গ্রামের সেইসব ফেরিওয়ালা

গ্রামের সেইসব ফেরিওয়ালা
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ফেরিওয়ালা কথার অর্থটা বুঝেছি ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় প্রাইমারি স্কুল বৃত্তি পরীক্ষা দেয়ার পর কালিহাতি থেকে টাংগাইল শহরে গিয়ে আমার প্রথম দেখা সিনেমা ‘মানুষের মন’ দেখার পর থেকে। এটা ছিল ১৯৭২ সনের প্রথম দিকে। সেই সিনেমায় নায়ক রাজ রাজ্জাক সাইকেলের চার চাকার ঠেলা গাড়ি নিয়ে খেলনা বিক্রি করছিলেন শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে গেয়ে। গানটি ছিল এমন:
এই শহরে আমি যে এক নতুন ফেরিওয়ালা।।
হরেক রকম সওদা নিয়ে ঘুরি সারা বেলা।
ফেরিওয়ালা।


চার চাকাতে ভাগ্য বেধে বুঝে নিলাম ভাই,
সব জিনিসের মূল্য আছে,
মানুষের দাম নাই।।


এরা ত হলেন শহরের ফেরিওয়ালা। প্রয়োজনীয় জিনিষ পত্র ক্রেতার কাছে নিয়ে আসে বিক্রি করার জন্য। হাটে গিয়ে আমরা জিনিসপত্র কিনতাম দোকান থেকে। মেয়েরা ও শিশুরা তো হাটে যেতে পারতো না। তাদের জন্য ছিল গ্রামের ফেরিওয়ালা। কিন্তু তাদেরকে কেউ ফেরিওয়ালা বলে জানতো না। তাদেরকে জানতো বাইন্যা, কুমার, নইটানাওয়ালা, গজাওয়ালা, হান্দার (সান্দার), বাইদা (বেদে), গুড়ওয়ালা, বেপারী /কুলু ইত্যাদি নামে।

আমি যে সময়ের কথাগুলি বলছি সেগুলি স্বাধীনতা যুদ্ধের আগের কথা। আমার শিশুকাল ও প্রাইমারি স্কুল জীবনের সময়ের কথা। আমাদের গ্রামের বাড়ি ঢনডনিয়া থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূর কালিহাতির কাছের ঝকগরমান গ্রাম থেকে দুইজন কুমার আসতেন বছরে দুইবার। একবার আসতেন শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে আরেকবার আসতেন মাঘ-ফাল্গুন মাসে। আউশ ও আমন ধান কাটা শেষ হলে। বর্ষাকালে তারা বল্লা ও কালিহাতির কুমারদের হাতে বানানো মাটির পাক পাতিল নৌকাভর্তি করে এনে ছোট চওনার ঘাটে এনে নামাতেন। সেখান থেকে ঝাকাভর্তি করে এনে জিতেশ্বরির একটা বাড়িতে রাখতেন। তারা দুইজনই হিন্দু ছিলেন। প্রতিদিন সকালবেলা দুইজন ঝাকাভর্তি করে মাথায় নিয়ে গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে পাক পাতিল বিক্রি করতেন। পরনে থাকতো শুধু একটি মাত্র ধুতি। লিক লিকে শরীর ছিল তাদের। লম্বা গড়ন। ঝাকা মাথায় পিঠ সোজা করে হাটতেন। উচ্চ স্বরে ডাক দিতেন “রাখবেন পাক পাতিল।”

সেই সময় আমাদের এলাকায় এলুমিনিয়ামের ক্রোকারিজ খুব কম পাওয়া যেতো। বেশীভাগই মাটির তৈরি হারি পাতিল ছিল। প্রায় সব কাজেই এই সব মাটির জিনিসপত্র ব্যবহার করা হতো। ব্যাবহার করা স্বাস্থ্য সম্মতও ছিল। মাটির হারি কলসিতে পানি রাখলে পানি বেশীক্ষণ ঠান্ডা থাকত। এলুমিনিয়াম বা কাশার হারি কলসিতে পানি গরম হয়ে যেতো। তাই বাড়িতে কাশার কলসি থাকা সত্যেও মাটির কলসিতে পানি সংরক্ষণ করা হতো। কাশার কলসি আমরা কলসি বলতাম কিন্তু মাটির কলসিকে বলতাম কলস। যেমন, বলতাম “ভরা কলস নড়ে না।” সেইসব মাটির তৈরি সবচেয়ে বড় যে পাত্রটি ছিল তার নাম ছিল জালা। জালায় ধান রাখা হতো। এর রঙ ছিল কালো। এর চেয়ে একটু ছোট ছিল কোলা বা রাইং। কোলা লালচে রঙের ছিল। কোলায় রাখা হতো চাউল। ভাত রান্না করা হত যেটিতে তার নাম ছিল বুরকা। বুরকার ঢাকনার নাম ছিল খোরা। তরকারি বা সালুন রান্না করা হতো পাতিলে বা পাইল্লায়। পাইল্লার ঢাকনির নাম ছিল চাপনি বা পাইল চাপনি। ভাত রাখা হতো গামলায়। সালুন বাড়া হতো বাটিতে। খাওয়া হতো হানকিতে (সানকিতে)। এখন পহেলা বৈসাখে আমরা সানকিতে পান্তাভাত খাই আমাদের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য। পানি পানের ক্ষেত্রে কিন্তু কেউ মাটির গ্লাস ব্যবহার করতো না। এলুমিনিয়াম, কাচ অথবা কাশার গ্লাস ব্যবহার করা হত। উপহার হিসাবে সাধারণত কাশার ক্রোকারিজ দেয়া হত। নতুন জামাইদেরকে করইর থালায় খাবার দিতো। চিনামাটি বা পোরসেলিনের প্লেটকে বলা হতো করইর থালা বা থালি। করইর থালি সহজে ভেংগে যেতো। তাই এই গুলিকে সাধারণত শিকেয় ঝুলিয়ে রাখা হতো। মাটির সানকিও সহজে ভেংগে যেতো। তাই সাধারণত টিনের থালা ব্যবহার হতো। গরুর খাবার দেয়া হতো চারীতে।

যাহোক, সেই ঝগরমানের কুমারগণ ঝাকাভর্তি পাক পাতিল নিয়ে বাইরবাড়ি এসে দাড়াতেন। মাথা থেকে ঝাকা নামানোর জন্য গ্রামের একজনকে সহযোগীতা করতে হতো। ছেলেরা হারি পাতিল নিয়ে বাড়ির ভিতর যেতো মেয়েদেরকে দেখানোর জন্য। মেয়েরা পছন্দের পাতিলে বাম হাত দিয়ে ধরে ডান হাতে থাপ্পর দিয়ে শব্দ শুনতেন। ভাংগা থাকলে বুঝা যেতো। শিশুদের জন্যও মাটির খেলনা আনতেন সেই ঝাকার মধ্যে। আমি মাটির ঘোড়া কিনতাম। সোমেলা কিনতো মাটির খুটি মুচি বা খেলনা পাক পাতিল। কেনার পর দাম পরিশোধ করা হত চিটাধান দিয়ে। চিটাধান হলো ধান প্রসেস করার সময় চেপটা চিটার সাথে কিছু নিম্নমানের মিশ্রিত ধান। মেয়েরা কষ্ট করে চিটা বাছাই না করে চিটাধান এইসব কেনার কাজে ব্যবহার করতেন। মৌসুমের সময় ফেরিওয়ালাগণ জিনিস বিক্রি করে চিটাধান সংগ্রহ করে মৌসুমের শেষে চিটা থেকে ধান আলাদা করতেন। এই ধানে তাদের সংসার ছয়মাস চলতো। ছয়মাস পর আমন ধানের মৌসুম আসতো। সেই ধানে তাদের বাকী ছয়মাস চলে যেতো। পাহাড়ি আউশধান প্রধানত ভাতুরি ধান ছিল। ভাতুরি ধানের সাথে কালো রঙের ঘাসের বিচি মিশে যেতো। ভাতুরি ধানের চাউলের ভাতের সাথে ঘাসের বিচির মিশ্রন একটা বিরক্তিকর ছিল। চিটাধানের সাথে অনেক ঘাসের বিচি চলে যেতো।

বাইন্যারা ছিলেন এলাকারই। বাইন্যাদের নাম পরিচয় আমার এই লেখায় দেয়া ঠিক হবে না। তাই তাদের পরিচয় লিখলাম না। আমাদের পাশের গ্রামের একজন বাইন্যা ছিলেন। দূর সম্পর্কের চাচা ছিলেন। তাই তিনি আমাদের বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতেন। তিনি বাঁশের বাইকে (ভার) ঝাকা ঝুলিয়ে কাঁধে নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে কধুর তেল, হিমকবরি তেল, স্নো, পাউডার, সজ মশল্লা বিক্রি করতেন। মা ঝাকা থেকে এইসব বের করে পছন্দমত জিনিস কিনতেন। বাবার হাট থেকে আনা জিরার চেয়ে বাইন্যার কাছ থেকে মার পছন্দ করা জিরার রান্না বেশী স্বাদের হতো।মা যখন বসে বসে ঝাকা থেকে স্নো পাউডার বের করতেন আমি তখন মার পিঠ ঘেষে দাঁড়িয়ে সেসব দেখতাম। সেখানে হুইশাল বাঁশীও থাকতো। মা আমাকে হুইশাল বাঁশী কিনে দিতেন। সেই বাঁশীর ভিতর একটা ছোট্ট গোল বল থাকতো। ফু দিলে বল ঘুরতে থাকতো আর শব্দ হতো। মার কানের কাছে গিয়ে হুইশাল বাজাতাম। মা কান চেপে ধরে সরে যেতে বলতেন দূরে। মসলা বিক্রি করতে করতে সেই বাইন্যা চাচার শরীরও মসলার বাস্না (ঘ্রাণ) করতো। আমি নাক দিয়ে সেই ঘ্রাণ নিতাম। জিরার ঘ্রাণ আমার ভালো লাগতো। তাই আমি এখনো দোকান থেকে জিরাপানির বোতল কিনে খাই।

