দিল্লী -জয়পুর -আগ্রা ভ্রমণ

দিল্লী -জয়পুর -আগ্রা ভ্রমণ
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

রাজধানী এক্সপ্রেস ট্রেনে কলোকাতা থেকে দিল্লী পৌছলাম ৩১/১/২০০৯ তারিখে। দিল্লী পৌছে ট্রাভেল এজেন্ট-এর সাথে কন্ট্রাক্ট করলাম আমাদেরকে দিল্লী, জয়পুর ও আগ্রা ভ্রমণ ও থাকার ব্যবস্থা করতে। দুপুর ২ টার দিকে দিল্লী শহরের একটা চার তারকা হোটেলে নেয়া হলো একটা মাইক্রোবাসে করে। হাত মুখ ধুয়ে খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। বিকাল ৫ টার দিকে সঞ্জয় নামে একজন ২৫/২৬ বছরের যুবক এলেন ৮ সীটের একটা টাভেল কার নিয়ে। বললো “আমাকে আপনাদের জন্য সার্বক্ষণিক ট্রাভেল গাইড ও ড্রাইভার হিসাবে নিয়োগ করা হয়েছে। আমি আপনাদেরকে দিল্লী, জয়পুর ও আগ্রা দেখাব। যতদিন আছেন আমি আপনাদের সাথেই আছি। দর্শনীয় স্থান যা যা আছে দেখাব। আপনাদের যদি স্পেশাল কিছু দেখার থাকে জানাবেন। আমি দেখিয়ে দেব।” যা যা দেখেছিলাম তার সবকিছু এই দশ বছর পর মনে নেই। দেখার ধারাবাহিকতায়ও কিছুটা ভুল হতে পাড়ে। আমাদের সাথে ছিলেন প্রফেসর ডাঃ আমিনুল হক স্যার ও ভাবী, প্রফেসর ডাঃ রুহিনী কুমার দাস দাদা ও বন্ধু প্রফেসর ডাঃ এ এফ এম সালেহ (ইকবাল), আমি ও আমার স্ত্রী ফিরোজা আখতার স্বপ্না। বিকেল ও সন্ধায় শহরের বিভিন্ন রোড দিয়ে ঘুরাফেরা করলাম। নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মাজারেও নিয়ে গেলো সঞ্জয়। মাজারের গেটের লোকদের আচরন দেখে আমাদের ভালো লাগলো না। ভিতরে না গিয়েই ফিরে এলাম। ইন্ডিয়া গেট দেখলাম সন্ধায়। সকালে নাস্তা করে কিছু দর্শনীয় স্থান দেখলাম। এর মধ্যে হুমায়ুন টম্ব অনেকক্ষণ দেখলাম। মোগল সম্রাট হুমায়ুন ছিলেন সম্রাট বাবরের ছেলে এবং সম্রাট আকবরের পিতা। হুমায়ুন টম্ব-এ মোগল বংশধরদের অনেক সমাধি আছে। সময়ের অভাবে জামা মসজিদের ভিতর যেতে পারি নাই। তবে পাস দিয়ে যাওয়ার সময় বাহির থেকে দেখেছিলাম। দিল্লী থেকে চলে গেলাম জয়পুর, পিংক সিটিতে। জয়পুর দুই রাত ছিলাম। জয়পুরের হোটেলটি খুব গর্জিয়াস ছিল। খুবই আরামদায়ক। কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে সন্ধার সময় বের হলাম। সঞ্জয়ই সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল কোথায় কোথায় যেতে হবে। সে একটা সিনেমা হলের নিকট নেমে আমিনুল স্যার ও ইকবালের সাথে কি যেন পরামর্শ করলো আমাকে এভয়েড করে। দেখলাম টিকিট এনে হাতে দিলো। আমি বললাম “২০০৫ সনে হজ্জ করার পর তো আমরা সিনেমা দেখি না। এটা কি করলেন?” আমিনুল স্যার মুসকি হেসে বললেন “দেখেন, ভালো লাগবে। জয়পুর এসে এই হলে সিনেমা না দেখে কেউ যায় না। এটার মালিক ধর্মেন্দ্র। খুব নামকরা সিনেমা হল। দেখলেই বুঝবেন।” স্ত্রী স্বপ্নার চোখের দিকে তাকালাম। দেখে মনে