তিন চাচী ও কিছু আপনজনের স্মরণে

তিন চাচী ও কিছু আপনজনের স্মরণে

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমার সবচেয়ে কাছের চাচী এবার মারা গেলেন। তাও আবার করোনাকালে। জানাজায় যেতে পারলাম না। এক বছরের মধ্যে তিন চাচী মারা গেলেন। এবার আরও অনেকজন আত্নীয় ও প্রিয়জন মারা গেছেন। তবে আজ আমি বিশেষ করে আমার মার ঘনিষ্ঠ বন্ধবী যে চাচী ছিলেন তাকে নিয়ে কিছু কথা লিখবো। তিনি হাছেন কাক্কুর স্ত্রী, হবির মা, মামুনের দাদী।

 

এবার করোনায় আমার খুব কাছের বড় ভাই, ৫ বছরের সিনিয়র, এম-১২ নং ব্যাচের প্রফেসর আনিসুর রহমান ভাই মারা যান করোনা হয়ে করোনার প্রথম দিকেই। তারপর মারা যান আমার ৪ বছরের সিনিয়র রাজু ভাই। একই হোস্টেলে থাকতাম। টাঙ্গাইলের রাজু ভাই। তিতাসের এম ডি না কি যেনো ছিলেন। করোনা হয়ে মারা গেলেন। আমারই ক্লাস মেট এম-১৭ ব্যাচের বন্ধু জহিরও মারা গেলো করোনা হয়ে। এক বছরের সিনিয়র, কচুয়ার আব্দুল্লাহ স্যারের ছেলে সাইফুল ভাইও এবার মারা গেলেন করোনা হয়ে। কতো যে ভালো বাসতেন আমাকে! আমাদের মুকুল যে হার্ট এটাক হয়ে মারা গেলো তারও কিন্তু প্রথম করোনা হয়েছিলো। করোনা নেগেটিভ হওয়ার কিছুদিন পর তার হার্ট এটাক করে। করোনায় এমন অনেক আপন জন মারা গেছে। মকুল মারা যাবার মাত্র ৪ দিন আগে আমার আরেক প্রিয় চাচাতো ভাই সাইফুলও মারা গেলো রক্তশুন্যতা হয়ে। এক বছর ধরে বার বার মৃত্যু সংবাদ শুনতে হয়েছে আমাকে।

 

তালুকদার বাড়ির সবার বড় বোন নূরজাহান বুবুর স্বামী, আমাদের প্রথম দুলাভাই ছোট চওনার মজিবুর রহমান, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আমাদের কাকরাজান ইউনিয়ন পরিষদ, মারা গেলেন এই বছরের প্রথম দিকেই। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। নুরজাহান বুবুর ছোট বোন হলো নাজমা। তার স্বামী হাতেম খাও মারা গেলো গত ঈদুল ফিতরের পর। আমার সাথে তার বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিলো। আমার আপন চাচা ভিয়াইল থাকতেন। তার মেয়ে, আমার চাচাতো বোন শেফালী অল্প বয়সেই বিয়ে হয়েছিল আমি যখন ক্লাস সিক্স বা সেভেনে পড়তাম। সে আমার থেকে অল্পদিনের ছোট ছিলো। দূরে থাকার জন্য তাকে আর বেশী দেখিনি। এবার ময়মনসিংহ আসে অসুস্থ হয়ে। চিকিৎসায় ভালো হয়ে যায়। অল্প কিছুদিন পরই আবার আসে স্ট্রোক করে অজ্ঞান হয়ে। এসে মারাই গেলো আমার চোখের সামনে।

 

