আমার মিউজিয়াম

পেন ড্রাইভ
কলমের মতো মাথায় ক্লিপ ছিল বলে এর নাম ছিল পেন ড্রাইভ।দেখুন, আমার বুক পকেটে লাগিয়ে রেখেছি কলমের মতো করে। এখন যেগুলি পাওয়া যায় এগুলি পেন ড্রাইভ না। আমি খুব সম্ভব এটা ২০০১ সনে কিনেছিলাম এই পেন ড্রাইভটি। দেখে অনেকে বলতেন “তোমার কলম এত মোটা নাকি?”

ডিজিটাল ক্যামেরা।
আমার ব্যবহৃত প্রথম ডিজিটাল ক্যামেরা।
সহপাঠী বন্ধু দীপক জাপান থেকে এনে আমাকে উপহার দিয়েছিল। আনুমানিক ২০০১ সনে।

মোবাইল মিনি টেলিভিশন।
আমেরিকা থেকে গিফট হিসাবে পাঠিয়েছিল ডা. ফারুখ (এম ১৯)। আনুমানিক ২০০২ সনে।

পেন ক্যাম (ডিজিটাল পেন সাইজ ক্যামেরা)।
এটা আমি কিনেছিলাম ১৯৯৯ সনে খুব সম্ভব।
কলমের ক্লিপের মতো ক্লিপ আছে পকেটে রাখার জন্য। কেউ জানতো যে আমার কাছে ক্যামেরা আছে। বন্ধুরা জিজ্ঞেস করতো কলম এত বড় কেন। আমি বাটন টিপে ভিডিও করে রাখতাম। পরে বন্ধুদের ভিডিও দেখালে বিস্মিত হতো। এই রকম একটি ক্যামেরা দিয়ে বহুল আলোচিত তেহেল্কা ঘুষ কেলেনকারির গোপন ভিডিও রেকর্ড করা হয়েছিল। তখন মোবাইলে ক্যামেরা ছিল না।

পকেট রেডিও।
১৯৮৮ সনে বরিশালের বাকেরগঞ্জের চরামদ্দি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে থাকাকালীন এই রকম একটি রেডিও ব্যবহার করতাম। এটি সেইটিই কিনা বলতে পারছি না। বিদ্যুৎ ছিল না।

এমপি-৩ প্লেয়ার।
আমি ব্যবহার করতাম ২০০১ সনের দিকে।

রিচার্জেবল ব্যাটারি চার্জার।
আমি এটা ব্যবহার করতাম ২০০১ সনের দিকে।

কর্ডলেস ইন্টারকম।
প্রায় ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিনাতারে যোগাযোগ করতে পারতাম এটা দিয়ে। বেইজ এর সাথে টিএনটি টেলিফোন সংযোগ দিয়ে সারা ময়মনসিংহ শহর থেকে টেলিফোন ব্যবহার করতে পারতাম।
১৯৯৯ সনে কিনেছিলাম।

ইউএসবি পোর্টে পেন্সিল ব্যাটারি চার্জার। আমি এটা ব্যবহার করতাম ২০০১ সনের দিকে।

কম্পিউটার কার্ড রিডার।
২০০৫ সনে আমি এটা ব্যবহার করেছি।

কম্পিউটার মাইক্রোফোন।
এটা আমি ব্যবহার করতাম 2001 থেকে 2005 সাল পর্যন্ত।

আমার এম ফিল ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট । আমি ১৯৯৫ সনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথালজি পরীক্ষায় সেকেন্ড প্লেস করেছিলাম ।

আমার ৪ দাদার স্বাক্ষর । বড় দাদা কায়েম উদ্দিন তালুকদার, মেঝো দাদা মেছের উদ্দিন তালুকদার, আমার দাদা মোকছেদ আলি তালুকদার এবং ছোট দাদা জয়নাল আবেদীন তালুকদার । খুব সম্ভব ১০৫২ সনে করা দলিল ।

