হক স্যার টুপি ঘুরাতেন

হক স্যার টুপি ঘুরাতেন

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

[প্রফেসর ডা. আব্দুল হক স্যার ছিলেন একজন সৎ ও আদর্শবান মানুষ। তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ছিলেন। তিনি উক্ত কলেজের প্রিন্সিপাল এবং ময়মনসিংহ বিএমএ-র প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। আমি উক্ত বিভাগে দুইবার বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছি। ভয়ে ভয়ে স্যারের চেয়ারটিতে বসেছি। স্যারকে নিয়ে আমার অল্প কিছু স্মৃতি কথা আছে। তারই কিছু ধারাবাহিকভাবে লিখে যেতে চেষ্টা করছি]

 

প্রথম দেখাতেই প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হক স্যার আমার হাত থেকে নতুন বইগুলো ছুড়ে মারাতে আমি মনক্ষুন্ন হই। নজরুল দেখে ফেলাতে আমি অপমান বোধ করি। মনে মনে ভাবী ইনি কেমন মানুষ? আমাকে তো সুন্দর করে বুঝিয়ে বলতে পারতেন। যদি এমন করে বলতেন “বাবা, তুমি তো বেস থার্ড ইয়ারে উঠেই নতুন বই কিনে ফেলেছো। খুব ভালো করেছো। তবে এই সব লাল নীল দেশী লেখকদের বই পড়ে ভালো ডাক্তার হওয়া যাবে না। তুমি বরং বিদেশী লেখকদের বই কিন। এসব বই পড়ে পাস করা যাবে না।” তা না করে তিনি আমার সাথে কিছুই না বলে বই ছুড়ে মেরে তার রুমে প্রবেশ করলেন। এই ক্ষোভ আমার ভেতরে অনেকদিন পর্যন্ত ছিলো, যতদিন না আমি স্যারের খুব কাছে আসতে পেরেছি।

 

তখন থার্ড ইয়ার থেকেই প্যাথলজি ক্লাস শুরু হতো। প্রফেসর ডাঃ আব্দুল মান্নান সিকদার স্যার অল্প বয়সের শিক্ষক ছিলেন। তিনি সুটেড-বুটেড হয়ে ক্লাসে আসতেন। তিনি তখন প্যাথলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন। প্রফেসর হক স্যার ছিলেন সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। এটা কিন্তু ১৯৮৩ সনের কথা বলছি। সিকদার স্যার সব কথা ইংরেজিতে বলতেন। আমি গ্রামের ছেলে। ইংরেজি খুব কম বুঝতাম। যদিও আমি ইন্টারমেডিটে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েছি। বইয়ের ইংলিশ মিডিয়াম বাংলা মিডিয়ামের চেয়ে সহজ ছিলো। কিন্তু ইংলিশ মিডিয়ামের লেকচার শোনা আমার জন্য কঠিন ছিলো। সিকদার স্যার গ্যালারির ভেতরে ছাত্রদের কাছে এসে পড়া ধরতেন। তাও আবার ইংরেজিতে কথোপকথন করে। আমি সবসময় ভীতসন্ত্রস্ত থাকতাম এবং স্যারের মুখের দিকে চেয়ে থাকতাম। স্যার আমার এই দুর্বলতা বুঝে ফেলে আমাকে পেয়ে বসেন। আমার এই অবস্থার কথা ক্লাসের সবাইকে বলতে থাকেন। আমি লজ্জিত হয়ে পড়ি। আমি যখন প্যাথলজির সহকারী অধ্যাপক হয়ে সেই একই গ্যালারিতে ক্লাস নিতাম মান্নান সিকদার স্যারের কথা মনে পড়তো। তাই, আমি ক্লাসে ইংরেজি বলার পাশাপাশি সরল বাংলায় ছাত্রদের বুঝিয়ে দিতাম। মান্নান স্যার ছাত্রদের মাঝে এসে পড়াতে ছাত্ররা অন্য মনস্ক হতে পারতো না। আমিও মাঝে মাঝে তাই করি। সিকদার স্যার পরের বছর বদলি হয়ে যান অন্য কোন মেডিকেল কলেজে। দীর্ঘদিন পর আমি যখন এম ফিল পড়ি তখন স্যারের দেখা পাই প্যাথলজি সোসাইটির এক সম্মেলনে। শুনলাম তিনি চট্রগ্রাম মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। তারপর থেকে স্যারের স্যাথে আমার অনেক দেখা সাক্ষাত হয়। মোবাইলে অনেক কথা বলেন। অনেক স্নেহ করেন আমাকে। তিনি আমার সাহিত্যের বইয়ের একজন ভালো রিভিউয়ার।