এই এক বছরের মধ্যে তিন চাচী মারা গেলেন। আমরা চাচাকে কাক্কু ও চাচীকে কাক্কি ডাকি। আবুল কাশেম তালুকদার যাকে আমরা মিয়া কাক্কু ডাকতাম তার স্ত্রী, মানে কাদেরের মা এই এক বছরের মধ্যেই মারা গেছেন স্ট্রোক করে। খুব হাসি খুশি ছিলেন সেই কাক্কি। আমরা ডাকতাম নয়া কাক্কি বলে। কাক্কির বড় বোন ছিলেন কুলসুম বুবুর মা। কুলসুম বুবুর জন্মের পরই সেই কাক্কি মারা গেলে সেই কাক্কির ছোট বোনকে মিয়া কাক্কু বিয়ে করেন। তাই নয়া কাক্কি ডাকা হতো। তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমাদের কাছে নয়া কাক্কিই ছিলেন। কাক্কি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। আমি কাক্কিকে কারো সাথে রাগারাগি করতে দেখিনি। নয়া কাক্কির বড় ছেলে শাজাহানের বয়স ছিল আমার থেকে সামান্য বেশী। আমার নিত্যদিনের খেলার সাথী ছিল সে। সেও ট্রাক্টর এক্সিডেন্টে মারা গেছে আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়তাম, সেই ১৯৭৩ সনে। খেলার সাথীর মা হওয়াতে কাক্কিও আমাকে অনেক স্নেহ করতেন। কাক্কির বাবার বাড়ি ছিলো মাইজবাড়ি। কাক্কির বাবার নাম ছিলো ঠান্ডু। আমরা কাক্কিকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতাম “আইজকা খুব ঠন্ডা নাগতাছে ।” কাক্কি মনে করতেন কাক্কির বাপের নামকে ব্যাঙ্গ করা হচ্ছে । কাক্কি “এই জাউরা” বলে হেসে হেসে ঢলে পড়তেন। কাক্কির এই হাসিটা দেখার জন্য ঠান্ডা কথাটা উচ্চারণ করতাম। কাক্কির হাসি যদি কেউ দেখতো অনেক্ষণ পর্যন্ত মন ভালো থাকতো তার। কাক্কির উদরের বড় ছেলে শাজাহানের খেলার সাথী ছিলাম বলেও কাক্কির বেশী বেশী আদর পেয়েছি। মারা যাওয়ার প্রায় এক বছর আগে কাক্কির সাথে একটা ছবি তুলেছিলাম। কাক্কিদের ঘরের সামনের সিড়ির সাথে কংক্রিটের বেঞ্চিতে মাঝখানে আমি বসেছিলাম। আমার দু’পাশে দুই কাক্কি হবির মা কাক্কি আর নয়া কাক্কি বসেছিলেন। দু’জনেই খুশী খুশী ছিলেন ছবি তোলার সময়। এমন একটা ভালো কাক্কি এক বছরের মধ্যেই চলে গিয়েছেন পরপারে।

 

আমাদের তালুকদার বাড়ির সবচেয়ে বড় চাচী, সোলায়মান তালুকদার মাস্টারের স্ত্রী, রাজ্জাকের মা মারা গেছেন সম্ভবত এ বছর জানুয়ারির দিকেই। এই কাক্কির বাপের বাড়ি ছিল গোহাইল বাড়ি। নানার নাম ছিল খুব সম্ভব চান মামুদ। আমরা কাক্কিকে কোন কোন সময় ঠাট্টা করে চান্দের মেয়া বলতাম। কাক্কির উদরের বড় ছেলে রাজ্জাক আমার থেকে বয়সে সামান্য ছোট। একসাথে খেলতাম, একসাথে বেড়াতাম, একসাথে স্কুলে যেতাম। প্রথম দিকে খেলার সাথী ছিল মজি ভাই, শাজাহান ও রাজ্জাক। তারপর মুকুল তারাতারি বড় হয়ে গেলে সেও খেলার সাথী হয়ে যায়। রাজ্জাককে যখন কাক্কি খাওয়াতেন তখন আমি রান্নাঘরের ঢেকির উপর বসে অপেক্ষা করতাম। খাওয়া শেষ হলেই খেলতে চলে যেতাম। রাজ্জাকের খেলার সাথী হিসাবে কাক্কি আমাকেও খুব স্নেহ করতেন। আদর করে গেঁদা ডাকতেন আমাকে। কাক্কির সারা শরীরে লাল লাল চাক্কা দাউদ ছিলো। সারাক্ষণ চুলকাতেন। গরমের দিনে বেশী হতো। হাতের নোখেও ছিলো। কাক্কির এই সমস্যার জন্য আমার কাক্কির জন্য কষ্ট হতো। এটাতে কাক্কি টোটকা মলম টলম লাগাতেন। কিন্তু নিচুইটা ভালো হতো না। আমি ডাক্তার হয়ে প্রথম চিকিৎসা করেছি কাক্কির এই দাউদ। আমি একটানা দেড় মাস কাক্কিকে ঔষধ খাইয়েছি। দাউদ ভালো হয়ে যায়। চান্দের মেয়ে চান্দের মতোই চেহারা ছিলো। দাউদ পরিস্কার হয়ে চান্দের মতোই হয়ে যায়। কাক্কি খুব খুশী হন। আমি চিকিৎসা করে খুব তৃপ্তি পাই। কাক্কি হজ্জ করেছিলেন। হজ্জের অভিজ্ঞতা অনেক শেয়ার করেছেন আমাদের কাছে। কাক্কির সন্তানরা সবাই শহরে সেটলড হয়েছেন। তাই বাড়িও নেই গ্রামে। এসে যখন এবাড়ি ওবাড়ি বেড়াতেন আমার খুব খারাপ লাগতো। এই চাচী এই তালুকদার বাড়ির বড় বউ ছিলেন। সেই চাচীও এবার স্ট্রোক করে মার গেলেন ।