এম পি-৩ প্লেয়ার কন্ট্রোলার। আমার ব্যবহার করা।

কম্পিউটারে ব্যবহার করা আমার হেডসেট।২০০৫ সনের।

মডেম। আমার ব্যবহার করা। এখন বিল্ট ইন থাকে।

একজনের পনরশ স্ত্রী

একজনের পনরশ স্ত্রী
(স্মৃতিচারণমূলক গল্প)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৯৫ সনে পোস্টগ্রাজুয়েট ডিগ্রী নেয়ার পরের বছর গুলোতে আমি ঘন ঘন সাইন্টিফিক বিষয়ে ট্রেইনিং নিতাম। ২০০০ সনের ফেব্রুয়ারি মাসের ২৩ থেকে ২৯ তারিখ পর্যন্ত আমি ঢাকার মহাখালীতে বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলে বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ লেখার উপর একটা ট্রেনিং প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করি। এমন অনেক প্রোগ্রামেই আমি অংশগ্রহণ করেছি। ফলে আমার এপর্যন্ত ৮৭টি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এরমধ্যে ২৭টি পাবমেড ইন্ডেক্স আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। পাঁচটি মেডিকেল জার্নাল সম্পাদনা করার সৌভাগ্য হয়েছে। যাহোক, আমি যখন ঢাকায় ট্রেনিং নিতাম ময়মনসিংহ থেকেই যাতায়াত করতাম। ময়মনসিংহ -ঢাকা রোডে তখন সবচেয়ে ভালো বাস ছিল পদ্মা গেইটলক। এই বাসটি রাস্তায় কোথাও যাত্রী নিতো না। অর্থাৎ গেইট লক থাকতো। দেড় দুই ঘন্টায় ঢাকায় যাওয়া যেতো। সারারাস্তায় ক্যাসেটে বাংলা ও হিন্দি সিনেমার গান বাজাতো। আমি গাড়িতে উঠেই খবরের কাগজ কিনতাম। সংগে কম্পিউটার শিক্ষার বই নিয়ে যেতাম। বাসের সীটে বসে হয় খবরের কাগজ নাহয় বই পড়তাম। এখন বাসের সীটে বসে পড়িনা, মোবাইলে টাইপ করে গল্প লিখি। Continue reading “একজনের পনরশ স্ত্রী”

চাচার থাপ্পরে এক চোখ নষ্ট

চাচার থাপ্পরে এক চোখ নষ্ট
(রোগীর গল্প)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

একবার গ্রাম থেকে এক বাবা তার অবিবাহিত মেয়েকে নিয়ে এলো। তার মেয়ের সমস্যা হলো মেয়ের ছোট চাচা রাগ করে মেয়ের মুখের বাম চোখের উপর চর মারে। তারপর থেকে মেয়েটি বাম চোখে দেখতে পাচ্ছিল না। মেয়ের বাবা চাচাদের মধ্যে খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো। চাচায় ভাতিজিকে থাপ্পর মেরেছে এতে কেউ অসন্তুষ্ট নয়। এমন জোরে কেনো থাপ্পর মারলো যে মেয়ের চোখ নষ্ট হয়ে গেলো, এতে সবাই অসন্তুষ্ট ছোট চাচার উপর। মেয়ের বাবাও অসন্তুষ্ট ছোট ভাইয়ের উপর। বাবায় ছোট ভাই থেকেও মেয়েকে বেশী স্নেহ করে। পাড়ায় সবাই বলাবলি করছিলো চাচার কান্ড নিয়ে। বাবায় ভাবছিল এই মেয়েকে বিয়ে দিতে সমস্যা হবে। পাড়াপ্রতিবেশিরা বাবাকে বুদ্ধি দিতে লাগল ছোট ভাইয়ের নামে মামলা করে দেয়ার জন্য। যেহেতু চোখ নষ্ট হয়েছে সেহেতু ৩২৬ ধারায় মামলা হবে। ভালো লোকেরা বুদ্ধি দিলো চিকিৎসা করোনোর জন্য। চিকিৎসায় যে খরচ হবে সে খরচ চাচার কাছ থেকে তারা আদায় করে দিবে। মামলা পড়ে হোক। বাবায় আমাকে বললেন Continue reading “চাচার থাপ্পরে এক চোখ নষ্ট”

