Category Archives: Writings

machhere

Machhere

মাছেরে

(টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক মাতৃভাষায় লেখা স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

গ্রামে আমরা কেউ ঘাস কাটতে গেলে তারে কইতাম ঘাসেরে গেছে। আর কেউ মাছ ধরতে গেলে কইতাম মাছেরে গেছে। চেংরাকালে আমি মাছেরে গেতাম। আংগ বাড়ি সখিপুরের পাহার অঞ্চলে। উনা মাসে পাহারে পানি থাকত না। তাই মাছও পাও যাইত না। ভর অঞ্চলে হারা বোছরই পানি থাকত। মাছও মারন গেত হারা বোছর। উনা মাসে পাহাইরারা য়াটে তিগা মাছ কিন্যা আইন্যা খাইত। ১৫/২০ মাইল দূরে তনে মাঝিরা মাছ কান্দে কইরা নিয়া আইত পাহারে য়াটের দিন অইলে। এতদুর আনতে আনতে মাছ কুইয়া বকবকা অইয়া গোন্দ উইঠা যাইত। হেইন্যা ফালাই দিয়ন নাগত। তাই উনা মাসে জিওল মাছ, মাগুর মাছ, কই মাছ, ছাইতান মাছ, টেংরা, বাতাসি, গুইটা বাজাইল ছাড়া আর কিছু পাও গেত না। পাহাইরা মাইনষে জিওল মাছ, মাগুর মাছ, কই মাছ, ছাইতান মাছ বুরকা- পাইল্যায় পানি দিয়া জিয়াইয়া য়াকত। কয়দিন ভইরা য়াইন্দা খাইত। পঁচা মাছ গুলাইনের পাতা দিয়া য়াইন্দা খাইলে গোন্দ করতো না। ইন্যা খাইয়া পেট ভাটভুট করলে গোন্দবাদাইলের পাতা দিয়া হাক য়াইন্দা খাইত। বাইস্যা মাসে পাহারের ধাইরা দিয়া য়াট বইত। হেনু ভৌরারা নানান জাতের মাছ নিয়াইত বেচপার নিগা। বেশিরভাগই ছিল নোরাফেকা মাছ। পদ্মা নদীর ইলসা মাছও এই সব য়াটে নিয়াইত নাইয়ারা।

আমি যেবা কইরা মাছ মারতাম হেইন্যা হুইন্যা আন্নের মোনয়ব আমি বোধকরি বালা ছাত্র আছিলাম না। আমি খুব বালা ছাত্র আছিলাম। হেসুমকার দিনে বাটাজোর বি এম হাই স্কুল অত্র অঞ্চলের মদ্যে সব তিগা বালা স্কুল আছাল। হেই স্কুল তিগা এস এস সি পাস করছি য়েকর্ড ভাইঙ্গা, মানে আগে যারা পাস করছাল তাগ চাইতে বেশি নম্বর পাইছিলাম, জামাল স্যার কইছেন। এহন পর্যায়ের নিহি কেউ আমার নাগালা বালা এজাল্ট করপায় নাই।

আমি স্কুল তিগা আইয়া চাইরডা খাইয়া মাছেরে গেতাম। পুশ মাস তিগা জৈস্টি মাস পর্যন্ত পাহারে পানি থাকত না। তাই মাছেরে যামু কুনু? পাহারে পানি আইলে পানির নগে মাছ আইত। মাছ আইলে মাছেরে গেতাম। জৈস্টি মাসের হেষের দিকে যেদিন বেশি বিস্টি অইত হেদিন চালার বেবাক পানি ঘোনা ঘুনিতে নাইমা বাইদ ভইরা গেত। বাইদের পানিতে জোরা ভইরা গেত। জোরা অইল বাইদের মইদ দিয়া চিকন খালের নাগালা। জোরার পানি গিয়া নামত চাপরাবিলে। চাপরা বিল পানি দিয়া ভইরা গেত। চাপরা বিল উনা মাসেও হুকাইত না। হেনুকার মাছ বেশি পানি পাইয়া উজাইতে উজাইতে আংগ বাইদে আইয়া পড়ত আন্ডা পারনের নিগা। চলাচলা পুটি, হেলাম পুটি, টেংরা, গোলসা, নোন্দা, হৈল, বোয়াল, পাত্যা, ছাইতান, আগ্যা, ইচা, নোন্দা, বাইং, এবা নানান জাতের মাছ পেট ভর্তি আন্ডা নই আইত পাহাইরা হোতের মইদ্যে আন্ডা পারনের নিগা। আমরা বিস্টিত ভিজা, ছাতি মাথায় দিয়া, কলাপাতা পাথায় দিয়া, নয় মাতইল মাথায় দিয়া মাছেরে গেতাম। ক্ষেতের বাতর যেনু পানি যাওনের নিগা কাইটা দিত হেডা কইত জোর। আমরা জোরের হোতের পানিতে জালি পাইত্যা খারই থাকতাম। পানির নিচে জালির নগে ঠ্যাং ঠেহাই য়াকতাম। জালিতে মাছ ঢুইকা যেসুম ঠ্যাংগের মদ্যে গুতা মারত হেসুম জালি উচা করতাম। জালি তিগা মাছ ধইরা খালুইর মদে য়াকতাম। খালুই ভইরা যাইত মাছে। হেই মাছের পেট বোজাই আন্ডা থাকত। হেই জোরের মইদ্যে য়াইতে ঠুই পাইত্যা য়াকতাম। সক্কালে বেলা ওঠনের সোম গিয়া ঠুই চাইতাম। ঠুইয়ের আগায় হেই মাছগুনা বাইজা থাকত। ক্ষেতের বাতরে ঠুই উল্টাইয়া মাছ বাইর করতাম। খালুই ভইরা যাইত। মাছের নগে চেকমেকা, কাকরা, কুইচ্যা, টেপা, হামুক, ইন্যাও বাজত। ইন্যা বাইচ্যা পানিত ঢেইল মাইরা ফালাই দিতাম। জৈস্টি মাসে জাংলাভর্তি জিংগা, পোড়ল অইত। বাড়ির পালানে ডাংগা অইত নশনশা। মা হেইন্যা দিয়া মাছ য়ান্না করতেন। ঢলের মাছ নতুন তরিতরকারি দিয়া এবা মজাই যে নাগ ত গো, খাইয়া পেট ডিগ ডিগ করত।

আষাঢ়, শাওন, ভাদ্দর মাসে খালি বিস্টি অইত। বাইদ বোজাই পানি থাকত। পাহারের পাগার, পুস্কুনি, কুয়া, জোরা পানিতে ভইরা থাকত। এইসুম মাছগুনা বাইদে ছড়াই ছিটাই থাকত। আর মাছের পোনা গুনা বড় অইতে থাকত। হেসুম খালি ঠুই পাইত্যা মাছ ধরতাম। ভাদ্দর মাসের হেষের দিকে যখন বিস্টি কইমা যাইত হেসুম বাইদের জমিতে আমন ধানের গোছা নাগাইত। আর আগে এই জমিগুনাতে ছিল আউশ ধান। বেশি ভাগই ছিল ভাতুরি ধান। ভাতুরি ধান কাটার পর ক্ষেতে য়াল বাইয়া কেঁদা বানাইহালত। ধানের গোছা দেওনের আগে মই দিয়া ক্ষেত হোমান করন নাগত। কেঁদা ক্ষেতে মই দেওনের সূম চংগের পাছের পানি হইরা গিয়া মাছ বাইরইয়া দাফ্রাইতে থাকত। এইন্যা ধইরা ধইরা আমরা খালই বোজাই করতাম। কোমরের পিছনে খালই ঝুলাইয়া বাইন্ধা নিতাম। দুই য়াত দিয়া ধরতাম, আর খালই মইদ্যে য়াকতাম। কই মাছ গুনা কেঁদার উপর কাতাইতে থাকত। কি মজাই যে নাগত! আমি, মজি ভাই, জিন্না ভাই, সিদ্দি ভাই, এবা অনেকেই দল ধইরা হেইন্যা ধরতাম। মজি ভাই মইরা গেছে গাড়ি এক্সিডেন্ট কইরা। পাহাইরা বাইদের মাটি খুব সারিল মাটি। কয়দিনেই ধানের গোছা মোটা য়ই গেত। ক্ষেতে হেসুম টলটলা পানি থাকত। হেই পানি দিয়া নানান জাতের মাছ দৌড়াদৌড়ি করত। দেহা গেত। আমরা ক্ষেতের বাতর কাইটা জোর বানাইয়া হেনু বাইনাতি পাইত্যা য়াকতাম। বাইনাতি বাঁশের বেতি দিয়া বুনাইয়া বানান নাগত। বাইনাতির সামন দিয়া ভাটার মাছ ঢোকার পথ আছে, আবার পিছন দিক দিয়া উজাইন্যা মাছ ঢোকার পথ আছে। মাছ ঢোকপার পায়, বাইরবার পায় না। দিনাপত্তি সকালে বাইনাতি চাওয়া য়ইত। বাইনাতি পাতার সুম মুখ কাঠের, নইলে বাঁশের কচি দিয়া বন্ধ কইরা দেও য়ইত। হেইডা খুইলা মাছ খালইর মদ্যে ঢাইল্যা দেও য়ইত। বেশি ভাগ বাইনাতিত গুত্তুম আর দারকিনা মাছ বাজত। ইন্যা পিয়াজ কাঁচা, মইচ, হৌষার তেল দিয়া ভাজা ভাজা কইরা খাইলে কিবা মজাই যে নাগত গ! যেনুকার বাতর মোটা আছাল, হেনুকার বাতর ভাঙ্গাও বড় বড় আছাল। হেনু বাইনাতি না পাইত্যা বড় বড় দোয়ারি পাতন নাগত। দোয়ারি বাইনাতির নাগালা দুইমুরা চোক্কা না। দোয়ারি অইল বাসকর মোত। ইন্যাও বাঁশের হলা দিয়া বুনাইয়া বানায়।

আশ্বিন মাসে বেশি বিস্টি অইত না। ধানের গোছাগুনাও মোটা মোটা অইত। হেইন্যার ভিতর দিয়া মাছ কপ কপ করত। য়ইদের তাপে ক্ষেতের পানি ততা অই গেত। মাছগুনা যেম্মুরা গাছের ছেওয়া পড়ত হেম্মুরা আই পড়ত। আমরা স্কুল তিগা আইয়া বশ্যি নিয়া মাছেরে গেতাম। বশ্যির আধার গাত্তাম খই, কুত্তাডেউয়ার আন্ডা, নয় চেরা দিয়া। চেরাগুনারে জির কিরমিরমির নাগালা দেহা গেত। উন্যারে গাছতলের ভিজা মাটি তিগা কোদাল দিয়া কোবাইয়া বাইর কইরা ছেনি দিয়া টুকরা টুকরা কইরা কাইট্যা নিতাম। বড় বড় পিপড়াগুনারে আমরা ডেউয়া কইতাম। কুত্তার মোত অইলদা য়োংগের ডেউয়ারে কইতাম কুত্তাডেউয়া। গজারি গাছের আগায় পাতা পেঁচাইয়া কুত্তাডেউয়ায় বাহা বানাইয়া আন্ডা পারত। হেই আন্ডা দিয়া বশ্যি হালাইলে বেশি মাছ ধরত। তরুই বাঁশ দিয়া বশ্যির ছিপ বানাইতাম। না পাইলে বৌরাবাঁশের কুইঞ্চা দিয়া ছিপ বানাইতাম। খালই বুনাইতাম তল্যা বাসের বেতি দিয়া। গোছা ক্ষেতে বশ্যি ফালাইলে বড় বড় আগ্যা মাছ ধরত। পানির মদ্যে বশ্যি নাচাইলে আগ্যা মাছ ফালাই ফালাই আইয়া বশ্যির আইংটায় বাইজা পড়ত। খোট্টা দিয়া টানে তুইল্যা হালাইতাম। কোন কোনডা ছুইট্টা গিয়া আড়া জোংগলে গিয়া পইরা হাটি পারতে থাকত। পাতা খুচখুচানির শব্দ হুইন্যা আগ্যা মাছের ঘারে ধইরা খালইর মইধ্যে ভইরা ফালাইতাম। মাছ যাতে তাজাতুজা থাহে হেইজন্য জগের মইদ্যে নয় বদনার মইদ্যে পানি দিয়া জিয়াই য়াকতাম। আগ্যা মাছ জাইরা আছে৷ বদনায় য়াকলে আগ্যা মাছ হাটি মাইরা বাইরই গেত দেইখা হিসার জগে য়াকতাম। শিক্ষিত মাইন্সে আগ্যা মাছরে রাগা মাছ কইত ফ্যারাংগি দেহাইয়া। ভৌরা মাইনষে আগ্যা মাছ খাইত না। তারা গুত্তুম মাছও খাইত না। বংশি-মান্দাইরা চুইচ্চা খাইত। তারা কাছিমও খাইত। কাছিম জোংগলেও থাকত। ইন্যা খুব বড় বড় ছিল। ইন্যারে কইত দুরা।

