা দাওয়াত খুব উপভোগ্য ছিল।
সে বছর রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অডিটোরিয়াম উদ্ভোদন হয়। কলেজের বার্ষিক সাংস্কৃতিক সপ্তাহের সমাপনী অনুষ্ঠানের রাতের মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানে প্রিন্সিপাল স্যারের সাথে আমরা উপভোগ করি। আমি প্রিন্সিপাল ডাঃ ফজলুর রহমান স্যারকে একবার অনুরোধ করি “স্যার, রাজশাহীতে সহজে আসা হয় না। এবার যখন এসেছি আপনি আমাদের কোথায় বেড়াতে হবে তার একটা গাইড লাইন দেন এবং বেড়ানোর বন্দোবস্ত করে দেন। রাতে স্যারের ল্যাবরেটরিতে গেলাম। স্যার কাজের ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন জনের সাথে ফোনে কথা বললেন আমাদের দর্শনীয় স্থানগুলোর এপয়েন্টমেন্ট-এর জন্য। কথামতো একদিন ভাইবা নেয়া শেষ করে রাজশাহীর বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম দেখতে গেলাম। আমরা পৌঁছাতে পৌঁছাতে অফিস টাইম শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিউরেটর সাহেব বললেন ” প্রিন্সিপাল সাব রিকোয়েস্ট করেছেন, তাই আমি আপনাদের আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করছি। ” বিলম্বে উপস্থিত হওয়াতে আমরা দুঃখ প্রকাশ করলাম। কিউরেটর সাহেব খুব ভালো মানুষ। তিনি আইনত অবসরে গেছেন। তিনি এত ভালো এবং দক্ষ যে কর্তৃপক্ষ তাকে এখানেই রেখে দিয়েছেন। তিনি খুব আগ্রহ নিয়ে ঘুরে ঘুরে অনেক কিছু দেখালেন। দেখার মতো অনেক কিছু আছে সেখানে। আমি তার দু’একটা উল্লেখ করতে চাই। বড় বড় পাথরে খোদাইকরা কারুকার্যখচিত দু’টা মেহরাব দেখালেন কিউরেটর সাব। মসজিদের যে স্থানে ইমাম দাড়ান সেই স্থানের সামনের কার্ভ ওয়ালটা হলো মেহরাব। মেহরাব সুন্দর করে বানানো হয়। মজার ব্যাপার হলো মিউজিয়ামের সেই পাথরের বিপরীত দিকে খোদাইকৃত বিভিন্ন দেবদেবীর মুর্তি আছে। তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন “ডাক্তার সাব, একই পাথরে একদিকে মসজিদের মেহরাব, আরেক দিকে মন্দিরের মূর্তি থাকার ব্যাখ্যা দিন।” আমি অপারহতা প্রকাশ করলাম। তিনি ব্যাখ্যা দিলেন এভাবে “সম্ভবত, এই বিরাট পাথরখানা প্রাচিনকালে হিন্দুদের মন্দিরে স্থাপিত ছিলো। পরবর্তীতে সে এলাকার সব হিন্দু কনভার্ট হয়ে মুসলিম হয়ে যায়। মন্দিরটি আর ব্যবহার না করাতে এক সময় ধংস হয়ে যায়। মুসলিমরা দামী পাথরটি সংরক্ষণ করে মূর্তির দিকটা সিমেন্ট কংক্রিট দিয়ে ঢেকে ফেলে। বিপরীত দিকে খোদাই করে মসজিদের মেহরাবের আকৃতি দিয়ে মসজিদে প্রতিস্থাপন করে। কালের আবর্তে সেই মসজিদটিও ধংস প্রাপ্ত হয়। পরবর্তীতে প্রত্নতাত্ত্বিকগণ সেই পাথর সংগ্রহ করে এই যাদুঘরে সংরক্ষণ করে।
– মুসলিমরা মূর্তিসহ মসজিদের দেয়ালে লাগালো কেন?
– মুসলিমরা বিধর্মীদের মূর্তিতে আঘাত করতো না। এত একটা দামী পাথর তারা মসজিদের কাজে লাগিয়েছে মূর্তিগুলো সিমেন্ট কংক্রিট দিয়ে ঢেকে দিয়ে। সাধারণ মুসুল্লিরা হয়তো জানতেনই না।
কিউরেটর সাব কয়েকটি দামী পাথরের মূর্তি দেখালেন হিন্দু সম্প্রদায়ের ভগবান শ্রীকৃষ্ণ-এর। তিনি বললেন
– লক্ষ্য করুন, শ্রীকৃষ্ণ-এর মূর্তিগুলোর অবয়ব ও পোশাকের মধ্যে পার্থক্য আছে। কোনটি খালি গায়, আবার কোনটি বস্ত্রাবৃত।
– এমন হলো কেন?
– এই মূর্তিটা গরম আবহাওয়াযুক্ত দেশের তৈরি ভাস্কর্য শিল্পীর। শীল্পিগণ তাদের ভগবানকে কল্পনায় সর্বশক্তিমান করে নির্মাণ করেন। বাস্তবে রাজাকে তারা দেখেন সর্বশক্তিমান। তাই, তাদের তৈরি মূর্তি তাদের দেশের রাজার মতো হয় কিছুটা। গ্রীষ্মপ্রধান দেশের রাজারা শরীর তেমন আবৃত করতো না। তাদের গলায় মালা ও শরীরে দামী দামী অলংকার থাকত। তাই এসব দেশের শ্রীকৃষ্ণর মূর্তিও এমন দেখতে। এই মুর্তিটাও কিন্তু শ্রীকৃষ্ণর। অথচ এটা দেখুন চাদরে ঢাকা শরীর। শ্রীকৃষ্ণ ত দুই রকম হবার কথা না। এই মূর্তির শিল্পী যেহেতু শীত প্রধান দেশের। এদের কল্পনায় শ্রীকৃষ্ণও এই রকম। আমি যাদুঘরের উপর অনেক প্রশিক্ষণ নিয়েছি বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে মিশরে। আমার সে জ্ঞান থেকে এসব বলছি।
– আচ্ছা, শ্রীকৃষ্ণই ত, হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশ্বাস মতে, ভগবান। এই মূর্তিতে দেখা যাচ্ছে তার হাতে জপ মালা। তিনি কার নাম জপ করেন?
– এটার সঠিক উত্তর আমার জানা নেই।
সেই কিউরেটর সাবের কথা আমার বারবার মনে পড়ে। একদিন দেখলাম জনপ্রিয় টিভি শো ইত্যাদিতে সেই কিউরেটরের কৃতিত্বর কথা প্রচার করা হচ্ছে। অথচ তার নাম আমি ভুলে গেলাম! ওখানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা বিভাগের একজন প্রফেসরও বসেন। তিনি একজন গবেষকের সাথে কথা বলছিলেন। আমাদের পেয়ে তিনি বেশ খুশী হলেন। তিনি বললেন যে মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল সাব আপনারা আসবেন বলে ফোন দিয়েছিলেন। খুশি হলাম আপনারা এসেছেন বলে। সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে এলাম বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম থেকে।
আমাদের এলাকার ড. ইসমাইল হোসেন পি এইচ ডি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। তিনি বিয়ে করেছেন সেই মিউজিয়ামের কিউরেটর সাবের মেয়েকে। গ্রাম এলাকা থেকে যেসব ক্যান্ডিডেট বিশ্ববিদ্যালয়ে এডমিশন টেষ্ট দিতে রাজশাহী যান তারা অনেকেই ইসমাইল সাবের বাসায় থাকে এবং খায়। আজ ইসমাইল সাবকে মোবাইল করেছিলাম
– আপনার শশুর কি বেঁচে আছেন?
– জি, বেঁচে আছেন।
– আলহামদুলিল্লাহ। ওনার নামটা ভুলে গেছি।
– আব্দুস ছামাদ মন্ডল।
পরেরদিন বিকেলে দেখতে গেলাম ছপুরা সিল্ক ফ্যাক্টরি। এখানেও প্রিন্সিপাল স্যার ফোন করে বলে দিয়েছিলেন আমাদেরকে যেন ভালো করে এই প্রজেক্টটি দেখানো হয়। বিশাল সিল্ক ফ্যাক্টরি। কিভাবে রেশমের জন্য গুটিপোকার চাষ হয় তা দেখলাম। কিভাবে তুঁত গাছের পাতা খেয়ে রেশম পোকা বড় হচ্ছে তা দেখলাম। রেশমের সুতা বের করতে দেখলাম। রেশমি শাড়ি বুনাতে দেখলাম।
তারপর দিন গেলাম সোনা মসজিদ স্থল বন্দর দেখতে। মাইক্রোবাস নিয়ে গিয়েছিলাম। যাওয়ার পথে দেখলাম ছোট সোনা মসজিদ।
ছোট সোনা মসজিদ বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন মসজিদ। প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড় নগরীর উপকণ্ঠে পিরোজপুর গ্রামে এ স্থাপনাটি নির্মিত হয়েছিল, যা বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ থানার অধীনে পড়েছে। সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ এর শাসনামলে (১৪৯৪-১৫১৯ খ্রিষ্টাব্দে) ওয়ালি মোহাম্মদ নামে এক ব্যক্তি এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদের মাঝের দরজার উপর প্রাপ্ত এক শিলালিপি থেকে এ তথ্য জানা যায়। তবে লিপির তারিখের অংশটুকু ভেঙে যাওয়ায় নির্মাণকাল জানা যায় নি। এটি কোতোয়ালী দরজা থেকে মাত্র ৩ কি.মি. দক্ষিণে। মসজিদটি মুসলিম স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন। এটি হোসেন-শাহ স্থাপত্য রীতিতে তৈরি (সুত্রঃ উইকিপিডিয়া)।
শীবগঞ্জে বিখ্যাত ওয়ালি শাহ নেয়ামত উল্লাহর মাজার জিয়ারত করলাম। শাহ সৈয়দ নেয়ামতউল্লাহ হলেন মধ্যযুগের একজন প্রখ্যাত ইসলাম প্রচারক। তিনি তৎকালীন গৌড়ে ইসলাম প্রচার করেন। সুলতান শাহ সুজার রাজত্বকালে (১৬৩৯-১৬৬০ খ্রিঃ) তিনি দিল্লী প্রদেশের করোনিয়ার নামক স্থান থেকে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে নানা স্থান ভ্রমণ করে রাজমহলে এসে উপস্থিত হন। তার আগমনবার্তা জানতে পেরে শাহ সুজা তাকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে অভ্যর্থনা জানান এবং তার নিকট বায়াত গ্রহণ করেন। পরে তিনি গৌড়ের উপকন্ঠে (বর্তমান শিবগঞ্জ উপজেলা) ফিরোজপুরে স্থায়ীভাবে আস্তানা স্থাপন করেন।
শীবগঞ্জে আরও দেখলাম বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের সমাধি কমপ্লেক্স। মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর (৭ মার্চ ১৯৪৯ – ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে চরম সাহসিকতা আর অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ যে সাতজন বীরকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান “বীর শ্রেষ্ঠ” উপাধিতে ভূষিত করা হয় তিনি তাদের অন্যতম। তিনি মুক্তিবাহিনীর ৭নং সেক্টরের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। মহানন্দা নদীর তীরে শত্রুর প্রতিরক্ষা ভাঙ্গার প্রচেষ্টার সময় তিনি শহীদ হন। তার উদ্যোগে মুক্তিবাহিনী ঐ অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। যার ফলাফলস্বরূপ মুক্তিবাহিনী প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করে এবং ওই অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত করে। তার সম্মানে ঢাকা সেনানিবাসের প্রধান ফটকের নাম “শহীদ জাহাঙ্গীর গেট” নামকরণ করা হয়েছে।ইন্ডিয়ান বর্ডার পর্যন্ত গিয়ে ফিরে এলাম।
তারপর দিন গেলাম নাটোর বেড়াতে। দেখলাম দিঘাপাতিয়া রাজবাড়ি বা উত্তরা গণভবন । এটি আঠারো শতকে নির্মিত দিঘাপতিয়া মহারাজাদের বাসস্থান। এই প্রাসাদটি নাটোর শহর থেকে প্রায় ২.৪ কিমি দূরে অবস্থিত। বর্তমানে এটি উত্তরা গণভবন বা উত্তরাঞ্চলের গভর্মেন্ট হাউস নামে পরিচিত।
১৯৭২ সনের ৯ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিঘাপতিয়া রাজবাড়ীকে উত্তরা গণভবন নামকরণ করেন। এই গণভবন চত্তরে সুন্দর সুন্দর ভাস্কর্য আছে। আছে নানান ধরনের ফুল ও ফলের গাছ।