মলন দেয়া

মলন দেয়া
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ধান মাড়াই করাকে বলা হত মলন দেয়া। গ্রামে এখন আর মলন দিতে দেখি না। মলন দিতে ৫/৭টি গরুর প্রয়োজন হতো। এখন কেউ লাংগল দিয়ে হাল চাষ করে না। কেউ গরুর গাড়ি বায় না। তাই গরুর সংখ্যা কমে গেছে। দুইএকজন দুধ খাওয়ার জন্য গরু পালে। কেউ কেউ গরু পালে মোটাতাজা করার জন্য। কোরবানির আগ দিয়ে ভালো দামে বিক্রি করে। লাখ টাকা দাম পায় সেই গরুর। শহরের ছেলে মেয়েরা ষাঁড় ও বলদের পার্থক্য বুঝতে পারে না। গ্রামে বলদ কোরবানি দেয়া হয়েছে শুনে একজন কলেজ পড়ুয়া আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল কয়েকজন মেয়ের উপস্থিতিতে “ষাঁড় ও বলদের মধ্যে পার্থক্য কি?” আমি উত্তর এড়িয়ে অন্য প্রসংগে চলে যাই। তাতে তাদের মনে রহস্যের সৃষ্টি হয়। কিভাবে বুঝাব তা বলতে পারছিলাম না। আপনারাও যদি পার্থক্যটা না বুঝে থাকেন তা হলে বলছি “যে সব ষাঁড়ের অন্ডকোষ গোটকা ডেকে কেটে ফেলা হয় সেগুলি বড়সড় ও উচু হয়। তাদের প্রজনন ক্ষমতা থাকে না। তাদের বলা হয় বলদ।” বলদ দিয়ে বেশী কাজ করানো যায়।

যাহোক, মলনের কাজে সকল প্রকার গরু ব্যবহার করা হতো। পারতপক্ষে ষাঁড় ব্যবহার করা হতো না। ষাঁড় অন্য গরুর জন্য বিরক্তির কারন ছিল। মলনের জন্য ৫, ৬ বা ৭ টি গরু সারিবদ্ধভাবে গলায় রশি দিয়ে বাঁধা হতো। এই রশিকে বলা হতো দাউন। নির্দিষ্ট দুরত্বে দুরত্বে একটা করে পাগা থাকতো সেই দাউনে। পাগায় গরুর গলা আটকানো হতো। পাগার এক মাথায় বলের মত গুটি থাকতো আরেক মাথায় আংটার মত ছিদ্র থাকতো। গরুর গলার দুই পাশ দিয়ে উপরে তুলে গুটি আইংটার মধ্যে লাগিয়ে দেয়া হতো। গলার সাইজ ছোট হলে গরু মাথা বের করে ছুটে পালাতো। এটাকে বলা হতো মুরগলা দেয়া। অর্থাৎ মুরগলা দিয়ে গরু ছুটে যেতো। গরুর পায়ের নিচে যেহেতু ধানের হিঞ্জা (শিষ) থাকত সেহেতু গরু ধানের হিঞ্জা খেয়ে ফেলতো। তাই গরুর মুখে ঠোনা লাগিয়ে দেয়া হতো। ঠোনা বেত, বাঁশ, নও (বনলতা) অথবা দড়ি (রশি) দিয়ে বুনিয়ে বানানো হত। ঠোনা মুখে লাগালে গরু হা করে কিছু মুখে দিত পারতো না। কেউ কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলে আমরা বলতাম “মুখে ঠোনা লাগিয়ে বসে আছো কেন? কিছু বল।” মলন দেয়ার আগে পাকা ধান কেটে আটি বেঁধে বাঁশের বাইকে কাঁধে করে বাড়ি এনে উঠানের এক পাশে পালা (স্তুপ) দেয়া হতো। আমরা পালা বেয়ে উপরে উঠতাম। উপর থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়তাম। মলন দেয়ার সময় পালার উপর থেকে ধানের আটি মাটিতে ফেলা হতো। আটির বাঁন (বাঁধ) খুলে ঝাকি দিয়ে উঠানে ছড়িয়ে দেয়া হতো এলোমেলো করে। তারপর সব গরুগুলিকে দাউনে বাঁধা হতো। মলন উঠানে গোলাকৃতি চাকতির মতো দেখা যেতো। মলনের মাঝখানে রাখা হতো সবচেয়ে বৃদ্ধ গাইটিকে। গাভীকে বলা হতো গাই। যে গাইয়ের শক্তি সবচেয়ে কম হতো তাকে রাখা হতো কেন্দ্র বিন্দুতে। এটাকে বলা হত মেউয়া। মেউয়া এক পা স্থির রেখে অন্যান্য গরুর সাথে ঘুরতো। তাই তার বাম পায়ে খের পেঁচিয়ে পড়তো। এটাকে বলা হতো মেউয়া্র পেচ। মাঝে মাঝে মেউয়ার পেচ ছাড়িয়ে দিতে হতো। মেউয়ার ডানে থাকতো গাল মেউয়া। গাল মেউয়া দুর্বল বলদ অথবা অল্প বয়সের গরু থাকতো। এরপর যতই ডানদিকে যাওয়া হত ততই শক্তিশালী ও চঞ্চল স্বভাবের গরু জোড়া হতো। গরুকে মলনের সাথে সামিল করাকে বলা হতো জোড়া। গরু জোড়া শেষ হলে পাজুন হাতে নিয়ে গরুর লেজে ঝাকুনি দিয়ে হইট হইট করলে হরু হাটা শুরু করতো। পাজুন হলো বাঁশের তৈরি গরু পিটানোর চিকন লাঠি। এই পাজুন হাল বাওয়ার সময়ও ব্যবহার করা হতো। তাই এটাকে আইল্লা পাজুনও বলা হতো। কাপুরুষ চাষী এই আইল্লা পাজুন দিয়ে বউ পিটাত। অনেকে ভয় দেখানোর জন্য বলতো “তরে আইল্লা পাজুন দিয়া বাইরামু।” অর্থাৎ গরু পিটানোর লাঠি দিয়ে আঘাত করবে। গরুরা মলনের উপর দিয়ে ঘড়ির কাটা ঘুরার  বিপরিত  দিকে ঘুরতো। মানে, বামদিকে ঘুরতো। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই বাম দিকে ঘুরি।