বাইদের পানির টান পরলে মাছগুনা পাগার, জোরায় গিয়া জরা অইত। আমরা হেইন্যারে খুইয়া, জালি, জাহি জাল, নয় ছিপজাল দিয়া মাইরা খাইতাম। বিষগোটা ছেইচ্ছা পাগারে ছিটাই দিলে মাছ গাবাই উঠতো। গাবাইন্যা মাছ ধইরা আরাম পায়ন গেত। পাগারের মাছ, জোরার মাছ ইন্যা পালা মাছ আছাল না। তাই যে কেউ ইন্যা মারতে পারত। আমরা চন্দের জোরা, আলম ঠাকুরের জোরা, ওহা বেপারির জোরা, খাজাগ জোরা, নাটুগ পাগার, কলুমুদ্দি তাওইগ পাগার তিগা ভরা মাছ মারছি। ঘাট চওনার জোরায় তনে ভরা ইচা মাছ মারছি খুইয়া দিয়া দোয়াইয়া। এনুকার পানি কইমা গেলে কেঁদার নিচে বাইং মাছ বই থাকত। কেঁদা পারাইলে পায়ের নিচে পিচলা নাগত বাইং মাছ। পায়ের নিচ দিয়া য়াত দিয়া কেঁদা হুইদ্যা বাইং মাছ টানে মেইল্যা মারতাম। য়াত দিয়া ধরতে গেলে বাইং মাছ পিচিল্যা যায় গা। একবার করছিলাম কি, এবা কইরা এডা মাছ কেদাসুদ্যা মেইল্যা মারছি, হেডা গিয়া পড়ল এডা ঝোপের ভিত্তরে। আমি ঝোপের ভিতর ফুস্কি দিয়া দেহি মেলা মাইনষের কংকাল, এহেবারে ঠেংগি দিয়া য়াকছে। ডরের চোটে তাত্তারি মাছ মারন বাদ দিয়া বাইত আই পরছি। য়াইতে হুইয়া হুইয়া বাবার নগে হেই কতা কইছি। বাবা কইল যে বংশি – মান্দাইরা কলেরা-বসন্ত হইয়া বেশি মানুষ মইরা গেলে চিতায় না পুইরা এবা ঝোপের মইদ্যে পালা দিয়া য়াকত। হেইন্যা মোনয় হুকাইয়া কংকাল অইছে।

কাতিমাসে বেশি মাছ মারন গেত। বাইদের ছোট ছোট গাতায় ভরা মাছ থাকত। টিনের থালি দিয়া হেই পানি হিচ্চা মাছ ধরতাম। এলকা পানি হিস্তে কষ্ট অইত। হেইজন্যে হাজা ধইরা হিচা মাছেরে গেতাম। পানি হিচা যে যেডি ধরাহারি হেডি ধইরা নিয়াইতাম। শাজাহান ঠিকমোত চোহে দেকত না। কেঁদার মইদ্যে খালি আতাপাতা করত। এই জন্যে যদি কইতাম “শাজাহান, হিচা মাছেরে যাবি নিহি?” শাজাহান কইত “ভাগে নিলে যামু।” আমি যে বোছর সেভেনে পড়ি, হেই ১৯৭৩ সোনে, হে ট্রাক্টরের চাকার নিচে পইরা মইরা গেছে। অহনো তার নিগা আমার পরণ পোড়ে। কেঁদার মইদ্যে মাছ ধরতে গেলে শইলে কেদা নাগত। যতই বালা কইরা গোসল করতাম কানের নতির পাছে কেদা নাইগাই থাকত ধলা অইয়া। খাবার বইলে পড়ে মা হেই কেঁদা আচল দিয়া মুইছা দিত।

কাতিমাসে পাহারের পানি হুকাই গেলে সব মাছ গিয়া চাপরাবিলে জরা অইত। মাছে বিল কপকপ করত। হুনিবার মোংগলবারে চাপরাবিলে মাছ মারনের নিগা মানুষ পিল্টা পরত। হেইডারে কইত বাওয়ার মাছ। বেশি মানুষ একবারে পানিত নামলে মাছ গাবাই উঠতো। তাই ধরাও পড়ত বেশি বেশি। এই জন্য সবাই বিলে মাছেরে যাওনের নিগা ডাহাডাহি পারত। অনেকে পরভাইত তিগাই শিংগা ফুয়াইত। শিংগার ফু হুইন্যা পাহাইরা মানুষ গুনা যার কাছে যেডা আছে হেডা নিয়া ভাইংগা চুইরা আইত চাপরা বিলে। এক নগে জাহইর দিয়া বিলে নামত নানান ধরনের জিনিস নিয়া। হেন্যা অইল মোন করুন চাবি, পলো, টেপারি, ফস্কা, কোচ, খুইয়া, জালি, ছিপজাল, ঝাকিজাল, চাকজাল আরও কত কী! ইলশা মাছ ছাড়া আর যত ধরনের মাছ আছে সব পাও গেত এই বিলে। খালইর চাইরমুরা পাটখরির মোঠা বাইন্দা দিত যাতে খালই পানিত ভাইসা থাহে। বড় বড় খালই ভইরা মাছ আইন্যা উঠানে ঢাইল্যা দিত। মেওপোলা মাইনষে হেইন্যা দাও বটি দিয়া কুইটা পাট খরিতে গাইতা দড়ি দিয়া ঝুলাইয়া অইদে হুকাইয়া হুটকি কইরা য়াকত নাইন্দার মইদ্যে। খাইত কয় মাস ধইরা। চাপরা বিলের আশে পাশের পাহাইরা গ্রামের মানুষ তিগা নিয়া হেম্মুরা হেই আংগারগাড়া পর্যন্ত মানুষ চাপরা বিলের মাছ মারতে আইত। হেই গেরামের নামগুনা আমি কইতাছি হুনুন – গবরচাহা, বৈলারপুর, য়ামুদপুর, বাঘেরবাড়ি, বেড়িখোলা, আন্দি, হুরিরচালা, চেল ধারা, নাইন্দা ভাংগা, গড়বাড়ি, বুড়িচালা, ইন্দাজানি, কাজিরামপুর, আদানি, ভাতগড়া,, ভুয়াইদ, পোড়াবাহা, ছিরিপুর, খুইংগারচালা, চটানপাড়া, ছোট চওনা, বড় চওনা, ঢনডইনা, হারাইসা, বাহার চালা, কাইলা, কৌচা, আড়াই পাড়া, ধলি, জামাল আটখুরা, দাইমা, ডাকাইতা, আরও ভরা গেরাম যেগ্নার কতা অহন মোনাইতাছে না। আমি হুনছি ভৌরারা চাপরা বিলে মাছেরে আইত না। আব ক্যা, তাগ কি মাছের অভাব আছে?

আংগ খালাগ বাড়ি মাইজ বাড়ি, আর বুগ বাড়ি অইল আমজানি। দুইডাই গাংগের পারে। বংশি নদীডারে আমরা গাং কই। আপারে আমরা বু ডাকতাম। জৈস্টি মাসের হেষের দিকে গাং পানিতে ভইরা যাইত। আমি বুগ বাইত গেলে, খালাগ বাইত গেলে বশ্যি নইয়া গাংগে মাছেরে গেতাম। আমজানির এবাদত ভাই, য়শি ভাই, হায়দার ভাই, আর মাইজ বাড়ির ইয়াছিন, ইসমাইল ভাইর নগে বশ্যি বাইতাম। ইয়াসিন ক্যান্সার অইয়া মইরা গেছে। তার নিগাও পরণ পোড়ে। আমার খালাত ভাই। বড় বড় নাইয়া বাইং, গুজা মাছ, হেলাম পুটি, বাইলা মাছ ধরত বশ্যিতে। ধরার আগে মাছে আধার ঠোকরাইত। হেসুম পাতাকাটি পানিতে নাচন পারত। তা দেইখা মোনের মইদ্যেও নাচন আইত। পাতাকাটি তল অইলে খোট্টা দিয়া মাছ তুইল্যা ফালাইতাম। বশ্যির মইদ্যে আটকাইয়া মাছ দাফরাইতে থাকত। কান্তা তিগা বশ্যি খুইলা মাছ খালইর মইদ্যে য়াকতাম। বুগ পাট ক্ষেতে চলাচলা পুটি মাছ দৌড় পাড়ত। হেইন্যা য়াত দিয়াই ধইরা ফালাইতাম। খালুই ভইরা যাইত পুটি মাছে। একটা আগ্যা মাছ ধরছিলাম দেইক্যা য়শি ভাই কয় “শালার পাহাইরায় আগ্যা মাছ ধরছে। আগ্যা মাছ মাইনষে খায়?” অশি ভাই দুলাভাইর চাচত ভাই। হেও মইরা গেছেগা। আগন পুষ মাসে গাংগের পানি কুইমা যাইত। কয়জনে মিল্যা গাংগে ঝার ফালাইত। হেই ঝারে বড় বড় বোয়াল মাছ, আইর মাছ, চিতল মাছ জরা অইত। ডল্যা জাল, নয় ঝাকি জাল, নয় চাক ঝাল দিয়া হেইন্যা ধরত। দুলাভাইরা কয়জনে ভাগে গাংগে ঝার ফালাইছাল। হেই ঝার তনে একটা মস্ত বড় পাংকাশ মাছ

ধরছাল। হেইডা কাইটা ভাগ কইরা নিছাল দুলাভাইরা। হেসুম বু আংগ বাইত্যে আছাল। দুলাভাই হেন তিগা এক ভাগা আংগ বাইত্যে নিয়াইছাল। আমি হেসুম দুল্যা আছিলাম। পাংকাশ মাছের নাম হেদিন হুনলাম। হায়রে মজা নাগছাল হেইডা!

আংগ নানিগ বাড়ি অইল ভরে, য়ৌয়া গেরামে। শিক্ষিত মাইনষে কয় রৌহা। হেনু গিয়াও মাছেরে গেছি। য়াইত কইরা আন্ধাইরের মইদ্যে বোরো ধান ক্ষেতের বাতর দিয়া আইটা যাওনের সোম হলক ধরাই যাইতাম। হলকের আলো দেইখা হৈল মাছ আইগাই আইত। কাছে আইয়া চাই থাকত। হেসুম ফস্কা দিয়া ঘাও মাইরা ধইরহালতাম। যাগ ফস্কা না থাকত তারা পাট কাটনের বাগি দিয়া কোপ মাইরা হৈলের ঘার কাইটাহালত। হৈল মাছ, সাইতান মাছ এক ঝাক পোনা নিয়া ঘুরাঘুরি করত। হেই পোনা খুইয়া দিয়া খেও দিয়া মারতাম। পোনামাছ ভাজি খুব বাসনা করত। এহন বুঝি উগ্না মারন ঠিক অয় নাই।

বাইস্যা মাসে আমি, ফজু ভাই, কাদে ভাই, নজু ডিংগি নাও নিয়া হুক্নি বিলের মইদ্যে গিয়া বশ্যি ফালাইতাম। বড় বড় ফইল্যা মাছ ধরত। নজু আমার তিগা এক বোছইরা ছোট আছাল। হে ছোট বালাই য়ক্ত আমাশা অইয়া মইরা গেছে। আশিন মাসে পানি নিটাল অইয়া গেত। চামারা ধান ক্ষেতের ভিতর হল্কা মাছ খাওয়া খাইত। হেসুম পানিত ছোট ছোট ঢেউ উঠত। আমি আর ভুলু ভাই ডিংগি নাও নিয়া যাইতাম মাছেরে। আমি পাছের গলুইয়ে বইয়া নগি দিয়া নাও খোজ দিতাম। ভুলু ভাই সামনের গলুইয়ে কোচ নইয়া টায় খারই থাকত। বিলাইর নাগালা ছপ্পন ধইরা। মাছে যেই য়া কইরা কান্তা নড়াইত অবাই ভুলু ভাই কোচ দিয়া ঘাও দিয়া ধইরা ফালাইত। আমি পৌকের নাগাল পাছের গলুইয়ে বই থাকতাম। ভিয়াইল আংগ ফুবুগ বাড়ি। হেনু গিয়াও এবা কইরা মাছ মারতাম গিয়াস ভাই, মতি ভাই, সূর্যভাই, সামসু ভাই, জিয়াবুল ভাই, চুন্নু ভাইগ নগে। চুন্নু ভাই, জিয়াবুল ভাই মইরা গেছে। ভিয়াইল আংগ কাক্কুগ বাড়িও। হায়দর ভাইর নগেও এবা কইরা মাছ ধরছি। ভৌরা মাইনষে আশিন মাসে পানির দারার মইদ্যে বড় বড় খরা পাইত্যা নোড়া ফেকা মাছ মারত। ফুবার নগে গিয়া ভরা নোড়া ফেকা মাছ কিন্যা আনছি নায় চইরা। কাতি মাসে তালতলাগ বোগল দিয়া যে বিলগুনা আছাল হেইগ্নার যত মাছ গোলাবাড়ির খাল দিয়া আমজানির গাংগে গিয়া নামত। আংগ গেরামের মাইনষে হেই খালে ছিপ জাল পাইত্যা হেই মাছ ধরত। খালের পাড়ে মাচাং বাইন্দা বইয়া বইয়া ছিপজাল বাইত। এহাকজোনে বাইক কান্দে নইয়া এক মোন দের মোন গোলাবাড়ি তিগা মারা পুটিমাছ আইন্যা উঠানে ঠেংগি দিয়া ঢালত। এত মাছ কিবা কইরা মারে ইডা দেকপার নিগা আমি আর জিন্না ভাই এক নগে গোলাবাড়ি গিয়া য়াইতে মাচাংগে হুইছিলাম। যাওনের সুম দেহি হাইল হিন্দুইরা খালে গুদারা নাই। অহন পাড় অমু কিবায়? ঘাটে কোন মানুষ জোনও আছাল না। জিন্না ভাই কইল “তুই অম্মুহি চা।” আমি চাইছি। ঘুইরা দেহি জিন্না ভাই এক য়াতে কাপর উচা কইরা ধইরা আরেক য়াত দিয়া হাতুর পাইরা খাল পাড় অইতাছে। দিস্ কুল না পাইয়া আমিও কাপড় খুইলা এক য়াতে উচা কইরা ধইরা হাতুর পাইরা পার অই গেলাম। য়াসুইন না জানি। হেসুম পোলাপান মানুষ আছিলাম। কেউ ত আর আংগ দেহে নাই। শরমের কি আছে? গোলাবাড়ি গিয়া দেহি হারা খাল ভর্তি খালি ছিপ জাল। ষাইট সত্তুরডা জাল পাতছে ছোট্ট এডা খালে, ঘোন ঘোন, লাইন দইরা। বেক্কেই য়াইত জাইগা জাল টানে। দিনে বেশি মাছ ওঠে না। য়াইতে নিটাল থাকে দেইখা মাছ খালে নামতে থাহে। দিনে বেক্কেই ঘুমায়। আমি আউস কইরা কয়ডা খেও দিছিলাম। অত বড় জাল আমি তুলবার পাই নাই। তাত্তারি মাচাংগে গুমাই পড়ি। হেষ আইতে ঘুম ভাইংগা যায় জারের চোটে। কাতি মাস অইলে কি অব, য়াইতে জার পড়ত। দেহি য়াত পাও টেল্কায় শান্নিক উইঠা গেছে গা। বিয়ান বেলা কোন মোতে কোকাইতে কোকাইতে বাইত আই পড়লাম। এন্তিগা এবা সর্দি নাগল গ, এক হপ্তা পর্যন্ত সর্দি জ্বর বাইছিল। জ্বর নিয়া কাতি মাসে বিয়ানবেলা য়ইদ তাপাইতে বালাই নাগত। এক নাক ডিবি ধইরা বন্ধ অই থাকত। নজ্জাবতি ফুলের বোটা ছিড়া নাকে হুরহুরি দিলে বাদা আইত। হাইচ্চ দিলে নাক বন্ধ খুইলা গেত। জোড়ে জোড়ে নাক ঝাইরা পরিস্কার করতাম। আমি গোলাবাড়ি একবারই গেছিলাম।