এরপর বেড়ালাম মহাস্থানগড় । এটি বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রাচীন পুরাকীর্তি। প্রসিদ্ধ এই নগরী ইতিহাসে পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রনগর নামেও পরিচিত ছিল। এক সময় মহাস্থানগড় বাংলার রাজধানী ছিল। যিশু খ্রিষ্টের জন্মেরও আগে অর্থাৎ প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে এখানে সভ্য জনপদ গড়ে উঠেছিল প্রত্নতাত্ত্বিক ভাবে তার প্রমাণ মিলেছে। ২০১৬ সালে এটি সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা হয়। বেড়ানোর সময় কিছু স্থানীয় গাইড মিসগাইড করছিল এই বলে যে এখানে বেহুলা লক্ষিন্দরের বাসর ঘর আছে। আসলে ওগুলো হয়তো ছিল বৌদ্ধ বিহার।
আমি ও ডাঃ তুষার সকালে পরীক্ষা নিতাম। বিকেলে বেড়াতাম আর রাতে খাতা দেখতাম।
২০০৩ সনে আমি ও তুষার এক্সটার্নাল এক্সামিনার হিসাবে পরীক্ষা নিতে চলে গেলাম রংপুর মেডিকেল কলেজ কেন্দ্রে। তখন আমার বিষয় প্যাথলজির বিভাগীয় প্রধান ছিলেন প্রফেসর ডাঃ শামসুজ্জামান স্যার। তখন তিনি সহকারী অধ্যাপক ছিলেন। আর তুষারের বিষয় মাইক্রোবায়োলজির বিভাগীয় প্রধান ছিলেন প্রফেসর ডাঃ পরিমল স্যার। তিনিও হয়তো সহকারী অধ্যাপক ছিলেন। আমরা ময়মনসিংহ থেকে রওনা দিয়েছিলাম সকাল ৯ টার দিকে হয়তো। রাস্তায় গাইবান্ধায় এক নোংরা রেস্টুরেন্টে বাস থামিয়েছিল কিছু খেতে। কিন্তু নোংরা পরিবেশ দেখে কিছু খেলাম না। বিকেল ৪ টার পর গিয়ে পৌছলাম রংপুর। উঠতে হবে কলেজের ভিতরেই চতুর্থ তলায় অবস্থিত পরীক্ষক লাউঞ্জ কাম গেস্ট হাউসে। তুষার বললেন যে, পরিমল দা তার বাসায় যেতে বলেছেন প্রথম। সেইমতে আমরা পরিমল দার বাসায় দিয়ে উঠলাম। ভাবলাম হাত মুখ ধুয়ে পেট ভরে ভাত খেয়ে গেষ্ট হাউসে গিয়ে একটা লম্বা ঘুম দেব। খুব ক্ষুধা লেগেছিল। পরিমল দা ভেবেছিলেন নিশ্চয়ই বগুড়ার ফুড ভিলেজে নেমে আমরা পেট ভরে লাঞ্চ করে এসেছি। তিনি আমাদের দেখে একটু বিরক্ত হয়েই বললেন “দেরি করে ফেলেছেন। আমরা রেডি হয়ে বসে আছি। সময় বেশি নেই। এখনই বের হতে হবে। তারাতাড়ি করে চা খেয়ে নেন। ” চায়ের কথা শুনে আমি হতাস হয়ে পড়লাম। আমি তুষারের চোখের দিকে তাকালাম। তিনি চোখে যা বুঝালেন তার অর্থ হলো “আমরা যে রাস্তায় কিছু খাইনি তা যেন পরিমল দা বুঝতে না পারেন। ” তারাতাড়ি চা খেয়ে দাদার গাড়িতে গিয়ে বসলাম। দাদার সাথে দাদার স্কুল পড়ুয়া ছেলেও উঠলেন গাড়িতে। আমি দাদাকে জিজ্ঞেস করলাম “দাদা, আমরা কোথায় যাচ্ছি?” দাদা আসতে করে উত্তর দিলেন “একটু ভিন্ন জগতে যাবো। ” মনে মনে বললাম “ক্ষুধার রাজ্যে ভিন্ন জগৎ ভালো লাগবে না।” প্রাইভেট কার চলছে স্বাভাবিক গতিতে। দাদা ড্রাইভারকে তাকিদ দিলেন আরও তারাতাড়ি যেতে। আমি দাদাকে জিজ্ঞেস করলাম “দাদা কোথায় যাবেন, বললেন না তো।” দাদা আবারও নিচু কন্ঠে উত্তর দিলেন “ঐ ভিন্ন জগতে। ” আমি মনে মনে বিরক্ত হলাম “এত রহস্ব করার কী আছে? সরাসরি বললেই তো হয় যে অমুক জায়গায় যাচ্ছি। যতবার জিজ্ঞেস করি ততবারই উত্তর দেন ভিন্ন জগৎ বলে। কিছুক্ষণ পর গাড়ি বাম দিকে ঘুরে একটা গেইট পার হলো। গেইটে বড় বড় করে লেখা “ভিন্ন জগৎ।” এখন বুঝলাম ভিন্ন জগৎ নামে একটা রিসোর্ট আছে। সেখানেই যাচ্ছি আমরা। পৌঁছেই দাদা বললেন “দেরি না করে নভোথিয়েটারের টিকিট করে ফেলি। এখনই শো শুরু হয়ে যাবে।” দাদা টিকিট কিনে আমাদের হাতে দিয়ে বললেন “এই নভোথিয়েটারটা খুবই ভালো।” আমি নভোথিয়েটারে কী হয় তা জানতাম না। ভাবলাম, আজ জানা যাবে এটা কী জিনিস। আসনে বসার পর সিনেমা হলের মতো আলো নিভিয়ে দেয়া হলো। দাদা বললেন উপরের দিকে দেখুন। চেয়ে দেখি ঠিক আকাশের মতোই মনে হচ্ছে। অথচ বদ্ধ ঘরের ভিতর বসে আছি। আকাশে অসংখ্য তারা ফুটে আছে। সাউন্ড বক্স থেকে বর্ননা হচ্ছে। পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন আকাশের গ্রহ নক্ষত্রগুলোকে। অবিকল সপ্তঋষিমন্ডল দেখা যাচ্ছে সেই কৃত্রিম আকাশে। ছোট বেলা মা আমাকে এটা দেখিয়ে বলতেন “এটার নাম আদম সুরুত।” এই সাতটা তারকা একসাথে দেখলে মনে হতো মানুষের পা, অর্থাৎ আদমের পা। মানে আদমের সুরুত। এগুলি দেখে অন্ধকার থেকে একটি ছোট্ট মেয়ে বার বার বলে উঠছিল “ওয়াও!” যাহোক, ভালোই লাগলো নভোথিয়েটার দেখে। আসলে আমার এর আগে জানা ছিল না যে নভোথিয়েটার কী। এবার জানা হলো। এর পরের বছর ২০০৪ সনে আমি আমার মেয়েদেরকে ঢাকার মাওলানা ভাষানী নভোথিয়েটার দেখালাম। সাথে আমিও দেখে নিলাম। তবে দেখলাম এখানকার উপস্থাপনা ভিন্ন রকমের। আমার কাছে ভিন্ন জগতের নভোথিয়েটারই বেশি ভালো মনে হলো। ২০০৬ সনে কোলকাতায় গিয়ে ওখানকার নভোথিয়েটার দেখলাম আমি ও প্রফেসর আমিনুল হক স্যার। শেষে আমার মনে হয়েছে ভিন্ন জগতেরটিই বেশি ভালো।
ভিন্ন জগৎ থেকে রাতে ফিরে দাদার বাসায় পেট ভরে ভাত খেয়ে চলে এলাম গেস্ট হাউসে। দিলাম লম্বা ঘুম। সকালে উঠে নাস্তা করে চলে গেলাম পরীক্ষার বোর্ডে। এখানেও প্রতি দিন সকালে পরীক্ষা নিতাম, বিকেলে বেড়াতাম এবং রাতে খাতা দেখতাম। প্রথম দিন বিকেলে গেলাম পায়রাবন্দ গ্রামে বেগম রোকেয়ার জন্মস্থানের বাড়ি দেখতে।
রংপুর শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এই বাড়িটি। বেগম রোকেয়া ছিলেন নারী জাগরণের পথিকৃৎ । বেগম রোকেয়ার বাড়ি একটি প্রাচীন নিদর্শন। ধারণা করা হয় অষ্টাদশ শতাব্দির দিকে তৈরি। এটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এর তালিকাভুক্ত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। এটি মূলত পায়রাবন্দ জমিদার বাড়ি। বেগম রোকেয়ার জন্মস্থান হওয়াতে তার বাড়ি হিসেবে এটি অধিক পরিচিতি লাভ করেছে। এই বাড়িতে তেমন কিছুই অবশিষ্ট দেখলাম না। যা দেখলাম তা হলো শুধু ভাঙ্গা দেয়াল ও খুঁটি যা সংরক্ষণ এর দায়িত্ব নিয়েছে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। বিকেলে আকাশ মেঘ করে অন্ধকার হতে লাগলো। আমরা তারাতাড়ি করে ফেরার চেষ্টা করলাম। কিন্তু বৃষ্টি নেমেই পড়লো। অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম একটা দোকান ঘরে। বৃষ্টি ছাড়লে বাস যোগে চলে এলাম রংপুর শহরে। রাতে রেস্টুরেন্টে খেলাম। নতুন একটা আইটেম খেলাম। এটা রংপুর খুব চলে। এটা হলো বাদাম ভর্তা। তুষারের সাথে থেকে একটা জিনিস আমার কাছে মনে হয়েছে তিনি আধ্যাত্মিক বিষয়ে ভালো জ্ঞান রাখেন। এবং তিনি আধ্যাত্নিক ভাবে ইবাদতও করে থাকেন। কথায় কথায় তিনি পীর মুর্শেদের উদাহরণ দিতেন। তার মারাত্নক একটা বদভ্যাস ছিল। কোন গুরুত্বপূর্ণ কিছু করার আগে কাঁচা সুপারি দিয়ে গাল ভর্তি করে পান খেতেন। মাঝে মাঝে দুপারির ঝাঁঝে ঘেমে যেতেন।
পরেরদিন বিকেলে দেখতে গেলাম রংপুর তাজহাট জমিদার বাড়ি। খুব সুন্দর লাগছিল জমিদার বাড়ি। রংপুর শহরের অদূরে তাজহাটে অবস্থিত বলেই এটাকে তাজহাট রাজবাড়ি বা তাজহাট জমিদার বাড়ি বলে। এটা একটি ঐতিহাসিক প্রাসাদ যা এখন একটি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পর্যটকদের কাছে এটি একটি আকর্ষণীয় স্থান। রাজবাড়িটি রংপুর শহর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আমি জানতাম না এটা কোন রাজার বাড়ি ছিল। ঘুরতে আসা কিশোরদেরকে মজা করে জিজ্ঞেস করছিলাম “আংকেল, বলতো এটা কোন রাজার বাড়ি ছিলো?” এই প্রশ্নটা আমি ৬/৭ জনকে করেছিলাম। কেউ সঠিক উত্তর দিতে পারেনি। একেক জন একেকভাবে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছে। উত্তরগুলো ছিলো এরকম-
“আসলে এটা একজন রাজার বাড়ি। কিন্তু এই মুহুর্তে সেই রাজার নামটা মনে করতে পারছি না। ”
“এইটা রাজার বাড়ি না। এটা হলো জমিদার বাড়ি। আংকেল, জমিদারের নামটা আমি জানতাম, কিন্তু এই মুহুর্তে আমার মনে পড়ছে না।”
আমি পরে পড়াশোনা করে জেনেছি, প্রাসাদটি বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায় নির্মাণ করেন। এতে সময় লেগেছিল প্রায় ১০ বছর। মহারাজা গোপাল রায় ছিলেন হিন্দু এবং পেশায় ছিলেন একজন স্বর্ণকার। কথিত আছে, তার মনমুগ্ধকর ‘তাজ’ বা মুকুটের কারণেই এ এলাকা তাজহাট নামে অভিহিত হয়ে আসছে।
