ফেইসবুক ও এর প্রোফাইল পিকচার

ফেইসবুক ও এর প্রোফাইল পিকচার
(সাধারণ)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ফেইসবুক বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয় এবং ব্যবহার যোগ্য ওয়েববেইজড ডিজিটাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। আমাদের অনেক বন্ধু আছে তারা ফেইসবুক ব্যাবহার করে না। তারা ফেইসবুক কি তা বুঝে না অথবা ফেইসবুক ভালো না মনে করে ফেইসবুক করতেও চায় না। যারা না পারে তারা লোকমুখে শুনে শুনে এর ক্ষতিকর দিকগুলি তুলে ধরার চেষ্টা করে। নানা রকম মন্তব্য করে বসে, যেমন,
‘ফেইসবুক ভালো না, অনেক সংসার ভেংগেছে ফেইসবুক করতে গিয়ে’
‘ফেইসবুক পরিবারের মধ্যে দুরুত্ব বাড়ায়’
‘ফেইসবুক একটা বড় নেশা’
‘মানুষ সারাক্ষণ ফেইসবুক নিয়েই পড়ে থাকে’

আমি অনেক সময় দুরের বন্ধুদেরকে মোবাইলে বলেছি ফেইসবুক করতে যাতে সহজে যোগাযোগ করতে পারি। কয়েকজন এমন কথা বলেছে ‘আমি ফেইসবুক খেলি না, পোলাপান দেখি ফেইসবুক খেলে। পোলাপান ফেইসবুক খেলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’ আসলে এরা ফেইসবুককে খেলা মনে করে।

আমিও খুব একটা জানি না ফেইসবুক সম্পর্কে। তবে যে টুকু জানি বা বুঝি তা আমি শেয়ার করতে চাচ্ছি আপনাদের সাথে।

ফেইসবুক প্রথম বানিয়েছিলেন আমেরিকার মার্ক জাকারবার্গ নামে একজন ইউনিভার্সিটির ছাত্র। তিনি ২০০৩ সনে যখন প্রথম বর্ষে পড়েন তখন ফেইসম্যাস ডট কম নামে একটা ডায়নামিক ওয়েবসাইট তৈরি করেন। ওয়েবসাইট দুই রকম স্ট্যাটিক ও ডায়নামিক। স্ট্যাটিক ওয়েব সাইটে তথ্য দেয়া থাকে ওয়েবপেইজে, যেগুলির জন্য কোন ডাটাবেইজ প্রয়োজন পড়ে না। ব্যবহার কারী শুধু পেইজ পড়তে পারেন। কোন রেসপন্স করতে পারেন না। ডায়নামিক ওয়েবসাইট তৈরি করতে ডাটাবেইজ ব্যাবহার করা হয় এবং এডমিন ও ব্যবহারকারী অনলাইনে ডাটা পরিবর্তন ও রেস্পন্স করতে পারেন। ফেইসম্যাসে জাকারবার্গ ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের দুইটি করে ছবি পাশাপাশি বসিয়ে ওয়েবপেইজ-এ দিয়ে হলের ছাত্রদেরকে ভোট দিতে বলতেন ছবিটি ‘হট’ অথবা ‘নট হট’ ক্লিক করে। এতে কয়েক ঘন্টার মধ্যে ৪৫০ জন ছাত্র ২২,০০০ ভোট দিয়েছিল অনলাইনে। সেই সময় আমি আমার নিজের পারসোনাল স্ট্যাটিক ওয়েবসাইট তালুকদারবিডি ডট কম তৈরি করেছিলাম। এখন আমি এটা ডায়নামিক করেছি।