গোলাবাড়ির মাছ মারা নিয়া এডা মজার কতা কই। একবার এডা মেওপোলা য়োগী নিয়া আইল এক বেটা আংগ এলাকা তিগা। কাগজপাতি ঘাইটা দেকলাম সখিপুর আর টাঙ্গাইল তিগা ভরা টেহার পরীক্ষা করছে। খালি টেহাই গেছে। আমি কইলাম “ভরাইত পরীক্ষা করছুইন।” বেটাডায় য়াগ কইরা কই উঠলো “আন্নেরা সখিপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিং য়োগীগ কাছ তিগা টেহা নিয়নের নিগা গোলাবাড়ির খালের মতো জাল ফালাইছুন ক্লিনিক কইরা। গোলাবাড়ির খালে যেবা উজান ভাটি সব জালেই হোমানে মাছ বাজে, হেবা আন্নেগ বেবাক ক্লিনিকেও গেরামের মাইনষের টেহা বাজে। বেটা মাইনষে বিদেশে কষ্ট কইরা টেহা কামাই কইরা দেশে পাঠাইতাছে, আর হেই টেহা আন্নেরা জাল পাইত্যা ছাইব্বা তোলতাছুইন। য়োগী বালা অওনের নাম নাই। খালি টেহা নিতাছুইন। ” আমি কইলাম “য়োগী ডাকতরেরা বালা করবার পাবনা। বেটির জামাইরে দেশে নিয়াই পড়ুন। দেকবাইন এবাই বালা অই যাবো গা। “

জারের দিনে নানিগ বাড়ির চহের পানি হুকাই গেত। পাগারের পানি পানায় ঢাইকা গেত। আমি আর ফজু ভাই হেই পানিত তিগা খুইয়া দিয়া দোয়াইয়া মাছ মারতাম। ফজু ভাই পানার নিচ দিয়া খুইয়া ঠেইল্যা দিত। পানা হুইদ্যা খুইয়া উচা কইরা ধরত। আমি খাবলাইয়া পানা হরাইয়া দিতাম। হেই খুইয়ায় খইলসা মাছ, চাটা মাছ, কই, জিওল, মাগুর মাছ উঠত। চাটা মাছ খইলসা মাছের নাগালা দেখতে, তে একটু ছোট। আমি চাটারে খৈলসা কইছিলাম দেইকা ফজু ভাই কইল “এই শালার পাহাইরা, চাটা মাছ চিনে না!” তিন আংগুল দিয়া মাথা আর ঘার পেইচা ঠাসি মাইরা ধরন গাগত জিওল মাছেরে। কাতা দেয় দেইকা আমি ডরে জিওল মাছ ধরহাইতাম না। একদিন সায়স কইরা ধরবার নিছিলাম। অবাই একটা কাতা খাইলাম। হায়রে বিষান নইল! বিষের চোটে উজা নাফ পারন নইলাম। কানতে কানতে নানিগ বাইত গেলাম। মামানি কাতা দিওন্যা যাগায় চুনা নাগাই দিলে বিষ কিছুডা কমল। তারপর বিষ নামাইন্যা ঝারা দিল এবা কইরা

আউরা জাউরা বিষের নাম,

কোন কোন বিষের নাম।

অ বিষ ভাটি ছাইড়া যাও।

যুদি ভাটি ছাইরা উজান ধাও,

মা পদ্মার মাথা খাও।

অ বিষ ভাটি ছাইরা যাও।

ঝারা দেওনের ভরাক্ষোন পরে বিষ কোমলে ঘুমাই পড়ি। আমি আর কূন্দিন কাতা খাই নাই। কাতা খাইয়া এডা উপুকার অইছে। য়োগিরা যেসুম কয় “য়াত পাও এবা বিষায় জানি জিওল মাছে কাতা দিছে। ” হেসুম আমি বুঝি কিবা বিষায়।

শাওন ভাদ্দর মাসে আমজানি দুলাভাইগ পালানের পাট কাটার পরে কোমর তুরি পানি থাকত। হেই পানিত চেলা, মলা, ঢেলা, বাতাসি, তিতপুটি, এবা ভরা মাছ থাকত। দুলাভাইর নগে মুশুরি টাইনা হেইন্যা ধরতাম হিসার পাইল্যা বোজাই কইরা। হিসার পাইল্যা পানিত ভাইসা থাকত। মাছ ধইরা পাইল্যায় য়াকতাম।

চৈত বৈশাখ মাসে পানি হুকাই যাইত। নানিগ বোরো ক্ষেতে হিচা দিয়া পানি হিচপার নিগা গাড়া কইরা মান্দা বানাইত। হেই মান্দা হিচা মাছ ধরতাম। অইদের তাপিসে কাঠের নাও হুকাইয়া বেহা ধইরা গেত দেইখা ইন্যারে পুস্কুনির পানিতে ডুবাই য়াকত। নায়ের পাটাতনের নিচ দিয়া মাছ পলাই থাকত। আমরা দুই তিন জোনে মিল্যা ঝেংটা টান মাইরা নাও পারে উঠাই ফালাইয়া নাও তিগা মাছ ধরতাম। মামুরা পুস্কুনিতে ডল্যা জাল টাইনা বড় বড় বোয়াল মাছ ধরত। জালে মইদ্যে বাইজ্যা হেগ্নায় হাটিহুটি পারত। মামুগ কান্দের উপুর দিয়া নাফ দিয়া যাইত গা বড় বড় বোয়াল। পুস্কুনির পাড়ে খারইয়া আমরা তামসা দেখতাম।

মাছ মারনের এবা ভরা কতা লেহন যাবো। কিন্তু এত সোময় আমার নাই। আন্নেরা ত জানুইনই আমি একজোন ডাকতর মানুষ। ডাকতরে গ কি অত সোময় আছে? একটা হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের প্রধান আমি। দিনাপত্তি বিয়ানবেলা সারে আটটা তিগা বিকাল আড়াইডা পর্যন্ত হেনু কাম করন নাগে। বৈকাল চাইরডা তিগা য়াইত নয়ডা পর্যন্ত নিজের প্রাইভেট ল্যাবরেটরিতে কাম করি। হেনু গেরামে তিগা মেলা লোক আহে। তাগ নগেও কতা কওন নাগে। শুক্কুরবারে বন্ধ থাহে। হেদিন য়াবিজাবি কাম করি। চাইরডা মেডিকেল জার্নাল সম্পাদনা করন নাগে আমার। বই লেহি। কম্পিউটারের সফটওয়্যার বানাই বিক্রি করি। ছাদবাগান করি। অনলাইনে ক্লাস নেই। জুমে মিটিং করি। ইউটিউব ভিডিও বানাই। মেয়াগ নগে, নাতি নাত্নিগ নগে, বন্ধুগ নগে, শালা সুমুন্দি গ নগে ভিডিও কলে কতা কইতে য়য়। এবা আরবিলের মইদ্যে থাকি। আন্নেগ নগে মাছ মারা নিয়া আর লেহনের সোময় নাই। অহন চেম্বারে যামু, থাইগ্যা। দোয়া করুইন জানি।

১৩/৭/২০২১ খ্রি.

ময়মনসিংহ

দিন চারি ঠিকানা সখিপুরের ঢনঢইনা গেরামের বড়বাইদ পাড়ার তালুকদার বাড়ি।

থাহি ময়মনসিং

তালুকদার প্যাথলজি ল্যাবরেটরিতে আইলে দেহা অব।

kanula

Kanula

কানুলা

(টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার)

ইডা ভরাদিন আগের কতা। হেই উনাশি শালের কতা মোনয়। হেসুম আমি ইন্টারে পড়ি, নায়য় পাস করছি। ঠিক করলাম, ছোট ফুবুগ বাইত্যে যামু। আংগ দুইজন ফুবু আছাল। বড় ফুবুগ বাড়ি অইল ভিয়াইল গায়। ছোট ফুবুগ বাড়ি অইল কাশতলার হাতাই পাড়ায়। হেনুকার হামিদ ডাক্তর আছাল আংগ ছোট ফুবা। মুকুল, মজি ভাই অইল আংগ বাবার চাচত ভাইয়ের পোলা। হেই ইসাবে তারা আমার চাচত ভাই। দুইওজন মইরা গেছে। অগ আছাল একটা ফুবু। হেই ফুবুরও বাড়ি আছাল ভিয়াইল। পরে হেই ফুবা চৌরা পাহারে জমিন কিন্যা বাড়ি বানাইছাল। হেই বাইত্যেও আমি গেছিলাম কেলাস এইটে থাকতে। আগের দিনে আমরা ইস্টিবাড়ি যাওনের সোম হাজা নিয়া যাইতাম। মজি ভাই আমারে হাজা নইয়া গেছাল তার ফুবুগ বাইত। মোনে আছে হেন্তিগা ডেইল্টার য়াটে গেছিলাম। বাড়ির বোগলেই, কাছরা পাহারে। আংগ বাড়িডা খাটি পাহারে, ঢনডইনা গায়ে। চিনুইন? বড়বাইদ পাড়ার তালুকদার বাড়িগ পোলা আমি। দলু তালুকদারের ছোট পোলা। যাইগ্যা হে কতা, যে কতা কইতে চাইছিলাম, হেই কতা কই।

আমি মুকুলেরে হাজা নইয়া ছোট ফুবুগ বাড়ি রওনা দিলাম। গিরিমিন্টি করতে করতে বিয়াল অই গেছাল। দেওপড়া গেলে পরেই বেইল ডুইব্যা গেলোগা। হেদিন মোনয় আমাবইস্যার য়াইত আছাল। পুসুন্ডা গেলে পরে ঘুটঘুইটা আন্দাইর পইরা গেল। য়াস্তাঘাট কিছুই দেহা যাইতাছাল না। আন্দাজি ডাইন মুহি ঘুইরা য়াটতে থাকলাম। একসুম দেহি বাড়িঘরের কোন চিহ্ন নাই। খালি চক ক্ষেত। ইটা ক্ষেতের উপুর দিয়া য়াটন নইলাম। মুকুল কইল আমি ডরাইতাছি। আমি কইলাম ডরাইস না। লা হাওলা অয়ালা কুয়াতা পড়তে থাক। আমার মোনইল বেশি ডাইনে গেছিগা। অহন বাম মুহি যাওনের চেষ্টা করি। কিন্তু যেনেই যাই হেনেই বিল বাজে। বিল আর হেশয় না। য়াটতে য়াটতে অরান অইগেলাম। পানি তুলাস নাইগ্যা গেলো। খিদায়ও পেট পোড়া শুরু করলো। অহন দিশ কুল না পাইয়া উলটা পালটা য়াটা শুরু করলাম। এবা কইরা কয়েক ঘন্টা য়াটার পর মাইন্সের শব্দ পাইলাম এক বেটা মোনয় বদনা নিয়া ইটা ক্ষেতে ঘাটুদ্ধারে বাইরইছাল। আন্দাইরে মইদ্যে আমাগো দিসা পাইয়া কয় যে, এই ক্যারা? আংগ যাতে চোর মোনে না করে হেইজন্য তারা তারি কইয়া উঠি, আমরা ফুবুগ বাইত্যে যাবার চাইছিলাম। পথ য়ারাই ফালাইছি গো। ইডা কোন গাও? বেটাডা কইল ইডা অইল নারাইংগেল গাও। মুকুল কইয়া ফালাইল, নইন নারাইংগেলের আনো বুগ বাইত্যে যাই। আনো বু অইল মুকুলের ফুবাত বোইন। দুলাভাইর নাম ওস্তম মাস্টর। আমি হইচ করলাম, কাশতলা কি কাছেই? কইল যে, না দূর আছে। বীরবাসুন্ডা অইল মাগ নানির বাড়ি। আমি হইছ করলাম, বীরবাসুন্ডা কি কাছে? কইল, না। মুকুল কইল, আমি আর য়াটপার পামু না। নইন দুলাভাইগ বাইত্তেই যাই। তাই করলাম। বেটায় দুলাইগ বাড়ি দেহাই দিল। বাড়ির উঠানে গিয়া, ভাইগ্না নুর ইসলামরে ডাক দিলাম, নুর ইসলাম ঘুমাই পরছ? দুলাভাই কইয়া উঠলো, ক্যারা? আমরা পরিচয় দিলাম। আনো বু দোয়াত আতে নইয়া আংগ মুহের মুহি চাইয়া কইল, তরা কোন তিগা আইলি। বাড়িত তিগা পলাই আইছস না ত? বাব্বুর কাছে কই য়াইছস? মুকুলের দাদিরে নাতিরা বাব্বু কইত। এবা ভরা কতা। আমি কইলাম, ভরা কতা আছে। আগে তাততারি চাইরডা খাবার দেইন। খিদায় মইরা যাইতাছি। বু কইল, এবা দুপুর য়াইতে কী খাবার দিমু। বিয়ানা খাওনের নিগা আলু হিদ্দ আছে। আগে এইগনাই খাইয়া নি। আমি ধাতুবাত কইরা চাইরডা ভাত চরাই দেই। আমি কইলাম, বু আংগ অহন ভাত খাওন নাগব না। আলু খাইয়াই হুইয়া পড়মু।