প্রফেসর ডাঃ আব্দুল মজিদ সিদ্দিকী স্যার ও রজব আলী স্যার আমাদের জুরিস্প্রুডেন্স পড়াতেন। ফরেনসিক মেডিসিনকে তখন জুরিস্প্রুডেন্স বলা হতো। আমি ছিলাম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ১৭তম ব্যাচের ছাত্র। তার মানে কলেজের বয়স ছিল ১৭ বছর। এমন বয়সে কলেজে শিক্ষক সংকট থাকে। মজিদ সিদ্দিকী স্যার রেডিওলজি (এক্স-রে) বিভাগের ডাক্তার হয়ে জুরিস্প্রুডেন্স লেকচার ক্লাস নিতেন। এমন সমস্যা দিনাজপুর মেডিকেল কলেজেও ছিলো। এই কলেজের বর্তমান নাম এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ। আমার মেয়ে ডা. মার্জিয়া ইসলাম দীনা এই কলেজের ১৭ ব্যাচের ছাত্রী ছিলো। তখন আমিও এই মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলাম। দীনাদের বায়োকেমিস্ট্রির প্রফেসর লেভেলের শিক্ষক না থাকাতে প্রথম দিকে আমিই অনেকগুলো বায়োকেমিস্ট্রি লেকচার ক্লাস নিয়েছি। মজিদ সিদ্দিকী স্যারের বাড়ি আমাদের পাশের উপজেলা ঘাটাইলে হওয়াতে তার কথাবার্তা আমার কাছে খুব পরিস্কার লাগতো। চিকন মানুষ, টনটনে কথা ছিলো মজিদ স্যারের। রজব আলী স্যার পরিপাটি ও দেখতে সুন্দর ছিলেন। ফরেনসিক মেডিসিনের পড়ায় বেশ কিছু লজ্জার কথা আছে। সেইগুলি বলার সময় রজব আলী স্যার স্মীত হাসতেন এবং তার গালে টোল পড়তো। এখনো স্যারের সেই টোল পরা গাল আর মোটা সুন্দর দাঁতের মিষ্টি হাঁসি আমার মনে আছে। ফিজিওলজির প্রফেসর এম এ জলিল স্যার আমাকে খুব ভালোবাসতেন। টাঙ্গাইলের মানুষ হওয়াতে তার কাছে খুব যেতাম। তিনি পড়াতেন খুব ভালো। খুব জ্ঞানী ছিলেন। কিন্তু তিনি যখন ব্লাকবোর্ডের কাছে গিয়ে কিছু লিখতেন তখন নিচু স্বরে কথা বলতেন যেগুলো আমি ফলো করতে পারতাম না। আমি যতদিন শিক্ষকতা করেছি সেই কথাটি মনে রেখেছি। তবে সব ক্লাস তারাতারি ডিজিটাল হয়ে যাওয়াতে আমাকে ব্লাকবোর্ডের দিকে ঘুরতে হয় নি। আমি ক্লাস নেই সামনে ক্যাপটপ রেখে। স্ক্রিনের দিকে তাকাই না বেশী। যেহেতু দৃষ্টি থাকে সামনের দিকে সেহেতু ছাত্ররা গন্ডগোল করতে পারে না। এনাটমির প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হাই ফকির স্যার সবসময় সুট টাই পরে থাকতেন। খুব পরিস্কার করে কথা বলতেন। শোনতে খুব ভালো লাগতো। তিনি বোর্ডে তেমন কিছু লিখতেন না। ইপিডায়াস্কোপে বইয়ের পাতা প্রজেক্ট করে স্ক্রিনে ফেলতেন। আমার কাছে স্যারের পড়ানোর স্টাইল ভালো লাগতো। এনাটমিতে হারুন স্যার নামে আরেকজন স্যার ছিলেন। তিনি কবিতা লিখতেন। পড়ানোর সময় মুখে হাসি লেগেই থাকতো। তিনি এপ্রোন পড়ে ক্লাসে আসতেন। ফার্মাকোলজির প্রফেসর ডাঃ জগদীশ চন্দ্র স্যার প্রথম দিন পরিচিতি মূলক ক্লাসে খাটি নেত্রকোনার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছিলেন মনে আছে। তিনি বলছিলেন এই কলেজটা যেইহানে অইছে সেইহানে পাট কেত আছিল। সহজ করে সুন্দর পড়াতেন। সার্জারীর প্রফেসর ডাঃ এনায়েত কবীর স্যার ক্লাসে খুব রাগারাগি করতেন। কেন করতেন তা বুঝতে পারতাম না। রাগারাগির এক পর্যায়ে পকেট থেকে ট্যাবলেট বের করে খেতেন। তারপর শান্ত হয়ে আবার পড়াতেন। বেস ভারী শরীর ছিলো স্যারের। জ্যাকেট গায়ে দিয়ে থাকতেন। দুই হাত প্রসারিত করে কথা বলতেন। একদিন সহকারীকে বললেন মাইকের মাউথ পিচটা সুতা দিয়ে গলায় ঝুলিয়ে দিতে। তারপর তিনি দুই হাত ছোড়াছুড়ি করে পড়ালেন। তিনি ছাত্রদেরকে তুই করে বলতেন। একদিন হঠাৎ তিনি ক্লাসে অনেককেই প্রশ্ন করা শুরু করলেন কে কোন কলেজ থেকে পাশ করে এসেছে। আমাকে যখন প্রশ্ন করলেন “তুই কোন কলেজ থেকে পাস করেছিছ?” আমি দাঁড়িয়ে গর্বের সাথে বললাম “আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ থেকে, স্যার?” তিনি সাথে সাথে তাচ্ছিল্যের সাথে বলে ফেললেন “বাহ, আলাউদ্দিনের মিষ্টি, অপুর্ব সৃষ্টি।” তিনিও হাসলেন, ছাত্ররাও হাসলো। কারন, কেউ তো জানতো না যে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কার দাদার নাম। সার্জারীর প্রফেসর ডাঃ আব্দুস শাকুর স্যার ছিলেন মাটির মানুষ। ধীরে ধীরে পড়াতেন। আমাকে বেশ স্নেহ করতেন। কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ডাঃ মোফাখখারুল ইসলাম স্যারকে রাগ করতে দেখিনি। তিনি ইংরেজ স্টাইলে থাকতেন। হাসি হাসি মুখ ছিল সব সময়। তিনি কিছুক্ষণ লেকচার দিয়েই বিলাতের কথা বলতেন। কথায় কথায় কমিউনিটি বেইজড মেডিকেল এডুকেশন, আলমা আটা, জেনেভা ডিক্লারেশন শব্দগুলো উচ্চারণ করতেন। শুনতে ভালোই লাগতো। মেডিসিনের অধ্যাপক শামসুল ইসলাম স্যার ছিলেন একটু ভার বুদ্ধিসম্পন্ন। তিনি ক্লাসে এসে কিছুক্ষণ সিগারেট টেনে শক্তি সঞ্চয় করে কেশে পড়ানো শুরু করতেন। তখন সিগারেট খাওয়াটা এখনকার মতো অতো দোষের ছিলো না। তিনি ক্লাসে পড়া ধরতেন না। তিনি সাধারণত সাদা হাফ শার্ট পরতেন। কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের সাদেক স্যার ছিলেন খুবই মাটির মানুষ। খুব বিনয়ের সাথে পড়াতেন। হাটার সময় তিনি এদিক সেদিক তাকাতেন না। চুক্ষু বিভাগের প্রফেসর মুক্তাদির স্যার ছাত্রদের সাথে বেশ মিশুক ছিলেন। তিনি দেখতে সুন্দর ছিলেন। সাফারি পরতেন সাধারণত। বিভাগীয় প্রধান ছিলেন প্রফেসর ডাঃ শামসুদ্দিন স্যার। তিনি জোক করে পরাতেন। একবার ক্লাসে আমি একটু অন্যমনস্ক ছিলাম। হঠাৎ তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন “এই, তিন মাসের বাচ্চার ভিটামিন কম পড়লে কি করবে।” আমি বলে দিলাম “সবুজ শাক সবজি খেতে দেব।” স্যার মুখের এক অদ্ভুত ভঙ্গি করে বললেন “হ্যা, তিন মাসের বাচ্চা ত শাক খেতে পারবেনা। নাকইর দিয়া ঠেলে ঠেলে পাছা দিয়ে শাক ঠুকাতে হবে।” আমি ত লজ্জা পেয়ে ঝিম মেরে গেলাম। স্যারের সামনে ত হাসা যায় না। বন্ধুদের কারো কারো শরীর ঝাকুনি দিতে দেখলাম চিপা হাসিতে। শামসুদ্দিন স্যার কোট-টাই পরতেন। হাটতেন দৈত্যে মতো। প্রফেসর ডাঃ জোবায়েদ হোসেন স্যার ছিলেন খুব জাদরেল এক শিক্ষক। সবাই তাকে ভয় পেতো। তিনি গাইনি বিভাগের প্রধান ছিলেন। প্রথম দিকে আর্মি অফিসার ছিলেন। হাটতেনও আর্মি স্টাইলে। লম্বা ছিলো স্যারের শরীর। টাই পরতেন। সার্জারীর প্রফেসর গাফফার তালুকদার স্যার বাংলা উচ্চারণ করতেন বিলাত প্রবাসী মানুষের মতো। তিনি শার্টের উপর জ্যাকেট পরতেন। সার্জারির আরেকজন শিক্ষক ছিলেন প্রফেসর ডাঃ সেলিম ভুইয়া স্যার। খুব নরম মানুষ ছিলেন। স্যারের আন্ডারে আমি ৬ মাস সার্জারিতে বিশেষ ট্রেইনিং নিয়েছিলাম। তিনি কথায় কথায় ইংল্যান্ডের ব্যবস্থার কথা বলতেন। আমি আমার কয়েকজন শিক্ষকের কথা এখানে উল্লেখ করলাম যারা আমাদের লেকচার ক্লাস নিতেন। আরও অনেক শিক্ষক ছিলেন, তারাও লেকচার ক্লাস নিতেন। সবার কথা লেখলে আপনি অধৈর্য্য হতে পারেন। হক স্যারকে নিয়ে লেখতে গিয়ে কয়েকজন শিক্ষকের নাম এসে গেলো। আমাদের সব শিক্ষকই অত্যধিক বিজ্ঞ ছিলেন। সবাই ভালো পড়িয়েছেন। একেকজন শিক্ষক একেক ভাবে স্মৃতিতে রয়ে গেছেন। আজ লিখবো হক স্যারকে নিয়ে। তার আগে একটু প্রফেসর আবু আহমেদ স্যারকে নিয়ে বলে নেই। স্যার ছিলেন প্যাথলজি বিভাগের সেকেন্ড স্যার। পড়াতেন মাইক্রোবায়োলজি। স্যারের লেখচার আমার খুব পছন্দ হতো। গল্প করে করে মজা করে পড়াতেন। যেদিন তিনি ফিতাকৃমি পড়ালেন সেদিন ক্লাস শুরুতেই একটি গল্প শুনালেন।

