সমস্যাঃ ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া

সমস্যাঃ ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া

(স্বাস্থ্য কথা)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ আসাকে ডাক্তারি ভাষায় ফ্রিকুয়েন্সি অফ মিকচুরেশন বলা হয়। ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ হলে স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটে, ঘনঘন ঘুম ভেঙ্গে যায়। দিন রাত ২৪ ঘন্টায় যদি তিন লিটারের বেশি প্রস্রাব হয় তবে এটাকে পলিইউরিয়া বা বহুমুত্র বলা হয়। বাথরুমের পৌঁছার আগেই যদি প্রস্রাব করে কাপড় নষ্ট হয়ে যায় তখন বলা হয় ইউরিনারি ইনকন্টিনেন্স।

 

পেটের ভেতর মেরুদণ্ডের দু’পাশে দু’টি কিডনি থাকে। কিডনি রক্ত থেকে ছেকে দূষিত পদার্থ পানির সাথে বের করে দেয়। এটাই ইউরিন বা প্রস্রাব। সর্বদায়ই কিডনি থেকে প্রস্রাব তৈরি হচ্ছে। সেই প্রস্তাব ইরেটার নালী দিয়ে এসে তলপেটে মূত্রথলি বা ইউরিনারি ব্লাডারে জমা হচ্ছে। জমতে জমতে ব্লাডার পূর্ণ হয়ে গেলে প্রস্রাবের চাপ অনুভূত হয়। তখন বাথরুমে গিয়ে প্রস্রাব করে ব্লাডার খালি করতে হয়। বেশিরভাগ মানুষ ২৪ ঘন্টায় প্রস্রাব করে ছয় – সাত বার। বাচ্চাদের থলি যেহেতু ছোট থাকে সেহেতু তারা বড়দের থেকে বেশি ঘন ঘন প্রস্রাব করে।

ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়ার কারণ

 

কেউ কেউ আছেন ঘন ঘন পানি খান। ঘন ঘন পানি খেলে তো ঘন ঘন প্রস্রাব হবে, এটা সহজ কথা। বিশেষ করে রাতে ঘুমাবার আগে বেশি পানি খেলে ঘুম থেকে উঠতে হবে ঘন ঘন প্রস্রাব করার জন্য। শীতের দিনে শরীর কম ঘামে তাই শীতের দিনে কম পানি খেলেও চলে। শীতের দিনে বেশী পানি খেলে আরও ঘন ঘন প্রস্রাব হবে। কোনো কোনো রোগী আছে তাদের অনেক প্রকার ঔষধের সাথে অনেক পানি খেতে হয়। এটা অতিরিক্ত পানি। অতিরিক্ত পানি খাওয়ার জন্য ঘন ঘন প্রস্রাব হবে। কোন কোন বাচ্চা ঘনঘন বাথরুমে যায় তার শারীরিক কোনো সমস্যা না থাকলেও। এটাকে বলা হয় টিক। কোন একটা কাজ বারবার করলে বলা হয় টিক। প্রস্রাব করাও একটা কাজ। বাচ্চাদের প্রস্রাব করার ঠিক হতে পারে। এসব বাচ্চা ঘন ঘন প্রস্রাব করতে বাথরুমে যাবে। কিছু কিছু বাচ্চা আছে তারা লেখাপড়া করা তেমন পছন্দ করে না। তাই বাড়িতে হাউজ টিউটর এলেই বাথরুমে প্রবেশ করে। কোন কোন বাবাও আছেন বাইরে থেকে বাসায় এসেই বাচ্চাকে পড়া ধরেন। ভয়ে বাবা বাসায় আসার শব্দ শুনেই বাচ্চা বাথরুমে প্রবেশ করে। এসব সমস্যা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়।

 

বেশি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা গুলো হল কিডনি ইউরেটার ব্লাডার এবং প্রোস্টেট সমস্যা অথবা অন্য কোনো রোগ, যেমন ডায়াবেটিস মেলাইটাস, ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস ও প্রেগ্ন্যাসি। আরো কিছু কিছু কারণ আছে যেমন দুশ্চিন্তা বা এংজাইটি, প্রস্রাব বৃদ্ধিকারী ঔষধ সেবন, ইনফেকশন, ক্যান্সার স্টোন বা পাথর, ইউরেথ্রাল স্ট্রিকচার ইত্যাদি।

