ঘড়ি

ঘড়ি
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আগের দিনে কারো কারো কাছে ঘড়ি একটি বিলাসিতার বস্তু ছিল। আগেরদিন বলতে আমি বুঝাচ্ছি আমার শৈশবের দিনগুলি। তখন সবচেয়ে দামী যে লুঙ্গী ছিল সেইটার নাম ছিল টুইচ লুঙ্গী। সেই লুঙ্গীর দাম ছিল ৪ টাকা। এমন দামের লুঙ্গী পরলে মানুষ মনে করতেন ফেরাংগী করে। সেই যুগে একটি ঘড়ির দাম ছিল ১০০/২০০ টাকা। তার মানে এটা একটা দামী জিনিস ছিল। ঘড়ির কাজ ছিল সময় দেখানো। যারা স্কুলে যেতেন বা অফিসে যেতেন তাদের প্রয়োজন পড়তো ঘড়ির। গ্রামের বেশী ভাগ শিক্ষিত মানুষের পেশা ছিল শিক্ষকতা করা, প্রাইমারী স্কুলে অথবা হাই স্কুলে। নিজ বাড়ি থেকেই গরম ভাত খেয়ে দশটার স্কুলে যেতেন। দশটা-পাচটায় স্কুল টাইম ছিল। এই সময় দেখার জন্যই মাস্টার সাহেবদের ঘড়ির প্রয়োজন পড়তো। স্কুলের ছাত্রদের হাতে ঘড়ি দেখা যেতো না। সব মাস্টারের হাতেও ঘড়ি দেখা যেতো না। যারা ঘড়ি পরতেন তারা সাধারণত বাম হাতের কবজিতেই পরতেন। তাই এটাকে কবজিঘড়ি বলা হতো। ইংলিশে বলা হতো রিস্টওয়াচ। ডাঃ লুৎফর রহমানের লেখা উন্নতজীবন নামে একটা প্রবন্ধ আমাদের পাঠ্য বইয়ে ছিল। সেই প্রবন্ধে লিখা ছিল ‘পকেটে ঘড়ি নেই তাতে কি?’ এই প্রবন্ধটা কচুয়া পাবলিক হাই স্কুলে ইনসান স্যার পড়ানোর সময় আমি প্রশ্ন করেছিলাম “স্যার, ঘড়িতো, সবাই হাতে পরে, পকেটে ঘড়ি থাকবে কেন?” স্যার বলেছিলেন “আগের দিনে সবাই ঘড়ি পকেটেই রাখতেন। এখনো কেউ কেউ ঘড়ি পকেটে রাখেন। পকেট ঘড়িতে চেইন নাই। শুধু গোল একটা চাকতির মতো। ঘড়ি যখন প্রথম আবিস্কার হয় তখন পকেট ঘড়ি হিসাবেই তৈরি করা হতো। এখন সময় দেখার সুবিধার্থে ও কিছুটা ফ্যাসান করার জন্য মানুষ হাতে ঘড়ি পড়ে। ” পড়ানোর সময় ইনসান স্যারের হাতে একটা চকচকে ঘড়ি ছিল। স্যারের চেহারা লিক লিকে ছিল। ঘড়ি হাতে ঢোলা হতো। বাম হাতে ঘড়ি পড়ে বেত নাচিয়ে নাচিয়ে পড়াতেন। ঘড়িতে স্যারকে বেস মানাতো।