নারাইংগেলে খুব আলু অয়। বাইল্যা মাটি ত। চিনামুরার মানুষ নিহি খালি আলু খাইয়া থাকছে। আংগ এক কাক্কু কইছে। ইডা মিছা কতাও অইতে পারে। কতার কতা। মস্কারি কইরা কইত, চিনামুরার ভদ্রলোক। বাইত্যে আলু খায়, বাইরে ফ্যারাঙ্গি করে। যাইজ্ঞ্যা, আমাগ কতা সব হুইন্যা দুলাভাই কইলেন “তোমগ কানুলায় ধরছাল। কানুলায় ধরলে পথ ভুলাই দিয়া অন্য পথ দিয়া ঘুরায়।”

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৪/৬/২০২১

train

Journey by Train

জার্নি বাই ট্রেইন

২০০৮ সন, জানুয়ারি মাস। আমার ছোট মেয়ে দীনাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তি করে মাইগ্রেশন ফর্মে প্রথম পছন্দ দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ লিখে ময়মনসিংহ চলে এলাম। দিনাজপুর যাত্রার উদ্যেশ্যে দীনার মা স্বপ্না, দীনা ও আমি রওনা দিলাম। রত্না স্বপ্নার ইমিডিয়েট ছোট বোন। দীনার খালামনি। তার বাসা টাঙ্গইল। তার বাসায় রাত্রিযাপন করলাম। সকালে নানারকম রেসিপি দিয়ে নাস্তা করলাম। দীনা মেডিকেলে চাঞ্চ পাওয়াতে তারা সবাই খুশী।

বাসে দিনাজপুর যাওয়া অনেক কষ্টের ভেবে এবার ট্রেনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। সিদ্ধান্তটা নেয়া হয়েছিল রত্নার পরামর্শেই। রত্না বলল “বাসে আট দশ ঘন্টা বসে থাকা খুব কষ্টের। ট্রেনে কি ফাইন কোন ঝাকি নাই। আরামে বসে যাওয়া যায়। নাস্তা করা যায়। বাথরুম করা যায়। কত সুবিধা!” আমরা টাঙ্গাগাইলা মানুষ। আগে এই জেলায় ট্রেন লাইন ছিল না। ট্রেন লাইন পেয়েছি যমুনা নদীর উপর সেতু হওয়ার পর। ট্রেনে উঠেছি মাত্র কয়েকবার। ট্রেনে হুরমুরি ওঠ-নামা করা আমার কাছে ঝামেলার মনে হতো। তাই আমি সাধারণত বাসেই জার্নি করতাম। খুব ছোট বেলায় দীনা ট্রেন জার্নি করেছে। সেটা তার মনে থাকার কথা না।

Read more

ট্রেনটা সকালে ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে টাঙ্গইল হয়ে দিনাজপুর যাবে। এগারোটার দিকে টাঙ্গইল টাচ করবে। আমাদেরকে একটু আগেই স্টেশনে উপস্থিত হতে হবে টিকিট করার জন্য। স্বপ্না আমাকে ডাক্তার বলে ডাকে। সকাল থেকেই কিছুক্ষণ পরপর তার সতর্কবাণী আমাকে বিরক্ত করছিল। সে বারবার বলছিল “এই ডাক্তার, তুমি কিন্তু দীনার প্রতি খেয়াল রাখবে। ট্রেনের ঢুলানিতে তার বমি হতে পারে। আল্লাহ নাকরুক, বমি করতে করতে যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে !” আবার বলে “এই ডাক্তার, অপরিচিত কারো কাছের কিছু কিন্তু খাবে না।” বারবার বলে “এই ডাক্তার, দীনাকে কিন্তু একা বাথরুমে পাঠাবে না। তুমি বাথরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে। আল্লাহ না করুক, কেউ যদি বাইর থেকে বাথরুমের দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দেয়! মা আমার ফাপর হয়ে যাবে।” আমি দেখলাম নানারকম অজানা আতংকে স্বপ্না অস্থির। আমি তেমন তার কথায় পাত্তা দিচ্ছিলাম না। একটু একটু সশার টুকরা মুখে দিয়ে কচকচ করে চিবাচ্ছিলাম। একটা দুইটা বরই মুখে দিয়ে চিবাচ্ছি্লাম। রত্নার সাথে ঠাট্টা মস্করা করছি্লাম। রত্নাও সতর্ক কম করছে না। বলছে “এই দুলাভাই, দীনা বাথরুমে গেলে খেয়াল রাখবেন।” ইত্যাদি। ট্রেন আসার সময়ের এক ঘন্টা আগেই রত্না, দীনা, স্বপ্না ও আমি রিক্সা করে সাবালিয়া থেকে টাঙ্গইল রেল স্টেশনে গেলাম। টিকিট করলাম। দুই ঘন্টা বিলম্ব করে ট্রেন এলো। ততক্ষণ দীনার মা-খালাদের সতর্কবাণী শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে পড়ছি। ট্রেনে উঠে বসলাম।

কিছুদুর চলার পর একটু বোরিং লাগছিল। ইয়ার ফোনটা কানে লাগিয়ে মোবাইল থেকে মেহেদী হাসানের গজল শুনতে থাকলাম। দীনাও তার কানে ইয়ার ফোন লাগাল। সে কি শুনছিল তা আমি জানি না। গরম জামা গায়ে ছিল। দুপুরের পর থেকে গরম একটু বেশী মনে হচ্ছিল। আমার প্রশ্রাবের চাপ হল। দীনাকে সীটে রেখে টয়লেটে গেলাম। টয়লেটে ঢুকে ভাল করে ভিতর থেকে শিটকিনি লাগালাম। ট্রেন দুলছিল খটর খট খটর খট শব্দে। আমিও দুলছিলাম । প্রশ্রাব করার পঅর বের হওয়ার জন্য প্রস্ততি নিলাম। শিটকিনি খুললাম। দরজা ধাক্কা দিলাম। দরজা খুলছে না। খুলছে না কেন? বুঝতে পারলাম কেউ বাইরে থেকে শিটকিনি লাগিয়ে দিয়েছে। এইবার মনে পড়ল স্বপ্নার সতর্ক বাণীর কথা। তার ধারনা ছিল দীনা আটকা পড়তে পারে। দীনা ছোট্ট মেয়ে। সে আটকা পরতে পারে। কিন্তু দীনার বাবা যে আটকা পরতে পারে তা কারো মাথায় ছিল না। আমি একটু ধৈর্য ধরলাম। ভাবলাম আমার পর যার প্রশ্রাবের সিরিয়াল সেই বাইরের শিটকিনি খুলে যখন প্রবেশ করবে তখন তার পাশ দিয়ে আমি আসতে করে বের হয়ে যাব। কিন্তু পনের বিশ মিনিট অতিবাহিত হল কারো দেখা পেলাম না। এবার টেনশন শুরু হল। ঘামতে লাগলাম। ফুল সুয়েটার পরা ছিল। সুয়েটারের নিচে ঘাম চাপা পরে অসস্তি লাগা শুরু হল। টয়লেটটা ছিল পশ্চিম পাশে। বিকেলের পশ্চিমা রোদে টয়লেট গরম হতে লাগলো। আমার শরীরে জ্বালা ধরে গেল। চলন্ত ট্রেনের ঝাকুনিতে আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দুলছি। কিন্তু এই দোলায় আরাম নেই, আছে কষ্ট। পকেট থেকে মোবাইল বের করে দীনাকে কল দিলাম। বিপত্তির কথা জানালাম। আরো ১০ মিনিট গেল। দীনা তার বাবাকে উদ্ধার করতে এলো না। আমি আবার কল দিলাম। দীনা বলল “তুমি কোন টয়লেটে গেছো, আমি তো খুঁজে পাচ্ছি না।”
-আমরা যে কম্পার্টমেন্টে ছিলাম সেইটার টয়লেটে।
-ওটা তো খালি।
-আমার মনে হয় তুমি উলটা দিকে খোঁজ করছো।
-তাহলে অন্য দিকে যাব?
-যাও।
অনেকক্ষণ দীনার কোন রেস্পন্স নাই।
আমি ঘেমে অস্থির।
-আব্বু, আমি কয়েকটা কম্পার্টমেন্ট খোঁজ করে দেখেছি কোন টয়লেট বাইরে থেকে বন্ধ না।
-তুমি বেশী দূর আর যেও না, সীট হারিয়ে ফেলবে।

দরজার কাছে এক সিকুরিটি ম্যান বসে ঘুমাচ্ছিল। দীনার মোবাইল অন ছিল। আমি শুনলাম দীনা বলছে “পুলিশ আংকেল, আমার আব্বু টয়লেটে গিয়ে আটকা পড়েছে। আংকেল, আংকেল…।” পুলিশ আংকেল কিছুই বুঝতে পারলেন না ঘুম থেকে জেগে উঠে। আমি পুলিশের সাথে দীনার ডায়লগ শুনে আরো চিন্তিত হয়ে পরলাম। ঘামতেই থাকলাম। মনে পরল ছুটির ঘন্টা সিনেমার কথা। স্কুল ছুটির পর দারোয়ান টয়লেট চেক না করেই এক ছাত্রকে টয়লেটে রেখে দরজা বন্ধ করে চলে গিয়েছিল। স্কুল কয়েকদিন ছুটি ছিল। ততদিনে ছেলেটির করুন মৃত্যু হয়। আমি মরব না। কিন্তু ঘেমে আমার বারটা বেজে যাবে। এক সময় কারো প্রশ্রাব পায়খানার চাপ এলে আমাকে উদ্ধার করবেই। কিন্তু যদি কারো চাপ না আসে! হায়, হায়! এক সময় দীনার ফোন এলো “আব্বু, আমি এখন আমার সীট চিনতে পারছি না।” আরেক টেনশন শুরু হল আমার।

অনেকক্ষণ আবার ফোন এল “আব্বু, আমি সীট খুঁজে পেয়েছি। চিন্তা করো না।”

এভাবে অবরুদ্ধ অবস্থায় আমার চল্লিশ পঞ্চাশ মিনিট কেটে গেলো। ট্রেন চলছে তার নিজস্ব গতিতে । আমি দুলছিলাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। এক সময় ছিটকিনি খুলে একজন লোক ভিতরে দাঁড়ানো আমাকে দেখতে পেল। বুঝতে পারলাম তার চাপ এসেছে। আমি আসতে করে তার পাশ দিয়ে বেরিয়ে পরলাম। সে ঢুকে পরল। কিন্তু জানল না আগের জনের ভাগ্যে কি দুর্গতি হয়েছিল। সীটে গিয়ে বাপবেটি এনিয়ে কথা বললাম। দীনা বলল “আমি তো দেখলাম ঐ টয়লেট থেকে একজন লোক বেরিয়ে এলো।” আমি আর তাকে  এনিয়ে বেশী জেরা করলাম না। ট্রেনের সিকুরিটিকে বিস্তারিত জানালাম। সতর্ক করে বললাম “আমি যেন আগামী সপ্তাহে কোন টয়লেটে দরজার বাইরে ছিটকিনি না দেখি। সবগুলো খুলে ফেলবেন।”এরপর ট্রেনে আমি মাত্র দুইএকবার ভ্রমন করেছি। অনেকদিন পর দীনা বলল “আম্মু সতর্ক করেছিল, ট্রেনে খোলা দরজার কাছে না যেতে। তাই আমি হয়ত ভাল করে টয়লেটের দরজা চেক করি নি।”

রাত আটটার দিকে দিনাজপুর পৌঁছলাম। অধ্যক্ষ স্যার আমাদের জন্য কলেজের ডর্মেটরির ভিআইপি রুমে থাকার ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন ।  দীনা ও আমি সেই রুমে অবস্থান করলাম। সকালের দিকে দীনা তার হোষ্টেল রুমে উঠল। তার রুমমেট পেখম তখন ক্লাসে ছিল। খবর পেয়ে রুমে এলো। দীনাকে জড়িয়ে ধরে বন্ধুত্ব প্রকাশ করল। আমার ভাল লাগলো।
১৯/২/২০১৮ খ্রি.