১৯৮৪ থেকে ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রাসাদটি ব্যবহৃত হয় রংপুর হাইকোর্ট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের একটি শাখা বা বেঞ্চ হিসেবে। প্রেসিডেন্ট এরশাদ বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীয়করণের লক্ষ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা সদরে বাংলাদেশের হাই কোর্ট বিভাগের আঞ্চলিক বেঞ্চ স্থাপন করেন যার একটি রংপুরে স্থাপিত হয়েছিল। পরে, ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর এই পদ্ধতি তুলে দেয়া হয়। ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ প্রাসাদটিকে একটি সংরক্ষিত স্থাপনা তথা স্থাপত্য হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশ সরকার এ স্থাপত্যের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করতঃ ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে রংপুর জাদুঘরকে স্থানান্তর করে এ প্রাসাদের দ্বিতীয় তলায় নিয়ে আসে।
মার্বেলের সিঁড়ি বেয়ে জাদুঘরে উঠলেই রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী কক্ষ যাতে রয়েছে দশম ও একাদশ শতাব্দীর টেরাকোটা শিল্পকর্ম। এখানে রয়েছে সংস্কৃত এবং আরবি ভাষায় লেখা বেশ কিছু প্রাচীন পাণ্ডুলিপি। এর মধ্যে রয়েছে মুঘল সম্রাট আওরাঙ্গজেবের সময়ের কুরআন সহ মহাভারত ও রামায়ণ। পেছনের ঘরে রয়েছে বেশ কয়েকটা কাল পাথরের হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর প্রতিকৃতি। কিন্তু জাদুঘরের ভিতরে ছবি তোলার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
প্রাসাদ চত্বরে রয়েছে বিশাল খালি মাঠ, গাছের সারি এবং প্রাসাদের দুই পাশে রয়েছে দুইটি পুকুর।
পরীক্ষার মাঝখানে একদিন ছুটি ছিলো। আমরা একটা মাইক্রোবাস নিয়ে বেড়াতে গেলাম দিনাজপুরের দিকে। আমাদের সাথে গিয়েছিল পরিমল দার ছেলেও। দিনাজপুর শহর ঘুরে আমাদের মাইক্রোবাস পূর্ব দিকে ফুলবাড়ির রাস্তায় চললো। এটাই আমার প্রথম দিনাজপুর শহর দেখা। ১৯৯৮ সনে জন স্বার্থে সহকারী অধ্যাপক করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে আমাকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে সরকার বদলি করেছিল। আমি চেষ্টা তদবির করে বৃহত্তর দিনাজপুরের জন স্বার্থের কথা বিবেচনা না করে বৃহত্তর ময়মনসিংহের জন স্বার্থ বিবেচনা করে ময়মনসিংহে থেকে যাই। আমাদের মাইক্রোবাসটা দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের পাস দিয়েই যাচ্ছিলো। কলেজের সামনে বিরাট করে নাম লিখা দেখায়ে আমি তুষারকে বললাম “এই কলেজে আমাকে বদলি করা হয়েছিল ১৯৯৮ সনে। আমি আসিনি। আজ পাস দিয়ে যেতে দেখে গেলাম।” ভাগ্যের কি ফের। এখানেই আবার বদলি করা হলো ২০০৮ সনের জানুয়ারিতে। থাকতে হলো পূর্ণ আটটি বছর, ২০১৫ সনের ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত।
চলে যাই ফুলবাড়ি হয়ে পার্বতীপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দেখতে। এটা বাংলাদেশের একমাত্র বাস্তবায়িত কয়লা খনি । এটি আবিষ্কৃত হয় ১৯৮৫ সালে। এর আয়তন ৬.৬৮ বর্গ কিলোমিটার। মজুদের পরিমাণ ৩৯০ মিলিয়ন মেট্রিক টন। এখানে বিটুমিনাস কয়লা পাওয়া যায়। এর থেকে প্রাপ্ত কয়লা দিয়ে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। সেখানকার ম্যানেজারের ছোট ভাই তুষারের পরিচিত একজন ডাক্তার। তিনি ম্যানেজার ভাইকে ফোন করে বলে দিয়েছিলেন আমাদেরকে সমাদর করতে। ম্যানেজারের বাসায় খুব ভালো করে নাস্তা করলাম। ম্যানেজার আমাদেরকে ঘুরে ঘুরে কয়লা খনি দেখালেন। তিনি বললেন “আমি যেভাবে আপনাদেরকে দেখালাম, সেভাবে সাধারণ পর্যটকরা দেখতে পারে না। সব জায়গায় তাদের দেখার পারমিশন নাই।” তিনি বাসায় চলে গেলে আমরা কিছু সময় ফলের বাগান দিয়ে হাটলাম। সুন্দর সবুজ সে বাগান। বিভিন্ন ভাবে ছবি উঠলাম। ফুটবল সাইজের একটা ফল দেখলাম। গাছে ঝুলছে প্রচুর। ফলের নামটা কী এখনো জানা হয়নি। মক্কার ফলের দোকানে ঐ ফলটা দেখেছি হজে গিয়ে ২০০৫ সনে। ১৭ জুন ২০১৭ তারিখে তুষার একটা ছবি ফেইসবুকে পোস্ট করেছিলেন। সেই ছবিতে দেখা যায় আমি ও তুষার সেই ফল গাছটির নিচে দাড়িয়ে ফল ধরে আছি। পোস্টে তিনি প্রশ্ন করেছেন, “তালুকদার ভাই কি আজো ফলটি চিনতে পেরেছেন?” চাইনিজ মাইনিং কোম্পানি খনির খয়লা তোলার কাজ করছিল। তারাই সুন্দর করে বাগান করছিল ওখানে। ম্যানেজারের বাসায় ফিরলে কিছুক্ষণ তিনি খনি নিয়ে আমাদের সাথে গল্প করলেন। কিভাবে এখানে এত কয়লা তৈরি হল তার বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা দিলেন। আমরা দেখেছি খনির শ্রমিকরা লিফট দিয়ে নিচ থেকে উঠে আসছে। সারা শরীরে কয়লার ছাই মাখা। যেন ইদুর বের হয়ে আসছে। আমি ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম “এই যে এমন খয়লার ছাই মেখে মানুষ কাজ করছে, এদের বেতন কেমন দেয়া হয়?” তিনি বললেন
– মাত্র দৈনিক ৩০০ টাকা।
– মাত্র ৩০০ টাকায় এই কঠিন কাজ?
– ওরা আগে দৈনিক ১৫০০ টাকা করে পেতো। ওরা সবাই ছিল চাইনিজ শ্রমিক। বাংলাদেশি কন্ট্রাক্টাররা কোম্পানিকে বুঝিয়েছে যে আমাদের বাংলাদেশী শ্রমিক দিয়ে কাজ করালে আমরা দৈনিক ১,০০০ টাকা বেতনে শ্রমিক দিতে পারবো। এভাবে চাইনিজ শ্রমিক সরিয়ে কোম্পানি দালালের মাধ্যমে ১,০০০ টাকার বাংলাদেশী শ্রমিক নিয়োগ দেয়। এরপর দালালরা প্রতিযোগিতা করে কমাতে কমাতে এখন ৩০০ টাকায় শ্রমিক দিচ্ছে। এমনিতে দিনাজপুরে শ্রমের মূল্য কম। শুনে দুঃখ পেলাম।
ম্যানেজার জানালেন যে এই মাটির নিচে খনি এলাকায় অনেক খালি জায়গা আছে। নিচ দিয়ে ইঞ্জিনিয়াররা মোটোর সাইকেল নিয়ে ঘুরা ফেরা করেন। ম্যানেজারের বাসায় পোলাও মাংস দিয়ে ভাত খেয়ে রওনা দিলাম দিনাজপুরের রামসাগর দেখতে। দিনাজপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দক্ষিণে তাজপুর গ্রামে দীঘিটি অবস্থিত।ঐতিহাসিকদের মতে, দিনাজপুরের বিখ্যাত রাজা রামনাথ (রাজত্বকাল: ১৭২২-১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দ) পলাশীর যুদ্ধের আগে (১৭৫০-১৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে) এই রামসাগর দিঘি খনন করেছিলেন। তারই নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় রামসাগর। দিঘিটি খনন করতে তৎকালীন প্রায় ৩০,০০০ টাকা এবং ১৫,০০,০০০ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়েছিল। এর দৈর্ঘ্য ১০৩১ মিটার আর প্রস্থ ৩৬৫ মিটার। দেখতে খুব সুন্দর। রামসাগর বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে আসে ১৯৬০ সালে। ১৯৯৫-৯৬ সালে এই দিঘিকেে আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল এটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের কাছাকাছি এই রাজাদের বড় একটা পুকুর দেখেছিলাম। ওটার নাম আনন্দসাগর। রামসাগর থেকে চলে গেলাম কান্তজিও মন্দির দেখতে।
কান্তজিউ মন্দির বা কান্তজী মন্দির বা কান্তনগর মন্দির দিনাজপুরের একটি প্রাচীন মন্দির। মন্দিরটি হিন্দু ধর্মের কান্ত বা কৃষ্ণের মন্দির হিসেবে পরিচিত যা লৌকিক রাধা-কৃষ্ণের ধর্মীয় প্রথা হিসেবে বাংলায় প্রচলিত। ধারণা করা হয়, মহারাজা সুমিত হর কান্ত এখানেই জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। দিনাজপুর শহর থেকে ২০ কিলোমিটার উত্তরে এবং কাহারোল উপজেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে সুন্দরপুর ইউনিয়নে, দিনাজপুর-তেঁতুলিয়া মহাসড়কের পশ্চিমে ঢেঁপা নদীর তীরবর্তী গ্রাম কান্তনগরে অবস্থিত এই প্রাচীন মন্দির।