২০০৪ সনে জাকারবার্গ দিফেইসবুক ডট কম নাম দিয়ে আরেকটা ডায়নামিক ওয়েবসাইট খুলেন। সেই ওয়েবসাটে তার ইউনিভার্সিটির বন্ধুদেরকে ইনক্লুড করেন ডাটাবেইজে। সেই ডাটাবেইজে বন্ধুদের আইডি, পাসওয়ার্ড, নাম, প্রোফাইল পিকচার, এড্রেস ইত্যাদি সংযুক্ত করা হয়। এবং অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করে নতুন বন্ধু এড করার অপশন রাখা হয়। বন্ধুর সাথে বন্ধুর যোগাযোগ করা হয় অনলাইনে রেস্পন্স করে। একটা কথা আছে বাংলায় “মুখ দেখে যায় চেনা”। বন্ধুকে চেনার জন্য প্রোফাইল পিকচার হিসাবে বন্ধুর মুখের (ফেইসের) ছবি যুক্ত করা হয়। অর্থাৎ ছবি দেখেই বুঝতে পারা যায় কোন বন্ধু লাইক, কমেন্ট করছে। তাই নাম হয়েছিল ফেইসবুক। ফেইসের বুক। তাই আমি বলি “ফেইস ছাড়া ফেইস বুক হবে কেমনে?”

জাকারবার্গ তার ফেইসবুক ওয়েবসাইটের নাম সংক্ষেপ করে ফেইসবুক ডট কম করেন। সংক্ষেপে বলা হয় ফেইসবুক। ফেইসবুকে সদস্য হতে তিনি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন ফ্রিতে। দ্রুত এর সদস্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। বৃদ্ধি পেতে পেতে ২০১৯ সনের হিসাবে দেখা গেছে যে এর সদস্য সংখ্যা ২৪২ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। এই সদস্যগুলিকে বলা হয় ফেইসবুক ফ্রেন্ড। তাই ফেইসবুক ফ্রেন্ড আর প্রকৃত ফ্রেন্ড এক না। ফেইসবুকের প্রধান ব্যবহার হলো নিজের মনের কথাটা ফেইসবুক ফ্রেন্ডদেরকে জানিয়ে দেয়া। এটাকে বলা হয় শেয়ার করা। এখন কথা নয় শুধু ছবি ও ভিডিও-ও শেয়ার করা হয়। এক কথায় বলা হয় পোস্ট করা। পোস্ট বুন্ধুদের মধ্যে লিমিট করে দেয়া যায়। যেমন শুধু নিজের বন্ধুরা দেখতে পাবে অথবা সবার বন্ধুরা (পাবলিক) দেখতে পারবে।

জাকারবার্গ এক সময় ব্যাবহারকারী সদস্যদেরকে তার পোস্টে বিজ্ঞাপন দিয়ে টাকা আয় করার সুযোগ করে দেন। এই আয়ের একটা অংশ ফেইসবুকের একাউন্টে সয়ংক্রিয়ভাবে জমা হতে থাকে। ব্যবহারকারী তার পোস্টে বিজ্ঞাপন দাতার সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে বসে থাকেন। বিজ্ঞাপন যতবার রিড হবে ততবার তার একাউন্টে টাকা জমা হতে থাকবে সয়ংক্রিয়ভাবে বিজ্ঞাপন দাতা প্রতিষ্ঠানের একাউন্ট থেকে। এই আকাউন্টগুলি ভার্চুয়াল একাউন্ট। ভার্চুয়াল একাউন্ট থেকে সময় সময় প্রকৃত ব্যাংক একাউন্টে টাকা ট্রান্সফার করা হয়। এইভাবে পোস্টে বিজ্ঞাপন দিয়ে টাকা আয় করাকে বলা হয় ফেইসবুক মনেটরি। জাকারবার্গ ফেইসবুকের মনেটরি অংশের আয় দিয়ে মাত্র ২৮ বছর বয়সেই পৃথিবীর দ্বিতীয় ধনি লোক বনে যান। বিয়ে করে সংসারী হন। তার প্রথম সন্তান জন্ম গ্রহন উপলক্ষে তার সম্পদের একটা বিরাট অংশ জনকল্যানে দান করে দেন।

