দীপু ডিজে

দীপু ডিজে

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

দীপু নামের শেষে ডিজে দেয়া হয়েছে তার ব্যাখ্যা আমি দেব। নামের আগে আপনারা আর জে লিখতে দেখেছেন। এই আর জে মানে কি সেটা আমি বলে নিচ্ছি। যে ব্যক্তি রেডিও সম্প্রচার করেন তাকে আমেরিকানরা বলে রেডিও ব্যক্তিত্ব (Radio personality), ব্রিটিশরা বলে রেডিও উপস্থাপক (Radio presenter)। এমন ব্যক্তিত্বকে ভারত ও পাকিস্তানে বলা হয় রেডিও জকি (Radio Jocky), সংক্ষেপে আর জে। এদের নামের আগে আর জে লেখা হয় । যেমন, আর জে কিবরিয়া। আর জে কিবরিয়া আমার পছন্দের আর জে। রেকর্ডকৃত সংগীত ডিস্ক থেকে পৃথক পৃথক ভাবে নির্বাচন করে তা রেডিওতে চালানো ব্যক্তিত্বকে সংক্ষেপে ডিস্ক জকি বা “ডিজে” বলা হয়। সম্প্রচারিত রেডিও ব্যক্তিত্বগুলির মধ্যে টক রেডিও হোস্টস, এএম / এফএম রেডিও শো হোস্ট এবং স্যাটেলাইট রেডিও প্রোগ্রামের হোস্ট অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। আমার একজন ভাতিজা দেখি ফেইসবুকে নামের আগে আর জে লিখেছে। সে এক জন আর জে না। তারপরও আর জে লেখেছে। তাই, তাকে ফ্রেন্ড লিস্ট থেকে বাদ দিয়েছি।

তবে কথা হলো আমি যাকে নিয়ে আজকে লিখব তার নামের শেষে ডিজে কেন। এই ডিজে ডিস্ক জকি না। এই ডিজে মানে হলো দিনাজপুর। এটা আমার নিজস্ব শব্দ। মোবাইল কন্টাক্ট লিস্টে যাদের নামের পরে ডিজে কথাটা আছে তারা দিনাজপুরের। যেমন, দীপু ডিজে, ইউনুস ডিজে, রামেন্দু ডিজে, বুলু ডিজে। আমার আজকের লেখার দীপু ডিজে মানে হলো দিনাজপুরের দীপু। ওর ভালো নাম দীপ্তেন্দু বসাক। ওর ছোট ভাইয়ের নাম রামেন্দু বসাক।

আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে বদলি হয়ে ২০০৮ সনের ১ জানুয়ারি দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে যোগদান করি। যার বর্তমান নাম এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ। আমি যেহেতু সেই সময়ের কথা লেখব সেহেতু আমার লেখায় দিনাজপুর মেডিকেল কলেজই থাকবে। সে সময় ছাত্রদের পরিচয় ছিল ব্যাচ নাম্বার হিসাবে। ব্যাচের আগে ডিজে ব্যবহার করতো। যেমন, ডিজে-২১ সাব্বির। মানে হলো দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের ২১ নাম্বার ব্যাচের সাব্বির। আমার প্যাথলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন ডাঃ রুহিনী কুমার দাস। তার পরের কক্ষেই আমি বসতাম। আমি সব কাজকর্মে কম্পিউটার ডিপেন্ডেন্ট ছিলাম। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে থাকতে আমার কম্পিউটারের সমস্যা ছিল না। বিভাগীয় প্রধান মীর্জা হামিদুল হক স্যার আমার জন্য কম্পিউটারের সব কিছুর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। আমার বাসায়ও নিজের কম্পিউটার ছিল। প্রাইভেট চেম্বারেও কম্পিউটার ছিল। এই তিন জায়গাতে ইন্টারনেটও ছিল। দিনাজপুর গিয়ে কম্পিউটার না থাকাতে আমি বিরাট সমস্যায় পড়ে গেলাম। প্রিন্সিপাল নজরুল ইসলাম স্যার আমার সমস্যার ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন। তিনি নিজেই আস্বাস দিলেন যে এরপর যে কম্পিউটারটা আসবে সেটা আমার জন্য বরাদ্ধ দিবেন। অগত্যা কিছু কিছু কাজ আমি প্যাথলজি বিভাগের অফিস রুমের কম্পিউটার দিয়ে করতে থাকলাম। অফিস সহকারী ছিল দীপ্তেন্দু বসাক ওরফে দীপু। তাকে দেখেই আমার পছন্দ হয়ে গেলো। নায়ক নায়ক চেহারা। কাজ কম। তাই বেশীক্ষণ চেয়ারে বসেন না। গলির সামনে রঙিন চশমা পরে স্টাইল করে দাড়িয়ে থাকেন। এর ওর সাথে গল্প করে সময় কাটান। আমি টারগেট নিলাম ইনাকে কাজে লাগাতে হবে। আমি লক্ষ্য করলাম তিনি আমাকে এড়িয়ে চলতে চান। আমি তার কক্ষে গেলে চেয়ার ছেড়ে বাইরে চলে যায়। আমি তার চেয়ারের পেছনে রাখা কম্পিউটার দিয়ে কাজ করে পেন ড্রাইভে সেইভ করে রাখি। এমনি ভাবে চলে গেলো ফেব্রুয়ারী মাস। মাঝে কয়েকবার মন্ত্রণালয়ে গিয়েছি বদলি হয়ে ময়মনসিংহ ফিরে আসতে। কিন্তু কেউ কথা শুনেনি। তত্বাবধায়ক সরকার। আমার কথা শুনে সচিবদের কি দরকার? সবারই এক কথা “বাংলাদেশের ভিতরেই তো আছেন। কিছুদিন চাকরি করেন। তারপর বদলির দরখাস্ত দেন। ”

