ফয়তার দাওয়াত

ফয়তার দাওয়াত
(স্মৃতিচারণ)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আগের দিনে গ্রামে প্রচুর ফয়তার দাওয়াত হতো। বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ কেউ মারা গেলে তার আত্বার শান্তি কামনা করে গ্রামের সবাই এবং আত্বীয় স্বজন মিলে দোয়া করার উদ্যেশ্যে মৃতের বাড়িতে উপস্থিত হতো। সাধারণত শীত কালের কোন একটি দিনের দুপুর বেলা সবাইকে দাওয়াত দেয়া হতো। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী লোক সংখ্যার পরিমাণ নির্ধারিত হতো। তবে সবাই চাইত গ্রামের সব পুরুষ মানুষকে এবং ইষ্টি-এগানাকে এক বেলা এক সাথে ভালো কিছু খাওয়াইতে। আমি ইসলামী বিধানে আলেম নই তাই ফয়তার গুরত্ব আমি আপনাদের বুঝাতে পারব না। সেই সময় মুরুব্বিদের কাছে শুনেছি এক বেলা পেট ভরে খেয়ে সবাই মিলে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করলে আল্লাহ্‌ দোয়া কবুল করেন। মৃত ব্যক্তি সারাজীবন কষ্ট করে কামাই করে সন্তানদের জন্য সম্মদ রেখে যান। সন্তানদের উচিৎ সেই সম্মদ থেকে আল্লাহ্‌র রাস্তায় তথা মানব কল্যাণে ব্যয় করে মৃত ব্যক্তির নাজাতের ব্যবস্থা করা। কিন্তু ধনী লোকেরা সেই সম্পদ থেকে খেলে কতটুকু কল্যাণ হয় এনিয়ে মতভেদ আছে। তবে গরীব মিসকিনকে দান করলে কোন মতভেদ নাই। আমি একজন কম জানা আলেমকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এই দাওয়াতের নাম ফয়তা হল কেন। তিনি বলেছিলেন যে, ফৌত শব্দ থেকে ফয়তা এসেছে। ফৌত কথার অর্থ মৃত। যেহেতু মৃত ব্যক্তির উদ্যেশ্যে দাওয়াত খাওয়ানো হয়, তাই এর নাম হয়েছে ফয়তার দাওয়াত। গ্রামে অনেকেই এভাবে গালি দিতো “আমার কথা মতো না চললে তোরে মাইরা ফয়তা খামু।” ফয়তা খাওয়া আনন্দেরও ছিল বটে। বাচ্চা ছেলে মেয়েরা ফয়তা খেয়ে পেট ডিগডিগ করে হাটতো। কেউ কেউ সন্তানদের ফয়তা খাওয়ানোর নির্ভর বলে মনে করতেন না। তাই জীবিত থাকতে নিজের ফয়তা নিজেই করে যেতেন। এও হতে পারে নিজের ফয়তা নিজের হাতে খাওয়াতে পেরে তৃপ্তিও পেতেন। কোন কোন গ্রামে গরীব মানুষ মারা গেলে  মৃত ব্যক্তির উদ্যেশ্যে চান্দা উঠিয়ে সবাই মিলে ফয়তা খেতেন। বুবুর কাছে একটা কথা শুনেছিলাম এমন। কোন এক দু:খী বিধবার একমাত্র ছেলেটিও কলেরা হয়ে মৃত্যু বরণ করে। বিধবার এক বেলা দুবেলার লবন ভাত হয়ত জোটত কিন্তু তরকারি জোগার করতে পারত না। তাই তাকে লবন মরিচ ডলা দিয়েই ভাত খেতে হত। গ্রামে নিজের ছেলেকে অনেকে গেঁদা ডাকে। বিধবার ছেলেটিকে পাড়ার সবাই ভাল বাসতো। গেঁদা মারা যাবার পর পাড়ার যুবকরা চান্দা তুলে গেঁদার জন্য ফয়তার দাওয়াতের ব্যবস্থা করলো। সেই ফয়তার দাওয়াত বিধবাও খেলেন। গরীবের ফয়তা তাই তেমন কিছু রান্না করা হয়নি। শুধু মাসের ডাউল ও গরম ভাত। বিধবা তৃপ্তিসহ খেয়ে ঢেকুর তুলে বললো “গেদাডা মরণে ডাইল দিয়া চাইরডা ভাত খাইলাম!” ইউনুসের কাছে আরেকটা চুটকি শুনেছিলাম। গ্রামের এক মহিলার মেয়ের জামাই ও ছেলের বউ কলেরা হয়ে মারা গেলো একই বছর। মহিলার ছেলের বউয়ের ফয়তার দাওয়াতে মেহমানদের সাথে মহিলা গল্প করছিল “এবারের মরা পরের উপর দিয়া গেছে।” আগের দিনে কলেরায় একই পরিবারের কয়েকজন করে সদস্য মারা যেতো। তখন সেলাইন আবিষ্কার হয় নাই অথবা সরবরাহ ছিল না। মহিলা পেটের ছেলেকে নিজের মনে করতো আর পেটের মেয়েকে নিজের মনে করতো। আর সব পর মনে করতো। তাই তার দৃষ্টিতে ছেলের বউ ও মেয়ের জামাই পরের সন্তান।

 

যাহোক, ফয়তায় আসি। ফয়তার দাওয়াত গ্রাম বাংলার এক ঐতিহ্যবাহি দাওয়াত। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ ধনী কেউ মারা গেলে অনেকেই হিসাব করতে থাকতো যে এর ফয়তাটা কবে খাব। দাওয়াত দেয়া হতো গ্রামের ছোট-বড় পরিবারের সকল সদস্যকে। পরিবারের সকল সদস্যকে এক কথায় বলা হত হোয়ারা। যেমন “অমুক সিকদারের ফয়তা হবে আগামী মঙ্গলবার। আপনাদের হোয়ারা দাওয়াত রইল।” বাড়ির বড় মহিলারা বাদে সবাই সেই দাওয়াত খেতে যেতেন। আত্বীয় স্বজনকেও হোয়ারা দাওয়াত দিতে হতো। দশ বিশ কিলোমিটার পথ হেটেও ফয়তার দাওয়াত খেতে যেতো অনেকেই।

 

ফয়তার দাওয়াতে শত শত মানুষ হতো। গ্রামের বাড়িতে সাধারণত মানুষ টিনের থালা ও মাটির সানকিতে ভাত খেতো। দাওয়াতে এত লোকের জন্য এত থালার ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল না। তাই সবাইকে কলা পাতায় খাবার দেয়া হতো। ফয়তা এলে গ্রামের কলা গাছের পাতা একটাও থাকতো না। বাঁশের কোটার আগায় কাঁচি (কাস্তে) বা বাগী (পাট কাটার লম্বা কাঁচি) বেঁধে ক্যাচক্যাচি কলার পাতা কেটে ফেলা হতো। সেইগুলি খন্ড খন্ড করে গুছিয়ে আনা হত ফয়তাবাড়িতে। উঠানে বা বাহির বাড়িতে বা পালানের ক্ষেতে পাটী ও চট বিছিয়ে বসতে দেয়া হত দাওয়াত খেতে। লাইন ধরে সবাই বসে যেতো লেটা দিয়ে। গ্রামের মাদবর দাওয়াত খাওয়ানো তদারকি করতেন। বিরাট বিরাট এলুমিনিয়ামের ডেগে (বড় ভাতের হারি) ভাত রান্না করা হতো। চাউলে বেশী করে পানি দেয়া হত। গরমে চাউল ফুটে ভাত হলেও পানি ফুরাতো না। পানি বলক পারা অবস্থায়ই ভাত নামানো হতো। মাটিতে ড্রেইন কেটে লাইন ধরে বসানো হতো ভাত রান্নার ডেগ। গজারি গাছের শুকনা লাকড়ি দিয়ে জ্বাল দেয়া হতো সেই চাউল। দুই বাঁশ দিয়ে চাংগা বানিয়ে সেই চাংগা দিয়ে দুইজনে ভাতের ডেগ নামিয়ে পানি ঝড়ার জন্য চালুনির উপর রেখে দিতো কিছুক্ষণ। পানি ঝড়ে গেলে গাছের ছায়ায়  বিছানো পাটি বা ধারির উপর ঢেলে রাখা হতো সেই ভাত। স্বেচ্ছা সেবক হিসাবে গ্রামের যুবক ছেলেরা রান্না ও খাওয়ানোর কাজে সহযোগিতা করতো। যারা রান্না করতো তাদেরকে বাবুর্চি আর যারা খাওয়াতো তাদেরকে নকিদার বলা হতো। ফয়তার দিন নকিদারের  ক্কদর বেড়ে যেতো। নকিদারের সাথে খাতির দিতে পারলে গোস্তের পরিমাণ একটু বেশী পাওয়া যেতো। সব কর্মীরা লুঙ্গী পরে কোমরে শক্ত করে গামছা বেঁধে নিতেন। হাটার সময় যাতে লুঙ্গী বেজে না পড়ে সেজন্য লুঙ্গীর সামনে পিছনে একাত্র করে বেঁধে নিতেন। প্রথমে সবার সামনে এক টুকরা করে কলার পাতা দিয়ে যেতেন একদল কর্মী। এরপর আরেকদল কর্মী সবার পাতে ভাত দিয়ে যেতেন হাত দিয়ে। এখানে চামচ ব্যবহার করতেন না। আরেকদল কর্মী সবার পাতে লবন দিয়ে যেতেন। আরেকদল কর্মী দুই তিন জন পর পর একটি করে এলুমিনিয়ামের গ্লাস দিয়ে যেতেন। আরেক জন জগ দিয়ে ক্লাসে পানি দিয়ে যেতেন। একদল নকিদার গরুর গোস্তের মাটির পাতিল নিয়ে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। গোস্ত দেয়ার জন্য কাশা বা পিতলের চামচ ব্যবহার করা হত। কে কোন পর্যন্ত খাওয়াবেন তার একটা নির্দেশ দেয়া থাকতো আগে থেকেই। মাদবরের নির্দেশ পেলেই দ্রুত নকিদারেরা পাতে গোস্ত দেয়া শুরু করতেন। সবাই আনন্দে খাওয়া শুরু করে দিতেন। গোস্তে অনেক ঝাল মসলা দেওয়া হতো। ঝালে সবাই হাহু হাহু করে খেতে থাকতেন। কপাল ঘেমে যেতো। নাক দিয়ে পানি এসে যেতো। আর বলতে থাকতো “ঝাল অইছে গো। এত ঝাল দিছে গোস্তে!” বাম হাত দিয়ে কপালের ঘাম মুছতো। আর পানি খেতো ঢোকে ঢোকে। গরুর মাংশ খুব স্বাদ হতো। বড় বড় পিতলের পাতিলে গরুর মাংশ রান্না করা হত। সেই পাতিলকে বলা হতো আড়া। গ্রামের ধনী বাড়িরা আড়া কিনে রাখতো। একটা আড়া কিনলে শত বছর রান্না করা যেতো। ফয়তা হলেই তারা আড়া রান্নার কাজে ব্যবহার করতে দিতেন। আড়ার মাংস খেতে স্বাদ। সিদ্ধ হয় ভালো তাই আড়ার মাংস খাওয়ার জন্যও অনেকে ফয়তার দাওয়াত কবুল করতো। অনেকে অপেক্ষা করতেন কবে আবার আড়ার মাংস খাবো।

 

কেউ কেউ গরুর গোস্ত খেতে পারতেন না এলার্জির কারনে। অথবা কবিরাজের নিষেধের কারনে। তাদের জন্য আলাদা একজন খাসির গোস্ত নিয়ে ঘোরতেন আর বলতেন “কে কে নিরামিষ খান? নিরামিষ আছে।” যদিও খাসির গোস্ত নিরামিষ না তবুও আমাদের এলাকায় খাসির গোস্তকেই নিরামিষ বলা হতো। গোস্তের পর দেয়া হত মাসের ডাউল। আমাদের পাহাড়ি এলাকায় প্রচুর মাস কলাই হতো। মাস কলাই ভেজে ঢেকিতে পার দিয়ে গুড়া করা হতো রান্নার জন্য। প্রত্যেকের পাতে এক কাপা করে মাসের ডাউল দেয়া হতো। কাপা হলো নারিকেলের খুলি দিয়ে তৈরি বিশেষ ধরনের চামচ। ডাউল দিয়ে পরিষ্কার করে খাওয়ার পর সবার পাতে এক মুষ্ঠি করে ভাত দেয়া হতো। এই ভাতে দেয়া হত পাতলা ঘোল দই। কালিহাতির কাছে নিশ্চিন্তপুর গ্রামের ঘোষরা টক দই বানাতেন মাটির পাতিলে। ঐ পাতিলকে দইয়ের পাতিল বলা হতো। কস্তুরি পাড়ার কিছু ঘোষ টক দই বানাতেন মাটির ডুপিতে। ডুপি ছিল লম্বাটে। দুই এক দিন আগে গিয়ে ঘোষদেরকে দইয়ের অর্ডার দিয়ে আসতে হতো বায়না টাকা দিয়ে। ফয়তার দিন সকালে দইয়ের ভারে সাজিয়ে বাইকে কাঁধে করে একেক জনে এক মন করে দই নিয়ে আসতেন খালি গায় ধুতি পরে। সেই দইয়ে পানি ও লবন মিশিয়ে ঘোল বানানো হতো। দইয়ের ডুপি বা পাতিল কম পোড়া মাটির তৈরি হত। তাই এগুলি রান্নার কাজে ব্যবহার করা যেতো না। আইল্লা সাজাতে এইগুলি ব্যবহার করা হত। ডুপিতে তুষ ভরে আগুন দিলে সেই আগুন সারাদিন থাকত। তুষের সেই আগুনকে আইল্লা বলা হত। চব্বিশ ঘন্টাই আইল্লায় তুষের আগুন দিগি দিগি ঝলত। তাই গানে আছে “কারে দেখাব মনের দুঃখ গো আমার বুক চিরিয়া, অন্তরে চুষের অনল জ্বলে রইয়া রইয়া।” খালি দই খাওয়া যেতো না। দইয়ের পাতে দুই মুষ্ঠি করে কুসাইরা চিনি দেয়া হত মিষ্টি করার জন্য। আখের চিনিকে কুসাইরা চিনি বলা হত। এটার রঙ লাল ছিল। তাই লাল চিনিও বলা হতো। আখের চিনি মিল কারখানায় সাদা দানাদার করা হতো। সেইগুলিকে বলা হতো জাবা চিনি বা সাব চিনি। জাবা চিনি শুধু বাড়িতে পায়েস রান্না করায় ব্যবহার হতো। দই দিয়ে খাওয়া শেষ করে হাত দুইয়ে সবাই মিলে এক যোগে মৃত ব্যক্তির আখেরাতের মুক্তির জন্য এক যোগে হাত তুলে মহান আল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনা করা হতো।

 

দাদাদের মধ্যে প্রথম ইন্তেকাল করেন মেঝোদাদা মেছের উদ্দিন তালুকদার। তার জানাজার কথা আমার মনে আছে। কিন্তু তার ফয়তার দাওয়াতের স্মৃতি আমার নাই। তারপর ইন্তেকাল করেন বড় দাদা কায়েম উদ্দিন তালুকদার। তিনি ভিয়াইলের বাড়িতে থাকতেন। তার ফয়তাও হয়েছিল ভিয়াইলের বাড়িতে। তাই আমি তার ফয়তা দেখি নাই। এরপর ইন্তেকাল করেন আমার নিজের দাদা মোকছেদ আলী তালুকদার। তিনিও বেশী সময় ভিয়াইলের বাড়িতে থাকতেন। তার ফয়তার দাওয়াত হয়েছিল ভিয়াইলের বাড়িতে। সেই দাওয়াতের কথা আমার কিছু কিছু মনে আছে। বাইর বাড়িতে বসতে দেয়া হয়েছিল দাওয়াতিদেরকে।

 

আমার দাদা খুব বড় রকমের খাদক ছিলেন। ভালো ভালো খাবার পছন্দ করতেন। দাওয়াত খেতে গিয়েও অনেক খেতেন। তিনি উঠানে পাতায় খেতেন না। তাকে আলাদাভাবে খাবার দিতে হতো। কাশেম কাক্কু (মিয়া কাক্কু) ছিলেন আমাদের গ্রামের মাদবর। দাদা ছিলেন তার চাচা। দাদাকে মিয়া কাক্কু নিজ হাতে খাওয়াতেন। দাদার জন্য স্পেশাল এক পাতিল গরুর গোস্ত দিতে হতো সামনে। একবার উত্তর পাড়ার আবেদ আলী কাক্কুর পিতা আইনুদ্দিন সিকদার দাদার ফয়তা খেতে গিয়েছিলাম। বন্ধুরা বলল “আয় তোর দাদার খাওয়া দেখি। এক পাতিল গরুর গোস্ত নিয়া বইছে। সবাই তার খাওয়া দেখতাছে।” আমি গিয়ে দেখি দাদা খেয়ে চলেছেন। মিয়া কাক্কু পাতিল থেকে গোস্ত তুলে দিচ্ছেন। হাছেন কাক্কু বিচুন (হাত পাখা) দিয়ে বাতাস করছেন। দুইজনেরই চাচা হন আমার দাদা। চাচাকে তো যত্ন করে খাওয়াবেনই। হাছেন কাক্কুও কম খাদক ছিলেন না। দাদা এক পাতিল গোস্ত খেয়ে শেষ করলেন। তারপর খেলেন আধা ডুপি দই। সাথে লাল চিনি। অস্থির অস্থির ভাব দেখালেন। ধরে ধরে বাড়ি নিয়ে এলাম। কাঠাল গাছ তলে বাতাসে পাটি বিছিয়ে দিলাম। গোংরালেন আর গড়াগড়ি পারলেন অনেক্ষণ। আমি বিচুন দিয়ে বাতাস করলাম।

 

আইনুদ্দিন দাদার পরই তার ভাই আজিম উদ্দিন সিকদার দাদার ফয়তা হয়। তিনি জীবিত থাকতেই তার ফয়তা হয়। সেই ফয়তার দাওয়াতও আমি খেয়েছি। খুব বড় দাওয়াত হয়েছিল সেদিন। আজিম সিকদার জয়নাল ভাইর দাদা ছিলেন।

 

আমি ছোটবেলা খুব বেছে খেতাম। মাসের ডাউল খেতাম না। ডাউলকে আমরা ডাইল বলতাম। ফয়তার দাওয়াতে গরুর গোস্তের পরই সরাসরি দইয়ে চলে যেতাম। আমার চাচাত বোন হেলেনা আপাকে আমরা হেল বু বলতাম। হেল বুর বিয়ে হয়েছে ইন্দ্রজানি। মাওলানা সালাউদ্দিনের সাথে। তিনি শামসুল হক পান্না চেয়ারম্যান সাহেবের চাচা। সালাউদ্দিন দুলাভাই জমি জমা কিনে আমাদের চালায়ই স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। হেল বুর নতুন বিয়ে হয়েছে। সেই সময় তার শশুরবাড়িতে একটা ফয়তার দাওয়াত দিয়েছিল আমাদের তালুকদার বাড়ি হোয়ারা। আমরা সব ছেলে মানুষ সেই দাওয়াতে গিয়েছিলাম। সব মানুষ একাত্র হতে হতে দুপুরের খাবার টাইম আমাদের বাড়িতেই হয়ে গেলো। ইন্দ্রজানি আমাদের বাড়ি থেকে ৪/৫ কিলোমিটার দূরে। সেখানে পৌছতে পৌঁছতে দেখি দাওয়াত খাওয়া শেষ।