হাছেন কাক্কুর শশুর বাড়ি বড় চওনা চৌধুরী বাড়ি। কাক্কির বাবার ডাক নাম ছিলো সোনাউল্লাহ চৌধুরী। কাক্কির প্রথম মেয়ের নাম ছিলো হাজেরা। আমি হাজেরা বুবুকে দেখেনি। আমাদের লাইলি বুবুর সমান বয়স ছিলো। এখনো বুবু বলেন হাজরাগ বাড়ি গেলাম। হাজরা বুবুর পর ভানু বুবু। তারপর মজি ভাই। তারপর মনো। আমি মজিভাইর ছোট ও মনোর বড়। আমরা দল বেঁধে মজি ভাইগ ঘরে পলান পলান খেলতাম। তখন পাঁচ কাক্কু একই বাড়িতে থাকতেন। মাঝখানে ছিলো বিরাট উঠান। কাক্কুরা যার যার ঘরের সামনে বসে ফজরের নামাজ পড়ে উচ্চস্বরে কোরআন পরতেন। কাক্কিগ উগারের মাঝখানে একটা গোল প্রবেশ পথ ছিল। এখানে পলায়ে টুক্কু দিতাম। ডোলের ভেতর পালিয়েও টুক্কু দিতাম। কাক্কির রাইংগভর্তি পাকা কলা ছিল। একদিন আমরা পলান পলান খেলার সময় ডোলের ভেতর বসে সব কলা খেয়ে ফেলেছিলাম। জেনেও কাক্কি বেজার হননি। কাক্কির চেহারা আর আমগ মার চেহারা খুবই সুন্দর ছিলো। দু’জনের মধ্যে খুবই খাতির ছিলো। মা সময় পেলে কাক্কির রান্নাঘরে বসে আলাপ করতেন। কাক্কির সময় হলে মার সাথে আমাদের রান্নাঘরে বসে বসে আলাপ করতেন। হাছেন কাক্কু বাবার থেকে সামান্য বয়সে বড়। তাই, কাক্কিকে মা বুঝি ডাকতেন। কাক্কি মাকে ডাকতেন নাইলির মাও বলে। বাবাকে ডাকতেন নাইলির বাপ বলে।

 

