সোনালি শৈশব

বইয়ের নামঃ সোনালি শৈশব

লেখকঃ ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

প্রকাশকঃ ছায়াবীথি

পৃষ্ঠাঃ ১৪৪

কভারঃ হার্ড

মূল্যঃ ২৫০ টাকা

বিবরণঃ

সোনালি শৈশব  একটি স্মৃতিকথার কথা সাহিত্যের বই। লেখক অতীতের গ্রাম বাংলার প্রকৃতি, পরিবেশ, মানুষ, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ইত্যাদি  মজার  মজার মজার কথা দিয়ে এই বইয়ে তুলে ধরেছেন।

পাওয়ার উপায়ঃ

১। নিকটস্থ লাইব্রেরি।

২। অনলাইন শপ (লেখকের নিয়ন্ত্রণে): www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/

৩। অনলাইন শপ (প্রকাশকের নিয়ন্ত্রণে):  www.rokomari.com

৪। কুরিয়ার সার্ভিসেঃ মোবাইল নম্বর 01711683046 তে অর্ডার করে।

৫। সরাসরি লেখকের চেম্বারের সহকারীর কাছ থেকে।

গেন্দু মিয়ার শশুর বাড়ি গমন

গেন্দু মিয়ার শশুর বাড়ি গমন

(হাসির হাস্তর)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

[সখিপুর এলাকার লোক মুখে শোনা গল্প। জোড়াতালি দিয়ে অলংকৃত করে লেখা হয়েছে। গল্প সংগ্রহে সাড়াসিয়ার ক্লাস মেট বন্ধু আবু বকর সিদ্দিকের সহযোগিতা নেয়া হয়েছে]

 

সিনেমা দেখার পর থেকেই গেন্দু মিয়ার বিয়ে করার ইচ্ছে জাগে। একদিন সে করিম বকসের কাছে তার মনের ইচ্ছাটা জানালে করিম বকস কথাটা গুরুত্বের সাথে নিলেন। গেন্দুর বাবার কাছে জানালেন। বাবায় বললেন

– পোলা হয়ে যখন জন্মেছে তখন বিয়েতো করাতেই হবে। ছেলের মোছ কালো হতে শুরু করেছে। বিয়ের বয়স এখন হয়েছে। সাবালক পোলা বিয়ে করিয়ে দেয়া আমাদের দায়িত্ব। কিন্তু পোলা যে বিয়ে করাবো তাতে একটু সমস্যা আছে। গত বছর মাইয়াটারে বিয়ে দিতে গিয়ে উজান বাইদের ক্ষেতটা বগুরাহান লাগিয়েছিলাম। দশ হাজার টাকা ফেরত দিতে পারলে ক্ষেতটা ফেরত পাওয়া যাবে। ছেলের শশুরের কাছ থেকে যদি টাকাটা নিয়ে বিয়ে করানো যায় তবে মন্দ না। আমি ছেলের জন্য সাইকেল ঘড়ি চাবো না। ছেলে আমার সাইকেল চালাতে পারবে না। ঘড়িও তার কাছে বেমানান।কাজেই, নগদ টাকাটাই নিতে হবে।

– আপনে যে টাকা নিতে চাচ্ছেন তা হলো যৌতুক। এটাকে এখন মানুষ ঘৃনা করে।

– আমরা নিলে হবো অন্যায়। আমিওতো মেয়ে জামাইকে ১০ টাকা হাজার দিয়েছি। আবার সেই টাকাই ফিরিয়ে আনবো ছেলে বিয়ে করিয়ে।

– আচ্ছা, ঠিক আছে। দেখি কোনো মেয়ে পাওয়া যায় কি না।

 

রহিম ও করিম বকসরা দু’জন মিলে খোঁজাখুঁজি করে অবশেষে মেয়ে একটা ঠিক হয়ে গেলো। ভর এলাকায় বাড়ি। গ্রামের নাম হদিলাপুর। মেয়ে একটু শ্যামলা হলেও স্বভাব চরিত্র ভালো। রহিম বকসরা ঘটকালি করে উভয়েই পাজামা পাঞ্জাবি উপহার পেলেন বিয়েতে। বিয়ে হলো, ফিরানি ঘুরানি পর্বও শেষ হলো। মেয়ের বাপে লক্ষ্য করলেন যে মেয়ে জানাই গেন্দুর বুদ্ধি শুদ্ধি কম। গেন্দুর সুমুন্দির বউরাও জানতে পারলো যে তাদের নোন্দের (ননদের) জামাই বাবাগোবা। বউয়ের ভাবীদের সাথে, ছোট ভাই-বোনদের সাথে সাধারণত জামাইদের হাসি-তামসা ঠাট্টা -মস্করার চল ছিল। গ্রামে হাসি তামাশার খুব প্রচলন ছিলো আগের দিনে। দাদা-দাদী ও নানা-নানিরা নাতি-নাত্নিদের নিয়ে হাসি-তামাসা করতো।

 

শ্যালকশ্যালিকাদের দুলাভাইদের সাথে এবং বেয়াই-বিয়ানিদের মধ্যেও ঠাট্টা মস্করা হতো। চাচী, ফুফু, খালা, মাঐদের সাথেও একধরনের ঠাট্টার চল ছিলো। তারা বাপ নিয়ে ঠাট্টা করতো। যেমন, ধরুন, মাঐ সম্পর্কের একজন পুতুরাকে (মেয়ের দেবর বা ছেলের শ্যালক) শুনিয়ে বললেন “বেগুনের দাম কমে গেছে, চার আনা সের।” পুতুরায় শুনে বললো “দিবোনা আপনের বাপেরা। বেগুন হাটে আট আনা সের।” অথবা পুতুরা মাঐ বাড়ির কাছে এসে গলা খাকিয়ে জানান দিলো “মাঐ আপনের বাপেরা আইলো গো।” মাঐ সতর্ক হয়ে আঁচল টেনে মাথায় উঠালো। এমন ঠাট্টার প্রচলন ছিলো আগের দিনে। গেন্দু মিয়ার সুমুন্দি বউদের অভিযোগ হইলো সে তাদের সাথে মস্করা করে না। লাজুক ভাবে চুপচাপ বসে থাকে রুমাল হাতে নিয়ে। গেন্দুর শশুর রহিম বকসকে বললেন কী বোকাসোকা জামাই দেখে মেয়ে বিয়ে দিলাম সে মেয়ের ভাবীদের সাথে একটু ঠাট্টা মস্করাও করতে পারে না। জামাইরে একটু বইলা দিয়েন যেনো সুমুন্দির বউদের সাথে ঠাট্টা মস্করা করে।” করিম বকস সেইমত গেন্দুকে বলে দিলেন “শশুরবাড়ি গিয়ে ভাবীদেরকে সালামাল্কি দিবি। একটু ঠাট্টা মস্করা করবি।”