সান্দার নামে এক প্রকার ফেরিওয়ালা আসতেন আমাদের বাড়িতে। তাদের বাড়ি সাভার এলাকায় ছিল। মৌসুমের সময় আমাদের এলাকায় এসে ধনী বাড়িদের বাংলাঘরে বা বারান্দায় সাময়িক ভাবে থাকতেন। মেয়ে সান্দাররা বাড়িতে প্রবেশ করে চুরি বিক্রি করতেন। মার পছন্দ করা চুরি মার হাতে পরিয়ে দিতেন। মা বেশ ফর্সা ছিলেন। আঙুলগুলি জড়সড় করে জোর করে সান্দার মার হাতে তুলে দিতেন। মা আংগুলের গিরায় ব্যথা পেয়ে উ আ করে মুখ লাল করে ফেলতেন। আমি কষ্টের সাথে মার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। হাতে চুরি উঠে গেলে মা উৎফুল্ল হতেন। আমিও উৎফুল্ল হতাম। সান্দারের ঝাকায় কাচের মার্বেল গুটির খেলনা ছিল। মা আমাকে মার্বেল গুটি কিনে দিতেন। আমি মজি ভাই, জিন্না ভাই, শাহজাহান ও মুকুলের সাথে মার্বেল গুটি খেলতাম। দূর থেকে আওয়াজ আসতো “নই টানা, মাখন টানা, বাদাম টানা, গোলগোলি ভাজা, ভাজা বুট।” আমরা খেলাধুলা বাদ দিয়ে দৌড়ে বাড়ি থেকে ঝার্না (কুলা) ও কাঠায় করে চিটা ধান নিয়ে বের হতাম। কিনে রাখতাম এই সব মিষ্টি জাতীয় জিনিস গ্রাম্য সেই ফেরিওয়ালার কাছ থেকে। এই ফেরিওয়ালার বাড়ি ছিল বল্লা।এলাকায় থেকে বাচ্চাদের মিঠা জিনিস বিক্রি করতেন। তিনিও হিন্দু ছিলেন। পরতেন ধুতি। খেতাম মজা করে চোটকিয়ে চোটকিয়ে। খেলার সাথীদের দেখিয়ে দেখিয়ে।

কত আর লিখব। আরও কত রকম ফেরিওয়ালা ছিল! তেল নিয়ে আসতেন কুলু। মা তেল রাখতেন। খাটি ঘানিতে ভাংগানো সরিষার তেল। কি বাস্না! মাথা পেতে দিতাম তেল দিয়ে দিতে। কাচা মরিচ, পিয়াজ কেটে মা মুড়ি বানিয়ে দিতেন সেই তেল দিয়ে। কি যে স্বাদ ছিল!

সেই নইটানা বাদাম টানা খেতাম আমরা ছোটরা। কিন্তু মা বাবা খেতেন না। মাকে খেতে বলতাম। খেতেন না। মনে করতাম বড় মানুষ তো এখন ছোটদের খাবার খেতে লজ্জা পান। তাই হয়ত খান না। আমি এখন বড় হয়েছি। নিজের সন্তানকে বড় হতে দেখেছি। নাতীকেও বড় হতে দেখছি। সন্তান যখন ছোট ছিল তারাও আমাকে তাদের পছন্দের জিনিস খেতে অফার করে। নাতীও তার পছন্দের খাবার খেতে আমাকে অফার করে। আমি মুখে দেই। কিন্তু আমি আমাদের সেই গ্রামের ফেরিওয়ালাদের নই টানা, মাখন টানা,বাদাম টানা, গোলগোলি ভাজা, কাঠগজা, রস গজা, জিলাপি, ভাজা বুটের মতো স্বাদ পাই না। কারন, সেগুলি ছিল আমাদের ফেরিওয়ালার। এখনো কি তারা গ্রামে এসে ডাকে “এই মাখন টানা, ভাজা বুট?”

১৭/৬/২০১৯ ইং
ময়মনসিংহ -কিশোরগঞ্জ -ময়মনসিংহ জার্নি