আমি কোন এক ইমাম সাহেবকে দেখেছি পকেট থেকে ঘড়ি বের করে সময় দেখতে। কচুয়া পাবলিক হাই স্কুলের আব্দুল্লাহ স্যার ক্লাসে এসে কিছুক্ষণ পড়া পড়ায়ে নীতিকথা শিক্ষা দিতেন। নামাজের মাসলা মাসায়েল জিজ্ঞাসা করতেন। যারা পড়া পাড়তো না তাদেরকে তিরস্কার করতেন। যে ছাত্র বেশী ফেরাংগী করতো অথচ পড়া পাড়তো না তাদেরকে মাক্কাল ফলের সাথে তুলনা দিতেন। বলতেন “মাক্কাল ফল দেখেছ না? পাকলে লাল টুক টুকে। দেখতে কি সুন্দর! ভেংগে দেখেছো? ভিতরে গোবরের মতো। তোমার বাইরে মাক্কাল ফলের মতো। ভিতরে গোবর। ” মাক্কাল ফলের মতো আরেকটা ফল আছে, কিছুটা করলার মতো, পাকলে টুক টুকে লাল, ভিতরে গোবরের মতো। খাওয়ার লোভে কাকে ঠোক্কর দেয়। কিন্তু গোবর দেখে খায় না। এটাকে বলা হয় কাইয়া কাঠল (কাউয়া কাঠাল)। স্যার নীতিকথা শিখানোর সময় ঘড়ি খুলে হাতে নিয়ে চাবি দিতেন। আগের দিনের ঘড়ির কাটা ঘূরত স্প্রিং-এ চাবি দেয়ার কারনে। ঘড়ির ভিতর একটা স্প্রিং কয়েল ছিল। ঘড়ির সাইডের নব ঘুরালে স্প্রিং পেচাতে পেচাতে টাইট হয়ে আসতো। ছেড়ে দিলে কয়েলটি আনকয়েল হতে থাকতো। আনকয়েল হয়ে শেষ হতে চব্বিশ ঘন্টার বেশী সময় লাগতো। চব্বিশঘণ্টা পর আবার চাবি দেয়া হতো। আনকয়েল হবার সময় কয়েল ঘড়ির কাটা ঘুরাতে থাকতো আর আমরা সময় দেখতে পেতাম। আব্দুল্লাহ স্যার দৈনিক ক্লাসে বসে ঘড়ির চাবি বা দম দিতেন। আব্দুর রহমান বয়াতি গেয়েছেন “একবার চাবি মাইরা দিছে ছাইড়া, জনম ভরা ঘুরিতেছে। মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি কোন মিস্তরি বানাইয়াছে?” আমাদের নতুন প্রজন্ম চাবি ওয়ালা ঘড়ি দেখে নাই। তাই তারা এই গানের মর্ম উপলব্ধি করতে পারবে না। ঘড়ির ভিতর জুয়েল বা মুক্তাদানা থাকতো, যার উপর দিয়ে ঘড়ির কাটা সুন্দর ভাবে ঘুরতে পারতো। জুয়েলের সংখ্যা যত বেশী হতো ঘড়ির দাম তত বেশী হত। আমি প্রথম ঘড়ি কিনি সেভেনটিন জুয়েলের। ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে পড়ার সময়। খুব সময় ১৫০ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম টাংগাইলের ভিক্টোরিয়া রোডের দোকান থেকে। ঘড়ি মাঝে মাঝে মেকার দিয়ে ওয়াস করাতে হতো।

এর আগে আমার ঘড়ি না থাকলেও আমার এই দেহঘড়ি দিয়ে সময় নির্ণয় করতে পারতাম। রেডিওতে কিছুক্ষণ পরপর সময়ের ঘোষনা দেয়া হতো। আমি বাইরে এসে সূর্যের দিকে তাকিয়ে আকাশে সূর্যের পজিশন দেখতাম বারবার। এইভাবে দেখতে দেখতে পাকা হয়ে যাই। আমি সূর্যের দিকে তাকিয়ে বন্ধুদের বলতাম “এখন বাজে এতটা এত মিনিট। ঘড়িতে মিলিয়ে দেখো। ” বন্ধুরা ঘড়ি মিলিয়ে দেখে বলতো “প্রায়ই হয়েছে। এই পাচ দশ মিনিট এদিক সেদিক হয়েছে।”

স্কুলে ক্লাস শুরু হতো সকাল দশটায় মাঠে এসেম্বলি ক্লাসের মাধ্যমে। এসেম্বলি ক্লাসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীত গাওয়া ও শারীরিক কসরত করা হত। প্রাইমারী স্কুল জীবন ছিল পাকিস্তান আমলের। তাই তখন উর্দুতে জাতীয় সংগীত গাইতে হতো। পরপরই আমরা বাংলায় একটা দেশাত্মবোধক গান গাইতাম। হাইস্কুল জীবন শুরু হয় স্বাধীন বাংলাদেশ দিয়ে। এরপর থেকে আমরা শুধু “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি” জাতীয় সংগীতটি গাই। পৃথক দেশাত্মবোধক গান গাইতে হয় না।

