দর্জি আব্দুল ওয়াহাব

দর্জি আব্দুল ওয়াহাব

(স্মৃতিচারণমূলক গল্প)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৯৫ সনে পোস্টগ্রাজুয়েট ডিগ্রী নেয়ার পরের বছর গুলোতে আমি ঘন ঘন সাইন্টিফিক বিষয়ে ট্রেইনিং নিতাম। ২০০০ সনের ফেব্রুয়ারি মাসের ২৩ থেকে ২৯ তারিখ পর্যন্ত আমি ঢাকার মহাখালীতে বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলে বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ লেখার উপর একটা ট্রেনিং প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করি। এমন অনেক প্রোগ্রামেই আমি অংশগ্রহণ করেছি। ফলে আমার এপর্যন্ত ৮৭টি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এরমধ্যে ২৭টি পাবমেড ইন্ডেক্স আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। পাঁচটি মেডিকেল জার্নাল সম্পাদনা করার সৌভাগ্য হয়েছে। যাহোক, আমি যখন ঢাকায় ট্রেনিং নিতাম ময়মনসিংহ থেকেই যাতায়াত করতাম। ময়মনসিংহ-ঢাকা রোডে তখন সবচেয়ে ভালো বাস ছিল পদ্মা গেইটলক। এই বাসটি রাস্তায় কোথাও যাত্রী নিতো না। অর্থাৎ গেইট লক থাকতো। দেড় দুই ঘন্টায় ঢাকায় যাওয়া যেতো। সারারাস্তায় ক্যাসেটে বাংলা ও হিন্দি সিনেমার গান বাজাতো। আমি গাড়িতে উঠেই খবরের কাগজ কিনতাম। সংগে কম্পিউটার শিক্ষার বই নিয়ে যেতাম। বাসের সীটে বসে হয় খবরের কাগজ, না হয় বই পড়তাম। এখন বাসের সীটে বসে পড়িনা, মোবাইলে টাইপ করে গল্প লিখি।

 

তখন দৈনিক জাহান খুব জনপ্রিয় পত্রিকা ছিল। ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত হতো। ২০০০ সনের ফেব্রুয়ারি মাসের সেই ট্রেনিং প্রোগ্রামে যাতায়াতের সময় প্রতিদিন আমি দৈনিক জাহান পড়েছি, কারন, ওটাতে দর্জি আব্দুল ওয়াহাব নামের একজন লেখকের একটা লেখা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল ঐ পত্রিকার দ্বিতীয় পৃষ্ঠায়। লেখাটির শিরোনাম ছিল “বঙ্গধারা”। ২৭শে ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় তার লেখায় একটা তথ্য পড়ে বিষ্মিত হলাম। তথ্যটি ছিল এমন “মহামতি আকবর বাদশাহর হিন্দু সেনাপতি মানসিংহের পত্নী সংখ্যা ছিলো পনরশ মাত্র। তারমাঝে ষাট জন তাঁর সঙ্গে সহমৃতা হয়েছিলেন।” আমি সেই পেপারের পাতাটি আমার “পেপার কাটিং” ফাইলে সংরক্ষণ করে রাখলাম। আমার প্রবল ইচ্ছা জাগলো দর্জি আব্দুল ওয়াহাব নামের লেখকের সাথে দেখা করার। এমন আজব তথ্য তিনি কোথায় পেলেন আমার জানার ইচ্ছা হলো।

 

কিছুদিন পর পত্রিকায় জানতে পেলাম যে দর্জি আব্দুল ওয়াহাবকে ময়মনসিংহ জেলা পরিষদ থেকে সন্মামনা দেয়া হয়েছে তার মূল্যবান লেখনীর জন্য। তাকে দেখার আগ্রহ আরও বেড়ে গেলো।

 

