এক ফোটা ঔষধের পাওয়ার

এক ফোটা ঔষধের পাওয়ার
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৮৩ সনে যখন আমি এমবিবিএস তৃতীয় বর্ষে পড়তাম তখন আমার এক আত্বীয় গ্রামের এক চিকিৎসকের খোজ নিতে বলেন যে সেই চিকিৎসক নাকি বন্ধা রুগীদের ভালো চিকিৎসা করতে পারেন এবং অনেকেই তার চিকিৎসায় সন্তান লাভ করেছে। তিনি মূলত হাই স্কুলের বিএসসি টিচার। বিকেলে ও ছুটির দিনে বাড়িতে প্র‍্যাক্টিস করেন। তার ভিজিট কত, কি কি নিয়ম জেনে যেতে হবে। আমি সেই বাড়িতে গেলাম। দেখি তিনি তার বাড়ির বাংলা ঘরে বসে রুগীর ব্যবস্থাপত্র ও ঔষধ দিচ্ছেন। কয়েকজন রুগী তার চেম্বারের ভিতরেই বসে আছে। আমিও সবার মতো করে বসলাম। Continue reading “এক ফোটা ঔষধের পাওয়ার”

রুগীর প্রক্সি

রুগীর প্রক্সি
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ঘটনাটা অনেকদিন আগের। ১৩/১৪ বছর তো হবেই। আমাদের গ্রাম এলাকা থেকে ময়মনসিংহে একজন লোক এলেন আমার কাছে। আমি তাকে চিনতাম না। তিনি আমাকে চিনতেন। তার বয়স ২৫ কি ২৬ বছর হবে। তিনি বললেন “আমি সৌদিআরব যেতে চাই চাকরি করতে। মেডিকেল চেক আপ-এ যেন ধরা না খাই সেজন্য চেক আপ করতে যে সব পরীক্ষা করাতে হয় সেইগুলি পরীক্ষা করায়ে দেখতে চাই। পরীক্ষায় সমস্যা না থাকলে দালালকে টাকা দেব। ” আমি তার কয়েকটি রক্তের পরীক্ষা ও বুকের এক্সরে করাতে দিলাম। দুইঘন্টা পর সবগুলি রিপোর্ট নিয়ে আমার কাছে এলেন। রক্তের রিপোর্ট ভালো। বুকের এক্সরে রিপোর্টে লিখা “নন-স্পেসিফিক ইনফেকশন।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন Continue reading “রুগীর প্রক্সি”

কোলকাতা ভ্রমণ

কোলকাতা ভ্রমণ
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

কোলকাতা ভ্রমণ করেছি ২ বার। প্রথমবার জানুয়ারি ২০০৬ সনে এবং দ্বিতীয়বার ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সনে। প্রথমবার যখন কলকাতা ভ্রমনের ইচ্ছা করেছিলাম তার আগে সরকারি ছুটি ও ভিসা পাওয়ার জন্য ইন্টার্নেটে ভারতের কোথাও প্যাথলজিস্টদের কোন আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আছে কিনা খোজ করছিলাম। একটা কনফারেন্স পছন্দ হলো। তারিখ জানুয়ারির ২৬-২৮, ২০০৬ সন। স্থান কলকাতা। কনফারেন্সের টাইটেল “INTERNATIONAL CME 2006” সংক্ষেপে “INTCME2006″। যৌথ ভাবে আয়োজন করা হচ্ছে ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন অব প্রেক্টিসিং প্যাথলজিস্ট এবং সোসাইটি অব Continue reading “কোলকাতা ভ্রমণ”

ভি আই পি রুগী

ভি আই পি রুগী
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

এমবিবিএস পাস করে কেবল ১৯৮৫ সনের নভেম্বর মাসে ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং শুরু করেছি। চাকরির নিয়ম কানুন কিছুই শেখা হয় নি। ফাউন্ডেশন ট্রেইনিং-এর সময় চাকুরি বিধি ভালো করে শেখানো হয়। এমবিবিএস পড়ার সময় পরীক্ষা পাসের জন্য যেটুকু জানা দরকার তা শিখেছিলাম। রুগী ম্যানেজমেন্ট-এর বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করার জন্য হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল এসিস্টেন্ট-এর সাথে ডিউটি করে ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং করা হতো। এখন ক্লিনিক্যাল এসিস্টেন্ট (সিএ)-কে এসিস্টেন্ট Continue reading “ভি আই পি রুগী”

দিল্লী -জয়পুর -আগ্রা ভ্রমণ

দিল্লী -জয়পুর -আগ্রা ভ্রমণ
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