মার্চ মাস এসে গেলো। দিনাজপুরে একটু আগেভাগেই গরম এসে যায়। ওখানকার গরম যেমন তীব্র, শীতও তেমন তীব্র। অসহ্য শীত ও অসহ্য গরম। শুধু মানুষগূলো ঠান্ডা মেজাজের। কাউকে যদি শাস্তি দিতে চান তাকে দিনাজপুর বদলী করে দিতে পারেন। আমি ফ্যান না ছেড়েই অফিস কক্ষে বসে কাজ করছিলাম। আমি এতটুকু গরমে অভ্যস্ত হয়েছিলাম। দুপুরের দিকে কক্ষে প্রবেশ করল এক যুবক। সামনের চেয়ারে বসলো। জিজ্ঞেস করলো “দাদা, কই।” আমি বললাম “সামনে গেছেন।” ছেলেটা বুকের বুতাম খুলে বুকে কয়েকটা ফু দিয়ে বলল “আজ খুব গরম পড়েছা, তাই না ভাই?” আমি বললাম “জি।” সে বলল “আপনি ফ্যান দেন নাই ক্যান? আপনার গরম করে না?” আমি কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিলাম “আমার গরম সহ্য হয়।” সে বিরক্তের স্বরে বললো “ফ্যানের সুইচটা অন করে দেন।” আমি ভদ্রভাবে উঠে সামনে গিয়ে তার পেছন দিকে মাথার কাছের ফ্যানের সুইচটা অন করে শান্তভাবে বসে কাজ করতে থাকলাম। কিছুক্ষণ পর শরীর ঠান্ডা হলে ছেলেটা আবার জিজ্ঞেস করলো “কই দাদা কখন আসবে?” এবার আমি আমার মুড পরিবর্তন করে কথা বলতে থাকলাম। বললাম “দীপু তেমন কাজ করে না। বেশী সময়ই বাইরে থাকে। খুবই আরামে আছে। ওর লক্ষণ আমার কাছে ভালো মনে হচ্ছে না। আপনি কে? কি জন্যে এসেছেন?” ছেলেটা বললো “আমি তার ছোট ভাই। একটা কাজে এসেছি।” আমি মুড নিয়ে কাজ করতে থাকলাম। ছেলেটা কিছুক্ষণ আমার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখলো। তারপর সোজা দাড়িয়ে বললো “আমার মনে হয় আপনি স্যার। আদাব স্যার। আমার ভুল হয়ে গেছে স্যার। আদাব স্যার। মাফ করে দেন স্যার। আমার বেয়াদবি হয়ে গেছে স্যার। দাদা জানলে আমাকে মেরে ফেলবে। আমি স্যার আপনাকে দিয়ে ফ্যানের সুইস অন করিয়েছি। বিরাট অন্যায় হয়েছে। আমি চিনতে পারিনি স্যার। দাদা যেনো কিছুতেই জানতে না পারে, স্যার। মাপ করে দেন স্যার।” এভাবে ছেলেটি অনেকক্ষণ কাচুমাচু করে মাপ চেতে থাকলো। আমি বেশ মজাই পাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ মজা উপভোগ করে মিটিমিটি হেসে বললাম “ঠিক আছে। কোন অন্যায় হয়নি। আমার গায়ে তো স্যার লেখা নেই। কোন স্যার তো অফিস সহকারীর রুমে বসে কাজ করেন না। কাজেই এই রুমে আমি স্যার না। তুমি ঠিকই বলেছ। যেহেতু আমি এই রুমে বসে আছি আমার মর্যাদা এখন অফিস সহকারীর মতোই। কাজেই তুমি আমাকে দিয়ে ফ্যানের সুইস অন করিয়ে ভুল করোনি। তোমার নাম কি? দীপু তোমার কেমন ভাই?” ছেলেটি দাড়িয়ে জোড় হাত করে বললো “স্যার, আমাকে মাফ করে দিন। আমি দাদার সহোদর ছোট ভাই। দাদা শুনলে আমাকে মেরেই ফেলবে।”

