জামাতে বন্ধ

জামাতে বন্ধ

(স্মৃতিচারণ)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

গ্রামে আমরা জামাত বদ্ধ হয়ে বসবাস করতাম। লবন, কেরোসিন ও কাপড় চোপড় ছাড়া তেমন কিছু কিনতে হতো না। এগুলো কিনতে হাটে যেতে হতো। হাট বসত সপ্তাহে মাত্র দুদিন । কারো বাড়িতে লবন শেষ হয়ে গেলে লবণ কর্জ করে আনতেন পাশের বাড়ি থেকে। তরকারির চামচের এক চামচ ভর্তি করে লবণ কর্জ দেওয়া হতো। কর্জ গ্রহণকারী হাটের দিন লবণ কিনে আনার পর ঠিক এক চামচ লবণ ফেরত দিতেন। শুকনা মরিচও সেভাবে কর্জ দেওয়া হতো। শুকনা মরিচ হিসাব করা হতো গন্ডা হিসাবে। চারটি মরিচে হতো এক গন্ডা। সাধারণত এক গন্ডা বা দুই গন্ডা বা তিন গন্ডা মরিচ কর্জ দেওয়া হতো। ফেরৎ নেওয়ার সময়ও গন্ডা হিসেবে গুণে নেওয়া হতো। Continue reading “জামাতে বন্ধ”

গরু খোঁজা

গরু খোঁজা

(স্মৃতিচারণ)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আগের দিনে গ্রামে হাল চাষের জন্য গরুর খুব প্রয়োজন ছিল। প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতেই হালের বলদ ছিল। অনেকের বাড়িতেই গাড়ির বলদ ছিল। দুধের গাভীও ছিল। গাভীকে আমরা বলতাম গাই। গাই খুব বেশি দুধ দিত না। সারারাত বাছুরকে আলাদা করে বেঁধে রাখা হতো । বাছুর রাখা হতো বড় ঘরে। গাই থাকত গোয়ালঘরে। মায়ের জন্য বাছুর মাঝে মাঝে ওম্মে করে থাকতো। গাইও ওম্বে করে জবাব দিতো। রাতে বাছুর দুধ না খাওয়ায় কিছু দুধ গাইয়ের ওলানে জমতো। সকালে চঁই চঁই করে সেই দুধ পানানো হতো হাটুর উপর দোনা বসিয়ে। ওলানে জোয়ার আসার জন্য মাঝে মাঝে বাছুরকে ওলান চাটতে দেয়া হতো। ওলানে চাপ আসলে গাই চোনায়ে দিতো। তখন দোনা সরিয়ে ফেলতে হতো, যাতে দুধে চোনা না লাগে। দুধ পানানো শেষে বাছুর ছেড়ে দেওয়া হতো। ছেড়ে দেয়া বাছুরকে বলা হতো আলগা বাছুর। বাংলাদেশের একটা শহরের নাম গাইবান্ধা। ভারতের সীমান্তে একটা জায়গার নাম বাছুর আলগা। সারাদিন বাছুর আলগা থাকতো। বান্ধা গাইয়ের আশেপাশে লেজ উচিয়ে বাছুর দৌড়াদৌড়ি করতো, দেখতে খুবই চমৎকার লাগতো। Continue reading “গরু খোঁজা”

খুইংগার চালা

খুইংগার চালা
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
গত দুই বছর আগে ইন্দ্রজানী হাট নিয়ে ফেসবুকে একটা গল্প লিখেছিলাম। সে গল্প পড়ে একজন পাঠক আমাকে অনুরোধ করেছিলেন তাদের খুইংগার চালা নিয়ে একটা গল্প লিখতে। গল্পটা ছিল স্মৃতিচারণমূলক। স্মৃতিচারণমূলক গল্প কেউ লিখতে বললে আমি লিখতে পারি না। আমার মাথায় যখন স্মৃতিচারণ খেলতে থাকে তখন আমি স্মৃতিচারণমূলক গল্প লিখি। তাই খুইংগার চালা নিয়ে এখনো কোনো গল্প লেখা হয় নি আমার। গতকাল দুপুরে খাবার সময় মোবাইলে একটা কল আসে। আমি সাধারণত মোবাইলে খাবার সময় কল ধরি না। মোবাইল স্ক্রিনে ‘নূর-ই-আলম খুইংগার চালা’ নামটা দেখে মোবাইলটা আমি রিসিভ করলাম । কথা শেষে স্বপ্না জিজ্ঞেস করলো Continue reading “খুইংগার চালা”