রাজধানী এক্সপ্রেস ট্রেনে কলোকাতা থেকে দিল্লী পৌছলাম ৩১/১/২০০৯ তারিখে। দিল্লী পৌছে ট্রাভেল এজেন্ট-এর সাথে কন্ট্রাক্ট করলাম আমাদেরকে দিল্লী, জয়পুর ও আগ্রা ভ্রমণ ও থাকার ব্যবস্থা করতে। দুপুর ২ টার দিকে দিল্লী শহরের একটা চার তারকা হোটেলে নেয়া হলো একটা মাইক্রোবাসে করে। হাত মুখ ধুয়ে খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। বিকাল ৫ টার দিকে সঞ্জয় নামে একজন ২৫/২৬ বছরের যুবক এলেন ৮ সীটের একটা টাভেল কার নিয়ে। বললো “আমাকে আপনাদের জন্য সার্বক্ষণিক ট্রাভেল গাইড ও ড্রাইভার হিসাবে নিয়োগ করা হয়েছে। আমি আপনাদেরকে দিল্লী, জয়পুর ও আগ্রা দেখাব। যতদিন আছেন Continue reading “দিল্লী -জয়পুর -আগ্রা ভ্রমণ”

মাথা থেঁতলানো এক রুগী

মাথা থেঁতলানো এক রুগী
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৮৭ সনের দিকে আমি যখন টাংগাইলের নাহার নার্সিং হোমের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ছিলাম তখন একজন রুগীর গ্যাস্ট্রোজেজুনোস্টোমি অপারেশন হয়েছিল। প্রাইভেট ক্লিনিকে অপারেশন করালেও তার আর্থিক অবস্থা তত ভালো ছিল না। ক্রনিক ডিওডেনাল আলসার রুগীর চিকিৎসা না করালে আলসার শুকিয়ে এক সময় পাকস্থলীর শেষের অংশ অর্থাৎ পাইলোরিক পার্ট সরু হয়ে যায়। তখন বলা হয় পাইলোরিক স্টেনোসিস। এই অবস্থায় পাকস্থলীর খাবার সহজে ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রবেশ করতে পারে না। তাই বলা হয় গ্যাস্ট্রিক আউটলেট অবস্ট্রাকশন। রুগীর বমি হয়। পচা ঢেঁকুর উঠে। সার্জন অপারেশন করে পাকস্থালীর সাথে জেজুনামের (ক্ষুদ্রান্ত্রের অংশ) লাইন করে দেন। এটাকেই বলা হয় গ্যাস্ট্রোজেনোস্টোমি। সেই রুগীর আমরা এই অপারেশন করেছিলাম। সার্জন ছিলেন ডাঃ রেজাউল ইসলাম।বি এস এম এম ইউ-এর মাননীয় সাবেক ভিসি, বর্তমানে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডাঃ কামরুল হাসান খান তখন টাংগাইলে মেডিকেল অফিসার ছিলেন। তিনি এবং আমি সহকারী সার্জন হিসাবে ছিলাম এই অপারেশনে। রহস্যজনক ভাবে লক্ষ করেছি লোকটাকে দেখতে আসার মতো তেমন কেউ ছিল না। তাই আমি তার বিশেষ যত্ন নিতাম। লোকটা খুব নিরিহ প্রকৃতির ছিল। বয়স ৫৪/৫৫ বছর হবে। Continue reading “মাথা থেঁতলানো এক রুগী”

মশা মারা

মশা মারা
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

প্রথম স্প্রে মেশিন আমি দেখেছি খুব সম্ভব ১৯৬৪ কি ১৯৬৫ সনের দিকে। খুব ছোট ছিলাম আমি। মেঝ দাদার কাছারি ঘরে অনেক লোক এলেন স্প্রে মেশিন নিয়ে। সবার পিঠে একটা করে স্প্রে মেশিন ছিল। অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডারের মত সিলিন্ডার পিঠে ছিল। ডান হাতে ছিল পাইপ লাগানো স্প্রে এবং বাম হাতে ছিল পাম্পের হাতল। পাম্প করে সিলিন্ডারের ভিতর প্রেসার বৃদ্ধি করা হতো। স্প্রে টিগারে চাপ দিলে ফোস ফোস করে তরল কিটনাশক ছড়িয়ে পড়তো। এই দলের একজন প্রধান ছিলেন, তার বাড়ি ছিল ইন্দ্রজানি। আমি তার নাম জানি না। আমার ভগ্নিপতি মাওলানা সালাউদ্দিনের আত্বিয় হবেন। তিনি স্বাস্থ্য বিভাগে সরকারি চাকরি করতেন। সারাদেশ থেকে ম্যালারিয়া পারাসাইট প্লাসমোডিয়াম বাহী এনোফিলিস মশা নিধনের জন্য সরকার প্রকল্প গ্রহন করেছিল। এক যোগে সারা দেশে মশার আবাসস্থলে কিটনাশক ডিডিটি পাউডার পানিতে গুলে স্প্রে করার প্রোগ্রাম করা হয়। একাজে সহায়তা করার জন্য স্বাস্থ্য সহকারীদের মাধ্যমে এলাকার যুবক শ্রেণীর লোক দিয়ে প্রতিটি ঘড়ের বেড়ার ভিতর ও বাহির এবং বাড়ির আশে পাশের আনাচে কানাচে ঝোপঝাড়ে ডিডিটি স্প্রে করা হয়। একসাথে ১২/১৩ জন যখন স্প্রে মেশিন নিয়ে বের হতেন তখন মনে হতো যে ইনারা যুদ্ধে বেরোচ্ছেন। আমার মনে আছে, এই বাহিনীতে জামাল ভাই, গাদু কাক্কু ও আবুল মামু ছিলেন। তারা সরকার থেকে টাকাও পেয়েছিলেন। এমন কাজ করে সরকার থেকে টাকা পেলে এখন আমরা আউট সোর্সিং বলি।
Continue reading “মশা মারা”