বললেন, একবার এক রাজকন্যার পেট থেকে ১৮ ফুট লম্বা একটা মাছ বের হলো পায়খানার সাথে। আমি শুনে তাজ্জব বনে নড়েচড়ে বসলাম। শোনার জন্য ব্যাকুল হলাম। আসলে এই গল্প থেকে স্যার চলে গেলেন ফিতা কৃমি পড়াতে। পদ্ধতিটা আমার খুব ভালো লেগেছিল। স্যার পড়ানোর সময় একটা কিছু বলে সামান্য হা করে জিহবার আগা নাড়াতেন এবং গাল ও ঠোঁটে হাসির ঢেউ খেলে যেতো। খুব ভালো লাগতো। থেমে থেমে পড়াতে বুঝতেও সুবিধা হতো। স্যারের দেখাদেখি আমিও ক্লাসে প্রসংগের সাথে মিল রেখে ছোট একটি গল্প বা ঘটনা শুনিয়ে দেই। ছাত্ররা যাতে গল্পটা মনে রাখতে গিয়ে পড়াটাও মনে রাখে এটাই আমার উদ্দেশ্য। একবার লন্ডন থেকে এক মেয়ে আমাকে মোবাইল করলো। সালাম দিয়ে কেমন আছি তা জানতে চাইল। কুশল বিনিময়ের পর জানতে চাইলাম

