মলন দেয়া

মলন দেয়া
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ধান মাড়াই করাকে বলা হত মলন দেয়া। গ্রামে এখন আর মলন দিতে দেখি না। মলন দিতে ৫/৭টি গরুর প্রয়োজন হতো। এখন কেউ লাংগল দিয়ে হাল চাষ করে না। কেউ গরুর গাড়ি বায় না। তাই গরুর সংখ্যা কমে গেছে। দুইএকজন দুধ খাওয়ার জন্য গরু পালে। কেউ কেউ গরু পালে মোটাতাজা করার জন্য। কোরবানির আগ দিয়ে ভালো দামে বিক্রি করে। লাখ টাকা দাম পায় সেই গরুর। শহরের ছেলে মেয়েরা ষাঁড় ও বলদের পার্থক্য বুঝতে পারে না। গ্রামে বলদ কোরবানি দেয়া হয়েছে শুনে একজন কলেজ পড়ুয়া আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল কয়েকজন মেয়ের উপস্থিতিতে “ষাঁড় ও বলদের মধ্যে পার্থক্য কি?” আমি উত্তর এড়িয়ে অন্য প্রসংগে চলে যাই। তাতে তাদের মনে রহস্যের সৃষ্টি হয়। কিভাবে বুঝাব তা বলতে পারছিলাম না। আপনারাও যদি পার্থক্যটা না বুঝে থাকেন তা হলে বলছি “যে সব ষাঁড়ের অন্ডকোষ গোটকা ডেকে কেটে ফেলা হয় সেগুলি বড়সড় ও উচু হয়। তাদের প্রজনন ক্ষমতা থাকে না। তাদের বলা হয় বলদ।” বলদ দিয়ে বেশী কাজ করানো যায়।

যাহোক, মলনের কাজে সকল প্রকার গরু ব্যবহার করা হতো। পারতপক্ষে ষাঁড় ব্যবহার করা হতো না। ষাঁড় অন্য গরুর জন্য বিরক্তির কারন ছিল। মলনের জন্য ৫, ৬ বা ৭ টি গরু সারিবদ্ধভাবে গলায় রশি দিয়ে বাঁধা হতো। এই রশিকে বলা হতো দাউন। নির্দিষ্ট দুরত্বে দুরত্বে একটা করে পাগা থাকতো সেই দাউনে। পাগায় গরুর গলা আটকানো হতো। পাগার এক মাথায় বলের মত গুটি থাকতো আরেক মাথায় আংটার মত ছিদ্র থাকতো। গরুর গলার দুই পাশ দিয়ে উপরে তুলে গুটি আইংটার মধ্যে লাগিয়ে দেয়া হতো। গলার সাইজ ছোট হলে গরু মাথা বের করে ছুটে পালাতো। এটাকে বলা হতো মুরগলা দেয়া। অর্থাৎ মুরগলা দিয়ে গরু ছুটে যেতো। গরুর পায়ের নিচে যেহেতু ধানের হিঞ্জা (শিষ) থাকত সেহেতু গরু ধানের হিঞ্জা খেয়ে ফেলতো। তাই গরুর মুখে ঠোনা লাগিয়ে দেয়া হতো। ঠোনা বেত, বাঁশ, নও (বনলতা) অথবা দড়ি (রশি) দিয়ে বুনিয়ে বানানো হত। ঠোনা মুখে লাগালে গরু হা করে কিছু মুখে দিত পারতো না। কেউ কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলে আমরা বলতাম “মুখে ঠোনা লাগিয়ে বসে আছো কেন? কিছু বল।” মলন দেয়ার আগে পাকা ধান কেটে আটি বেঁধে বাঁশের বাইকে কাঁধে করে বাড়ি এনে উঠানের এক পাশে পালা (স্তুপ) দেয়া হতো। আমরা পালা বেয়ে উপরে উঠতাম। উপর থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়তাম। মলন দেয়ার সময় পালার উপর থেকে ধানের আটি মাটিতে ফেলা হতো। আটির বাঁন (বাঁধ) খুলে ঝাকি দিয়ে উঠানে ছড়িয়ে দেয়া হতো এলোমেলো করে। তারপর সব গরুগুলিকে দাউনে বাঁধা হতো। মলন উঠানে গোলাকৃতি চাকতির মতো দেখা যেতো। মলনের মাঝখানে রাখা হতো সবচেয়ে বৃদ্ধ গাইটিকে। গাভীকে বলা হতো গাই। যে গাইয়ের শক্তি সবচেয়ে কম হতো তাকে রাখা হতো কেন্দ্র বিন্দুতে। এটাকে বলা হত মেউয়া। মেউয়া এক পা স্থির রেখে অন্যান্য গরুর সাথে ঘুরতো। তাই তার বাম পায়ে খের পেঁচিয়ে পড়তো। এটাকে বলা হতো মেউয়া্র পেচ। মাঝে মাঝে মেউয়ার পেচ ছাড়িয়ে দিতে হতো। মেউয়ার ডানে থাকতো গাল মেউয়া। গাল মেউয়া দুর্বল বলদ অথবা অল্প বয়সের গরু থাকতো। এরপর যতই ডানদিকে যাওয়া হত ততই শক্তিশালী ও চঞ্চল স্বভাবের গরু জোড়া হতো। গরুকে মলনের সাথে সামিল করাকে বলা হতো জোড়া। গরু জোড়া শেষ হলে পাজুন হাতে নিয়ে গরুর লেজে ঝাকুনি দিয়ে হইট হইট করলে হরু হাটা শুরু করতো। পাজুন হলো বাঁশের তৈরি গরু পিটানোর চিকন লাঠি। এই পাজুন হাল বাওয়ার সময়ও ব্যবহার করা হতো। তাই এটাকে আইল্লা পাজুনও বলা হতো। কাপুরুষ চাষী এই আইল্লা পাজুন দিয়ে বউ পিটাত। অনেকে ভয় দেখানোর জন্য বলতো “তরে আইল্লা পাজুন দিয়া বাইরামু।” অর্থাৎ গরু পিটানোর লাঠি দিয়ে আঘাত করবে। গরুরা মলনের উপর দিয়ে ঘড়ির কাটা ঘুরার  বিপরিত  দিকে ঘুরতো। মানে, বামদিকে ঘুরতো। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই বাম দিকে ঘুরি।