ফেইসবুকে দেখবেন সুন্দর সুন্দর ভিডিও আসে। কোন কোন ভিডিও লক্ষ কোটিবার ভিউ হয়েছে। লক্ষবার শেয়ার হয়েছে। কোটিবার শেয়ার হয়েছে। এইগুলি চলার সময় ছোট ছোট বিজ্ঞাপন দেখা যায়। অর্থাৎ এই বিজ্ঞাপনও কোটিবার প্রদর্শিত হয়েছে। যিনি এই বিজ্ঞাপন তার ভিডিও পোস্টে শেয়ার করেছেন তার আয় কত হতে পারে ভেবে দেখেছেন? সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো তিনি শুধু কয়েক মিনিট সময় দিয়েছেন পোস্টটি তৈরি করতে। মনেটরি করার জন্য রেজিস্ট্রেশন করলে বিজ্ঞাপনও সয়ংক্রিয়ভাবে ট্যাগ হয়ে যায়। ফেইসবুকে পোস্ট করার পর তার আর কোন কাজ নেই। লক্ষ কোটি টাকা তার একাউন্টে চলে আসছে আপনা আপনি। ফেইসবুক ব্যবহারকারী উপভোগ করছে পোস্টটি। তিনি জানেনই না এই পোস্টটি সার্ভ করে একজন কত টাকা আয় করে নিচ্ছে।

এখন বলছি ফেইসবুক প্রোফাইল পিকচারের কথা। কারো ফেইসবুক পেইজে প্রবেশ করলে প্রথমেই চোখে পড়বে তার প্রোফাইল পিকচার। কে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করলেন তার পরিচিতিতেও আছে ছবি ও নাম। অনেকে নিজের তথ্য গোপন রাখার জন্য প্রোফাইল লক করে রাখেন। কেন রাখেন তারাই জানেন। ‘ইহা আমার কাছে হাস্যকর’। প্রফাইল লক করা থাকলেও তার প্রোফাইল পিকচার ও নাম লক করা থাকে না। তখন উদ্ভট একধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করে। যেমন, নাম দিল ‘অচেনা পাখি’ আর ছবি দিল একটা অচেনা ‘পাখির’। ইনি ছেলে না মেয়ে বুঝার উপায় নাই। এর সাথে কেউ রেস্পন্স করবে ফেইসবুকে? প্রোফাইল পিকচার ফেইসবুক ব্যবহারকারীর সম্পর্কে অনেক কথাই বলে। তাই ফেইসবুকের প্রোফাইল পিকচার সেট করার ব্যাপারে সতর্ক হতে হয়।

ফেইসবুকের প্রোফাইল পিকচার নিজের ফেইস দিয়ে সেট করাই উত্তম। ফেইস দেখে যাবে চেনা। একই নামে অনেক ফ্রেন্ড থাকতে পারে। একেকজন একেক রকম কমেন্ট করেছে। কোনটি কার কমেন্ট মুখ দেখেই চেনা যাবে। রিপ্লাই দেয়ার সময়ও সতর্ক হওয়া যাবে। যেমন, এম এ জলিল নামে তিনজন বন্ধু কমেন্ট করেছেন। একজন তার শিক্ষক, একজন তার প্রকৃত বন্ধু এবং একজন তার ছাত্র। কিন্তু সবাই ফেইসবুক ফ্রেন্ড। কমেন্টে রিপ্লাই দেয়ার সময় ভিন্ন ভিন্ন ভাবে লিখতে হবে। যেমন, ধন্যবাদ স্যার, ধন্যবাদ দোস্ত এবং ধন্যবাদ রিমান। না চিনে এইভাবে লিখা সম্ভব হয় না।

