হোটেলে গিয়ে মাগনা খাওয়া

হোটেলে গিয়ে মাগনা খাওয়া

(হাস্তর)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

 

শহরে বেড়াতে গেলেও রহিম বকস ও করিম বকস একসাথেই যেতেন। শহরে মূলত তাদের কোন কাজ ছিলো না। আসল উদ্দেশ্য ছিলো হলে বসে সিনেমা দেখা। যখন যে সিনেমা মুক্তি পেতো সেই সিনেমেই তারা দেখে নিতেন। গ্রামের মানুষ তখন সিনেমাকে টগি বলতো। সম্ভবত টকিজ থেকে টগি হয়েছে। টাঙ্গাইলের গ্যাঘের দালানের সাথে এখনকার নিরালা মোড়ের সিনেমা হলের নামটিও কিন্তু “দি রওশন টকিজ।” প্রথম দিকে সিনেমায় চলমান চিত্র দেখা যেতো কিন্তু কথা শুনা যেতো না। এগুলোকে নির্বাক চলচ্চিত্র বলা হতো। একসময় চলচ্চিত্রের সাথে কথা যোগ করার প্রযুক্তি আবিস্কার হয়। কথার ইংরেজি হলো টক। এই টক থেকেই সম্ভবত টকিজ হয়েছে। সিনেমা হলে বসার কয়েকটি ক্লাস ছিলো। সবার সামনে অর্থাৎ রুপালি পর্দার কাছাকাছি সিটগুলোকে বলা হতো ফ্রন্ট স্টল। এগুলোর টিকেটের মূল্য ছিলো মাত্র ৮ আনা। ১৬ আনায় ১ টাকা হতো। ৬ পয়সায় হতো ১ আনা। একটা কয়েনের মাঝখানে গোল ছিদ্র ছিলো, সম্ভব ওটা ২ পয়সার কয়েন ছিলো। ওটাকে বলা হতো ছেন্দা পয়সা। এখনো ঐ পয়সার নাম বলে অনেকে খোটা দেয় এভাবে “একটা ছেন্দা পয়সাও দিলোনা কৃপ্টায়।” ফ্রন্ট স্টলের পেছনের সিটগুলোর নাম ছিলো মিডল স্টল। এগুলোর টিকিটের মূল্য ছিল ১ টাকা। সবার পেছনের সিটগুলোর নাম ছিলো রিয়ার স্টল, মূল্য ছিলো দেড়টাকা। দোতলায় পেছনের দিকে কিছু সিট ছিলো। এগুলোর নাম ছিলো বেলকনি। বেলকনির সিটের মূল্য ছিলো ২ টাকা। দোতলায় বক্সের ভেতর দু’একটা চেয়ার ছিলো, বলা হতো বক্সের সিট। প্রতি বক্সে দু’টি সিট থাকতো। দুই সিটের বক্সের মূল্য ছিলো ৬ টাকা। নব দম্পতিরা নিরিবিলি বসে সিনেমা দেখার জন্য বক্সে টিকিট করতো। সিটের মূল্য যতো বেশী হতো সিনেমা দেখেও তত আরাম লাগতো। গ্রামের অল্প জানা লোকগুলো দু’টা কারনে ফ্রন্ট স্টলে টিকেট কিনতেন। প্রথমত, গরীব হওয়ার দরুন। দ্বিতীয়ত, তারা মনে করতেন সব কিছুর সামনে থাকা ভালো। রহিম ও করিম বকসরা ফ্রন্ট স্টলে টিকিট করতেন কারপণ্যতার কারনে। টিকিট কিনতে হতো ওয়ালের মধ্যের একটা ছিদ্র দিয়ে হাত ঢুকিয়ে। লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট নিতে হতো। টিকিটের গায়ে সরকারি সীল থাকতো। কারণ, সরকার সিনেমা দেখাকে প্রমোদ মনে করতো। তাই দর্শানার্থীদের টিকিটের সাথে প্রমোদ কর কেটে নিতো। লেখা থাকতো “প্রমোদ কর এত পয়সা।” এই টিকিট হিসাব করে শুল্ক বিভাগের লোকেরা কর আদায় করতেন। হলের ম্যানেজাররাও কম চালাক ছিলেন না। তারা কর ফাঁকি দেয়ার জন্য কিছু টিকিট সীল ছাড়া বিক্রি করতেন দালালদের মাধ্যমে। এগুলোকে ব্লাকের টিকিট বলা হতো। গ্রামের কেউ কেউ বলতেন ব্যালাকের টিকিট। রহিম বকসরা বেশী সময় ব্লাকের টিকিট কিনতেন। যারা ঘন ঘন সিনেমা দেখতো তাদেরকে ব্লাকাররা চিনে ফেলতো। এসব দর্শকরাও ব্লাকারদেরকে চিনে ফেলতো। কাজটা করা হতো গোপনে। ব্লাকারদের সাথে রহিম বকসদের বেশ খাতির ছিলো।