মলনে একজনে গরু পরিচালনা করে। এটাকে বলা হতো গরু ডাহানো। ডান হাতে পাজুন আর বাম কাহে (কাঁকে) বাচ্চা নিয়ে অনেকে গরু ডাহাইতো। মলনে হাটার সময় গরু চোনাইয়া দিত। গরুর প্রশ্রাবকে বলা হতো চোনা। প্রশ্রাব করাকে বলা হতো চোনানো। চোনা খেরের সাথে মিশে যেতো পাড়ায় পাড়ায়। চোনানোর পর গরু দাঁড়িয়ে একটু বাঁকা হতো পায়খানা করার জন্য। সাথে সাথে কিছু খের হাতে নিয়ে গরুর নেদা (লেদা/গোবর) ধরে ফেলা হতো। গোবর মেইল্লা মেরে (ছুড়ে মেরে) ফেলা হতো উচির মধ্যে। উচি বুনানো হতো বাঁশের বেতী দিয়ে। উচি ভরে গেলে মেয়েরা কাঁহে করে নিয়ে গিয়ে পালানের গোবরের ঠেংগিতে (স্তুপ) ফেলে দিতো। ফসল বুনার আগে খেত প্রস্তুত করার সময় জৈব সার হিসাবে কৃষক শুকনা গোবর খেতে ছড়িয়ে দিতো। পানাইন্না গরুর বাছুর বেঁধে রাখা হতো গোয়াইল ঘরে। ক্ষুধায় বাছুর মাকে ডাকতো “অম ব্যা” করে। মা গাই উত্তর দিতো “হাম্বা” করে। দেশী জাতের গাই ছিলো সেগুলি। সাইজে ছোট ছিল। ওলান ছিল ছোট। দুধ হতো মাত্র দুই পোয়া বা তিন পোয়া। খুব বেশী হলে এক সের। এক সের ছিল প্রায় এক লিটারের সমান। এক সেরের চার ভাগের এক ভাগ হলো এক পোয়া। এক সের দুধের দাম ছিল মাত্র এক টাকা।