– কী মনে করে ফোন করেছ।

– স্যার, গভীর রাত এখানে। ঘুম আসছিলো না। দেশের কথা মনে হলো। শেষে আপনার ক্লাসের কথা মনে পড়লো। আপনি একদিন ভুত দেখেছিলেন। সেই কথা মনে হবার পর আপনাকে ফোন করেছি।

– আমার ভুতের গল্প ত মনে আছে। কেনো বলেছিলাম তা কি মনে আছে?

– জি স্যার, ট্রমাটিক ফ্যাট নেক্রোসিস হলে ফ্যাট সেল মরে গিয়ে তার শুধু আবসা আবসা আউট লাইন দেখা যায়। মানে মৃত কোসের ছায়ার মতো দেখা যায়, যেটাকে বলা হয় ঘোস্ট সেল। আপনার গল্পগুলো মনে হলে প্যাথলজির পড়াও মনে এসে যায়।

ভুতের গল্প প্রায় সবাই ভালোবাসে। সেদিন ফেইসবুকে একটা পড়েছি এমন। গোরস্থানে পাসের বাড়িতে সাধারণত কেউ থাকিতে চায় না। এমন একটি বাড়ি ছিলো গোরস্থানের পাশে। আসেপাশে আর বাড়ি ছিলো না। সস্তা পেয়ে এই বিল্ডিংয়ের দোতলা ভাড়া নিলেন এক শিক্ষিত ভদ্রলোক। এক রাতে এক একা ভালো লাগছিলো না তার। সিদ্ধান্ত নিলেন তৃতীয় তলার ভদ্রলোকের সাথে কিছুক্ষণ আলাপ করে আসা যাক। তাই, টিপ টিপ করে সিড়ি বেয়ে তৃতীয় তলায় উঠে বেল টিপ দিলেন। শীর্ণকায় লম্বা এক ভদ্রলোক দরজা খুলে দিয়ে বসতে দিলেন। কিছুক্ষণ কথা বলার পর লক্ষ্য কিরলেন ভদ্রলোকের হাতের আঙুলগুলো অত্যধিক লম্বা এবং গলাও বেশ লম্বা। তাকে ভুত বলে সন্দেহ হলো। জিজ্ঞেস করলেন “আচ্ছা ভাই, আপনি কি ভুত আছে বলে বিশ্বাস করেন?” উপর তলার সেই লোকটি জবাব দিলেন “মরার আগে বিশ্বাস করতাম না। এখন করি।” শুনে নিচ তলার লোকটির ভয়ে শরীম হীম হয়ে এলো। তারাতাড়ি কথা সেরে চলে এলেন।

 

আমি ক্লাসে গল্পের সাথে পড়া মিলিয়ে ছাত্রদেরকে শেখাতে চেষ্টা করি। ফলো করেছিলাম আবু আহমেদ স্যারকে।