khola akasher niche

Khola Akasher Niiche Ghumalam

খোলা আকাশের নিচে ঘুমালাম

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

মুজদালিফায় অবস্থান করা হজ্জের একটি ওয়াজিব পর্ব। আমরা হজ্জ করেছিলাম আজ থেকে ১৯ বছর আগে, সেই ২০০৪ সনে। আমরা রাতের কোন এক সময় আরাফার ময়দান থেকে মুজদালিফায় গিয়ে পৌছলাম। আমাদের কাফেলায় ছিল খুব সম্ভব ৪৫ জন হাজী। খুব ক্লান্ত ছিলাম। খোলা আকাশের নিচে মাটিতে শুতে হয়। আমাদের পরনে ছিল সেলাইবিহীন মাত্র দু’টরো সাদা কাপড়। এক টুকরো লুঙ্গির মতো করে প্যাচ দিয়ে পরা। আরেক টুকরো চাদরের মতো করে শরীরে জড়িয়ে রাখা। আমার উঁচু ভুড়ির কিছুটা বের হয়ে থাকতো। ওখানে গিয়ে নিজেকে কিছুই মনে হতো না। কিসের ডাক্তার, কিসের গেজেটেড অফিসার, কিসের মেডিকেল শিক্ষক। আমি কিছুই না। সারাক্ষণ অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত ও আখেরাত নিয়ে ভাবতাম।

আমরা চাদর বিছিয়ে শুয়ে পড়লাম চিত হয়ে মুজদালিফার মাটিতে। এক সারিতে আমরা ছেলেরা শুলাম। আমাদের পায়ের দিকে কিছুটা দূরে শুলো মহিলারা। আমি আকাশের দিকে তাকালাম। আল্লাহর সৃষ্টি আকাশের তারকারাজি দেখতে লাগলাম। সৃষ্টি জকগতের রহস্য নিয়ে ভাবতে লাগলাম। শহরের বিল্ডিংয়ের ভিতর থাকতে থাকতে রাতের আকাশ দেখা ভুলেই গিয়েছিলাম। ছোট বেলা গরমের দিনে উঠোনে বিছানা করে বাবার সাথে শুয়ে আকাশের তারকা দেখতাম। গোনতে চেষ্টা করতাম। বাবা বলতেন আশমানের তারা গুনে কেউ শেষ করতে পারবে না। সেই ভাবে শুয়ে শুয়ে তারা দেখতে লাগলাম। ক্লান্ত ছিলাম। তবুও ঘুম আসছিল না। পায়ের দিকে চোখ গেল। দেখি আমার স্ত্রী স্বপ্না আমার দিকে টুলটুলি চেয়ে আছে। আমিও টেলটেলি চেয়ে রইলাম। মাথা নেড়ে নেড়ে ইশারায় জিগালাম “ঘুম আসে না?” স্বপ্নাও মাথা নেড়ে নেড়ে ইশারায় বললো “না, ঘুম আসে না।”

১৮ জানুয়ারি ২০২৩ খ্রি.

ময়মনসিংহ

#memoryofsadequel

tiner thali

টিনের থালি

টিনের থালি

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন গ্রামের অধিকাংশ মানুষ টিনের থালাবাসন ব্যবহার করতো। গরীবরা ব্যবহার করতো পোড়ামাটির থালাবাসন। থালা, বাটি ও ডিস ছিলো টিনের তৈরি। সানকি, বাটি ও গামলা ছিলো পোড়ামাটির তৈরি। ধনি বাড়িতে অল্প কিছু পোরসেলিনের বা চিনামাটির থালাবাসন ছিলো। এগুলোকে করইর বাসনও বলা হয়। এগুলো সাধারণত সিকায় তুলে রাখা হতো। মেহমান এলে করইর থালায় খাবার পরিবেশন করা হতো। এগুলোর সাথে পিতলের চামচ ব্যবহার করা হতো।

টিনের থালির উপর দিয়ে সাদা রংগের প্রলেপ দেয়া থাকতো যাতে জং (মরিচা) না ধরে। থালি পুরান হলে ঘসায় ঘসায় রং উঠে গিয়ে জং ধরে যেতো। জং ধরলে থালি ছিদ্র হয়ে যেতো। আমরা বলতাম ছেন্দা। অন্য এলাকার মানুষ বলতো কানা। ছেন্দা থালি বড় চওনা হাটে নিয়ে মেকার দিয়ে ঝালাই করে আনা হতো। রং উঠে গেলে বলা হতো কালাই উইঠা গেছে। বারবার ঝালাই করলে খালিতে ভাত খাওয়ার অনপোযুক্ত হয়ে যেতো। এমন থালি দিয়ে ভৌরা (নিচু এলাকার) মানুষ নায়ের (নৌকার) পানি হিচতো (সেচতো)। মেয়েরা ছাই ফেলতো বা ছাই রেখে জিয়লমাছ (শিং মাছ) কাটতো। পাহাইড়া (পাহাড় এলাকার) মানুষ মান্দা হিচতো।

ফকিররা (ভিক্ষুক) ভিক্ষার থলেতে একটা টিনের থালি রাখতো। কেউ খাবার দিলে এই টিনের থালিতে নিয়ে খেতো। ভিক্ষা নিতো আইচায় করে। আইচার ভিক্ষা থলের চাউলের সাথে মিশিয়ে নিতো।

এখন গ্রামে বা শহরে টিনের থালি চোখে পড়ে না। আমি কয়েকমাস আগে ময়মনসিংহের স্বদেশী বাজারে কাঁচের বৈয়ম কিনতে গিয়ে এই থালির দেখা পাই। সখ করে একটা থালি কিনে আনি। আজ ভাগনে ফারহানকে দেখিয়ে বলি “এমন টিনের থালিতে আগের দিনে বেশী ভাগ মানুষ ভাত খেতো। এখন এগুলো দেখা যায় না।” ফারহান বললো “আমি যেনো কোথায় দেখেছি। মনে পড়েছে, ভিক্ষুকের হাতে দেখেছি।” শুনে সবাই হা, হা করে হেসে দিলো। আমি এরপর আমার এই স্মৃতি কথাটি লিখে ফেললাম।

ময়মনসিংহ

২৩ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রি.

#memoryofsadequel

haque-sir-fnac

Introduced by Haque Sir

হক স্যারের কারনে পরিচিতি পেলাম

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

সময়টা খুব সম্ভব ১৯৯৭ বা ৯৮ সন। ডাঃ ফজলুল হক পাঠান ভাই ময়মনসিংহ বিএমএ-র জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন। তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহের সব জেলার ডাক্তারদের নিয়ে একটা বিরাট সম্মেলন করেছিলেন। সেই সম্মেলনে আমি একটা সাইন্টিফিক পেপার প্রেযেন্ট করেছিলাম। প্যাথলজির প্রফেসর, সাবেক বিভাগীয় প্রধান, সাবেক অধ্যক্ষ, সাবেক বিএমএ প্রেসিডেন্ট ডাঃ আব্দুল হক স্যার সেদিন অন্যতম লিজেন্ড হিসাবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি তার বকৃতায় সম্মেলন আয়োজকদের ভুয়সী প্রশংসা কনেন। বিশেষ করে সাইন্টিফিক পর্বের প্রতি বেশ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন “সাইন্টিফিক প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে আমরা চিকিৎসা বিজ্ঞানের নতুন নতুন বিষয়গুলো জানতে পারি। যেগুলো এখনো বইয়ে আসেনি। আমার এক ছাত্র ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার সুন্দর করে প্রেজেন্ট করেছে। সে প্যাথলজি বিভাগের হিস্টোপ্যাথলজির পাশাপাশি সাইটোপ্যাথলজি বিশেষ করে এফ এন এ সি ও পেপস স্মিয়ার করা হচ্ছে তা সুন্দর করে প্রেজেন্ট করেছে। এফ এন এ সি পরীক্ষার কথা তো আমার জানাই ছিলো না। আমার এক আত্মীয় কয়েকদিন আগে হাসপাতালে এসে ভর্তি হয়। আমি দেখে অনুমান করি তার ক্যান্সার হয়েছে। বায়োপসি পরীক্ষা করতে হবে ডায়াগনোসিস করার জন্য। কয়েকদিন সময় লাগবে। বিকেলে আমার বাসায় ওরা খবর নিয়ে এলো যে পরীক্ষায় ক্যান্সার ধরা পড়েছে। আমি বললাম যে আমাদের এখানে বায়োপসি পরীক্ষা করতে ৩ থেকে ১০ দিন সময় লাগে। আজকেই কিভাবে পরীক্ষা করলো। ওরা বললো, দুই ঘন্টার মধ্যেই রিপোর্ট দিয়েছেন। আমি বললাম যে রিপোর্ট নিয়ে আসো। রিপোর্টে দেখি ঠিকই ক্যান্সার ডায়াগনোসিস করেছেন আমারই ছাত্র, সম্প্রতি পিজি থেকে এম ফিল পাস করে এসেছেন ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার। তারপর এনিয়ে প্রফেসর মীর্জা হামিদুল হকের সাথে কথা বললাম। জানতে পারলাম এফ এন এ সি করে এখানে দ্রুতই ক্যান্সার ডায়াগনোসিস করা যাচ্ছে……।”

স্যারের বকৃতা শুনে অন্যান্য জেলার চিকিৎসকগণও জেনে গেলেন এফ এন এ সি ও পেপ্স স্মিয়ার পরীক্ষার গুরুত্ব এবং আমিও পরিচিতি পেয়ে গেলাম বৃহত্তর ময়মনসিংহের সকল ডাক্তারদের কাছে। প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ হিসাবে ডাক্তারদের সাথে পরিচিতি পেলে যে কি লাভ তা ডাক্তারগণ জানেন। কাজেই ময়মনসিংহে ডাক্তারদের মাঝে পরিচিতি পেতে আমার সরাসরি শিক্ষক প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হক স্যারের বিরাট অবদান আছে। আমি স্যারকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।

১০ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রি

ময়মনসিংহ

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ম-১৭ ব্যাচ (১৯৮৫ এম বি এম এস)

সাবেক বিভাগীয় প্রধান, প্যাথলজি

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ

#memoryofsadequel

Haque-sir-er-basay

Haque Sir-er Basay

হক স্যারের বাসায় গিয়েছিলাম

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হক স্যার তখন অবসর জীবন যাপন করছিলেন। ময়মনসিংহের চরপাড়ার লাশকাটা ঘরের বিপরীত দিকের রাস্তায় তিনি বাড়ি করে থাকতেন। ১৯৯৭ সনের পরে হবে। বাংলাদেশ জার্নাল অব প্যাথলজি-তে আমার প্রথম দুটি সাইন্টিফিক রিসার্চ আর্টিকেল প্রকাশিত হলো। এগুলো ছিলো ঢাকার শাহবাগে ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিসিন এন্ড রিসার্চ (আইপিজিএম আর)-এ এম ফিল কোর্স করার সময় আমার থিসিস। পাকস্থলীর ক্যান্সারের সাথে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি জীবাণুর সম্পর্কে গবেষণা করছিলাম। আমার গবেষণার ফলাফল জার্নালে প্রকাশ পাওয়ায় খুব আনন্দিত ছিলাম। এই আনন্দ সবার সাথে শেয়ার করা যায় না। সবাই এর মর্জাদা বুঝে না। ঢাকার হোটেল শেরাটনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সোসাইটি অব প্যাথলজিস্ট-এর সম্মেলনে জার্নাল বিতরণ করা হয় নিবন্ধিত মেম্বারদের মাঝে। আমি আমার প্রিয় শিক্ষক প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হক স্যারকে প্রদান করার জন্য অতিরিক্ত দুটি কপি সংগ্রহ করেছিলাম। হক স্যার ছিলেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ও অধ্যক্ষ। তিনি ময়মনসিংহ বিএমএ-এর এক সময় প্রেসিডেন্টও ছিলেন।

আমি তখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের লেকচারার ছিলাম। অফিস থেকে বের হয়ে সকাল আনুমানিক ১০ টার দিকে জার্নাল দুটি হাতে নিয়ে স্যারের বাসার দিকে গেলাম। গেইটে করা নাড়ায় স্যার নিজেই দরজা খুলে দিলেন। আসেন আসেন বলে স্যার খুব খুশি হয়ে আমাকে তার বেড রুমে নিয়ে গিয়ে বাসালেন। সিম্পল একটা খাটে সাধারণ বিছানা পাতা। মশারীর দুই কোণা বাঁধা আছে। অন্য দুই কোণা বিছানার অর্ধেক পর্যন্ত কভার করে আছে। বাসায় অন্য কেউ আছে বলে মনে হলো না। স্যারের স্ত্রী ঢাকার বাসায় থাকেন। মেয়েরাও ঢাকায় থাকে। বাসার পরিবেশ দেখে মনে হলো আমি সেই হাজার বছর আগের দিনের কোন এক দার্শনিকের কাছে এসেছি। স্যার জার্নাল দুটি হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলেন। আমি আমার আর্টিকেল বের করে দিয়ে বললাম “স্যার, এ দুটি আমার প্রথম আর্টিকেল।” স্যার আমাকে

অভিনন্দন জানিয়ে আনন্দিত চোখে পড়া শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পড়ার পর বললেন “খুব ভালো হয়েছে। তবে বেশ কিছু গ্রামার ভুল আছে।” আমি বললাম

– স্যার গতকাল আমাদের সোসাইটির বার্ষিক সম্মেলন ছিলো। সেখানে সবাইকে এই জার্নাল দিয়েছে। আমি আপনার জন্য দুটি নিয়ে এসেছি।