মলনে একজনে গরু পরিচালনা করে। এটাকে বলা হতো গরু ডাহানো। ডান হাতে পাজুন আর বাম কাহে (কাঁকে) বাচ্চা নিয়ে অনেকে গরু ডাহাইতো। মলনে হাটার সময় গরু চোনাইয়া দিত। গরুর প্রশ্রাবকে বলা হতো চোনা। প্রশ্রাব করাকে বলা হতো চোনানো। চোনা খেরের সাথে মিশে যেতো পাড়ায় পাড়ায়। চোনানোর পর গরু দাঁড়িয়ে একটু বাঁকা হতো পায়খানা করার জন্য। সাথে সাথে কিছু খের হাতে নিয়ে গরুর নেদা (লেদা/গোবর) ধরে ফেলা হতো। গোবর মেইল্লা মেরে (ছুড়ে মেরে) ফেলা হতো উচির মধ্যে। উচি বুনানো হতো বাঁশের বেতী দিয়ে। উচি ভরে গেলে মেয়েরা কাঁহে করে নিয়ে গিয়ে পালানের গোবরের ঠেংগিতে (স্তুপ) ফেলে দিতো। ফসল বুনার আগে খেত প্রস্তুত করার সময় জৈব সার হিসাবে কৃষক শুকনা গোবর খেতে ছড়িয়ে দিতো। পানাইন্না গরুর বাছুর বেঁধে রাখা হতো গোয়াইল ঘরে। ক্ষুধায় বাছুর মাকে ডাকতো “অম ব্যা” করে। মা গাই উত্তর দিতো “হাম্বা” করে। দেশী জাতের গাই ছিলো সেগুলি। সাইজে ছোট ছিল। ওলান ছিল ছোট। দুধ হতো মাত্র দুই পোয়া বা তিন পোয়া। খুব বেশী হলে এক সের। এক সের ছিল প্রায় এক লিটারের সমান। এক সেরের চার ভাগের এক ভাগ হলো এক পোয়া। এক সের দুধের দাম ছিল মাত্র এক টাকা।

গরুর ক্ষুরের পাড়ায় পাড়ার হিঞ্জা থেকে ধান আলাদা হয়ে নিচের দিকে চলে যেতো। আরেকজন আবার ধানের আটি খুলে মলনের উপর ছড়িয়ে দিতো। এইভাবে কয়েকঘন্টা মাড়ানোর পর মলন ভেংগে গরু বাঁধা হতো চাড়ির পাড়ে। চাড়িতে লবন, কুড়া ও পানি মিশিয়ে পেস্ট করা হতো। ক্ষুধার্ত ও পরিশ্রান্ত গরুগুলি তখন হামচিয়ে খেতো সেই কুড়া। খাওয়া শেষ হলে শুয়ে শুয়ে জাবর কাটতো ।

বাঁশের আগার কঞ্চিগুলি কেটে চেছে মশ্রিন করে আগায় একটি কঞ্চি রেখে দিয়ে সেই কঞ্চিকে গরম করে বেকিয়ে আংটা বানিয়ে তৈরি করা হতো কারাইল। কারাইল দিয়ে খের খুঁচিয়ে আলাদা করা হত। ধান গাছ থেকে ধান পড়ে গেলে যা থাকে তাকে বলা হয় খের (খর)। কারাইল দিয়ে রৌদ্রে নেড়ে খের শুকিয়ে বাইর বাড়িতে পালা দিয়ে রাখা হতো। যারাবেশী ধান আবাদ করতো তাদের খেরও বেশী হতো। তাই খেরের পালাও বড় হতো। মেয়ে বিয়ে দিবার সময় ছেলের বাপের খেরের পালার সাইজ দেখে ধনী কেমন তা আন্দাজ করা হতো। টিনের ঘরের সংখ্যা দিয়েও ধনী কেমন তা বুঝা যেতো।

শুকনা খেরের পালা থেকে পরিমাণ মত খের বের করে কাঁচি (কাস্তে) দিয়ে কেটে গরুর চাড়িতে দেয়া হতো। খের ছিল গরুর প্রধান খাবার। খের দিয়ে ঘরের চালও ছাওয়া হতো। তবে ছন দিয়ে ঘরের চাল ছাওয়া হলে বেশী মজবুত হতো। কিন্তু সবার খেতে ছন হতো না। ছন হতো ছন পাওরে।

