বাংলাদেশে বিরাজমান বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি

বাংলাদেশে বিরাজমান বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি
(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বাংলাদেশের সাধারণ রুগীরা যেসব চিকিৎসা পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে তার কয়েকটির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরছি।

আয়ুর্বেদ চিকিৎসা:
আয়ুর্বেদ হলো ভারতবর্ষের প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্রের এক অঙ্গ। প্রায় ৫,০০০ বছর পূর্বে ভারতবর্ষেরই মাটিতে এই চিকিৎসা পদ্ধতির উৎপত্তি হয়। এটি এমনই এক চিকিৎসা পদ্ধতি যাতে রোগ নিরাময়ের চেয়ে স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার প্রতি বেশী জোর দেওয়া হয়। আয়ুর্বেদ চিকিত্‍সা বলতে ভেষজ বা উদ্ভিদের মাধ্যমে যে চিকিত্‍সা দেয়া হয়। বেদশাস্ত্রের একটি ভাগ – অথর্ববেদ এর যে অংশে চিকিৎসা বিদ্যা বর্ণিত আছে তা-ই আয়ুর্বেদ। আদি যুগে গাছপালার মাধ্যমেই মানুষের রোগের চিকিৎসা করা হতো। এই চিকিত্‍সা বর্তমানে ‘হারবাল চিকিত্‍সা’ তথা ‘অলটারনেটিভ মেডিসিন ’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। এটা ঔষধের বিকল্প ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মুক্ত হিসেবে বিশ্বে এখন ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে এই চিকিত্‍সা বেশী প্রচলিত। এই বিদ্যার উপর সনদপ্রাপ্ত চিকিৎসককে কবিরাজ বলা হয়। যেমন – কবিরাজ যোগেশ চন্দ্র ঘোষ।

ইউনানী চিকিৎসা:
ইউনানী শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ইউনান থেকে, যা হিপোক্রিটিস-এর জন্মস্থানের নাম।
ইউনানী হলো এক ধরনের ঐতিহ্যগত (traditional) চিকিৎসা পদ্ধতি, যা গ্রিক, মুসলমান এবং স্পেনীয়দের (আরব-স্প্যানিশ) মধ্যে বেশি বিকাশ লাভ করে। এটা গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস এবং রোমান চিকিৎসক গ্যালেন-এর শিক্ষার উপর ভিত্তি করে তৈরি এবং আরব ও ফার্সি চিকিৎসক যেমন, আল রাযী, ইবনে সিনা এবং ইবনে আন নাফীস দ্বারা একটি সম্প্রসারিত এবং বিকশিত চিকিৎসা ব্যবস্থা ।

বাংলাদেশের ট্রেডিশনাল মেডিসিনের মুসলিম চিকিৎসকগণ সাধারণত ইউনানি পদ্ধতিতে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। ঔষধের ফার্মেসীতে ইউনানি ঔষধালয় লিখা থাকে। এই বিদ্যার সনদপ্রাপ্ত চিকিৎসককে হাকিম বলা হয়। যেমন, হাকিম হাফিজুর রহমান।

আগেরদিনের ইসলাম শিক্ষার ধর্মীয় বই পুস্তকের শেষের দিকে ইউনানি চিকিৎসার সাধারণ ঔষধের নাম লিখা থাকতো। সস্তা ও পার্শপ্রতিক্রিয়া কম বলে অথবা নাই বলে গরীব ও ধার্মিক রুগীরা অনেকেই ইউনানি দাওয়াখানায় যায় চিকিৎসা নিতে।

হোমিওপ্যাথি:

