সাইকেল

সাইকেল
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বাই-সাইকেলকেই আমরা ছোট বেলা থেকে সাইকেল বলে অভ্যস্ত হয়েছি। বাই মানে দুই, সাইকেল হলো চাকা। দুই চাকার গাড়ী বলেই এটাকে বাই সাইকেল বলা হয়। পায়ে প্যাডেল ঘুরিয়ে চেইনের মাধ্যমে চাকা ঘুরিয়ে চলে যাওয়াটা হলো সাইকেল চালানো। এই সাইকেল চালানোটা হলো সারা বিশ্বে বহুল ব্যবহারিত সহজ যান। জালানি তেল খরচে মোটর যন্ত্র সাইকেলে লাগানোর পর এর নাম হয়েছে মোটর সাইকেল। গ্রামে এটাকে অনেকে সাইকেল মোটর বলতো। মোটর সাইকেল আমদানী হতো জাপান থেকে হুন্ডা ব্রান্ডের। মোটর সাইকেলের গায়ে তাই লেখা থাকতো হুন্ডা। তাই অনেকে মোটর সাইকেলকে হুন্ডা বলতো। ময়মনসিংহের কোন কোন গ্রামের মানুষ হুন্ডা না বলে হুন্ডার হলে। যেমন, “বেটা কত জোড়ে হুন্ডার চালাইয়া যায়!” আমি যখন ক্লাস ওয়ানে পড়তাম ঘোনার চালা ফ্রি প্রাইমারী স্কুলে তখন আমার ক্লাসমেট বন্ধু লেবুর (প্রফেসর লুৎফর রহমান পি এইচ ডি) মামা আলী আহম্মদ স্যার স্কুলের পাস দিয়ে ভো করে ধুলা উড়িয়ে হুন্ডা নিয়ে দক্ষিণ দিকে যেতেন। খুব সম্ভব তিনি বংকি যেতেন। তিনি প্রাইমারী স্কুলের মাস্টার ছিলেন। ধনী বাপের সৌখিন ছেলে ছিলেন। যতদূর মনে পড়ে এইটাই আমার প্রথম মোটর সাইকেল দেখা। তবে জন্মের পর স্মরনকাল থেকেই আমি আমাদের বাড়িতে সাইকেল দেখছি। চাচারা সাইকেল ব্যবহার করতেন। আমাদের পাহাড়ি রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে কোথাও যাওয়া সুবিধাজনক ছিল। কোন কোন এলাকায় সাইকেল দিয়ে খেপ দিতো। ১৯৮৮ সনে আমাদের প্রথম পোস্টিং হয় দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রত্যন্ত গ্রামে মেডিকেল অফিসার হিসাবে। সেইসব এলাকায় পৌছতে বন্ধুদের বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে। এনিয়ে বন্ধুদের কাছে মজার মজার কথা শুনেছি। কেউ গিয়েছেন গরুর গাড়িতে, কেউ গিয়েছেন নৌকায়, কেউ গিয়েছেন রিক্সায় আবার কেউ গিয়েছেন ভ্যান গাড়িতে। ডাঃ সদর উদ্দিন নাকি হেলিকপ্টারে গিয়েছিল। আমি বললাম “আশ্চর্য! এমন দুর্গম জায়গা যে হেলিকপ্টারে যেতে হয়েছে?” বললো “আরে, এটা পাখাওয়ালা হেলিকপ্টার না। সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসিয়ে প্যাসেঞ্জার নেয় সাইকেলওয়ালারা গ্রামের রাস্তায়। নাম দিয়েছে হেলিকপ্টার।