খেরের পালার গোড়ায় খের দিয়ে ঢেকে লুকিয়ে আমরা পলান পলান (লুকুচুরি) খেলতাম। ঘরের পিছনে, বাওবেড়ার পিছনে, উগারতলে, চকিরতলে, দরজার চিপায়, ডোলের ভিতর, ফুলঘরি গাছের ঝোপে, গাছে উঠে অথবা খেরের পালায় লুকিয়ে আমরা “টুকু” শব্দ করতাম। বন্ধুরা খুঝে পেতো না। আর ডাকতো “টুকু টু”। মজা পেতাম সেই খেলায়। খুজে পাওয়ার পর কি আনন্দই না পেতাম আমরা!

এখনো ধান আবাদ হয়। কিন্তু সেই ধান আবাদ করতে পাওয়ার ট্রিলার ব্যবহার করা হয়। এখন আর কেউ হালের লাংগল দিয়ে হাল বায় না। হাল বাইতে বাইতে আর কারো দুপুর গড়িয়ে যায় না। কোন গ্রাম্য বউ তার স্বামীর জন্য এক বাটি পান্তাভাত ও এক বদনা পানি নিয়ে খেতের বাতরে (আইলে) নিয়ে যায় না। কোন বউ আর এখন পান্তা ভাত খাওয়ার সময় তার স্বামীর কপালের ঘাম আচল দিয়ে মুছে দেয় না। এখন খাটো খাটো হাইব্রিড ধান গাছ হয়। তাতে ধরে উচ্চ ফলনশীল বড় বড় সাইজের ধান। সেইগুলি আর কেউ কাঁধে করে নিয়ে আসে না। নিয়ে আসে ভ্যানে করে। মলন আর দেয়া হয় না। বাবার কোলে কোন শিশু মলনের পিছনে ঘুরে না। সবাই ধান মাড়ায় মাড়াই মেশিন দিয়ে। মলনের দিন শেষ।
২৮/৯/২০১৯ খ্রি.
ময়মনসিংহ

 

 

এক ফোটা ঔষধের পাওয়ার

এক ফোটা ঔষধের পাওয়ার
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৮৩ সনে যখন আমি এমবিবিএস তৃতীয় বর্ষে পড়তাম তখন আমার এক আত্বীয় গ্রামের এক চিকিৎসকের খোজ নিতে বলেন যে সেই চিকিৎসক নাকি বন্ধা রুগীদের ভালো চিকিৎসা করতে পারেন এবং অনেকেই তার চিকিৎসায় সন্তান লাভ করেছে। তিনি মূলত হাই স্কুলের বিএসসি টিচার। বিকেলে ও ছুটির দিনে বাড়িতে প্র‍্যাক্টিস করেন। তার ভিজিট কত, কি কি নিয়ম জেনে যেতে হবে। আমি সেই বাড়িতে গেলাম। দেখি তিনি তার বাড়ির বাংলা ঘরে বসে রুগীর ব্যবস্থাপত্র ও ঔষধ দিচ্ছেন। কয়েকজন রুগী তার চেম্বারের ভিতরেই বসে আছে। আমিও সবার মতো করে বসলাম। Continue reading “এক ফোটা ঔষধের পাওয়ার”

রুগীর প্রক্সি

রুগীর প্রক্সি
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ঘটনাটা অনেকদিন আগের। ১৩/১৪ বছর তো হবেই। আমাদের গ্রাম এলাকা থেকে ময়মনসিংহে একজন লোক এলেন আমার কাছে। আমি তাকে চিনতাম না। তিনি আমাকে চিনতেন। তার বয়স ২৫ কি ২৬ বছর হবে। তিনি বললেন “আমি সৌদিআরব যেতে চাই চাকরি করতে। মেডিকেল চেক আপ-এ যেন ধরা না খাই সেজন্য চেক আপ করতে যে সব পরীক্ষা করাতে হয় সেইগুলি পরীক্ষা করায়ে দেখতে চাই। পরীক্ষায় সমস্যা না থাকলে দালালকে টাকা দেব। ” আমি তার কয়েকটি রক্তের পরীক্ষা ও বুকের এক্সরে করাতে দিলাম। দুইঘন্টা পর সবগুলি রিপোর্ট নিয়ে আমার কাছে এলেন। রক্তের রিপোর্ট ভালো। বুকের এক্সরে রিপোর্টে লিখা “নন-স্পেসিফিক ইনফেকশন।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন Continue reading “রুগীর প্রক্সি”

