গেন্দুর বউ এলো

গেন্দুর বউ এলো

(হাসির হাস্তর)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

[আমাদের সখিপুরের গ্রাম এলাকায় ছোটবেলা লোক মুখে কিছু গল্প শুনতাম। সেগুলোকে বলা হতো হাস্তর। আমি সেসব হাস্তর বন্ধুদের সহযোগিতায় সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছি আমার মতো করে। হাস্তরের ভেতর দিয়ে আগের দিনের গ্রামবাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রকাশ পাবে বলে আমি মনে করি। এই লেখাটি তারই একটি অংশ]

 

গেন্দু বিয়ে করার সময় শশুর বাড়ি যেতে হয়নি। বউকে তুইল্যা এনে বিয়ে পড়ানো হয়েছিলো। গ্রামে দুই রকম বিয়ে পড়ানোর নিয়ম আছে। একটা হলো চইল্যা যাওয়া আরেকটা হলো তুইল্যা আনা। বর যখন বিয়ে পড়ানোর উদ্যেশ্যে শশুর বাড়িতে গিয়ে বিয়ে পড়ায় সেটাকে বলা হয় চইল্যা যাওয়া। বর কনের বাড়ি না গিয়ে যদি কনেকে বরের বাড়িতে এনে বিয়ে পড়ানো হয় সেটাকে বলা হয় তুইল্যা আনা। গেন্দুর বউ জয়গনকে তুইল্যা এনে বিয়ে পড়ানো হয়েছিলো। দু’টি প্রথাই সখিপুর এলাকায় চালু আছে। ডুলিতে চড়ে জয়গন প্রথমদিন শশুরবাড়ি এসেছিলো। ডুলিতে এক জনের বেশী বসা যেতো না। পালকি ছিলো অনেক বড়। পালকিতে এক সাথে বর, কনে ও কনের সাথে আসা নানী, বা দাদী বা ছোট বোনও বসতে পারতো। যারা কনের সাথে প্রথম বরের বাড়ি যেতো তাদেরকে বলা হতো ডুলি ধরা। জয়গনের সাথে জয়গনের ছোট বোন আর নানী ডুলি ধরা হিসাবে এসেছিলো। কনেরা প্রথমবার এসে যে কয়দিন শশুরবাড়ি থাকতো সেকয়দিন ডুলিধরাও সেখানে থাকতো। ফিরে যাওয়ার সময় উপহার পেতো। যেটাকে বলা হতো মাইন পাওয়া। ডুলিধরাদের বিয়ে বাড়িতে থাকা খাওয়া কষ্টকর ছিলো। তবু মাইন পাওয়ার আসায় তারা এই কষ্ট ভুলে থাকতো।

 

জয়গন বাপেরবাড়িতে আসার সময় খুব কেঁদেছিল। মায়ের বুকে মুখ রেখে অনেক্ষণ ফুঁফিয়ে কেঁদেছিলো। মায় আঁচল দিয়ে চোখ মুখ মুছে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন “মা জয়গন, কাইন্দ না। সব মেয়া মাইনসেরই হশুরবাড়ি থাকন নাগে। এইডাই খোদার নিয়ম। হশুর হউরির খেজমত করবা। দামান্দের কথা হোনবা। হউরি বাইরা না দিলে পাইল্যা থিকা কিছু নিয়া খাবা না। দামান্দে খাবার আগে তুমি খাবা না। এইযে তোমার আঁচলে একটা খিলি পান বাইন্দা দিলাম। এইডা তোমার হউরিরে দিয়া কবা আংগ মাইয়া দিছে আননেরে খাইতে।” অদুরে দাঁড়িয়ে জয়গনের বাপে গামছা দিয়ে চোখ মুছছিলেন। জয়গনে মা পাপের দিকে নিয়ে গিয়ে বললেন “তোমার বাপের কাছে কইয়া যাও।” বাপের বুকে মুখ রেখে জয়গন চিকইর দিয়ে কেঁদে ফেললো। জয়গনের কান্না শুনে বাড়ির নাইয়রিরাও গুপ ছেড়ে কেঁদে দিলো। এক হৃদয়বিধারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। পাড়ার মুরুব্বিরা জয়গনকে ধরে ধরে হাটিয়ে ডুলি পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। ডুলির ফেতর আসন বিড়ায়ে বসলে জয়গনকে নিয়ে শশুর বাড়ির দিকে চললো বেয়ারা। ডুলিধরারা চললো গরুর গাড়িতে।

 