 

বর্ষাকাল ছিলো। খাল বিল নদী নালা সব পানিতে ভরে গিয়েছিলো। সেবার খুব চামারা ধান হয়েছিলো মাঠভর্তি। চামারা ধানের বৈশিষ্ট্য হলো মাঠের পানি যতই বাড়তে থাকতো ধান গাছও তত বাড়তে থাকতো। শুধু ধানের সবুজ পাতা মাঠভর্তি দেখা যেতো। বিলের পানি দেখা যেতো বিস্তির্ন এলাকা জুরে। নৌকা ছাড়া কোথাও যাওয়া যেতো না। মাঠের উপর দিয়ে নৌকা সোজা বেয়ে নিতে হতো চামারা ধান ক্ষেতের উপর দিয়ে। তাতে ধান গাছগুলো দু’দিকে সরে গিয়ে পানিতে নৌকা চলার রাস্তা হতো। এই পানির রাস্তাকে বলা হতো দারা। দারা দিয়ে নৌকা চলার সময় ধান গাছে ঘষা লেগে এখরনের শব্দ হতো। সেই বর্ষাকালে গেন্দুর শাশুড়ি গেন্দুর শশুরকে বললেন জামাইকে নিতার দাওয়াত খাওইতে। বললেন “জামাইরে নাইরল-চিড়া পার ও কুশাইরা গুরের ফুকা পিঠা ও খির খাওয়াইতে অইবো। জামাইরে দাওয়াত কইরা নিয়া আহুন গা।” আগের দিনে মেয়ে-জামাইকে শাশুড়ী খুব খাওইতো।

গেন্দুর শশুর ডিংগি নাও নিয়া গেন্দুকে আনতে গেলেন। নাও খোজ দেয়ার জন্য একজন লোক নিয়ে গেলেন। জয়নাতলা ঘাটে নৌকা রেখে জামাইবাড়ি গেলেন। গেন্দুর বাবাকে বলে নিয়ে এলেন গেন্দুকে।

গেন্দু দাঁত মাজত না। দাতের গোড়ায় পঁচামুইনা ঘাঁও ছিলো। কথা বলার সময় পাঁচকাঠা দাঁত বের হয়ে থাকতো। দাঁতের ময়লা দেখে শশুরের খারাপ লাগছিলো। জয়নাতলা ঘাটে একজনে কুশাইর কেটে বেঁচছিলো। শশুর জামাইকে চার আনা পয়সা দিয় বললেন “জামাই, এই পয়সা দিয়া একটা কুশাইর কিনে খাওগা।” শশুরের উদ্দেশ্য ছিলো কুশাইর চিবিয়ে খাবার সময় কুশাইরের ছোবলার ঘষায় জামাইর দাঁত পরিস্কার হবে। জামাই পয়সা হাতে নিয়ে জয়নাতলা গিয়ে দেখেন কুশাইরের দোকানের পাশেই একজনে ভেজা সেদ্ধ বুট বিক্রি করছে। সে কুশাইর না কিনে বুট কিনে খেতে খেতে আসছে, আর দাঁত বের করে বলছে “আব্বা, বুট খাইতে ইচ্ছা অইলো তাই বুট কিনলাম।” শশুর দেখলেন যে গেন্দুর দাঁতের চিপা দিয়ে ভিজা বুটের চোঁচা লেগে আরও বিছছিরি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কি আর করা যায়! নতুন জামাই তো।

 

গেন্দুর সকাল থেকেই পেটটা কেমন ফাঁফা ফাঁফা মনে হচ্ছিল। অত্যধিক গ্যাস জমেছিলো পেটে। বুট খেয়ে আরও গ্যাস বৃদ্ধি পেলো। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল বেরিয়ে যাবে ফস করে। কিন্তু গেন্দুর শশুর সাথে থাকাতে ছাড়তে পারছিলো না। গেন্দু মাঝে মাঝে চিন্তা করছিলো শব্দ না করে চুপি চুপি ছেড়ে দিতে। কিন্তু তার ভয় ছিলো যদি সেটা দুর্গন্ধ ছড়ায়! সাথে শশুর আছে, লজ্জার কথা। নাও চলছিলো দারা দিয়ে। শশুর নায়ের সামনের গলুইয়ে বসেছিলেন কপালে হাত দিয়ে। কপালে রোদ লাগছিলো বিকেলের। নায়ের মাঝির সন্দেহ হলো নায়ের গুড়া দিয়ে পানি প্রবেশ করছে। সে গেন্দুকে বললো “জামাই, দেহুনছে নায়ে পানি ওঠতাছে নিহি।” গেন্দু হুতি দিয়ে পাটাতন তুলে যেই দেখতে নিয়েছে অমনি পুত শব্দ করে কিছু গ্যাস বেরিয়ে গেলো। শশুরের দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো। গেন্দু ধান ক্ষেতের দিকে দৃষ্টি দিলো লজ্জায় পড়ে। একটা চালাকি তার মাথায় এলো। শশুরকে ভুলানোর জন্য সে চলন্ত নায়ের গুড়ায় বসে ধান পাতায় দুই আংগুলের চাপ দিয়ে ধরে চিক করে শব্দ করলো কয়েকবার। শশুর জামাইর চালাকি বুঝতে পেরে বললেন “জামাই, ধানের পাতার শব্দ আগের মতো আর অইব না।” নায়ের মাঝি বুঝতে পেরে চিপা চিপা হাসতে থাকলো। এক সময় ফেককত করে হাসি দিয়ে লগি সহ ঢলে পড়লো পানিতে। শশুর তাকে টেনে উঠালেন। নাও আবার চললো। আসরের নামাজের জের ওয়াক্তে গিয়ে তারা শশুরবাড়ি পৌঁছলো। নতুন জামাই আসতে দেখে সমুন্দির বউরা বাড়ির ঘাটে অপেক্ষা করছিলো। গেন্দু মিয়ার মনে পড়লো করিম বকসের উপদেশের কথা। সালামাল্কি দিয়ে ভাবীদের সাথে হাসি তামসা মস্করা করতে। তাই, গেন্দু বলে উঠলো “সালামালাইকুম, ভাবীসাবেরা, আইলো কইল আপনের বাপেরা।” শশুর জিহবায় কামর দিয়ে বললেন “জাউরাডায় ইডা কী কয়।”

৫/১২/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ
Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/





আব্দুল হক স্যার বই ছুড়ে মারলেন

আব্দুল হক স্যার বই ছুড়ে মারলেন

(স্মৃতি কথা)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

[প্রফেসর ডা. আব্দুল হক স্যার ছিলেন একজন সৎ ও আদর্শবান মানুষ। তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ছিলেন। তিনি উক্ত কলেজের প্রিন্সিপাল এবং ময়মনসিংহ বিএমএ-র প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন]

 

১৯৮৩ সন। ফার্স্ট প্রফেসনাল পরীক্ষা পাস করে এমবিবিএস তৃতীয় বর্ষে ওঠলাম। বড়ভাইদের পরামর্শ নিয়ে কিছু নতুন বই কেনলাম ঢাকার নিউমার্কেট থেকে। ফার্স্ট প্রফেসনাল পরীক্ষা হলো এমবিবিএস কোর্সের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। এনাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হাই ফকির স্যার থাকাতে আরও কঠিন হয়ে পড়েছিলো এই পরীক্ষা। এই পরীক্ষা এক চাঞ্চেই ভালো নম্বর পেয়ে পাস করাতে আমার মনের মধ্যে ফুরফুরে ভাব ছিলো। জিন্সের পেন্ট বানালাম। একটু স্টাইল করে হাটার চেষ্টা করলাম। কিন্তু স্টাইলে হাটা হচ্ছিলো না। আগে থেকে অভ্যাস না থাকলে কি করে স্টাইল আসবে? থার্ড ইয়ারের সব ক্লাস ঠিকমতো হচ্ছিলো না। বন্ধুরা মিলে ট্যাং ট্যাং করে ঘুরে বেড়াতাম। একসাথে ঘুরে বেড়ানোর বন্ধুদের মধ্যে ছিলো নজরুল, সদর, মোহাম্মদ আলী খান, সেবাব্রত, সফি, নাসিম, মাহবুব, খোরশেদ, সাধারণত এরাই। এনাটমির ডিসেকশন হলের সামনে, এখন যেখানে অডিটোরিয়াম আছে, এখানে বসে আড্ডা দিতাম। একবার আড্ডার সময় দেখলাম হঠাৎ আমাদের মাঝে নাসিম নেই। কিভাবে উধাও হয়ে গেলো আমরা বুঝলাম না। আসলে ওর একটু বেশী শয়তানি বুদ্ধি ছিলো। আমাদেরকে চমকিয়ে দেয়ার জন্য পেছন থেকে স্যানিটারি পাইপ বেয়ে নিচে নেমে গিয়েছিলো।

 

ডিসেকশন হলের উপর তলায় বিল্ডিং ছিলো না। এখন ওটার উপরে গেলারি ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ হয়েছে। তখন প্যাথলজি ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ মিলে একটা বিভাগ ছিলো। মাইক্রোবায়োলজি প্যাথলজির একটা সাবজেক্ট ছিলো। পড়াতেন প্রফেসর ডাঃ আবু আহমমেদ স্যার। স্যার খুব মজা করে পড়াতেন। মুখে হাসি লেগেই থাকতো। স্যারের সব চুল পাকা ছিলো। মাথায় ধব ধবে সাদা চুল ছিলো। তাই আমরা আড়ালে পাকু স্যার বলতাম।

 

প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ছিলেন প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হক স্যার। আসলে আমি স্যারকে তখনও ভালো ভাবে চিনিনি। বিভাগীয় প্রধানের রুমের সামনের করিডোর দিয়ে আমি ও নজরুল পশিম দিকে হেটে যাচ্ছিলাম খুব সম্ভব ছাত্রসংসদ রুমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। আমার ডান হাতে দু’টি নতুন বই ছিল। বই দু’টির কভারের রঙ ছিলো লাল। বইয়ের অথর ছিলেন প্রফেসর ডাঃ এম এ খালেক স্যার। বলা হতো এম এ খালেকের প্যাথলজি বই। প্রাক্টিকেল পার্টসহ আরেকটা প্যাথলজি বই ছিলো নিল রঙের কভারের। ওটার অথর ছিলেন প্রফেসর ডাঃ কাজী খালেক স্যার। বলা হতো কাজী খালেকের বই। ছাত্র জীবনের এই খালেক স্যারদের ওজন মাপার মতো অতোটুকু জ্ঞান আমার ছিলো না। স্যারদের পরিচয় পেয়েছি ডাক্তার হবার পর এম ফিল কোর্স করার সময় আমার স্যারদের মুখে তাদের ইতিহাস শুনে। যাহোক, যখন বিভাগীয় প্রধানের রুমের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হক স্যার বের হলেন। আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন “এই দাড়াও।” দাড়ালাম। “দেখি কী বই এগুলো” বলে আমার হাত থেকে লাল রঙের বই দু’টি নিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করলেন। আমি খুব খুশী খুশী ছিলাম এই ভেবে যে আমি থার্ড ইয়ারে উঠেই নতুন চক চকে বই কিনে ফেলেছি। দেখে স্যার খুব খুশী হবেন। কিন্তু একি! স্যার রাগে চোখ বড় বড় করছেন। এদিক সেদিক তাকাছেন। ঠোঁট বির বির করে কি যেনো বকছেন। এক পর্যায়ে স্যারের রুমের বিপরীত দিকের দু’রুমের চিপা দিয়ে একটি কাঁচের জানালা ছিলো। সেই জানালার একটি পাল্লা খোলা ছিলো। বই দু’টি ছুড়ে মারলেন সেই জানালা দিয়ে। জানালার গ্রিলের সাথে বারি খেয়ে ফ্লোরে পড়ে গেলো। দেখলাম মাঝখানের সেলাই ফেটে গেছে। স্যার রুমের ভেতরে চলে গেলেন। আমি হত বিহবল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কীসের থেকে কী হলো কিছুই বুঝলাম না। দেখি নজরুল ভেগে পড়েছে। আমি বই দু’টি কুড়িয়ে তুলে ধুলা ঝেরে আবার হাতে তুলে নিলাম। চলে এলাম। কিন্তু কিসে থেকে কী হলো কিছুই বুঝলাম না।

 

কয়েকদিন পর প্যাথলজি প্রথম লেকচার ক্লাস করলাম আব্দুল হক স্যারের। তিনি প্রথম ক্লাসে অনেক নীতিকথা শুনালেন। তিনি ইংল্যান্ড থেকে এমআরসিপ্যাথ পাস করেছেন। সেখানকার জ্ঞান গড়িমার কিছু বক্তব্য তুলে ধরলেন। বুঝলাম প্যাথলজি বিষয়ে তিনি অগাধ জ্ঞান রাখেন। দেশী লেখকদের পাঠ্য বই পড়া যাবে না। লাল খালেক, নীল খালেক পড়ে পরীক্ষা দিতে এলে ফেল করিয়ে দেবেন। পড়তে হবে বিদেশি লেখক মুইসের প্যাথলজি বই। আমি আবার নিউমার্কেট গিয়ে মুইসের প্যাথলজি বই কিনে নিয়ে এলাম। তবে, পাস করার জন্য কাজী খালেক স্যারের বইটিই বেশী কাজে লেগেছে। আমি যখন শিক্ষকতা করি তখন পড়িয়েছি রবিন্সের প্যাথলজি বই। সাথে কাজী খালেক। কিন্তু ছাত্ররা আমার মেধাবী ছাত্র জহিরের বই না পড়ে পরীক্ষা দিতে আসছে না মনে হচ্ছে।

৫/১২/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/


গেন্দু মিয়ার শহর দেখা

গেন্দু মিয়ার শহর দেখা

( হাল্কা হাসির হাস্তর)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

অনেক বড় বয়স পর্যন্ত পোলাপানি ভাব না যাওয়াতে তাকে সবাই গেন্দু ডাকতো। গেন্দুর আসল নাম কি তা আমাদের জানা নাই। গ্রামের মানুষ শিশুদের ছেলেদের বেলায় গেন্দা আর মেয়েদেরকে গেন্দু বলে ডাকতো। সেই গেন্দা থেকে গেন্দু হয়েছে। বড় হলে গেন্দুর সাথে মিয়া যোগ করে গেন্দু মিয়া হয়েছে। অনেক বড় হওয়া পর্যন্ত গেন্দু মিয়ার নাক দিয়ে হিনিত পড়তো। নাকের নিচে ঠোঁটের উপর যখন মোছের রেখ দেখা তারপর থেকে তার হিনিত পরে না। গ্রামের মানুষ মোছের রেখ দেখা দিলেই মনে করতো বিয়ের বয়স হয়েছে। তাই ছোট বয়সেই অনেকে ছেলের বিয়ে দিয়ে দিতো। আরেকটা কারনে অনেকে ছেলে বিয়ে করাতো। বিয়ে করলে কিছু যৌতুক পাওয়া যেতো। এখন যৌতুকের প্রথা নেই।

অনেকেই টাঙ্গাইল শহরে গিয়ে টগি দেখে আসে। টগির গল্পের কথা অনেকের কাছেই গেন্দু মিয়া শোনে। করিম বকস ও রহিম বকস প্রায়ই টাঙ্গাইল গিয়ে টগি দেখে আসেন। একদিন গেন্দু মিয়া রহিম বকসকে বললো

– মিয়া ভাই, আপনেরা শহরে গিয়া কত কিছু দেইখা আইসা গল্প করেন। আমারও শহরে যাইতে ইচ্ছা করে।

– শহরে যাইবার সখ হইছে? তাহলে চল যাই একদিন। তয় একটা কথা আছে খরচাপাতি কিন্তু তোর দিতে হবে।

– কেমন খরচা অইব?

– আমি শহরে গেলে সবসময় রহিম বকসকে সাথে রাখি। কাজেই গেলে তিন জন একসাথেই যাবো। তিনজনের গাড়িভাড়া, সিনেমার টিকেট কেনা ও দুপুরে আপ্যায়ন হোটেলে খাওয়া বাবদ যা হয়। আমি পুরাপুরি হিসাবটা রহিমের সাথে বসে ঠিক করে বলবোনি। আর আরেকটা কথা, টাউনে গেলে কিন্তু ভালো কাপড় চোপড় ও জুতা মোজা পরে যেতে হবে।

পরিস্কার দিন দেখে তারা তিনজন টাঙ্গাইল রওনা দিলেন। গেন্দু মিয়া হাওই শার্ট গায় দিয়ে, টুইস লুঙ্গি পরে, নাগরা জুতা ও মোজা পায় দিয়ে নিলো। রহিম বকসরা এবার কোথাও কোন ফাঁকিঝুকি দিলেন না। কারন, এবার পরের টাকায় ভ্রমণ হচ্ছে। আমুদপুর পর্যন্ত হেটে গিয়ে তারা মোটর গাড়িতে উঠলেন। গেন্দু মিয়ার প্রথম মোটর গাড়ি দেখা হলো। এর আগে গ্রামে শুধু গরুর গাড়ি ও মহিষের গাড়ি দেখেছে। গাড়ির সাথে মোটর ইঞ্জিন যোগ করেছিলো বলে গ্রামের মানুষ বাসকে মোটর গাড়ি বলতো। সেইরূপ, সাইকেলের সাথে মোটর ইঞ্জিন যোগ করেছিলো বলে এগুলোকে মোটর সাইকেল বলতো। একটা লোক গাড়ির সিটের মাঝখানের করিডোর দিয়ে হেটে হেটে ভাড়া আদায় করছিলেন যাকে বলা হয় কনডাক্টর। কিন্তু যাত্রীরা বলতো কন্ডাকদার। কন্ডাকদারের গলায় চামড়ার ব্যাগ ঝুলানো থাকতো। সেই ব্যাগে কয়েকটা পার্টিশন থাকতো এক পয়সা, দুই পয়সা, ১০ পয়সা, চার আনা, আট আনা ও এক টাকার কয়েন পৃথকভাবে রাখার জন্য। সবাই কয়েন দিয়ে ভাড়া দিতো। ব্যাগ ঝাকি দিয়ে যখন কয়েন বের করা হতো ভাংতি দেয়ার জন্য তখন কয়েনে ঝনঝন শব্দ হতো। গেন্দু মিয়ার সামনে সিটে বসেছিলেন রহিম ও করিম বকস। কন্ডাক্টর রহিম ককসের কাছে “ভাড়া লন” বললে তিনি গেন্দু মিয়াকে বলে দিলেন ভাড়া দিয়ে দিতে। গেন্দু মিয়া হিসাব করে তিনজনের ভাড়া দিয়ে দিলো। টাঙ্গাইল তখন বাস টার্মিনাল ছিলো না। ময়মনসিংহ থেকে ঢাকার বাস যেতো টাঙ্গাইল হয়ে। গাজীপুর হয়ে যে রাস্তা হয়েছে ওটা অনেক পরে হয়েছে। ঢাকা-ময়মনসিংহের বাস কিছুক্ষণ টাঙ্গাইল শহরে থামতো। তাই ওটাকে বলা হতো টাঙ্গাইল বাস স্ট্যান্ড। এখন ওটার নাম পুরাতন বাস স্ট্যান্ড। এখানে নেমে ভিক্টোরিয়া রোড দিয়ে হেটে হেটে দোকানপাঠ দেখিয়ে দেখিয়ে মেইন রোডের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন গেন্দু মিয়াকে। শহরে প্রচুর লোক দেখে গেন্দু মিয়া মন্তব্য করলো — মিয়া ভাই, আমারে এরুম আটের দিন নিয়া আইছুন ক্যা?