মন্দিরের উত্তর দিকের ভিত্তিবেদীর শিলালিপি থেকে জানা যায়, তৎকালীন দিনাজপুরের মহারাজা জমিদার প্রাণনাথ রায় তার শেষ বয়সে মন্দিরের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। ১৭২২ খ্রিষ্টাব্দে তার মৃত্যুর পরে তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তার পোষ্যপুত্র মহারাজা রামনাথ রায় ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দে মন্দিরটির নির্মাণ কাজ শেষ করেন। শুরুতে মন্দিরের চূড়ার উচ্চতা ছিলো ৭০ ফুট। ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে মন্দিরটি ভূমিকম্পের কবলে পড়লে এর চূড়াগুলো ভেঙে যায়। মহারাজা গিরিজানাথ মন্দিরের ব্যাপক সংস্কার করলেও মন্দিরের চূড়াগুলো আর সংস্কার করা হয়নি।
মন্দিরের বাইরের দেয়াল জুড়ে পোড়ামাটির ফলকে লেখা রয়েছে রামায়ণ, মহাভারত এবং বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনী। পুরো মন্দিরে প্রায় ১৫,০০০-এর মতো টেরাকোটা টালি রয়েছে। উপরের দিকে তিন ধাপে উঠে গেছে মন্দিরটি। মন্দিরের চারদিকের সবগুলো খিলান দিয়েই ভেতরের দেবমূর্তি দেখা যায়। মন্দির প্রাঙ্গণ আয়তাকার হলেও, পাথরের ভিত্তির উপরে দাঁড়ানো ৫০ ফুট উচ্চতার মন্দিরটি বর্গাকার। নিচতলার সব প্রবেশপথে বহু খাঁজযুক্ত খিলান রয়েছে। দুটো ইটের স্তম্ভ দিয়ে খিলানগুলো আলাদা করা হয়েছে, স্তম্ভ দুটো খুবই সুন্দর এবং সমৃদ্ধ অলংকরণযুক্ত। মন্দিরের পশ্চিম দিকের দ্বিতীয় বারান্দা থেকে সিঁড়ি উপরের দিকে উঠে গেছে। মন্দিরের নিচতলায় ২১টি এবং দ্বিতীয় তলায় ২৭টি দরজা-খিলান রয়েছে, তবে তৃতীয় তলায় রয়েছে মাত্র ৩টি করে। এখান থেকে চলে যাই নয়াবাদ মদজিদ দেখতে।
দিনাজপুরের নয়াবাদ মসজিদ এখনো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে। ঐতিহাসিক কান্তজিউ মন্দিরের পাশেই অবস্থিত নয়াবাদ মসজিদ। মসজিদটি দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার নয়াবাদ গ্রামে অবস্থিত। সুদূর পারস্য থেকে আগত কান্তজিউ মন্দিরের শিল্পীরাই নিজেদের প্রয়োজনে ইসলাম প্রচারের স্বার্থে এ মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন।মসজিদের পাশেই ঢেপা নদী। জেলা সদর থেকে দূরত্ব মাত্র ২০ কিলোমিটার। মসজিদের প্রবেশদ্বারের ওপর ফারসিতে লেখা লিপি অনুযায়ী সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সময় ১২০০ বাংলা সনে (১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দ) মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল।
নির্মাণকালীন সময় মন্দিরের পাশেই খোলা আকাশের নিচে নামাজ আদায় করতেন তারা। এরই মধ্যে কারিগরদের প্রধান নেয়াজ অরফে কালুয়া মিস্ত্রি মহারাজার দরবারে গিয়ে সব মিস্ত্রির থাকা ও ধর্ম পালনের নিমিত্তে একটি মসজিদ নির্মাণের জায়গা চান।
এ সময় মহারাজা মন্দির থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরত্বে ঢেপা নদীর পশ্চিম কোলঘেঁষে নয়াবাদ গ্রামে ১ দশমিক ১৫ বিঘা জমি মসজিদ নির্মাণের জন্য দেন। এ ছাড়া মসজিদের পাশে থাকার বাড়ি করার নির্দেশ দেন মহারাজা। মহারাজার নির্দেশ মোতাবেক মিস্ত্রিরা মন্দিরের পাশাপাশি নয়াবাদ গ্রামে নিজেদের থাকার বাড়ি ও নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদ নির্মাণকাজ চালিয়ে যান। নয়াবাদ মসজিদ নির্মাণের পর তারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন সেখানে।
মন্দির নির্মাণের কাজ শেষে কারিগরেরা ফিরে যান নিজ দেশে। কিন্তু এদেশ ছেড়ে যেতে চায় না নেয়াজ ওরফে কালুয়া মিস্ত্রি ও তার ছোট ভাই। আবার নেয়াজ মিস্ত্রি মহারাজার দরবারে হাজির হন। এবার স্থায়ীভাবে বসবাস ও জীবিকা নির্বাহের জন্য মহারাজার কাছে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহের জন্য কিছু জমির আবদার করেন। তাৎক্ষণিক মহারাজা কিছু জমি তাদের দুই ভাইকে দান করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মিসরীয় এই দুই ভাই মহারাজার দানকৃত জমিতে ফসল আবাদ করে দিনাতিপাত করেন। মৃত্যুর পর মিস্ত্রি ও তার ছোট ভাইয়ের বংশধররা নয়াবাদ মিস্ত্রিপাড়ায় বসবাস করছেন। এখান থেকে ফেরার সময় গ্রামের অল্প বয়সের ছেলেরা কিছুক্ষণ পর পর আমাদের গাড়ি থামিয়ে পূজা উপলক্ষে চাঁদা নিয়েছে। চলে এলাম দিনাজপুর শহরে রাজবাড়ি দেখতে।
দিনাজপুর রাজবাড়ি দিনাজপুর জেলার সদর উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত। ‘রাজবাটী’ গ্রামের সন্নিকটে এই স্থানটি “রাজ বাটিকা” নামে বিশেষভাবে পরিচিত। উল্লেখ্য যে, প্রাচীন এই রাজ বাড়িটির নামেই গ্রামের নামকরণ হয়েছে। এটি দিনাজপুর কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনাল এর দক্ষিনে অবস্থিত। দিনাজপুর রাজবাড়ি রাজা দিনাজ স্থাপন করেন। কিন্তু অনেকের মতামত পঞ্চদশ শতকের প্রথমার্ধে ইলিয়াস শাহীর শাসনামলে সুপরিচিত “রাজা গণেশ” এই বাড়ির স্থপতি। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষের দিকে শ্রীমন্ত দত্ত চৌধুরী দিনাজপুরের জমিদার হন। কিন্তু শ্রীমন্ত দত্ত চৌধুরীর ছেলের অকাল মৃত্যুর হওয়াতে, তার ভাগ্নে “সুখদেব ঘোষ” তার সম্পত্তির উত্তরাধিকার হন।আসলে বর্তমানে দিনাজপুর রাজবাড়ি বলতে এর অবশিষ্টাংশকে বুঝায়। এর বেশিরভাগ অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। শুধু গুটিকয়েক স্থাপনা এখন বিদ্যমান। রাজবাড়ির প্রবেশ পথে পশ্চিমমুখী একটি মিনার আকৃতির বিশাল তোরণ আছে। রাজবাড়ির সীমানার মধ্যে তোরণের কিছু দূরে বামদিকে একটি উজ্জ্বল রঙ করা কৃষ্ণ মন্দির এবং ডানদিকে রাজবাড়ির বহিঃমহলের কিছু ধ্বংসাবশেষ আছে। রাজবাড়ির সীমানার ভেতরে আরকটি তোরণ আছে, যার মাধ্যমে রাজবাড়ির প্রধান বর্গাকার অংশে প্রবেশ করা হয়। রাজবাড়ির প্রধান অংশের পূর্বদিকে আরেকটি সমতল ছাদবিশিষ্ট মন্দির আছে। যার মধ্যে অনেক হিন্দু দেবতার প্রতিমা বিদ্যমান।আমার মনে আছে মন্দিরের প্রবেশমুখে লেখা ছিল “এখানে লুঙ্গি পরে প্রবেশ নিষেধ। ” রাজবাড়ির ভেতরে রানীর গোসল করার একটা পুকুর দেখলাম। সখিদের দাড়ানোর স্থান এবং শাড়ি পাল্টানোর স্থান দেখে ভালো লাগলো। দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। চলে এলাম রংপুর। পরীক্ষা নেয়া শেষ করে ময়মনসিংহ ফিরলাম। দেখা হয়ে গেল রংপুর -দিনাজপুরের দার্শনিয় স্থানের অনেকটা। দিস্তা ব্যারেজ অবস্য এর আগে ১৯৯৯ সনে সড়ক পথে নেপাল যাওয়ার সময় দেখা হয়েছিল।
পরীক্ষা নিতে গিয়ে তুষারের সাথে ভ্রমণ করা আর হয়নি। ২০০৮ সনে আমাকে দিনাজপুর বদলি করে দেয় তত্বাবধায়ক সরকার দিনাজপুরের জন স্বার্থে। আমার ছোট মেয়ে ডাঃ মার্জিয়া ইসলাম দিনা সে বছর ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়। দিনার স্বার্থে তাকে আমি মাইগ্রেশন করে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে নিয়ে আসি। থাকতে থাকি বাপ বেটি দিনাজপুরে। ২০০৯ সনে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এলে তুষারের ভাগ্য ত্বরান্বিত হতে থাকে। তরতর করে প্রমোশন হয় প্রফেসর পর্যন্ত।
তখন তিনি ঢাকার মহাখালীর ইনফেকশাস ডিজিজ কন্ট্রোল বিভাগে চাকরি করতেন। তিনি থাকতেন উত্তরায় কেনা নিজস্ব ফ্লাটে। আমার ফ্যামিলি রেখেছিলাম উত্তরার ভারা বাসায়। তিনি আমাকে কালাজ্বর কন্ট্রোল প্রোগ্রামে ট্রেইনিং নিতে কয়েকদিনের জন্য ঢাকায় আনলেন। ট্রেইনিং এর সুবাদে আমি কয়েকদিন ফ্যামিলির সাথে কাটালাম। ট্রেইনিং প্রোগ্রামটা ছিল শহিদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে। তিনি সকালে মোবাইল করলেন আমাকে উত্তরার রাস্তার উপর দাড়াতে। তিনি বাসা থেকে একটা সিএনজি অটোরিকশা করে আসছিলেন। তিনি তখনো প্রাইভেট কার কেনেননি। আমাকে রাস্তা থেকে তুলে নিলেন। যেতে যেতে কথা হলো। বললেন “আপনারা যখন বসুন্ধরার প্লট বুকিং দিলেন আমি তখন উত্তরায় একটা ফ্ল্যাট বুকিং দিয়েছিলাম। সেই ফ্লাটে এবার উঠেছি। এখন দেখছি সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের নতুন ভাইস প্রিন্সিপাল হয়েছেন আপনার দোস্ত প্রফেসর ডাঃ আব্দুর রশিদ মানিক। তালুকদার ভাই, কাইন্ডলি ওনার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেবেন।” ট্রেইনিং প্রোগ্রাম শুরুর আগে ভাইস প্রিন্সিপালের রুমে গিয়ে তুষারকে পরিচয় করিয়ে দিলাম। তিনি মানিককে জানালেন যে ছাত্রজীবনে তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ছাত্রলীগের ভিপি ছিলেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। মানিককে নিয়ে তিনি ট্রেইনিং প্রোগ্রামের প্রধান অতিথি করলেন। বক্তব্যে তিনি বললেন যে তিনি ভাইস প্রিন্সিপালকে মানিক ভাই বলে সম্ভোদন করতে চান। তারপর থেকে তিনি কথায় কথায় মানিক ভাইই বললেন। এটাই নিয়ম নেতাদের জন্য। ট্রেইনিং শেষ করে দিনাজপুর ফিরে এলাম।