– তোমার নাম কি?

– স্যার, আমার নাম রামেন্দু বসাক। সবাই রামেন্দু বলে ডাকে।

– তোমরা ক’ভাইবোন?

– স্যার, আমরা দুই ভাই এক বোন।

– তুমি লেখাপড়া কোন পর্যন্ত করেছো?

– স্যার, আমরা গরীব মানুষ। লেখাপড়া তেমন করতে পারিনি। এইট পাশ করেছি। দাদা আই কম পাস করেছেন। সংসারের কাজ করতে হয় আমাকেই। আমি সব সময় দাদার কথামতো চলি। দাদা আমাকে মেরেই ফেলবেন। মাফ করে দেন স্যার।

– বিয়ে করেছো?

– জি, স্যার। একটা ছেলে আছে। দাদারও এক ছেলে।

– বউরা কি চাকরি করে?

– না, স্যার।

আমি কম্পিউটার বন্ধ করে মুস্কি হেসে “ভুল হয়নি” বলে আমার রুমে চলে গেলাম।

মাঝে মাঝে দীপুর রুমে গিয়ে দেখতাম অফিসের কাজ করছে কম্পিউটারে। আমাকে দেখে উঠে যেতো। একদিন আমি তাকে উঠতে নিষেধ করলাম। বললাম

– কি করছেন?

– রুহিনী স্যার একটা দরখাস্ত টাইপ করতে দিয়েছেন।

আমি তার পেছনে গিয়ে দাড়ালাম। তিনি দাড়িয়ে পড়লেন। আমি তার কাধে চাপ দিয়ে বসিয়ে দিলাম। বললাম

– বসে কাজ করুন।

চাপ খেয়ে দীপু বসে গেলেন। বললাম

– কম্পিউটার শিখেছেন কোথা থেকে?

– স্যার, অফিস থেকে ৪ সপ্তাহের ট্রেইনিং করতে পাঠিছিলেন মহাখালীতে। কিছুটা শিখেছি।

– আপনি চাকরিতে প্রবেশ করেছেন কখন?

– ১৯৯৫ সনে স্যার।

– তখন আপনার পোস্টের নাম কি ছিল?

– অফিস এসিস্ট্যান্ট কাম টাইপিস্ট।

– টাইপ করা শিখেছিলেন টাইপ মেশিন দিয়ে?

– জি, স্যার। তখন তো কম্পিউটার ছিলো না। টাইপ করেই চিঠি পত্র দেয়া হতো।

– আগেও ১৯৯৮ সনে আমার এখানে বদলির অর্ডার হয়েছিল। সেই অর্ডার আমি ক্যান্সেল করিয়েছিলাম। তিন মাসের মধ্যে আমি যোগদান না করাতে প্রিন্সিপাল মতলুবুর রহমান স্যার আমাকে যোগদান করার জন্য রেজিস্ট্রি ডাকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠি টাইপ রাইটারে টাইপ করা ছিল। হয়তো আপনিই টাইপ করেছিলেন। কম্পিউটার আসাতে আপনার জন্য সুইধাই হয়েছে, তাই না?

– জি, স্যার।

– এটা কোন প্রোগ্রাম দিয়ে করছেন?

– স্যার, এম এস ওয়ার্ডে।

– এই ডকোমেন্ট আপনি টাইপ করলেন?

– স্যার, আগেই টাইপ করা ছিলো। কপি করে নিয়েছি।

– কোথা থেকে কপি করেছেন?

– স্যার, এই ফাইল থেকে।

– আমি আপনাকে একটা টিপস শিখিয়ে দিচ্ছি। আপনি মাত্র দু’টি অক্ষর লিখে স্পেসবারে চাপ দিবেন। দেখবেন বিরাট বিরাট ফাইল তৈরি হয়ে যাবে নিমিষে। আপনার এই কম্পিউটারে সবচেয়ে বড় ফাইল কোনটা?