কোলকাতা ভ্রমণ

কোলকাতা ভ্রমণ
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

কোলকাতা ভ্রমণ করেছি ২ বার। প্রথমবার জানুয়ারি ২০০৬ সনে এবং দ্বিতীয়বার ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সনে। প্রথমবার যখন কলকাতা ভ্রমনের ইচ্ছা করেছিলাম তার আগে সরকারি ছুটি ও ভিসা পাওয়ার জন্য ইন্টার্নেটে ভারতের কোথাও প্যাথলজিস্টদের কোন আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আছে কিনা খোজ করছিলাম। একটা কনফারেন্স পছন্দ হলো। তারিখ জানুয়ারির ২৬-২৮, ২০০৬ সন। স্থান কলকাতা। কনফারেন্সের টাইটেল “INTERNATIONAL CME 2006” সংক্ষেপে “INTCME2006″। যৌথ ভাবে আয়োজন করা হচ্ছে ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন অব প্র্যাক্টিসিং প্যাথলজিস্ট এবং সোসাইটি অব সার্জিকেল প্যাথলজিস্ট অব নর্থ আমেরিকা। আমি এদের ওয়েবসাইট পড়ে বিস্তারিত জেনে নিলাম। জানতে পারলাম এমন সিএমই প্রতি বছরই হয় ভারতের একেক বছর একেক শহরে। প্রথম যাচ্ছি কাজেই কলকাতা হওয়াতে বেশী আগ্রহী হলাম। সাথী সংগি খুঁজলাম। আমি তখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলাম। সাবেক অধ্যক্ষ ও প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ডাঃ আমিনুল হক স্যার তখন ছিলেন আমার সিনিয়র সহকারী অধ্যাপক। আমি স্যারকে রাজি করালাম। শুরু হলো প্রস্তুতি। আমিনুল স্যার এবং আমি এই সম্মেলনে এটেন্ড করবো। রেজিস্ট্রেশন ফি যা ধার্য ছিল তা আমার জন্য একটু বেশী মনে হচ্ছিল। আমি সম্মেলন কর্তৃপক্ষকে ইমেইল করলাম ফি-টা বাংলাদেশি ডেলিগেটদের জন্য কিছু কমিয়ে দিতে। তারা ৫০% ডিসকাউন্ট করে ইমেইল করলেন। আমার আশংকা ছিল যদি সম্মেলনের আগে ছুটি ও ভিসা সংগ্রহ করতে না পারি তবে রেজিস্ট্রেশন ফি-টা বৃথা যাবে। আমি আবার ধন্যবাদ জানিয়ে লিখলাম যে আমাদের স্পট রেজিস্ট্রেশন করার সুযোগ দেয়া হোক। তারা তাতেও রাজি হলেন।  স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে আমরা ছুটি মঞ্জুর করালাম। কিন্তু ভিসা করাতে সমস্যা হলো। তারা আমাদের নামে নামে ভারত থেকে আমন্ত্রণপত্রের কপি দাবী করলেন। আমি ইমেইল করে আমন্ত্রণপত্র আনলাম। ভিসা পেলাম ২৫ তারিখে । ভিসা করতে গিয়ে গুলশানের মাহীমা টোরিজমের প্রতিনিধিদের সাথে তাদের অফিসে গিয়ে টোর পরিকল্পনা করে ফেললাম। বাসের আপ-ডাউন টিকিট করলাম ঢাকা-কোলকাতা-ঢাকা। ২৫ তারিখ রাত ১০ টায় শ্যামলি বাস ছাড়লো ঢাকা থেকে। বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারত প্রবেশ করলাম। কোলকাতা মার্কুইস্ট্রিটে পৌঁছলাম ২৬ তারিখ সকাল ১১ টার দিকে। ঐদিনই ছিল আমাদের সম্মেলনের প্রথম দিন। সকাল ৯ টায় শুরু হয়েছিল। আমরা তাড়াতাড়ি করে একটা হোটেলে উঠলাম। দ্রুত গোসল সেরে রেডি হয়ে রিক্সায় চলে গেলাম সম্মেলনস্থলে। গিয়ে দেখি লাঞ্চ খাওয়া চলছে। আমরা দ্রুত রেজিস্ট্রেশন স্থলে গেলাম রেজিস্ট্রেশন করতে। আমাদের ডিসকাউন্ট ডকোমেন্ট হিসাবে প্রিন্টকরা ইমেইলটি দেখালাম। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে এবং খাবার কুপন হাতে নিয়ে চলে গেলাম বুফের লাইনে। ইচ্ছে মতো প্লেটে খাবার নিয়ে সরে এলাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেতে। সবাই দাঁড়িয়ে খাচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখলাম আমাদের প্রফেসর সৈয়দ মোকাররম আলী স্যার দাঁড়িয়ে খাচ্ছেন। আমি কাছে গিয়ে পরিচয় দিলাম। তিনি আর কে কে এসেছেন জিজ্ঞেস করাতে আমি আমিনুল স্যারকে ডেকে স্যারের কাছে আনলাম। এর মধ্যে এসে গেলেন আমাদের প্রফেসর মনিমোহন দাদা। তিনি স্যারের সাথে কথা বললেন। জানা গেলো যে আমরা তিন ভাগে এসেছি, কিন্তু কেউ কারো খবর জানতাম না। মনিমোহন দা একটু দূরে সরে গেলে মোকাররম স্যার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন “ঐ ছেলেটি কে যেন?” আমি মনিমোহন দার বিস্তারিত পরিচয় দিয়ে বললাম “ওনার একটা প্যাথলজি বই আছে, ফোর্থ ইয়ারের ছাত্ররা খুব পড়ে ওটা। মনিমোহনের প্যাথলজি নামে পরিচিত। স্যার, আমি আপনার কাছে এম ফিল ফাইনাল ভাইভা পরীক্ষা দিয়েছি ১৯৯৫ সনে। আপনি এক্সারনাল এক্সামিনার ছিলেন।”