হলো সেও সিনেমা হলটার অভিজ্ঞতা নিতে চাচ্ছে। এদিকে সিনেমা শুরু হয়ে গেছে। দ্রুত প্রবেশ করলাম। অন্ধকারে সীট খুঁজে বের করে বসলাম। আসলেই দেখার মতো সিনেমা হল। হলের নাম রাজমন্দির। থ্রিডি সাউন্ড সিস্টেম। নিখুঁত ছবি। সিনেমার নাম ছিল “রব মে বানানে জুডি।” প্রধান চরিত্রে ছিলেন শাহ রূখ খান ও আনুসকা। সব মিলিয়ে ভালোই লেগেছিল। ভালোই অভিজ্ঞতা হলো। আমিনুল স্যারের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল বলে মনে হলো। এরপর আর আমি হলে বসে সিনেমা দেখি নাই।

সঞ্জয় আমাদের নিয়ে চলে গেলেন আগ্রায়। হোটেলে গিয়ে উঠলাম রাত ৮ টার দিকে। খেয়ে শুয়ে পড়লাম। খুব ক্লান্ত লাগছিল। এই হোটেলটা জয়পুরের মত অত দামী ছিল না। তবে ভালই ছিল। সঞ্জয় যেহেতু কোম্পানির লোক ছিল সেহেতু তার থাকার চিন্তা আমাদের করতো হতো না। আমরা যখন যেখানে থাকতে বলতাম সে ঠিক সে সময় সেখানেই থাকতো। সে খুব অনুগত ছিল আমাদের প্রতি। ইকবাল তার সীটের কাছে বসে তার সাথে বেশ মজা করতো। ডাক দিতো সঞ্জে বলে। ইকবাল হিন্দি জানতো না। তবে সঞ্জের সাথে আজব আজব উচ্চারণে হিন্দিতে কথা বলতো। শুনে আমরা পিছন থেকে হাসতাম। পরেরদিন সকাল ৯ টায় আমাদের সম্মেলন ছিল। আমাদের সম্মেলনের শীরোনাম ছিল “International Continued Medical Education 2009” সংক্ষেপে “INTCME2009″। প্রতিবছর ভারতে ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন অব প্রেক্টিশিং প্যাথলজিস্ট এবং এসোসিয়েশন অব প্যাথলজিস্ট অব নর্থ আমেরিকা-এর যৌথ উদ্যোগে এই কনফারেন্স হয় ভারতে একেক শহরে। এমন একটি সিএমই INTCME2006-তে আমি ও আমিনুল স্যার অংশ নিয়েছিলাম কলকাতায়। কলকাতায় আমাদের প্রফেসর ডাঃ মোকাররম আলী স্যার এবং প্রফেসর ডাঃ মনিমোহন স্যারও এটেন্ড করেছিলেন পৃথকভাবে। সেবার চিফগেস্ট ছিলেন একারম্যান্স সার্জিকেল প্যাথলজি বইয়ের এডিটর জন রোজাই। আগ্রায় চিফগেস্ট ছিলেন রবিন্স প্যাথলজিক বেসিস অব ডিজিজ বইয়ের এডিটর ভিনয় কুমার। তিন দিন ব্যপি প্রগ্রাম ছিল। আমরা লাঞ্চ করার পর আর কনফারেন্সে ফিরলাম না। চলে গেলাম বেড়াতে সঞ্জয়কে নিয়ে। প্রথম দিন বিকেলে চলে গেলাম তাজ মহল দেখতে। বিশ্বের সাত আশ্চর্যের এক আশ্চর্য। ভ্রমনের প্রধান আকর্ষণ। বিশ্বের প্রধান সৌন্দের সমাধি সৌধ । সম্রাট শাহ জাহানের স্ত্রী মমতাজের সমাধি সৌধ। তিন কিলোমিটারের মধ্যে কোন আর্টিফিশিয়াল জিনিস নাই। বিদ্যুৎ নাই। শব্দদুষন নাই। সব কিছু ন্যাচারাল। তাজমহলের সৌন্দর্য রক্ষা করার জন্যই এই ব্যবস্থা। কার থেকে নেমে ঘোড়ার গাড়ি চড়ে তাজমহল দেখতে গেলাম। স্থানীয় গাইড নিযুক্ত করলাম বুঝিয়ে দেয়ার জন্য। যতই দেখি এর সৌন্দর্য দেখা আর শেষ হয় না। গাইড তার পকেট থেকে একটি ছোট টর্চ লাইট জালিয়ে আলো কমিয়ে বাড়িয়ে এবং বিভিন্ন এংগেল থেকে