জানালা দিয়ে দেখলাম

জানালা দিয়ে দেখলাম
(নিজের চোখে দেখা)
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
আমি ১৯৯৩ জুলাই থেকে ১৯৯৫ জুলাই, এই দুই বছর পিজির “এ” ব্লকের হোস্টেলের চতুর্থ তলার উত্তর পাশের এক রুমে থাকতাম। উত্তর পাশের জানালা দিয়ে বটতলা চত্ত্বর, এ ও বি ব্লকের মাঝের খালি মাঠ ও বি ব্লকের বারান্দা দেখা যেতো। আমরা যেটাকে পিজি বলতাম সেটার পূর্ণ নাম ছিল ইন্সটিটিউট অব পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিসিন এন্ড রিসার্চ, সংক্ষেপে আইপিজিএমআর। তখন অন্যান্য ইন্সটিটিউটের মতো এটাও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ছিলো। তাই, এর কিছুটা দৈন্যদশা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়ে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এর দৈন্যদশা দুর হয়। এখন এর নাম হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সংক্ষেপে বিএসএমএমইউ।
অফিস টাইমে বটতলা চত্ত্বর জমজমাট থাকতো। পোস্ট গ্রাজুয়েট ছাত্ররা বসে বসে ঝালমুড়ি, ছোলা বুট ও বাদাম খেতো। জানালা দিয়ে দেখা যেতো। আমার হোস্টেল বিল্ডিং এর সেপ্টি টেংকি একটা ঢাকনা ছিলো না। আগের দিনে এটা একটা কমন দৃশ্য ছিল। এই ঢাকনাগুলো নেশা খোররা তুলে বিক্রি করে নেশা করতো। হাসপাতালের আউটডোর টয়লেটের মেটালিক টেপ একটাও থাকতো না। নেশাখোররা নিয়ে বিক্রি করে নেশা করতো। ঐ ম্যানহোলের ঢাকনা দিয়ে পায়খানার দুর্ঘন্ধ বের হতো। সেইখানে এসে বসতো স্কুল ড্রেস পড়ুয়া দুইজন ছেলে মেয়ে। সকাল দশটা থেকে বিকেল চারটা /পাচটা পর্যন্ত কি আলাপই যে তারা করতো! তাদের নাক দিয়ে পায়খানার দুর্ঘন্ধ প্রবেশ করলেও তারা কাবু হতো না। এমন নেশায় কাটতো তাদের সময়। নিজ চোখে তাদের এমন ধৈর্য দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। দুজন যুবক আসতো বিকেল তিনটার পর। তাদের দেখে সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান বলে মনে হতো। তাদের পরনে কাবুলি কুর্তা থাকতো। বি ব্লকের কার্যক্রম বিকেল তিনটার পর শেষ হয়ে যেতো। এসময় বারান্দায় কেউ থাকতো না। এখন যেখানে কেন্টিন হয়েছে। সেই বারান্দায় আসন বিড়ায়ে বসতো যুবক দু’জন। পকেট থেকে কি যেনো বের করে বাম হাতের তালুতে নিয়ে বুইড়া আঙ্গুল দিয়ে তামাক ডলার মতো করে ডলতো। কাগজের মধ্যে আগুন ধরিয়ে নাক দিয়ে ধুয়া নিতো। কোন কোন সময় কাগজ মুড়িয়ে বিড়ি বানিয়ে টানতো। তারা প্রতিদিন এই বিকেল বেলায় এই কাজ করতো। এটাকে আমার কাছে রহস্যময় মনে হতো। আমার কাছে মনে হলো এরা নেশা করছে। রহস্যটা বুঝার জন্য আমাদের পিজিতে পড়ুয়া এক ডাইলখোর ডাক্তারের কাছে জিজ্ঞেস করলাম ওরা কি করে? ডাইলখোর বললেন যে ওরা হিরোইন সেবন করে। যারা ফেসসিডিলে আসক্ত ছিলো তাদেরকে ডাইলখোর বলা হতো। ফেন্সিডিলে নাকি হালকা নেশা হয়। তাই, ফেন্সিফিডিলের নেশাখোররাও পড়াশোনা করতে পারতেন। এভাবে আমি ঐ দুই যুবককে অনেকদিন হিরোইন খেতে দেখেছি। কাউকে কিছু বলিনি। শুধু আমার পোস্ট গ্রাজুয়েট এম ফিল (প্যাথলজি) পড়া পড়েছি।