সকাল ৯ টার সময় স্কুলে যাওয়ার জন্য বেল বাজানো হতো ঢং ঢং ঢং করে অনেক্ষন। সেই বেলের শব্দ আমাদের বাড়ি থেকে শোনা যেতো। কারন, তখনকার পরিবেশ ছিল শান্ত। বেলের শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ ছিল না। এমনকি কচুয়া বাজারে বাউল গানের আসরে কাশেম বয়াতির খলিমুখের বাউলা গানও আমাদের বাড়ি থেকে শোনা যেতো। আমার এখনো মনে আছে তিনি গাইতেন
আসিবে তুফান, ভাংগিবে ঘরখান,
চিরদিন ভবে কারো সমান যায় না।
কাংগাল হইলে ভবে কেউ জিগাইনা।।
আমি যেই ডাইলে ধরি, ডাইল ভাইংগা পড়ি, কোন ডাইলে আমার ভর কুলায় না।
কাংগাল হইলে ভবে কেউ জিগায় নারে, কাংগাল।।
অথচ কচুয়া বাজার ও হাই স্কুল আমাদের বাড়ি থেকে আড়াই বা তিন কিলোমিটার হবে। আমার প্রাইমারী স্কুল ঘোনার চালাও এক দেড় কিলোমিটার হবে আমাদের বাড়ি থেকে। নয়টার ঘন্টা শুনে ততাভাত (গরম ভাত) খেয়ে রওনা দিতাম স্কুলে। পথিমধ্যে আমাদের সাথে যোগ দিতো অনেকে। দলবদ্ধভাবে এক সাথে আনন্দে চলে যেতাম স্কুলে। মেয়েরা যেতো আগে আগে, আমরা যেতাম পিছে পিছে। কেউ কোনদিন কাউকে উত্তক্ত করতো না। প্রাইমারী স্কুলে ঘন্টা দেয়ার মতো কোন দপ্তরি ছিল না। স্যারগণ নিজে অথবা ক্লাস ক্যাপ্টেন দিয়ে ঘন্টা বাজাতেন। কচুয়া পাব্লিক হাই স্কুলের দপ্তরি ছিলেন মফিজ ভাই। কত ভালো মানুষ ছিলেন মফিজ ভাই! দপ্তরিরা সব সময় ভালো মানুষই হতো। মফিজ ভাই অফিসের বারান্দায় বের হয়ে বামহাতে পিতলের বেল উচু করে ধরে কাঠের হাতুরি ডান হাতে ধরে বেলে আঘাত করতেন। ঢং করে বেজে উঠতো বেল। আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজে বেল বাজাতেন জুরান ভাই, ইন্সু ভাই। সব দপ্তরিদেরকেই আমার খুব সুখী মানুষ মনে হতো। এরা কেন এতো সুখী থাকে আমি জানি না।

প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে ঘড়ি তৈরির প্রযুক্তিরও উন্নতি হয়েছে। স্প্রিং ও জুয়েলের পরিবর্তে ব্যাটারিচালিত ঘড়ি আসা শুরে করে। কাটা ঘুরানোর জন্য ব্যাটারি থেকে এনার্জি সাপ্লাই দেয়া হয় এইসব ঘড়িতে। এরপর আসে ডিজিটাল ঘড়ি। ঘড়ির ভিতর মেমোরি চিপ লাগিয়ে এলসিডি মনিটরে সময় সংখ্যা দেখায় এই ঘড়িতে। আমি কিছুদিন এই ঘড়ি হাতে দিয়েছি। কিন্তু আমি ডিজিটাল ঘড়ি বাদ দিয়ে এখন ব্যাটারি চালিত কাটার ঘড়ি ব্যবহার করছি। এই মুহুর্তে আমার বাম হাতে কাটার ঘড়ি আছে। আমি গত ৪ বছর আগে রংপুরের ৯০ এর দশকে প্যাথলজির অবসর প্রাপ্ত অধ্যাপক নুরুজ্জামান স্যারের কাছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনছিলাম। তিনি তার বাম হাতের স্প্রিং চালিত চাবির ঘড়িটি দেখিয়ে বললেন “এই ঘড়িটিই তখন আমার হাতে ছিল যখন হানাদারবাহীনি আমাকে ধরলো। এটা আমি ইংল্যান্ড থেকে এনেছিলাম পড়তে গিয়ে পাকিস্তান আমলে। এখনো এটায় ভালো টাইম দেয়। ” আমি শুনেছি স্বাধীনতার এই ৪৯ বছর পরও তিনি সেই ঘড়িটি সবসময় হাতে দেন। ওল্ড ইজ গোল্ড।

এরপর ডিজিটাল ঘড়িতে কম্পিউটারের যতসব ফাংশন সেট করে এর ব্যবহার বহুমাত্রিক করে ফেলেছে। জানা গেছে যে এই ঘড়ি দিয়ে প্রশ্ন ফাস করা হয়। পরীক্ষার্থীরা নকল করে পরীক্ষায়। তাই এখন কোন ঘড়ি নিয়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করা যায় না। অনেকে ঘড়ি পরাই বাদ দিয়েছে। কারন, তাদের মোবাইলেই ডিজিটাল ঘড়ি আছে। কি দরকার বাড়তি খরচ করে ঘড়ি কিনে? কিছুক্ষণ পরপর মোবাইল ফোন সেট পকেট থেকে বের করে সময় দেখে নেয়। পকেট মোবাইল আবার পকেটেই ঢুকে পড়েছে।
১৩/৭/২০১৯ ইং
ময়মনসিংহ -কিশোরগঞ্জ জার্নি