এদিকে গেন্দুকে হলুদ দিয়ে গোসল করিয়ে বিয়ের সাজন সাজিয়ে রাখা হলো। সন্ধারাতে ডুলি এসে পৌঁছলো গেন্দুদের বাইরবাড়ি। নুতুন বউয়ের আগমনে পোলাপানরা “নয়া বউ আইছে, নয়া বউ আইছে” বলে চিতকার করতে করতে পালানের ক্ষেতে গিয়ে গাইঠা (পটকা) ফুটাতে থাকলো। হাওয়াই বাজি ফুটালো। বাড়ির বউরা, মেয়েরা ও নাইয়রিরা সবাই বউ বরণ করতে বাইরবাড়ি চলে গেলো। বড় ঘরের মেঝেতে সব রান্নাকরা খাবার সাজিয়ে রাখাছিলো ডিস ভর্তি। ঘরে ছিলো শুধু গেন্দুর মা ও পালা বিড়ালটি। বিড়ালটি খাবার ডিসের পাশে বসে বসে মিয়াও মিয়াও করছিলো। গেন্দুর মায় চিন্তা করলেন “এই ওলা বিলাইডা যদি ঘরে রাইখ্যা বউ আনতে যাই তাইলে সব খাবার চাইটা নষ্ট কইরা ফালাইবো। খালি ঘরে বিলাই রাইখ্যা যান যাবো না।” কাউরে ডেকেও কোন সাড়াশব্দ পেলেন না।

 

এদিকে জয়গনকে ডুলি থেকে নামিয়ে আনতে হবে শাশুড়ির অর্থাৎ গেন্দুর মায়ের। সবাই উদবিঘ্ন ছিলো গেন্দুর মা আসে না কেনো। উপায়ান্তর না পেয়ে গেন্দুর মায়ের মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। হাতের কাছেই একটা বেতের ঢাকি ছিলো। চট করে ঢাকি দিয়ে বিড়ালটিকে ঢেকে ফেললো। বিড়াল আটকা পড়লো ঢাকির নিচে। তারপর গেন্দুর মা চলে গেলেন বউ বরণ করতে। গেন্দুর মা জয়গনকে ডুলি থেকে নামিয়ে আনলেন। জয়গন শাশুড়িকে কদম্বুছি করে আঁচল থেকে গিট্টু খুলে পানটি দিলো। বললো “আম্মা, আংগ মাইয়া আপনেরে পান খাইতে দিছে, নেইন।” গেন্দুর মা পান নিয়ে মুখে দিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন “নও মা, বাড়ির ভিতর।” উঠান পর্যন্ত নিয়ে জয়গনকে পাটার উপর দাড় করানো হলো। এক গ্লাস মিষ্টি সরবত খাইয়ে দেয়া হলো জয়গনকে। তারপর দেয়া হলো একটি চমচম। তারপর একগ্লাস পানি। আশে পাশের ননদেরা জয়গনকে না না রকম কেরাই করে কথা বলছিল। তারা পাটার নিচে পাতিল ভাংগা চেড়া দিয়ে রেখেছিল। তাই পাটা গুট গুটি নড়া চড়া করছিল। তাই দেখে ননদেরা কেরাই করছিলো “ভাবী, অবা থুকুর বুকুর নাচতাছুন ক্যা?” জয়গন খুব বিরক্ত হচ্ছিলো এসব আচার অনুষ্ঠান দেখে। সামনে আরও কত কি যে আছে? বিয়ের অনুষ্ঠানের এত নিয়ম কানুন ও প্রথা কে যে আবিস্কার করছিলো? অনেকক্ষণ পর জয়গনকে বড় ঘরে নেয়া হলো। জয়গনের খালা-শাশুড়ি বললেন “বিসমিল্লাহ বিল্ল্যা ঘরে পাড়া দেওগ বউ।” ঘরে ঢুকেই জয়গন দেখে মেঝেতে অনে খাবার দাবার পাটির উপর সাজিয়ে রাখা আছে। উপুর করা একটা ঢাকির নিচে কি যেন ছটর ফটর করছে। জয়গনের শাশুড়ির হটাৎ মনে পড়লো বিড়াল চাপ দিয়ে ঢেকে রাখার কথা। এতক্ষণে হয়তো বাতাস না পেয়ে আধা মরা হয়ে গেছে। তারাতাড়ি করে ঢাকি উচু করে দিলেন। হুলো বিড়ালটি লাফ দিয়ে বেড়িয়ে উগার তলে গিয়ে পালালো। জয়গন বিড়াল দেখে চমকে উঠলো। মনে মনে ভাবলো “বিয়ের অনুষ্ঠান কত নিষ্ঠুর। বউ ঘরে প্রবেশ করা পর্যন্ত বিড়াল ঢাইক্যা রাহন নাগে। আমি যেদিন পোলার বউ বাড়ি আনমু, হেদিন একটা না, তিনটা বিড়াল ছাইড়া দিমু পোলার বউয়ের সামনে।”

৩০/১২/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ
Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)

Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/