হা, হা, হা

হা, হা, হা
(স্মৃতির পাতা থেকে)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

একদিন আমার এক প্রাতঃভ্রমণের বন্ধু রেল ওয়ের পরিচালক নুরুল ইসলাম ভাইকে নিয়ে এলেন আমার চেম্বারে। তিনি পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন “আপনার ডায়াবেটিস চেক করার জন্য এই ল্যাবরেটরিতে রক্ত দেবেন। সঠিক রেজাল্ট পাবেন।” শুনে পরিচালক একটা অট্টহাসি দিলেন “হা, হা, হা।” আমি চমকে উঠলাম। শুনে পাশের রুম থেকে আমার সহকারী এসে পড়ল কি হয়েছে মনে করে। হাসি কি বিকট হাসি। আমি বললাম “ভাই, কি হয়েছে? এমন হাসলেন কেন?” তিনি আরো জোড়ে হাসলেন “হা, হা, হা।” আমরা আবারো চমকে উঠলাম। আবার জানতে চাইলাম “হাসলেন কেন, এভাবে?” এবার তিনি তার সামনের রুপালী দুইটি দাত বের করে মিষ্টি করে বললেন “আমাকে একজন শিখিয়ে দিয়েছেন “বেশী বেশী হাসবেন। হাসলে সুস্থ থাকবেন। তাই খুশীর সংবাদেও হাসি, দু;খের সংবাদেও হাসি।”
-তাই এভাবে চেম্বারে এসেও হাসবেন?
– হা, হা, হা।
– আমিও এভাবে হাসি। তবে সবসময় সব জায়গায় না। ফজরের নামাজ পড়ে, দুই পেইজ কোরআন শরীফ অর্থসহ পড়ে বেরিয়ে পড়ি প্রাতঃভ্রমণে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে ৫০/৬০ জনের একটা দল গল্পগুজব ও হাসিঠাট্টা করতে করতে হাটি। তারপর সবাই গোল হয়ে দাড়াই। একজনের কমান্ডে নানারকম শারীরিক কসরত করে ব্যায়াম করি। সেই কমান্ডও মজার মজার কথার। যেমন ধরেন বলা বলো ‘মুড়ি ভাঁজুন’। আমরা কোমর ঘুরালাম কিছুক্ষণ। বলা হল ‘ফিক্কা মারুন’। আকাশের দিকে হাত ছুড়ে মারলাম। ‘ঢাকা ময়মনসিংহ ‘। দুই হাত উত্তর দক্ষিণ দোলালাম কিছুক্ষণ। পাখি দেখুন। পিঠ পিছনের দিকে বেকিয়ে আকাশের পাখি দেখলাম কিছুক্ষণ। এইভাবে শরীরের সব জোড়া জাড়ির ব্যায়াম করা হয় মজার মজার কথা বলে। শেষের ইভেন্ট হলো সবাই হাটুতে হাত রেখে মাটির দিকে তাকিয়ে লিডার বলেন ‘হাসতে জানে কাঁদতে জানে সেই ত সুখে রয়। ‘ আমরা এক যোগে উচ্চ স্বরে হেসে উঠি হা, হা, হা। আমাদের সেই হাসি শুনে ক্যাম্পাসের সব পাখি উড়ে যায়। পথচারীরা থমকে দাঁড়ায়।
– হা, হা, হা।
এরপর থেকে নুরুল ইসলাম ভাই রেগুলার এসে আমার ল্যাবে রক্তের সুগার পরীক্ষা করতে দিতেন সকালে। বিকেলে রিপোর্ট নিতে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করতেন
– ভাই রিপোর্ট কেমন?
– ভালো।
– হা, হা, হা।

আমাদের ল্যাবের সবাই জানতেন যে ইনি এভাবেই হাসেন। খুব ভালো লোক। আমার সাথে তার বন্ধুত্ব বাড়তে থাকে। আরো দুই চারজন করে বুন্ধু নিয়ে আসেন সুগার পরীক্ষা করাতে, লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করাতে, কোন ডাক্তার দেখাতে হবে তার সিদ্ধান্ত দিতে। শেষে হা, হা, হা।

একদিন তিনি হা হা হা করে আমার রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি ডেকে বললাম
– ভাই, আপনার ইসলাম কাইত হয়ে আছে।
– মানে?
– যান, আরেকদিন বলবো।
-না, আজই বলেন। (সামনে বসলেন)
-অন্য একসময় বলব।
– না, রহস্যময় কথা। এখনি বলেন।
– শুনেন। ইসলামের ৫টি স্তম্ভ আছে। ইমান, নামাজ, রোজা, হজ্জ ও যাকাত। প্রথম তিনটি স্তম্ভ ধনী গরীব সবার জন্য প্রযোজ্য। শেষের দুইটি শুধু ধনীদের জন্য প্রযোজ্য।
– তাতো বুঝলাম। আমার ইসলাম কাইত হলো কেমনে?
– বিল্ডিং সাপোর্ট করার জন্য প্রোয়োজন স্তম্ভ। ঘরের চালা সাপোর্ট দেয়ার জন্য খুটি প্রয়োজন। একটি চার কোণা তাবু সাপোর্ট দেয়ার জন্য প্রয়োজন পাচটি বাঁশের স্তম্ভ বা খুটি। মাঝে একটি এবং চার কোণায় চারটি। মাঝের খুটিটি ইমান সরূপ। আপনার ইমান আছে, নামাজ পড়েন, রোজা রাখেন এবং যাকাত প্রদান করেন। তার মানে আপনার ইসলামের চারটি খুটি আছে। কিন্তু আপনি হজ্জ করেন নাই। তার মানে একটি খুটি কম আছে। তাবু যেমন একটি খুটি কম থাকলে একদিকে কাইত হয়ে থাকে তেমনি আপনার ইসলাম হজ্জ না করার জন্য এক দিকে কাইত হয়ে আছে।
– হা, হা, হা।
– আমি হজ্জ করব, ইনশাল্লাহ। তবে এখন না। কিছু ঝামেলা আছে। ঝামেলা গুলি শেষ হবার পর।
– যদি আপনার শারীরিক সামর্থ্য থাকে, সৌদিআরব যাওয়া আসা ও হজ্জের সময় খরচ করার মত অর্থ থাকে তবে আপনার হজ্জ করা জরুরি বা ফরজ। না করলে গুনাহগার হবেন। আপনার কি অপেক্ষা করা ঠিক হবে?
– হা, হা, হা। আজ আসি। দেখি কি করা যায়। পরে কথা বলব। হা, হা, হা।