– স্যার, এইটা। ২৭ পৃষ্ঠা লম্বা।

– এটা ১০০ পৃষ্ঠা থাকলেও কোন সমস্যা নেই। মাত্র দু’টি অক্ষর টাইপ করে স্পেস বারে চাপ দেব সেকেন্ডের মধ্যে আরেক্টা ফাইল তৈরি হয়ে যাবে।

এই বলে তাকে ১০/১২ টা টিপস শিখিয়ে দিলাম। দীপু উৎফুল্ল হলো। এরপর থেকে দীপু আমার দিকে এটেনশন দেয়া শুরু করলো। প্রতিদিন তাকে কিছু না কিছু টিপস শিখাতে থাকলাম। তিনি আর বাইরে ঘুরাফেরা না করে কম্পিউটার নিয়ে মেতে থাকলেন। তিনি যা শিখলেন তা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে লাগলেন। বন্ধুদেরকে আমার রুমে নিয়ে এসে পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলেন। সবাই যেন আমাকে দেখতে পেয়ে খুশী। দীপুর মাধ্যমে আমি সকল কর্মচারীদের অন্তরের ভিতর ঢুকে গেলাম।

একদিন দেখলাম দীপু আমাদের ডিপার্টমেন্টের করিডোরে দাড়িয়ে মিটিমিটি হাসছেন সামনের গেইটের দিকে তাকিয়ে। আমি দীপুকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম

– দীপুকে খুশী খুশী মনে হচ্ছে?

– স্যার, ঐ স্যারের কান্ড দেখে হাসি পাচ্ছে।

– কেনো, স্যার অত্যন্ত সন্মানিত একজন সিনিয়র টিচার তার কাণ্ড দেখে আপনার হাসি পাবে কেনো?

– স্যার, আমাকে দিয়ে এক প্রশ্নপত্র টাইপ করালেন। চেক করে প্রিন্ট করালেন। তারপর প্রিন্টেড কপি ফাইলের ভিতর রাখলেন। আমাকে ফাইলটা ডিলিট করতে বললেন। আমি ডিলিট বাটনে চাপ দিয়ে ডিলিট করে দিলাম। তারপর আমার মুখের দিকে তাখিয়ে মুস্কি হেসে বললেন ‘এখন আর প্রশ্ন আউট করতে পারবেন না।’ ফাইল নিয়ে চলে গেলেন খুশী হয়ে।

– তাতে হাসির কি আছে?

– স্যার তো জানেন না যে ডিলিট করার পর ফাইল চলে যায় রিসাইকল বীনে। আমি ইচ্ছা করলে এখন রিসাইকল বীন থেকে বের করে ছাত্রদের কাছে আউট করে দিতে পারি। এইসব স্যারদের জন্যই প্রশ্ন আউট হয়। তাই হাসি পাচ্ছে।

– ঠিক বলেছেন। তাহলে কি করা উচিৎ ছিলো?

– উচিৎ ছিল রিসাইকল বীন থেকে পারমানেন্টলি ডিলিট করিয়ে চলে যাওয়া। তাহলে আমি আর এটা খুঁজে পেতাম না।

– আমি পারতাম।

– কিভাবে?

– আছে কোথাও না কোথাও থেকে যায় কম্পিউটারে। আমি বের করতে পারবো।

– আশ্চর্য!

– জানার আছে অনেক কিছু। লেগে থাকেন। ধীরে ধীরে শেখাবো। যখন স্যার সাথে থেকে প্রশ্ন টাইপ করান তখন স্যারের অলক্ষে কন্ট্রোল সি চেপে প্রশ্ন কপি করে রাখে দুইনম্বরিরা। এদিক সেদিক তাকিয়ে স্যারের দৃষ্টি অন্যদিকে নিয়ে অন্য ফোল্ডারে কপি করে রাখে অনেকে। তারপর আউট করে দেয়।

– তাইলে কি করা উচিৎ?

– নিজের প্রশ্ন নিজের কম্পিউটারে টাইপ করা উচিৎ। তাইলে প্রশ্ন আউট বন্ধ করা যাবে।

দীপুকে পাশে নিয়ে যখন কম্পিউটারে কাজ করতাম দীপু একটা কথা বারবার বলতেন

-স্যার, আপনি এত কিছু জানেন! স্যার, আপনি এতো ভালো মানুষ! আমি প্রথম দিকে বুঝতে পারিনি। তাই আমি আপনাকে এড়িয়ে চলতাম। তাছাড়া আপনার আসার আগে একজনে আপনার সম্পর্কে আমাকে ভুল ধারণা দিয়েছিলেন। তাই ভয়ে ভয়ে দূরে থেকেছি।

– কেমন ধারণা দিয়েছেন?