গরুর ক্ষুরের পাড়ায় পাড়ার হিঞ্জা থেকে ধান আলাদা হয়ে নিচের দিকে চলে যেতো। আরেকজন আবার ধানের আটি খুলে মলনের উপর ছড়িয়ে দিতো। এইভাবে কয়েকঘন্টা মাড়ানোর পর মলন ভেংগে গরু বাঁধা হতো চাড়ির পাড়ে। চাড়িতে লবন, কুড়া ও পানি মিশিয়ে পেস্ট করা হতো। ক্ষুধার্ত ও পরিশ্রান্ত গরুগুলি তখন হামচিয়ে খেতো সেই কুড়া। খাওয়া শেষ হলে শুয়ে শুয়ে জাবর কাটতো ।

বাঁশের আগার কঞ্চিগুলি কেটে চেছে মশ্রিন করে আগায় একটি কঞ্চি রেখে দিয়ে সেই কঞ্চিকে গরম করে বেকিয়ে আংটা বানিয়ে তৈরি করা হতো কারাইল। কারাইল দিয়ে খের খুঁচিয়ে আলাদা করা হত। ধান গাছ থেকে ধান পড়ে গেলে যা থাকে তাকে বলা হয় খের (খর)। কারাইল দিয়ে রৌদ্রে নেড়ে খের শুকিয়ে বাইর বাড়িতে পালা দিয়ে রাখা হতো। যারাবেশী ধান আবাদ করতো তাদের খেরও বেশী হতো। তাই খেরের পালাও বড় হতো। মেয়ে বিয়ে দিবার সময় ছেলের বাপের খেরের পালার সাইজ দেখে ধনী কেমন তা আন্দাজ করা হতো। টিনের ঘরের সংখ্যা দিয়েও ধনী কেমন তা বুঝা যেতো।

শুকনা খেরের পালা থেকে পরিমাণ মত খের বের করে কাঁচি (কাস্তে) দিয়ে কেটে গরুর চাড়িতে দেয়া হতো। খের ছিল গরুর প্রধান খাবার। খের দিয়ে ঘরের চালও ছাওয়া হতো। তবে ছন দিয়ে ঘরের চাল ছাওয়া হলে বেশী মজবুত হতো। কিন্তু সবার খেতে ছন হতো না। ছন হতো ছন পাওরে।

খেরের পালার গোড়ায় খের দিয়ে ঢেকে লুকিয়ে আমরা পলান পলান (লুকুচুরি) খেলতাম। ঘরের পিছনে, বাওবেড়ার পিছনে, উগারতলে, চকিরতলে, দরজার চিপায়, ডোলের ভিতর, ফুলঘরি গাছের ঝোপে, গাছে উঠে অথবা খেরের পালায় লুকিয়ে আমরা “টুকু” শব্দ করতাম। বন্ধুরা খুঝে পেতো না। আর ডাকতো “টুকু টু”। মজা পেতাম সেই খেলায়। খুজে পাওয়ার পর কি আনন্দই না পেতাম আমরা!

এখনো ধান আবাদ হয়। কিন্তু সেই ধান আবাদ করতে পাওয়ার ট্রিলার ব্যবহার করা হয়। এখন আর কেউ হালের লাংগল দিয়ে হাল বায় না। হাল বাইতে বাইতে আর কারো দুপুর গড়িয়ে যায় না। কোন গ্রাম্য বউ তার স্বামীর জন্য এক বাটি পান্তাভাত ও এক বদনা পানি নিয়ে খেতের বাতরে (আইলে) নিয়ে যায় না। কোন বউ আর এখন পান্তা ভাত খাওয়ার সময় তার স্বামীর কপালের ঘাম আচল দিয়ে মুছে দেয় না। এখন খাটো খাটো হাইব্রিড ধান গাছ হয়। তাতে ধরে উচ্চ ফলনশীল বড় বড় সাইজের ধান। সেইগুলি আর কেউ কাঁধে করে নিয়ে আসে না। নিয়ে আসে ভ্যানে করে। মলন আর দেয়া হয় না। বাবার কোলে কোন শিশু মলনের পিছনে ঘুরে না। সবাই ধান মাড়ায় মাড়াই মেশিন দিয়ে। মলনের দিন শেষ।
২৮/৯/২০১৯ খ্রি.
ময়মনসিংহ