এরপর একদিন কোন একটা কাজে আমি ময়মনসিংহ শহরের সিকে ঘোষ রোডের একটা কম্পিউটার কম্পোজের দোকানে যাই। অল্প বয়সি একজন ছেলে বাংলায় টাইপ করছিল। তারসাথে আরেক ছেলে বসা ছিল। ছেলেটির পেছনে দাঁড়িয়ে একজন বৃদ্ধলোক বানান ঠিক করে দিচ্ছিলেন। তার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করছিলাম। লোকটির চাহিদামতো চেলেটি বানান ঠিকমত টাইপ করতে পারছিলো না। তাই ছেলেটি বারবার বিরক্তি প্রকাশ করছিলো। লোকটির গায়ে ছিল অতি পুরাতন সাদা পাজামা পাঞ্জাবি। উস্কুখুস্কু ছিল তার চুল। একসময় ছেলেটি বললো “চাচা, বুড়াকালে এগুলো কি লিখতাছেন? এগুলো লেখা বাদ দেন। বানান উচ্চারণ করতে দাঁত ভেংগে যায়। টাইপ করতেও কষ্ট হয়।” শুনে লোকটি বললেন “আরে, তোদের মতো যদি চেংড়া বয়স থাকতো তয় আমি নিজেই টাইপ করে ফেলতাম। এই বয়সে তো নতুন করে কম্পিউটার শিখতে পাড়ি না তাই তোদের কাছে এসেছি। তোরা এগুলোর মানে বুঝবি না। এগুলো বুঝার মতো জ্ঞান তোদের নেই।” বৃদ্ধের কথা শুনে আমি কম্পিউটারের মনিটরে দৃষ্টি দিলাম। দেখলাম একটি আর্টিকেল টাইপ হচ্ছে সেই আর্টিকেলের লেখকের নাম লেখা হয়েছে দর্জি আব্দুল ওয়াহাব। আমি জিজ্ঞেস করলাম
– চাচা, দর্জি আব্দুল ওয়াহাব কে?
– জি, আমিই।
– আপনিই লেখক দর্জি আব্দুল ওয়াহাব? আপনিই দৈনিক জাহানে বঙ্গধারা লিখতেন?
– জি, সেই লেখাটি বই আকারে প্রকাশ করবে জেলা পরিষদ। ডিসি সাহেব আমাকেই দায়িত্ব দিয়েছেন বইটি প্রিন্ট করার জন্য। টাকা যা লাগবে জেলা পরিষদ দিবে। তা দেখেন না, ওরা বাংলা টাইপ করতে কেমন বিরক্ত প্রকাশ করছে। আমি নিজে টাইপ করতে পারলে ভালো হতো।
– আমি অনেকদিন থেকে আপনাকে খুঁজছি। আপনি লিখেছেন মানসিংহ পনরশ বিয়ে করেছেন। আপনি এতথ্য কোথায় পেলেন?
– আমি দর্জি হলেও অনেক বই পড়েছি। মুসলিম লাইব্রেরী থেকে বই নিয়ে অনেক বই পড়েছি। আমি যা লিখেছি বই পড়ে জেনে শুনেই লিখেছি।
– সত্যি পনরশ বউ ছিল তার?
– হ্যা, ষাট জন স্ত্রী তার সাথে সহমরণ করেছিলেন।
– আমার কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছে না।
– আমি আপনাকে রেফারেন্স দেখাতে পারবো।
– ঠিক আছে, বিশ্বাস করলাম। ধন্যবাদ।

 

এরপর অনেক বছর কেটে গেছে। ২০০৭ সনের দিকে তত্বাবধায়ক সরকারের সময় আমাদের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের অডিটোরিয়াম, ছাত্রীদের নতুন হোস্টেল ও ইন্টার্নি হোস্টেল নির্মানের কাজ সম্পন্ন হয়। স্থাপনাগুলো বুঝে নেওয়ার টীমের প্রধানের দায়িত্ব দেয়া হয় আমাকে। আমি ওয়ার্ক অর্ডার দেখে রাতে ইন্টারনেট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং কিছু জ্ঞান অর্জন করে পরের দিন ইঞ্জিনিয়ার ও কন্ট্রাক্টর থেকে বিল্ডিংগলোর কাজ কর্ম বুঝে নিচ্ছিলাম। অডিটোরিয়াম বুঝে নেয়ার সময় দেখলাম আসন সংখ্যা এক হাজার। তারা বললেন যে আসন সংখ্যা এক হাজার হলেও তেরশ গেস্ট বসতে পারবে আশেপাশের স্পেসগুলো ব্যবহার করে। তৎক্ষনাৎ মনে পড়ে গেলো মানসিংহের স্ত্রীদের কথা। চিন্তা করলাম “আজ যদি মানসিং স্ত্রীদের নিয়ে বেঁচে থাকতেন, এবং তাদের যদি এই অডিটোরিয়ামে দাওয়াত দেয়া হতো তাহলে সব স্ত্রী একসাথে বসতে পারতেন না।”

 

আজ শুক্রবার, ছুটির দিন। সকালে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ জার্নালের একটি আর্টিকেল সম্পাদনা করে বাসার ফাইল কেবিনেট থেকে পুরাতন কাগজপত্র ফেলে দিতে গিয়ে দর্জি আব্দুল ওয়াহাব লিখিত সেই বঙ্গধারা আর্টিকেলটি পেয়ে গেলাম পেপার কাটিং ফাইলে। দুপুরের খাবারের পর শুয়ে শুয়ে আর্টিকেলটি আবার পড়লাম। তারপর লিখে ফেললাম আমার এই স্মৃতিচারণটি আপনাদের জন্য।
১৭/১/২০২০ খ্রি.
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
প্যাথলজি বিভাগ
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহ