গেন্দু মিয়ার গাইয়ের দুধ

গেন্দু মিয়ার গাইয়ের দুধ
(হাসির হাস্তর)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
[আমাদের সখিপুরের গ্রাম এলাকায় ছোটবেলা লোক মুখে কিছু গল্প শুনতাম। সেগুলোকে বলা হতো হাস্তর। আমি সেসব হাস্তর বন্ধুদের সহযোগিতায় সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছি আমার মতো করে। হাস্তরের ভেতর দিয়ে আগের দিনের গ্রামবাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রকাশ পাবে বলে আমি মনে করি। এই লেখাটি তারই একটি অংশ]
গেন্দু যেদিন শশুর বাড়ি নিতা খেতে গিয়েছিল সেই রাতেই তাদের গাভিন গাইটি বিয়ায়। একটি নাদুসনুদুস ষাড় বাছুর হয়। ২৮ দিন পর্যন্ত গাইয়ের দুধ তারা কেউ খায় না। শুধু বাছুরে খায়। এই সময়টায় গাইকে বলায় হয় কাচিলা গাই। কাচিলা গাইয়ের দুধ মিঠা মিঠা লাগে। এই সময়ের দুধ কেউ বাজারেও বিক্রি করে না। গেন্দুরে বিয়া করানোর পরই গাই বিয়াইলে সবাই বলে “গেন্দুর বউডা কপাইল্যা আছে। বাড়িতে আবার পরই গাই বিয়াইছে।” গাই বিয়ানোর কয়দিন পরই গাইয়ের খুব পেট খারাপ হয়েছিলো। গেন্দুরা মনে করেছিল আউশ ধান কাটার পর নাড়া ক্ষেতে গাই হাচার দেয়া হয়েছিলো। ঘাসের সাথে গাই ময়না খেয়েছিলো। তাই পেট খারাপ হয়েছিলো। ময়না এক প্রকার বিষাক্ত ঘাস। গরু খেলে পাতলা পায়খানা হয়। যাহোক, গাই এখন ভালো আছে।
গাই বিয়ানোর ২৮ দিন পরও গেন্দুরা গাইয়ের দুধ খেলো না। এ বাড়ির সবাই খুব কৃপণ। দুধ যা হয় পানাইয়া সব বিক্রি করে দেয় বাজারে। দৈনিক ১০টার সময় বর্গা বাজারে নিয়ে দুধ বিক্রি করতো গেন্দু মিয়া। গেন্দুর শশুর বাড়ির লোকেরা কৃপাণ না। তারা গাই পানাইয়া নিজেরা খাওয়ার জন্য যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু রেখে দিয়ে বাকীটুকু বাজারে নিয়ে বিক্রি করতো। কাজেই, বাপের বাড়িতে থাকাকালীন গেন্দুর বউ জয়গন প্রায় দৈনিক দুধভাত খেতে পারতো। শশুর বাড়িতে এসে দুধের গাইয়ের যত্ন নিচ্ছে জয়গন, শাশুড়ি গাই পানানোর সময় বাছুর ধরে দাড়িয়ে থাকে জয়গন, অথচ সেই দুধের এক ফোটাও খেতে পারেনা জয়গন।
একদিন জয়দগনের খুব দুধ খেতে ইচ্ছে হলো। বিক্রির জন্য রেখে দেয়া দুধের ঘট থেকে কিছু দুধ গ্লাসে ঢেলে জয়গন যুত করে খেয়ে ফেললো। যেটুকু কম পরলো সেটুকু কলসির পানি দিয়ে পুড়া করে রাখলো। সেই পানি মেশানো দুধ নিয়ে গেন্দু বাজারে গেলো। সরকারি স্বাস্থ্য কর্মীরা দুধের বাজারে সেদিন এলো দুধ পরখ করতে। লেকটোমিটার দুধে ডুবিয়ে ডুবিয়ে দুধ পরীক্ষা করা হচ্ছিল। যাদের দুধে পানি পাওয়া গেলো তাদের কানে ধরে ১০০ বার উঠ বইস করা হলো এবং পানি মেশানো দুধ তার মাথায় ঢেলে দেয়া হচ্ছিলো। কি কারনে পানি মেশানো হয়েছে তার কৈফিয়ত দিতেও বলা হচ্ছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে গেন্দুর দুধে পানি ধরা পড়লো। ঘটের দুধ সম্পুর্ণ ঢেলে দেয়া হলো গেন্দুর মাথায়। চুল, নাক, মুখ ও শার্ট দুধে চুবা চুবা হয়ে গেলো। গেন্দুর দুধে পানি থাকতে পারে এটা গেন্দু কল্পনাও করতে পারেনি। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা যখন গেন্দুকে পানি মেশানোর কারন জিজ্ঞেস করলো তখন গেন্দু উত্তর দিলো “আমরা দুধে পানি মিশাই নাই। আমার মনে অয় আমগ গাইয়ের মাঞ্জায় পানি আছে, যেডা দুধের নগে মিশা আহে।” বাড়িতে এলে জয়গন জানতে চাইলো “আইচকা দুধের বাজার কিবা? আপনের শরীরে দুধের গোন্দো পাইতাছি ক্যা? মাথা এব্যা আডা আডা ক্যা?” গেন্দু বিস্তারিত বলার পর জয়গন বললো “আসলেই মনে অয় গাইয়ের মাঞ্জায় পানি আছে।” জয়গনের মনে খুব কষ্ট লাগছিলো। তারজন্যই তার স্বামীকে অপমান করা হয়েছে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো আর দুধ খাবেও না, দুধে পানিও দিবে না। এরপরও গেন্দু নিয়মিত দুধ নিয়ে বাজারে যেতো। আরেকদিন এভাবে দুধ পরখ করা হলো। কিন্তু দুধে পানি ধরা পড়লো না। তাহলে আগের ঘটনার দিন পানি কোথা থেকে এলো? এই প্রশ্ন গেন্দুর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো।
তশর মুন্সির বাড়ির কাছ দিয়ে গেন্দু বাজারে যেতো। রাস্তায় মুন্সির সাথে গেন্দুর দেখা হলে মুন্সি জিজ্ঞেস করলেন
– গেন্দু ভাই, গাইয়ে কয় শের কইরা দুধ দেয়?
– দিনপত্তি ১ শের কইরা দুধ দেয়।
– বেচ কতটুকু।
– ব্যাকখানি বেইচা ফালাই।
– ক্যা, নিজেরা গাই পানাও। এক ফোটা দুধও খাওনা। অথচ তোমগো অবস্থা আমগো থিগা অনেক ভালা। আমগো জমি জিরাতও নাই, গাইও নাই। তাও আল্লায় দিলে ভালাই চলে। খোদার তিরিশ দিনই মুন্সি খাবার পারি। কারো অসুখ বিসুখ অইলে মোলুদ পড়াই, কোন নতুন গাছের ফল পাকলে মুন্সি খাই, নতুন ঘরে উঠতে গেলেও মুন্সি খাই। আমার কোন কোন দিন দুই বেলাও মুন্সি খাইতে অয়। সবাই আমার জন্য কুরকা (মুরগি) জবাই করে। দুধ দেয় পাতে। আল্লাহয় দিলে ভালাই খাইতাছি। দোয়া করার পরপর আতে যা দেয় তা দিয়া আমার সোংসার ভালাই চইল্যা যায়। তোমারে বলি কী, তুমি মইদ্যে মইদ্যে দুধ না বেইচা মাও, বাপ ও নয়া বউ নিয়া দুধ দিয়া ভাত খাও।
– দুধ বেইচ্যা যে আমগো হদাই করন নাগে।
– আইজকার দুধটা আমিই কিনলাম। এই নেও টেহা। এই টেহা দিয়া হদাই করোগা। আর দুধটুকু আমি তোমারে দিয়া দিলাম। তোমরাই খাবা।
গেন্দু বাজারে গিয়ে সদাই করে দুধ নিয়ে বাড়ি ফিরলো। দুধ বেচা টাকা দিয়ে বউয়ের জন্য আলতা, স্নো, পাউডার ও কদুর তেল কিনেছিলো। বাড়ি এসে বউয়ের হাতে এগুলো তুলে দিয়ে তশর মুন্সির কাইন্ডটি বর্ণনা করলো। আলতা-স্নো-পাউডার পেয়ে জয়গন খুশী হলো। আরো খুশী হলো এই ভেবে যে আজ সে দুধ খেতে পারবে। গেন্দুর ছোট বোন দেখে বললো “ভাই যে খালি ভাবীর জন্য স্নো পাউডার আনলাইন। আমার জন্য আনলাইন না? আগেত আনতাইন। অহন আমার কতা মনে থাকপ না।” গেন্দু বললো “আনমুনি, এরপর দুধ বেইচ্চা। একদিনের টেহায় ত সব কিনা যায় না।” কিছুক্ষণ পর জয়গন দেখলো দুধের ঘট নিয়ে গেন্দু ঘরের পেছনের দিকে যাচ্ছে। জয়গন ব্যাপারটা লক্ষ করছিলো। দেখলো গেন্দু ঘটের সম্পুর্ণ দুধ আসতে করে পাগারের পানিতে ঢেলে দিলো। ঘাটের পানি দুধে সাদা হয়ে গেলো। জয়গন জিগাইলো “মাইনসে এবা করলো ক্যা বুঝবার পাইলাম না। দুধ নিয়া পানিত ঢাইল্যা দিলো ক্যা?” গেন্দু উত্তরে বললো “আইজকা যুদি আমি দুধ খাই তাইলে আবার খাবার ইচ্ছা অব। দুধ খাবার অভ্যাস না অওয়াডাই ভালা। তাই মুন্সির দেয়া দুধ ফালাই দিলাম।”
২৪/১২/২০২০ খ্রি.
ময়মনসিংহ
গল্প সংগ্রহে সহযোগিতায় বন্ধু আবু বকর সিদ্দিক, সাড়াসিয়া।

Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)

Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/