তাজমহলের দেয়ালে ফেলে দেখালেন। আলোর একেক রকম তীব্রতায় একেক রকম সৌন্দর্য দেখাচ্ছিল। তাতে গাইড বুঝালেন “তাজমহলের সৌন্দর্য দিনের ও রাতের সুর্যের আলো ও চাদের আলোয় বিভিন্ন তীব্রতায় বিভিন্ন রকম হয়। তাই সারাজীবন দেখেও এর সৌন্দর্য দেখে শেষ করতে পারবেন না। সম্রাট শাহজাহানকে তার ছেলে সম্রাট আওরঙ্গজেব বন্দী করে রেখেছিলেন যমুনা নদীর ঐপাড়ে। তিনি ওখানে বসে দূর থেকে তাজমহলের সৌন্দর্য উপভোগ করলেও আংশিক উপভোগ করতে পেরেছেন।” আমি এর সৌন্দর্য কিছুটা উপভোগ করলাম রাত অবধি। কিন্তু আমি এর সৌন্দর্য ভাষায় বর্ণনা করতে পারব না। রাতে ফিরে এলাম হোটেলে। সিএমইর দ্বিতীয় দিন খুব ইম্পোর্টেন্ট টপিক্স ছিল। সেদিন বিকেল পর্যন্ত সিএমইতে ছিলাম। সন্ধায় প্যাথলজিস্টদের পরিবেশিত মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল। উপভোগ করে গ্রান্ড ডিনার খেয়ে হোটেলে ফিরলাম। পরেরদিন নাস্তা করে আগ্রা থেকে রওনা দিলাম আবার দিল্লীর উদ্দেশ্যে। আগ্রায় থাকা হলো দুই দিন দুই রাত। ফেরার সময় প্রথমেই দেখলাম সম্রাট শাহজাহান যে প্রাসাদে বন্দী ছিলেন সেই প্রাসাদ। সম্রাট শাহজাহান নাকি আরেকটা সৌধ নির্মান করা শুরু করছিলেন নদীর ওপার কালো পাথর দিয়ে। তখনই তাকে তার ছেলে আওরঙ্গজেব ক্ষমতাগ্রহন করে বাবাকে মাথাখারাপ আখ্যা দিয়ে প্রাসাদে বন্দী করে রাখেন। এবং তাজমহল দেখার সুযোগ করে দেন দূর থেকে। তাজমহল সাদা মর্মর পাথরের তৈরি।

আরও কিছুদুর চলার পর পেলাম দিকান্দারা যেখানে সম্রাট আকবরের সমাধি সৌধ। দেখার জন্য ভিতরে প্রবেশ করলাম। প্রবেশ করার সময় সামনে ঝুকে বাকা হয়ে প্রবেশ করতে হলো কারন ছাদ একটু নিচু ছিল। আমি গাইডকে প্রশ্ন করেছিলাম
– ছাদ এত নিচু কেন?
– এই সমাধি সম্রাট তার জীবদ্দশায় বানিয়ে গিয়েছিলেন কৌশল করে যেন কেউ এখানে এলে মাথা নিচু করে আসে। এখানে আরেকটা বিশেষত্ব আছে সেটা হলো একটি কথা সাতবার প্রতিধনিত হয়। আমি খাদেমকে অনুরোধ করলাম শুনিয়ে দেখানোর। তিনি বললেন “ইলাহ।” সাতবার ইলাহ শব্দের প্রতিধ্বনি হলো। আমি বললাম “আপনি ইলাহ শব্দ কেন উচ্চারণ করলেম?” খাদেম বললেন “আমাদের মাবুদ ইলাহ।” সম্রাট আকবর তাই প্রচার করেছেন দীন-ই-ইলাহিতে।

চলছিলাম দিল্লীর দিকে। পথে পরলো মথুরা। হিন্দু ধর্ম মতে শ্রীকৃষ্ণের মামাবাড়ি যেখানে তার মামা তাকে বন্দী করে রেখেছিলেন। সাথে বিরাট এক মন্দির। মন্দির ঘুরে ঘুরে দেখলাম। অনেক হিন্দু এসেছেন পুণ্য অর্জন করতে। সকাল সাড়ে এগারোটার সময়ই মন্দির বন্ধ করে দেয়া হল। কারন, সেদিন ছিল শুক্রবার। মন্দিরের উত্তর পাশেই মাত্র ২০/২৫ ফুট কাছেই বিরাট মসজিদ। নির্মাণ করেছিলেন সম্রাট আলমগির (আওরঙ্গজেব)। মসজিদের নাম মসজিদে আলমগির। মন্দিরের নাম মথুরার মন্দির। এত বড় মন্দির ও এত বড় মসজিদ পাশাপাশি। হিন্দু মুসলিম সহবস্থানের এক অনন্য উদাহরণ রেখে গেছেন মোগল মুসলিম সম্রাট আলমগির। সম্রাট আলমগির ধার্মিক ছিলেন। তার সংকলিত একটি ফতোয়ার গ্রন্থ আছে। নাম ফতোয়া-ই-আলমগিরি। মন্দিরের গেট থেকে এক গ্লাস করে ঘোল কিনে খেলাম। কারন, আমি শুনেছিলাম যে যিনি মথুরায় যান তিনি যেন এক গ্লাস ঘোল কিনে খান। এত স্বাদের ঘোল আর কোথাও পাওয়া যায় না।