 

টাঙ্গাইল গেলে সাধারণত তারা বড় রেস্টুরেন্টে খেতেন না। তারা খেতেন ছয় আনি বাজারের খোলা খাবারের দোকানে। দোকানীরা ত্রিপাল টানিয়ে ভাত-সালুন বিক্রি করতেন। সেই খাবারে ভন ভন করে মাছি বসতো। সের দরে ভাত বিক্রি হতো। মোটা সেদ্ধ ঢেকিছাঁটা চালের ভাত। টিনের প্লেটে ভাত বেড়ে দাড়িপাল্লা দিয়ে ওজন করে ভাত বিক্রি হতো। এক প্লেট ভাতের ওজন হতো প্রায় আধা সের। এক সের প্রায় এক কেজির সমান ছিল। হোটেলের খাবারের খরচের চেয়ে ছয় আনি বাজারের খাবারের খরচ চার ভাগের এক ভাগ ছিলো। তাই, রহিম বকসরা ছয় আনি বাজারে গিয়ে টুলে বসে খেতেন।

 

শক্ত বেরাম থেকে সেরে ওঠার পর রহিম বকসের ইচ্ছা হলো একবার টাঙ্গাইল থেকে ঘুরে আসা যাক। শুনলেন যে “বনবাসী রুপবান” সিনেমা চলছে টাঙ্গাইল হলে। রূপ বানের যাত্রা তারা বহুবার দেখেছেন গ্রামের যাত্রা পালায়। সেখানে রুপবানের অভিনয় করেছে পুরুষ মানুষ। সিনেমায় মেয়ের অভিনয় মেয়েরাই করে। রুপবান সিনেমাটা দেখতে হবে হলে গিয়ে। রহিম বকস করিম বকসকে প্রস্তাব দিলেন

– করিম, অনেকদিন হলো টগি দেখিনা। অসুখ থেকে সেরে ওঠে বারবার টাঙ্গাইল যেতে ইচ্ছে করছে।

– তুমি তো জানোই কাতিমাস চলছে। হাতে টাকা পয়সা নাই।

– তোমার হাতে আবার কবে টাকা পয়সা থাকে? তুমি অসুখের সময় আমাকে দেখতে গেছিলা খালি হাতে। নিজে তো কিছু নিয়ে যাওনি, উল্টো আরো আমার পথ্যগুলো খেয়ে এসেছিলে।

– তুমি শুধু খোটা দিতে জানো। আমার খাওয়াটাকেই বড় করে দেখলে। আমি তোমার সাথে সময় দিয়ে যে উপকার করেছি তা অন্য কেউ করেছে?

– যাউকগা, টাকা পয়সা যা লাগে এবার আমি খরচ করবো। তুমি শুধু আমার লগে যাবে।

– ঠিক আছে। আগামী রবিবারে আমরা যাবো। তুমি কিন্তু কৃপ্টেমি করতে পারবা না। ভালো রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে হবে। ছয় আনি বাজারে খাবো না। বক্সে বসে টগি দেখাতে হবে।

– তাই হবে। আগামী রবিবারে।

 