আপনি বিরক্ত হচ্ছেন, হক স্যারের কথা লিখতে গিয়ে এসব কী লিখছি। আসছি এখন হক স্যারের কথায়। আজ হয়তো হক স্যারের কথা আপনার কাছে ভালো লাগবে না। আসলে হক স্যারের আমি প্রথম দিকে শুধু বাইরেরটাই দেখছিলাম। তাই প্রথম দিকে তিনি আমার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কেউ ছিলেন না। অনেক বছর পর যখন আমি হক স্যারের ভেতরের জিনিস আবিস্কার করলাম তখন থেকে আমি জানি স্যার একজন অসাধারণ মানুষ। সেই সময় টুপিওয়ালা স্যার মাত্র দু’জনই ছিলেন। দু’জন আবার দূরকম। একজন হলেন ফিজিওলজির দাদু স্যার আরেকজন হলেন প্যাথলজির হক স্যার।দাদু স্যারের নাম খুব সম্ভব ডাঃ আমিনুল ইসলাম ছিলো। দাদু স্যারের গালে লম্বা সাদা চাপ দাড়ি ছিলো। লম্বা জুব্বা পরতেন। বয়স্ক দাদাদের মতো করে কথা বলতেন। তাই, ছাত্ররা দাদু স্যার বলত। দাদু স্যার বলতে বলতে স্যারের আসল নামটি ভুলে গেছি হয়তো । হক স্যার টুপি মাথায় দিতেন, কিন্তু শার্ট পরতেন। হক স্যারের টুপির ধরনটি অনেকটা ডাঃ জাকির নায়েকের টুপির মতো গোল। স্যার মাথার চুল সবসময় চেঁছে রাখতেন। তাতে মাথার সাথে টুপি লেপটিয়ে থাকতো। চুল না থাকায় টুপিটি সহজেই মাথার উপর ঘুরানো যেতো। আমি যতদিন ছাত্র ছিলাম ততদিন স্যারের দাড়ি ছিলো না। দাড়ি রেখেছেন পরে। স্যারের চোখের উপর ভ্রু কম ছিলো। স্যার একটি বিশেষ ধরনের শার্ট গায় দিতেন। সাভাবিকের চেয়ে একটু লম্বা শার্ট। শার্টের কলারও ছিলো সাভাবিকের চেয়ে বেশ লম্বা। শার্টের রঙ ছিলো সাদাটে। আমরা অফ হোয়াইট বলতে পারি। মোটা কাপড়ের শার্ট ছিলো। ছেড়ার কথা না সহজে। আমি এক যুগ ধরে একই অথবা একই রকম শার্ট দেখেছি। একই রকম শার্ট কয়েকটি ছিলো কি না আমি জানি না। আমার কাছে মনে হতো একই। পাজামা, না ফুল প্যান্ট পরতেন তা বুঝা যেতোনা। মোটা অফ হোয়াইট কাপরের এক ধরনের ফুল প্যান্ট পরতেন শার্টের নিচ দিয়ে টাকনুর উপর পর্যন্ত। ফিতাবিহীন শু পরতেন পায়। হাটতেন সামনের ৪-৫ ফুট মাটির দিকে তাকিয়ে । স্যারকে প্রাইভেট কারে চড়তে দেখিনি। স্যারের স্ত্রী ডাঃ বীণা হক ম্যাডাম ছিলেন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ। তাকে আমি সবসময় প্রাইভেট কারে চলাফেরা করতে দেখেছি। স্যারকে রিক্সায় উঠতেও দেখিনি। চরপাড়ায় রাস্তা দিয়ে দু’হাতে ভারী ভারী বাজারের ব্যাগ নিয়ে বাসার দিকে হেটে যেতে দেখেছি। আমি একদিন একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম হক স্যার নিজের জন্য গাড়ি কেনেন না কেনো। উত্তরে জানতে পেলাম তিনি গাড়িতে চলা পছন্দ করেন না। আমেরিকা প্রবাসী তার বুয়েট থেকে পাস করা ইঞ্জিনিয়ার ছেলে দেশে এসে স্যারের জন্য একটি কার কিনে দিয়ে যান। স্যার সেটা ব্যবহার না করে জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসায় দান করে দেন। জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার মাঠে একটি টীন সেডে প্রাইভেট কার দেখেছি। খুব সম্ভব ওটাই হবে।

 