ওখান থেকে চলে এলাম দিল্লী শহরে। ঘুরে ঘুরে কুতুব মিনার দেখলাম। কিছু ছবি উঠালাম সেখানে স্বপ্নার সাথে। সেখান থেকে চলে গেলাম রেড ফোর্ট বা লাল কেল্লায়। সম্রাট শাহজাহানের কির্তি এটা। এখানে রাতে লাইট এন্ড সাউন্ড শো হয়। এটা নাকি দেখার মতো। কিন্তু আমাদের সময় ছিল না দেখার। এদিকে সঞ্জয়ের ডিউটি শেষ হয়েছে। সে আমাদেরকে শেষ হোটেলে পৌছে দিয়ে বিদায় নিবে। তাই, চলে এলাম। সঞ্জয়কে আমাদের ভাড়া দিতে হয় নি। ভাড়া দিবে টাভেল এজেন্সি। সে একটা খাতা দিয়ে মন্তব্য লিখতে বলল যে সে কেমন সার্ভিস দিয়েছে। ইকবাল খুব ভালো করে তাকে রিকমেন্ড করলো। ইকবাল বলল “সঞ্জে, তুমি খুব ভালো ছেলে। তোমাকে আমরা ভুলব না। তোমার টেলিফোন নাম্বার দাও।” সঞ্জয় টেলিফোন নাম্বার দিল। আমরা হ্যান্ডসেক করে ধন্যবাদ দিয়ে তাকে বিদায় দিলাম। পরেরদিন টুকটাক কেনাকাটা করে দুপুরের পর রাজধানী এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠলাম। ফেরার সময় আমাদের মধ্যে যাওয়ার দিনের মতো অতটা স্পৃহা ছিল না। সবাই যেন কেমন চুপচাপ ছিলাম ট্রেনে। ক্লান্ত হয়ে শুয়ে শুয়ে এ কদিনের জার্নিতে কি কি দেখলাম তা মনে করতে চেষ্টা করলাম। মনে পড়লো সম্রাট হুমায়ুনের সমাধিস্থল, জয়পুরের পিংক সিটি, যন্তর মন্তর, রাজমন্দির সিনেমাহল, রব মে বানানে জুডি সিনেমা, আম্বর ফোর্ট, ফতেহপুর-সিক্রির সম্রাট আকবরের দুর্ঘ, রাজস্থানের মরুময় রাস্তা পাগড়ি পরা ছেলেগুলি, ঘুমটাপরা মেয়েগুলি, আগ্রার তাজমহল, ভিনয় কুমার, সম্রাট শাহজাহানের বন্দী জীবনের প্রাসাদ, সিকান্দারায় সম্রাট আকবরের সমাধি সৌধ, মথুরার মন্দির, ঘোল, মসজিদে আলমগির, কুতুবমিনার, রেড ফোর্ট, আরো কত কি! আকবেরের সরাইখানা, জাহাঙ্গীরের সমাধি ও সালিমার গার্ডেন আমি ২০০৩ সনেই দেখে এসেছিলাম লাহোর গিয়ে। সেগুলিও মনে পড়লো। শেষে মনে পড়লো আমাদের এ কদিনে ভ্রমণ সংগী ড্রাইভার কাম গাইড সঞ্জয়কে। ভেবেছিলাম দেশে গিয়ে সঞ্জয়কে ফোন দেব। কিন্তু আর দেয়া হয় নি। ইকবাল ফোন দিয়েছিল কি না আমি জানি না। ইকবাল তাকে ভুলে নাই। মাঝে মাঝে ইকবালের সাথে সঞ্জয়কে নিয়ে কথা বলি। ইকবালের সঞ্জে। আমি যোগাযোগ না করলেও সঞ্জয়কে আমার মনে পড়ে। মানুষ প্রয়োজনের সময় মানুষকে ভালোবাসে, যোগাযোগ রাখে। প্রয়োজন শেষ হলে ভালোবাসলেও, মনে পড়লেও যোগাযোগ রাখতে চায় না বা যোগাযোগের প্রয়োজন মনে করে না।
১৬/৮/২০১৯ খ্রী