 

আমরা তাড়াতাড়ি বসে পড়লাম। সবার পাতে ভাত দেয়া হল। কিন্তু গোস্ত শেষ। গোস্ত ফুরিয়ে যাওয়ায় তারা দুঃখ প্রকাশ করলেন। বললেন “আপনারা দেরী করে ফেলেছেন।” আমি ক্ষুধায় অস্থির হয়ে পড়লাম। গোস্ত নেই তাই সরাসরি মাসের ডাইল দিয়ে দিলেন পাতে। আমি তো মাসের ডাইল খাই না। কি করা যায়? বাচার জন্য মাসের ডাইল দিয়েই ভাত মাখিয়ে মুখে দিলাম। খেয়ে দেখি মাসের ডাইল খুব স্বাদ। তাহলে এতদিন ভুল করেছি? কবে যেন মাসের ডাইল খেয়েছিলাম? সেদিন হয়ত ভালো লাগে নি। তাই বলে কি আর মাসের ডাইল ভালো লাগতে পারে না? এরপর সিদ্ধন্ত নিলাম বাড়িতেও মাসের ডাইল খাব। আমার মাসের ডাইল খাওয়ার কথা বাড়ি এসে মাকে জানালাম। মা একদিন মাসের ডাইল রান্না করে আমার পাতে দিলেন। খেয়ে দেখি এটাও স্বাদ। এরপর থেকে আমার ডাইলের মধ্যে প্রথম পছন্দ মাসের ডাইল, এখনো।

 

তারপর অনেকদিন গত হয়েছে। গ্রামের রাতারাতি উন্নতি হয়েছে। শিক্ষিত মানুষের হার অনেক বেড়ে গেছে। তারা জেনে গেছে যে মুরুব্বিরা যে সম্পদ রেখে যান সেই সম্পদ থেকে দান খয়রাত করতে হয়। এক কথায় এটাকে খরচ করা বুঝায়। এখন ফয়তার দাওয়াতের নাম পরিবর্তিত হয়ে খরচের দাওয়াত হয়েছে। খরচের দাওয়াতে পাটি, চট, ধাড়ি এগুলি বিছানো হয় না। ডেকোরেশন থেকে ভাড়া করে প্যান্ডেল করে চেয়ার টেবিলে খেতে দেয়া হয়। বাবুর্চি ভাড়া করে রান্না করানো হয়। নেই সেই আড়ার গোস্ত। নেই সেই মাসের ডাইল। এই চেয়ারে সবাই বসতে পারে না। তাই গরীবরা বাদ পড়ে যায়। শুনলাম এক বাড়িতে খরচের দাওয়াতে অনেক ভদ্রলোক এসেছিলেন। শহর থেকে মোটর সাইকেল শোভাযাত্রা করে শত শত সমমনা বুন্ধুরা এসেছিলেন যিনি তার বাপের জন্য খরচের দাওয়াত দিয়েছিলেন। সবাই তার প্রশংসা করেছেন এত বড় খরচের দাওয়াত খাওয়ানোর জন্য। কেউ কেউ সেই খাওয়ার ছবি ধারন করে ফেইসবুকে পোস্ট দিয়েছেন “অমুকের বাপের খরচের দাওয়াতে।” ভাজন ফকির বেচে থাকলে হয়ত বলতেন “তোমরা না, কি যে একটা ফেইসবুক ওয়ালা অইছ, ফয়তার দাওত খাইয়া ছবি দেহাও!”

তারিখঃ ৫/৭/২০১৯ খ্রি.
ময়মনসিংহ