– খুব ভালো করেছেন। সাদেক, কেউ এখন দায়িত্ব নিয়ে খোঁজ খবর নেয় না। অথচ, দেখেন, আমি এই সোসাইটির আজীবন সদস্য। একটা চিঠিও পাই না। আপনি আমার কথা মনে করে জার্নাল নিয়ে এসেছেন, এজন্য অনেক ধন্যবাদ। আপনি আরও পেলে আমার জন্য নিয়ে আসবেন। নতুন কিছু জানতে হলে জার্নাল পড়তে হবে। এই যে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি জীবাণু যে স্টোমাকে থাকে কজনে জানেন? আপনি স্টোমাক থেকে জীবাণু আইসোলেট করেছেন এবং তার সাথে যে ক্যান্সারের এসোসিয়েশন আছে তার প্রমাণও করেছেন।

স্যার ছোট বড় সবাইকে আপনি করে বলতেন। আমি স্যারের ছাত্র হলেও তিনি আমাকে আপনি করে বলতেন। অনেক্ক্ষণ তিনি অনেক স্মৃতিচারণ করে কথা বললেন। বিশেষকরে তিনি যখন ইংল্যান্ডে পোস্ট গ্রাজুয়েট কোর্সে ছিলেন সেই সময়ের স্মৃতি কথা বলছিলেন। আমার ক্লাস আছে বলে উঠতে চাইলে স্যার বললেন “সাদেক, একটু বসেন। চা দিচ্ছি” বলে দ্রুত ভিতরের রুমে গিয়ে নিজেই চা বানিয়ে আমার জন্য নিয়ে এলেন।” আমি বিনয়ের সাথে বললাম “স্যার, আপনি কষ্ট করে চা বানালেন!” স্যার, হালকা হেসে বলেলেন “এই সামান্য এক কাপ চা, আর কি, খান। এভাবেই কেটে যাচ্ছে। “

৯ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রি

ময়মনসিংহ

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ম-১৭ ব্যাচ

সাবেক বিভাগীয় প্রধান

প্যাথলজি বিভাগ

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ

#memoryofsadequel

baba

আমার বাবা

(স্মৃতিকথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমার বাবার নাম দলিল উদ্দিন তালুকদার। জন্মগ্রহণ করেন কালিহাতির ভিয়াইল গ্রামের দক্ষিণ পাড়ায় তালুকদার বাড়ি। আমার দাদা ছিলেন মোকছেদ আলী তালুকদার। বাবার ডাক নাম ছিল দলু । বাবার শরীরে ইমুনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম ছিল। তাই, ঘনঘন অসুস্থ্য হতেন । অসুস্থ থাকার কারনে বাবা পরিশ্রমের কাজ করতে পারতেন না। একজন কৃষক হয়েও কৃষিকাজ তেমন করতেন না। যার দরুন অনেক জমি জমা থাকলেও তিনি তেমন সচ্ছল ছিলেন না।

বাবা বেশিরভাগ সময়ই ঘুরে বেড়াতেন। লাইলি বুবু ও আকবর ভাইর জন্মের পরই দাদা বাবাকে পাঠিয়ে দেন পাহাড় অঞ্চলের জমি দখল করে আবাদ করার জন্য। বাবা ঢনডনিয়া গ্রামের বড়বাইদ পাড়া এসে বাড়ি করেন। মা আমাকে গর্ভে করে নিয়ে আসেন আমাদের নতুন বাড়িতে। তাই, আমার জন্ম হয়েছে এই গ্রামে আনুমানিক ১৯৫৮ সনে । তখন এটা কালিহাতি থানার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখন এটা পড়েছে সখিপুর উপজেলার অধীন।

বাবাকে দেখেছি ঘনঘন ভিয়াইল যেতে। জিজ্ঞেস করলে বলতেন “তোমার দাদাগো বাড়ি গেছিলাম। তোমার ফুফুগ বাড়ি গেছিলাম।” অল্প বয়সেই আমার দাদী অন্ধ হয়ে যান। আমার দাদার স্বভাবও উড়াটে ধরনের ছিলো। আমার বড় ফুফু খুব বুদ্ধিমতি ছিলেন। অল্প বয়সেই ভাই বোনদের দায়িত্ব নিতে হয় তাকে। আমার বাবা-চাচার একজন নির্ভরযোগ্য বোন ছিলেন আমার বড় ফুফু। তাই তিনি ফুফুর কাছে চলে যেতেন। ফুফুর বিয়েও হয়েছিল ভিয়াইল গ্রামের উত্তর পাড়ার তালুকদার বাড়ি। মফিজ উদ্দিন তালুকদার ছিলেন আমার ফুফা।

বাবা জমিতে ফসল তেমন ফলাতে পারতেন না। তাই, তালুকের জমি বিক্রি করে বাজার সদায় করে খেতেন। বাবার কাছে আমাদের কিছু চাইতে হয়নি। আমাদের যার যখন যা কিছু লাগতো বাবা জমি বেচা টাকা দিয়ে কিনে আনতেন।

বাবা খুব পাড়া পেড়াতেন। খেয়ে কুলি ফেলতেন নওপাড়া গিয়ে। জিতাস্বরি পাড়ার হাতু কাক্কু, দলু তাঐ ও বুর্জু কাক্কুর সাথে বাবার খুব খাতির ছিলো। তারাও বাবার মতো অলস ছিলেন। তাদের সাথেই বেশি সময় কাটাতেন। বর্ষাকালের অর্ধেক সময় নৌকায় কাটাতেন। ভিয়াইলের মধ্য পাড়ার তোমজ বেপারির ছেলে হাসান বেপারি আমাদের দাদা হতেন। আমাদের কাছে হাছেন দাদা নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি তায়েজ উদ্দিন কাক্কুর বাবা। হাছেন দাদা আমাদের খুব আদর করতেন। আমাদের জন্য জিলাপি নিয়ে আসতেন। কিন্তু আমরা তাকে পছন্দ করতাম না। কারন হলো, তিনি বাবাকে আমাদের থেকে নিয়ে যেতেন তার সাথে ব্যবসা করতে। তিনি পাট ও কাঠের ব্যবসা করতেন। তার বিরাট নাও (নৌকা) ছিলো। নাওয়ের সামনের অংশ প্রসস্থ ছিলো। এই অংশে মালামাল বোঝাই করা হতো। পিছনের অংশে ছই ছিল। এই ছইয়ের নিচে বসে হাছেন দাদা, বাবা ও হাছেন দাদার বড় ছেলে কদ্দুস কাক্কু গল্প করতে করতে হুক্কা খেতেন। আমি মাঝে মাঝে এই নায়ে বাবার সাথে ছোট চওনা ঘাট থেকে উঠে ভিয়াইল গিয়েছি। ছোট চওনা ঘাট থেকে গজারি কাঠের গুড়ি অথবা পাট কিনে নায়ে ভরে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে বিক্রি করার উদ্যেশ্যে রওনা দিতেন। চারজন মাল্লায় এই নাও বেয়ে নিতেন। সামনে দুই পাশে দুইজন, পিছনে দুইপাশে দুইজন মাল্লা লগি দিয়ে খোজ দিতেন এক সাথে। ভারী নাও ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতো। বাবা অথবা কদ্দুস কাক্কু পিছনের গলুইয়ে বসে হাল ধরে থাকতেন। আমি বাবার টোনায় বসে বাবার সাথে হাল ধরে মজা পেতাম। খাল ও নদী দিয়ে যাওয়ার সময় মাল্লারা পাড় দিয়ে হেটে হেটে গুন টেনে যেতেন। গুনের কাঠি কাঁধে নিয়ে বাঁকা হয়ে আঁকা বাঁকা শুকনো ও কাঁদা পথে হাটতেন মাল্লারা। তাদের কষ্টের কথা আমি এখনো ভুলতে পারিনি। পথে রাত হয়ে যেতো। হাছেন দাদা মাটির চৌকায় রান্না করতেন। ভাতে বেগুন সিদ্ধ দিয়ে খাস (সরিষা) তেল দিয়ে ভর্তা করতেন। চামারা চাউলের গরম ভাত দিয়ে খেতে কি যে স্বাদ পেতাম! খেয়ে নায়ের গুড়ায় বসে পানিতে প্রশ্রাব করে ছইয়ের নিচে বেতের পাটিতে ঘুমিয়ে পড়তাম। ঘুমের ভিতরেই বাবা আমাকে কোলে নিয়ে নাও থেকে নামিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিতেন।

বাবা যখন নায়ে যেতেন তখন একটানা ১০-১৫ দিন কাটিয়ে আসতেন। ঐসময় আমার মন খারাপ থাকতো। আমি হাছেন দাদার প্রতি বিরক্ত থাকতাম। মাও বিরক্ত হতেন হাছেন দাদাকে দেখে। তিনি বলতেন “অইজে আবার আইছে, তোমার বাবাকে নিয়ে যেতে।” বড় হয়ে আমার হাছেন দাদার প্রতি অভিযোগ ছিলনা। আমি বুঝতে পেরেছি আয় রোজগার করতে বাড়ি ছেড়ে থাকতে হয় অনেকদিন। হাছেন দাদাই ছিলেন বাবার সবচেয়ে ভালো বন্ধু।

বাবাকে বিদায় দেয়ার জন্য মা অনেকদূর পিছে পিছে যেতেন। আমিও মার সাথে গিয়েছি। আমার চোখের পানি গাল বেয়ে পড়তো। বাবা গামছা দিয়ে মুছে দিতেন। কোলে নিয়ে আদর করে বলতেন “বাজান, কাইন্দো না, কয়দিন পরই আই পরমু।” মার কোলে আমাকে বসিয়ে দিয়ে বাবা বুইদ্দাচালার সরু পদ দিয়ে আড়াল হয়ে যেতেন। আমি নিশ্চুপ দাড়িয়ে থাকতাম। চারদিক নিরব হয়ে যেতো। সবুজ গাছের আড়াল থেকে থেকে-থেকে ঘুঘু ডেকে উঠতো। আমার মনে হতো বাবা চলে গেলেন বলেই ঘুঘুরা কাঁদছে। অন্যদিন অত ডাক শুনিনি।

আমার কপালের এক পাশে, গাল ও চোখ সহ প্রতিবছর শীতকালে ব্যাথা করতো। তীব্র ব্যাথা। যন্ত্রনায় কান্না করতাম মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে, কপাল দু’হাতে ধরে। এটাকে বলা হতো আধকপালে মাথার বিষ। আমার কষ্টে বাবাও কষ্ট পেতেন। বাবা বড় চওনা ও কচুয়া হাট থেকে বড়ি এনে দিতেন। পানি দিয়ে খেতাম। কোন কাজ হয়নি। একজন বললেন যে, ভুয়াইদের এক মান্দাই মহিলা কবিরাজ আধকপালে মাথার বিষের চিকিৎসা জানেন। বাবা আমাকে কাঁধে নিয়ে ভুয়াইদ গেলেন। মহিলা বিধান দিলেন “সকালে উদিয়মান সূর্যের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মাটিতে সেজদা দিতে হবে কিছুক্ষণ করে কয়েকদিন।” তাতে কোন কাজ হলো না। ছোট দাদা জয়নাল আবেদীন তালুকদার শুনে বললেন ” মুসলমানের পোলা হয়ে হিন্দু কবিরাজের কথায় সূর্যপূজা করতাছ? বাড়ির পাশেই কবিরাজ থাকতে গেছস ভুয়াইদ! আমিই তো আধকপালে বিষের চিকিৎসা জানি।” এই বলে তিনি গাছান্ত বেটে বটিকা বানিয়ে দিলেন। আমি প্রতিদিন সকালে বিষ ওঠার শুরুতেই ঐ বটিকা খেতাম। ওটা এমন ঝাল লাগতো যে বিষের যন্ত্রনার চেয়ে ঝালের তীব্রতাই বেশি ছিল। দাদার ঔষধ বাদ দিলাম। বাবা খবর পেলেন বাঘেরবাড়িতে একজন আধকপালী মাথা বিষের ভালো কবিরাজ আছেন। বাবা আমাকে পর পর তিন দিন কাঁধে করে নিয়ে গেলেন ঝার ফুক দিতে। কোন কাজ হলো না। প্রতিবছর আমার এমন রোগ হতো। আমি কষ্ট পেতাম। কোন চিকিৎসা নেইনি। মেডিকেল কলেজে ৩য় বর্ষে পড়ার সময় শিখলাম যে ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়াতে এমন কপালের এক পাশে ব্যাথা হয়। এর ঔষধ কি তাও বই পড়ে জেনে নিলাম। আমি নিজের বুদ্ধিতেই ফার্মেসী থেকে ঔষধ কিনে কাউকে না জানিয়ে সকালে খেয়ে নিলাম। শুরু হলো সারা শরীরে তীব্র যন্ত্রণা। বুঝতে পেলাম। ভুল করেছি। ভুল চিকিৎসা করেছি নিজের উপর। অসহ্য যন্ত্রণায় বিছানায় ছটফট করলাম। বিছানা থেকে উঠতে পারলাম না। কাউকে আমার বোকামির কথা বললাম না। মৃত্যুর জন্য প্রস্তত হলাম। কিন্তু আল্লাহ বাচিয়ে দিলেন। এরপর নাক-কান-গলা বিভাগের আউটডোরে মেডিকেল অফিসারকে দেখালাম। তিনি আর এস ডাঃ সিরাজুল আরেফিন স্যারের কাছে রেফার্ড করলেন। তিনি আমার সব ইতিহাস শুনে এবং নাক-কান-গলা দেখে বললেন “তোমার প্রতিবছর শীতকালে সাইনোসাইটিস রোগ হয়। তোমার সাইনোসাইটিস রোগ হয়েছে।” তিনি সাইনোসাইটিস সম্পর্কে বিস্তারিত আমাকে শিখিয়ে দিলেন। তারপর থেকে আমার আর সাইনোসাইটিসের ব্যাথার কষ্ট হয় নি। আলহামদুলিল্লাহ।

বাবা আমাকে প্রথম হাট দেখিয়েছেন। বড় চওনা, কচুয়া, ইন্দ্রজানী, বর্গা ও পলাশতলীর হাট বাবাই আমাকে প্রথম দেখিয়েছেন। বাবার সাথেই আমি প্রথম বাসে উঠি। বাবাই আমাকে প্রথম সিনেমা দেখান। বাবার পেটের নাভীর কাছে ব্যথা করতো। তীব্র ব্যাথায় অনেক রাতে পেট ধরে কাঁদতে দেখেছি। হাট থেকে বোতলের ঔষধ এনে খেতেন। কোন কাজ হতো না। একবার, তখন আমি খুব ছোট, আমি মার সাথে রৌহার মামাবাড়ি ছিলাম। বাবা কোথাও যাচ্ছিলেন। আমি বললাম

– বাবা, কুনু যাবাইন?