– বলেছেন, নতুন যে স্যার আসবেন, তিনি কিন্তু ডেঞ্জারাস। সাবধান! এসব কথা শুনেছি ।

আমি হেসে বলতাম “ঠিকই। খারাপদের জন্য আমি ডেঞ্জারাস। দুই নম্বরি কাজ আমি পছন্দ করি না। কাজেই, দুই নম্বরি কাজ যারা করে তাদের জন্য আমি ডেঞ্জারাস। আপনি কি দুই নম্বরি কাজ করেন?” দীপু হেসে বলেন “দুই নম্বরির প্রশ্নই উঠে না। গরীব মানুষের ছেলে আমি। চাকরি নিতে একটা পয়সা লাগেনি। দুই নম্বরি করব কেন? আমাদের সবাইকে বারী স্যার চাকরি দিয়েছেন। বারী স্যার অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন। সবাইকে চাকরি দিয়েছেন। একটা পয়সাও লাগেনি।”

– কোন বারী স্যার? আমাদের ময়মনসিংহের সাইফুল বারী স্যার?

– না, স্যার। এই স্যার তো পরে এসেছেন। যিনি প্রথম প্রিন্সিপাল ছিলেন। ওনার নাম ছিলো এস এ বারী। ব্রিটিশ বারী নামে পরিচিত ছিলেন। খুবই ভালো মানুষ। আমাদের এই সাইফুল বারী স্যারও ভালো মানুষ স্যার। এখনকার প্রিন্সিপাল নজরুল ইসলাম স্যারও ভালো মানুষ। মুলতঃ দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের সব প্রিন্সিপালই ভালো মানুষ ছিলেন। দেখবেন বর্তমান প্রিন্সিপাল নজরুল ইসলাম স্যার কোন মিটিং করার সময় একা মঞ্চে বসেন না। সব প্রাক্তন প্রিন্সিপাল স্যারদের নিয়ে বসেন।

সেসময় সাইফুল বারী ও মাসুদুর রহমান স্যারও এই মেডিকেল কলেজে কর্মরত ছিলেন। নজরুল ইসলাম স্যার মিটিং করার সময় এই দুইজনকে মঞ্চে বসাতেন তার দুপাশে। তিনি আমাকে বলেছেন “তারা এক সময় প্রিন্সিপালের চেয়ারে বসতেন। তাদেরকে আমি সামনের সাধারণ শিক্ষকদের আসনে বসা দেখতে চাই না। তাদের মনে কষ্ট আসতে পারে।”

২০০৭ ও ২০০৮ সন ছিল তত্বাবধায়ক সরকার শাসিত সময়। দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ থেকে প্রভাবশালী অনেক শিক্ষককে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে এনে ডাম্পিং করা হয়। আমি গুণে দেখেছি এক মিটিং-এ প্রিন্সিপাল ও প্রাক্তন প্রিন্সিপাল ৫ জন উপস্থিত আছেন। বেশ কিছু ফুল প্রফেসর আছেন। এতো কোলালিটি সম্পন্ন টিচার অন্য মেডিকেল কলেজে বিরল। তার আগে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের বদনাম ছিল যে এখানে টিচার নাই, পড়াশুনা হয় না, ১৪ নম্বর মেডিকেল কলেজ, ইত্যাদি। তত্বাবধায়ক সরকার এসে এমন কান্ড করে ফেললেন যে এদের বসার জায়গা দিতে পারলেননা। লাভ হলো ছাত্রদের। ছাত্ররা কোয়ালিটি সম্পন্ন অনেক টিচার পাওয়াতে লেখাপড়ার কোয়ালিটি বেড়ে গেলো। ফলশ্রুতিতে কি হলো? আপনারা দেখবেন সেই সময়ের ছাত্ররা ডাক্তার হয়ে অনেকেই পোস্ট গ্রাজুয়েট করে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে সুনামের সাথে শিক্ষকতা করছে অথবা পোস্ট গ্রাজুয়েট পড়াশুনা করছে। অথবা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। অনেক টিচার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে চাকরি ইস্তফা দিয়েছে। সৈয়দ ভাইকে বদলী করা হয়েছিল চিটাগং থেকে দিনাজপুরে। আমাদের ডিপার্টমেন্টে। তিনি ১৯৯৪ সনে এম ফিল পাস করেছিলেন। আমার এক বছর আগে। কাজেই এক সাথে কোর্স করেছি। তিনি যেদিন চিটাগং থেকে রওনা দিতেন তার আগেরদিন কয়েকবার আমাকে মোবাইল করতেন “সাদেক, আগামীকাল আসছি। এতটার সময় রওনা দেব। পরের দিন এতটার সময় দিনাজপুর পৌছার সম্ভাবনা আছে।” আমি বলতাম “আসুন। সমস্যা নাই। ” তিনি চিটাগং বাসা থেকে বের হয়ে একটা ফোন দিতেন “সাদেক, আমি রওনা দিয়েছি।” আমি বলতাম “আসুন। সমস্যা নাই।” কয়েক ঘন্টা পর আবার ফোন করতেন “সাদেক, আমি কুমিল্লা এসে নাস্তা করছি। সব ঠিক আছে তো?” আমি নির্লিপ্ত ভাবে বলতাম “সব ঠিক আছে।” আরও কয়েক ঘন্টা পর মোবাইল করতেন “সাদেক, আমি ঢাকা ছেড়েছি। ঠিক টাইমেই পৌঁছে যাব। চিন্তা করিয়েন না।” আমি বলতাম “আসুন, চিন্তা করি না।”