বি ব্লকের পশ্চিম গেটের রাস্তার পাশে ছোট একটা পাটি বিছিয়ে এক ফকির বসে ফকিরান্তি করতেন। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা হতাশাগ্রস্ত রোগীরা এই ফকিরের কাছে এসে বসতো। ফকির পানি পড়া নিতেন। তাবিজ দিতেন। রাতে তিনি বি ব্লকের বারান্দায় পাটি বিছিয়ে ঘুমাতেন। হাসপাতালের টয়লেট ব্যবহার করতেন। সকালে টয়লেটে গোসল করে বারান্দায় পাটিতে বসে সারা শরীরে তেল মাখতেন। লুঙ্গি পরে খালি গায়ে থাকতেন। সাথে একটা সাপের পতো লাঠি থাকতো। কাপড়ের একটা ঝোলাও ছিলো কাবুলিওয়ালার মতো। মাথায় বাবরি চুল ছিলো। তার শরীর পরিস্কার ছিল। তেল মেখে তেলে তেলে থাকতেন। মাড়িতে দাঁত ছিলো না, কিন্তু তিনি তত বৃদ্ধও ছিলেন না। হাসপাতালের একটা আয়াকে প্রায় প্রতিদিন তার কাছে বসে অনেকক্ষণ গল্প করতে দেখেছি নিজ চোখে জানালা দিয়ে। মেয়েটার দুই আড়াই বছরের এক বাচ্চাও ছিলো। বাচ্চাটাকে ফকিরের পিঠ ঘেঁষে খেলা করতেও দেখেছি।
একদিন আমার কৌতুহল জাগলো ফকিরের সাথে কথা বলতে। ক্লাস থেকে ফেরার সময় লোকটার কাছে গিয়ে জিগালাম
– আপনার বাড়ি কোথায়?
– জি, আমি এই হানেই থাহি।
– তা বুঝলাম। আপনার জন্ম স্থান কোথায়?
– জি, আমার বাড়ি যশোর জেলায়।
যশোর না অন্য জেলায় আমি এখন মনে করতে পারছি না।
– আপনি এখানে থাকেন কেনো?
– আমিতো ফকির, বাবা!
– আপনার ছেলে মেয়ে নাই?
– আছে। ছেলেও আছে মেয়েও আছে আল্লাহর মাল।
– বাড়ি ঘর নাই?
– বাড়ি আছে।
– তয় এখানে পড়ে থাকেন কেনো?
– আমিতো ফকির !
– আপনার ছেলেরা কিছু করেন না?
– আমার দুই ছেলেই মাশাল্লাহ চাকরি করে। একছেলে আর্মিতে চাকরি করে। আরেক ছেলে মীলে চাকরি করে। ভালাই বেতন পায়।
– তারপরও আপনি এভাবে বারান্দায় ঘুমান। আর সারাদিন মাঠে পাটি বিছিয়ে বসে থাকেন।
– বাবা, আমিতো ফকির !
তিনি দাঁতের মুথুল্লা বের করে চোখটাকে এমন ভাব করে ‘আমিতো ফকির ‘ কথাটা বলেন যে ওটা আপনাকে বলে আমি বুঝাতে পারবো না।
– আপনার এখানে একটা মেয়ে একটা বাচ্চাসহ আসে। ওটা কে হয় আপনার?
– ও এখানকার হাসপাতালের আয়া। ঐ মেয়েটার দুনিয়ায় কেউ নাই। আয়ার কাম কইরা খায়। আমার কাছে আহে। বাবা ডাকে আমারে। বাচ্চাডায় আমারে নানা ডাহে। মেয়েডা খুব ভালা।
– আপনি যে বাড়ি ছেড়ে এখানে পড়ে থাকেন আপনার চাকরি করা ছেলেরা লজ্জা পান না?