Home Post

Mobile Prescription

Welcome to website of Dr. Sadequel Islam Talukder


Dr. Md. Sadequel Islam Talukder
MBBS, M Phil (Pathology), MACP
Associate Professor and Head
Department of Pathology
Mymensingh Medical College
Mymensingh Bangladesh
.

 

Send your comment to: sadequel@yahoo.com

আমার মিউজিয়াম

পেন ড্রাইভ
কলমের মতো মাথায় ক্লিপ ছিল বলে এর নাম ছিল পেন ড্রাইভ।দেখুন, আমার বুক পকেটে লাগিয়ে রেখেছি কলমের মতো করে। এখন যেগুলি পাওয়া যায় এগুলি পেন ড্রাইভ না। আমি খুব সম্ভব এটা ২০০১ সনে কিনেছিলাম এই পেন ড্রাইভটি। দেখে অনেকে বলতেন “তোমার কলম এত মোটা নাকি?”

Continue reading “আমার মিউজিয়াম”

একজনের পনরশ স্ত্রী

একজনের পনরশ স্ত্রী
(স্মৃতিচারণমূলক গল্প)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৯৫ সনে পোস্টগ্রাজুয়েট ডিগ্রী নেয়ার পরের বছর গুলোতে আমি ঘন ঘন সাইন্টিফিক বিষয়ে ট্রেইনিং নিতাম। ২০০০ সনের ফেব্রুয়ারি মাসের ২৩ থেকে ২৯ তারিখ পর্যন্ত আমি ঢাকার মহাখালীতে বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলে বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ লেখার উপর একটা ট্রেনিং প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করি। এমন অনেক প্রোগ্রামেই আমি অংশগ্রহণ করেছি। ফলে আমার এপর্যন্ত ৮৭টি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এরমধ্যে ২৭টি পাবমেড ইন্ডেক্স আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। পাঁচটি মেডিকেল জার্নাল সম্পাদনা করার সৌভাগ্য হয়েছে। যাহোক, আমি যখন ঢাকায় ট্রেনিং নিতাম ময়মনসিংহ থেকেই যাতায়াত করতাম। ময়মনসিংহ -ঢাকা রোডে তখন সবচেয়ে ভালো বাস ছিল পদ্মা গেইটলক। এই বাসটি রাস্তায় কোথাও যাত্রী নিতো না। অর্থাৎ গেইট লক থাকতো। দেড় দুই ঘন্টায় ঢাকায় যাওয়া যেতো। সারারাস্তায় ক্যাসেটে বাংলা ও হিন্দি সিনেমার গান বাজাতো। আমি গাড়িতে উঠেই খবরের কাগজ কিনতাম। সংগে কম্পিউটার শিক্ষার বই নিয়ে যেতাম। বাসের সীটে বসে হয় খবরের কাগজ নাহয় বই পড়তাম। এখন বাসের সীটে বসে পড়িনা, মোবাইলে টাইপ করে গল্প লিখি। Continue reading “একজনের পনরশ স্ত্রী”

চাচার থাপ্পরে এক চোখ নষ্ট

চাচার থাপ্পরে এক চোখ নষ্ট
(রোগীর গল্প)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