কোহিনূর

কোহিনূর
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

এই কোহিনূরকে আপনারা চিনবেন না। এই কোহিনূর একজন গরীবের মেয়ে। দেখতে ছিল রবি ঠাকুরের গানের কৃষ্ণকলির মতো। তার বাবার কাছে ছিল বৃটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত মোগল সম্রাজ্ঞীর ব্যবহার করা পৃথিবীর সবচেয়ে দামী হীরা কোহিনূরের মতো। ত্রিশ বছরেরও বেশী আগে আমার প্রথম পোস্টিং হয়েছিল বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়ন উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে মেডিকেল অফিসার হিসাবে। চিকিৎসা পেশার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা থাকায় দুঃসাহসিক ইচ্ছা নিয়ে আমি সেই গ্রামের জরাজীর্ণ টিনসেড হাসপাতালে গ্রামের মানুষের চিকিৎসা দিতে থাকি। পাশে একটা পরিত্যক্ত সরকারি বাসস্থান ছিল মেডিকেল অফিসারের জন্য। ইতিপূর্বে কোন এমবিবিএস ডাক্তার সেখানে পোস্টিং হয় নাই। আমিই প্রথম। ১০০ টাকা দামের চৌকি কিনে সেই বাসাতেই আমি থাকা শুরু করলাম। সাথে একটা রান্নাঘর ছিল। ওটার ভিতর কোহিনূরের বাবা ধানের ক্ষর রেখেছিলেন। আরেকটা বৈঠককখানা ছিল। ওটার ভিতর কোহিনূরের বাবা ধানের আটি রেখেছিলেন স্তুপ করে। বাড়ীর চারিদিকে পরিত্যক্ত সিমেন্টের খুটি ছিল টিনের বেড়ার। কিন্তু টিন ছিল না। একটা কামলা নিয়ে বাঁশ কিনে সেই খুটিতে বাঁশ বেঁধে বাঁশের উপর দিয়ে কলাপাতা ভাজ করে ঝুলিয়ে বেড়া তৈরি করালাম। বাড়ির পশ্চিমপাশ সংলগ্ন একটা বিরাট জমিদারি পুকুর ছিল। খুব স্বচ্ছ ছিল তার পানি। সেই পানিতে জ্যোৎস্নার আলো ঝলমল Continue reading “কোহিনূর”

সনাক্তকরণ চিহ্ন

সনাক্তকরণ চিহ্ন
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ছোট বেলা থেকেই আমি রেডিওর পোকা ছিলাম। খুব রেডিও শোনতাম। আমার বয়সী পোলাপানরা কেউ রেডিও শোনত না। কেউ কেউ শুনলেও পল্লীগীতি শুনতো। আমি পল্লীগীতি, নাটক, খবর ও খেয়াল শোনতাম। রেডিওতে খেয়াল শুরু হলে সবাই Continue reading “সনাক্তকরণ চিহ্ন”

ঘড়ি

ঘড়ি
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আগের দিনে কারো কারো কাছে ঘড়ি একটি বিলাসিতার বস্তু ছিল। আগেরদিন বলতে আমি বুঝাচ্ছি আমার শৈশবের দিনগুলি। তখন সবচেয়ে দামী যে লুঙ্গী ছিল সেইটার নাম ছিল টুইচ লুঙ্গী। সেই লুঙ্গীর দাম ছিল ৪ টাকা। এমন দামের লুঙ্গী পরলে মানুষ মনে করতেন ফেরাংগী করে। সেই যুগে একটি ঘড়ির দাম ছিল ১০০/২০০ টাকা। তার মানে এটা একটা দামী জিনিস ছিল। ঘড়ির কাজ ছিল সময় দেখানো। যারা স্কুলে যেতেন বা অফিসে Continue reading “ঘড়ি”