– সাদেক, আমি বগুড়া ফুড ভিলেইজে নাস্তা করছি।

– করুন।

– সাদেক, আমি গাইবান্ধা পারি দিলাম। গরম পানির গিজার্ডটা অন করে রাখুন।

– আসুন। পানি গরমই থাকবে।

– আমাকে এসে গোসল করে নাস্তা করে ঘুমাতে হবে।

– ঠিক আছে আপনি আসুন।

অবশেষে তিনি এসে পৌঁছতেন দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের ডর্মেটরিতে। গরম পানি দিয়ে গোসল করে জামাকাপড় গায় দিতে দিতে এবং নাস্তা করার সময় এবং অন্য সময় প্রায়ই বলতেন “সাদেক, এত কষ্ট দেয়ার কোন মানে হয়? এ এলাকায় টিচার নাই? চিটাগং থেকে কেনো দিনাজপুর পাঠাতে হবে। সাদেক, আমি চাকরিটা ছেড়ে দেবো।” তিনি যতবার বলেছেন “আমি চাকরিটা ছেড়ে দেবো” আমি ততবারই বলেছি, খুব শান্ত ও নির্লিপ্ত ভাবে “ছেড়ে দিন।” একবারও বলিনি “ভাই, সরকারি চাকরি। ছেড়ে দিয়েন না। কোন রকম ধরে রাখুন, এক সময় কাজে লাগতে পারে।” এমনই একদিন তিনি চিটাগং থেকে দিনাজপুর পৌছে সকালবেলা আমার রুমে এসে বাথ রুমে যাওয়ার জন্য তারাতাড়ি কাপড় ছাড়ছিলেন। ব্যাগ থেকে লুঙ্গি বের করে বেডে রাখলেন। আমি আমার লুঙ্গি খুলে প্যান্ট পড়ে চেয়ারের উপর আমার লুঙ্গি রেখেছিলাম। দেখলাম তিনি চট করে আমার লুঙ্গিটা নিয়ে গলা ঢুকিয়ে দাঁত দিয়ে কামড় দিয়ে লুঙ্গিটা আটকিয়ে প্যান্টের চেইন টানতে টানতে যা বলছিলেন তা যেহেতু আমার আগে থেকেই মুখস্থ ছিল তাই বুঝে ফেললাম। তিনি বলছিলেন “সাদেক, আমি এবার চাকরিটা ছেড়েই দেব।” আমি শুধু শান্তভাবে বললাম “ছেড়ে দেওয়াই ভালো।” মনে মনে জিজ্ঞেস করলাম “ভাই, আপনে যে আপনার লুঙ্গি বাদ দিয়ে আমার লুঙ্গি পরতেছেন সেটা খেয়াল আছে?” বাথরুমের ভিতরে গিয়ে হঠাৎ চিতকার দিয়ে বলেন “উরে বাপরে গরম পানি।” তিনি ঠান্ডা পানি মনে করে গরম পানি মাথায় ছেড়েছিলেন। বুঝলাম চিটাগাং থেকে দিনাজপুর আসতে আসতে মাথার সব আইলাইয়া গেছে। তিনি তার লুঙ্গি মনে করে আমার লুঙ্গি পরেছিলেন এটা তাকে বুঝতে দেইনি। আমি অন্য কাউকে বলিনি। আপনারা তাকে বইলেন না যেনো। মাইন্ড করবেন। একদিন তিনি মোবাইল করে বললেন “সাদেক, আপনার ভাবির লিভারে ক্যান্সার হয়েছে। ইন্ডিয়া নিয়ে যাচ্ছি। এবার চাকরিটা ছেড়েই দেব। কি বলেন?” আমি বললাম “ছেড়েই দেন।”