Continue reading “কোলকাতা ভ্রমণ”

ভিআইপি রোগী

ভিআইপি রোগী
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

এমবিবিএস পাস করে কেবল ১৯৮৫ সনের নভেম্বর মাসে ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং শুরু করেছি। চাকরির নিয়ম কানুন কিছুই শেখা হয় নি। ফাউন্ডেশন ট্রেইনিং-এর সময় চাকুরি বিধি ভালো করে শেখানো হয়। এমবিবিএস পড়ার সময় পরীক্ষা পাসের জন্য যেটুকু জানা দরকার তা শিখেছিলাম। রোগী ম্যানেজমেন্ট-এর বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করার জন্য হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল এসিস্টেন্ট-এর সাথে ডিউটি করে ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং করা হতো। এখন ক্লিনিক্যাল এসিস্টেন্ট (সিএ)-কে এসিস্টেন্ট রেজিস্ট্রার এবং ইন-সার্ভিস ট্রেইনিংকে ইন্টার্নি বলা হয়। আমি ডক্টরস ডিউটি রুমে বড় ভাইদের কথাবার্তা শুনছিলাম। তারা এক রোগীর খারাপ ব্যবহার নিয়ে সমালোচনা করছিলেন। আমি জানতাম ট্রেইনিং-এর সময়ই সব শিখে যেতে হবে। রেগুলার মেডিকেল অফিসার হিসাবে যখন কাজ করব তখন আর শেখার সুযোগ থাকবে না। আমি সিএ-কে জিজ্ঞেস করলাম Continue reading “ভিআইপি রোগী”

দিল্লী-জয়পুর-আগ্রা ভ্রমণ

দিল্লী-জয়পুর-আগ্রা ভ্রমণ
(স্মৃতিচারণ- অন্যরকম ভ্রমণ কাহিনী)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

রাজধানী এক্সপ্রেস ট্রেনে কোলকাতা থেকে দিল্লী পৌঁছলাম  ৩১/১/২০০৯ তারিখে। ট্রাভেল এজেন্ট-এর সাথে কন্ট্রাক্ট করলাম আমাদেরকে দিল্লী, জয়পুর ও আগ্রা ভ্রমণ ও থাকার ব্যবস্থা করতে। দুপুর ২ টার দিকে দিল্লী শহরের একটা চার তারকা হোটেলে নেয়া হলো একটা মাইক্রোবাসে করে। হাত মুখ ধুয়ে খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। বিকাল ৫ টার দিকে সঞ্জয় নামে একজন ২৫/২৬ বছরের যুবক এলেন ৮ সীটের একটা ট্রাভেল কার নিয়ে। বললো “আমাকে আপনাদের জন্য সার্বক্ষণিক ট্রাভেল গাইড ও ড্রাইভার হিসাবে নিয়োগ করা হয়েছে। আমি আপনাদেরকে দিল্লী, জয়পুর ও আগ্রা দেখাব। যতদিন আছেন আমি আপনাদের সাথেই আছি। দর্শনীয় স্থান যা যা আছে দেখাব। আপনাদের যদি স্পেশাল কিছু দেখার থাকে জানাবেন। আমি দেখিয়ে দেব।” যা যা দেখেছিলাম তার সবকিছু এই দশ বছর পর মনে নেই। দেখার ধারাবাহিকতায়ও কিছুটা ভুল হতে পারে। আমাদের সাথে ছিলেন প্রফেসর ডাঃ আমিনুল হক স্যার ও ভাবী, প্রফেসর ডাঃ রুহিনী কুমার দাস দাদা ও বন্ধু প্রফেসর ডাঃ এএফএম সালেহ (ইকবাল), আমি ও আমার স্ত্রী ফিরোজা আখতার স্বপ্না। বিকেল ও সন্ধায় শহরের বিভিন্ন রোড দিয়ে ঘুরাফেরা করলাম। নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মাজারেও নিয়ে গেলো সঞ্জয়। মাজারের গেটের লোকদের আচরন দেখে আমাদের ভালো লাগলো না। ভিতরে না গিয়েই ফিরে এলাম। ইন্ডিয়া গেট দেখলাম সন্ধায়। সকালে নাস্তা করে কিছু দর্শনীয় স্থান দেখলাম। এর মধ্যে হুমায়ুন টম্ব অনেকক্ষণ দেখলাম। মোগল সম্রাট হুমায়ুন ছিলেন সম্রাট বাবরের ছেলে এবং সম্রাট আকবরের পিতা। হুমায়ুন টম্ব-এ মোগল বংশধরদের অনেক সমাধি আছে। সময়ের অভাবে জামা মসজিদের ভিতর যেতে পারিনি। তবে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বাহির থেকে দেখেছিলাম। দিল্লী থেকে চলে গেলাম জয়পুর, পিংক সিটিতে। জয়পুর দুই রাত ছিলাম। জয়পুরের হোটেলটি খুব গর্জিয়াস ছিল। খুবই আরামদায়ক। কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে সন্ধার সময় বের হলাম। সঞ্জয়ই সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল কোথায় কোথায় যেতে হবে। সে একটা সিনেমা হলের নিকট নেমে আমিনুল স্যার ও ইকবালের সাথে কি যেন পরামর্শ করলো আমাকে এভয়েড করে। দেখলাম টিকিট এনে হাতে দিলো। আমি বললাম “২০০৫ সনে হজ্জ করার পর তো আমরা সিনেমা দেখি না। এটা কি করলেন?” আমিনুল স্যার মুসকি হেসে বললেন “দেখেন, ভালো লাগবে। জয়পুর এসে এই হলে সিনেমা না দেখে কেউ যায় না। এই হলের নাম রাজমন্দির । এটার মালিক অভিনেতা ধর্মেন্দ্র। খুব নামকরা সিনেমা হল। দেখলেই বুঝবেন।” স্ত্রী স্বপ্নার চোখের দিকে তাকালাম। দেখে মনে হলো সেও সিনেমা হলটার অভিজ্ঞতা নিতে চাচ্ছে। এদিকে সিনেমা শুরু হয়ে গেছে। দ্রুত প্রবেশ করলাম। অন্ধকারে সীট খুঁজে বের করে বসলাম। আসলেই দেখার মতো সিনেমা হল।  থ্রিডি সাউন্ড সিস্টেম। নিখুঁত ছবি। সিনেমার নাম ছিল “রব মে বানানে জুডি।” প্রধান চরিত্রে ছিলেন শাহ রূখ খান ও আনুসকা। সব মিলিয়ে ভালোই লেগেছিল। ভালোই অভিজ্ঞতা হলো। আমিনুল স্যারের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল বলে মনে হলো। হলে বসে সিনেমার দেখা এটাই শেষ । এরপর আর আমি হলে বসে সিনেমা দেখি নাই। Continue reading “দিল্লী-জয়পুর-আগ্রা ভ্রমণ”

