ডাক্তার ও ভুয়া ডাক্তারের চিকিৎসার পার্থক্য

ডাক্তার ও ভুয়া ডাক্তারের চিকিৎসার পার্থক্য
(স্বাস্থ্য কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আজকাল মাঝে মাঝে পত্রিকাতে খবর দেখা যায় যে, মাত্র এইট বা এসএসসি পাস করে এমবিবিএস, এফসিপিএস, এফআর সিএস, এমডি, এমএস ইত্যাদি বড় বড় ডিগ্রী লাগিয়ে বড় বড় ডায়াগনোস্টিক সেন্টার বা হাসপাতালে ভুয়া ডাক্তার দীর্ঘদিন যাবৎ প্রাক্টিস করছিলেন। তাতে মনে করা যেতে পারে, এখনো দুই একজন ভুয়া ডাক্তার থাকা অবিশ্বাস্য না। র‍্যাব বা ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে ধরা পড়ে দুই মাস বা দুই বৎসরের জেল হয়েছে এবং কিছু টাকা জরিমানা হয়েছে। কেউ কেউ হাসপাতালের মালিক কাম পরিচালক কাম সার্জন হয়েছেন। বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল -এর রুল অনুযায়ী এমবিবিএস পাস ছাড়া কেউ ডাক্তার লিখে প্রাক্টিস করতে পারবেন না। কিন্তু আমাদের দেশে আবহমান কাল থেকেই একটা প্রচলন আছে যে, যিনি রোগের চিকিৎসা করেন তাকে ডাক্তার ডাকতে হয়। সমাজে ডাক্তারদেরকে অন্যরকম সম্মান দেয়া হয়। পল্লী চিকিৎসক, হোমিও চিকিৎসক, মেডিকেল এসিস্টেন্ট, ফার্মাসিস্ট ও ঔষধের দোকানদারদেরকে সম্মানের সাথে জনগণ ডাক্তার সাব বলে সম্বোধন করে। এমন প্রতিটি ডাক্তারই এলাকার জনগনের বিপদের বন্ধু। তারা অল্প ভিজিটে, অল্প টাকায় গরীবদের, যাই পারেন, চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। তাদেরকে কেউ ভুয়া ডাক্তার মনে করে না। ভুল চিকিৎসা করলেও তাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা জেনে তাদেরকে কেউ ভুল বুঝে না। তারা বাকীতেও চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। জনগণ প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয় আসলে ভুয়া ডাক্তারের কাছে। পত্রিকা পড়ে ও কিছু কিছু কেইস স্টাডি করে এই ভুয়া ডাক্তার ও আসল ডাক্তারের চিকিৎসার পার্থক্যের যে ধারনা আমার হয়েছে তা এখানে তুলে ধরছি।

এমবিবিএস পাস করা সবাই বিএমডিসি স্বীকৃত ডাক্তার। এরপর যারা বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা বা ডিগ্রী অর্জন করেন তারা সেই বিষয়ের বিশেষজ্ঞ নামে পরিচিত হন, যেমন, প্যাথলজিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট, সনোলজিস্ট, নেফ্রোলজিস্ট, নিউরোলজিস্ট, ইত্যাদি। পোস্টগ্রাজুয়েট ট্রেইনিং বা কোর্স না করেই যারা পোস্টগ্রাজুয়েট ডাক্তার পরিচয় দিয়ে শুধু এমবিবিএস পাস করে নিজেকে বিশেষজ্ঞ পরিচয় দিয়ে প্রাক্টিস করেন তারাও ভুয়া বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। ভুয়া ডাক্তাররা বড় বড় ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও প্রেক্টিস করে। তারা নিজেদের মধ্যে সিন্ডিকেট করে নেয়। গ্রামে একটা প্রবাদবাক্য আছে “চোরে চোরে আলি, এক চোরে বিয়ে করে আরেক চোরের হালি।” এদের নিজেদের মধ্যে এমন সখ্যতা থাকে। ভুয়া ডাক্তার দেখে চেনার উপায় নাই। তাদের সার্টিফিকেট চেক করে কেউ রুগী দেখায় না। তাদের ব্যবহার খুব ভালো হয়। বেশভূষা সুন্দর ও পরিপাটি থাকে। কেউ কেউ খুব ধার্মিক লোক সাজে। তাদের প্রচারের জন্য দালাল গ্রুপ থাকে। কোন কোন পল্লী চিকিৎসক পরিচয়দানকারী আসলে তাদের দালাল। মধুর মধুর কথা বলে দালালরা রুগী নিয়ে যায় ভুয়াদের কাছে। তাতে দশ/বারোটা রুগী নিজে চিকিৎসা করে যা পাবে ভুয়া ডাক্তারকে একটা রুগী ভিড়িয়ে দিলে তার চেয়ে অনেক বেশী পাবে। রুগীটাকে অপারেশনের কেইস বানাতে পারলে তো কথাই নাই। খুশীতে তার পোয়া বারো।