কয়েকমাস পর তুষার আমাকে মোবাইলে জানালেন “বৃহত্তর দিনাজপুরের জন্য কালাজ্বর কন্ট্রোল এর উপর একটা ট্রেইনিং প্রোগ্রাম করা হবে। সেখানে, তালুকদার ভাই, আপনাকে রাখা হয়েছে। আপনি আমার হয়ে সব ব্যবস্থা নিবেন।” সেইমত দিনাজপুর সিভিল সার্জন অফিস কনফারেন্স রুমে কয়েদিন ট্রেইনিং প্রোগ্রাম চললো। আমি ট্রেইনার হিসাবে অংশ গ্রহন করলাম। পার্টিসিপ্যান্টদের মধ্য থেকে একজন মন্তব্য করলেন যে সাদেক স্যারের বুঝানোটা খুব ভালো হয়েছে। অন্যরাও তা সমর্থন করলেন। আমি মনে করিয়ে দিলাম “আমি কিন্তু হিস্টোপ্যাথলজিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট না। কালাজ্বর হলো মাইক্রোবায়োলজির অংশ। ভালো হবার কথা না।” তারা বললেন “আপনি অনেক মজা করে পড়িয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন। আমরা এঞ্জয় করেছি।” আমি বললাম “এ জন্যই হয়ত তুষার সাব আমাকে এখানে এনেছেন।”
তুষার খুব ব্যস্ত হয়ে ঢাকায় গিয়ে। বড় বড় কাজে তুষারকে ব্যস্ত রাখে সরকার। সরকারি রেডিও ও টেলিভিশন প্রোগ্রামে তুষার অংশ গ্রহণ করে রয়ালটি পেয়ে সেই টাকার চেকের ছবি ফেইসবুকে ছেড়ে দেন। কবিতা লিখে ফেইসবুকে ছেড়ে দেন। সেই কবিতায় আধ্যাত্মিক কথাবার্তা থাকে। এসবের অর্থ আমি বুঝতে পারি না। তারপরও লাইক দিতে থাকি। ভালো ভালো কমেন্ট করি। এদিকেও আমি ফেইসবুকে সাহিত্য লেখতে থাকি। তুষার তাতে লাইক কমেন্ট করে। তার কবিতার বই প্রকাশ হতে থাকে। আমারও স্মৃতি কথার বই প্রকাশ হতে থাকে। এনিয়ে মাঝে মাঝে মোবাইলে আলাপ আলোচনা করি।
তুষার নবপ্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন এন্ড রেফারাল সেন্টার এর পরিচালক হন। তিনি আমাকে অনুরোধ করেন
– তালুকদার ভাই, আমার উপর তো বিরাট দায়িত্ব পড়ে গেল। আমি চাই আপনি আমার এখানে আসেন। আপনাকে নিয়ে হিস্টোপ্যাথলজি ল্যাবরেটরিটুকু এস্টাব্লিশ করবো।
– আমি এই বয়সে ঢাকায় এডজাস্ট করতে পারব না। বাকী জীবন ময়মনসিংহই কাটিয়ে দিতে চাই।
কিছুদিন পর তুষার আমাকে অনুরোধ করলেন আমার তৈরি ল্যাবরেটরি রিপোর্ট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারটা তার ইন্সটিটিউটের জন্য সরবরাহ করতে। আমি তাই করলাম। তিনি তা ব্যবহার করা শুরু করলেন। সমস্যা হলো মন্ত্রণালয়কে নিয়ে। তারা বললেন একজন নন প্রফেশনালের তৈরি কম্পিউটার সফটওয়্যার সরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করা যাবে না। তাই সেটা ব্যবহার করা হলো না। তুষার সেজন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন।
২০২০ সনের মার্চ মাসের ৭ তারিখ, তখন আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছিলাম। মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আমাকে ফোন করে বললেন “স্যার, ঢাকা থেকে কয়েকজন বড় বড় শিক্ষক এসেছেন আমাদের ডিপার্টমেন্টে থিসিস ডিফেন্স পরীক্ষা নিতে। আপনি অনুগ্রহ পূর্বক ওনাদের সাথে আমাদের এখানে এসে লাঞ্চ করবেন।” আমি লাঞ্চের একঘন্টা আগেই গেলাম। দেখি ভাইরোলজির প্রফেসর ডাঃ নজরুল ইসলাম স্যার, মাইক্রোবায়োলজির প্রফেসর ডাঃ আব্দুল্লাহ আক্তার স্যার, প্রফেসর ডাঃ আকরাম হোসেন স্যার, প্রফেসর ডাঃ সহিদুল ইসলাম স্যার এবং প্রফেসর ডাঃ শামসুজ্জামান তুষার এসেছেন। তুষার আমাকে নজরুল ইসলাম স্যারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে অনেক গুণ গান করলেন আমার। বললেন “তালুকদার ভাই কিন্তু আমাকে আপনার লেখা বই উপহার দেননি। ” আমি আমার ডিপার্টমেন্টে ফোন করে আমার বুক সেল্ফে রাখা আমার লেখা স্মৃতি কথার বই স্মৃতির পাতা থেকে আনিয়ে সবাইকে এক কপি করে হাতে দিয়ে ছবি তুললাম। তুষারের সাথে ছবি তোলার সময় তিনি খুব উৎফুল্ল ছিলেন। তিনি শুধু আমার সাথে ছবি তুলেই ক্ষান্ত হলেন না, অন্যদের আমি গিফট দেয়ার সময়ও তিনি মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুললেন। গত কয়েক বছর হয় তুষার দাড়ি রেখেছেন। ইয়া লম্বা দাড়ি, নাভির নিচ পর্যন্ত ঝুলে পড়েছে। টুপি ও দাড়ির স্টাইল দেখে মনে হয় যেন পীর সাব। আসলে তার ভেতর অনেক আধ্যাত্মিক জ্ঞান আছে। পীরের তাছির থাকতেও পারে। আমি তুষারের কানে কানে বললাম “তুষার ভাই, আপনি আগে ক্লীন সেভ করে থাকতেন। আমি মনে করতাম আপনার দাড়ি মোছ গজায় নাই, মাহুন্দা। এখন এত লম্বা দাড়ি দেখে বিশ্বাস হচ্ছে না যে এগুলি আসল দাড়ি।” শুনে তুষার অট্টহাসি হেসে উঠেন। সবাই চমকে উঠে।
তুষার আমাকে জিজ্ঞেস করেন
– তালুকদার ভাই, এবার একুশের বই মেলায় বই প্রকাশ করেন নাই?
– আমার শৈশবের একাত্তর এবার বই মেলায় প্রকাশিত হয়েছে। গতবার প্রকাশিত হয়েছিল তিনটি – স্মৃতির পাতা থেকে, সোনালি শৈশব এবং বর্ণিল অতীত। বই মোট লেখা হয়েছে বারটির মতো। ধীরে ধীরে প্রকাশ করতে থাকব।
– এবারের মুজিব বর্ষেই সবগুলো প্রকাশ করে ফেলুন। আমি তো নিয়ত করেছি মুজিব বর্ষে প্রতি মাসেই একটা করে কবিতার বই প্রকাশ করব।
২০২০ সনের মার্চের ১৫ তারিখের পর থেকে দেশে করোনা ভাইরাস রোগ মহামারি আকার ধারণ করে। দেশ লক ডাউনে চলে যায়। ১৫ এপ্রিল ছিল আমার জন্ম দিন। ১৩ তারিখ ছিল আমার শেষ সরকারি চাকরি জীবন। আমি নিরবে অবসরে চলে গিয়ে লক ডাউনে বাসায় বসে রইলাম। টিভিতে মহামারির নিউজ শুনতাম। ফেইসবুকে প্রিয় প্রিয় মানুষদের মৃত্যু সংবাদ দেখতাম। বিজ্ঞ বিজ্ঞ ডাক্তারদের বক্তব্য শুনতাম টেলিভিশনে। মন উদগ্রীব হয়ে থাকতো তুষারের কথা শোনার জন্য। কিন্তু তুষারকে তেমন দেখা যেতো না টিভিতে। একবার এক বড় নামকরা মন্ত্রী মহোদয়ের মেয়ের কোভিড-১৯ রিপোর্ট করিয়েছিলেন তুষারের ওখান থেকে। সেই রিপোর্ট কোন কারনে ভুল হয়েছিলো। এনিয়ে সামাজিক মিডিয়ায় তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। এর ব্যাখ্যা দিতে তুষারকে সাংবাদিক সম্মেলন করতে হয়। তুষার সুন্দর করে ব্যাখ্যা করেন। এরপর থেকে ঘন ঘন তুষারকে টিভিতে দেখা যায়। চোখে পড়ার মতো। ইয়া বড় দাড়ি। ইয়া বড় টুপি মাথায়। বার বার মনে পড়ে তুষারকে মাহুন্দা বলার কথা।
১৫ এপ্রিল ২০২১ তারিখে রংপুর মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের প্রফেসর ডাঃ আশরাফুল আলম আমাকে ফেইসবুক মেসেঞ্জারে লিখলেন “সামসুজ্জামান তুষার স্যার লাইফ সাপোর্টে।” টিভির নিউজ স্ক্রলেও তাই দেখলাম। মনটা আরও ভেঙ্গে গেলো। ফেইসবুক চেক করে দেখলাম তার জন্ম তারিখ ১০ এপ্রিল। অর্থাৎ তুষার তার সরকারি চাকরির সমাপ্তির তারিখে সুস্থ ছিলেন না।
২৪ এপ্রিল ২০২১ তারিখে ময়মনসিংহ বিএমএ সভাপতি ডাঃ মতিউর রহমান ভুঁয়া ভাই তার ফেইসবুকে পোস্ট দেন “অধ্যাপক ডাঃ একেএম শামসুজ্জামান তুষার কোভিড ১৯ এ আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ ভোরে ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিওন।” আমি দীর্ঘস্বাস ছেড়ে পড়লাম “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। ” তুষারের সাথে আর ভ্রমণ করা হবে না আমার। তুষার কি মুজিব বর্ষে ১২ টি বই লিখতে পেরেছিলেন? তুষার অনন্ত ভ্রমণে চলে গেছেন। আল্লাহ উভয়কেই মাফ করে দিয়ে এক সাথে সেই অনন্ত ভ্রমণে সঙ্গি করে দিন।
(ঐতিহাসিক তথ্য উইকিপিডিয়া থেকে নেয়া হয়েছে)
৮/৭/২০২১ খ্রি.
ময়মনসিংহ

হক স্যার টুপি ঘুরাতেন

হক স্যার টুপি ঘুরাতেন

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

[প্রফেসর ডা. আব্দুল হক স্যার ছিলেন একজন সৎ ও আদর্শবান মানুষ। তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ছিলেন। তিনি উক্ত কলেজের প্রিন্সিপাল এবং ময়মনসিংহ বিএমএ-র প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। আমি উক্ত বিভাগে দুইবার বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছি। ভয়ে ভয়ে স্যারের চেয়ারটিতে বসেছি। স্যারকে নিয়ে আমার অল্প কিছু স্মৃতি কথা আছে। তারই কিছু ধারাবাহিকভাবে লিখে যেতে চেষ্টা করছি]

 

প্রথম দেখাতেই প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হক স্যার আমার হাত থেকে নতুন বইগুলো ছুড়ে মারাতে আমি মনক্ষুন্ন হই। নজরুল দেখে ফেলাতে আমি অপমান বোধ করি। মনে মনে ভাবী ইনি কেমন মানুষ? আমাকে তো সুন্দর করে বুঝিয়ে বলতে পারতেন। যদি এমন করে বলতেন “বাবা, তুমি তো বেস থার্ড ইয়ারে উঠেই নতুন বই কিনে ফেলেছো। খুব ভালো করেছো। তবে এই সব লাল নীল দেশী লেখকদের বই পড়ে ভালো ডাক্তার হওয়া যাবে না। তুমি বরং বিদেশী লেখকদের বই কিন। এসব বই পড়ে পাস করা যাবে না।” তা না করে তিনি আমার সাথে কিছুই না বলে বই ছুড়ে মেরে তার রুমে প্রবেশ করলেন। এই ক্ষোভ আমার ভেতরে অনেকদিন পর্যন্ত ছিলো, যতদিন না আমি স্যারের খুব কাছে আসতে পেরেছি।

 

তখন থার্ড ইয়ার থেকেই প্যাথলজি ক্লাস শুরু হতো। প্রফেসর ডাঃ আব্দুল মান্নান সিকদার স্যার অল্প বয়সের শিক্ষক ছিলেন। তিনি সুটেড-বুটেড হয়ে ক্লাসে আসতেন। তিনি তখন প্যাথলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন। প্রফেসর হক স্যার ছিলেন সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। এটা কিন্তু ১৯৮৩ সনের কথা বলছি। সিকদার স্যার সব কথা ইংরেজিতে বলতেন। আমি গ্রামের ছেলে। ইংরেজি খুব কম বুঝতাম। যদিও আমি ইন্টারমেডিটে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েছি। বইয়ের ইংলিশ মিডিয়াম বাংলা মিডিয়ামের চেয়ে সহজ ছিলো। কিন্তু ইংলিশ মিডিয়ামের লেকচার শোনা আমার জন্য কঠিন ছিলো। সিকদার স্যার গ্যালারির ভেতরে ছাত্রদের কাছে এসে পড়া ধরতেন। তাও আবার ইংরেজিতে কথোপকথন করে। আমি সবসময় ভীতসন্ত্রস্ত থাকতাম এবং স্যারের মুখের দিকে চেয়ে থাকতাম। স্যার আমার এই দুর্বলতা বুঝে ফেলে আমাকে পেয়ে বসেন। আমার এই অবস্থার কথা ক্লাসের সবাইকে বলতে থাকেন। আমি লজ্জিত হয়ে পড়ি। আমি যখন প্যাথলজির সহকারী অধ্যাপক হয়ে সেই একই গ্যালারিতে ক্লাস নিতাম মান্নান সিকদার স্যারের কথা মনে পড়তো। তাই, আমি ক্লাসে ইংরেজি বলার পাশাপাশি সরল বাংলায় ছাত্রদের বুঝিয়ে দিতাম। মান্নান স্যার ছাত্রদের মাঝে এসে পড়াতে ছাত্ররা অন্য মনস্ক হতে পারতো না। আমিও মাঝে মাঝে তাই করি। সিকদার স্যার পরের বছর বদলি হয়ে যান অন্য কোন মেডিকেল কলেজে। দীর্ঘদিন পর আমি যখন এম ফিল পড়ি তখন স্যারের দেখা পাই প্যাথলজি সোসাইটির এক সম্মেলনে। শুনলাম তিনি চট্রগ্রাম মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। তারপর থেকে স্যারের স্যাথে আমার অনেক দেখা সাক্ষাত হয়। মোবাইলে অনেক কথা বলেন। অনেক স্নেহ করেন আমাকে। তিনি আমার সাহিত্যের বইয়ের একজন ভালো রিভিউয়ার।

প্রফেসর ডাঃ আব্দুল মজিদ সিদ্দিকী স্যার ও রজব আলী স্যার আমাদের জুরিস্প্রুডেন্স পড়াতেন। ফরেনসিক মেডিসিনকে তখন জুরিস্প্রুডেন্স বলা হতো। আমি ছিলাম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ১৭তম ব্যাচের ছাত্র। তার মানে কলেজের বয়স ছিল ১৭ বছর। এমন বয়সে কলেজে শিক্ষক সংকট থাকে। মজিদ সিদ্দিকী স্যার রেডিওলজি (এক্স-রে) বিভাগের ডাক্তার হয়ে জুরিস্প্রুডেন্স লেকচার ক্লাস নিতেন। এমন সমস্যা দিনাজপুর মেডিকেল কলেজেও ছিলো। এই কলেজের বর্তমান নাম এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ। আমার মেয়ে ডা. মার্জিয়া ইসলাম দীনা এই কলেজের ১৭ ব্যাচের ছাত্রী ছিলো। তখন আমিও এই মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলাম। দীনাদের বায়োকেমিস্ট্রির প্রফেসর লেভেলের শিক্ষক না থাকাতে প্রথম দিকে আমিই অনেকগুলো বায়োকেমিস্ট্রি লেকচার ক্লাস নিয়েছি। মজিদ সিদ্দিকী স্যারের বাড়ি আমাদের পাশের উপজেলা ঘাটাইলে হওয়াতে তার কথাবার্তা আমার কাছে খুব পরিস্কার লাগতো। চিকন মানুষ, টনটনে কথা ছিলো মজিদ স্যারের। রজব আলী স্যার পরিপাটি ও দেখতে সুন্দর ছিলেন। ফরেনসিক মেডিসিনের পড়ায় বেশ কিছু লজ্জার কথা আছে। সেইগুলি বলার সময় রজব আলী স্যার স্মীত হাসতেন এবং তার গালে টোল পড়তো। এখনো স্যারের সেই টোল পরা গাল আর মোটা সুন্দর দাঁতের মিষ্টি হাঁসি আমার মনে আছে। ফিজিওলজির প্রফেসর এম এ জলিল স্যার আমাকে খুব ভালোবাসতেন। টাঙ্গাইলের মানুষ হওয়াতে তার কাছে খুব যেতাম। তিনি পড়াতেন খুব ভালো। খুব জ্ঞানী ছিলেন। কিন্তু তিনি যখন ব্লাকবোর্ডের কাছে গিয়ে কিছু লিখতেন তখন নিচু স্বরে কথা বলতেন যেগুলো আমি ফলো করতে পারতাম না। আমি যতদিন শিক্ষকতা করেছি সেই কথাটি মনে রেখেছি। তবে সব ক্লাস তারাতারি ডিজিটাল হয়ে যাওয়াতে আমাকে ব্লাকবোর্ডের দিকে ঘুরতে হয় নি। আমি ক্লাস নেই সামনে ক্যাপটপ রেখে। স্ক্রিনের দিকে তাকাই না বেশী। যেহেতু দৃষ্টি থাকে সামনের দিকে সেহেতু ছাত্ররা গন্ডগোল করতে পারে না। এনাটমির প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হাই ফকির স্যার সবসময় সুট টাই পরে থাকতেন। খুব পরিস্কার করে কথা বলতেন। শোনতে খুব ভালো লাগতো। তিনি বোর্ডে তেমন কিছু লিখতেন না। ইপিডায়াস্কোপে বইয়ের পাতা প্রজেক্ট করে স্ক্রিনে ফেলতেন। আমার কাছে স্যারের পড়ানোর স্টাইল ভালো লাগতো। এনাটমিতে হারুন স্যার নামে আরেকজন স্যার ছিলেন। তিনি কবিতা লিখতেন। পড়ানোর সময় মুখে হাসি লেগেই থাকতো। তিনি এপ্রোন পড়ে ক্লাসে আসতেন। ফার্মাকোলজির প্রফেসর ডাঃ জগদীশ চন্দ্র স্যার প্রথম দিন পরিচিতি মূলক ক্লাসে খাটি নেত্রকোনার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছিলেন মনে আছে। তিনি বলছিলেন এই কলেজটা যেইহানে অইছে সেইহানে পাট কেত আছিল। সহজ করে সুন্দর পড়াতেন। সার্জারীর প্রফেসর ডাঃ এনায়েত কবীর স্যার ক্লাসে খুব রাগারাগি করতেন। কেন করতেন তা বুঝতে পারতাম না। রাগারাগির এক পর্যায়ে পকেট থেকে ট্যাবলেট বের করে খেতেন। তারপর শান্ত হয়ে আবার পড়াতেন। বেস ভারী শরীর ছিলো স্যারের। জ্যাকেট গায়ে দিয়ে থাকতেন। দুই হাত প্রসারিত করে কথা বলতেন। একদিন সহকারীকে বললেন মাইকের মাউথ পিচটা সুতা দিয়ে গলায় ঝুলিয়ে দিতে। তারপর তিনি দুই হাত ছোড়াছুড়ি করে পড়ালেন। তিনি ছাত্রদেরকে তুই করে বলতেন। একদিন হঠাৎ তিনি ক্লাসে অনেককেই প্রশ্ন করা শুরু করলেন কে কোন কলেজ থেকে পাশ করে এসেছে। আমাকে যখন প্রশ্ন করলেন “তুই কোন কলেজ থেকে পাস করেছিছ?” আমি দাঁড়িয়ে গর্বের সাথে বললাম “আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ থেকে, স্যার?” তিনি সাথে সাথে তাচ্ছিল্যের সাথে বলে ফেললেন “বাহ, আলাউদ্দিনের মিষ্টি, অপুর্ব সৃষ্টি।” তিনিও হাসলেন, ছাত্ররাও হাসলো। কারন, কেউ তো জানতো না যে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কার দাদার নাম। সার্জারীর প্রফেসর ডাঃ আব্দুস শাকুর স্যার ছিলেন মাটির মানুষ। ধীরে ধীরে পড়াতেন। আমাকে বেশ স্নেহ করতেন। কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ডাঃ মোফাখখারুল ইসলাম স্যারকে রাগ করতে দেখিনি। তিনি ইংরেজ স্টাইলে থাকতেন। হাসি হাসি মুখ ছিল সব সময়। তিনি কিছুক্ষণ লেকচার দিয়েই বিলাতের কথা বলতেন। কথায় কথায় কমিউনিটি বেইজড মেডিকেল এডুকেশন, আলমা আটা, জেনেভা ডিক্লারেশন শব্দগুলো উচ্চারণ করতেন। শুনতে ভালোই লাগতো। মেডিসিনের অধ্যাপক শামসুল ইসলাম স্যার ছিলেন একটু ভার বুদ্ধিসম্পন্ন। তিনি ক্লাসে এসে কিছুক্ষণ সিগারেট টেনে শক্তি সঞ্চয় করে কেশে পড়ানো শুরু করতেন। তখন সিগারেট খাওয়াটা এখনকার মতো অতো দোষের ছিলো না। তিনি ক্লাসে পড়া ধরতেন না। তিনি সাধারণত সাদা হাফ শার্ট পরতেন। কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের সাদেক স্যার ছিলেন খুবই মাটির মানুষ। খুব বিনয়ের সাথে পড়াতেন। হাটার সময় তিনি এদিক সেদিক তাকাতেন না। চুক্ষু বিভাগের প্রফেসর মুক্তাদির স্যার ছাত্রদের সাথে বেশ মিশুক ছিলেন। তিনি দেখতে সুন্দর ছিলেন। সাফারি পরতেন সাধারণত। বিভাগীয় প্রধান ছিলেন প্রফেসর ডাঃ শামসুদ্দিন স্যার। তিনি জোক করে পরাতেন। একবার ক্লাসে আমি একটু অন্যমনস্ক ছিলাম। হঠাৎ তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন “এই, তিন মাসের বাচ্চার ভিটামিন কম পড়লে কি করবে।” আমি বলে দিলাম “সবুজ শাক সবজি খেতে দেব।” স্যার মুখের এক অদ্ভুত ভঙ্গি করে বললেন “হ্যা, তিন মাসের বাচ্চা ত শাক খেতে পারবেনা। নাকইর দিয়া ঠেলে ঠেলে পাছা দিয়ে শাক ঠুকাতে হবে।” আমি ত লজ্জা পেয়ে ঝিম মেরে গেলাম। স্যারের সামনে ত হাসা যায় না। বন্ধুদের কারো কারো শরীর ঝাকুনি দিতে দেখলাম চিপা হাসিতে। শামসুদ্দিন স্যার কোট-টাই পরতেন। হাটতেন দৈত্যে মতো। প্রফেসর ডাঃ জোবায়েদ হোসেন স্যার ছিলেন খুব জাদরেল এক শিক্ষক। সবাই তাকে ভয় পেতো। তিনি গাইনি বিভাগের প্রধান ছিলেন। প্রথম দিকে আর্মি অফিসার ছিলেন। হাটতেনও আর্মি স্টাইলে। লম্বা ছিলো স্যারের শরীর। টাই পরতেন। সার্জারীর প্রফেসর গাফফার তালুকদার স্যার বাংলা উচ্চারণ করতেন বিলাত প্রবাসী মানুষের মতো। তিনি শার্টের উপর জ্যাকেট পরতেন। সার্জারির আরেকজন শিক্ষক ছিলেন প্রফেসর ডাঃ সেলিম ভুইয়া স্যার। খুব নরম মানুষ ছিলেন। স্যারের আন্ডারে আমি ৬ মাস সার্জারিতে বিশেষ ট্রেইনিং নিয়েছিলাম। তিনি কথায় কথায় ইংল্যান্ডের ব্যবস্থার কথা বলতেন। আমি আমার কয়েকজন শিক্ষকের কথা এখানে উল্লেখ করলাম যারা আমাদের লেকচার ক্লাস নিতেন। আরও অনেক শিক্ষক ছিলেন, তারাও লেকচার ক্লাস নিতেন। সবার কথা লেখলে আপনি অধৈর্য্য হতে পারেন। হক স্যারকে নিয়ে লেখতে গিয়ে কয়েকজন শিক্ষকের নাম এসে গেলো। আমাদের সব শিক্ষকই অত্যধিক বিজ্ঞ ছিলেন। সবাই ভালো পড়িয়েছেন। একেকজন শিক্ষক একেক ভাবে স্মৃতিতে রয়ে গেছেন। আজ লিখবো হক স্যারকে নিয়ে। তার আগে একটু প্রফেসর আবু আহমেদ স্যারকে নিয়ে বলে নেই। স্যার ছিলেন প্যাথলজি বিভাগের সেকেন্ড স্যার। পড়াতেন মাইক্রোবায়োলজি। স্যারের লেখচার আমার খুব পছন্দ হতো। গল্প করে করে মজা করে পড়াতেন। যেদিন তিনি ফিতাকৃমি পড়ালেন সেদিন ক্লাস শুরুতেই একটি গল্প শুনালেন।

বললেন, একবার এক রাজকন্যার পেট থেকে ১৮ ফুট লম্বা একটা মাছ বের হলো পায়খানার সাথে। আমি শুনে তাজ্জব বনে নড়েচড়ে বসলাম। শোনার জন্য ব্যাকুল হলাম। আসলে এই গল্প থেকে স্যার চলে গেলেন ফিতা কৃমি পড়াতে। পদ্ধতিটা আমার খুব ভালো লেগেছিল। স্যার পড়ানোর সময় একটা কিছু বলে সামান্য হা করে জিহবার আগা নাড়াতেন এবং গাল ও ঠোঁটে হাসির ঢেউ খেলে যেতো। খুব ভালো লাগতো। থেমে থেমে পড়াতে বুঝতেও সুবিধা হতো। স্যারের দেখাদেখি আমিও ক্লাসে প্রসংগের সাথে মিল রেখে ছোট একটি গল্প বা ঘটনা শুনিয়ে দেই। ছাত্ররা যাতে গল্পটা মনে রাখতে গিয়ে পড়াটাও মনে রাখে এটাই আমার উদ্দেশ্য। একবার লন্ডন থেকে এক মেয়ে আমাকে মোবাইল করলো। সালাম দিয়ে কেমন আছি তা জানতে চাইল। কুশল বিনিময়ের পর জানতে চাইলাম

– কী মনে করে ফোন করেছ।

– স্যার, গভীর রাত এখানে। ঘুম আসছিলো না। দেশের কথা মনে হলো। শেষে আপনার ক্লাসের কথা মনে পড়লো। আপনি একদিন ভুত দেখেছিলেন। সেই কথা মনে হবার পর আপনাকে ফোন করেছি।

– আমার ভুতের গল্প ত মনে আছে। কেনো বলেছিলাম তা কি মনে আছে?

