এক ফোটা ঔষধের পাওয়ার

এক ফোটা ঔষধের পাওয়ার
(স্মৃতিচারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৮৩ সনে যখন আমি এমবিবিএস তৃতীয় বর্ষে পড়তাম তখন আমার এক আত্বীয় গ্রামের এক চিকিৎসকের খোজ নিতে বলেন যে সেই চিকিৎসক নাকি বন্ধা রুগীদের ভালো চিকিৎসা করতে পারেন এবং অনেকেই তার চিকিৎসায় সন্তান লাভ করেছে। তিনি মূলত হাই স্কুলের বিএসসি টিচার। বিকেলে ও ছুটির দিনে বাড়িতে প্র‍্যাক্টিস করেন। তার ভিজিট কত, কি কি নিয়ম জেনে যেতে হবে। আমি সেই বাড়িতে গেলাম। দেখি তিনি তার বাড়ির বাংলা ঘরে বসে রুগীর ব্যবস্থাপত্র ও ঔষধ দিচ্ছেন। কয়েকজন রুগী তার চেম্বারের ভিতরেই বসে আছে। আমিও সবার মতো করে বসলাম। দেখলাম তিনি একটা ছোট্ট কাচের ভায়ালের কর্কের ছিপি খুলে ভায়ালের মুখে কর্ক ঠেকিয়ে এক ফোটা তরল ঔষধ এক বোতল পানিতে ছেড়ে দিয়ে বোতলের ছিপি লাগিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ঝাকালেন। বোতলের গায়ে একটা সাদা কাগজ আঠা দিয়ে লাগালেন। সেই কাগজ কয়েকটি ভাজ করে কোনা ক্যাচি দিয়ে কাটা হয়েছে যা বোতলে লাগানোর পর সমান দুরত্বে দুরত্বে কাটা চিহ্ন হয়েছে। সেই বোতলটি রুগীর হাতে দিয়ে বললেন
– এই যে ছয় সপ্তাহের ঔষধ দেয়া হল। প্রতি সপ্তাহে এক দাগ করে খাবেন। দাম ৬০ টাকা। এই সময়ের মধ্যে সন্তান পেটে না আসলে আরেক বোতল ঔষধ নিয়ে যাবেন।

তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন
– আপনি কিছু বলবেন?
– স্যার, আমি খোজ নিতে এসেছি আপনি কি কি রোগের চিকিৎসা করেন এবং কত টাকা ভিজিট নেন।
– আমি মুলত মেয়ে রুগীদের সন্তান লাভের জন্য এবং সন্তান যাতে স্বাভাবিক ডেলিভারি হয় তার জন্য ঔষধ দিয়ে থাকি।
– আপনার ঔষধ এইসব ক্ষেত্রে কিভাবে কাজ করে?
– মেয়েদের ওভারি থেকে ডিম্বাণু তৈরি হয় প্রতিমাসে। এই ডিম্বাণু দুর্বল হলে শুক্রাণুর সাথে মিশতে পারে না। তাই মেয়েদের বাচ্চা হয় না। আমার এই ঔষধে ডিম্বানুর শক্তি বাড়িয়ে দেয়। মেয়েদের ইউটরাসে সন্তান উল্টাভবে প্রসব হলে সাধারণত নর্মাল ডেলিভারি করানো যায় না। সেই ক্ষেত্রে হাসপাতালে সিজার করে বাচ্চা ডেলিভারি করাতে হয়। নর্মাল ডেলিভারি হয় যদি বাচ্চার মাথা নিচের দিকে থাকে। যদি বাচ্চার পা নিচের দিকে থাকে তবে সেটাকে ব্রিজ প্রেজেন্টেশন বলা হয়। ব্রিজ প্রেজেন্টেশনে বাচ্চার পা বের হয়ে মাথা আটকা পড়ে যায়। মাথা নিচের দিকে থাকলে সেফালিক প্রেজেন্টেশন বলা হয়। আমার ঔষধে বাচ্চাকে সেফালিক প্রেজেন্টেশনে রাখে। তবে বাচ্চা পেটে আসার তিন মাস পর থেকে ডেলিভারি পর্যন্ত সময় আমার এই ঔষধ সপ্তাহে এক ডোজ করে খেতে হয়।
– ইউটরাস কি?
– ইউটরাস হলো মেয়েদের জরায়ু, যেখানে সন্তান ধারন করে।
– আপনি এক বোতল পানিতে মাত্র এক ফোটা ঔষধ মেশালেন। এই এক ফোটা ঔষধ ৬ সপ্তাহ কিভাবে কাজ করবে। ঔষধটা খুব পাতলা হয়ে গেলো না?
– আপনি বিজ্ঞান পড়েছেন, পদার্থ বিজ্ঞান?
– জি, আমি বিজ্ঞান গ্রুপ নিয়েই পাস করেছি। পদার্থ বিদ্যায় আমি ১০০ তে ৯৪ পেয়েছিলাম।
– গুড। তাহলে, আপনি ভালো জানেন। আপনি অণু ভেংগে কি হয় জানেন?
– পরমাণু হয়।
– পরমাণু ভেংগে কি পাই?
– ইলেকট্রন -প্রোট্রন।
– ইলেকট্রন – প্রোট্রন ভাংলে কি পাই?
– শক্তি।
– ইয়েস, ইয়েস, গুড। আমার এই এক ফোটা ঔষধ এক বোতল পানিতে ডাইলুট হতে হতে অণু, পরমাণুতে রুপান্তরিত হয়। পরমাণু ভেংগে ইলেকট্রন – প্রোটন হয়। শেষে এই গুলি ভেংগে শক্তিতে রুপান্তরিত হয়ে কাজ করে।

আমি হা করে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। তিনি জানেন না যে আমি এমবিবিএস থার্ড ইয়ারে পড়ি। শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলাম তিনি এক ফোটা করে ঔষধ এক বোতল পানিতে মিশিয়ে ঝাকিয়ে ঝাকিয়ে রুগীর হাতে তুলে দিচ্ছেন আর টাকা নিচ্ছেন। এত শুদ্ধ করে, এত সুন্দর করে, এত মিষ্টি করে কথা বলতে আমি খুব কম লোককেই দেখেছি। যিনি একজন হাই স্কুলের বিএসসি টিচার, ইউটেরাসকে উচ্চারণ করেন ইউটরাস, তিনি পানিতে এক ফোটা ঔষধ মিশিয়ে অণু-পরমাণু- ইলেকট্রন -প্রট্রনে ভেংগে শক্তিতে রুপান্তরিত করেন গ্রামের বাংলাঘরে বসে। আজো মনে পড়ে সেই লোকটির ঔষধের পাওয়ারের কথা।
২৯/৮/২০১৯ খ্রী.