– আরে বোকা, হাটের দিন না। শহরে দৈনিকই হাট লেগে থাকে। প্রতিদিনই গ্রাম থেকে অনেক লোক আসে শহরে এটা সেটা কেনার জন্য। বেশী ভাগ দোকান গুলা এই রোডে। এজন্য তোকে এই রোড দিয়ে ঘুরাইতেছি।

– মিয়া ভাই, এইহানে পেছাপ করমু কুনু?

– পেছাব করবি? আয়, এই খাল পারে বসে পেছাব কর।

নিরালা মোরের ব্রিজের নিচ দিয়ে বের হয়ে ভিক্টোরিয়া রোডের দক্ষিণ পাশ দিয়ে একটা খাল ছিলো। খালের উপর বাঁশ গেড়ে টং ঘর তৈরি করে বেশ কিছু দোকান ও রাত্রিযাপনের হোর্ডিং ছিলো। এসবের ভেতরে বাঁশের উপর বসে বোর্ডাররা পায়খানা করতো। নিচের খালের পানিতে টপটপি পড়তো। ভিক্টোরিয়া রোড থেকে দেখা যেতো। রাস্টার ধারে একটা ট্যাপ থেকে পানি লিক করছিলো। গেন্দু মিয়া জিজ্ঞেস করলো

– মিয়া ভাই, ইডা কি?

– এটা পানির ট্যাপ। ই পানি খাওন যাবো?

– খাওয়া যাবে। উপরের মাথাটা ডান দিকে ঘুরা, পানি বের হবে। চৌল ভরে খাবি।

গেন্দু মিয়া ট্যাপ ঘুরিয়ে অঞ্জুলি ভরে পানি খেয়ে মন্তব্য করলো “টাউনের পানি ততা। ততা পানি খাইয়া পানি তুলাস গেলো না।” পানির পাইপ রৌদ্রে গরম হয়েছিল। তাই গেন্দুর কাছে পানি গরম লেগেছিলো।

সিনেমা হলের টিকিট করলো রিয়ার স্টলের। হলে যখন প্রবেশ করলো তখন হলের লাইট নিভিয়ে দেয়া হয়েছিলো। মোহিনী বিড়ির এডার্টাইজ দেখানো হচ্ছিলো রুপালি পর্দায়। গেন্দু মিয়া হলের ভেতর অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখছিলো না। বললো

– মিয়া ভাই, আন্ধাইর ছাড়া চোখে ত কিছুই দেখতাছি না। ঘুটঘুই্টা আন্ধাইর। দোয়াত জ্বালাইতে পারে না?

– রোদ্র থেকে এসে হলে প্রবেশ করাতে বেশী অন্ধকার দেখা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর আরও পরিস্কার হবে। টগি দেখাইতে হয় অন্ধকার ঘরে।

সিনেমা শুরু হলে সবাই দেখতে লাগলো। গেন্দুর কাছে আশ্চর্য লাগছিলো কিছু কিছু বিষয়ে তা হলো সিনেমার মানুষগুলো এই বিরাট বিরাট এই ছোট ছোট দেখে যায়। গাছ পালা নদী নালা বাড়িঘর এই হলের ভেতর আনলো কেমনে এ নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলো। বললো

– মিয়া ভাই, এতো কিছু এই ঘরের ভিতরে আনলো কেমনে?

– তুই বুজবি না। এসব সত্যি না। এগুলি ছবি। ঐ যে দেখ। দোতলায় পেছন দিক থেকে একটা ছিদ্র দিয়ে আলো প্রবেশ করে আমাদের মাথার উপর দিয়ে গিয়ে সামনের রূপালি পর্দায় পরছে। আলো প্রবেশের মুখে একটা চাকার উপর দিয়ে ঘুরে চলে যাচ্ছে ফটো ফিল্ম। যা পর্দায় পড়ার সাথে সাথে আমরা তাদের জীবিতের মতো দেখতে পাই।

সিনেমার সাপের দৃশ্য দেখে গেন্দু মিয়া উঠে দৌড় দেয়ার চেষ্টা করছিলো। রহিম বকস কাঁধের উপর চাপ দিয়ে বসিয়ে দিয়ে জিনিসটা যে বাস্তব না তা বুজিয়ে দিলেন। বিরতির সময় লাইট অন করে দিলে গেন্দু মিয়া ইলেক্ট্রিক বালব জ্বলতে দেখে জিজ্ঞেস করে “মিয়া ভাই, ইগুনা কিবা বাতি আগুন ছাড়াই জ্বলতাছে?” করিম বকস বুজিয়ে দেন “এগুলি কারেন্টের বাতি। জ্বলতে আগুন লাগে না।” ইলেক্ট্রিক ফ্যান ঘুরতে দেখে গেন্দু জিজ্ঞেস করে “এগুনা চরকির মতো ঘুরে কেন?” করিম বকস বুজিয়ে দেন “এগুলো বৈদ্যুতিক পাখা বা ফ্যান। মানে কারেন্টের বিচুন। ”