একবার গ্রাম থেকে এক বাবা তার অবিবাহিত মেয়েকে নিয়ে এলো। তার মেয়ের সমস্যা হলো মেয়ের ছোট চাচা রাগ করে মেয়ের মুখের বাম চোখের উপর চর মারে। তারপর থেকে মেয়েটি বাম চোখে দেখতে পাচ্ছিল না। মেয়ের বাবা চাচাদের মধ্যে খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো। চাচায় ভাতিজিকে থাপ্পর মেরেছে এতে কেউ অসন্তুষ্ট নয়। এমন জোরে কেনো থাপ্পর মারলো যে মেয়ের চোখ নষ্ট হয়ে গেলো, এতে সবাই অসন্তুষ্ট ছোট চাচার উপর। মেয়ের বাবাও অসন্তুষ্ট ছোট ভাইয়ের উপর। বাবায় ছোট ভাই থেকেও মেয়েকে বেশী স্নেহ করে। পাড়ায় সবাই বলাবলি করছিলো চাচার কান্ড নিয়ে। বাবায় ভাবছিল এই মেয়েকে বিয়ে দিতে সমস্যা হবে। পাড়াপ্রতিবেশিরা বাবাকে বুদ্ধি দিতে লাগল ছোট ভাইয়ের নামে মামলা করে দেয়ার জন্য। যেহেতু চোখ নষ্ট হয়েছে সেহেতু ৩২৬ ধারায় মামলা হবে। ভালো লোকেরা বুদ্ধি দিলো চিকিৎসা করোনোর জন্য। চিকিৎসায় যে খরচ হবে সে খরচ চাচার কাছ থেকে তারা আদায় করে দিবে। মামলা পড়ে হোক। বাবায় আমাকে বললেন Continue reading “চাচার থাপ্পরে এক চোখ নষ্ট”

মলন দেয়া

মলন দেয়া
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ধান মাড়াই করাকে বলা হত মলন দেয়া। গ্রামে এখন আর মলন দিতে দেখি না। মলন দিতে ৫/৭টি গরুর প্রয়োজন হতো। এখন কেউ লাংগল দিয়ে হাল চাষ করে না। কেউ গরুর গাড়ি বায় না। তাই গরুর সংখ্যা কমে গেছে। দুইএকজন দুধ খাওয়ার জন্য গরু পালে। কেউ কেউ গরু পালে মোটাতাজা করার জন্য। কোরবানির আগ দিয়ে ভালো দামে বিক্রি করে। লাখ টাকা দাম পায় সেই গরুর। শহরের ছেলে মেয়েরা ষাঁড় ও বলদের পার্থক্য বুঝতে পারে না। গ্রামে বলদ কোরবানি দেয়া হয়েছে শুনে একজন কলেজ পড়ুয়া আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল কয়েকজন মেয়ের উপস্থিতিতে “ষাঁড় ও বলদের মধ্যে পার্থক্য কি?” আমি উত্তর এড়িয়ে অন্য প্রসংগে চলে যাই। তাতে তাদের মনে রহস্যের সৃষ্টি হয়। কিভাবে বুঝাব তা বলতে পারছিলাম না। আপনারাও যদি পার্থক্যটা না বুঝে থাকেন তা হলে বলছি “যে সব ষাঁড়ের অন্ডকোষ গোটকা ডেকে কেটে ফেলা হয় সেগুলি বড়সড় ও উচু হয়। তাদের প্রজনন ক্ষমতা থাকে না। তাদের বলা হয় বলদ।” বলদ দিয়ে বেশী কাজ করানো যায়।