হোমিওপ্যাথি হলো জার্মান চিকিৎসক স্যামুয়েল হ্যানিম্যান উদ্ভাবিত (১৭৯৬) এক চিকিৎসা পদ্ধতি। হোমিও কথাটার অর্থ হলো একই রকম। আর প্যাথি কথাটার অর্থ হলো রোগ। এই চিকিৎসা পদ্ধতির মূলনীতি হচ্ছে- কোনো একজন সুস্থ ব্যাক্তির শরীরে যে ওষুধ প্রয়োগ করলে তার মধ্যে যে লক্ষণ দেখা দেয়, ঐ একই ওষুধ সেই লক্ষনের ন্যায় অসুখে আক্রান্ত ব্যক্তির উপরে প্রয়োগ করলে তা অসুস্থ ব্যক্তির জন্য অসুখের লক্ষণ নিরাময়ের কাজ করে। অর্থাৎ কোন একটি ঔষধ সুস্থ একজন লোক সেবন করলে যদি তার শরীরে জ্বর হয় তবে জ্বরের রুগীকে ঐ ঔষধ সেবন করালে তার জ্বর কমে যাবে। হ্যানিম্যানের প্রস্তাবিত এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থা।

সাধারণত হোমিওপ্যাথিক ওষুধ তৈরী করার জন্য একটি নির্দিষ্ট দ্রব্যকে ক্রমাগত লঘূকরণ করা হয় অ্যালকোহল অথবা পতিত জলে (ডিস্টিল্ড ওয়াটার) দ্রবীভূত করে। হোমিও চিকিৎসকদের বিশ্বাস, এই লঘূকরণ এতবার করা হয়ে থাকে যে শেষ পর্যন্ত এই মিশ্রণে প্রাথমিক দ্রব্যের অণু পরমাণুও অবশিষ্ট থাকে না, ঔষধটি শক্তিতে রুপান্তরিত হয়ে কার্যকরী হয়।

মোটামুটি সস্তা পদ্ধতির কারনে বেশ কিছু রুগী হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকদের চিকিৎসা গ্রহণ করে থাকে।

আধুনিক এলোপ্যাথি চিকিৎসা:

চিকিৎসা বিজ্ঞান বা চিকিৎসা শাস্ত্র হল রোগ উপশমের বিজ্ঞান কলা বা শৈলী। মানব শরীর এবং মানব স্বাস্থ্য ভালো রাখার উদ্দেশ্যে রোগ নিরাময় ও রোগ প্রতিষেধক বিষয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানে অধ্যয়ন করা হয় এবং প্রয়োজন অনুসারে বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

সমসাময়িক চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্বাস্থ্য বিজ্ঞান অধ্যয়ন, গৱেষণা, এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিবিদ্যার ব্যবহার করে লব্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে ঔষধ বা শল্য চিকিৎসার দ্বারা রোগ নিরাময় করার চেষ্টা করা হয়। ঔষধ বা শল্য চিকিৎসা ছাড়াও মনোচিকিৎসা, কৃত্রিম অঙ্গসংস্থাপন, আণবিক রশ্মির প্রয়োগ, বিভিন্ন বাহ্যিক উপায় (যেমন, স্প্লিণ্ট এবং ট্রাকশন),জৈবিক সামগ্রি (রক্ত, অণু জীব ইত্যাদি), শক্তি্র অন্যান্য উৎস (বিদ্যুৎ, চুম্বক, অতি-শব্দ) ইত্যাদিরও প্রয়োগ করা হয়।

চিকিৎসাবিদ্যা অনেকগুলো শাখায় বিভক্ত। এগুলোকে তিনভাগে ভাগ করা যায়। প্রাথমিক বা বেসিক, প্যারাক্লিনিক্যাল এবং ক্লিনিক্যাল। বেসিক শাখাগুলোর মধ্যে রয়েছে এনাটমী বা অঙ্গংস্থানতত্ত্ব, ফিজিওলজি বা শারীরতত্ত্ব, বায়োকেমিস্ট্রি বা প্রাণরসায়ন ইত্যাদি। প্যারাক্লিনিক্যাল শাখার মধ্যে অণুজীববিদ্যা, রোগতত্ত্ব বা প্যাথোলজি, ভেষজতত্ত্ব বা ফার্মাকোলজি অন্যতম। ক্লিনিক্যাল হলো প্রায়োগিক চিকিৎসাবিদ্যা। এর প্রধান দুটি শাখা হলো, মেডিসিন এবং শল্যচিকিৎসা বা সার্জারি। আরও আছে ধাত্রী ও স্ত্রীরোগবিদ্যা, শিশুরোগবিদ্যা বা পেডিয়াট্রিক্স, মনোরোগবিদ্যা বা সাইকিয়াট্রি, ইমেজিং ও রেডিওলোজি ইত্যাদি। এগুলোর সবগুলোরই আবার বহু বিশেষায়িত্ব শাখা রয়েছে। এই পদ্ধতির চিকিৎসায় গবেষণালব্ধ ঔষধ ফার্মাসিটিক্যাল ল্যাবরেটরিতে কাঁচামাল থেকে উৎপাদিত হয়। মানুষের শরীরে প্রয়োগের পূর্বে প্রাণীর শরীরে প্রয়োগ করে নিরাপদ কিনা তা জেনে নেয়া হয়। এই পদ্ধতির ঔষধকে হোমিওপ্যাথির জনক হ্যানিম্যান এলোপ্যাথি আখ্যা দেন। এলো মানে বিপরীত। অর্থাৎ এই পদ্ধতির ঔষধে উপসর্গের বিপরীত কাজ করে। যেমন, রোগে জ্বর হয়, প্যারাসিটামল সেবন করলে জ্বর কমে। তাই, এটা এলোপ্যাথি।

বাংলাদেশে চিকিৎসাবিজ্ঞান শিক্ষার মূল ক্ষেত্র মেডিকেল কলেজ। প্রতিবছর সরকারি ও বেসরকারি অনেকগুলো মেডিকেল কলেজে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রি ভর্তি হয়ে থাকেন। পাঁচবছর মেয়াদি পড়াশোনা শেষে স্নাতক হিসেবে এম বি বি এস ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর একবছর শিক্ষানবিশ হিসেবে প্রশিক্ষণ নিতে হয়। শিক্ষানবিশি শেষে ‘বাংলাদেশ মেডিকেল এণ্ড ডেন্টাল কাউন্সিল’এর রেজিস্টার্ড ডাক্তার হিসেবে চর্চা করতে পারেন। আধুনিক চিকিৎসা বিদ্যায় এম বি বি এস সনদপ্রাপ্ত চিকিৎসকগণ ডাক্তার হিসাবে পরিচিত হন।

অনুমোদনহীন চিকিৎসা:
বাংলাদেশের গ্রামে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বেশ কিছু ভিত্তিহীন চিকিৎসা পদ্ধতিতে অজ্ঞ লোকগণ চিকিৎসা দেন এবং চিকিৎসা নেন। এটা বাংলাদেশের চিকিৎসা সেকটরে এক বিরাট সমস্যা। এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে অনেকেই অযথা টাকা ও সময় দুইটিই অপচয় করে। শেষে তারা আধুনিক ব্যয়বহুল চিকিৎসা নেয়ার আর সুযোগ পায় না। অজ্ঞতা ও অপশিক্ষার সুযোগ নিয়ে অর্থলিপ্সুরা তাদেরকে ঠকিয়ে থাকে। ঝাড়ফুঁক, পানি পড়া, তেল পড়া, প্রলেপ, মালিশ, ক্ষত চিকিৎসা, সাপে কাটার বিষ নামানো, বাত খসানো, দাঁতের পোকা খসানো, জিনের আসর করা, ঝাড়ুপেটা করা, জন্ডিসের মালা পরা, কপালে জন্ডিসের সেক দিয়ে পুড়ে দেয়া, হাড়ে গুল দেয়া, শিংগা লাগানো, পায়ড়া (পারদ) খাওয়া, ভরম ধরা, বর্মাদুষ্ট ভার করা ইত্যাদি অপচিকিৎসার উদাহরণ।

বাংলাদেশে সরকারি ভাবে অনুমোদিত মুল চিকিৎসা পদ্ধতিগুলি হলো হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদী, ইউনানি ও এলোপ্যাথি। এইসব পদ্ধতিতে চিকিৎসাদানকারী চিকিৎসকগণকে যথাক্রমে ডাক্তার, কবিরাজ, হাকিম ও ডাক্তার বলা হয়। চিকিৎসা পদ্ধতি ও চিকিৎসকদের ধরন জানা থাকলে সুচিকিৎসা পাওয়া সহজ হবে।


তারিখ : ২১/৩/২০১৯ ইং
স্থান: ময়মনসিংহ- কিশোরগঞ্জ – ময়মনসিংহ জার্নি

বাংলাদেশের এলোপ্যাথি চিকিৎসক ও চিকিৎসার ধরন

বাংলাদেশের এলোপ্যাথি চিকিৎসক ও চিকিৎসার ধরন
(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বাংলাদেশে এলোপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতির ডাক্তার বা চিকিৎসক হবার নূনতম ডিগ্রী হলো এমবিবিএস অথবা বিডিএস পাস Continue reading “বাংলাদেশের এলোপ্যাথি চিকিৎসক ও চিকিৎসার ধরন”

ফিজিওলজি ও প্যাথলজি

ফিজিওলজি ও প্যাথলজি
(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমাদের জানতে ও অজানতে শরীরের ভিতরে ও বাইরে অনেক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। শরীরের প্রয়োজনেই এই সব Continue reading “ফিজিওলজি ও প্যাথলজি”

অখাদ্য জিনিস খাওয়ার বদ অভ্যাস

অখাদ্য জিনিস খাওয়ার বদ অভ্যাস
(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

কিছু কিছু মেয়ে আছে তারা ঘন ঘন ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে চুল আচড়ায়। চুল ছিড়ে ছিড়ে চিরুনির সাথে পেঁচিয়ে যায়। Continue reading “অখাদ্য জিনিস খাওয়ার বদ অভ্যাস”

gastrointestinal_bleeding

পরিপাকতন্ত্রের রক্তক্ষরণ
(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

পরিপাকতন্ত্র থেকে রক্তক্ষরণ খুবই চিন্তার বিষয়। যেহেতু, পেটের ভিতরে রক্তক্ষরণ হয় তাই রুগী অনেকসময় বুঝতে পারে না। রক্তক্ষরণের কারনে রক্তশুন্যতা অথবা Continue reading “gastrointestinal_bleeding”

paralysis

প্যারালাইসিস
(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

প্যারালাইসিস স্নায়ুরোগের লক্ষণ। মাথার খুলির ভিতর থাকে ব্রেইন বা মস্তিষ্ক বা Continue reading “paralysis”

gastrointestinal_bleeding

পরিপাকতন্ত্রের রক্তক্ষরণ
(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

পরিপাকতন্ত্র থেকে রক্তক্ষরণ খুবই চিন্তার বিষয়। যেহেতু, পেটের ভিতরে রক্তক্ষরণ হয় তাই রুগী অনেকসময় বুঝতে পারে না। রক্তক্ষরণের কারনে রক্তশুন্যতা অথবা Continue reading “gastrointestinal_bleeding”

Jaundice

জন্ডিস
(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

জন্ডিস কিন্তু কোনো রোগের নাম না। অর্থাৎ জন্ডিস নামে কোন রোগ নাই। জন্ডিস হলো কয়েকটি রোগের লক্ষণ। Continue reading “Jaundice”

মানুষ ফোলে কেন?

 

মানুষ ফোলে কেন?
(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

সাভাবিকের চেয়ে বেশী পরিমাণ পানি শরীরে জমলে মানুষ ফুলে যায়। ডাক্তারগণ বলেন ইডেমা হয়েছে। ইডেমা Continue reading “মানুষ ফোলে কেন?”