আমার যেবছর মুসলমানী হয় সে বছর আমার নিজের নানী মারা যান মুসলমানীর দু’এক দিন পরই। মা আমাকে রেখে রৌহা নানীগ বাড়ি চলে যান। বাড়িতে ছিলাম আমি আর বাবা। বাবার রান্না করার কোন অভিজ্ঞতা ছিলো না। ভর্তাভাত রান্না করতে পারতেন। আমি আবার ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে পারতাম না। তাই বাবা ক্ষেত থেকে বেগুন তুলে লম্বা করে কেটে লবন পানি দিয়ে সেদ্ধ করেছিলেন ছালুন হিসাবে। কারন, ছালুন হলে সামান্য চারটে ভাত খেতে পারতাম। এমন সময় কাক্কি এলেন আমাদের রান্না ঘরে। চুলার পারে গিয়ে “দেখি, নাইলির বাপে কি রানছে” বলে পাইলচাপনি উচু করে ছালুন দেখে মুসকি হাসলেন। বললেন “এইডা ছালুন অইছে? মনে অইতাছে বেগুন সিদ্ধ।” বাবা বললেন “সাদেক ছালুন ছাড়া খেতে পারে না, তাই বেগুনের ঝোল রানছি।” কাক্কি ওর মধ্যে কিছু মসলা মিশিয়ে ছালুন রেঁধে দিলেন। এরপর বুবু এলেন তার শশুরবাড়ি আমজানি থেকে। বুবুই রান্না করে দিলেন ছালুন। মুসলমানী করার সাত দিনের দিন গোসল করানো হয় বিয়ের গায়ে হলুদের মতো আনন্দ করে। বুবু ও কাক্কি আমাকে কাপড় কাঁচার ফিড়াতে (পিড়ি) দাঁড় করিয়ে গোসল করালেন। অন্যান্য বাড়িতে মুসলমানীর ৭ দিনের দিন খুব আনন্দ ফুর্তি হতো। গ্রামোফোন রেকর্ডের গান মাইকে বাজানো হতো। কিন্তু তালুকদার বাড়িতে এসব নিষেদ ছিল। মুসলমানির উৎসবে অন্যরা বিভিন্ন রকম উপহার সামগ্রি দিতো। আমাদের বাড়িতে উৎসব না হলেও বুবু আমাকে গোসল করায়ে একটি কাশার গ্লাস উপহার দেন। সেই কাশার গ্লাসটি অনেক বছর আমাদের বাড়িতে ছিলো। আমি কাশার গ্লাসে পানি খেতাম না। আমি পানি খেতাম ফটিকের গ্লাসে। কাঁচের গ্লাসকে আমরা ফটিকের গ্লাস বলতাম। খুব সম্ভব স্ফটিক থেকে ফটিক হয়েছে। যখন গ্রামে বিদ্যুৎ ছিলো না তখন ইসতিরির ভেতর কয়লা জালিয়ে ইসতিরি গরম করা হতো। আমি জলন্ত কয়লা আমার সেই কাশার গ্লাসে ভরে গরম করে তার মসৃন তলা দিয়ে ঘসে আমার শার্ট ইসতিরি করতাম।

 

একবার মজি ভাই নাড়াই করে আমাকে চেরা দিয়্র ডেইল দিয়ে কপাল কেটে ফেলেছিলেন। গভীর রাতে কাক্কু হাটে থেকে এলে কাক্কুকে নিয়ে কাক্কি বদনা বাতি জালিয়ে আমাকে দেখতে আসেন। আমাকে শান্তনা দেন “মজির বাপে আট থাইকা আইয়া হুইনা মজিরে মাইর দিছে। ইন্ডিয়ান বাম লাগাইলেই ভালো অইয়া যাবোগা।”

আমি এইচএসসি পরীক্ষা দেয়ার সময় ১৯৭৯ এ আমার মা ইন্তেকাল করেন। আমি আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ থেকে এসে রাতেই মাকে দাফন করে ভোরে ফিরে গিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। ফিরে যাবার সময় কাক্কি মনে করিয়ে দেন “সাদেকে মনে হয় বছরকারি ফল আম খায় নাই। কবে না কবে আবার আবো। হেসুম আম থাকপো না। ওরে আম ছিলাইয়া দেও।” বুবু আমাকে আম ছিলিয়ে দিলেন দুধের সাথে। আমি খেলাম।

 

কাক্কু মারা যাবার পর থেকে মুলত কাক্কির স্বভাব স্তিমিত হতে থাকে। আমি এক বছর বা ছয়মাস পর পর বাড়ি যাই। বাড়ি এসেছি শুনেই কাক্কি আমাদের বাড়িতে আসতেন। হাসি হাসি মুখে বলতেন “সাদেক কুনসুম আইলা। মুনার মায় আইছে?” কাক্কির কোলে ও সাথে বেশ কয়েকজন করে নাতি নাত্নি থাকতো। আমি জিজ্ঞেস করতাম কোনটা কার ছেলে/মেয়ে? কাক্কি বলতেন “এইডা আমগো আলমগিরের, এইডা আমগো ছাদ্দাকাছের পোলা, এইডা হবির পোলা” ইত্যাদি। আমি এগুলো মনে রাখতে পারতাম না। আমি কাক্কির হাতে মজার প্যাকেট দিলে সব নাতী নাত্নিদের বিলিয়ে দিতেন। কাক্কির ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠতো। কাক্কি এসে আমার কাছে বসতেন। বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজ খবর নিতেন।