যাহোক, মলনের কাজে সকল প্রকার গরু ব্যবহার করা হতো। পারতপক্ষে ষাঁড় ব্যবহার করা হতো না। ষাঁড় অন্য গরুর জন্য বিরক্তির কারন ছিল। মলনের জন্য ৫, ৬ বা ৭ টি গরু সারিবদ্ধভাবে গলায় রশি দিয়ে বাঁধা হতো। এই রশিকে বলা হতো দাউন। নির্দিষ্ট দুরত্বে দুরত্বে একটা করে পাগা থাকতো সেই দাউনে। পাগায় গরুর গলা আটকানো হতো। পাগার এক মাথায় বলের মত গুটি থাকতো আরেক মাথায় আংটার মত ছিদ্র থাকতো। গরুর গলার দুই পাশ দিয়ে উপরে তুলে গুটি আইংটার মধ্যে লাগিয়ে দেয়া হতো। গলার সাইজ ছোট হলে গরু মাথা বের করে ছুটে পালাতো। এটাকে বলা হতো মুরগলা দেয়া। অর্থাৎ মুরগলা দিয়ে গরু ছুটে যেতো। গরুর পায়ের নিচে যেহেতু ধানের হিঞ্জা (শিষ) থাকত সেহেতু গরু ধানের হিঞ্জা খেয়ে ফেলতো। তাই গরুর মুখে ঠোনা লাগিয়ে দেয়া হতো। ঠোনা বেত, বাঁশ, নও (বনলতা) অথবা দড়ি (রশি) দিয়ে বুনিয়ে বানানো হত। ঠোনা মুখে লাগালে গরু হা করে কিছু মুখে দিত পারতো না। কেউ কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলে আমরা বলতাম “মুখে ঠোনা লাগিয়ে বসে আছো কেন? কিছু বল।” মলন দেয়ার আগে পাকা ধান কেটে আটি বেঁধে বাঁশের বাইকে কাঁধে করে বাড়ি এনে উঠানের এক পাশে পালা (স্তুপ) দেয়া হতো। আমরা পালা বেয়ে উপরে উঠতাম। উপর থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়তাম। মলন দেয়ার সময় পালার উপর থেকে ধানের আটি মাটিতে ফেলা হতো। আটির বাঁন (বাঁধ) খুলে ঝাকি দিয়ে উঠানে ছড়িয়ে দেয়া হতো এলোমেলো করে। তারপর সব গরুগুলিকে দাউনে বাঁধা হতো। মলন উঠানে গোলাকৃতি চাকতির মতো দেখা যেতো। মলনের মাঝখানে রাখা হতো সবচেয়ে বৃদ্ধ গাইটিকে। গাভীকে বলা হতো গাই। যে গাইয়ের শক্তি সবচেয়ে কম হতো তাকে রাখা হতো কেন্দ্র বিন্দুতে। এটাকে বলা হত মেউয়া। মেউয়া এক পা স্থির রেখে অন্যান্য গরুর সাথে ঘুরতো। তাই তার বাম পায়ে খের পেঁচিয়ে পড়তো। এটাকে বলা হতো মেউয়া্র পেচ। মাঝে মাঝে মেউয়ার পেচ ছাড়িয়ে দিতে হতো। মেউয়ার ডানে থাকতো গাল মেউয়া। গাল মেউয়া দুর্বল বলদ অথবা অল্প বয়সের গরু থাকতো। এরপর যতই ডানদিকে যাওয়া হত ততই শক্তিশালী ও চঞ্চল স্বভাবের গরু জোড়া হতো। গরুকে মলনের সাথে সামিল করাকে বলা হতো জোড়া। গরু জোড়া শেষ হলে পাজুন হাতে নিয়ে গরুর লেজে ঝাকুনি দিয়ে হইট হইট করলে হরু হাটা শুরু করতো। পাজুন হলো বাঁশের তৈরি গরু পিটানোর চিকন লাঠি। এই পাজুন হাল বাওয়ার সময়ও ব্যবহার করা হতো। তাই এটাকে আইল্লা পাজুনও বলা হতো। কাপুরুষ চাষী এই আইল্লা পাজুন দিয়ে বউ পিটাত। অনেকে ভয় দেখানোর জন্য বলতো “তরে আইল্লা পাজুন দিয়া বাইরামু।” অর্থাৎ গরু পিটানোর লাঠি দিয়ে আঘাত করবে। গরুরা মলনের উপর দিয়ে ঘড়ির কাটা ঘুরার  বিপরিত  দিকে ঘুরতো। মানে, বামদিকে ঘুরতো। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই বাম দিকে ঘুরি।