 

 

এক ফোটা ঔষধের পাওয়ার

এক ফোটা ঔষধের পাওয়ার
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৮৩ সনে যখন আমি এমবিবিএস তৃতীয় বর্ষে পড়তাম তখন আমার এক আত্বীয় গ্রামের এক চিকিৎসকের খোজ নিতে বলেন যে সেই চিকিৎসক নাকি বন্ধা রুগীদের ভালো চিকিৎসা করতে পারেন এবং অনেকেই তার চিকিৎসায় সন্তান লাভ করেছে। তিনি মূলত হাই স্কুলের বিএসসি টিচার। বিকেলে ও ছুটির দিনে বাড়িতে প্র‍্যাক্টিস করেন। তার ভিজিট কত, কি কি নিয়ম জেনে যেতে হবে। আমি সেই বাড়িতে গেলাম। দেখি তিনি তার বাড়ির বাংলা ঘরে বসে রুগীর ব্যবস্থাপত্র ও ঔষধ দিচ্ছেন। কয়েকজন রুগী তার চেম্বারের ভিতরেই বসে আছে। আমিও সবার মতো করে বসলাম। Continue reading “এক ফোটা ঔষধের পাওয়ার”

রুগীর প্রক্সি

রুগীর প্রক্সি
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ঘটনাটা অনেকদিন আগের। ১৩/১৪ বছর তো হবেই। আমাদের গ্রাম এলাকা থেকে ময়মনসিংহে একজন লোক এলেন আমার কাছে। আমি তাকে চিনতাম না। তিনি আমাকে চিনতেন। তার বয়স ২৫ কি ২৬ বছর হবে। তিনি বললেন “আমি সৌদিআরব যেতে চাই চাকরি করতে। মেডিকেল চেক আপ-এ যেন ধরা না খাই সেজন্য চেক আপ করতে যে সব পরীক্ষা করাতে হয় সেইগুলি পরীক্ষা করায়ে দেখতে চাই। পরীক্ষায় সমস্যা না থাকলে দালালকে টাকা দেব। ” আমি তার কয়েকটি রক্তের পরীক্ষা ও বুকের এক্সরে করাতে দিলাম। দুইঘন্টা পর সবগুলি রিপোর্ট নিয়ে আমার কাছে এলেন। রক্তের রিপোর্ট ভালো। বুকের এক্সরে রিপোর্টে লিখা “নন-স্পেসিফিক ইনফেকশন।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন Continue reading “রুগীর প্রক্সি”

কোলকাতা ভ্রমণ

কোলকাতা ভ্রমণ
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

কোলকাতা ভ্রমণ করেছি ২ বার। প্রথমবার জানুয়ারি ২০০৬ সনে এবং দ্বিতীয়বার ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সনে। প্রথমবার যখন কলকাতা ভ্রমনের ইচ্ছা করেছিলাম তার আগে সরকারি ছুটি ও ভিসা পাওয়ার জন্য ইন্টার্নেটে ভারতের কোথাও প্যাথলজিস্টদের কোন আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আছে কিনা খোজ করছিলাম। একটা কনফারেন্স পছন্দ হলো। তারিখ জানুয়ারির ২৬-২৮, ২০০৬ সন। স্থান কলকাতা। কনফারেন্সের টাইটেল “INTERNATIONAL CME 2006” সংক্ষেপে “INTCME2006″। যৌথ ভাবে আয়োজন করা হচ্ছে ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন অব প্রেক্টিসিং প্যাথলজিস্ট এবং সোসাইটি অব Continue reading “কোলকাতা ভ্রমণ”