নুরুল ইসলাম ভাই চলে গেলেন। দুইএকদিন পর আবার এলেন। বললেন
– ভাই, আপনি সেদিন বলার পর থেকে আমি বেশ চিন্তা করেছি। শীগ্রি হজ্জ করব। হজ্জে যাওয়ার সময় মেডিকেল চেক আপ করার সময় যেসব পরীক্ষা করা হয় সেইসব পরীক্ষা করে দেখতে চাই ফিট আছি কিনা।
– আলহামদুলিল্লাহ। খুব খুশী হলাম। এই পরীক্ষাগুলি করান।
– হা, হা, হা।
– হজ্জে গেলে এভাবে হাসা যাবে না।
– এ্যা, আমি ত নিয়ত করেছি কাবা শরীফের কাছে গিয়েও একটা হাসি দিব।
– ওখানে গিয়ে আপনি শান্ত হয়ে পরবেন। হাসি আসবে না।
– হা, হা, হা।
– ভাই, আপনি একা না গিয়ে ভাবীকেও সাথে নিয়ে যাইয়েন।
– না, এবার আমি একাই যাই। আপনার ভাবীকে পরে নিয়ে যাবো। একটু সমস্যা আছে।
– হজ্জ কিন্তু একবারই ফরজ। পরে গেলে আপনার দ্বিগুণ খরচ হবে। যদি পারেন এক সাথেই যান।
– হা, হা, হা।

কয়েকদিন পর নুরুল ইসলাম ভাই একজন মহিলাকে নিয়ে এলেন। পরিচয় করিয়ে দিলেন
– ইনি আপনার ভাবী। আপনি বলার পর হিসাব করে দেখলাম যে এবারই তাকে নিয়ে হজ্জে যাই। তাই রক্ত প্রশ্রাব পরীক্ষা করাতে নিয়ে এসেছি।
– আলহামদুলিল্লাহ। আমরাও দুজনে একসাথে ২০০৫ এর জানুয়ারিতে হজ্জ করে এসেছি। একসাথে যেতে পারলে খুব ভালো হবে।

পরেরদিন নুরুল ইসলাম ভাই রিপোর্ট নিতে এলেন। রিপোর্ট ভালো শুনে বললেন
– হা, হা, হা।
– ভাই, হাসছেন তো, আরেকটা কথা বলি। কথাটা হলো আমার গালটা আপনার গালের চেয়েও ভালো।
– মানে?
– মানে হলো, আমার গালে দাড়ি আছে, আপনার গালে নাই। দাড়ি রাখা ভালো বলেই নবীজি দাড়ি রেখেছেন এবং দাড়ি রাখার তাকিদ দিয়েছেন। সেই দাড়ি আপনার গালে নাই। দেখবেন, অনেকেই হজ্জে গিয়ে দাড়ি নিয়ে ফিরেন। কি দরকার, দাড়ি নিয়ে হজ্জে যান। দাড়ি নিয়েই হাজির হন আল্লাহ্‌র ডাকে।
– হা, হা, হা।

এরপর হজ্জ যাত্রার আগে নুরুল ইসলাম ভাই বেশ কিছু হজ্জ গমনেচ্ছু সাথী নিয়ে এলেন রক্ত চেকাপ করতে। দেখি তার গালে দাড়ি। আমি বললাম
– আলহামদুলিল্লাহ, ভাই, খুব ভালো লাগছে।
– হা, হা, হা।

ঠিক তাই হল। ২০০৬ বা ২০০৭ সনে তারা সস্ত্রীক হজ্জ করে এলেন। আমার সাথে দেখা করতে এলেন। কিন্তু এবার আর হা হা করে হাসলেন না। এরপরেও কয়েকবার এসেছেন। আর তাকে হা, হা, করে হাসতে শুনি নি। ২০০৮ সনে বদলী হয়ে চলে যাই দিনাজপুরে। আট বছর ছিলাম সেখানে। হয়ত নুরুল ইসলাম ভাই আমার চেম্বারে এসেছেন, কিন্তু আমাকে না পেয়ে চলে গেছেন। আমি এখানে এসেছি তিন বছরেও বেশী সময় ধরে। নুরুল ইসলাম ভাইকে আর আসতে দেখি নাই। সেই হা, হা, হা হাসি আর শুনি না কতদিন!

১৬/৬/২০১৯ ইং
ময়মনসিংহ -কিশোরগঞ্জ জার্নি