মলনে একজনে গরু পরিচালনা করে। এটাকে বলা হতো গরু ডাহানো। ডান হাতে পাজুন আর বাম কাহে (কাঁকে) বাচ্চা নিয়ে অনেকে গরু ডাহাইতো। মলনে হাটার সময় গরু চোনাইয়া দিত। গরুর প্রশ্রাবকে বলা হতো চোনা। প্রশ্রাব করাকে বলা হতো চোনানো। চোনা খেরের সাথে মিশে যেতো পাড়ায় পাড়ায়। চোনানোর পর গরু দাঁড়িয়ে একটু বাঁকা হতো পায়খানা করার জন্য। সাথে সাথে কিছু খের হাতে নিয়ে গরুর নেদা (লেদা/গোবর) ধরে ফেলা হতো। গোবর মেইল্লা মেরে (ছুড়ে মেরে) ফেলা হতো উচির মধ্যে। উচি বুনানো হতো বাঁশের বেতী দিয়ে। উচি ভরে গেলে মেয়েরা কাঁহে করে নিয়ে গিয়ে পালানের গোবরের ঠেংগিতে (স্তুপ) ফেলে দিতো। ফসল বুনার আগে খেত প্রস্তুত করার সময় জৈব সার হিসাবে কৃষক শুকনা গোবর খেতে ছড়িয়ে দিতো। পানাইন্না গরুর বাছুর বেঁধে রাখা হতো গোয়াইল ঘরে। ক্ষুধায় বাছুর মাকে ডাকতো “অম ব্যা” করে। মা গাই উত্তর দিতো “হাম্বা” করে। দেশী জাতের গাই ছিলো সেগুলি। সাইজে ছোট ছিল। ওলান ছিল ছোট। দুধ হতো মাত্র দুই পোয়া বা তিন পোয়া। খুব বেশী হলে এক সের। এক সের ছিল প্রায় এক লিটারের সমান। এক সেরের চার ভাগের এক ভাগ হলো এক পোয়া। এক সের দুধের দাম ছিল মাত্র এক টাকা।

গরুর ক্ষুরের পাড়ায় পাড়ার হিঞ্জা থেকে ধান আলাদা হয়ে নিচের দিকে চলে যেতো। আরেকজন আবার ধানের আটি খুলে মলনের উপর ছড়িয়ে দিতো। এইভাবে কয়েকঘন্টা মাড়ানোর পর মলন ভেংগে গরু বাঁধা হতো চাড়ির পাড়ে। চাড়িতে লবন, কুড়া ও পানি মিশিয়ে পেস্ট করা হতো। ক্ষুধার্ত ও পরিশ্রান্ত গরুগুলি তখন হামচিয়ে খেতো সেই কুড়া। খাওয়া শেষ হলে শুয়ে শুয়ে জাবর কাটতো ।

বাঁশের আগার কঞ্চিগুলি কেটে চেছে মশ্রিন করে আগায় একটি কঞ্চি রেখে দিয়ে সেই কঞ্চিকে গরম করে বেকিয়ে আংটা বানিয়ে তৈরি করা হতো কারাইল। কারাইল দিয়ে খের খুঁচিয়ে আলাদা করা হত। ধান গাছ থেকে ধান পড়ে গেলে যা থাকে তাকে বলা হয় খের (খর)। কারাইল দিয়ে রৌদ্রে নেড়ে খের শুকিয়ে বাইর বাড়িতে পালা দিয়ে রাখা হতো। যারাবেশী ধান আবাদ করতো তাদের খেরও বেশী হতো। তাই খেরের পালাও বড় হতো। মেয়ে বিয়ে দিবার সময় ছেলের বাপের খেরের পালার সাইজ দেখে ধনী কেমন তা আন্দাজ করা হতো। টিনের ঘরের সংখ্যা দিয়েও ধনী কেমন তা বুঝা যেতো।

শুকনা খেরের পালা থেকে পরিমাণ মত খের বের করে কাঁচি (কাস্তে) দিয়ে কেটে গরুর চাড়িতে দেয়া হতো। খের ছিল গরুর প্রধান খাবার। খের দিয়ে ঘরের চালও ছাওয়া হতো। তবে ছন দিয়ে ঘরের চাল ছাওয়া হলে বেশী মজবুত হতো। কিন্তু সবার খেতে ছন হতো না। ছন হতো ছন পাওরে।

খেরের পালার গোড়ায় খের দিয়ে ঢেকে লুকিয়ে আমরা পলান পলান (লুকুচুরি) খেলতাম। ঘরের পিছনে, বাওবেড়ার পিছনে, উগারতলে, চকিরতলে, দরজার চিপায়, ডোলের ভিতর, ফুলঘরি গাছের ঝোপে, গাছে উঠে অথবা খেরের পালায় লুকিয়ে আমরা “টুকু” শব্দ করতাম। বন্ধুরা খুঝে পেতো না। আর ডাকতো “টুকু টু”। মজা পেতাম সেই খেলায়। খুজে পাওয়ার পর কি আনন্দই না পেতাম আমরা!