ভাবি মারাই গেলেন। তিনি চাকরিটা ছেড়েই দিলেন। কিন্তু আমরা কষ্ট করে চাকরিটা করতে থাকলাম। পূর্ণ ৮ বছর দীপুদের জেলায় কাটালাম। দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, সৈয়দপুর গাইবান্ধা জেলার রোগীদের সেবায় রত রাখলেন আমাকে মহান আল্লাহ। তিনিই ভালো জানেন। কেনো রাখলেন।

তবে দীপু আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন “স্যার, আপনি তো ভালো মানুষ। আপনাকে এতদূর বদলী করলো কেনো এটাতো বুঝছি না।” আমি দীপুকে এভাবে বুঝালাম “আল্লাহ আমার জন্য যা ভালো তাই করেন। এমনো হতে পারে আমার মেয়ে দীনা এই মেডিকেল কলেজে পড়ছে তার ভালোর জন্য আল্লাহ আমাকে পাঠালেন। আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এক টানা ১৪ বছর ছিলাম সব ধরনের সরকারের আমলেই। আমি কারো শত্রু ছিলাম না। তাই, কোন রাজনৈতিক সরকারই আমাকে বদলি করেনি। তত্বাবধায়ক সরকার মনে করেছে এই লোক এক জায়গায় ১৪ বছর ঘাপটি মেরে চাকরি করছে। একে পাঠিয়ে দাও দিনাজপুরে।”

দীপুকে কম্পিউটারের অনেক কাজ শিখালাম। শিখালাম অফিসের অনেক নিয়ম কানুন। আমাকে ছাড়া এখন আর কিছু বুঝে না। পারিবারিক ও আত্বীয় সজনের কোন সমস্যা হলেও আমার সাথে শেয়ার করে। ছেলের পড়াশুনা করানোর পরামর্শ ও করে আমার সাথে। এক দিন জিজ্ঞেস করলেন “স্যার, ডর্মেটরিতে আপনার সাথেই তো থাকেন মেডিসিনের তিমির বরন বসাক স্যার। উনি কেমন স্যার?

– ভালোই তো। কেন?

– মানে, ওনারা তো বসাক পরিবারের। আমাদের বসাক পরিবারের এক মেয়ে দিয়ে ওনার সাথে বিয়ের প্রস্তাব দিতে চাচ্ছে।

– টিমির দা তো আমার এক বছরের সিনিয়র। উনি বিয়ে করবেন কেন?

– উনি অবিবাহিত।

– তাই নাকি?

এমন এমন কথাও দীপুর সাথে আমার হয়েছে। একদিন দীপু বললেন ” স্যার, যে বেতন পাই, তাতে সংসার চলে না। বিকেলে কোন একটা চেম্বারে যদি ঢুকিয়ে দিতে পারতেন।” আমি মনে মনে তা-ই চাচ্ছিলাম। তাকে নিয়ে নিয়ে নিলাম আমার চেম্বারেই। আমি তাকে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার রিপোর্ট তৈরি করা শিখিয়ে চেম্বারে কম্পিউটার অপারেটর চাকরি দিলাম। কৃতজ্ঞতার সাথে মনোযোগ দিয়ে আমার চেম্বারে কাজ করতে লাগলো। অল্পদিন পর তার ফ্যামিলি নিয়ে এলো শহরে বাড়ি ভাড়া করে। ছেলেকে সেইন্ট যোসেফ স্কুলে ভর্তি করে বেশ উৎফুল্ল হলো। সেই ছেলে এবার ঢাকার এআইইউবি থেকে কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এ গ্রাজুয়েট করে বের হবে। এক ছেলেই তার।