– লজ্জা পাবো কেন? আমি তো ফকির ! এই কইরাই আমি তাগরে পড়াইছি।
ফকিরের সাথে কথায় না পেরে আমি হোস্টেলে চলে গেলাম। জানালা দিয়ে ফকিরের দিকে চেয়ে থাকতাম আর বিচিত্র মানুষের কথা ভাবতাম। আয়া বেটির কথাও ভাবতাম। দুনিয়ায় তার কেউ নাই। আল্লাহ তাকে ফকির বাবা জোগার করে দিয়েছে। বাচ্চাটাকে নানা বানিয়ে দিয়েছে আল্লাহ।
আমি ভোরে উঠে ফজরের নামাজ পড়েই পড়তে বসতাম। পড়তাম বিছানায় বসে। একদিন এভাবে জানালার পাশে বসে পড়ছিলাম। অনেকে তখনও ঘুমাচ্ছিলো। বাইরে কেউ ছিলো না। বি ব্লকের বারান্দায় পাটিতে ল্যাটা দিয়ে বসে ফকির বাবা বিড়ি টানছিলেন। দুই তিন ফুট দূরে বারান্দার কিনারে পা ঝুলিয়ে বসা ছিলো এক টোকাই। টোকাই বসে বসে ঝিমাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল তার ঘুম ভাঙ্গেনি এখনো। হয়ত ফকির বাবার অদূরেই সে খালি বারান্দার মেঝেতে ঘুমিয়েছিল গত রাতে। ছিন্নমূল শিশুদের তখন টোকাই বলা হতো। তারা সারাদিন হাবিজাবি জিনিসপত্র টুকিয়ে ভাঙ্গারির দোকানে বিক্রি করে ভাত রুটি কিনে খেয়ে জীবন বাচাত বলে তাদেরকে টোকাই বলা হতো। টোকাইদের নিয়ে প্রতিদিন চিত্রশিল্পী রফিকুন্নবী (রনবী) কার্টুন আঁকতেন। কার্টুনের টোকাইদের উক্তির মাধ্যমে শিল্পী সমাজের অনেক অসংগতি তুলে ধরতেন। তারপর সরকার এদের নাম দেয় পথশিশু। পথশিশুদের অনেককেই পূনর্বাসনের ব্যাবস্থা করে সরকার, কিছু করে বিদেশি সংস্থা, কিছু পাচার হয়ে যায়। এখনো কিছু কিছু পথ শিশু আছে। যাহোক, সেই টোকাইর বয়সটা হয়তো আট কি দশ বছর হবে। তাকে দেখে আমার খুব মায়া হলো। খালি গায়। পরনে কুড়িয়ে পাওয়া নোংরা পুরাতন প্যান্ট। তাকে নিয়ে অনেক্ক্ষণ ভাবলাম। কে তাকে জন্ম দিয়েছিল, কে তাকে পেটে ধারণ করেছিলো, মায়ের স্নেহ সে পায় নি, বাবার আদর ও শাসন কি সে তা পায় নি। পশু পাখির মতো তার দিনের খাবার দিনে যোগার করতে হয়। এমন ভাবনা তাকে নিয়ে ভাবছিলাম আর তাকে দেখছিলাম জানালা দিয়ে। ছেলেটা এদিক সেদিক নড়াচড়াও করছিলো না ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে। ফকির বাবা দীর্ঘ সময় বিড়ি টানলেন। অনেকে পায়খানার বেগ আনতেও বিড়ি টানে। এমনও হতে পারে পায়খানার বেগ আনতে বিড়ি টানছিলেন। বিড়িটানা শেষ করে সবকিছু ভাজ করে ঝুলিতে ঢুকালেন। ঝুলি থেকে কাশার লোটা বের করে লোটা নিয়ে তিনি টয়লেটে প্রবেশ করলেন। এবার টোকাই ছেলেটা হটাৎ নড়াচড়া দিয়ে উঠে খোরঘোষের মতো এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখে ফকিরের ঝুলির ভেতর হাত ঢুকিয়ে মানিব্যাগটা বের করে আনলো। সব টাকা বের করে প্যান্টের পকেটে নিয়ে মানিব্যাগটা আগের যায়গায় রেখে পূর্ব পাশের গলি দিয়ে চলে গেলো। আমি জানালা দিয়ে চেয়ে চেয়ে দেখলাম। সে চলে গেলো। নিয়ে গেলো সব টাকা মানি ব্যাগের। যা কিছু কামিয়েছিলেন ফকির বাবা। সব নিয়ে গেলো। চেয়ে চেয়ে দেখলাম। আমার করার কিছু ছিলো না।
১৬/৯/২০২০ খ্রি.
ময়মনসিংহ

কেমন লাগলো তার উপর ভিত্তি করে নিচের ফাইফ স্টারে ভোট দিন ক্লিক করে
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)

Loading...
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার রচিত বই-এর অনলাইন শপ লিংক
http://www.daraz.com.bd/shop/talukder-pathology-lab/