এখনো ধান আবাদ হয়। কিন্তু সেই ধান আবাদ করতে পাওয়ার ট্রিলার ব্যবহার করা হয়। এখন আর কেউ হালের লাংগল দিয়ে হাল বায় না। হাল বাইতে বাইতে আর কারো দুপুর গড়িয়ে যায় না। কোন গ্রাম্য বউ তার স্বামীর জন্য এক বাটি পান্তাভাত ও এক বদনা পানি নিয়ে খেতের বাতরে (আইলে) নিয়ে যায় না। কোন বউ আর এখন পান্তা ভাত খাওয়ার সময় তার স্বামীর কপালের ঘাম আচল দিয়ে মুছে দেয় না। এখন খাটো খাটো হাইব্রিড ধান গাছ হয়। তাতে ধরে উচ্চ ফলনশীল বড় বড় সাইজের ধান। সেইগুলি আর কেউ কাঁধে করে নিয়ে আসে না। নিয়ে আসে ভ্যানে করে। মলন আর দেয়া হয় না। বাবার কোলে কোন শিশু মলনের পিছনে ঘুরে না। সবাই ধান মাড়ায় মাড়াই মেশিন দিয়ে। মলনের দিন শেষ।
২৮/৯/২০১৯ খ্রি.
ময়মনসিংহ

 

 

এক ফোটা ঔষধের পাওয়ার

এক ফোটা ঔষধের পাওয়ার
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৮৩ সনে যখন আমি এমবিবিএস তৃতীয় বর্ষে পড়তাম তখন আমার এক আত্বীয় গ্রামের এক চিকিৎসকের খোজ নিতে বলেন যে সেই চিকিৎসক নাকি বন্ধা রুগীদের ভালো চিকিৎসা করতে পারেন এবং অনেকেই তার চিকিৎসায় সন্তান লাভ করেছে। তিনি মূলত হাই স্কুলের বিএসসি টিচার। বিকেলে ও ছুটির দিনে বাড়িতে প্র‍্যাক্টিস করেন। তার ভিজিট কত, কি কি নিয়ম জেনে যেতে হবে। আমি সেই বাড়িতে গেলাম। দেখি তিনি তার বাড়ির বাংলা ঘরে বসে রুগীর ব্যবস্থাপত্র ও ঔষধ দিচ্ছেন। কয়েকজন রুগী তার চেম্বারের ভিতরেই বসে আছে। আমিও সবার মতো করে বসলাম। Continue reading “এক ফোটা ঔষধের পাওয়ার”

রুগীর প্রক্সি

রুগীর প্রক্সি
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ঘটনাটা অনেকদিন আগের। ১৩/১৪ বছর তো হবেই। আমাদের গ্রাম এলাকা থেকে ময়মনসিংহে একজন লোক এলেন আমার কাছে। আমি তাকে চিনতাম না। তিনি আমাকে চিনতেন। তার বয়স ২৫ কি ২৬ বছর হবে। তিনি বললেন “আমি সৌদিআরব যেতে চাই চাকরি করতে। মেডিকেল চেক আপ-এ যেন ধরা না খাই সেজন্য চেক আপ করতে যে সব পরীক্ষা করাতে হয় সেইগুলি পরীক্ষা করায়ে দেখতে চাই। পরীক্ষায় সমস্যা না থাকলে দালালকে টাকা দেব। ” আমি তার কয়েকটি রক্তের পরীক্ষা ও বুকের এক্সরে করাতে দিলাম। দুইঘন্টা পর সবগুলি রিপোর্ট নিয়ে আমার কাছে এলেন। রক্তের রিপোর্ট ভালো। বুকের এক্সরে রিপোর্টে লিখা “নন-স্পেসিফিক ইনফেকশন।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন Continue reading “রুগীর প্রক্সি”