– তোমার হাছেন দাদার সাথে সয়ার হাটে যামু। তোমার দাদা একটা গরু কিনবেন।

– আমি যামু।

– দুর আছে। মোটরে চইড়া যাইতে অয়।

– ভোঁ মোটর সাইকলে?

– না, মোটর গাড়িতে।

– আমি মোটরে চরমু।

– এখন না। বড় অইলে নিয়া যামুনি।

– না, আইজকাই যামু।

বলে কান্না শুরু করে দিলাম। বাধ্য হয়ে বাবা আমাকে সাথে নিতে রাজি হলেন। মা আমার গায়ে একটা হাওই শার্ট পরিয়ে দিলেন। কালিহাতির রাজাফৈরের কাছে গেলে ভোম ভোম রকম শব্দ পেলাম। বাবা বললেন “এইটা মোটরের শব্দ।” চামুরিয়া পাড়ি দিলে ফটিকজানি নদীর উপর ব্রিজ দেখিয়ে বললেন “ঐযে দেখ কত বড় পুল।” পুলের উপর তাকাতেই দেখা গেলো বিরাট এক কাছিমের মতো জিনিস পুলের উপর দিয়ে চলে গেলো। আমি বললাম “ওঠা কি গেলো?” বাবা বললেন “ওঠা, প্রাইভেট কার। বড় লোকেরা ওডায় চড়ে।” এরপর বড় একটা কিছু যাচ্ছিল। বললেন “এইডা মোটর গাড়ি।” কালিহাতি বাসস্ট্যান্ডে কিছুক্ষণ দাড়ালে ময়মনসিংহ থেকে একটা মোটর গাড়ি এসে থামলো। কাঠবডি বাস। কাঠের জানালা। সীট খালি নেই। আমরা দাড়িয়েই গেলাম। সয়া গিয়ে নেমে পড়লাম। কালিহাতি ও এলেঙ্গার মাঝামাঝি হলো সয়ার হাট। ঘুরে ঘুরে গরু কিনতে রাত হয়ে গেলো। রাতে আমরা চলে গেলাম বাগুনডালি গ্রামে। সেই গ্রামে একজন কবিরাজ ছিলেন। সেই বাড়ি গিয়ে রাত কাটালাম। কবিরাজ বাবার পেটের ব্যাথার ঔষধ দিলেন। ঔষধ দেখতে লোহার করাতের গুড়ার মতো। খেলে ব্যাথা ভালো হয়। পরেরদিন সকালে ঐ বাড়িতে নাসতা করে আমরা পা পথে গরু নিয়ে ভিয়াইল চলে আসি। সেই ঔষধ খেয়ে বাবা ভালো থাকতেন। এরপরও কয়েকবার বাবা সেই ঔষধ এনে সেবন করেছেন। কিন্তু ঔষধের দাম খুব বেশি ছিল। আমি এখন মনে করি ওগুলো আসলেই করাতের গুড়া। করাতে থাকে এলুমিনিয়াম। এই এলুমিনিয়াম পাকস্থলির হাইড্রোক্লোরিক এসিডের সাথে বিক্রিয়া করে এসিডকে নিউট্রাল করে দিয়ে পেট ব্যাথা তথা পেপ্টিক আলসার ভালো করে। বাবা এরপর খোঁজ পান খাওয়ার সোডা বেকিং পাউডার। বাবা বেকিং পাউডার খেয়ে পেপ্টিক আলসারের ব্যাথা থেকে উপসম হতেন। আমি ডাক্তার হবার পর আর বাবাকে বেকিং পাউডার খেতে হয় নি।

বাবা আমাকে কোনদিন কোন কাজ করতে বলেন নি। বাবা না বললেও আমি সংসারের অনেক কাজ করেছি। বাবা আমাকে কোনদিন পড়তে বলেননি। কারন, তিনি জানতেন সাদেককে পড়তে বলতে হবে না। আল্লাহ সাদেককে ও গুণটি দিয়েই তৈরি করেছেন। আমি যখন দোয়াত জ্বালিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত পড়তাম বাবা আমার পাশেই শুয়ে শুয়ে মশা মেরে দিতেন এবং বিচুন দিয়ে বাতাস দিতেন। পিঠে হাত বুলিয়ে দিতেন। প্রাইমারির পড়া বুঝিয়ে দিতেন। বাবার অনেক বিষয়ে ভালো সাধারণ জ্ঞান ছিলো। তিনি কোন নিতিকথা শিখাননি। কারন, তার বিশ্বাস ছিল সাদেক কোন অনৈতিক কাজ করতে পারে না।

১৯৭৯ সনে যখন মা মারা যান তখন বাবার বয়স হয়তো ৫৫ বছর। ঘটকরা চেষ্টা করেছিলেন বাবাকে পুনরায় বিয়ে করিয়ে দিতে। আমি তখন এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। আমরা বিয়ের ব্যাপারে হা না কিছু বলিনি। বাবা বিবেচনা করে দেখেছেন যে সংসারের আমাদের নতুন মা এলে আমাদের শান্তি বিগ্নিত হতে পারে। তাই তিনি ধৈর্য ধরেন।

আমি ডাক্তার হবার পর বাবাকে সতর্ক করে দেই যে এখন থেকে তিনি জমি বিক্রি করে খেতে পারবেন না। আমি সংসারের জন্য যতটুকু পারি করে যাবো। তারপর থেকে তিনি আর জমি বিক্রি করেননি। তিনি ঘনঘন জ্বরে আক্রান্ত হতেন। আমি তখন আমার এম ফিল কোর্সের পড়া নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। বাবার জন্য সময় দিতে পারিনি। এম ফিল শেষ করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে যোগদান করে বাবাকে আমার বাসায় রাখলাম। কিন্তু আমার মনে হয়েছে বাবাকে জেল খানায় বন্দী করে রেখেছি। বাবার সাথে সময় দেয়ার কেউ ছিল না। বাবা ঘনঘন বাড়ি চলে যেতেন। আমি বুঝতে পারি বাবা এখন গ্রামময় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বন্ধুদের সাথে গুপ ছেড়ে হেসে হেসে গল্প করছেন। তাই আমি শহরে এসে থাকতে বাবাকে পিড়াপিড়ি করিনি।

২০০১ সনের দিকে বাবা খুব বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দেখানো হয়। পরীক্ষা করে দেখা যায় বাবার প্যানসাইটোপেনিয়া আছে। অর্থাৎ সব রক্তকণিকা কম আছে। এজন্যই ঘনঘন ইনফেকশন হয়। ইনফেকশনের জন্যই জ্বর হয়। বাবাকে অনেকদিন হাসপাতালে ভর্তি রাখতে হয়। ভাতিজা আব্দুল মান্নান তালুকদার তখন কলেজে পড়তো। ওর পড়াশোনা ক্ষতি করে বাবার সাথে থাকে অনেক দিন। এরপর ধরা পড়লো বাবার লিভারে সিরোসিস হয়েছে। এরোগ ভালো হবার নয়। ৭৫ বছর বয়সে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করাও ঠিক হবে না মনে করলাম। যতটুকু সম্ভব সাধারণভাবে চিকিৎসা করে যেতে লাগলাম। বাবার ইচ্ছে অনুযায়ী বাড়িতে রাখলাম। সুবিধা ছিল, ভাই, ভাবী, মান্নান ও আফ্রোজা বাবার ঠিকমতো যত্ন নিতে পারবেন নিজ বাড়িতে। তখন ছিল অক্টোবর মাস। আবহাওয়া ছিল দুর্যোগপূর্ণ। বাড়ির চারিদিকে ছিল কাদা আর কাদা। এমন একটি দিনে ২০০১ সনের ২০ অক্টোবর বাবার ইন্তেকালের সংবাদ পেলাম। কার নিয়ে ছুটে গেলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। দুই কিলোমিটার দুরে পাকা রাস্তায় নেমে কর্দমাক্ত রাস্তা দিয়ে হেটে গিয়ে বাবার মৃতদেহের কাছে উপস্থিত হলাম। দেখলাম আমার নিস্পাপ বড় ভাই আকবর হোসেন তালুকদার বাবার কাছে বসে বাবার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। আনুমানিক ৭৫ বছর বয়সে বাবা চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। বাবাকে ছেড়ে মা চলে গিয়েছেন পরপারে ২০ বছর আগে। আল্লাহ আমার ধৈর্যশীল বাবার জন্য বেহেস্ত নসীব করুন।

১৫/৪/২০২০ খ্রি.

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

#memoryofsadequel

kathal churi

কাঁঠাল চুরি

(স্মৃতি কথা)

তখন ক্লাস ওয়ান বা টুতে পড়তাম। তখন আম-কাঁঠাল গাছ তেমন বেশী ছিলো না। যেহেতু, তালুকদারদের মধ্যে মেঝ দাদা মেছের আলী তালুকদার প্রথম এই গ্রামে এসে বাড়ি করেছিলেন সেহেতু দাদাদের গাছগুলো তুলনামূলক বড় ছিলো। কি কারনে যেন আমরা মেছের দাদার স্ত্রী, যিনি আমাদের দাদী হন তাকে সব নাতী নাত্নিরা বাব্বু ডাকতাম। বাব্বু আমার বাবার আপন চাচী। মুকুলের আপন দাদী। দাদুদের গাছগুলো প্র‍্থম দিকে বাব্বুই লাগিয়েছিলেন। তাই, গাছগুলোর নাম বাব্বুর নামে হয়েছে। যেমন, বাব্বুর কাঁঠাল গাছ, বাব্বুর আম গাছ। বাব্বুর কাঁঠাল গাছটা ছিল বাব্বুগ ঘরের পিছে, বাঁশ আড়ার সাথে । তাই কাঠাল চুরি করা সহজ ছিলো।

এই কাঁঠাল পাকলে হয় জুম্মাঘরে দেয়া হবে শুক্রবারে। না হয় ভেঙ্গে বাব্বু মুকুলকে খাইয়ে দিবে। না হয় বাটি ভর্তি রোয়া নিয়ে ছোট কাক্কুর হাতে দিবে। এটাই ছিলো আমাদের ধারণা। শাজাহান, রাজ্জাক, মুকুল ও আমি সাধারণত এক সাথে পাড়াময় ঘুরে বেড়াতাম। বাব্বু মুকুলকে খুব আদর করতেন এবং চোখে চোখে রাখতেন। আমরা মুকুলকে নিয়ে যেদিকে যেতাম, বাব্বুও সেদিকে যেতেন। কাঁঠালটা বড় হলে পাকলো কিনা জানার জন্য পাজুন (গরু পিটানোর লাঠি) দিয়ে বারি দিতাম প্রতিদিন একবার করে। একসময় পাকার জন্য আর ধৈর্য্য ধরে না। সিদ্ধান্ত নিলাম পেড়ে মুখে কচি ঠুকায়ে পাঁকাবো। তাতে তো আমাদের লাভ হবে না। মুকুল একা খেতে পারবে, আমরা পারবো না। তিনজনে সিদ্ধান্ত নিলাম মুকুলকে সাথে নিয়ে এই কাঁঠাল চুরি করবো। তাতে ধরা পরলে মুকুল সাথে থাকলে কেউ চোর বলতে পারবে না। সেই মতো একদিন আমরা কাঠালটা ঝেংটা টান মেরে পেড়ে বাঁশ আড়ার ভিতর দিয়ে লুকিয়ে এক দৌড়ে ঘোনা পার হয়ে বুইদ্যা চালার জঙ্গলে লুকিয়ে পড়লাম। কোদাল দিয়ে মাটি কেটে গর্তে কাঠাল রেখে মাটি দিয়ে ঢেকে ফেললাম। তারপর ৪ চোর মিলে বুইদ্যা চালার মাঝখানে যেখানে বন ছিলনা সেখানে বসে শলাপরামর্শ করলাম কিভাবে ফলোআপ দিতে হবে। সিদ্ধান্ত হলো সব চোর একাত্র হয়ে প্রতিদিন একবার করে কাঁঠাল দেখে যাব। একটা আসংকা ছিলো যে কাঁঠাল পেকে গেলে আড়ার শিয়াল মাটি থেকে কাঁঠাল তুলে খেয়ে ফেলবে। তাই রাতে হুয়া হুয়া করে শিয়াল ডাকলে মনে করতাম কাঁঠালটা খেয়ে শিয়াল আনন্দ করছে। কাঁঠাল দেখতে যাওয়ার আগে আমরা একে অন্যকে ডাকতাম। সিদ্ধান্ত হয়েছিলো যে “ঠাল” বললে মনে করবো ঐ চুরি করা কাঠাল।

in-feed-ads:

