ক্লাস টুর পড়া

ক্লাস টুর পড়া

(স্মৃতিচারণ)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার


১৯৬৮ সনে ক্লাস টুতে উঠে বাংলা ও অংক বিষয়ের সাথে যোগ হল সমাজপাঠ। ভুগোল, পৌরনীতি ও ইতিহাস নিয়ে সংক্ষিপ্ত আকারের একটা বই ছিল ‘সমাজ পাঠ’ নামে। ওখানে দিক নির্নয় শিক্ষার জন্য একটা লেসন ছিল। সুর্য যে দিকে উদয় হয় তাকে পুর্ব দিক বলা হয়। উদিয়মান সুর্যের দিকে ঘুরে দাড়ালে হাতের ডান দিক দক্ষিন, হাতের বাম দিক উত্তর এবং পিছনের দিক পশ্চিম। মাথার উপরের দিক উর্ধ এবং পায়ের নিচের দিক অধ। এইভাবে বই পড়ে স্যারগণ আমাদের দিক শেখাতেন। স্যার প্রশ্ন করতেন “খলিফা বাড়ি স্কুলের কোন দিকে?” আমরা বলতাম “পিছনের দিকে।” স্যার শুধ্রে দিতেন “না, উত্তর দিকে।”
-পুকুর স্কুলের কোন দিকে?
-ডান দিকে।
– না, পশ্চিম দিকে।

আজকাল কলেজের ছাত্রদের যদি প্রশ্ন করি “যাদুঘর বিএসএমএমইউ-এর কোন দিকে?” কোন কোন ছাত্র উত্তর দেয় “সামনের দিকে। ” আমি শুধ্রে দেই “দক্ষিন দিকে।”
– বাংলাদেশের পশ্চিমে কোন দেশ?
-এটা আমাদের পরীক্ষায় আসে না।
-ইউএসএ বাংলাদেশের কোন দিকে?
-নিচের দিকে?
-কেমনে?
-ড্রপ ডাউন লিস্টে ইংলিশ বর্নমালার ক্রম অনুসারে দেশের নাম আসে। তাই উপরের দিকে বাংলাদেশ, নিচের দিকে ইউএসএ।

মনে হচ্ছে আগের পড়া আর এখনকার পড়ার মধ্যে পার্থক্য আছে।

পৌরনীতিতে পড়া ছিল মা-বাবা, দাদা-দাদী, ও সন্তান নিয়ে এক বাড়িতে বাস করলে তাকে পরিবার বলে। কয়েকটি পরিবার মিলে তৈরি হয় পাড়া। কয়েকটি পাড়া মিলে একত্রে বলা হয় গ্রাম। কয়েকটি গ্রাম নিয়ে তৈরি হয় একটি ইউনিয়ন। যেমন, কালিয়া ইউনিয়ন। কয়েকটি ইউনিয়ন মিলে হয় থানা। যেমন, বাসাইল থানা। কয়েকটি থানা মিলে হয় একটি মহুকুমা। যেমন, টাংগাইল। কয়েকটি মহুকুমা মিলে হয় একটি জেলা। যেমন, ময়মনসিংহ জেলা। কয়েকটি জেলা মিলে হয় একটি বিভাগ। যেমন, ঢাকা।

ভাল করে পড়া মুখস্ত করে এসেছি। স্যার পড়া ধরেন। আমরা উত্তর দেই। সংজ্ঞা ও উদাহরণগুলি সব পারি। কিন্তু পড়ার বাইরের প্রশ্নগুলো পারছিলাম না। লুৎফরের উত্তরগুলি সঠিক হচ্ছিল। স্যার লুৎফরকে প্রশ্ন করেন “তোমার ইউনিয়নের নাম কি?” লুৎফর বলল “কালিয়া ইউনিয়ন।” আমাকে প্রশ্ন করলে আমি মনে করলাম বইয়ে যেহেতু কালিয়া ইউনিয়ন লিখা আছে তাই বললাম “কালিয়া ইউনিয়ন।” স্যার বললেন “গাধা।” চিন্তায় পড়ে গেলাম। স্যার প্রশ্ন করেন “তোমার মহুকুমার নাম কি?” উত্তর দিলাম “টাংগাইল।” হয়েছে। চিন্তায় পরে গেলাম বইয়ের উদাহরণ কোনটা হয় কোনটা হয় না কেন? বাড়ি এসে বাবাকে ঘটনা বললাম। বাবা বললেন “বইয়ে উদাহরণ দিয়েছে। এর অর্থ এই না যে এটা তোমার। তোমার আর লু ৎফরের ইউনিয়ন এক না। তোমার ইউনিয়ন কাকড়াজান। লুৎফরের ইউনিয়ন কালিয়া। তোমার গ্রাম ঢনডনিয়া। লুৎফরের গ্রাম ঘোনার চালা। যার যার সঠিক ঠিকানা জানা থাকতে হবে। এই বলে বাবা আমার নিজের গ্রাম, ইউনিয়ন, থানা, মহুকুমা, জেলা, বিভাগ, প্রদেশ, দেশ ইত্যাদির নাম শিখালেন।

বুঝলাম সব কিছুই বই পড়ে ও স্কুল থেকে শেখা যায় না। বাবা মাকেও শিখাতে হয়।

১১/১০/২০১৭ খ্রি.

Comments are closed.