যেসব ভুয়া ডাক্তার মেডিসিন প্রাক্টিস করে তারা গদবাধা অনেকগুলি পরীক্ষা লিখে দেয়। যেহেতু সে নিজেই ভুয়া, সেহেতু সে ভুয়া লোকের কাছেই পাঠায়। কেউ কেউ কোন মতে কিছু একটা পরীক্ষা করে, কেউ কেউ না করেই রিপোর্ট দেয়। রক্ত নিয়ে নাকি বালতিতে ফেলে দেয়। শুনেছি এটাকে বলা হয় বালতি পরীক্ষা। তবে রিপোর্ট কিন্তু কম্পিউটার কম্পোজ করা অফসেট পেপারেই দিয়ে থাকে। রিপোর্টগুলি দেখতে খুব আকর্ষণীয় হয়। রিপোর্ট পেয়ে ভুয়া ডাক্তার সুন্দর করে কয়েকটি ঔষধ লিখে দেয়। কমন কতকগুলি গ্রুপের ঔষধ। যেগুলি সাধারণত আসল ডাক্তারগণ লিখে থাকেন। আসল ডাক্তারগণ ঔষধ লিখার সময় অনেক কিছু বিষয় বিবেচনা করে লিখেন। যেমন, এই ঔষধগুলি এই বয়সের রুগীর জন্য দেয়া সঠিক কি না, সঠিক ডোজ কত, অন্য ঔষধের সাথে ঝামেলা বাধায় কিনা, লিভার ও কিডনির উপর চাপ পরবে কি না, ইত্যাদি। তাই, আসল ডাক্তারের প্রেস্ক্রিপশনের ঔষধ সেবন করা নিরাপদ। কিন্তু ভুয়া ডাক্তারের ঔষধ সেবন করলে লিভার ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রশ্ন করতে পারেন “ভুয়া ডাক্তারের ঔষধে রোগ ভালো হয় কেমনে?” আমাদের শরীরে জন্মগতভাবেই রোগ ভালো হয়ে যাবার নিজস্ব পদ্ধতি আছে। ঔষধ ছাড়াই রোগ ভালো হতে পারে। তাই, ভুয়া প্রেস্ক্রিপশনেও রোগ ভালো হয়। তাছাড়া, ভুয়া ডাক্তার কয়েকটি গ্রুপের ঔষধ এক সাথে লিখে। তাতে একটি লেগে যায়। যেমন, রুগীর জ্বর হলে এমন একটা এন্টিবায়োটিক দেয় যাতে অনেক ধরনের জীবাণু সেই এন্টিবায়োটিকে নির্মুল হয়। জ্বর সাধারণত ইনফেকশন-এর জন্যই হয়। তাছাড়া, সাথে টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর-এর ঔষধও লাগিয়ে দেয়। এক দিকে টাকার অপচয় আরেক দিকে লিভার ও কিডনির উপরে চাপ হয়।

এতো গেলো মেডিসিন রুগীর কথা। কিছু কিছু কেইস তারা ইচ্ছা করেই সার্জিকেল কেইস বানায়। মনে করেন, অল্প বয়সের এক বাচ্চা ভেজাল চানাচুর জাতীয় কিছু খেয়ে পেটের ব্যাথার কথা বলছে। ভুয়া ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে পেটে কিছুক্ষণ টিপাটিপি করে বলবে “এপেন্ডিসাইটিস হয়েছে।” ভুয়া সনোলজিস্ট রিপোর্ট দিয়ে দেবে “একুট এপেন্ডিসাইটিস। ” ভুয়া ডাক্তার ভুয়া সার্জনের কাছে রেফার্ড করবে। ভুয়া সার্জন বলবে “কয়েকঘন্টার মধ্যে এপেন্ডিক্স ফেটে গিয়ে রুগী মারা যাবে। তাড়াতাড়ি অপারেশন। ” নিজের সন্তানের জীবনাশঙ্কা চিন্তা করে অপারেশন করাতে রাজী হয়ে যায়। ভুয়া সার্জন পেট কেটে এপেন্ডিক্স-এর গোড়া বরাবর ফেস দিয়ে কেটে সুতা দিয়ে সেলাই করে দেয়। কোন কোন সময় এপেন্ডিক্স না কেটে শুধু চামড়া কেটে টেপ লাগিয়ে রাখা হয়। আর আসলেই যদি কোন রুগীর এপেন্ডিসাইটিস হয় এবং আসল সার্জনের হাতে পড়ে তবে বিচার বিশ্লেষণ করে তিনি বিশেষজ্ঞ অজ্ঞানের ডাক্তার দিয়ে অজ্ঞান করিয়ে বিজ্ঞানসম্মত ভাবে এপেন্ডিক্স অপারেশন করে এনে হিস্টোপ্যাথলজিস্ট দিয়ে বায়োপ্সি পরীক্ষা করায়ে সুচিকিৎসা করাবেন। শরীরের কোথাও টিউমার বা ক্যান্সার হলে ভুয়া সার্জন টাকার লোভে চিন্তা ভাবনা না করেই অজ্ঞান করে ছুরি দিয়ে ফেসিয়ে টিউমার কেটে ফেলে দিবেন। তাতে রগ মগ যা আছে তার সাথে সব কাটা পড়বে। সুতা দিয়ে বেধে বেধে রক্ত পড়া বন্ধ করবে। টিউমার কেটে সমান করাই ভুয়া সার্জনের কাজ। টিউমার কাটার পর ভুয়া আয়া সেগুলি কুত্তারে খাওয়াবে। আর যদি টিউমারের রুগী আসল সার্জনের হাতে পড়তো তাহলে তিনি ভেবে দেখতেন এই পর্যায়ে টিউমারের কতটুকু অংশ টাকা যায়। কাটার সময় রক্তনালী ও স্নায়ু ঠিকঠাক রেখে কাটবেন। কারন, তিনি জানেন, কোন রক্তনালীর কি গুরুত্ব, কোন স্নায়ুর কি কাজ।