মাথা থেঁতলানো এক রোগী

মাথা থেঁতলানো এক রুগী
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

মাথা থেঁতলানো এক রোগী
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৮৭ সনের দিকে আমি যখন টাঙ্গাইলের  নাহার নার্সিং হোমের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ছিলাম তখন একজন রোগীর গ্যাস্ট্রোজেজুনোস্টোমি অপারেশন হয়েছিল। প্রাইভেট ক্লিনিকে অপারেশন করালেও তার আর্থিক অবস্থা তত ভালো ছিল না। ক্রনিক ডিওডেনাল আলসার রোগীর চিকিৎসা না করালে আলসার শুকিয়ে এক সময় পাকস্থলীর শেষের অংশ অর্থাৎ পাইলোরিক পার্ট সরু হয়ে যায়। তখন বলা হয় পাইলোরিক স্টেনোসিস। এই অবস্থায় পাকস্থলীর খাবার সহজে ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রবেশ করতে পারে না। তাই বলা হয় গ্যাস্ট্রিক আউটলেট অবস্ট্রাকশন। রোগীর বমি হয়। পচা ঢেঁকুর উঠে। সার্জন অপারেশন করে পাকস্থালীর সাথে জেজুনামের (ক্ষুদ্রান্ত্রের অংশ) লাইন করে দেন। এটাকেই বলা হয় গ্যাস্ট্রোজেনোস্টোমি। সেই রোগীর আমরা এই অপারেশন করেছিলাম। সার্জন ছিলেন ডাঃ রেজাউল ইসলাম। বিএসএমএমইউ-এর মাননীয় সাবেক ভিসি, বর্তমানে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডাঃ কামরুল হাসান খান তখন টাঙ্গাইলে মেডিকেল অফিসার ছিলেন। তিনি এবং আমি সহকারী সার্জন হিসাবে ছিলাম এই অপারেশনে। রহস্যজনক ভাবে লক্ষ করেছি লোকটাকে পরিবার থেকে দেখতে আসার মতো তেমন কেউ ছিল না। তাই আমি তার বিশেষ যত্ন নিতাম। লোকটা খুব নিরিহ প্রকৃতির ছিল। বয়স ৫৪-৫৫ বছর হবে। Continue reading “মাথা থেঁতলানো এক রোগী”