বয়স বাড়তে থাকে কাক্কি ক্রমশ দুর্বল হতে থাকেন। তখন তিনি আমাদের বাড়িতে তেমন আসতে পারতেন না। বাড়িতে কিছু খাবার জিনিস নিয়ে গেলে আমি কাক্কির জন্য নিয়ে গিয়ে দেখা করে আসতাম। শেষের দিকে কাক্কির শরীর শুকিয়ে কংকালসার হয়ে যায়। গাল কপাল ও চোখের কোনায় চামড়ার ভাঁজ পড়ে যায়। এই ভাঁজ পড়ার চামড়ার হাসিও আমার কাছে ভালো লাগে। কাক্কির কমন সমস্যার কথা বলতেন এভাবে “বাজান, কিচ্ছু ভালা নাগে না গো, কিচ্ছু ক্ষাপ্পাই না।” আমি ভাবতাম আমার মা যদি বেঁচে থাকতেন তা হলে এমনি ভাবেই হয়তো বলতেন “কিচ্ছুই খাপ্পাই না গো সাদেগালী বাজান।” তাও আমার ভালো লাগতো। আল্লাহ আমার মা ও এই চাচীকে মাফ করে দিয়ে বেহেস্তের ঘরে বসে আলাপ করার সুযোগ করে দিন। সাথে আমাদেরও।

 

গত ফেব্রুয়ারিতেই কাক্কির সাথে আমার শেষ দেখা। আমি ফেরার সময় কাক্কির হাতে অল্প কিছু টাকা দিয়ে আসতাম কিছু কিনে খাওয়ার জন্য। আমার স্ত্রী স্বপ্নাও কাক্কির জন্য বেশ টাকা পয়সা দিয়ে দিতেন আমার কাছে। আমার মেয়েরাও আমার হাতে দিয়ে দিতো এই বলে “দাদুর হাতে এই টাকাটা দিয়ে বলবে কিছু কিনে খেতে।” এবার কাক্কিকে খুব দুর্বল দেখেছিলাম। আরেকবার এসে পাবো কিনা সন্দেহ হলো। ঠিক তাই হলো। এবার ঈদুল আজহা হয়েছিল পহেলা আগষ্ট। করোনা মহামারির প্রকোপ খুব বেশী ছিলো। আমি বাড়ি যাইনি। মুকুল ও কদ্দুস রিস্ক নিয়ে বাড়ি গিয়েছিলো। আমি বাড়িতে কোরবানি দিয়েছিলাম। ভাতিজারা ম্যানেজ করেছিলো। ঈদ হয়েছিলো শনিবার। রবিবার দিন গত রাতে অর্থাৎ আগষ্টের ৩ তারিখে সোমবার কাক্কি ইন্তেকাল করেন। আমি জানাযায় শরীক হতে পারিনি।

 

তারপর মুকুলের জানাজায় শরীক হতে ১১ অক্টোবর বাড়ি গিয়েছিলাম। কাক্কির কথা খুব মনে পড়লো। মুকুলও কাক্কিকে খুব খোঁজ নিতো। সেও চলে গেলো। ৪ দিন আগে চলে গেছে আরেক প্রিয় চাচাতো ভাই সাইফুল। গত বছর চলে গেছে খসরু কাক্কু। তারপর কায়সার। সব নতুন কবর। কেমন জানি মনে হলো এরপরই আমার ডাক আসবে। আমি কি প্রস্তুত?

ফেরার সময় আগের মতোই কাক্কিদের বাড়িতে প্রবেশ করলাম। এবার আগের মতো ডাক দিলাম না “কাক্কি কোন ঘরে” বলে। দেখলাম বাড়িতে কেউ নেই। কাক্কি যে ঘরে থাকতেন সেই ঘরের দরজায় তালা লাগানো। আমি ডাক দিলাম বাড়িতে কেউ নাই নাকি। কার বউ যেন এসে বললো “বসুন।” আমি বললাম “কাক্কি এই ঘরে থাকতেন।” সে বললো “না পরে এই ঘরে থাকতেন। এই ঘরে মারা গেছেন। আমার বুক ফেটে কান্না এলো। চলে এলাম চোখ ভর্তি অশ্রু নিয়ে।

৩০/১০/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)

Loading...
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/