হল ভাঙ্গার পর তারা আপ্যায়ন হোটেলে খেতে গেলেন। বোয়াল মাছ, বাচ্চা মুর্গি গোস্ত, ডিম ও ডাউল ছিলো রেসিপি। গেন্দু মিয়ার হাতে যে টাকা আছে তা ডিম ও ডাউল দিয়ে খাওয়া ছাড়া উপায় ছিলো না। তাই, ভাতের সাথে ডিম ও ডাউল অর্ডার দেয়া হলো। এক টেবিলে রমিম ও করিম বকস আরেক টেবিলে গেন্দু মিয়া বসলো। গেন্দু মিয়া সেদ্ধ ডিম খাবার সময় দেখলো যে ডিমের ভেতর মুরগির বাচ্চা। ডিমটা খোসাসহ ছিলো, না খোসাছাড়া ছিলো তা আমার জানা নেই। এগুলো আমার শোনা কথা। তাই আমার কাছে গোজামিল মনে হচ্ছে। যাহোক ডিমের ভেতর সেদ্ধ বাচ্চা ছিলো এটা ঠিক। এগুলো হলো কুইচা মুরগির ডিম। দেশী জাতের মুরগিরা ২০-২২টি ডিম পারে ডোলের ভেতর ধানের উপর। বাচ্চা ফুটানোর জন্য ডিমের উপর ২২ দিন পর্যন্ত বসে থাকে। এজন্য ডিমগুলোকে একটা ঝাইঞ্জরের মধ্যে খের বিছিয়ে ডিমের উপর বসিয়ে দেয়। শরীরের তাপে ডিমের ভেতর ভ্রুন থেকে বাচ্চা হয়। ডিমের ভেতর থেকেই ঠুকরিয়ে ঠুকরিয়ে খোসা ফাটিয়ে চেও চেও করে বাচ্চা বের হয়ে আসে। প্রথম দিকে অল্পক্ষণ তাপ দেয়। শেষের কয়েকদিন খাওয়া দাওয়া বাদ দিয়ে একটানা তাপ দিয়ে যায়। তখন মুরগি খুব দুর্বল হয়ে পড়ে। এগুলোকে কুইচা মুরগি বলে। আর ডিমগুলোকে বলা হয় কুইচা মুরগির ডিম। আগের দিনের ডিমের পাইকাররা ঢাকি কাঁধে নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ডিম কিনে নিতো। বাড়ির কাছে এসে ডাক দিতো “ও আন্ডা।” মেয়েরা মুরগি ও হাসের ডিম নিয়ে পাইকারদের কাছে বিক্রি করতেন। পোলাপানরা তাদের মা বাড়িতে না থাকলে চুপি চুপি কুইচা মুরগির ডিমও বেচে দিতো। ডিমের কাছে গেলে কুইচা মুরগি ঠোকর মেরে দেয়। গেন্দু মিয়াও একদিন যুত করে কুইচা মুরগির ডিম বিক্রি করেছিলো। ডিমের ভেতর বাচ্চা দেখে পেছনের টেবিলের দিকে ঘুরে গেন্দু বললো “মিয়া ভাই, আন্ডার ভিতর মুরগির বাচ্চা।” করিম বকস বললেন “কথা কইস না, খেয়ে ফেল। নইলে বাচ্চার দামও দিতে হবে।” গেন্দু বাচ্চাসহই ডিম খেয়ে ফেললো। খাওয়া শেষে গেন্দুর তীব্র পায়খানার বেগ ধরলো। বললো

– মিয়া ভাই বাইরে যামু।

– খাওয়ার টাকা দিয়ে যা।

– টাকা পরে, আগে বাইরে যাওন নাগবো, থাকবার পারতাছি না।

বলে সে দরজা দিয়ে বের হতে লাগলো। করিম বকস বললেন

– ওদিকে যাস কেন?

– আমার খুব আগা ধরছে। বাইরে যামু। জংলা দেইখা এক জায়গায় বইসা পড়মু।

– দূর বোকা, এখানে জংলা পাবি কই? ভেতরেই পাইখানা ঘর আছে।

গ্রামের মানুষ তখনকার দিনে অনেকেই লেট্রিন ব্যবহার করতো না। বাড়ির বাইরে গিয়ে ঘাটের ওধারে অথবা ঝোপঝাড়ে বসে প্রাকৃতিক কাজ সেরে নিতো। লেট্রিনে বসে একজনের পায়খানার উপর আরেকজন পায়খানা করা তারা পছন্দ করে না। জংলায় গিয়ে ডেউ পেড়ে পেড়ে জায়গা বেছে নিয়ে সুবিধামতো এক জায়গায় বসে তারা পায়খানা করতো। বাড়ির বাইরে গিয়ে পায়খানা করতে হতো বিধায় পায়খানায় যাওয়াকে তারা বাইরে যাওয়া বলতো।

ওয়েটারকে বললেন গেন্দুকে লেট্রিন দেখিয়ে দিতে। গেন্দুকে লেট্রিনের ভেতর ঢুকিয়ে দরজা চাপিয়ে ওয়েটার এসে পড়লো। গেন্দু দেখলো পোস্তাকরা তেলতেলা পাকা ঘর। এখানে পায়খানা করবো কিভাবে তা বুঝার আগেই ওটা বেরিয়ে এলো আলোর পথে। গেন্দু তারাতারি মোজা খুলে মোজার মধ্যে ধরে ফেললো। এখন কি করা যায়। উপরের দিকে চেয়ে দেখলো ওয়ালের একটা ছিদ্র দিয়ে বাইরের আলো প্রবেশ করছে। চিন্তা করলো এই ছিদ্র দিয়ে বাইরে ছুড়ে মারবে। কিন্তু ভেন্টিলেটরের ছিদ্রটা ছিলো অনেক উঁচুতে। একটা বুদ্ধি এলো তার মাথায়। মোজার বন্ধ দিকটা ডান হাত দিয়ে ধরে ভেন্টিলেটরের দিকে মুখ করে সজোরে মোজা ঘুরাতে থাকলো। মোজার সব কিছু ছুটে ছূটে ভেন্টিলেটর দিয়ে বাইরে গিয়ে পড়লো। তারপর লক্ষ্য করলো ছিটেফোঁটা শুধু ভেন্টিলেটর দিয়েই যায়নি। চারিদিকের ওয়ালেও রেখ রেখে করে বিভিন্ন ডিজাইনে দাগ পড়েছে। গেন্দু অবাক হয়ে সেই দৃশ্য উপভোগ করতে লাগলো। এদিকে গেন্দু অনেক্ষণ লেট্রিনে দেরি করছে দেখে ওয়েটার এগিয়ে গেলো। সেও সেই দৃশ্য দেখে জিজ্ঞেস করলো “এগুলো কি?” গেন্দু উত্তরে বললো “আমার পায়খানা।” দেখে ওয়েটার অবাক হলো। এসে সবাইকে খবর দিলো এই বলে “দেখে যান এক কাস্টমার কত ডিজাইন করে পায়খানা করেছে। যে দেখে সেই অবাক হয় এবং মুগ্ধ হয়। ভির বেড়েই চললো। শেষের দিকে কেউ আর আসল ঘটনা না জেনে এটাকে একটা শিল্পকর্ম মনে করে দেখতে লাগলো। ভিক্টোরিয়া রোড দিয়ে যাচ্ছিলেন চিত্রশিল্পী রাফি চৌধুরী। তিনিও লোকমুখে শুনে দেখতে গেলেন। তিনি অনেক লম্বা লোক ছিলেন। সবার মাথার উপর দিয়ে তাকিয়ে দেখে মন্তব্য করলেন ” শিল্পকর্মটি আসলেই মনমুগ্ধকর।”