রবিবার দূ’জনই প্রস্তুতি নিলেন টাঙ্গাইল যাত্রার উদ্দেশ্যে। রহিম বকস মাথায় খাস তেল দেয়ার জন্য বোতল হাতে নিয়ে দেখেন বোতলের খোলা মুখ দিয়ে একটা তেলাপোকা প্রবেশ করতে নিয়ে আটকে পড়ে আছে। বোতলের মুখ খোলা পেলেই তেলাপোকারা বোতলে ঢুকে পড়ে তেল খাওয়ার জন্য। এজন্য গ্রামের মানুষ এদেরকে তেলচোরাও বলে থাকে। রহিম বকস তেলচোরাটাকে ধরে মাথার উপর পাড়া দিয়ে মেরে ফেললেন। তারপর একটা সাদা কাগজে রেখে ভাঁজ করে পাঞ্জাবির বাম পকেটে নিলেন। একটা মোছকাটার ক্যাঁচি দিয়ে পাঞ্জাবির ডান পকেটের নিচের দিকে কেটে ছিদ্র করে দিলেন। টাকা নিলেন বুক পকেটের ভেতরের চোরা পকেটে। আমুদপুর পর্যন্ত হেটে গিয়ে টাঙ্গাইলের কাঠ বডি বাস ধরলেন। টাঙ্গাইল পৌঁছে সকাল ১০ টার মেটিনি শোর বক্সের ৬ টাকার টিকিট কিনলেন ব্লাকে ৪ টাকা দিয়ে। দু’জনে আরাম করে চেয়ারে বসে “বনবাসী রুপবান” সিনেমা উপভোগ করলেন। হল ভাংলো ১ টার পর। লাগলো ক্ষুধা। এবার রহিম বকস কথা দিয়েছেন ছয় আনি বাজারে খাবেন না। সেই মতো ভিক্টোরিয়া রোডের আপ্যায়ন হোটেলে গিয়ে বসলেন। ভাতের সাথে অর্ডার করলেন সরষে ইলিশ। এক প্লেট করে ভাত খেয়ে আরও এক প্লেট করে অর্ডার করলেন। দ্বিতীয় প্লেটের খাবারের অর্ধেকেরও বেশী খাওয়া হয়ে গেলে রহিম বকস পাঞ্জাবির পকেটের কাগজে মোড়ানো মরা তেলাপোকাটা ছেড়ে দিলেন ভাতের প্লেটে। তারপর ওয়েটারকে ডেকে গালাগালি করতে লাগলেন ভাতের মধ্যে তেলাপোকা ছিলো, সেই তেলাপোকা মেশানো ভাত সবাইকে খাইয়েছে। এর শক্ত বিচার হবে। হই চই শুনে লোকজন জড়ো হয়ে পড়লো। ম্যানেজার এসে মাফ চাইলে তারা ঝগড়া ক্ষান্ত দিয়ে বের হয়ে এলেন বিল পরিষোধ না করেই। ম্যানেজার বিল চাইবার সাহস পেলেন না। ডেস্কের পেছনে ম্যানেজারের একটা সুন্দর ছাতা ঝুলানো ছিলো। করিম বকস সেই ছাতাটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিলেন এই বলে “ছাতাটা নিয়ে যাই।” ম্যানেজার বললেন “ছাতাটা আমার।” করিম বকস চোখ রাংগিয়ে বললেন “আচ্ছা, বাটপার দেখছি। পঁচা খাবার খাইছে। আবার বাটপারি করে আমার ছাতাটাও রাইখা দিতে চায়? সবগুলারে পুলিশে দেবো।” বলে ছাতা নিয়ে বের হয়ে সোজা চলে গেনেন বাস স্ট্যাণ্ডে। ময়মনসিংহ গামী কাঠবডি বাসে উঠলেন। এলেঙ্গা পর্যন্ত চলে এসে বাসের কনডাক্টার ভাড়া চাইলে রহিম বকস ডান পকেটে হাত দিয়ে বলে উঠলেন “হায়, হায়, পকেট মাইর হইছে।” শুরু হয়ে গেলো হই ছই। বাসের লোকদেরকে বললেন “আপনারা খুব খারাপ, আমার পকেট কাটলো আপনাদের বাসের গেইটে। গেইটে গেঞ্জামের সময় আমার ডান পকেটের টাকা পকেট কেটে নিয়ে গেছে। এই দেখেন পকেট কাটা।” ককন্ডাক্টর বললেন “ভাড়া আপনার দিতে হবে। পকেট কাটা বুঝি না। হুস করে বাসে ওঠতে পারেন না?” রহিম বকস বললেন “এই বাটপার, তোদের লোকেরাই আমার পকেট কেটেছে। আমার টাকা ফেরত দিবি। না হলে সবগুলারে আমুদপুর নামিয়ে মজা দেখাবো। আবার ভাড়া চাস?” অন্য যাত্রিরা ঝগড়া থামিয়ে দিলে রহিম বকসরা আমুদপুর নেমে পড়ে বাড়ির দিকে হাটা দিলেন। করিম বকস রহিম বকসকে উদ্দেশ্য করে বললেন “দোস্তো, খুব তো বাটপারি করলা আমার সাথে। যাওয়ার সময় বাস ভাড়া দিলা আট আনা আট আনা এক টাকা, সিনেমা দেখাইলা চার টাকায়, খাওয়াইলা মাগনা, ফেরার সময় বাস ভাড়াও ফ্রি। ফুটানি তো ভালাই দেখাইলা। এই জন্যই কি তেল চোরা পকেটে করে এনেছিলে? এই জন্যই কি ডান পকেট কেটে এনেছিলে?”

২৯/১১/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

শব্দার্থঃ

মাগনা = বিনামূল্যে

ছেন্দা = ছিদ্র

সালন = কারি

বেরাম = রোগ

কাতিমাস = কার্তিক মাস

লগে= সাথে

খাস তেল = সরিষার তেল

ফুটানি = ফোর টুয়েন্টি