ইউরিনারি ব্লাডার-এর যদি ইনফেকশন হয় তাহলে ব্লাডার অল্পতেই সংবেদনশীল হয়ে প্রশ্রাবের চাপ হয়। ব্লাডারে পাথর হলে প্রস্রাবের রাস্তার মুখে ঘষাঘষি করে। ফলে প্রস্রাবের চাপ হয়। পুরুষের মুত্রনালীর শুরুতে এবং মুত্রথলির সংযোগ স্থলে সুপারির সমান একটি নরম গ্রন্থি আছে যাকে বলা হয় প্রোস্টেট গ্লান্ড। ষাট বছর বয়সের কাছাকাছি এসে অনেকেরই এই গ্রন্থি হাইপারপ্লাসিয়া হয়ে অথবা ক্যান্সার হয়ে বড় হয়ে যায়। যেহেতু প্রস্রাবের নালী এই গ্লান্ডের ভেতর দিয়ে এসেছে সেহেতু এই নালীর চারপাশে চাপ পড়ে। ফলে নালী সরু হয়ে যায়। সাভাবিক গতিতে এবং সাভাবিক পরিমাণে তখন প্রস্রাব বের হয় না। প্রস্রাব করার পরও কিছু প্রস্রাব ব্লাডারে থেকে যায়। এটাকে বলা হয় পোস্ট ভয়েড রেসিডিউয়াল (পিভিআর) ইউরিন। যেহেতু আগে থেকেই ব্লাডার কিছুটা ভরা থাকে সেহেতু বাকীটুকু ভরতে বেশী সময় লাগে না। ফলে অল্পক্ষণ পরই আবার প্রস্রাব ধরে। এজন্য প্রোস্টেট হাইপারপ্লাসিয়া ও প্রোস্টেট ক্যান্সার রোগীরা ঘন ঘন বাথ রুমে যায়।

 

এমন সমস্যা হলে ডাক্তার দেখাতে হবে। শারীরিক কোন সমস্যা না থাকলে যে কারনে ঘনঘন প্রস্রাব হচ্ছে সেগুলো চিহ্নিত করে তা পরিহার করলেই হলো। ইনফেকশন সন্দেহ হলে প্রস্রাবের রুটিন টেস্ট করা হয় প্যাথলজি ল্যাবরেটরিতে। প্রোস্টেট বড় হয়ে গেছে কিনা তার সহজ পরীক্ষা হলো ডাক্তার সাব হাতে গ্লাবস পরে আংগুলে পিচলা গ্লিসারিন লাগিয়ে পায়খানার রাস্তা দিয়ে আংগুল দিয়ে প্রোস্টেটের উপর চাপ দিয়ে অনুভব করেন। এটাকে বলা হয় ডিজিটাল রেকটাল এক্সামিনেশন। ক্যান্সার সন্দেহ হলে রক্তের পি এস এ পরীক্ষা করা হয় ল্যাব থেকে। ক্যান্সার হলে এটার লেভেল বেড়ে যায়। প্রোস্টেট বড় হলে অপারেশন করে ফেলে দেয়া হয়। তাতে ঘন ঘন প্রস্রাবের সমস্যা দূর হয়। ক্যান্সার আছে কিনা তার জন্য হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষা করা হয়। অপারেশনের আগে সূঁই দিয়ে প্রোস্টেট থেকে সেম্পল নিয়েও হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষা করা হয়। অপারেশন শেষে পুরা প্রোস্টেটের হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষা করা হয়। এসব বিষয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে ইউরোলজিস্ট বলা হয়। প্রস্রাবের সমস্যা হলে নিয়ম হলো প্রাথমিক ভাবে একজন এমবিবিএস ডাক্তার দেখানো। তিনি প্রাথমিক কারন নির্ণয় করে ইউরোলজিস্টের নিকট রেফার্ড করবেন।

৬/১১/২০২০

ময়মনসিংহ

 

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 1.00 out of 5)

Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/