২/১২/২০২০

ময়মনসিংহ

 Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/


হোটেলে গিয়ে মাগনা খাওয়া

হোটেলে গিয়ে মাগনা খাওয়া

(হাস্তর)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

শহরে বেড়াতে গেলেও রহিম বকস ও করিম বকস একসাথেই যেতেন। শহরে মূলত তাদের কোন কাজ ছিলো না। আসল উদ্দেশ্য ছিলো হলে বসে সিনেমা দেখা। যখন যে সিনেমা মুক্তি পেতো সেই সিনেমেই তারা দেখে নিতেন। গ্রামের মানুষ তখন সিনেমাকে টগি বলতো। সম্ভবত টকিজ থেকে টগি হয়েছে। টাঙ্গাইলের গ্যাঘের দালানের সাথে এখনকার নিরালা মোড়ের সিনেমা হলের নামটিও কিন্তু “দি রওশন টকিজ।” প্রথম দিকে সিনেমায় চলমান চিত্র দেখা যেতো কিন্তু কথা শুনা যেতো না। এগুলোকে নির্বাক চলচ্চিত্র বলা হতো। একসময় চলচ্চিত্রের সাথে কথা যোগ করার প্রযুক্তি আবিস্কার হয়। কথার ইংরেজি হলো টক। এই টক থেকেই সম্ভবত টকিজ হয়েছে। সিনেমা হলে বসার কয়েকটি ক্লাস ছিলো। সবার সামনে অর্থাৎ রুপালি পর্দার কাছাকাছি সিটগুলোকে বলা হতো ফ্রন্ট স্টল। এগুলোর টিকেটের মূল্য ছিলো মাত্র ৮ আনা। ১৬ আনায় ১ টাকা হতো। ৬ পয়সায় হতো ১ আনা। একটা কয়েনের মাঝখানে গোল ছিদ্র ছিলো, সম্ভব ওটা ২ পয়সার কয়েন ছিলো। ওটাকে বলা হতো ছেন্দা পয়সা। এখনো ঐ পয়সার নাম বলে অনেকে খোটা দেয় এভাবে “একটা ছেন্দা পয়সাও দিলোনা কৃপ্টায়।” ফ্রন্ট স্টলের পেছনের সিটগুলোর নাম ছিলো মিডল স্টল। এগুলোর টিকিটের মূল্য ছিল ১ টাকা। সবার পেছনের সিটগুলোর নাম ছিলো রিয়ার স্টল, মূল্য ছিলো দেড়টাকা। দোতলায় পেছনের দিকে কিছু সিট ছিলো। এগুলোর নাম ছিলো বেলকনি। বেলকনির সিটের মূল্য ছিলো ২ টাকা। দোতলায় বক্সের ভেতর দু’একটা চেয়ার ছিলো, বলা হতো বক্সের সিট। প্রতি বক্সে দু’টি সিট থাকতো। দুই সিটের বক্সের মূল্য ছিলো ৬ টাকা। নব দম্পতিরা নিরিবিলি বসে সিনেমা দেখার জন্য বক্সে টিকিট করতো। সিটের মূল্য যতো বেশী হতো সিনেমা দেখেও তত আরাম লাগতো। গ্রামের অল্প জানা লোকগুলো দু’টা কারনে ফ্রন্ট স্টলে টিকেট কিনতেন। প্রথমত, গরীব হওয়ার দরুন। দ্বিতীয়ত, তারা মনে করতেন সব কিছুর সামনে থাকা ভালো। রহিম ও করিম বকসরা ফ্রন্ট স্টলে টিকিট করতেন কারপণ্যতার কারনে। টিকিট কিনতে হতো ওয়ালের মধ্যের একটা ছিদ্র দিয়ে হাত ঢুকিয়ে। লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট নিতে হতো। টিকিটের গায়ে সরকারি সীল থাকতো। কারণ, সরকার সিনেমা দেখাকে প্রমোদ মনে করতো। তাই দর্শানার্থীদের টিকিটের সাথে প্রমোদ কর কেটে নিতো। লেখা থাকতো “প্রমোদ কর এত পয়সা।” এই টিকিট হিসাব করে শুল্ক বিভাগের লোকেরা কর আদায় করতেন। হলের ম্যানেজাররাও কম চালাক ছিলেন না। তারা কর ফাঁকি দেয়ার জন্য কিছু টিকিট সীল ছাড়া বিক্রি করতেন দালালদের মাধ্যমে। এগুলোকে ব্লাকের টিকিট বলা হতো। গ্রামের কেউ কেউ বলতেন ব্যালাকের টিকিট। রহিম বকসরা বেশী সময় ব্লাকের টিকিট কিনতেন। যারা ঘন ঘন সিনেমা দেখতো তাদেরকে ব্লাকাররা চিনে ফেলতো। এসব দর্শকরাও ব্লাকারদেরকে চিনে ফেলতো। কাজটা করা হতো গোপনে। ব্লাকারদের সাথে রহিম বকসদের বেশ খাতির ছিলো।

 

টাঙ্গাইল গেলে সাধারণত তারা বড় রেস্টুরেন্টে খেতেন না। তারা খেতেন ছয় আনি বাজারের খোলা খাবারের দোকানে। দোকানীরা ত্রিপাল টানিয়ে ভাত-সালুন বিক্রি করতেন। সেই খাবারে ভন ভন করে মাছি বসতো। সের দরে ভাত বিক্রি হতো। মোটা সেদ্ধ ঢেকিছাঁটা চালের ভাত। টিনের প্লেটে ভাত বেড়ে দাড়িপাল্লা দিয়ে ওজন করে ভাত বিক্রি হতো। এক প্লেট ভাতের ওজন হতো প্রায় আধা সের। এক সের প্রায় এক কেজির সমান ছিল। হোটেলের খাবারের খরচের চেয়ে ছয় আনি বাজারের খাবারের খরচ চার ভাগের এক ভাগ ছিলো। তাই, রহিম বকসরা ছয় আনি বাজারে গিয়ে টুলে বসে খেতেন।

 

শক্ত বেরাম থেকে সেরে ওঠার পর রহিম বকসের ইচ্ছা হলো একবার টাঙ্গাইল থেকে ঘুরে আসা যাক। শুনলেন যে “বনবাসী রুপবান” সিনেমা চলছে টাঙ্গাইল হলে। রূপ বানের যাত্রা তারা বহুবার দেখেছেন গ্রামের যাত্রা পালায়। সেখানে রুপবানের অভিনয় করেছে পুরুষ মানুষ। সিনেমায় মেয়ের অভিনয় মেয়েরাই করে। রুপবান সিনেমাটা দেখতে হবে হলে গিয়ে। রহিম বকস করিম বকসকে প্রস্তাব দিলেন

– করিম, অনেকদিন হলো টগি দেখিনা। অসুখ থেকে সেরে ওঠে বারবার টাঙ্গাইল যেতে ইচ্ছে করছে।

– তুমি তো জানোই কাতিমাস চলছে। হাতে টাকা পয়সা নাই।

– তোমার হাতে আবার কবে টাকা পয়সা থাকে? তুমি অসুখের সময় আমাকে দেখতে গেছিলা খালি হাতে। নিজে তো কিছু নিয়ে যাওনি, উল্টো আরো আমার পথ্যগুলো খেয়ে এসেছিলে।

– তুমি শুধু খোটা দিতে জানো। আমার খাওয়াটাকেই বড় করে দেখলে। আমি তোমার সাথে সময় দিয়ে যে উপকার করেছি তা অন্য কেউ করেছে?