– জি স্যার, ট্রমাটিক ফ্যাট নেক্রোসিস হলে ফ্যাট সেল মরে গিয়ে তার শুধু আবসা আবসা আউট লাইন দেখা যায়। মানে মৃত কোসের ছায়ার মতো দেখা যায়, যেটাকে বলা হয় ঘোস্ট সেল। আপনার গল্পগুলো মনে হলে প্যাথলজির পড়াও মনে এসে যায়।

ভুতের গল্প প্রায় সবাই ভালোবাসে। সেদিন ফেইসবুকে একটা পড়েছি এমন। গোরস্থানে পাসের বাড়িতে সাধারণত কেউ থাকিতে চায় না। এমন একটি বাড়ি ছিলো গোরস্থানের পাশে। আসেপাশে আর বাড়ি ছিলো না। সস্তা পেয়ে এই বিল্ডিংয়ের দোতলা ভাড়া নিলেন এক শিক্ষিত ভদ্রলোক। এক রাতে এক একা ভালো লাগছিলো না তার। সিদ্ধান্ত নিলেন তৃতীয় তলার ভদ্রলোকের সাথে কিছুক্ষণ আলাপ করে আসা যাক। তাই, টিপ টিপ করে সিড়ি বেয়ে তৃতীয় তলায় উঠে বেল টিপ দিলেন। শীর্ণকায় লম্বা এক ভদ্রলোক দরজা খুলে দিয়ে বসতে দিলেন। কিছুক্ষণ কথা বলার পর লক্ষ্য কিরলেন ভদ্রলোকের হাতের আঙুলগুলো অত্যধিক লম্বা এবং গলাও বেশ লম্বা। তাকে ভুত বলে সন্দেহ হলো। জিজ্ঞেস করলেন “আচ্ছা ভাই, আপনি কি ভুত আছে বলে বিশ্বাস করেন?” উপর তলার সেই লোকটি জবাব দিলেন “মরার আগে বিশ্বাস করতাম না। এখন করি।” শুনে নিচ তলার লোকটির ভয়ে শরীম হীম হয়ে এলো। তারাতাড়ি কথা সেরে চলে এলেন।

 

আমি ক্লাসে গল্পের সাথে পড়া মিলিয়ে ছাত্রদেরকে শেখাতে চেষ্টা করি। ফলো করেছিলাম আবু আহমেদ স্যারকে।

আপনি বিরক্ত হচ্ছেন, হক স্যারের কথা লিখতে গিয়ে এসব কী লিখছি। আসছি এখন হক স্যারের কথায়। আজ হয়তো হক স্যারের কথা আপনার কাছে ভালো লাগবে না। আসলে হক স্যারের আমি প্রথম দিকে শুধু বাইরেরটাই দেখছিলাম। তাই প্রথম দিকে তিনি আমার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কেউ ছিলেন না। অনেক বছর পর যখন আমি হক স্যারের ভেতরের জিনিস আবিস্কার করলাম তখন থেকে আমি জানি স্যার একজন অসাধারণ মানুষ। সেই সময় টুপিওয়ালা স্যার মাত্র দু’জনই ছিলেন। দু’জন আবার দূরকম। একজন হলেন ফিজিওলজির দাদু স্যার আরেকজন হলেন প্যাথলজির হক স্যার।দাদু স্যারের নাম খুব সম্ভব ডাঃ আমিনুল ইসলাম ছিলো। দাদু স্যারের গালে লম্বা সাদা চাপ দাড়ি ছিলো। লম্বা জুব্বা পরতেন। বয়স্ক দাদাদের মতো করে কথা বলতেন। তাই, ছাত্ররা দাদু স্যার বলত। দাদু স্যার বলতে বলতে স্যারের আসল নামটি ভুলে গেছি হয়তো । হক স্যার টুপি মাথায় দিতেন, কিন্তু শার্ট পরতেন। হক স্যারের টুপির ধরনটি অনেকটা ডাঃ জাকির নায়েকের টুপির মতো গোল। স্যার মাথার চুল সবসময় চেঁছে রাখতেন। তাতে মাথার সাথে টুপি লেপটিয়ে থাকতো। চুল না থাকায় টুপিটি সহজেই মাথার উপর ঘুরানো যেতো। আমি যতদিন ছাত্র ছিলাম ততদিন স্যারের দাড়ি ছিলো না। দাড়ি রেখেছেন পরে। স্যারের চোখের উপর ভ্রু কম ছিলো। স্যার একটি বিশেষ ধরনের শার্ট গায় দিতেন। সাভাবিকের চেয়ে একটু লম্বা শার্ট। শার্টের কলারও ছিলো সাভাবিকের চেয়ে বেশ লম্বা। শার্টের রঙ ছিলো সাদাটে। আমরা অফ হোয়াইট বলতে পারি। মোটা কাপড়ের শার্ট ছিলো। ছেড়ার কথা না সহজে। আমি এক যুগ ধরে একই অথবা একই রকম শার্ট দেখেছি। একই রকম শার্ট কয়েকটি ছিলো কি না আমি জানি না। আমার কাছে মনে হতো একই। পাজামা, না ফুল প্যান্ট পরতেন তা বুঝা যেতোনা। মোটা অফ হোয়াইট কাপরের এক ধরনের ফুল প্যান্ট পরতেন শার্টের নিচ দিয়ে টাকনুর উপর পর্যন্ত। ফিতাবিহীন শু পরতেন পায়। হাটতেন সামনের ৪-৫ ফুট মাটির দিকে তাকিয়ে । স্যারকে প্রাইভেট কারে চড়তে দেখিনি। স্যারের স্ত্রী ডাঃ বীণা হক ম্যাডাম ছিলেন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ। তাকে আমি সবসময় প্রাইভেট কারে চলাফেরা করতে দেখেছি। স্যারকে রিক্সায় উঠতেও দেখিনি। চরপাড়ায় রাস্তা দিয়ে দু’হাতে ভারী ভারী বাজারের ব্যাগ নিয়ে বাসার দিকে হেটে যেতে দেখেছি। আমি একদিন একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম হক স্যার নিজের জন্য গাড়ি কেনেন না কেনো। উত্তরে জানতে পেলাম তিনি গাড়িতে চলা পছন্দ করেন না। আমেরিকা প্রবাসী তার বুয়েট থেকে পাস করা ইঞ্জিনিয়ার ছেলে দেশে এসে স্যারের জন্য একটি কার কিনে দিয়ে যান। স্যার সেটা ব্যবহার না করে জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসায় দান করে দেন। জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার মাঠে একটি টীন সেডে প্রাইভেট কার দেখেছি। খুব সম্ভব ওটাই হবে।

 

দোতলায় প্যাথলজি ডিপার্টমেন্ট। সিড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে এসে ক্লাসের মঞ্চে এসে নিঃশ্বাস ছাড়তেন। খুব সিরিয়াস হয়ে পড়ানো শুরু করতেন। যা বলতেন সবই যেনো গুরুত্বপূর্ণ। মানে প্যাথলজির কোন কিছুই বাদ দেয়া যাবে না। সবাই নিরব হয়ে স্যারের লেকচার শুনতাম। স্যারের টেবিলের সামনে বিদেশি বিরাট টেক্সট বই খোলা রাখতেন। কিছুক্ষণ পর পর বইয়ের দিকে চোখ দিতেন। ডান হাতে চক আর বাম হাতে ডাস্টার ধরা থাকতো। কথা বলার সময় ডান হাত ঘুরাতেন। চট করে ব্লাকবোর্ডে গিয়ে কিছু লিখতেন। মাঝে মাঝে প্রশ্ন করতেন কাউকে নির্দিষ্ট না করে। কেউ উত্তর দিয়ে দিলে গুড বলে আবার শুরু করতেন। কেউ উত্তর না দিলে বলতেন “এই লিসান জামিল কই? লিসান বলো।” অথবা “দীপক কুমার ধর বলো।” দীপক আমাদের মধ্যে সবসময় ফার্স্ট হতো । লিসান জামিল সেকেন্ড হয়েছিল। তারপরই ছিল মিজানুর রহমান স্বপন। শেষের দিকে স্বপন সেকেন্ড হতো। আমি ওদের মতো না হলেও ৮ম, ৯ম অথবা ১০ম অবস্থানেই সাধারণত থাকতাম। বেশী ভালো ভালো না। সেই ভালো ছাত্ররা মাতৃভূমি ছেড়ে চলে গেছেন সুখের দেশে। এদেশ তাদের চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। হক স্যারও বিদেশে গিয়েছিলেন উচ্চ শিক্ষা অর্জন করতে। ফিরে এসে দেশের সেবাই করেছেন। কিন্তু স্যার তার ইঞ্জিনিয়ার ছেলেকে দেশে রাখতে পারেননি। যাহোক, যখন স্যার যা পড়াতেন তাকেই বলতেন ভেরি ভেরি ইমপোর্টেন্ট। তিন বার করে বলতেন ভেরি ভেরি ইমপোর্টেন্ট। বলার সময় প্রত্যেকবার মাথার টুপি ঘুরাতেন। আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে তিনি লোবার নিউমোনিয়া চারটি স্টেজ বলার সময় চার বার টুপি ঘুরিয়েছিলেন। বলছিলেন, লোবার নিউমোনিয়ার চারটি স্টেজ আছে – স্টেজ অব কঞ্জেশন, স্টেজ অব রেড হেপাটাইজেশন, স্টেজ অব গ্রে হেপাটসিজেশন অ্যান্ড স্টেজ অব রেজুলুশন। হক স্যার বাংলা ও ইংরেজি সংমিশ্রণ করে পড়াতেন। তাই ভালো বুঝতে পারতাম। আমি স্যারের এই বৈশিষ্ট্যটা অনুসরণ করে ক্লাস নেই। আমি আরেকটা ব্যাপারে স্যারকে অনুসরণ করি। সেটা হলো আমি ঠিক সময়ে ক্লাসে উপস্থিত হই। স্যার কোনদিন ক্লাসে অনুপস্থিত থাকতেন না। আমিও কোনদিন ক্লাসে অনপস্থিত থাকি না, একান্ত জরুরি অবস্থা ব্যাতিরেকে। ছাত্রাবস্থায় স্যারের ভেতরের মহত্ব আবিস্কার করার মত জ্ঞান আমার ছিলো না। ছাত্রাবস্থায় স্যার আমার সাথে কয়কবার দুরব্যাবহার করেছিলেন বলে মন থেকে স্যারকে কম পছন্দ করতাম। পছন্দ করা শুরু করলাম সেদিন থেকে যেদিন থেকে স্যারের ভেতরের জিনিসটা আবিস্কার করতে পারলাম। সে কথা পরে লিখবো।

১৬/১২/২০২০

ময়মনসিংহ
Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/





 

সোনালি শৈশব

বইয়ের নামঃ সোনালি শৈশব

লেখকঃ ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

প্রকাশকঃ ছায়াবীথি

পৃষ্ঠাঃ ১৪৪

কভারঃ হার্ড

মূল্যঃ ২৫০ টাকা

বিবরণঃ

সোনালি শৈশব  একটি স্মৃতিকথার কথা সাহিত্যের বই। লেখক অতীতের গ্রাম বাংলার প্রকৃতি, পরিবেশ, মানুষ, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ইত্যাদি  মজার  মজার মজার কথা দিয়ে এই বইয়ে তুলে ধরেছেন।

পাওয়ার উপায়ঃ

১। নিকটস্থ লাইব্রেরি।

২। অনলাইন শপ (লেখকের নিয়ন্ত্রণে): www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

৩। অনলাইন শপ (প্রকাশকের নিয়ন্ত্রণে):  www.rokomari.com

৪। কুরিয়ার সার্ভিসেঃ মোবাইল নম্বর 01711683046 তে অর্ডার করে।

৫। সরাসরি লেখকের চেম্বারের সহকারীর কাছ থেকে।