ভুয়া গাইনোকোলজিস্ট সেজে কত মায়ের জরায়ু যে তারা অল্প বয়সে কেটে ফেলছে। আল্ট্রাসনোগ্রাফী করাচ্ছে ভুয়া সনোলজিস্ট দিয়ে। তারা লিখে দিচ্ছে “বাল্কি ইউটেরাস।” এই অজুহাতে অল্প বয়সের মেয়েদের ইউটেরাস কেটে ফেলা হয়েছে। কোন বায়োপ্সি পরীক্ষা না করে ডাস্টবিনে ফেলে দিচ্ছে কর্তিত জরায়ু। মায়ের কোন লাভ হয় নি তাতে। বরং ক্ষতি হয়েছে। লাভ হয়েছে দালালের, ক্লিনিক মালিকের ও ভুয়া গাইনিকোলজিস্ট-এর। আর যদি এই রুগী আসল গাইনিকোলজিস্ট-এর হাতে পড়তো তবে রুগীর কম্পলেইনের সাথে তার শরীরের কি সম্পর্ক আছে তা বের করে পরীক্ষা দিতেন। যদি বাল্কি ইউটেরাস হয়েই থাকে তা হলে সেটার কারন জেনে অপারেশন করে কনফার্ম হবার জন্য জরায়ুর বায়োপ্সি পরীক্ষা করাতেন। জরায়ু কেটে আনার সময় রক্তনালী ও নার্ভ ঠিক ঠাক মতো ম্যানেজ করতেন। ভুয়া ডাক্তার তা করে না। সে অগুলি চিনে না। সে পেপের মতো কেটে আনে জরায়ু। ফেলে দেয় বালতিতে। রুগী জানেই না যে তার সেই জরায়ুতে ক্যান্সার ছিল কি না।

ভুয়া ডাক্তার নিয়ে আমার এই বিশ্লেষণ টেলিভিশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও খবরেরকাগজ পড়ে লিখা। আপনি মনে করতে পারেন, আমি এদের সম্পর্কে এত জানি কেমনে? প্রতিবেদন দেখে ও কিছুটার কল্পনার সংমিশ্রণ করে আমার এই লেখা। ভুয়া ডাক্তার ধরা পরার পর জানা গেছে তারা বেশ কয়েক বছর যাবৎ এভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কাজেই, এদের হাতে কত শত রুগী যে প্রতারিত ও মারা গেছে তার হিসাব কি কেউ রেখেছে। যেহেতু তারা শুধু মানুষকে প্রতারিতই করছে না, রুগীর লিভার ও কিডনির ক্ষতিকরা এমনকি মৃত্যুর জন্য তারা দায়ী।

কয়েক মাসের জেল আর কিছু টাকা জরিমানায় এদের হাত থেকে জনগণ রক্ষা পাবে না। যেহেতু সাধারণের বুঝার উপায় নাই যে কে আসল আর কে ভুয়া সেহেতু ভুয়া ডাক্তার ধরার অভিজান আরও জোরদার করতে হবে। শাস্তির মাত্রা আরও বাড়ানো যায় কি না তাও বিবেচনায় আনতে হবে।
২৭/৭/২০১৯ ইং