মশা মারা

মশা মারা
(স্মৃতিচারণ)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

প্রথম স্প্রে মেশিন আমি দেখেছি খুব সম্ভব ১৯৬৪ কি ১৯৬৫ সনের দিকে। খুব ছোট ছিলাম আমি। মেঝ দাদার কাছারি ঘরে অনেক লোক এলেন স্প্রে মেশিন নিয়ে। সবার পিঠে একটা করে স্প্রে মেশিন ছিল। অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডারের মত সিলিন্ডার পিঠে ছিল। ডান হাতে ছিল পাইপ লাগানো স্প্রে এবং বাম হাতে ছিল পাম্পের হাতল। পাম্প করে সিলিন্ডারের ভিতর প্রেসার বৃদ্ধি করা হতো। স্প্রে ট্রিগারে চাপ দিলে ফোঁস ফোঁস করে তরল কিটনাশক ছড়িয়ে পড়তো। এই দলের একজন প্রধান ছিলেন, তার বাড়ি ছিল ইন্দ্রজানি। আমি তার নাম জানি না। আমার ভগ্নিপতি মাওলানা সালাউদ্দিন দুলাভাইয়ের আত্বীয় হবেন। তিনি স্বাস্থ্য বিভাগে সরকারি চাকরি করতেন। সারাদেশ থেকে ম্যালারিয়া পারাসাইট প্লাসমোডিয়াম বাহী এনোফিলিস মশা নিধনের জন্য সরকার প্রকল্প গ্রহন করে। এক যোগে সারা দেশে মশার আবাসস্থলে কিটনাশক ডিডিটি পাউডার পানিতে গুলে স্প্রে করার প্রোগ্রাম করা হয়। একাজে সহায়তা করার জন্য স্বাস্থ্য সহকারীদের মাধ্যমে এলাকার যুবক শ্রেণীর লোক দিয়ে প্রতিটি ঘড়ের বেড়ার ভিতর ও বাহির এবং বাড়ির আশে পাশের আনাচে কানাচে ঝোপঝাড়ে ডিডিটি স্প্রে করা হয়। একসাথে ১২/১৩ জন যখন স্প্রে মেশিন নিয়ে বের হতেন তখন মনে হতো যে ইনারা যুদ্ধে বেরোচ্ছেন। আমার মনে আছে, এই বাহিনীতে জামাল ভাই, গাদু কাক্কু ও আবুল মামু ছিলেন। তারা সরকার থেকে টাকাও পেয়েছিলেন। এমন কাজ করে সরকার থেকে টাকা পেলে এখন আমরা আউট সোর্সিং বলি।

Continue reading “মশা মারা”

বরিশালের কোহিনূর

বরিশালের কোহিনূর
(স্মৃতিচারণ)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বরিশালের এই কোহিনূরকে আপনারা চিনবেন না। এই কোহিনূর একজন গরীবের মেয়ে। দেখতে ছিল রবি ঠাকুরের গানের কৃষ্ণকলির মতো। তার বাবার কাছে ছিল বৃটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত মোগল সম্রাজ্ঞীর ব্যবহার করা পৃথিবীর সবচেয়ে দামী হীরা কোহিনূরের মতো। ত্রিশ বছরেরও বেশী আগে আমার প্রথম পোস্টিং হয়েছিল বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়ন উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে মেডিকেল অফিসার হিসাবে। চিকিৎসা পেশার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা থাকায় দুঃসাহসিক ইচ্ছা নিয়ে আমি সেই গ্রামের জরাজীর্ণ টিনসেড হাসপাতালে গ্রামের মানুষের চিকিৎসা দিতে থাকি। পাশে একটা পরিত্যক্ত সরকারি বাসস্থান ছিল মেডিকেল অফিসারের জন্য। ইতিপূর্বে কোন এমবিবিএস ডাক্তার সেখানে পোস্টিং হয় নি। আমিই প্রথম। ১০০ টাকা দামের চৌকি কিনে সেই বাসাতেই আমি থাকা শুরু করলাম। সাথে একটা রান্নাঘর ছিল। ওটার ভিতর কোহিনূরের বাবা ধানের ক্ষর রেখেছিলেন। আরেকটা বৈঠককখানা ছিল। ওটার ভিতর কোহিনূরের বাবা ধানের আটি রেখেছিলেন স্তুপ করে। বাড়ীর চারিদিকে পরিত্যক্ত সিমেন্টের খুটি ছিল টিনের বেড়ার। কিন্তু টিন ছিল না। একটা কামলা নিয়ে বাঁশ কিনে সেই খুটিতে বাঁশ বেঁধে বাঁশের উপর দিয়ে কলাপাতা ভাজ করে ঝুলিয়ে বেড়া তৈরি করালাম। বাড়ির পশ্চিমপাশ সংলগ্ন একটা বিরাট জমিদারি পুকুর ছিল। খুব স্বচ্ছ ছিল তার পানি। সেই পানিতে জ্যোৎস্নার আলো ঝলমল করতো। রান্নাঘর ও থাকার ঘরের গলি বরাবর পুকুরপাড়ে একটা শানবাঁধানো ঘাট ছিল। এইগুলি চরামদ্দির জমিদারদের ছিল। তারাই প্রজাদের জন্য বৃটিশ আমলে ডিসপেনসারি করেছিল। সেইটাই এখন হয়েছে সরকারি উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্র। এই বাড়ি বাংলাদেশের এক সময়ের প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আহসানুল্লাহ সাহেবের শশুরবাড়ি ছিল। সেখানে অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা আছে। পুকুরের টলটলে পানিতে শানবাঁধানো ঘাটে আমি খালি গায়ে লুঙ্গী পরে গোসল করতাম। বয়স ছিল আমার ২৭ কি ২৮। দেখতে খুব সুদর্শন ছিলাম। খালি গা দেখে পুকুরের অপর দিকের মানুষ আমার দিকে চেয়ে থাকতো। তাই, শানবাঁধানো ঘাটে বাঁশ গেড়ে কলাপাতা ভাঁজ করে বেড়া দেওয়ালাম। ফার্মাসিস্ট এর সাথে পরামর্শ করে বৈঠকখানা খালি করার সিদ্ধান্ত নিলাম। কোহিনূরের বাবাকে ডেকে বললাম “আমি সরকারি মেডিকেল অফিসার। এখানে অবস্থান করে আমি চাকরি করব। বিকেলে একটু প্রাইভেট প্রেক্টিশ করব। আপনি ধানের আটি গুলি সরিয়ে ফেলুন। এখানে চেম্বার বানাবো। রান্নাঘর থেকে ক্ষর সরিয়ে ফেলুন। এখানে রান্না করার ব্যবস্থা করব।” শুনে কোহিনূরের বাবা আমার দিকে ফেল ফেল করে তাকিয়ে রইলেন। তার গায়ে জামা ছিল না। বুকের হার সবগুলি বের করা ছিল। পেট চিমটা লাগা ছিল। নাভীর নিচে লুঙ্গী পরা ছিল। লুঙ্গীর দুই পাশ খাটো করার জন্য দুই পাশে গুজে দেয়া ছিল। উপরের পাটির দাত উঁচু ছিল। দাঁত বের করার জন্য হাসতে হয় নি। অসহায় ভাবে দাঁড়িয়েছিল আমার সামনে। যেন এক জমিদারের সামনে প্রজা দাঁড়িয়ে আছে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর কোহিনূরের বাবা বললেন
– সায়েব, আমি খুব গরীব মানুষ। জমি জমা কিচ্ছু নাই। অন্যের জমি চাষ করে কয়েকটা ধানের আটি পাইছি। এইগুলি রাখার জাওয়গাও নাই আমার। সংসারে বুড়া মা, বউ, আর দুগগা মাইয়া। আমি বাজার থাইক্কা ধান কিন্না আনি। সিদ্ধ কইরা শুকাইয়া ঢেকিতে পাড় দিয়া চাইল বানায় কোহিনূরের মায়। বেইচা যা অয় তাই দিয়া কোন মতে চালাইয়া নেই। আপ্নে যা কইছেন বুইজ্জি। Continue reading “বরিশালের কোহিনূর”