কেউ কেউ নিজের মুখের সেল্ফি দিয়ে প্রোফাইল পিকচার দেন। সেল্ফি পিকচার সাধারণত বিকৃত চেহারার হয়। না দেয়াই ভালো। অথচ বর্তমানে আমি যে ছবিটা প্রোফাইল পিকচার হিসাবে সেট করেছি সেটা আমার সেল্ফি। আমার কাছে এটা বিকৃত হয়েছে বলে মনে হয় না। কেউ এর বিপক্ষেও বলে নাই। এটা দেখে সহজেই আমাকে চেনা যায়। এটা প্রায় তিন বছর যাবৎ দিয়ে রেখেছি। কয়েকবছর হয় মিডিয়াতে লেখালেখি করছি। একটু লেখক লেখক ভাব এসেছে আমার মনে। তাই ফেইসবুক এপ থেকে এই ডিজাইনটা পছন্দ করে ‘আই এম লিজেন্ড লেখা’ বইয়ের কভারে আমার পিকচারটা বসিয়ে প্রোফাইল পিকচার হিসাবে সেট করেছি।

আমি মূলত একজন ডাক্তার, মেডিকেল কলেজের শিক্ষক। আমার ফ্রেন্ডলিস্টে বেশীর ভাগ ডাক্তার থাকবে এটাই সাভাবিক। আমার ফ্রেন্ড লিস্টে কাকে রাখব, কাকে রাখবা না সেটা আমারই সিদ্ধান্ত। কেন নেই সে এটার কৈফিয়ত দেয়া আমার কাজ না। বন্ধু নির্বাচন করার ক্ষেত্রে আমার নিজস্ব কিছু চিন্তাভাবনা আছে। আমি চাই ডাক্তাররা আমার লিস্টে থাকুক। তাদের পোস্ট আমার প্রফেসনের কাজে লাগবে। আমার ফামিলি মেম্বার ও আত্বীয় স্বজন আমার লিস্টে থাকুক। কিছু ছাত্র থাকুক লিস্টে। আমার গ্রাম এলাকার মানুষজন থাকুক। অনেকেই আমার লেখা পড়ে ভালোবেসে আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়। প্রোফাইল পিকচার দেখে চিনে ফেললে রেস্পন্স করি। না চিনলে তার প্রোফাইলে প্রবেশ করি। প্রোফাইল পড়ে মনে করলে এক্সেপ্ট করি। প্রোফাইল পিকচার দেখেও অনেককে বাদ দিয়ে দেই। নিজেকে খারাপভাবে বা উদ্ভট ভাবে প্রেজেন্ট করলে বাদ দিয়ে দেই। নিজের নাম বিকৃত করলেও বাদ। যেমন, অজানা পাখি, হতাস কাজল, পাগল মজনু ইত্যাদি। নিজের ছবি না দিয়ে নাতি পুতি ও বউয়ের ছবি দিলেও বাদ। কেউ কেউ নিজেকে অন্য জনের মাঝে বিলিন করতে চান। তারা নিজের ছবি না দিয়ে বিখ্যাত মানুষের ছবি দেন প্রোফাইল পিকচারে। এরা খুব বিভ্রান্তকর আমার কাছে।

কেউ কেউ দাঁত বের করে হাসি দিয়ে প্রোফাইল পিকচার দেন। দেখে ভালোই লাগে। তবে সমস্যা হলো শোক সংবাদ শুনে কমেন্ট করছেন দু:খের, অথচ দেখে মনে হচ্ছে শুনে হাসছেন। কেউ কেউ আছেন স্বামী-স্ত্রী একসাথে ছবি দিয়ে রেখেছেন। হয়ত বুঝাতে চান যে আমরা একে অপরকে খুব ভালোবাসি। কিন্তু তাই বলে পৃথিবীর সবাইকে দেখাতে হবে? অনেকে প্রোফাইল পিকচারে পরিবারের সবাইকে নিয়ে গ্রুপ ছবি দেন। এই ছবি লাইক কমেন্টের সময় অতি ক্ষুদ্র হয়ে যায়। কাউকে চেনার উপায় থাকে না।

কাজেই, আমার মতে, প্রোফাইল পিকচার হিসাবে সেট করতে হবে নিজের মুখের ছবি যাতে মুহুর্তে চেনা যায় ব্যবহারকারীকে। প্রোফাইল পিকচার দেখেও অনেকে বুঝতে পারেন ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্য কি ফেইস বুক করে এবং কেমন হবে তার চরিত্র।
২৩/৮/২০১৯ খ্রী.