একদিন আমি শাজাহানকে ডাকলাম “এই শাজাহান, ঠাল।” অন্যরাও বলে উঠলো “ঠাল।” সেখানে কয়েকজন মুরুব্বিও ছিলেন। মোতালেব ভাই বললেন “কি ব্যাপার? কিসের ঠাল?” আমি বললাম “এটা আপনি বুঝবেন না। এটা আমাদের সাংকেতিক ভাষা।” ভাই বললেন “বুঝব না মানে? কাঁঠাল চুরি করছস। এখন কাঁঠালকে বলছস ঠাল। তাই না?” আমরা বললাম “তা না।” তাড়াতাড়ি সরে পড়লাম জেড়ার হাত থেকে। পরামর্শ করলাম এখন থেকে ঠাল বলা যাবে না। বলবো লঠাকা। রাজ্জাক বললো “এটা বললে আবার ধরা খাবা। বাশার ভাই বানান উল্টো করে কথা বলতে পারে। বুঝে ফেলবেন লঠাকা মানে কাঠাল।” চুরি নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলাম। ঐদিন আর ফলোআপ দিতে গেলাম না। পরেরদিন গিয়ে দেখি শিয়ালে কাঁঠাল খেয়ে মাটির সাথে চেড়াবেড়া করে রেখে গেছে। কেইত্তা দেখে মনে হলো বাত্তি হইছিলো না। আমরা খেলে হয়তো পাইনছা লাগতো। যাহোক, চুরিটা সাকসেসফুল হলো না।

বড় হয়ে বুঝেছি, ওটা চুরি ছিলো না। দাদীর গাছের কাঁঠাল চুরি করে খেলে সেটা চুরি হয় না। চুরি করে খেয়েছে শিয়ালে।

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১১ অক্টোবর ২০২২

ময়মনসিংহ

#memoryofsadequel

Khuingar Chala

খুইংগার চালা

গত দুই বছর আগে ইন্দ্রজানী হাট নিয়ে ফেসবুকে একটা গল্প লিখেছিলাম। সে গল্প পড়ে একজন পাঠক আমাকে অনুরোধ করেছিলেন তাদের খুইংগার চালা নিয়ে একটা গল্প লিখতে। গল্পটা ছিল স্মৃতিচারণমূলক। স্মৃতিচারণমূলক গল্প কেউ লিখতে বললে আমি লিখতে পারি না। আমার মাথায় যখন স্মৃতিচারণ খেলতে থাকে তখন আমি স্মৃতিচারণমূলক গল্প লিখি। তাই খুইংগার চালা নিয়ে এখনো কোনো গল্প লেখা হয় নি আমার। গতকাল দুপুরে খাবার সময় মোবাইলে একটা কল আসে। আমি সাধারণত মোবাইলে খাবার সময় কল ধরি না। মোবাইল স্ক্রিনে ‘নূর-ই-আলম খুইংগার চালা’ নামটা দেখে মোবাইলটা আমি রিসিভ করলাম । কথা শেষে স্বপ্না জিজ্ঞেস করলো

– কে ফোন করেছিল? তুমিতো সাধারণত খাবার সময় ফোন ধর না।

– নূর-ই-আজম ফোন করেছিল। রোগী নিয়ে আসবে।

– নূর-ই-আজম কে?

– খুইংগার চালার।

– খুইংগার চালা? খুইংগার চালা আবার কেমন নাম? খুইংগার মানে কি?

আমি স্বপ্নাকে খুইংগা কথাটার মানে ভালো করে বুঝিয়ে দিলাম। এরপর থেকে আমার ইচ্ছা হল খুইংগার চালা নিয়ে কিছু একটা লিখি। তাই আজ দুপুরে খাবার পর শুয়ে শুয়ে খুইংগার চালা নিয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করলাম।

খুইংগার চালা নিয়ে আমার তেমন কোন স্মৃতি নেই। তবে আমি একবার খুইংগার চালায় গিয়েছিলাম । আমার চাচাতো ভাই ইখতিয়ার উদ্দিন (বাশার ভাই)পাকিস্তান আমলে এস এস সি পাশ করে খুইংগার চালা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি নেন। আমি তখন ক্লাস থ্রিতে পড়তাম। যেহেতু এটা স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে তাই আমাদের দেশের নাম ছিল পাকিস্তান। এই পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস ছিল ১৪ ই আগস্ট। আমি স্বাধীনতা দিবস পালন করতে বাশার ভাইর সাথে খুইংগার চালা প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে যাই। মাঠটা ছিল অনেক বড়। অনেক খেলাধুলা হয়েছিল সেদিন। ওই বিরাট মাঠে ঘোড়দৌড়েরও ব্যবস্থা করা হয়েছিল। খুবই উপভোগ্য ছিল সেই ঘোড় দৌড়। যে ঘোড়াটি প্রথম স্থান অধিকার করেছিল সেই ঘোড়ার সওয়ার ছিল মাত্র ৭-৮ বছরের একটি ছেলে। ছেলেটির গা ছিল খালি। ভাঁজ করে লুঙ্গি পড়েছিল। আমরা পাহাড়িয়া পোলারা অনেকেউ ভাঁজ করে লুঙ্গি পড়তাম বাইটা বাছ্রার ভয়ে। লুঙ্গির নিচের অংশে মাঠের বাইটা বাছ্রা ছেঁকে ধরতো। তাই হাটু পর্যন্ত ভাঁজ করে লুঙ্গি পড়তে হতো। কিন্তু ওই ছেলেটি বাইটা বাছ্রার ভয়ে লুঙ্গি ভাঁজ করে পরে নি। সে পরেছিল ঘোড়া চালনার সুবিধার্তে। ঘোড়দৌড়ের সময় তাঁর ঘোড়াটি যেন উড়ে উড়ে চলছিল। সে ঘোড়ার লাগাম ধরে রেখেছিল। ঘোড়ার পিঠের উপর সে ছুটে ছুটে পড়ছিল। এই সময় তার লুঙ্গি উপর দিকে একবার উড়ছিল আর নামছিল। দর্শকরা দুই কারণে আনন্দ পাচ্ছিল। এক নাম্বার আনন্দ ছিল ঘোড়ার দৌড় দেখার আনন্দ। তুই নাম্বার আনন্দের কারন ছিল বাচ্চাদের জন্য। এটা ছিল ছেলের লুঙ্গি উড়ার আনন্দ। লুঙ্গি উড়ার সময় ছেলেটি বেআব্রু হয়ে যাচ্ছিল। তাই বাচ্চারা আনন্দ পাচ্ছিল। আমিও কিন্তু তখন বাচ্চাই ছিলাম। তাই, আমি দুই কারনে আনন্দ পেয়েছিলাম। আরেকটি আনন্দের খেলা ছিল লাঠিবাড়ি খেলা। খুবই চমৎকার ছিল সেই লাঠিয়ালদের লাঠি বাড়ি খেলা। সারাদিন খেলাধুলার আনন্দ উপভোগ করে রাতে বাশার ভাইর সাথে বাড়িতে ফিরি। আমার সাথে মজিবর ভাইও সেদিন গিয়েছিলেন খুইংগার চালা। সাড়াসিয়া বেসরকারি প্রাইমারি স্কুলটি যখন সরকারিকরণ করা হয় তখন বাশার ভাই সাড়াসিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। এটা খুব সম্ভব স্বাধীনতা যুদ্ধের আগেই।

Read more

আপনাদের কিন্তু এখনো খুইংগার কথাটার মানে বোঝানো হয়নি। গাছের ভিতর যদি কোনো কারণে গর্ত থাকে সেটাকে বলা হয় খুং বা খোং। আপনারা বলেন গাছের কোটর। ছোট বেলায় আমরা পড়েছি “আদিম যুগের মানুষ গাছের কোটরে বাস করতো।” সে কোটরকেই আমরা বলতাম খোং। সাধারণত পুরাতন বা বৃদ্ধ গাছে খোং তৈরি হয়। খাঠখোকড়া পাখি ঠুকড়িয়ে গাছে খোং তৈরি করে খোংগের ভিতর বাসা বানায় । গাছের কোন অংশ পঁচে গিয়েও খোং তৈরি হতে পারে। খোং যে কারনেই তৈরি হোক না কেন অনেক প্রকার পাখি এসব খোংগে বাসা বানায়। কাঠঠোকড়া, টিয়া, দোয়েল, ভুতুম পেঁচা ইত্যাদি পাখি খোংগের ভিতর বাসা বানায়। আমি গাছে উঠে খোংগের ভিতর উঁকি দিয়ে পাখির বাসা দেখতাম। ডিম পাড়া থেকে শুরু করে বাচ্চা তোলানো পর্যন্ত প্রতিটি পর্ব আমি পর্যবেক্ষণ করতাম। কোন পাখির ডিম কত দিনে ফোটে তা আমার জানা হয়ে গিয়েছিল। গিরিকিটি বা কক্কে সাপও খোংগে থাকতো। আমাদের বাড়ির উত্তর পাশে একটা অশথ্ব গাছ ছিল। আমরা বলতাম বটগাছ। সেই গাছে অসংখ্য খোং ছিল। সেই খোংগেও অনেক পাখি বাসা করতো। সন্ধায় বড় ভুতুম পাখি ডাকতো “ভুত ভুতুম, ভুতুম।” ছোট ভুতুম পেঁচা ডাকতো “কেচরমেচর” করে। পাখির কাছে গেলে কুতকুতি চেয়ে থেকে ভয় দেখাতো। বেলা ডোবার পর কক্কে সাপ ডেকে উঠতো “কক্কে কক্কে বলে। ” শুনেছি কক্কে সাপের যত বয়স ততবার কক্কে কথাটি উচ্চারণ করে ডাকার সময়। যেমন, যেটার বয়স তিন বছর সেটা ডাকতো তিন বার কক্কে কক্কে কক্কে বলে। একেক কক্কে একেক নির্দিষ্ট সময় দিনে-রাতে মাত্র একবার ডেকে উঠতো।

খোংগের ভিতর মৌমাছিও বাসা বানায়। আমরা বলতাম খুইংগা চাইক (চাক)। এই মৌমাছি আলাদা প্রজাতির মৌমাছি। এরা গাছের ডালে বসে না। এরা চাক বানায় গাছের খোংগে অথবা উলুর টিকরে। উইপোকাকে আমরা বলতাম উলু পোকা। পুরাতন গাছ মাটির উপর বরাবর কেটে ফেললে তার সাথে উইপোকা বাসা বেধেঁ মাটি তুলে ডিবির মতো করে ফেলে। তখন ছোটখাটো পাহারের মতো মনে হয়। এগুলোকে আমরা বলতাম উলুর টিকর। একসময় পাখা গজার পর সব উলু আকাশে উড়ে যেতো। চৈত্র মাসে সন্ধার সময় গজারির মরা পাতায় আগুন দিলে সেই আগুনের উপর উলু ঝাকে ঝাকে উড়ে এসে পড়ে পুড়ে যেতো। তাই বলা হয় “পীপিলিকার পাখা গজায় মরিবার কালে।” উলুও এক প্রকার পীপিলিকা। উলু বাসা ছেড়ে চলে গেলে সেই খোংগে খুইংগা চাক বসত। মনো ভাইদের বাড়ির পিছনের আড়ায় (জংলায়) একটা উলুর টিকর ছিলো। সেই টিকরে প্রতি বছর খুইংগা চাক বসতো। খুইংগা চাকের মৌমাছি সাধারণত কামড়ায় না। আমি খোংগে হাত দিয়ে আসতে করে মৌমাছি চাক থেতে সরিয়ে পাঠশোলা (স্ট্র) দিয়ে টেনে টেনে মধু খেতাম। আমার সাথে একদিন মুকুলও গিয়েছিল মধু খেতে। মৌমাছি কি মনে করে যেনো মুকুলের কঁচি কানের লতিতে হুল ফুটিয়ে বসে। মুকুল আমার চেয়েও তিন বছরের ছোট। মুকুল বিষে কান্না শুরু করে। আমি মুখ চেপে কান্না বন্ধ করে দেই। কারন, মনো ভাই টের পেলে খবর ছিল।

যেসব গাছে বেশি বেশি খোং থাকতো সেসব গাছকে খুইংগা গাছ বলা হতো। যেসব কাঠালের গায়ে গর্ত গর্ত থাকতো সেসব কাঠালকে খুইংগা কাঠাল বলা হতো। আমাদের বাড়ির পশ্চিম পাশে একটা কাঠাল গাছ ছিল। সেই গাছের কাঠাল খুইংগা ছিল। তাই, সেই গাছকে খুইংগা গাছ বলা হতো। খুইংগা হলেও কাঠাল খুব স্বাদের ছিলো।

খুইংগার চালা গ্রামের নাম কেন খুইংগার চালা হয়েছে তা আমার জানা নেই। চালা হলো উচু ভুমি। খুইংগার চালা আমি দেখেছি একটু উচু ভুমি। খুব সম্ভব এই উচু ভুমিতে আগের দিনে অনেক খুইংগা গাছ ছিলো। তাই হয়ত খুইংগার চালা নাম হয়েছে। আপনার কি মনে হয়?

২৮/৩/২০২০ খ্রি.