– যাউকগা, টাকা পয়সা যা লাগে এবার আমি খরচ করবো। তুমি শুধু আমার লগে যাবে।

– ঠিক আছে। আগামী রবিবারে আমরা যাবো। তুমি কিন্তু কৃপ্টেমি করতে পারবা না। ভালো রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে হবে। ছয় আনি বাজারে খাবো না। বক্সে বসে টগি দেখাতে হবে।

– তাই হবে। আগামী রবিবারে।

 

রবিবার দূ’জনই প্রস্তুতি নিলেন টাঙ্গাইল যাত্রার উদ্দেশ্যে। রহিম বকস মাথায় খাস তেল দেয়ার জন্য বোতল হাতে নিয়ে দেখেন বোতলের খোলা মুখ দিয়ে একটা তেলাপোকা প্রবেশ করতে নিয়ে আটকে পড়ে আছে। বোতলের মুখ খোলা পেলেই তেলাপোকারা বোতলে ঢুকে পড়ে তেল খাওয়ার জন্য। এজন্য গ্রামের মানুষ এদেরকে তেলচোরাও বলে থাকে। রহিম বকস তেলচোরাটাকে ধরে মাথার উপর পাড়া দিয়ে মেরে ফেললেন। তারপর একটা সাদা কাগজে রেখে ভাঁজ করে পাঞ্জাবির বাম পকেটে নিলেন। একটা মোছকাটার ক্যাঁচি দিয়ে পাঞ্জাবির ডান পকেটের নিচের দিকে কেটে ছিদ্র করে দিলেন। টাকা নিলেন বুক পকেটের ভেতরের চোরা পকেটে। আমুদপুর পর্যন্ত হেটে গিয়ে টাঙ্গাইলের কাঠ বডি বাস ধরলেন। টাঙ্গাইল পৌঁছে সকাল ১০ টার মেটিনি শোর বক্সের ৬ টাকার টিকিট কিনলেন ব্লাকে ৪ টাকা দিয়ে। দু’জনে আরাম করে চেয়ারে বসে “বনবাসী রুপবান” সিনেমা উপভোগ করলেন। হল ভাংলো ১ টার পর। লাগলো ক্ষুধা। এবার রহিম বকস কথা দিয়েছেন ছয় আনি বাজারে খাবেন না। সেই মতো ভিক্টোরিয়া রোডের আপ্যায়ন হোটেলে গিয়ে বসলেন। ভাতের সাথে অর্ডার করলেন সরষে ইলিশ। এক প্লেট করে ভাত খেয়ে আরও এক প্লেট করে অর্ডার করলেন। দ্বিতীয় প্লেটের খাবারের অর্ধেকেরও বেশী খাওয়া হয়ে গেলে রহিম বকস পাঞ্জাবির পকেটের কাগজে মোড়ানো মরা তেলাপোকাটা ছেড়ে দিলেন ভাতের প্লেটে। তারপর ওয়েটারকে ডেকে গালাগালি করতে লাগলেন ভাতের মধ্যে তেলাপোকা ছিলো, সেই তেলাপোকা মেশানো ভাত সবাইকে খাইয়েছে। এর শক্ত বিচার হবে। হই চই শুনে লোকজন জড়ো হয়ে পড়লো। ম্যানেজার এসে মাফ চাইলে তারা ঝগড়া ক্ষান্ত দিয়ে বের হয়ে এলেন বিল পরিষোধ না করেই। ম্যানেজার বিল চাইবার সাহস পেলেন না। ডেস্কের পেছনে ম্যানেজারের একটা সুন্দর ছাতা ঝুলানো ছিলো। করিম বকস সেই ছাতাটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিলেন এই বলে “ছাতাটা নিয়ে যাই।” ম্যানেজার বললেন “ছাতাটা আমার।” করিম বকস চোখ রাংগিয়ে বললেন “আচ্ছা, বাটপার দেখছি। পঁচা খাবার খাইছে। আবার বাটপারি করে আমার ছাতাটাও রাইখা দিতে চায়? সবগুলারে পুলিশে দেবো।” বলে ছাতা নিয়ে বের হয়ে সোজা চলে গেনেন বাস স্ট্যাণ্ডে। ময়মনসিংহ গামী কাঠবডি বাসে উঠলেন। এলেঙ্গা পর্যন্ত চলে এসে বাসের কনডাক্টার ভাড়া চাইলে রহিম বকস ডান পকেটে হাত দিয়ে বলে উঠলেন “হায়, হায়, পকেট মাইর হইছে।” শুরু হয়ে গেলো হই ছই। বাসের লোকদেরকে বললেন “আপনারা খুব খারাপ, আমার পকেট কাটলো আপনাদের বাসের গেইটে। গেইটে গেঞ্জামের সময় আমার ডান পকেটের টাকা পকেট কেটে নিয়ে গেছে। এই দেখেন পকেট কাটা।” ককন্ডাক্টর বললেন “ভাড়া আপনার দিতে হবে। পকেট কাটা বুঝি না। হুস করে বাসে ওঠতে পারেন না?” রহিম বকস বললেন “এই বাটপার, তোদের লোকেরাই আমার পকেট কেটেছে। আমার টাকা ফেরত দিবি। না হলে সবগুলারে আমুদপুর নামিয়ে মজা দেখাবো। আবার ভাড়া চাস?” অন্য যাত্রিরা ঝগড়া থামিয়ে দিলে রহিম বকসরা আমুদপুর নেমে পড়ে বাড়ির দিকে হাটা দিলেন। করিম বকস রহিম বকসকে উদ্দেশ্য করে বললেন “দোস্তো, খুব তো বাটপারি করলা আমার সাথে। যাওয়ার সময় বাস ভাড়া দিলা আট আনা আট আনা এক টাকা, সিনেমা দেখাইলা চার টাকায়, খাওয়াইলা মাগনা, ফেরার সময় বাস ভাড়াও ফ্রি। ফুটানি তো ভালাই দেখাইলা। এই জন্যই কি তেল চোরা পকেটে করে এনেছিলে? এই জন্যই কি ডান পকেট কেটে এনেছিলে?”

২৯/১১/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

শব্দার্থঃ

মাগনা = বিনামূল্যে

ছেন্দা = ছিদ্র

সালন = কারি

বেরাম = রোগ

কাতিমাস = কার্তিক মাস

লগে= সাথে

খাস তেল = সরিষার তেল

ফুটানি = ফোর টুয়েন্টি