ভি আই পি রুগী

ভি আই পি রুগী
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

এমবিবিএস পাস করে কেবল ১৯৮৫ সনের নভেম্বর মাসে ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং শুরু করেছি। চাকরির নিয়ম কানুন কিছুই শেখা হয় নি। ফাউন্ডেশন ট্রেইনিং-এর সময় চাকুরি বিধি ভালো করে শেখানো হয়। এমবিবিএস পড়ার সময় পরীক্ষা পাসের জন্য যেটুকু জানা দরকার তা শিখেছিলাম। রুগী ম্যানেজমেন্ট-এর বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করার জন্য হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল এসিস্টেন্ট-এর সাথে ডিউটি করে ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং করা হতো। এখন ক্লিনিক্যাল এসিস্টেন্ট (সিএ)-কে এসিস্টেন্ট Continue reading “ভি আই পি রুগী”

দিল্লী -জয়পুর -আগ্রা ভ্রমণ

দিল্লী -জয়পুর -আগ্রা ভ্রমণ
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

রাজধানী এক্সপ্রেস ট্রেনে কলোকাতা থেকে দিল্লী পৌছলাম ৩১/১/২০০৯ তারিখে। দিল্লী পৌছে ট্রাভেল এজেন্ট-এর সাথে কন্ট্রাক্ট করলাম আমাদেরকে দিল্লী, জয়পুর ও আগ্রা ভ্রমণ ও থাকার ব্যবস্থা করতে। দুপুর ২ টার দিকে দিল্লী শহরের একটা চার তারকা হোটেলে নেয়া হলো একটা মাইক্রোবাসে করে। হাত মুখ ধুয়ে খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। বিকাল ৫ টার দিকে সঞ্জয় নামে একজন ২৫/২৬ বছরের যুবক এলেন ৮ সীটের একটা টাভেল কার নিয়ে। বললো “আমাকে আপনাদের জন্য সার্বক্ষণিক ট্রাভেল গাইড ও ড্রাইভার হিসাবে নিয়োগ করা হয়েছে। আমি আপনাদেরকে দিল্লী, জয়পুর ও আগ্রা দেখাব। যতদিন আছেন Continue reading “দিল্লী -জয়পুর -আগ্রা ভ্রমণ”

মাথা থেঁতলানো এক রুগী

মাথা থেঁতলানো এক রুগী
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৮৭ সনের দিকে আমি যখন টাংগাইলের নাহার নার্সিং হোমের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ছিলাম তখন একজন রুগীর গ্যাস্ট্রোজেজুনোস্টোমি অপারেশন হয়েছিল। প্রাইভেট ক্লিনিকে অপারেশন করালেও তার আর্থিক অবস্থা তত ভালো ছিল না। ক্রনিক ডিওডেনাল আলসার রুগীর চিকিৎসা না করালে আলসার শুকিয়ে এক সময় পাকস্থলীর শেষের অংশ অর্থাৎ পাইলোরিক পার্ট সরু হয়ে যায়। তখন বলা হয় পাইলোরিক স্টেনোসিস। এই অবস্থায় পাকস্থলীর খাবার সহজে ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রবেশ করতে পারে না। তাই বলা হয় গ্যাস্ট্রিক আউটলেট অবস্ট্রাকশন। রুগীর বমি হয়। পচা ঢেঁকুর উঠে। সার্জন অপারেশন করে পাকস্থালীর সাথে জেজুনামের (ক্ষুদ্রান্ত্রের অংশ) লাইন করে দেন। এটাকেই বলা হয় গ্যাস্ট্রোজেনোস্টোমি। সেই রুগীর আমরা এই অপারেশন করেছিলাম। সার্জন ছিলেন ডাঃ রেজাউল ইসলাম।বি এস এম এম ইউ-এর মাননীয় সাবেক ভিসি, বর্তমানে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডাঃ কামরুল হাসান খান তখন টাংগাইলে মেডিকেল অফিসার ছিলেন। তিনি এবং আমি সহকারী সার্জন হিসাবে ছিলাম এই অপারেশনে। রহস্যজনক ভাবে লক্ষ করেছি লোকটাকে দেখতে আসার মতো তেমন কেউ ছিল না। তাই আমি তার বিশেষ যত্ন নিতাম। লোকটা খুব নিরিহ প্রকৃতির ছিল। বয়স ৫৪/৫৫ বছর হবে। Continue reading “মাথা থেঁতলানো এক রুগী”