দীপুর ছোট ভাই রামেন্দু মাঝে মাঝে কলেজে ও চেম্বারে এসে আমার কাছে আসতো। ওর মনে হয় আমাকে ভালো লেগেছিলো। মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দিতো “স্যার, আমাকে মাফ করেছেন কি?” আমি মিটিমিটি হাসতাম। দীপুকে দেখতাম নেতাদের সাথে ঘুরাফেরা করতে। দীপুর প্রোমোশন হলো স্টোর কিপার পদে। ২০১০ সনে। স্টোর নিয়ে বেশী ব্যস্ত থাকায় আমার চেম্বারের বিকেলের চাকরিটা ছেড়ে দিলেন। ছোট ভাই রামেন্দু বসাকেরও চাকরি হলো এমএলএসএস পদে ২০১১ সনে । পোস্টিং দিলো প্যাথলজি বিভাগে। আমার কক্ষেই তার ডিউটি। এসেই আমার পা ছুয়ে বলল “স্যার, মাফ করে দিন।” আমি বললাম “এই পাগল, আমি কাউকে পা ছুতে দেই না।” সব শুনলাম। দীপু চেষ্টা করে আমার রুমেই তার ভাইয়ের পোস্টিং দিয়েছে। সে বাড়িতে বলেছে “স্যারের মতো ভালো মানুষ হয়না। সবাইকে খুব ভালো বাসেন। সবাইকে ভালো বেসে কাজ করিয়ে নেন। স্যারের সাথে থাকলে অনেক কিছু শেখা যায়, ইত্যাদি।” আমি তাকে বুঝালাম “যতদিন আমার ভায়ে ভায়ে থাকবে ততদিন তোমার কোন সমস্যা হবে না। আমি যা বলবো তাই তুমি করবে। চেয়ারে বসবে না। রুমের সামনে টুল পেতে বসে থাকবে। আমি রুমে আসার আগে তুমি আসবে। টেবিল পরিস্কার করবে। ফার্নিচার মুছবে আমি আসার আগে। আমি চলে যাবার পর তুমি চলে যাবে। আমার উপদেশ না শোনলে তোমার ক্ষতি হবে। শোনলে তোমার উপকার হবে। কি উপকার হবে তুমি পরে বুঝতে পারবে।”

ঠিক, কথা মতোই রামেন্দু আমার রুমে ডিউটি করতে লাগলো। তার কাজের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে বার বার তাকে প্রিন্সিপাল অফিসে টান দিতে চেয়েছে। কিন্ত জোর হাত করে আমাকে বলেছে “যতদিন আপনি আছেন স্যার ততদিন আমাকে আপনার কাছে রাখবেন।” সব প্রিন্সিপাল আমাকে ভালো বাসতেন। তাই, আমি রামেন্দুকে আমার কাছেই রাখতে পেরেছি। ওর চাকরি হয় ২০১১ সনে। আমি ২০১৫ সনের শেষে চলে এসেছি। এই ৫ বছর রামেন্দু আমার কাছেই ছিল। দীপু স্টোর কিপার হয় ২০১০ সনে। যেদিন আমি বিদায় নিলাম আমি রামেন্দুর মুখের দিকে তাকাতে পারিনি। কারন, হঠাৎ যদি হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলি? রামেন্দুও আমার দিকে তাকাতে পারেনি। হয়তো তার ভিতরেও আমার মতোই অনুভূতি ছিল। তার সাথে আমি তেমন কথা বলতে পারলাম না। একবার তার কাঁধে হাত রেখেছিলাম। সে শান্তভাবে মাটির দিকে চেয়েছিল।

চলে আসার দু’দিন পর রামেন্দু ফোন দিল “স্যার, আমার মাথায় তীব্র যন্ত্রণা। দুই রাত ঘুম আসে নাই। আমি কি করবো বুঝতে পারছি না। ” আমি বললাম “সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি কয়েকদিন পরই আসতেছি। তোমার সাথে অনেক কথা আছে। আমি এসে বলবো। তুমি ঘুমিয়ে পড়।” বলে রামেন্দুকে ফাঁকি দিলাম। আমি জানি রামেন্দুর মনটা শিশুর মতো।

আসলে আমি গিয়েছিলাম কয়েক মাস পর। ততদিনে রামেন্দু সাভাবিক হয়েছে। রামেন্দু ও দীপু আমাকে মাঝে মাঝে ফোন করে জানায় দিনাজপুরের বিভিন্ন খবরাখবর। সে যে পড়ে এস এস সি পাস করেছে এটাও জানিয়েছে। দীপুর ছেলে এ আই ইউ বি তে ভর্তি হয়েছে। তাও জানিয়েছে। রামেন্দুর কিছুদিন আগে এক মেয়ে হয়েছে। সে বাইরে দাড়িয়ে আগে আমাকে ফোন করেছে “স্যার, খুশীর সংবাদ, আমার এই মাত্র মেয়ে হয়েছে।”

আজ দীপুকে ফোন দিয়ে বললাম “আপনার ফেইসবুক প্রোফাইলে রঙিন চশমা পড়া ছবিটা এবং রামেন্দুর একটা ছবি আমার মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে দিন।” দীপু দু’টি ছবিই পাঠিয়েছে সাথে সাথে। দীপু ডিজে।

১৯/৭/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

দীপু

রামেন্দু

পড়ে কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ দেখার জন্য ক্লিক করুন

http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/