দোতলায় প্যাথলজি ডিপার্টমেন্ট। সিড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে এসে ক্লাসের মঞ্চে এসে নিঃশ্বাস ছাড়তেন। খুব সিরিয়াস হয়ে পড়ানো শুরু করতেন। যা বলতেন সবই যেনো গুরুত্বপূর্ণ। মানে প্যাথলজির কোন কিছুই বাদ দেয়া যাবে না। সবাই নিরব হয়ে স্যারের লেকচার শুনতাম। স্যারের টেবিলের সামনে বিদেশি বিরাট টেক্সট বই খোলা রাখতেন। কিছুক্ষণ পর পর বইয়ের দিকে চোখ দিতেন। ডান হাতে চক আর বাম হাতে ডাস্টার ধরা থাকতো। কথা বলার সময় ডান হাত ঘুরাতেন। চট করে ব্লাকবোর্ডে গিয়ে কিছু লিখতেন। মাঝে মাঝে প্রশ্ন করতেন কাউকে নির্দিষ্ট না করে। কেউ উত্তর দিয়ে দিলে গুড বলে আবার শুরু করতেন। কেউ উত্তর না দিলে বলতেন “এই লিসান জামিল কই? লিসান বলো।” অথবা “দীপক কুমার ধর বলো।” দীপক আমাদের মধ্যে সবসময় ফার্স্ট হতো । লিসান জামিল সেকেন্ড হয়েছিল। তারপরই ছিল মিজানুর রহমান স্বপন। শেষের দিকে স্বপন সেকেন্ড হতো। আমি ওদের মতো না হলেও ৮ম, ৯ম অথবা ১০ম অবস্থানেই সাধারণত থাকতাম। বেশী ভালো ভালো না। সেই ভালো ছাত্ররা মাতৃভূমি ছেড়ে চলে গেছেন সুখের দেশে। এদেশ তাদের চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। হক স্যারও বিদেশে গিয়েছিলেন উচ্চ শিক্ষা অর্জন করতে। ফিরে এসে দেশের সেবাই করেছেন। কিন্তু স্যার তার ইঞ্জিনিয়ার ছেলেকে দেশে রাখতে পারেননি। যাহোক, যখন স্যার যা পড়াতেন তাকেই বলতেন ভেরি ভেরি ইমপোর্টেন্ট। তিন বার করে বলতেন ভেরি ভেরি ইমপোর্টেন্ট। বলার সময় প্রত্যেকবার মাথার টুপি ঘুরাতেন। আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে তিনি লোবার নিউমোনিয়া চারটি স্টেজ বলার সময় চার বার টুপি ঘুরিয়েছিলেন। বলছিলেন, লোবার নিউমোনিয়ার চারটি স্টেজ আছে – স্টেজ অব কঞ্জেশন, স্টেজ অব রেড হেপাটাইজেশন, স্টেজ অব গ্রে হেপাটসিজেশন অ্যান্ড স্টেজ অব রেজুলুশন। হক স্যার বাংলা ও ইংরেজি সংমিশ্রণ করে পড়াতেন। তাই ভালো বুঝতে পারতাম। আমি স্যারের এই বৈশিষ্ট্যটা অনুসরণ করে ক্লাস নেই। আমি আরেকটা ব্যাপারে স্যারকে অনুসরণ করি। সেটা হলো আমি ঠিক সময়ে ক্লাসে উপস্থিত হই। স্যার কোনদিন ক্লাসে অনুপস্থিত থাকতেন না। আমিও কোনদিন ক্লাসে অনপস্থিত থাকি না, একান্ত জরুরি অবস্থা ব্যাতিরেকে। ছাত্রাবস্থায় স্যারের ভেতরের মহত্ব আবিস্কার করার মত জ্ঞান আমার ছিলো না। ছাত্রাবস্থায় স্যার আমার সাথে কয়কবার দুরব্যাবহার করেছিলেন বলে মন থেকে স্যারকে কম পছন্দ করতাম। পছন্দ করা শুরু করলাম সেদিন থেকে যেদিন থেকে স্যারের ভেতরের জিনিসটা আবিস্কার করতে পারলাম। সে কথা পরে লিখবো।

১৬/১২/২০২০

ময়মনসিংহ
Rate on this writing:

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)

Loading...
Online book shop of Dr. Sadequel Islam Talukder
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/