আমাদের দেশে সাইকেল তৈরি হতো না। এইগুলি আমদানি করা হতো সাধারণত চিন দেশ বা জাপান থেকে। ফিলিপাইন ও কোরিয়া থেকেও হয়ত সাইকেল আমদানি হতো। এইগুলির মান ইন্ডিয়ান সাইকেল থেকে ভাল ছিল। ইন্ডিয়ানরা কম মানের কম দামের সাইকেল বানাত। তারা আমদানি নির্ভর ছিল না। পত্রিকায় পড়েছি, একবার এক লোক সাইকেলের পিছনের ক্যারিয়ারে করে এক বস্তা মাল নিয়ে বাংলাদেশ বর্ডার পাড়ি দিচ্ছিল। বাংলাদেশের বর্ডার গার্ডের কয়েক সদস্য তাকে ধরার জন্য পিছন থেকে ধাওয়া দিলে সে বস্তা ফেলে সাইকেল চালিয়ে দ্রুত ইন্ডিয়ার ভিতরে ঢুকে পড়ে পালিয়ে যায়। গার্ডরা বস্তা খুলে দেখতে পান বস্তাভর্তি তুষ। তুষ পাচার করছে কেন এই রহস্য কেউ উদঘাটন করতে পারছিলেন না। কয়েক সপ্তাহ পর অনুরূপ ঘটনা আবার ঘটলো। এবার গার্ডরা সিদ্ধান্ত নিলেন “এবার বস্তা না ধরে সাইকেলওয়ালা ধরা হবে। তুষ কেনো পাচার করে তা আমাদের জানতেই হবে।” আরেকদিন ওৎ পেতে বসেছিলেন গার্ডরা। সেই সাইকেলওয়ালা যেই সাইকেলে বস্তা নিয়ে বর্ডার পার হচ্ছিলেন ঠিক সেই মুহুর্তে বর্ডার গার্ডরা দৌড় দিলেন ধরার জন্য। পাচারকারী বস্তা ফেলে পালাতে চেষ্টা করল। কিন্তু এবার গার্ডরা বস্তার দিকে নজর না দিয়ে সাইকেলওয়ালাকে পাকরাও করলেন। উত্তম মধ্যম কিছু দেয়ার পর জিজ্ঞেস করলেন
– এই বেটা, তুই বার বার তুষ পাচার করস কেন? ইন্ডিয়ায় কি তুষের অভাব?
– স্যার, সত্য কথা কমু, মারবেন না তো?
– ক, মারুম না, ক?
– স্যার, আসলে আমি সাইকেল পাচার করি। ইন্ডিয়ায় ফনিক্স ব্রান্ডের সাইকেল নাই। এই সাইকেল ইন্ডিয়ায় নিয়ে অনেক বেশী দামে বিক্রি করি।
– তা বুঝলাম, তুই তুষ নিয়ে কি করস?
– স্যার, তুষের কোন দাম নাই। তাই, এক বস্তা তুষ নিয়ে রওনা দেই। কেউ ধাওয়া দিলে বস্তা ফেলে সাইকেল নিয়ে চলে যাই ইন্ডিয়া। ধাওয়াকারীরা বস্তা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।

বেটা শয়তানের বুদ্ধি কম না!

ছোট বেলা থেকেই আমরা সাইকেল চালানো শিখতাম। সীটের উপর বসলে প্যাডেল নাগাল পাওয়া যেতো না। তাই সাইড দিয়ে ঝুলে কাইত হয়ে সাইকেল চালাতাম। শিখার সময় পড়ে গিয়ে হাটুর ছাল উঠে যেতো। সাইকেলের ছালও উঠে যেতো। তাই চাচারা শিখার জন্য সাইকেল দিতেন না। বড়চওনা হাটে আহাদুল্লাহ মেকার ও কচুয়া হাটে হাকিম মেকার নামে দুইজন সাইকেল মেকার ছিলেন। তারা কয়লার আগুনে হিট দিয়ে সাইকেল ঝালাইর কাজ করতেন। চাকায় হ্যান্ড পাম্প দিয়ে হাওয়া দিয়ে দিতেন। এই দুই চাচা আমাদের কিশোরদের কাছে খুব প্রিয় ছিলেন। মেকারের দোকান থেকে পুরাতন সাইকেল ভাড়া নিয়ে আমরা সাইকেল চালানো শিখতাম। প্রথম প্রথম পিছন থেকে ক্যারিয়ার ধরে একজন সাইকেলকে সোজা করে রাখতো। সাইকেলে উঠার জন্য উচু বাতর (আইল) ব্যবহার করা হত। পড়ে গিয়ে ছাল উঠে গেলে ধুলা দিয়ে ঢেকে দেয়া হতো অথবা ফুলঝুরি বা শিয়ালমুতি পাতা ডলে রস করে প্রলেপ দেয়া হতো।