সনাক্তকরণ চিহ্ন

সনাক্তকরণ চিহ্ন
(স্মৃতিচারণ)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ছোট বেলা থেকেই আমি রেডিওর পোকা ছিলাম। খুব রেডিও শোনতাম। আমার বয়সী পোলাপানরা কেউ রেডিও শোনত না। কেউ কেউ শুনলেও পল্লীগীতি শুনতো। আমি পল্লীগীতি, নাটক, খবর ও খেয়াল শোনতাম। রেডিওতে খেয়াল শুরু হলে সবাই বন্ধ করে দিতো। আমি বন্ধ না করে শোনতাম মনোযোগ দিয়ে। দাদী বলতেন “এই, বন্ধ কর। তুই খেয়ালের কি বুঝস? খালি ভ্যা ভ্যা করে!” আমি বললতাম “খেয়াল বোঝার দরকার নাই। ভালো লাগে, তাই শুনি।” পাখির গান আমরা বুঝি না। কিন্তু পাখির গান ভালো লাগে। তাই শুনি। খেয়াল বুঝি না। কিন্তু খেয়ালের সুর ভালো লাগে। কোন খেয়ালটি কোন সুরে গাওয়া হচ্ছে ছোট বেলা থেকেই আমি বুঝতে পারতাম। কারন, রেডিওতে ঘোষণা হতো “এখন শুনবেন খেয়াল। রাগ ভৈরবী। বা এখন শুনবেন খেয়াল। রাগ মালকোশ।” ভৈরবী ও মালকোশ রাগ আমার ভালো লাগে এখনো। খবরের পর মাঝে মাঝে এমন ঘোষনা দিতো “নিখোঁজ সংবাদ। মিন্টু নামে ৬ বছরের একটি ছেলে ঢাকার গুলিস্তান এলাকা থেকে হারিয়ে গেছে। তার গায়ের রং শ্যামলা, হেংলা পাতলা গড়ন। সে বাংলায় কথা বলে। তার নিচের ঠোটে কাটা দাগ আছে।” নিচের ঠোটের কাটা দাগটিই হল সনাক্তকরণ চিহ্ন। ইংরেজীতে বলা হয় আডেন্টিফিকেশন মার্ক। আগে আইডি কার্ড তেমন ছিল না। কাজেই সনাক্তকরণ চিহ্নের খুব গুরুত্ব ছিল। কোন কিছুতে যেন ভুয়া কোন লোক ঢুকতে না পারে সে জন্য শরীরের সনাক্তকরণ চিহ্ন ভালো ভাবে লিখা হতো, দেখা হতো। শরীরের এমন একটা চিহ্নকে সনাক্তকরণ চিহ্ন হিসাবে গণ্য করতে হবে যেটা সারাজীবন শরীরে বিদ্যমান থাকবে এবং সহজে বের করা যায়। জন্মগত কালো তিল বা তিলক এবং কাটা দাগ হলো সনাক্তকরণ চিহ্নের জন্য উপযোগী। মুখমণ্ডলে এমন চিহ্ন হলে ভালো হয়। না থাকলে অন্য কোথাও হলেও চলবে। তবে সহজে যেন বের করা যায়। অনেকে না বুঝে লিখে থাকে নানা রকম চিহ্ন। যেমন, পিঠের মাঝখানে একটি তিল আছে অথবা ঊরূর সামনে একটা সাদা দাগ আছে, ইত্যাদি। এই চিহ্ন বের করতে সনাক্তকারীর জন্য মুস্কিল, যাকে চেক করা হয় তার জন্যও মুস্কিল। Continue reading “সনাক্তকরণ চিহ্ন”