গ্রামের মাস্টার সাহেবরা পায়জামা পাঞ্জাবী পরে ঘড়ি হাতে দিয়ে সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতেন। কৃষকরা ফসল বস্তায় বা ঝাকায় ভরে সাইকেলের পাইপে বা ক্যারিয়ারে করে হাটে যেতেন। এই জন্য গ্রামের জামাইরা শশুরের কাছ থেকে একটা সাইকেল উপহার হিসাবে আশা করতো। মেয়েরাও চাইতেন তার বাবা জামাইকে একটা সাইকেল উপহার দিক। নিজের স্বামীকে সাইকেল নিয়ে হাটে যেতে তাদের কাছে ভালোই লাগতো। এভাবে উপহার দিতে দিতে একসময় জামাইকে সাইকেল দেয়া যৌতুকের মধ্যে পড়ে যায়। এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে জামাইকে সাইকেল না দিলে মেয়ে নিবে না ছেলের বাবা। এটাই হলো যৌতুক। গ্রামে অনেক মেয়ে একটা সাইকেলের জন্য যৌতুকের বলি হয়েছে। এখন গ্রামে সাইকেল দেয়ার প্রচলন নেই। তবে কেউ কেউ মোটর সাইকেল উপহার হিসাবে পেয়ে থাকেন। অনেকে শশুর থেকে টাকা পয়সা নিয়ে বিদেশ যায় চাকরি করতে। মেয়ের সুখের জন্য মেয়ের বাবাও যৌতূক মনে না করে জামাইকে টাকা দিয়ে বিদেশ পাঠান।

তিনটি সাইকেলের চাকা দিয়ে সাইকেলের পরে তৈরি করে রিক্সা। সুবিধা হলো একজন চালক দুইজন যাত্রী বসায়ে সাইকেলের মতই চালিয়ে যেতে পারে। তবে এটার জন্য প্রশস্ত রাস্তার প্রয়োজন। একই ভাবে মালা মালামাল বহন করার জন্য সাইকেলের তিন চাকা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ভ্যান। ২০০৩ সনে বেগম রোকেয়ার গ্রামের বাড়ি রংপুরের পায়রাবন্দে দেখেছিলাম স্কুলের মেয়েরা এক প্রকার সাইকেল চালায় যেগুলির উপরের পাইপ নাই। তাতে মেয়েদের সাইকেলে উঠতে সুবিধা হয়। বর্তমানে সাইকেল ও রিক্সায় ব্যাটারি লাখিয়ে অটোরিকশা বা অটোসাইকেল বা অটোভ্যান বানানো হয়েছে। তাতে চালকের কষ্ট কিছুটা কমেছে। কলকাতা শহরে এক প্রকার রিক্সা দেখে এসেছি সেগুলি তুই চাকার। পায়ে না চালিয়ে সেগুলি টেনে নিয়ে যাওয়া হয় দৌড়িয়ে। যাত্রী হেলান দিয়ে সীটে বসে থাকে। রিকক্সাওয়ালা দৌড়িয়ে নিয়ে যায়। এই দৃশ্যটা আধুনিক বিশ্বে বেমানান। তবু কোলকাতার ঐতিহ্য হিসাবে তারা এই রিক্সা এখনো চালাচ্ছে।

অনেক স্মৃতি আছে সবারই সাইকেল নিয়ে। আমি আর কয়টা লিখব। আজ আর নাইবা লিখলাম সেগুলি।
১৭/৭/২০১৯ ইং